#বৃষ্টি_ভেজা_মৌসুমে_তুমি_এলে
#পর্ব২(শেষ)
#রাউফুন
আকাশের মুখ ভার। সকাল থেকেই ঢাকার আকাশে মেঘের ঘনঘটা, যেন শ্রাবণের ধারা নামবে বলে পণ করেছে। মিরা জানালার গ্রিল ধরে বাইরের ঝিরঝিরে বৃষ্টি দেখছিল। আজ তিন দিন হলো সে গৃহবন্দী। বাবা তার ফোন কেড়ে নিয়েছেন, বাইকের চাবি এখন আসাফ সাহেবের ড্রয়ারে তালাবদ্ধ। তবে শরীরের কালশিটে দাগগুলো কমলেও মনের ভেতরের অস্থিরতা কমছে না। সেই রাতের সেই রক্তমাখা মুখটা বারবার তার চোখের সামনে ভেসে উঠছে। লোকটা কি বেঁচে আছে? নাকি শেষ পর্যন্ত মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েছে?
হঠাৎ নিচ থেকে অনেকগুলো গাড়ির আওয়াজ পাওয়া গেল। মিরা উঁকি দিয়ে দেখল, কালো কাঁচ ঢাকা কয়েকটা দামি এসইউভি তাদের পোর্টিকোতে এসে দাঁড়িয়েছে। গেট দিয়ে ঢোকার সময় দারোয়ানদের বাধা দেওয়ার সাহসও হলো না কারো। গাড়ি থেকে সুটেড-বুটেড কয়েকজন লোক নামল, যাদের একজনের হাতে একটি বড় ফুলের তোড়া এবং অন্যজনের হাতে একটি দামী স্যুটকেস।
মিরা কৌতূহলী হয়ে নিচে নেমে এল। ড্রয়িংরুমে তখন এক উত্তপ্ত পরিস্থিতি। জাজ আসাফ উদ দৌলা হায়দার রাগে কাঁপছেন। তার সামনে সোফায় পা তুলে রাজকীয় ভঙ্গিতে বসে আছে একজন যুবক। পরনে সাদা লিনেন শার্ট, গলার কাছে কয়েকটা বোতাম খোলা, যেখানে ব্যান্ডেজের সাদা অংশ উঁকি দিচ্ছে। কপালে সেই গভীর কাটা দাগটা এখন অনেকটা শুকিয়ে এলেও তার চোখের সেই ‘মৃত্যুঞ্জয়ী তেজ’ এক বিন্দু কমেনি।
সে আর কেউ নয়, শাহরিয়ার আর্যান।
”আপনি কি জানেন আপনি কার বাড়িতে ঢুকেছেন? আমি চাইলে এখনই পুলিশ ডেকে আপনাকে অ্যারেস্ট করাতে পারি!” আসাফ সাহেবের কণ্ঠস্বরে বজ্রপাত।
আর্যান ঠোঁটের কোণে একটা বাঁকা হাসি ফুটিয়ে তুলল। সে ধীরস্থিরে পকেট থেকে একটা লাইটার বের করে জ্বালাল, সিগারেট ধরিয়ে তারপর সেটা আবার নিভিয়ে দিয়ে বলল, “পুলিশ? আসাফ সাহেব, আপনি তো আইনের লোক, আপনি ভালো করেই জানেন শেরিফকে ধরার মতো হাত এই শহরের পুলিশের নেই। আর আমি এখানে কোনো ক্রাইম করতে আসিনি, আমি এসেছি আমার ঋণ শোধ করতে।”
মিরা সিঁড়ির কোণায় দাঁড়িয়ে দৃশ্যটা দেখছিল। আর্যান মাথা ঘুরিয়ে মিরার দিকে তাকাল। তার চোখে তখন এক অন্যরকম দ্যুতি। সে উঠে দাঁড়াল এবং আসাফ সাহেবের দিকে তাকিয়ে বলল, “আপনার মেয়ে ওই রাতে আমার জীবন বাঁচিয়েছে। আমি আমার জীবনের দেনা কারো কাছে রাখি না। এই স্যুটকেসে যা আছে, তা আপনার আগামী পাঁচ বছরের আয়ের চেয়েও বেশি। আর ওই তোড়াটা,ওটা মিরার জন্য।”
মিরা এগিয়ে এল। তার কণ্ঠস্বরে কোনো ভয় নেই, বরং এক ধরনের চ্যালেঞ্জ। সে আর্যানের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে বলল, “আমি টাকা বা উপহারের জন্য আপনাকে বাঁচাইনি। ওটা আমার জেদ ছিল। আপনার জায়গায় অন্য কেউ হলেও বাঁচাতাম।”
আর্যান মিরার খুব কাছে এগিয়ে এল। এতো কাছে যে মিরা তার নিশ্বাসের তপ্ত ছোঁয়া অনুভব করতে পারছিল। আর্যান নিচু স্বরে বলল, “তোমার জেদ আমাকে মরতে দেয়নি মিরা। কিন্তু এখন আমার জেদ তোমাকে নিয়ে। তুমি আমার জন্য যা করেছ, তার বিনিময় তো হবেই, তবে সেটা টাকায় নয়, অধিকার দিয়ে।”
বাইরে তখন ঝমঝম করে বৃষ্টি নামল। আসাফ সাহেব গর্জে উঠলেন, “বেরিয়ে যান আমার বাড়ি থেকে! মিরা, তুমি ভেতরে যাও!”
আর্যান আসাফ সাহেবের দিকে ফিরে বলল, “আজ যাচ্ছি। কিন্তু মনে রাখবেন, শেরিফ যা একবার হাত বাড়িয়ে ধরে, তা সে আর ছাড়ে না। আপনার আইন আর আমার ক্ষমতার লড়াইয়ে মিরা যেন মাঝখানে পিষ্ট না হয়, সেটা খেয়াল রাখবেন।”
আর্যান চলে যাওয়ার সময় মিরার দিকে এক নজর তাকাল। সেই চাহনিতে কী ছিল? ভালোবাসা নাকি অধিকারের নেশা? মিরা স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। সে বুঝতে পারছে, এই বর্ষা তার জীবনে কেবল বৃষ্টি নয়, এক কালবৈশাখী নিয়ে আসছে।
পরের দুদিন মিরা লক্ষ্য করল তাদের বাড়ির চারপাশে সারাক্ষণ কয়েকটা অচেনা গাড়ি টহল দিচ্ছে। তার বাবা তাকে কড়া পাহারায় রেখেছেন, এমনকি ইউনিভার্সিটিতে যাওয়ারও অনুমতি নেই। কিন্তু আর্যান কি এত সহজে হার মানার পাত্র?
সেদিন বিকেলে বৃষ্টির তোড় আরও বাড়ল। মিরার ঘরের কাঁচের জানালায় কেউ যেন ছোট পাথর ছুড়ে মারল। মিরা জানলা খুলতেই দেখল নিচে রেইনকোট পরা একজন লোক দাঁড়িয়ে আছে। সে ইশারায় দেখাল পাশের বাগানের দেয়াল। মিরা কোনো কিছু না ভেবেই বৃষ্টির মধ্যে ভিজে পেছনের দেয়ালের কাছে গেল। সেখানে দাঁড়িয়ে আছে আর্যান। তার জখম হওয়া শরীরটা বৃষ্টির ঝাপটায় কিছুটা কুঁকড়ে গেলেও সে অবিচল।
”তুমি এখানে কেন?” মিরা ফিসফিস করে বলল।
”তোমাকে নিতে এসেছি। ওই চার দেয়ালের জেলখানায় তোমাকে মানায় না। তুমি রাজপথের মেয়ে, বাতাসের সাথে তোমার মিতালি। চলো যায়!” আর্যান হাত বাড়িয়ে দিল।
”আমার বাবা তোমাকে ছেড়ে দেবে না আর্যান। তুমি জানো না সে কতটা প্রভাবশালী। আর আমি যাবো কেন তোমার সঙ্গে?” মিরা দ্বিধায় ভুগছিল।
”তোমার বাবা আইনের বিচার করেন, আর আমি করি ভাগ্যের। এসো আমার সাথে। আজ থেকে তোমার কোনো ভয় নেই। তোমাকে ছোঁয়ার শক্তি এই দুনিয়ায় কারো নেই।” আর্যানের কণ্ঠে এক অদ্ভুত মায়া আর নির্ভরতা ছিল।
মিরা সেই হাত ধরল। সে জানত না সে কোন অতল গহ্বরে পা রাখছে, কিন্তু তার মনে হচ্ছিল, এই অন্ধকার জগতের রাজপুত্রের সাথেই হয়তো তার মুক্তি। এই প্রথম সে অনুভব করলো সে এইবার একটা ভালো সিদ্ধান্ত নিয়েছে নিজের জীবনের জন্য। ভালোবাসা এখন নেই পরে হতেও পারে। আর তার কেন যেন মনে হচ্ছে তার স্বাধীনতায় এই লোকটা তার বাবার মতো বাধা হবে না। তাকে আগলে রাখবে। তার মতো একজন শক্তিশালী মানুষ তার ব্যাক আপ হিসেবে থাকলে কাত সাধ্যি তার ক্ষতি করবে? বৃষ্টির ধারায় ধুয়ে যাচ্ছিল সব পিছুটান। আর্যান তাকে মিরার বাইকেই তুলল, সেই কালো কাওয়াসাকি নিঞ্জা, যা ওই রাতে দুজনের পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল। মিরার চুল ভিজে একাকার, আর্যানের জ্যাকেট আঁকড়ে ধরে সে ঝড়ের বেগে অজানার পথে পাড়ি দিল।
পেছনে পড়ে রইল আভিজাত্যের বন্দিশালা আর বাবার শাসন। সামনে কেবল বৃষ্টির অঝোর ধারা আর এক অনিশ্চিত কিন্তু রোমাঞ্চকর ভবিষ্যৎ।
আর্যান তার ব্যক্তিগত ডুপ্লেক্স বাংলোয় মিরাকে নিয়ে এল। শহর থেকে দূরে, ঢাকার উপকণ্ঠে এক নির্জন জায়গায় এই বাড়ি। চারপাশে ঘন বন আর মাঝখানে আধুনিক স্থাপত্যের এই ঘর। মিরা ভিজে একাকার হয়ে কাঁপছিল। আর্যান তাকে একটা তোয়ালে আর নিজের একটা বড় শার্ট দিল পরার জন্য।
”এখানে তুমি নিরাপদ। জ্যাক বাইরে পাহারা দিচ্ছে।” আর্যান শান্ত গলায় বলল।
মিরা শার্টটা পরে আয়নার সামনে দাঁড়াল। বড় শার্টে তাকে আরও বেশি মায়াবী লাগছে। সে ঘর থেকে বেরিয়ে ড্রয়িংরুমে আসতেই দেখল আর্যান জানালার পাশে দাঁড়িয়ে সিগারেট টানছে। তার পিঠের পেশিগুলো শার্টের ওপর দিয়েও বোঝা যাচ্ছে। মিরা ধীর পায়ে তার পাশে গিয়ে দাঁড়াল।
”এরপর কী হবে আর্যান? পুলিশ আমাদের খুঁজবে। বাবা শান্তি পাবে না। আমাকেও শান্তিতে থাকতে দেবে না।।” মিরা চিন্তিত স্বরে বলল।
আর্যান সিগারেটটা নিভিয়ে মিরার দিকে ফিরল। তার দুই হাত মিরার কাঁধে রাখল, “আমি সব ব্যবস্থা করেছি মিরা। কাল সকালেই আমরা সীমান্ত পার হয়ে যাব। তবে তার আগে, আমি তোমাকে আমার করে নিতে চাই। কোনো জোর নয়, কোনো অধিকার নয়, স্রেফ ভালোবাসায়।”
মিরা আর্যানের চোখের দিকে তাকাল। সেই চোখে আজ কোনো দাপট নেই, আছে এক বুক তৃষ্ণা। মিরা বুঝতে পারল, এই কঠোর হৃদয়ের মানুষটার ভেতরেও একটা নিঃসঙ্গ শিশু লুকিয়ে আছে, যে কেবল একটু আশ্রয় চায়। মিরা তার ছোট হাত দুটো দিয়ে আর্যানকে জড়িয়ে ধরল, “আমি তোমার সাথেই থাকব আর্যান। যেখানেই তুমি নিয়ে যাও।”
সেই রাতেই কাজী ডেকে তাদের বিয়ে সম্পন্ন হলো। কোনো জাঁকজমক নেই, কোনো আত্মীয়-স্বজন নেই। রাখ ঢাক করে বিয়ে করলে পাছে তার শত্রুরা তার বউয়ের ক্ষতি করতে পারে। তাই তার দূর্বলতা কে সে লুকিয়েই রাখবে। বিয়ের সাক্ষী হিসেবে রইল আর্যানের অনুগত দেহরক্ষীরা আর বাইরের অবিরাম বর্ষণ। কাজী চলে যাওয়ার পর সারা বাড়িতে এক মায়াবী নিস্তব্ধতা নেমে এল।
বাসর ঘরটা আর্যান নিজের হাতে সাজিয়েছে। তবে ফুলে নয়, নীল আলোর মৃদু আভা আর কিছু সুগন্ধি মোমবাতি দিয়ে। বাইরে তখনো বৃষ্টির ছন্দ চলছে। ঘরের ভেতরে রজনীগন্ধার তীব্র ঘ্রাণ আর বৃষ্টির সোঁদা গন্ধ মিলেমিশে এক অন্যরকম আবেশ তৈরি করেছে।
মিরা বিছানায় বসে ছিল। তার পরনে একটা হালকা নীল রঙের সিল্কের শাড়ি, যা আর্যান তার জন্য এনে রেখেছিল। আর্যান ঘরে ঢুকে দরজাটা ধীরে বন্ধ করে দিল। সে যখন মিরার সামনে এসে দাঁড়াল, মিরা লজ্জায় মাথা নিচু করল। আজ সে কোনো বিদ্রোহী রেসার নয়, আজ সে কেবল আর্যানের নববিবাহিত স্ত্রী।
আর্যান মিরার চিবুক ধরে মুখটা তুলল,”ওই রাতে যখন প্রথম তোমাকে দেখেছিলাম, ভেবেছিলাম কোনো অপ্সরা নেমে এসেছে। স্পিড আর আগুনের মিশেলে তৈরি তুমি এক অনন্য নারী।”
মিরা ফিসফিস করে বলল, “আর আমি ভেবেছিলাম তুমি এক উদ্ধত অহংকারী লোক, যাকে বাঁচানোই আমার ভুল ছিল।”
”সেই ভুলের মাসুল এখন সারা জীবন দিতে হবে মিরা। পারবে তো এই শেরিফের সাথে নরকের পথে হাঁটতে?” আর্যান মিরার কপালে নিজের কপাল ঠেকাল।
”তোমার সাথে থাকলে নরকও আমার কাছে স্বর্গ মনে হবে।” মিরা চোখ বন্ধ করে বলল।
আর্যান মিরার শাড়ির আঁচলটা একটু সরিয়ে তার কাঁধের ছিলে যাওয়া দাগটার ওপর হাত রাখল। যে দাগটা ওই রাতের দুর্ঘটনার স্মৃতি বহন করছে। সে সেখানে অত্যন্ত কোমলভাবে ঠোঁট ছোঁয়াল। মিরার সারা শরীরে এক শিহরণ খেলে গেল। বৃষ্টির শব্দ তখন আরও তীব্র হয়েছে, যেন প্রকৃতির এই উদ্দামতা তাদের মিলনকে স্বাগত জানাচ্ছে।
আর্যান মিরাকে কোলে তুলে নিয়ে বিছানায় শুইয়ে দিল। মোমবাতির আলোয় দুজনের ছায়া দেয়ালে একাকার হয়ে যাচ্ছিল। আর্যান মিরার কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলল, “আজ থেকে তুমি শুধু আমার। পৃথিবীর কোনো শক্তি তোমাকে আমার কাছ থেকে ছিনিয়ে নিতে পারবে না।”
মিরা তার হাত দুটো আর্যানের গলায় জড়িয়ে ধরল। উষ্ণতার এক গভীর স্রোত বয়ে গেল দুজনের মাঝে। বাইরের বর্ষা আর ভেতরের দহন এক বিন্দুতে এসে মিলিত হলো। সব ঘৃণা, সব আভিজাত্য আর অপরাধের জগত পেছনে ফেলে তারা দুজনে ডুব দিল এক আদিম অকৃত্রিম ভালোবাসার সমুদ্রে।
ভোর হওয়ার আগেই তাদের নতুন যাত্রা শুরু হবে। এক নতুন দেশ, নতুন নাম আর নতুন জীবন। কিন্তু এই বৃষ্টিভেজা রাতের স্মৃতি তাদের হৃদয়ে অমর হয়ে থাকবে। যেখানে এক বিদ্রোহী মেয়ে আর এক আন্ডারওয়ার্ল্ড সম্রাট তাদের সব পার্থক্য মুছে দিয়ে এক হয়ে গিয়েছিল।
বৃষ্টি থামল শেষ রাতে। তবে মিরা আর আর্যানের জীবনের নতুন বসন্ত কেবল শুরু হলো।
#সমাপ্ত
