হারানো ঠিকানা(চতুর্থ পর্ব)
বাড়ি বিক্রির খবরটা শোনার পর যেন গৌরী দেবীর ভিতরের সব শক্তি এক মুহূর্তে শেষ হয়ে গিয়েছিল।
যে বাড়িটার প্রতিটা দেওয়ালে তাঁর স্মৃতি জড়িয়ে ছিল, যেটাকে তিনি নিজের সংসার বলে ভেবেছিলেন, সেই বাড়িটা আর তাঁর নয়—এই সত্যিটা তিনি কিছুতেই মেনে নিতে পারছিলেন না।
যেদিন নতুন মালিকের লোকজন যখন বাড়ি মাপজোক করতে এসেছিল, গৌরী দেবী চুপচাপ ঠাকুরঘরের সামনে বসে ছিলেন।
চোখের সামনে ভেসে উঠছিল একটার পর একটা পুরোনো দৃশ্য।
এই বারান্দাতেই প্রথম হাঁটতে শিখেছিল গৌরব।
এই ঘরেই রাত জেগে তরুণের পরীক্ষার পড়া দেখিয়েছিলেন তিনি।
ডাইনিং টেবিলটার পাশে দাঁড়িয়ে কতদিন তপন বাবুর জন্য অপেক্ষা করেছেন…
সবকিছু যেন মুহূর্তের মধ্যে পর হয়ে গেল।
কোথায় যাবেন?এই প্রশ্ন মাথায় আসতেই গৌরি দেবীর মনে হলো,তিনি এবার সত্যিই এই অদ্ভুত অসহায় অবস্হার মধ্যে নিজের ছেলেদের নিয়ে হয়তো বাঁচতেই পারবেন না।
কিন্তু শেষ পর্যন্ত পাড়ার এক বর্ষীয়ান প্রায় আত্মীয়সম নির্মলবাবু,মীরা বৌদি তাঁদের থাকার জন্য নিজের বাড়ির একটা ঘর ছেড়ে দেন। নির্মল বাবু গৌরি দেবীর দিকে তাকিয়ে বলেন,”বোন,আমার ক্ষমতা খুব সীমিত,এই ঘরে যতদিন পর্যন্ত থাকতে চাও থেকো,কোন অসুবিধা নেই।
মীরা বৌদি গৌরি দেবীর হাতটা ধরে বলেন,”এখন অসুবিধার সম্মুখীন তোমরা হয়েছে,ঠিক কথা কিন্তু দেখো সময় আবার পালটাবে,ভালো দিন আবার আসবে”।
ঘর বলতে ছিলো তখন ছিলো শুধুই একটা ঘর।গৌরি দেবী নির্মল বাবু এবং পাড়ার আরো কয়েকজন মানুষের সহায়তায় ওই বাড়ির সব আসবাবপত্র বিক্রি করে দিলেন।শুধু রাখলেন একটা খাট, দুটো ছোট পুরোনো আলমারি, আর বাসনপত্র।
আগে যেখানে আলাদা আলাদা ঘরে অভ্যস্ত ছিল তারা, সেখানে এখন তিনজনকে একসঙ্গে থাকতে হচ্ছিল।
প্রথম কয়েকটা রাত গৌরী দেবী প্রায় ঘুমোতেই পারেননি।মাঝরাতে হঠাৎ ঘুম ভেঙে যেত,তারপর অন্ধকারেই তিনি চুপচাপ বসে থাকতেন।
চোখের সামনে শুধু পুরোনো বাড়িটার ছবি ভেসে উঠত—ঠাকুরঘরের প্রদীপ, ছেলেদের পড়ার টেবিল, রান্নাঘরের জানলা, বারান্দার মানিপ্ল্যান্ট…
মনে হতো, যেন কেউ তাঁর বুকের ভিতর থেকে পুরো জীবনটাই তুলে নিয়ে গেছে।
সব হারিয়ে গৌরি দেবীর মনে হতো,তিনি ভিতর থেকেই ফাঁকা হয়ে গিয়েছেন।
কিন্তু সংসার থেমে থাকে না।
মানুষ যত বড় আঘাতই পাক, পরদিন সকাল আবার আসে।
একদিন খুব ভোরে গৌরী দেবী ঘুম থেকে উঠে দেখলেন, তরুণ জানলার পাশে বসে আছে। সারারাত সম্ভবত সে-ও ঘুমোয়নি।তার চোখ লাল, মুখ ক্লান্ত।
গৌরবও চুপচাপ বসেছিল পাশে।হঠাৎ গৌরব উঠে এসে মায়ের সামনে দাঁড়াল।তার গলাটা কাঁপছিল, কিন্তু চোখে ছিল অদ্ভুত জেদ,কাঁপা গলাতেই সে বলে উঠল, “মা, আমরা হারব না।”
গৌরী দেবী অবাক হয়ে ছেলের দিকে তাকালেন।
তরুণও ধীরে এসে পাশে দাঁড়াল।একটু থেমে সে-ও বলে উঠলো,“বাবা যা করেছে, তার জন্য আমরা মাথা নিচু করব না।”
কথাগুলো খুব সাধারণ ছিল।
কিন্তু সেই মুহূর্তে গৌরী দেবীর মনে হলো, তাঁর ছেলেরা আর ছোট নেই।
জীবন তাদের এক ধাক্কায় বড় করে দিয়েছে।তিনি কিছু বলতে পারলেন না।
শুধু চুপচাপ দুই ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন।
আর বহুদিন পর প্রথমবার তাঁর মনে হলো—
তিনি একা নন।
সেই দিন থেকেই শুরু হলো তাদের নতুন লড়াই।
সংগ্রামের লড়াই।
নিজেদের ভেঙে পড়া জীবনটাকে আবার গড়ে তোলার লড়াই।
তরুণ তখন কলেজে পড়ে।আগে পড়াশোনার বাইরে তার বিশেষ কোনো দায়িত্ব ছিল না। কিন্তু এখন পরিস্থিতি অন্য।
সে টিউশন পড়ানো শুরু করল।
সকালে কলেজ, দুপুরে লাইব্রেরি, বিকেলে তিনটে থেকে বাড়িতে বাড়িতে গিয়ে পড়ানো, রাতে নিজের পড়া।
কখনও কখনও এত ক্লান্ত হয়ে পড়ত যে খেতে খেতেই চোখ বন্ধ হয়ে আসত।তবুও সে থামত না।
কারণ সে জানত—এখন সে শুধু নিজের জন্য লড়ছে না,মা আর ভাইয়ের জন্যও লড়ছে।
একদিন রাতে গৌরী দেবী বললেন, “এত কষ্ট করিস না বাবা। শরীর খারাপ হয়ে যাবে।”
তরুণ হেসে বললো, “এখন থামলে চলবে না মা।”
তার গলায় তখন বাবার প্রতি রাগ নয়, বরং দায়িত্বের ভার ছিল।
অন্যদিকে গৌরবও নিজেকে বদলে ফেলছিল।
আগে সে একটু চঞ্চল ছিল। বন্ধুদের সঙ্গে ঘোরা, খেলাধুলো—এসবেই বেশি সময় কাটত।
কিন্তু সংসারের এই ভাঙন তাকে একেবারে অন্য মানুষ বানিয়ে দিল।
সে দিনে পড়াশোনা করতো, আর সন্ধ্যায় ছোটখাটো কাজ।
কখনও পাড়ার পাশের দোকানের হিসাব লিখে দিচ্ছে, কখনও বয়স্ক কারুর বাড়িতে বাজার পৌঁছে দিচ্ছে,কখনও কোন ছোট বাচ্চার স্কুলের নানা প্রজেক্ট বানিয়ে দিচ্ছে।
মাসের শেষে হাতে খুব বেশি টাকা আসতো না,তবুও সেই সামান্য টাকাগুলোও তখন তাদের কাছে ভীষণ মূল্যবান ছিল।
আগে যাদের জীবন স্বচ্ছল ছিল, তারা এখন প্রতিটা টাকার হিসাব কষে চলত।বাজারে যাওয়ার আগে কত টাকা খরচ হবে, সেটা লিখে নিয়ে যেতে হতো।
নতুন জামাকাপড় কেনা বন্ধ,বাইরে খাওয়া বন্ধ।
অনেকদিন মাছও হতো না বাড়িতে।
তবুও কেউ অভিযোগ করত না।কারণ তিনজনই জানত—তারা লড়াই করছে।
গৌরী দেবীও বসে থাকেননি।প্রথমদিকে আত্মসম্মানে খুব লাগত তাঁর।
কিন্তু ধীরে ধীরে তিনি বুঝলেন—সংসার বাঁচাতে হলে কাজ করতেই হবে।
পাড়ার কয়েকজনের শাড়িতে ফলস লাগানোর কাজ শুরু করলেন তিনি।
তারপর ধীরে ধীরে আচার বানানো বাড়িতে বাড়িতে অনুষ্ঠানের সময় রান্নার অর্ডার নেওয়া—যা কাজ পাচ্ছিলেন, তাই করছিলেন।
প্রথম যখন অন্যের বাড়িতে রান্না করতে গিয়েছিলেন, তাঁর হাত কেঁপে উঠেছিল,কারণ একসময় এই মানুষগুলোই তাঁকে “তপনবাবুর স্ত্রী” বলে আলাদা সম্মান দিত।
আজ তারা সহানুভূতির চোখে তাকায়।সেই দৃষ্টি সহ্য করতে খুব কষ্ট হতো তাঁর।
কিন্তু অপমানের আগুনই ধীরে ধীরে তাঁকে শক্ত করে তুলছিল।
একদিন কাজ থেকে ফিরে গৌরি দেবী ছোট আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে দেখছিলেন,
মুখ শুকিয়ে গেছে, চোখের নীচে কালি।
তবুও সেই মুখের ভিতরে তিনি একটা নতুন জেদ দেখতে পেয়েছিলেন।
এই পাড়ার সবাই কমবেশি এদের প্রতি সহানুভূতিশীল ছিল ।
এক সন্ধ্যায় পাড়ার ক্লাব থেকে কয়েকজন ছেলে এল।
তারা হাতে কিছু বাজারের ব্যাগ নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল।
সমরবাবুর ছেলে রাহুল বলে উঠলো,“কাকিমা, কিছু দরকার হলে আমাদের বলবেন। আমরা আছি।”
গৌরী দেবী প্রথমে নিতে চাইছিলেন না।
কিন্তু ছেলেগুলোর আন্তরিক মুখ দেখে তাঁর চোখ ভিজে উঠল।তিনি বুঝলেন—সবাই শুধু কষ্ট দেয় না।
কিছু মানুষ নিঃস্বার্থভাবে পাশে দাঁড়াতেও জানে।
অন্যদিকে তপন বাবুর কোনো খবর পাওয়া যাচ্ছিল না।
কেউ বলত, তিনি অন্য শহরে চলে গেছেন।
কেউ বলত, ব্যবসা শুরু করেছেন।
আবার কেউ বলত, তাপসীর সঙ্গে খুব সুখে আছেন।
আগে এসব কথা শুনলে গৌরী দেবীর বুকের ভিতর কষ্ট হতো।কিন্তু ধীরে ধীরে তিনি এসব নিয়ে ভাবা বন্ধ করে দিলেন,কারণ তিনি বুঝে গিয়েছিলেন—যে মানুষ নিজের পরিবারকে এভাবে ভেঙে দিতে পারে, তাকে নিয়ে ভেবে আর কোনো লাভ নেই।
এখন তাঁর পুরো পৃথিবী শুধু দুই ছেলে।
সেদিন রাতে খাওয়া শেষ করে তিনজন চুপচাপ বসেছিল।ঘরের আলোটা ম্লান ছিল,বাইরে হালকা বৃষ্টি পড়ছিল।
হঠাৎ তরুণ ধীরে মায়ের পাশে এসে বসে বলল,
“মা, একদিন আমরা আবার নিজেদের বাড়ি কিনব।”
গৌরী দেবী ছেলের মুখের দিকে তাকালেন।
সেই চোখে তিনি প্রথমবার ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখলেন।
গৌরব হেসে বলল,“আর সেই বাড়িতে বিশ্বাসঘাতকদের কোনো জায়গা হবে না।”
কথাটা শুনে গৌরী দেবীর চোখ ভিজে উঠল,তিনি কিছু বললেন না,শুধু চুপচাপ দুই ছেলের মাথায় হাত রাখলেন।
বহুদিন পর তাঁর বুকের ভিতর একটা নতুন অনুভূতি জন্ম নিচ্ছিল।
ভাঙা জীবনের ধ্বংসস্তূপের মধ্যেও যেন কোথাও ছোট্ট একটা আলো জ্বলছিল,”আশার আলো”।
ক্রমশ
