হারানো ঠিকানা(পঞ্চম পর্ব)
দেখতে দেখতে কেটে গেছে বহু বছর।সময় সত্যিই অনেক কিছু বদলে দেয়।
একসময় যে ক্ষতগুলো প্রতিদিন রক্তাক্ত হতো, সেগুলো ধীরে ধীরে শুকিয়ে যায়। মানুষ হাসতে শেখে, বাঁচতে শেখে। কিন্তু কিছু দাগ থেকে যায় মনের খুব গভীরে—যেগুলো কোনোদিন পুরোপুরি মুছে যায় না।
গৌরী দেবীর জীবনেও ঠিক সেটাই ঘটেছিল।
তপন বাবুর বিশ্বাসঘাতকতা, নিজের বাড়ি হারানো, অপমান—সবকিছু যেন এখন বহু পুরোনো স্মৃতি। কিন্তু মাঝরাতে কখনও কখনও ঘুম ভেঙে গেলে এখনও তাঁর মনে পড়ে যায় সেই দিনগুলোর কথা।
তবে আর একটা জিনিস বদলে গিয়েছিল।আগের অসহায় গৌরী দেবী আর নেই,আর তাঁর দুই ছেলেও আর সেই ভেঙে পড়া কিশোর নয়।
তরুণ আর গৌরব এখন নিজের পায়ে দাঁড়ানো মানুষ।
তাদের চোখে আত্মবিশ্বাস, কথায় দৃঢ়তা।
জীবনের কঠিন সময় মানুষকে যেমন ভেঙে দেয়, তেমনই অনেক সময় ভিতর থেকে নতুন করে গড়েও তোলে।
সংসারের সবচেয়ে খারাপ সময়েই তরুণ বুঝে গিয়েছিল—শুধু চাকরির অপেক্ষা করে থাকলে চলবে না,তাদের দ্রুত নিজের কিছু করতে হবে।
সেই ভাবনা থেকেই শুরু হয়েছিল শাড়ির ছোট্ট ব্যবসা।
প্রথমদিকে ব্যাপারটা খুব সাধারণ ছিল।
গৌরী দেবী পাড়ার পরিচিত কয়েকজন মহিলার কাছে শাড়ি দেখাতেন। কারও বাড়িতে বিয়ে থাকলে বা কোনো অনুষ্ঠান হলে তরুণ দু-চারটে নতুন শাড়ি এনে দিত।
গৌরী দেবী নিজের মিষ্টি ব্যবহার আর রুচির জন্য খুব দ্রুত মানুষের ভরসা পেয়ে যান।তিনি কাউকে ঠকাতেন না।
যে শাড়ির যেমন মান, ঠিক তেমন দামই বলতেন।
ফলে ধীরে ধীরে মানুষ তাঁর কাছ থেকে কিনতে শুরু করল।
প্রথমদিকে তরুণ ট্রেনে করে কলকাতা যেত।
ভোরবেলা বেরিয়ে সারাদিন বড়বাজার, গড়িয়াহাট ঘুরে সন্ধ্যায় ফিরত।
কখনও মুর্শিদাবাদ থেকে সিল্ক আনত, কখনও শান্তিপুরের তাঁতের শাড়ি।ছোট্ট একটা ব্যাগে করে শাড়ি এনে বাড়িতে সাজিয়ে রাখত।
গৌরব তখনও পড়াশোনার পাশাপাশি ভাইকে সাহায্য করত,সে হিসাব লিখে রাখত খাতায়।
কোন শাড়ি কত দামে কেনা হলো, কত লাভ হলো, কে টাকা বাকি রেখেছে—সব কিছু খুব যত্ন করে সামলাত সে।
কিন্তু পথটা মোটেও সহজ ছিল না।
অনেকদিন এমন গেছে, যখন একটা শাড়িও বিক্রি হয়নি।
ধার করে মাল তুলতে হয়েছে,কখনও ক্রেতা টাকা দিতে দেরি করেছে,কখনও লোকসান হয়েছে।
একবার তো একটা খুবই দামি শাড়ি বৃষ্টিতে ভিজে নষ্ট হয়ে গিয়েছিল।সেদিন রাতে তরুণ চুপচাপ বসে ছিল,তার চোখেমুখে হতাশা স্পষ্ট ছিল।
গৌরী দেবী ধীরে ধীরে বলেছিলেন, “ভেঙে পড়লে চলবে না বাবা। সংসার আবার দাঁড় করাতে গেলে ধাক্কা খেতেই হবে।”
তরুণ মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে ছিল,এই মহিলা এত কষ্টের পরেও কীভাবে এত শক্ত থাকেন, সেটা সে আজও বুঝতে পারে না।
ধীরে ধীরে ব্যবসা একটু করে বাড়তে শুরু করল।
পাড়ার বাইরে থেকেও অর্ডার আসতে লাগল।
গৌরব তখন অনলাইনে ব্যবসার কাজ শুরু করল।ফেসবুকে ছবি দেওয়া, হোয়াটসঅ্যাপে গ্রাহকদের সঙ্গে কথা বলা, বাইরে কুরিয়ার করা—এসব নতুন জিনিস সে খুব দ্রুত শিখে ফেলেছিল।
তরুণ অবাক হয়ে বলত, “তুই না থাকলে এতদূর আসা যেত না।”
গৌরব হেসে উত্তর দিত, “আমরা তিনজন একসাথে বলেই তো পারছি।”
এই “আমরা” শব্দটাই ছিল তাদের শক্তি।
বছরের পর বছর কেটে গেল।
ছোট্ট ব্যবসাটা একসময় একটা ভাড়া দোকানে পৌঁছাল।দোকানটা খুব বড় ছিল না।
কিন্তু যেদিন প্রথম নিজেদের দোকানের শাটার খুলেছিল তারা, গৌরী দেবীর চোখ ভিজে উঠেছিল।
তিনি দোকানের মেঝেতে আলতো করে হাত ঠেকিয়ে প্রণাম করেছিলেন,কারণ এই দোকান শুধু ব্যবসা ছিল না।
এটা ছিল তাদের নতুন জীবনের শুরু।
তরুণ দিনরাত দোকানে পড়ে থাকত।কোন কাপড় এখন ট্রেন্ডে চলছে, কোথা থেকে কম দামে ভালো জিনিস পাওয়া যায়—এসব নিয়ে সবসময় ভাবত।
ধীরে ধীরে সে কলকাতার বড় বড় পাইকারদের সঙ্গেও যোগাযোগ তৈরি করে ফেলল।
পরে বেনারস, সুরাট, এমনকি দক্ষিণ ভারত থেকেও শাড়ি আনানো শুরু হলো।
গৌরব পুরো হিসাবের দায়িত্ব নিল।
কম্পিউটারে বিল তৈরি, অনলাইন পেমেন্ট, নতুন গ্রাহকদের ডেটা—সবকিছু সে এমন দক্ষতায় সামলাত যে অনেকেই অবাক হতো।
একসময় তাদের দোকানের নাম আশেপাশের এলাকায় পরিচিত হয়ে গেল।
পুজোর সময় দোকানে ভিড় সামলানো কঠিন হয়ে যেত।দূরদূরান্ত থেকে মানুষ শাড়ি কিনতে আসত।
গৌরী দেবী এখনও মাঝে মাঝে দোকানে বসতেন।অনেক পুরোনো ক্রেতা এসে বলত, “দিদি, আপনার পছন্দের শাড়ির আলাদা ব্যাপার আছে।”
তিনি মৃদু হেসে শাড়ি দেখাতেন।কিন্তু ভিতরে ভিতরে ভাবতেন—একসময় যাঁকে সবাই করুণা করত, আজ সেই মানুষকেই আবার সম্মান দিচ্ছে সবাই।
সময় সত্যিই অদ্ভুত।
আরও কয়েক বছর পরে তারা নিজেদের একটা দোকান খুলল,প্রথম দোকানটা-ও রেখে দিলো যাতে মালপত্র রাখতে সুবিধা হয়।
সেদিন পাড়ার মানুষ সত্যিই গর্ব অনুভব করেছিল।
সমরবাবু চায়ের দোকানে দাঁড়িয়ে বলেছিলেন, “গৌরী বৌদির ছেলেরা নিজের চেষ্টায় এত বড় হয়েছে! এটাই আসল জয়।”
এই কথাটা শুনে গৌরী দেবীর বুক ভরে উঠেছিল,কারণ তিনি জানতেন—এই সাফল্য সহজে আসেনি।
প্রতিটা টাকার পিছনে ছিল ঘাম, অপমান, না খেয়ে কাটানো রাত আর অসংখ্য লড়াই।
সবচেয়ে বড় কথা,
তারা আবার নিজেদের বাড়ি কিনতে পেরেছিল।নির্মল বাবু মারা যাবার পর মীরা দেবী নিজের ছেলের কাছে চলে যাচ্ছিলেন।তিনি বাড়িটা বিক্রি করবেন বলে ভেবেছিলেন, প্রথমেই তিনি গৌরি দেবীকে কেনার জন্য বলেন।
গৌরি দেবী তরুণ আর গৌরবের সাথে আলোচনা করে উপযুক্ত মূল্যে বাড়িটা কিনে নেন।
যেদিন বাড়িটা কেনা হলো, সেদিন গৌরী দেবী অনেকক্ষণ চুপ করে ছিলেন।তাঁর মনে হচ্ছিল, জীবন যেন ধীরে ধীরে হারানো সবকিছু ফিরিয়ে দিচ্ছে।
মীরা দেবী যখন চলে যাচ্ছিলেন,তখন গৌরি দেবী মীরা দেবীর হাতটা ধরে বললেন, “বৌদি,এটা আপনারই বোনের বাড়ি,আপনার বাড়ি।যখনই মনে হবে,চলে আসবেন।”
বাড়িটা কেনার পর কিছু মেরামত করার কাজ যেমন চলছিল, তেমনি আর একটা নতুন তলা করার কাজ-ও শুরু হয়েছিল।তরুণ আর গৌরব প্রায় প্রতিদিনই কাজটা দেখতো।
কোন ঘর কোথায় হবে, মায়ের জন্য ঠাকুরঘর কেমন হবে, বারান্দায় কী গাছ লাগানো হবে—সবকিছু নিয়ে তাদের উৎসাহ ছিল ভীষণ।
গৌরী দেবী শুধু একটাই কথা বলেছিলেন,“বাড়িটা যেন শান্তির হয়।”
অবশেষে সেই দিন এল, বাড়ির গৃহপ্রবেশ।
সকাল থেকেই বাড়িতে লোকজনের ভিড়।
পাড়ার সবাই এসেছিল।
যে মানুষগুলো একসময় তাদের ভাঙন দেখেছিল, আজ তারাই তাদের নতুন শুরু দেখছে।ঠাকুরঘরে পূজো হচ্ছিল। ধূপের গন্ধে পুরো বাড়ি ভরে গিয়েছিল।
গৌরী দেবী চুপচাপ সদর দরজার পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন।হঠাৎ তাঁর চোখ ভিজে উঠল।
কারণ বহু বছর আগে ঠিক এভাবেই তিনি আরেকটা বাড়িতে ঢুকেছিলেন—স্বপ্ন নিয়েতারপর একদিন সেই বাড়ি হারিয়েছিলেন,আজ আবার নতুন করে একটা বাড়ি পেলেন।
তরুণ এসে মায়ের হাত ধরে বললো, “মা,এবার এই বাড়ি কেউ কেড়ে নিতে পারবে না,এটা তোমার নামে রেজিস্ট্রি করা।”
গৌরব হেসে যোগ করল, “একদম মা,তাছাড়া আর একটা কারণ-ও হলো এই বাড়ি বিশ্বাস দিয়ে তৈরি,যা কেউ ভাঙবে না।”
কথাটা শুনে গৌরী দেবী আর নিজেকে সামলাতে পারলেন না।চোখ বেয়ে নীরবে জল গড়িয়ে পড়ল।
কিন্তু সেই কান্নায় আর অসহায়তা ছিল না,ছিল দীর্ঘ লড়াইয়ের পর শান্তি পাওয়ার তৃপ্তি।
ক্রমশ
