#রাগে_অনুরাগে
#পর্ব_৭
#সুহাসিনি_ফাতেহা
“তিতলি দমে গেল না। দমে যাবে বলে কী এতটা ঝুঁকি নিয়েছে? হেরে যাওয়ার পাত্রী সে নয়। ফারাজ খানের সাথে একটু কথা বলতে এসে যদি সেটা জ্বালানো হয় তাহলে এবার সত্যি সত্যি তিতলি ফারাজ খানকে জ্বালাবেই।” তাই সে ভীষন সাহস যুগিয়ে বলল,
“আপনি সত্যি মাঠে নামবেন স্যার?” আমার কিন্তু ফুটবল খেলা খুব পছন্দ! টিভিতে মেসি নেইমারের খেলা ও দেখি! কলেজে সুন্দর সুন্দর সিনিয়র ভাইয়ারা যখন খেলে আমার যে কি ভালো লাগে…”
“এই মেয়ে একদম চুপ! এক থাপ্পড় দিলে তো সোজা পাশের তাল গাছের উপর পড়বেন! এসব আজগুবি কথা আপনার মাথায় কই থেকে আসে হ্যাঁ?” বেয়াদব মেয়ে!”
“মনের ভেতর থেকে আসে স্যার?”
“আউট!”
…
…
ফারাজ খানের সাথে ঝগরায় জিততে না পেরে চঞ্চল তিতলির মাথা কাজ করছে না। তাতে কি? সময় তার ও আসবে তখন এই লোককে ছাড়বে না একদম ছাড়বে না। সপ্তাদশী উদাস মনে বাড়ির ভেতরে চলে গেলো। রুন্ধ মস্তিষ্কে বিরবির করে বললো,
“ কি খারাপ লোক তিতলি কে বলে থাপ্পড় দিলে নাকি তাল গাছের উপর পড়বে! তো বলি কি সাহস থাকলে থাপ্পড় মেরে দেখাতি ! আমি উপরে বসে বসে তোর মাথায় তাল ফেলতাম। তখন বুঝতি কত ধানে কত চাল।”
“কি বিরবির করছো তিতলি?”
পাশ থেকে পুরুষালী কণ্ঠ শুনে পাশে ফিরলো তিতলি। অয়ন কে দেখে বিনা দ্বিধায় জ্বিভ ফস্কে বলল,
“আপনার কাজিন ফারাজ খান আছে না ওই লোক টা একদম সুবিধার না ভাইয়া । কলেজে ও শুধু স্টুডেন্টদের ধমকের উপর রাখে। সবাই তো আড়ালে ভাল্লুক ফারাজ স্যার বলে ডাকে।”
“কি বলছো তুমি তিতলি? ভাইয়া শুনতে ফেলে কি হবে তুমি জানো?”
“শুনলে শুনোক আমার কি? ওনাকে আমি ভয় পায় না।”
অয়ন অসহায় চোখে তাকালো মেয়েটার মুখপানে। ছোট থেকে তুষারের সাথে বন্ধুত্ব হওয়ার ভালোই মেয়েটার স্বভাবের সাথে পরিচিত। মুখে যা আসে তাই বলে। তবে এটা অয়নের ভালোই লাগে। এমন চঞ্চল প্রকৃতির মেয়ে সে খুব পছন্দ করে। আর সে যদি হয় তিতলি তাহলে আর কি? কেন যেন ভয় হয় তিতলির দিকে অন্য নজরে তাকাতে! যদি তুষার তার সাথে বন্ধুত্ব চিহ্ন করে দেয়। ভাবনা বাদ দিয়ে আশপাশে তাকিয়ে দেখলো কোথাও ফারাজ খান নেই। তাই স্বঃস্থির নিশ্বাস ফেলল।
তিতলির দিকে চেয়ে স্নিগ্ধ কণ্ঠ বলল,
“সানগ্লাস টা তোমাকে অনেক মানিয়েছে তিতলি। ”
“আমি জানি ভাইয়া! আসার পথেও একজন বলেছে আমাকে মানিয়েছে ?”
অয়ন শক্ত কণ্ঠে বলল,
“কে বলেছে?”
তিতলির কি হলো কে জানে। সে ওই ছেলেটার কথা বলল না। বরং বলল,
“আপনার ফারাজ ভাইয়া বলেছে। আমাকে নাকি আগুন সুন্দরী লাগছে।”
বলে চঞ্চল তিতলি হাসতে হাসতে সেখান থেকে চলে এলো।
পেছনে রেখে গেলো অবাক, হতবাক,হতবিহ্বল চোখে চেয়ে থাকা অয়ন কে। সে যেন এখনো বুঝতে পারছে না মেয়েটার বলা কথাটা। ফারাজ ভাই! ফারাজ ভাই এই কথা বলবে? অয়নের জানামতে সে তো কোনো মেয়ের দিকে ও তাকায় না। আর সেখানে?…. ফারাজ ভাইয়ের সাথে কোনো ঝামেলা করলো না তো তিতলি! ভাই যদি রেগে যায়….. আর ভাবতে পারছে না অয়ন..। ত্রস্ত পায়ে বাড়ির বাহিরে চলে গেলো।”
~~~~
ঘড়ির কাঁটায় সন্ধ্যা ছয়টা।
ইতিমধ্যেই বরপক্ষ চলে যাওয়ার জন্য তাড়া করছেন। আয়েশার কান্না যেন থামছে না। বাবা মা ভাই সবাইকে ছেড়ে শশুড় বাড়িতে চলে যাবে। এটা যেন মেয়েটার মন মানছে না। ও কাঁদতে কাঁদতে বাবাকে জড়িয়ে ধরলো। হেঁচকি উঠে গেছে মেয়েটার।
আমরুল খান নিজের মেয়েকে বুকে জড়িয়ে নিলেন। ভদ্রলোকের চোখেও পানি। একমাত্র আদরের মেয়ে কে আগের মতো প্রতিদিন চোখের সামনে দেখবেন না। ভাবতেই ওনার কলিজা ফেঁটে যাচ্ছে। আয়েশা একে একে মা বাবা ভাই সবাইকে জড়িয়ে ধরে কাঁদলো। আমরুল খান আর রুমানা বেগম বরপক্ষ চলে যাওয়ার সময় আয়েশার হাত সাইফের হাতে তুলে দিলেন,
আমরুল খান আত্মবিশ্বাসী গলায় বললেন,
“আমার মেয়েকে দেখে রেখো বাবা। আজকে তোমার হাতে আমানত হিসাবে তুলে দিলাম। আশা করি তুমি আমার মেয়েটাকে কখনো কষ্ট পেতে দিবে না। আমার বিশ্বাস আছে তোমার উপর।”
শশুড়ের কথায় সাইফ ভদ্রতায় ঠোঁঠ প্রসারিত করে হাসলেন। আবেগঘন কণ্ঠে জানাল,
“আমি আয়েশা কে কখনো কষ্ট পেতে দিবো না শশুড় আব্বু। আপনার মেয়ে আপনার বাড়িতে যেমন ছিলো,ঠিক তেমনই থাকবে। কোনো চিন্তা করবেন না আপনি।”
আমরুল খান, রুমানা বেগম দুজনের মনটা কিছুটা হালকা হলো।
ফারাজ খান ও এগিয়ে এলেন সেখানে। স্নেহে আয়েশার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে শাসনের সুরে বললেন,
“ওখানে কখনো কোনো সমস্যা হলে সোজা আমাকে ফোন করে জানাবি । সবার সাথে হাসি খুশি থাকবি। এখন কাঁদিস না।”——– বলতে বলতে ফারাজ খানের চোখ গেলো তিতলির মুখপানে। সপ্তাদশীর পেল্লব মুখখানার ওপর বিক্ষিপ্ত আকারে আছড়ে পড়ছে বেয়াদব কেশগুচ্ছ। গোল মুখখানায় যেন রাজ্যের সকল মোহ নিহিত। তবে তা ফারাজ খানকে কাবু করতে পারলো না। তিতলি তাকাতেই দুজনের চোখাচোখি হলো। তাতলি মুখ ভেঙচি কাটলো। ঠোঁট বেঁকালো মুখ বেঁকালো।
ফারাজ খান চোয়াল শক্ত করে আওড়ালো,
“সিংহ জেগে উঠলে যেমন হিংস্র হয়ে যায় ফারাজ খান জেগে উঠলে হিংস্র হতে সময় লাগবে না মিস তিতলি! — সাবধান করেছি শুনলেন না তো! এবার আমার হাত থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে দেখান। আপনার পায়ের শিকল টানবো আমি। দেখি আপনি আর কতটা দৌড়াতে পারেন।”
.
.
আয়েশার কান্না দেখে তিতলির ও কেন যেন খুব কান্না ফেলো। সপ্তাদশী নিজের দিকটা উপলদ্ধি করছিল। কিন্তু চঞ্চল তিতলি অন্যভাবে ভাবছিলো যে, একদিন তাকেও তার সুন্দর নরম বিছানা ছেড়ে বাবা মা ভাই সবাইকে ছেড়ে — ❝ একজন পুরুষ মানুষের গায়ের ঘামের গন্ধের মাঝখানে শুয়ে থাকতে হবে ।❞
এটা নিয়ে সপ্তাদশীর মনে দুঃখে রীতিমত দুঃখবোধের শেষ নেই।
সবার থেকে বিদায় নিয়ে বরপক্ষ রা চলে গেলো সে সময়। সাথে সাথে বিয়ে বাড়ির মানুষ জন ও কমে গেলো। কেউ কেউ চলে গেছে আবার কেউ কেউ থেকে গেছেন। অয়নদের একেবারে নিকটাত্মীয় রা একেবারে বৌভাত শেষ করে তারপর যাবেন।
তিতলি আসার সময় একটা ধূসর রঙা টপস জামা এনেছিলো। সফেদ রঙা গ্রাউন টা চেঞ্জ করে সেটা পড়ে নিয়েছে। কি যে গরম বলার বাহিরে। তিতলি বেশ ঘামছে। আবার কারেন্ট ও নেই। বিয়ে বাড়ির জেনাটারের লাইট জ্বলছে। সন্ধ্যা যে কারেন্ট গেছে এখনো আসে নি। এখন প্রায় সাতটা ত্রিশ মিনিট…
তুষার বাহির থেকে এসেই দেখলেন তিতলি ঝিলিকদের সাথে বসে বসে আড্ডা দিচ্ছে। ও এক পলক বোনের দিকে তাকিয়ে ফের রুমানা বেগমের কাছে গেলেন। ভদ্র মহিলাম মন খারাপ হয়ে আছে। চোখ দুটো সামান্য ফুঁলা ভাব। তুষার গিয়ে বললেন,
“আন্টি এবার আমাদের চলে যেতে হবে। আপনাকে বলতে এসেছি। ” ——-তৎক্ষণাৎ টি-শার্ট পড়তে পড়তে সেখানে অয়নও আসলো, এক কথায় বলল,
“আজকে তুদের যেতে দিবো না।”
রুমানা বেগম ও বললেন,
“আজকে থেকে যাও তুষার। কালকে ও তো থাকলে না রাত করে চলে গেলে। আর তো কখনো আসবেও না।”
আন্টি আমার চলে যেতে হবে। জুরুরী কাজ আছে। অন্য সময় আসবো কেমন! তিতলিও রাতে অন্য কোথায়ও ঘুমাতে পারে না।”
অয়ন তুষারের মাথায় থাপড়ে দিয়ে বলল,
“নাটক করিস না তো! এখন বোনের নাম দিয়ে চলে যাওয়ার বাহানা করবি কাজের বাহানা দিবি। তুই থাকবি আর তোর বোনও থাকবে।”
তুষার আমিও চাই আজকের দিনটা থেকে যাও বাবা। মেয়েটা চলে গেছে পুরো বাড়ি ফাঁকা ফাঁকা লাগছে ——– বলতে বলতে রুমানা বেগম কেঁদে উঠলেন।
“আন্টি কাঁদবেন না প্লিজ! শান্ত হন!”
“তোরা চলে যাবি বলছিস তাই কাঁদতেছে!”
রুমানা বেগম শাড়ির আঁচল দিয়ে চোখের পানি মুছে ফের বললেন,
“আমি কোনো কথা শুনবো না । তোমরা থাকবে এটাই ফাইনাল!”
তুষার যেন একটা বড় ফাঁদে পরে গেছে। রুমানা বেগম কে তিনি মায়ের মতো স্নেহ করেন। কিভাবে কথা ফেলবে! রুমানা বেগম বললেন,
“তোমার জন্য নাস্তা নিয়ে আসি বসো।”
“আমার খিদে নেই আন্টি!”
.
.
তুষার ড্রয়িংরুমে গিয়ে তিতলি কে দেখলো। তিতলি ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে আছে। ইশারা করলো যাওয়ার কথা নিয়ে।
তুষারের হঠাৎ চোখ গেলো ঝিলিকের দিকে। মেয়েটাকে কেন যেন ওনার ভালো লাগে। কিন্তু বিষযটা তেমন পাত্তা দেয় না। ওনি ওদিকে একবার তাকিয়ে মোবাইল হাতে টাইপ করতে করতে বের হয়ে গেলেন।
তিতলি ফোন হাতে নিয়ে দেখলো ভাইয়ের মেসেজ—-
“আজকে মনে হয় যেতে পারবো না । আন্টি কিভাবে ধরে রেখেছেন। তুই থাকতে পারবি তো?”
তিতলি মেসেজ টা সিন করে রেখে দিলো। আসলে তিতলির সবার সাথে ভালোই লাগছে। আর কখনো আসা হবে না। তাই সবার ফেসবুক আইডি ফ্রেন্ড লিস্টে যোগ করে নিলো। যাতে চলে গেলেও কথা বলতে পারে।
~~~
রাত নয়টার দিকে ওরা সবাই ছাঁদে গোল করে বসেছে। সবার ভাবনা একটাই কানামাছি খেলবে। বছর চারেক আগেও সপ্তাদশী তিতলি স্কুলে কানামাছি খেলতো। এখন আবার সে খেলা খেলতে পারবে বলে সপ্তাদশীর আনন্দে তর সইছে না।
ওরা ছয়জন আছে খেলার জন্য।
ঝিলিক বলল,
“আগে চো”র কে হবে?”
তিতলি নির্ধিদায় বলল,
“আপু আমার প্রথমে চোখ বাঁধো।”
“না হাত মিলানো হোক। যে সবার পরে হবে সে প্রথমে চোর হবে।”
তিতলি বাধ্য মেয়ের মতো মেনে নিলো সেটা।
ওরা সবাই তিনজন তিনজন করে হাত মিলালো। কিন্তু ভাগ্য কেন যেন তিতলি কে সবার শেষে তুললো। তিতলি নিজের পরনের ওড়না টা কাঁধ থেকে বুক পর্যন্ত গুঁজিয়ে নিলো ভালো ভাবে।
তারপর ওরা তিতলি কে চোখ বেঁধে দিলো। আর তিতলি হয়ে গেলো কানা। ওরা সবাই তিতলি বলল,
“এখানে কয়টা আঙুল বলো তো?”
তিতলি মুচকি হেসে বলল,
“দুইটা…..”
তিতলির কথা শুনে ওরা সবাই হেসে উঠলো। কারণ কোনো আঙুলই ওরা দেখায় নি। অতঃপর ওরা চারদিকে ছুঁটিয়ে পড়লো। তিতলি ও পায়ের দাপে দাপে ওদের দিকে এগাতে লাগলো।
“একজন বলছে আমি এখানে? আরেকজন বলছে আমি এখানে…. চঞ্চল তিতলি দ্বিকশূণ্য হয়ে আচমকা কাউকে জড়িয়ে ধরে বলে উঠলো,
“ধরে ফেলেছি তোমায় ঝিলিক আপু! এবার যাবে কই? দেখি আমার চোখ খুলে দাও তো?”
সপ্তাদশী কোনো উত্তর না পেয়ে সামনের মানুষটার শরীর ঝাঁকিয়ে ফের বলল,
“একি আপু তোমাকে এত চওড়া লম্বা লাগছে কেন? তোমার মুখ এমন খোঁচা খোঁচা লাগছে কেন? তোমার দাড়ি গোঁফ গজাইছে?”
#চলবে।
