হারানো ঠিকানা(তৃতীয় পর্ব)
হাসপাতাল থেকে ফেরার পর খবরটা পাড়ায় আগুনের মতো ছড়িয়ে পড়তে সময় লাগেনি।
একদিন আগেও যে মানুষটাকে পাড়ার সবাই সম্মানের চোখে দেখত, পরদিন থেকেই সেই মানুষটার নাম উচ্চারণ হচ্ছিল ঘৃণা আর বিস্ময়ের সঙ্গে।
চায়ের দোকান, বাজার, ক্লাবঘর—সব জায়গাতেই একটাই আলোচনা, “তপনবাবু এত বড় প্রতারণা করলেন!”
কেউ বিশ্বাস করতে পারছিল না,যে মানুষ এত বছর ধরে নিজের স্ত্রী-সন্তান নিয়ে সুখী সংসারের ছবি দেখিয়েছে, সে গোপনে আরেকটা সংসার চালিয়েছে—এটা যেন কারও মাথাতেই ঢুকছিল না।
গৌরী দেবী প্রথম কয়েকদিন বাড়ির বাইরে বেরোনোই বন্ধ করে দিয়েছিলেন।
কারও মুখোমুখি হতে ইচ্ছে করত না তাঁর।
তাঁর মনে হচ্ছিল, পাড়ার প্রত্যেকটা মানুষ যেন তাঁকে করুণা করছে।
কিন্তু সবচেয়ে ভয়ংকর সময়টা তখনও শুরু হয়নি।
হাসপাতাল থেকে ছাড়া পাওয়ার চারদিন পর তপন বাবু বাড়ি ফিরলেন।
গৌরী দেবী মনে মনে ভেবেছিলেন, হয়তো এত বড় ঘটনার পরে অন্তত কিছুটা অনুতাপ হবে তাঁর মধ্যে। হয়তো তিনি আলাদা কোথাও থাকার ব্যবস্থা করবেন।
কিন্তু তিনি ভুল ভেবেছিলেন।
সেদিন বিকেলে বাড়ির সামনে একটা বড় গাড়ি এসে থামল।গৌরব বারান্দা থেকে নিচে তাকিয়ে প্রথমে বুঝতেই পারেনি কী হচ্ছে।
তারপর একে একে গাড়ি থেকে নামল তাপসী, আর তার সঙ্গে দুই ছেলে-মেয়ে—তন্ময় আর তপস্যা।
বয়সে তারা তরুণ আর গৌরবের কাছাকাছি। তন্ময়ের চোখেমুখে একটা উদ্ধত আত্মবিশ্বাস ছিল।,তপস্যার মুখেও ছিল এক অদ্ভুত ঔদ্ধত্য।
তাদের দেখে মনে হচ্ছিল না, তারা কোনো অপরাধবোধ নিয়ে এসেছে,বরং এমন ভাব যেন এই বাড়িতে তাদের প্রবেশের অধিকার বহুদিনের।
তাপসী ধীরে ধীরে বাড়ির ভিতরে ঢুকে চারদিকে তাকাল।তার চোখে বিস্ময় নয়, ছিল অধিকারবোধ।
তপন বাবু শান্ত গলায় বললেন, “এখন থেকে সবাই এখানেই থাকবে।”
গৌরী দেবীর বুকের ভিতরটা মোচড় দিয়ে উঠল।
তরুণ সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠল, “মানে? এরা এখানে থাকবে কেন?”
তপন বাবুর মুখ শক্ত হয়ে গেল।তিনি চেঁচিয়ে বলে উঠলেন, “কারণ এরা আমার পরিবার।”
এই কথাটা যেন আগুনে ঘি ঢেলে দিল।
গৌরী দেবী রাগে কাঁপতে কাঁপতে বলে উঠলেন, “তাহলে আমরা কী?”
কিন্তু তপন বাবু উত্তর দিলেন না।
সেই দিন থেকেই বাড়িটার পরিবেশ বদলে গেল।
একসময় যে বাড়িতে শান্তি ছিল, সেখানে এখন প্রতিদিন অস্বস্তি, অপমান আর চাপা উত্তেজনা।
তাপসী খুব দ্রুত নিজের জায়গা তৈরি করতে শুরু করল।প্রথম কয়েকদিন সে মিষ্টি ব্যবহার করলেও ধীরে ধীরে তার আসল আচরণ সামনে আসতে লাগল।
রান্নাঘরে গিয়ে কাজের মাসিকে নির্দেশ দিচ্ছে, “তপনের জন্য কম তেল দেবে।”
“এই বাসনগুলো আলাদা করে রাখো।”
“এই ঘরটা তন্ময়ের লাগবে।”
গৌরী দেবী অবাক হয়ে দেখছিলেন, তাঁর নিজের বাড়িতে একজন বাইরের মানুষ কী সহজে কর্তৃত্ব করতে শুরু করেছে।
সবচেয়ে কষ্ট হতো ডাইনিং টেবিলে।আগে চারজনে একসাথে বসে খাওয়ার সময় বাড়িটা হাসিতে ভরে থাকত।
এখন সেই টেবিলে সাতজন বসে।তাপসী যেন ইচ্ছে করেই গৌরী দেবীর জায়গায় বসতো। তন্ময় আর তপস্যা এমনভাবে কথা বলত,যেন তারা বহুদিনের মালিক।
একদিন খাওয়ার সময় তন্ময় হেসে বলেছিল,
“এই বাড়িটা বেশ বড়। একটু রিনোভেশন করলে আরও ভালো লাগবে।”
গৌরব রাগে থালা নামিয়ে বলেছিল,“এটা আমাদের বাড়ি!”
তপস্যা ঠান্ডা হেসে উত্তর দিয়েছিল,
“তোমাদের বাবার বাড়ি। আর সেই অধিকার আমাদেরও আছে।”
কথাটা শুনে গৌরী দেবীর হাত কেঁপে উঠেছিল।তিনি বুঝতে পারছিলেন, তাঁকে ইচ্ছে করেই ছোট করা হচ্ছে।
ধীরে ধীরে পাড়ার মানুষও সবকিছু জানতে শুরু করল।
প্রথমে ফিসফিসানি ছিল।
পরে সেটা প্রকাশ্য সমালোচনায় বদলে গেল।
পাড়ার মহিলারা আর তাপসীর সঙ্গে কথা বলত না। ক্লাবের ছেলেরা তপন বাবুকে দেখলে মুখ ঘুরিয়ে নিত।
সমরবাবু একদিন সরাসরি বলেই ফেলেছিলেন,“আপনার কাছে এটা আশা করিনি তপনবাবু।”
তপন বাবুর মুখ কালো হয়ে গিয়েছিল।কিন্তু তাঁর রাগটা আরও বেশি পড়ত গৌরী দেবীর উপরেই।
একদিন রাতে তিনি বিরক্ত গলায় বলে উঠলেন, “পাড়ার লোকজনকে এত মাথায় তুলছ কেন,বাড়ির কথা সব বলছো?”
গৌরী দেবী শান্ত গলায় বলেছিলেন, “আমি কাউকে কিছু বলিনি।”
তপন বাবু চিৎকার করে বলে উঠলেন, “সবাই যেন আমাকে অপরাধী ভাবছে!”
তরুণ তখন আর নিজেকে সামলাতে পারেনি।সে এবার প্রথমবারের মতো তপন বাবুর সঙ্গে চেঁচিয়ে বলে উঠল, “কারণ তুমি অপরাধী,বাবা!”
ঘরের ভিতর মুহূর্তে নীরবতা নেমে এসেছিল।তপন বাবু রাগে ছেলের দিকে তাকিয়েছিলেন, কিন্তু তরুণ চোখ নামায়নি।
সেই প্রথমবার গৌরী দেবী বুঝলেন—তাঁর ছেলেরা আর আগের মতো ছোট নেই।
দিন যত যাচ্ছিল, বাড়ির পরিস্থিতি তত খারাপ হচ্ছিল।
তাপসী ক্রমশ অস্থির হয়ে উঠছিল।পাড়ার মানুষ তাকে গ্রহণ করেনি—এটা সে মেনে নিতে পারছিল না।
একদিন বাজার থেকে ফিরে সে রাগে বলেছিল, “সবাই এমনভাবে তাকায় যেন আমি কোনো অপরাধ করেছি,কি করেছি আমি?”
গৌরী দেবী শান্তভাবে বলেছিলেন,“মানুষ যা দেখছে, যা নীতিবিরুদ্ধ তাই নিয়ে বলছে।”
তাপসী তীব্র গলায় বলেছিল, “তোমার জন্যই সবাই আমাদের বিরুদ্ধে!”
গৌরী দেবী উত্তর দেননি,কারণ তিনি জানতেন—এই অপমানের শুরু তিনি করেননি।
এরইমধ্যে গৌরি দেবী একদিন পাড়ার-ই এক ভদ্রলোকের সহায়তায় একজন উকিলের দারস্হ হলেন।
যেদিন বাড়িতে প্রথম উকিল এলো,একটু হলেও তপন বাবু চমকে উঠলেন। তিনি একটু অবাক হয়েই জিজ্ঞেস করলেন,”উকিল কি জন্য?”
গৌরি দেবীর হয়ে সেই উকিল বলে উঠলেন, “আমার মক্কেল চান,আপনাদের বিবাহ বিচ্ছেদ হোক,এবং তিনি ও তাঁর দুই ছেলে তাঁদের প্রাপ্য সম্মান ও সম্পত্তির ভাগ পাক”।
তপন বাবু চিৎকার করে বলে উঠলেন, “এই বাড়ি আমার কেনা,ওদের কোন অধিকার নেই ”
গৌরি দেবী শান্ত স্বরে বলে উঠলেন, “আমার বাবা-মা মারা যাওয়ার পর তুমি আমার ওই বাড়িটা প্রায় জোর করেই বিক্রি করেছিলে,এবং সেই সব টাকা দিয়েই তুমি এই বাড়িটা কিনেছো।
আমি যদি তোমার এই অবৈধ সম্পর্ক নিয়ে পুলিশের কাছে যাই,তাহলে উকিল বাবু ও পুলিশ সব সত্যিই বের করে আনবে।হয়তো কিছুই পাবেনা তুমি,বরং আরো তোমার সম্মানহানি হবে,তাই আমি চাই সহজভাবে তুমি বিবাহ বিচ্ছেদ এর কাগজে সই করে দাও এবং আমি এবং আমার ছেলেরা আমাদের প্রাপ্য সম্মান, সম্পত্তির অংশ পাই।”
উপস্থিত পাড়ার সবাই গৌরি দেবীকে সমর্থন জানালো।একবার সবার দিকে তাকিয়ে তপন বাবু বলে উঠলেন, “গৌরি,তুমি যা চাইছে,তাই হবে।তবে আমাকে অন্তত একমাস সময় দাও, আমি একটু সুস্থ হয়ে উঠলেই তাপসী ও ছেলেমেয়েদের জন্য অন্য বাড়ি খুঁজে চলে যাবো।”
গৌরি দেবী সম্মতি দিলেন।
এরপর হঠাৎই একদিন খবর ছড়িয়ে পড়ল—
তপন বাবু, তাপসী এবং তাদের ছেলে-মেয়ে বাড়ি ছেড়ে চলে গেছে।
সকালবেলা কাজের মাসি এসে দেখলো, বাড়ির উপরের ঘরগুলো খালি।
সঙ্গে সঙ্গেই সে গৌরি দেবীকে জানায়।
গৌরি দেবী এসে দেখেন,তপন বাবুর আলমারি ফাঁকা,তাপসীর জিনিসপত্রও নেই।
প্রথমে সবাই ভেবেছিল, হয়তো এত অপমান সহ্য করতে না পেরে তারা চলে গেছে।পাড়ার লোকজন কেউ কেউ স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছিলএই ভেবে যে,এবার বিবাহ বিচ্ছেদ তপনবাবু এবং গৌরি দেবীর হলে অন্তত কিছুটা হলেও এই তিনজন নিরপরাধ মানুষ শান্তি পাবে।
কিন্তু গৌরী দেবীর বুকের ভিতর তখনও অদ্ভুত একটা অশান্তি ছিল কারণ তপন বাবু যাওয়ার আগে তাঁর সঙ্গে একবারও কথা বলেননি।
এত বছর সংসার করার পরেও বলেননি তিনি কোথায় যাচ্ছেন,কি করবেন।
দুদিন পর আসল সত্য সামনে এল।দুপুরবেলা একজন অচেনা লোক বাড়িতে এসে দরজায় কড়া নাড়ল।
সে নিজেকে বাড়ির নতুন মালিক বলে পরিচয় দিল।প্রথমে গৌরী দেবী ভেবেছিলেন, লোকটা ভুল করছে।
কিন্তু কিছু কাগজ সামনে আনতেই তাঁর মাথার ভিতর যেন সবকিছু ঘুরে উঠল।
তপন বাবু অনেক আগেই বাড়িটা বিক্রি করে দিয়েছেন।শুধু তাই নয়—তিনি চাকরিও ছেড়ে দিয়েছেন। কোম্পানি থেকে নিজের সমস্ত পাওনা টাকা তুলে নিয়েছেন।
সবকিছু আগেই পরিকল্পনা করা ছিল।তাপসী আর তার সন্তানদের নিয়ে নতুন জীবন শুরু করার জন্য তিনি পুরোনো সংসারটাকে সম্পূর্ণভাবে শেষ করে দিয়েছেন।
গৌরী দেবী নিঃশব্দে মেঝেতে বসে পড়লেন।
তাঁর চারপাশের দেওয়ালগুলো যেন অপরিচিত লাগছিল,এই বাড়ির প্রতিটা ইটে তাঁর স্মৃতি ছিল।
এই বাড়িতেই তরুণের প্রথম স্কুলে যাওয়া, গৌরবের জন্মদিন, অসংখ্য হাসি-কান্না…
আজ সেই বাড়িও আর তাঁর নয়।
তরুণ মায়ের পাশে এসে দাঁড়াল,গৌরবের চোখে ছিল জল।
কিন্তু গৌরী দেবী কাঁদলেন না।তিনি শুধু ফাঁকা চোখে সামনে তাকিয়ে রইলেন,কারণ কিছু কিছু আঘাত মানুষকে কাঁদতেও ভুলিয়ে দেয়।
ক্রমশ
