হারানো ঠিকানা (দ্বিতীয় পর্ব)
পরদিন সকাল থেকেই হাসপাতালের পরিবেশটা যেন অদ্ভুত হয়ে উঠছিল।
রাতের আতঙ্ক কাটলেও গৌরী দেবীর বুকের ভিতর জমে থাকা অস্বস্তিটা একটুও কমেনি, বরং সকাল বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সেটা আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছিল।
হাসপাতালের কেবিনের জানলা দিয়ে ফিকে রোদ ঢুকছিল। করিডোর জুড়ে নার্সদের ব্যস্ত হাঁটাচলা, দূরে কোথাও মনিটরের বিপ-বিপ শব্দ, আর মাঝেমধ্যে স্ট্রেচারের চাকার আওয়াজ—সব মিলিয়ে চারদিকে একটা ভারী পরিবেশ।
তপন বাবু তখন কিছুটা সুস্থ।
ডাক্তার জানিয়েছিলেন, আপাতত বিপদ কেটে গেছে। তবে কয়েকদিন পর্যবেক্ষণে রাখতে হবে।
সাধারণ ক্ষেত্রে,এই খবর শুনে গৌরী দেবীর স্বস্তি পাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু আজ তাঁর মন অন্য এক অজানা আশঙ্কায় ডুবে ছিল।
কারণ সেই সকাল থেকেই তাপসী যেন তপন বাবুর পুরো হাসপাতালের দায়িত্ব নিজের হাতে নিয়ে ফেলেছিল।
কখন কোন ওষুধ দিতে হবে, কোন রিপোর্ট কখন আসবে, ডাক্তার কী বলেছেন—সবকিছুতেই তার অস্বাভাবিক রকম আগ্রহ।
একজন নার্স এসে তপন বাবুর ডায়েট নিয়ে কিছু বলতেই তাপসী সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠল,“চিনিটা একদম কম দেবেন। ওর সুগার একটু ওঠানামা করে।”
“ওর।”
শব্দটা গৌরী দেবীর কানে কেমন যেন বিঁধল।
একজন সহকর্মী হয়েও একজন মানুষ এত ব্যক্তিগত তথ্য জানে কীভাবে?
গৌরী দেবী চুপচাপ সব দেখছিলেন। তরুণও বিষয়টা লক্ষ্য করছিল। ছেলেটা ছোটবেলা থেকেই বুদ্ধিমান। বাবার মুখের অস্বস্তি, তাপসীর আচরণ—সব মিলিয়ে তার মনেও প্রশ্ন জমছিল।
গৌরব বারবার মায়ের কাছে এসে দাঁড়াচ্ছিল,তার চোখে স্পষ্ট ভয়।
হাসপাতালের কেবিনটা যেন ধীরে ধীরে অপরিচিত হয়ে উঠছিল।
সকাল গড়িয়ে দুপুর হতে না হতেই পাড়ার কয়েকজন মানুষ হাসপাতালে এল তপন বাবুকে দেখতে।
পাড়ার ক্লাবের সম্পাদক সমরবাবু, পাশের বাড়ির মীনাদি, আর আরও দু-একজন পরিচিত মানুষ।
সবাই এসে প্রথমেই অবাক হয়ে গেল তাপসীকে দেখে।
মহিলাটা এমনভাবে ঘোরাফেরা করছিল যেন বহুদিনের ঘরের মানুষ।
কখনও তপন বাবুর বালিশ ঠিক করে দিচ্ছে, কখনও ওষুধের কাগজ দেখছে, কখনও ডাক্তারদের সঙ্গে আলাদা করে কথা বলছে।
মীনাদি ধীরে গৌরী দেবীর কানে বলেছিলেন, “ওই মহিলা কে গো?”
গৌরী দেবী কষ্ট করে শুধু বলেছিলেন, “অফিসের সহকর্মী নাকি।”কিন্তু কথাটা বলার সময় তাঁর নিজের গলাতেও বিশ্বাস ছিল না।
দুপুরের দিকে পরিস্থিতি আরও অস্বস্তিকর হয়ে ওঠে।ডাক্তার এসে কিছু পরীক্ষা সম্পর্কে বলছিলেন। গৌরী দেবী মন দিয়ে শুনছিলেন।
হঠাৎ তাপসী মাঝখান থেকে বলে উঠল, “ডাক্তারবাবু, ও তো আগেও এই সমস্যায় ভুগেছিল।”
ডাক্তার অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “আগেও হয়েছিল?”
তাপসী স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলল, “হ্যাঁ, তিন বছর আগে। তখনও দুদিন হাসপাতালে ভর্তি থাকতে হয়েছিল।”
গৌরী দেবীর বুকের ভিতরটা কেঁপে উঠল।
তিন বছর আগে?
তিনি তো কিছুই জানতেন না।
তাঁর মনে পড়ল—তিন বছর আগে একবার তপন বাবু অফিসের কাজে বাইরে গিয়েছিলেন, বলে জানিয়েছিলেন।
তাহলে?
মুহূর্তের মধ্যে অনেক পুরোনো ঘটনা যেন মাথার ভিতর জুড়ে জুড়ে যেতে লাগল।
প্রতি মাসে হঠাৎ হঠাৎ অফিস ট্যুর, রাত করে ফেরা, ফোন লুকিয়ে কথা বলা…এতদিন যেগুলোকে তিনি গুরুত্ব দেননি, আজ সেগুলোই নতুন অর্থ নিয়ে সামনে দাঁড়াল।
গৌরী দেবীর মাথার ভিতর ঝড় বয়ে যাচ্ছিল।
অবশেষে তিনি আর নিজেকে আটকাতে পারলেন না।
ঘরের মধ্যে তখন এক অদ্ভুত নীরবতা।
তপন বাবু বেডে আধশোয়া অবস্থায় ছিলেন। তরুণ জানলার পাশে দাঁড়িয়ে। গৌরব মায়ের কাছে।
তাপসী একটা ফাইল গুছিয়ে রাখছিল।
গৌরী দেবী ধীরে উঠে দাঁড়ালেন।তাঁর গলাটা কাঁপছিল, কিন্তু চোখে ছিল দৃঢ়তা।
তিনি সরাসরি তাপসীর দিকে তাকিয়ে বললেন, “আপনার সঙ্গে তপনের সম্পর্কটা ঠিক কী?”
প্রশ্নটা শুনে পুরো ঘরটা যেন স্তব্ধ হয়ে গেল।
করিডোরের শব্দ পর্যন্ত যেন হঠাৎ দূরে সরে গেল।
তাপসীর হাত থেমে গেল।
তরুণ ধীরে বাবার দিকে তাকাল।গৌরবের বুকের ভিতর ধকধক শব্দ হচ্ছিল।
কয়েক সেকেন্ড কেউ কোনো কথা বলল না।
তারপর তাপসী কিছু বলার আগেই তপন বাবু ধীরে উঠে বসলেন।তাঁর মুখে অদ্ভুত শান্ত ভাব।
যেন বহুদিন ধরে লুকিয়ে রাখা একটা সত্য অবশেষে বলার সময় এসেছে।
তিনি ধীরে, ঠান্ডা গলায় বললেন,“তাপসী শুধু আমার সহকর্মী নয়… ও আমার স্ত্রী।”
মুহূর্তের মধ্যে যেন পৃথিবী থেমে গেল।
গৌরী দেবীর মুখের রঙ সাদা হয়ে গেল।
তরুণ হতবাক চোখে বাবার দিকে তাকিয়ে রইল।
গৌরব যেন বুঝতেই পারছিল না, সে ঠিক কী শুনল।
ঘরের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা অফিসের সহকর্মীরা ও পাড়ার দু-একজন মানুষকেও চমকে উঠল।
কেউ কেউ একে অপরের মুখের দিকে তাকাচ্ছিল অবিশ্বাসে।
গৌরী দেবীর ঠোঁট কাঁপছিল।তিনি অস্ফুট গলায় বললেন, “তুমি… তুমি কী বলছ তপন?”
কিন্তু তপন বাবুর মুখে কোনো লজ্জা ছিল না।
কোনো অপরাধবোধও না,বরং তিনি আশ্চর্য ঠান্ডা গলায় বললেন,“এই সম্পর্ক অনেক বছরের। এখন আর কিছু লুকিয়ে লাভ নেই।”
কথাগুলো এত সহজভাবে বললেন তিনি, যেন এটা খুব সাধারণ একটা বিষয়।
গৌরী দেবীর মনে হচ্ছিল, তিনি দুঃস্বপ্ন দেখছেন।
এই মানুষটার সঙ্গে তিনি সতেরো বছরেরও বেশি সংসার করেছেন,যার জন্য নিজের জীবন কাটিয়ে দিয়েছেন, যার ছেলেদের মানুষ করেছেন…
সেই মানুষটা এতদিন ধরে আরেকটা সংসার লুকিয়ে রেখেছিল?
কিন্তু দুঃস্বপ্ন তখনও শেষ হয়নি।
তাপসী এবার ধীরে ধীরে সামনে এগিয়ে এল।
তার গলায় মায়া ছিল না, বরং ছিল চাপা গর্ব।
সে বলল,“আমাদের যমজ ছেলে-মেয়েও আছে… তন্ময় আর তপস্যা।”
কথাটা শুনে গৌরী দেবীর মাথা ঘুরে উঠল।তিনি পাশের চেয়ারটা ধরে দাঁড়িয়ে রইলেন।
তাঁর মনে হচ্ছিল, বুকের ভিতরটা কেউ ছিঁড়ে ফেলছে।এত বছর ধরে তিনি যাকে নিজের সুখী সংসার ভেবেছেন, সেই সংসারের আড়ালেই আরেকটা গোপন সংসার বেঁচে ছিল।
আর তিনি কিছুই জানতেন না।
তরুণ এবার রাগে কাঁপতে কাঁপতে বলে উঠল,“বাবা, তুমি এটা কীভাবে করতে পারলে?”
গৌরবের চোখ ভরে উঠেছিল জলে।সে শুধু ফ্যালফ্যাল করে বাবার দিকে তাকিয়ে ছিল।
তপন বাবু এবার বিরক্ত গলায় বলে উঠলেন,”এত নাটক করার কিছু নেই।”
ঘরে উপস্থিত সবাই স্তব্ধ হয়ে গেল।
তপন বাবু গৌরী দেবীর দিকে তাকিয়ে ঠান্ডা গলায় বললেন, “এখন এসব মেনে নেওয়াই ভালো। এতদিন যেমন চলেছে, এখনও তেমনই চলবে।”
এই কথাটা যেন শেষ আঘাত ছিল।গৌরী দেবীর মনে হলো, তাঁর পুরো জীবনটা মুহূর্তের মধ্যে ভেঙে চুরমার হয়ে গেল।
গৌরি দেবী ভাবতেন, ভালোবাসা মানে বিশ্বাস,সংসার মানে একসাথে পথ চলা।
কিন্তু আজ বুঝলেন—তিনি এতদিন একটা মিথ্যের ভিতর বেঁচে ছিলেন।
হাসপাতালের সাদা দেওয়ালগুলো যেন তাঁর দিকে ঝুঁকে আসছিল।চোখের সামনে সব ঝাপসা হয়ে যাচ্ছিল।তাঁর কানে শুধু একটাই শব্দ ঘুরছিল—
“ও আমার স্ত্রী…”
আর সেই মুহূর্তে গৌরী দেবী বুঝতে পারলেন—
মানুষের সবচেয়ে বড় ভাঙন বাইরে নয়, ভিতরে ঘটে।
ক্রমশ
