হারানো ঠিকানা(সপ্তম পর্ব)
গৌরী দেবী চুপচাপ দরজার দিকে তাকিয়ে ছিলেন।
সময় যেন হঠাৎ অনেক বছর পিছিয়ে গেছে।
দরজার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটা তপন বাবু—এটা বুঝতে তাঁর-ও কয়েক সেকেন্ড লেগেছিল।
কিন্তু এই মানুষটা সেই পুরোনো তপন বাবু নন।যে মানুষ একসময় দামি জামাকাপড় পরে আত্মবিশ্বাসে মাথা উঁচু করে চলতেন, যার গলায় সবসময় দৃঢ়তা থাকত, আজ তিনি ভাঙা, ক্লান্ত, পরাজিত।
সবচেয়ে বেশি বদলে গেছে তাঁর চোখ।সেখানে আর অহংকার নেই,আছে শুধু ক্লান্তি আর অসহায়তা।
তরুণের মুখ মুহূর্তে শক্ত হয়ে গেল।বহু বছরের জমে থাকা রাগ যেন আবার বুকের ভিতর জেগে উঠল।
সে ঠান্ডা গলায় বলে উঠলো, “এখানে কেন এসেছেন?”
তপন বাবু কিছুক্ষণ মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইলেন।মনে হচ্ছিল, কথাগুলো বলতেও তাঁর কষ্ট হচ্ছে।
তারপর খুব ধীরে ধীরে বললেন, “একটু ভিতরে বসতে দেবে?”
ঘরের ভিতর অদ্ভুত নীরবতা নেমে এল।
গৌরবের মুখে স্পষ্ট বিরক্তি।সুমনা আর মেঘলা চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিল।
ঋদ্ধি কিছুই বুঝতে না পেরে অবাক চোখে লোকটার দিকে তাকিয়ে ছিল।
কেউ কোনো উত্তর দিল না।
শেষ পর্যন্ত গৌরী দেবী ধীরে বললেন, “ভিতরে আসুন।”
তাঁর গলায় আবেগ ছিল না,ছিল শুধু একধরনের যন্ত্রচালিত আহ্বান।
তপন বাবু ধীরে ধীরে ড্রয়িংরুমে এসে বসলেন।কিন্তু বসেও যেন ঠিক বসতে পারছিলেন না।চোখ তুলে কারও দিকে তাকানোর সাহস ছিল না তাঁর।
একসময় এই বাড়িতে তাঁর গলাতেই শেষ কথা হতো।আজ তিনি অতিথির থেকেও কম।
গৌরব দূরে দাঁড়িয়ে ছিল হাত গুটিয়ে।
তরুণের চোয়াল শক্ত হয়ে আছে।গৌরী দেবী চুপচাপ সোফার অন্য পাশে বসেছিলেন।
অনেকক্ষণ কেউ কোনো কথা বলল না।শুধু ঘড়ির টিকটিক শব্দ শোনা যাচ্ছিল।
অবশেষে তপন বাবুই ধীরে কথা শুরু করলেন।
“তাপসী… কয়েক বছর আগেই মারা গেছে,”কথাটা বলার সময় তাঁর গলাটা কেঁপে উঠল।
গৌরী দেবীর মুখে কোনো পরিবর্তন হলো না।
তপন বাবু আবার বললেন,“কিডনির অসুখ হয়েছিল। অনেক চেষ্টা করেছিলাম… কিন্তু বাঁচাতে পারিনি।”
কিছুক্ষণ চুপ থেকে তিনি দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
তারপর ধীরে ধীরে বলতে শুরু করলেন দীর্ঘও কয়েক বছরের কথা।তাপসীর মৃত্যুর পর থেকেই তন্ময় আর তপস্যার আচরণ বদলে যেতে শুরু করে।
প্রথমে সেটা ছোটখাটো বিষয়েই বোঝা গিয়েছিল।ব্যবসার হিসাব নিয়ে ঝগড়া, সম্পত্তির কাগজ নিজেদের কাছে রাখা, বাবার সিদ্ধান্তে বিরক্তি…
তপন বাবু তখনও বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দেননি।
তিনি ভাবতেন, নিজের সন্তান কখনও তাঁর ক্ষতি করবে না।
যেমন একদিন ভেবেছিলেন—দুই সংসার সামলেও সবাইকে নিজের মতো করে ধরে রাখতে পারবেন।
জীবন তখনও তাঁকে শিক্ষা দিচ্ছিল,কিন্তু তিনি বুঝতে চাননি।
তপন বাবু ধীরে ধীরে বলছিলেন,“তন্ময় বলত, ব্যবসাটা পুরোপুরি ওর নামে করে দিতে। তপস্যাও আলাদা ফ্ল্যাট চাইছিল। আমি ভাবতাম সময় গেলে সব ঠিক হয়ে যাবে।”
তিনি তিক্ত হেসে মাথা নেড়ে বললেন,“কিন্তু কিছুই ঠিক হয়নি।”
একদিন হঠাৎ তিনি জানতে পারেন, ব্যাংকের যৌথ অ্যাকাউন্ট থেকে প্রায় সব টাকা তুলে নেওয়া হয়েছে।তন্ময় সেই টাকা নিয়ে নিয়েছিলো।
তপস্যাও নিজের অংশ বুঝে নিয়ে ছিলো। তপন বাবু কার্যত কপর্দকশূন্য হয়ে পড়েন,একা হয়ে পড়েন।
যে বাড়ির জন্য তপন বাবু নিজের প্রথম সংসার ভেঙে দিয়েছিলেন, শেষ পর্যন্ত সেই বাড়ি থেকেও তাঁকে বের করে দেওয়া হয়।তাঁর নিজের গলায় তখন তীব্র অপমানের যন্ত্রণা।
তিনি বলে ওঠেন, “ওরা বলেছিল, আমি নাকি এখন বোঝা।”
ঘরের ভিতর আবার নীরবতা নেমে এল।
কথাগুলো শুনেও তরুণের মুখ নরম হলো না।
বরং তার চোখে আরও কঠোরতা ফুটে উঠল।
সে ধীরে ধীরে বললে,“এটা তো,আপনার প্রাপ্য, তখন তো আপনি-ও আমাদের কথাও ভাবেননি।”
তপন বাবু মাথা নিচু করে রইলেন।
তরুণের গলায় জমে থাকা বহু বছরের কষ্ট বেরিয়ে আসছিল।সে চেঁচিয়ে বলে উঠলো,“যেদিন মা-কে রাস্তায় নামিয়েছিলেন, সেদিন কি একবারও মনে হয়েছিল উনিও একা হয়ে যাবেন?”
গৌরবও আবার বলে উঠল,“যেদিন বাড়িটা বিক্রি করলেন, সেদিন আমরা কোথায় যাব, সেটা ভেবেছিলেন?”
তপন বাবুর ঠোঁট কাঁপছিল,কিন্তু কোনো উত্তর ছিল না তাঁর কাছে—
কারণ কিছু প্রশ্নের উত্তর সত্যিই হয় না।
ঋদ্ধি তখনও কিছু বুঝতে না পেরে গৌরী দেবীর পাশে বসেছিল।সে ধীরে ধীরে জিজ্ঞেস করল, “ঠাকুমা, এই দাদু কাঁদছে কেন?”
ঘরের সবাই এক মুহূর্তের জন্য চুপ হয়ে গেল।
গৌরী দেবী নাতির মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন।তারপর খুব শান্ত গলায় বললেন, “মানুষ যখন নিজের ভুলের শাস্তি পায়,তখনও অনেক কষ্ট পায়।”
তপন বাবুর চোখ ভিজে উঠল।
হয়তো বহু বছর পরে প্রথমবার তিনি নিজের কাজের পরিণতি পুরোপুরি অনুভব করছিলেন।
অনেকক্ষণ পরে তিনি ধীরে গৌরী দেবীর দিকে তাকালেন।সেই চোখে অনুতাপ ছিল,লজ্জা ছিল।
আর ছিল আশ্রয় হারানো মানুষের অসহায়তা।
তিনি কাঁপা গলায় বললেন, “গৌরী… আমি খুব ভুল করেছি।”
গৌরী দেবী চুপ করে শুনছিলেন।
তপন বাবু আবার বললেন,
“যদি পারো… আমাকে একটু আশ্রয় দাও।”
কথাটা শুনে ঘরের সবাই নিস্তব্ধ হয়ে গেল।
একসময় যে মানুষটা নিজের অহংকারে একটা সংসার ভেঙে দিয়েছিল, আজ সেই মানুষটাই আশ্রয়ের জন্য হাত পাতছে।
তরুণ সঙ্গে সঙ্গে প্রতিবাদ করল।সে বলে উঠলো, “না, এটা সম্ভব না।”
গৌরবও রাগে বলল, “যে মানুষ আমাদের শেষ করে দিয়েছিল, তাকে আবার এই বাড়িতে রাখা হবে?”
মেঘলা আর সুমনাও চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিল।তারা জানত, এই সিদ্ধান্ত সহজ নয়।
গৌরী দেবী অনেকক্ষণ চুপ করে রইলেন।
তাঁর চোখে রাগ ছিল না,কিন্তু বহু বছরের জমে থাকা ক্লান্তি ছিল।
তিনি ধীরে ধীরে বললেন, “মানুষ হিসেবে কাউকে রাস্তায় ফেলে দিতে পারবো না,আমরা রাস্তার ভিখারিকে-ও খাবার দিই,জামা-কাপড় দিই।”
তরুণ কিছু বলতে যাচ্ছিল।গৌরী দেবী হাত তুলে থামিয়ে দিলেন।
তারপর খুব স্পষ্ট গলায় তপন বাবুকে বললেন,
“ আশ্রয় আর খাবার-কিন্তু এর বেশি কিছু আর নয়।”
এই একটা বাক্যের মধ্যেই যেন গৌরি দেবী নিজের পরিবারের সঙ্গে তপনবাবুর সব সম্পর্কের সীমারেখা টেনে দিলেন তিনি।
সেই থেকেই বাড়ির বাইরের উঠোনের একটা ছোট্ট ঘরে থাকতে শুরু করলেন তপন বাবু।আগে এখানে ব্যবসার মাল রাখা হতো,এখন সেই সব সরিয়ে একটা খাট, একটা টেবিল দেওয়া হলো তপন বাবুকে, আর একটা ছোট্ট জানলা ভেঙে তৈরি করে দেওয়া হলো।
একসময় যে মানুষ বড় বাড়ি, গাড়ি, আর অর্থের অহংকারে বেঁচে ছিলেন, আজ তিনি নিঃশব্দে দিন কাটান সেই সংসারেরই এক কোণে।
সকালে খুব ভোরে উঠে বারান্দায় বসে থাকেন।
ঋদ্ধি মাঝে মাঝে দৌড়ে এসে বলে, “নতুন দাদু, খেলবে?”
তপন বাবু মৃদু হেসে মাথা নেড়ে না বলেন।
কিন্তু বাড়ির অন্যরা দূরত্ব বজায় রাখে।তরুণ আর গৌরব প্রয়োজন ছাড়া কথা বলে না।
তারা তপন বাবুকে থাকতে দিয়েছে, কারণ গৌরী দেবী শিখিয়েছেন মানবিকতা।
কিন্তু ক্ষমা আর বিশ্বাস যে এক জিনিস নয়, সেটাও তারা শিখেছে গৌরি দেবী আর নিজেদের জীবন সংগ্রাম থেকে।
ক্রমশ
