#বৃষ্টি_ভেজা_মৌসুমে_তুমি_এলে
#পর্ব১
#রাউফুন
রাত তখন গভীর। ঢাকার রাজপথ এখন কোনো তিলোত্তমা নগরী নয়, বরং এক নির্জন অরণ্যের মতো নিস্তব্ধ। তবে সেই নিস্তব্ধতাকে চিরে খানখান করে দিচ্ছে একটি বিশেষ শব্দ, একটি শক্তিশালী সুপারবাইকের ইঞ্জিনের গর্জন। কুচকুচে কালো রঙে ঢাকা একটি কাওয়াসাকি নিঞ্জা এইচ-টু নিয়ে ফ্লাইওভারের ওপর দিয়ে যেন উড়ছে মিরা হায়দার। বাতাসের ঝাপটা তার হেলমেটের ভাইজর ঘষে বেরিয়ে যাচ্ছে। স্পিডোমিটারে কাঁটা ১৭০ ছাড়িয়েছে অনেক আগেই। এই হাই-স্পিড রেসিং তার কাছে কেবল শখ নয়, বরং তার দমবন্ধ করা আভিজাত্য থেকে পালানোর একমাত্র রাস্তা।
মিরার পরিচয় এই শহরের উচ্চবিত্ত সমাজের কাছে এক দীর্ঘশ্বাসের নাম। সে জাজ আসাফ উদ দৌলা হায়দারের একমাত্র মেয়ে। যে আসাফ হায়দারের কলমের এক খোঁচায় বড় বড় অপরাধীর ফাঁসি হয়, তার মেয়ে কেন এভাবে বখে গেল, সেই উত্তর কারো জানা নেই। কিন্তু মিরার কাছে এই গতিই স্বাধীনতা।
হঠাৎ হেডলাইটের তীব্র সাদা আলোয় সামনে কিছু একটা নড়ে উঠল। মিরার চোখ কুঁচকে এল। রাস্তার ঠিক মাঝখানে একজন মানুষ টলতে টলতে এগিয়ে আসছে। পরনে সাদা শার্ট, কিন্তু সেই সাদার বুক চিরে রক্তের স্রোত নেমে এসেছে কালচে লাল হয়ে। লোকটার এক হাতে একটা পিস্তল, অন্য হাত পেটে চেপে ধরা।
“শিট!” মিরা দাঁতে দাঁত চেপে হার্ড ব্রেক কষল।
১৭০ কিমি বেগে চলা বাইক হঠাৎ থামতে চাইলে যা হয়, তাই হলো। টায়ার ঘষার বিকট শব্দে চারপাশ কেঁপে উঠল, নীল ধোঁয়ায় ভরে গেল রাস্তা। বাইকটা নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে একপাশে হেলে গিয়ে স্কিড করল প্রায় বিশ ফিট। মিরা ছিটকে পড়ল রাস্তার পাশে ডিভাইডারের কাছে। তার হাতের গ্লাভস ছিঁড়ে গিয়ে তালু ছিলে গেছে, কনুইতে প্রচণ্ড আঘাত। কিন্তু হেলমেট পরা থাকায় মাথাটা বেঁচে গেল।
সে যন্ত্রণায় কঁকিয়ে উঠে ধীর পায়ে উঠে দাঁড়াল। রাগে তার শরীর জ্বলছে। কার জন্য আজ তার এই অবস্থা? সে সামনে তাকাতেই দেখল সেই লোকটা এখন রাস্তার ওপর হাঁটু গেড়ে বসে পড়েছে। তার শরীরটা সামনের দিকে ঝুঁকে আছে। মিরা রাগে গজগজ করতে করতে এগিয়ে গেল, ইচ্ছা ছিল লোকটাকে আচ্ছা করে শুনিয়ে দেবে। কিন্তু কাছে যেতেই তার কথা আটকে গেল।
ল্যাম্পপোস্টের ম্লান আলোয় দেখল লোকটার মুখ। তীক্ষ্ণ নাক, চাপ দাড়ি, আর কপালে একটা গভীর কাটা দাগ যেখান থেকে রক্ত গড়িয়ে চোখে পড়ছে। লোকটা মুখ তুলে মিরার দিকে তাকাল। সেই চোখে ভয় নেই, আছে এক অমোঘ মৃত্যুঞ্জয়ী তেজ।
ছেলেটার নাম শাহরিয়ার আর্যান। আন্ডারওয়ার্ল্ডের একচ্ছত্র সম্রাট, যাকে মানুষ ‘শেরিফ’ বলে চেনে। আজ নিজেরই বিশ্বস্ত মানুষের বিশ্বাসঘাতকতায় সে ঝাঁঝরা হয়ে গেছে বুলেটে। কিন্তু তার এই অসহায় অবস্থাতেও তার ব্যক্তিত্বে এমন এক দাপট আছে যা মিরাকে থমকে দিল।
আর্যান কোনোমতে ফিসফিস করে বলল, “সরে যাও… ওরা পিছু নিয়েছে… নিজের ভালো চাইলে চলে যাও মেয়ে। ”
মিরা জেদি হাসল। সে বখে যাওয়া হতে পারে, কিন্তু সে ভিতু নয়। সে দেখল আর্যানের শার্টের নিচে ক্ষতটা বেশ গভীর। প্রচুর রক্তক্ষরণ হচ্ছে। মিরা জানে, এখান থেকে কয়েক কিলোমিটার দূরেই একটা প্রাইভেট ক্লিনিক আছে যেখানে পরিচয় গোপন রাখা যায়। সে বাইকটা কোনোমতে টেনে তুলল। আয়রন লেডিখ্যাত এই বাইকের পেছনের সিটে চাপড় দিয়ে সে আর্যানকে কমান্ড করল।
“মরার শখ থাকলে এই রাস্তায় পড়ে থাকুন। আর যদি বাঁচতে চান, তবে চেপে বসুন। আপনাকে বাঁচানো এখন আমার জেদ। কারণ আমার রেস কেউ কোনোদিন থামাতে পারেনি, আপনিও পারবেন না।”
আর্যান অবাক চোখে মেয়েটির দিকে তাকাল। মৃত্যুর দোরগোড়ায় দাঁড়িয়েও সে এক অদ্ভুত আকর্ষণ বোধ করল এই মেয়েটার প্রতি। তআর কারণ হইতো এটাই, এই জীবনে সবাই শুধু তাকে মা’রতেই চেয়েছে, পথের কাটার মতো ভেবে উপড়াতে চেয়েছে কিন্তু এই মেয়েটাই প্রথম যে কিনা তাকে বাঁচানোর জন্য তৎপর হচ্ছে। তার গলার স্বর, তার চোখের আগুন, আর্যান তার সারা জীবনেও এমন কিছু দেখেনি। সে তার শেষ শক্তিটুকু সঞ্চয় করে বাইকের পেছনে উঠে বসল। মিরার কাঁধ শক্ত করে ধরল সে। মিরার জ্যাকেটে গরম রক্তের ছোঁয়া লাগতেই সে শিউরে উঠল, কিন্তু পরক্ষণেই থ্রটল ঘুরিয়ে বাইক ছোটাল ঝড়ের গতিতে।
পেছনের রিয়ার-ভিউ মিররে আর্যান দেখল মেয়েটার উড়ন্ত চুল হেলমেটের নিচ দিয়ে বেরিয়ে আসছে। সে কি মানুষ নাকি কোনো অপ্সরা? জ্ঞান হারানোর ঠিক আগে আর্যানের মনে কেবল একটা কথাই বারবার ঘুরপাক খাচ্ছিল,”একে আমার চাই। যে আমাকে সাক্ষাৎ মৃত্যুর হাত থেকে ফিরিয়ে নিয়ে যাচ্ছে, তাকে আমি পৃথিবীর শেষ প্রান্ত থেকেও খুঁজে বের করব।”
হসপিটালের ইমার্জেন্সি গেটে আর্যানকে এক প্রকার ঠেলে নামিয়ে দিয়ে মিরা এক মুহূর্তও দাঁড়ায়নি। স্ট্রেচারে করে তাকে ভেতরে নিয়ে যাওয়ার সময় আর্যান একবার হাত বাড়িয়ে মিরাকে ধরতে চেয়েছিল, কিন্তু মিরা তখন ধোঁয়ার মতো মিলিয়ে গেছে রাতের আঁধারে। না গেলে সে এই বাইক রেসে হেরে যাবে। হার শব্দটা তার অভিধানে নেই। রেস সেই জিতবে।
রাত চারটে বেজে পনেরো মিনিট। ধানমণ্ডির অভিজাত ‘হায়দার ভিলা’র বিশাল লোহার গেটটা খুলে গেল। মিরা বাইকটা গ্যারেজে পার্ক করে টলতে টলতে মেইন দরজার দিকে এগিয়ে গেল। তার জ্যাকেটে রক্তের কালচে দাগ, হাতে পটি বাঁধা। সে আশা করেছিল সবাই ঘুমিয়ে আছে। কিন্তু ড্রয়িংরুমে পা রাখতেই তার রক্ত হিম হয়ে গেল। রেস জেতার আনন্দ টা নিমিষেই তলিয়ে গেলো অতলে।
পুরো ঘরের ঝাড়বাতি জ্বলছে। বিশাল রাজকীয় সোফায় বসে আছেন জাজ আসাফ উদ দৌলা হায়দার। তার সামনে রাখা টি-টেবিলে সাজানো কিছু ফাইল। পাশে তার মা মেহজাবিন বেগম, আঁচলে মুখ ঢেকে কাঁদছেন। এই নীরবতা শ্মশানের চেয়েও ভয়ঙ্কর।
আসাফ সাহেব চশমাটা টেবিলের ওপর রাখলেন। তার গম্ভীর কণ্ঠস্বর পাথরের মতো ভারী শোনাল, “মিরা হায়দার, তুমি কি জানো এখন কটা বাজে?”
মিরা কোনো উত্তর দিল না। সে দেয়াল ধরে সোজা হয়ে দাঁড়ানোর চেষ্টা করল। আসাফ সাহেব উঠে দাঁড়ালেন। তার পরনে সিল্কের নাইট গাউন, চোখে একরাশ ঘৃণা আর হতাশা।
“আমি কাল সুপ্রিম কোর্টে এক বড় স্মাগলারের সাজা ঘোষণা করতে যাচ্ছি। আর আমার নিজের মেয়ে রাতভর রাজপথে কুলাঙ্গারদের মতো বাইক চালিয়ে রক্ত মেখে ঘরে ফিরছে! ছিঃ মিরা! লোকে বলে আমি অন্যের বিচার করি, কিন্তু নিজের ঘরই ঠিক করতে পারিনি। তোমার জন্য আর কি কি শুনতে হবে আমাকে? বলো?”
মেহজাবিন বেগম ফুঁপিয়ে উঠে বললেন, “কেন করিস এমন মিরা? কিসের অভাব তোর? কবে তুই একটা ভদ্র মেয়ের মতো জীবন কাটাবি? আমাদের সম্মানটা কি ধুলোয় মিশিয়ে না দিলে তোর শান্তি হবে না?”
মিরা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। সে জানে কোনো কথা বলে লাভ নেই। তার বাবা তাকে কেবল একজন জাজের মেয়ে হিসেবে দেখে, নিজের সন্তান হিসেবে নয়। তাকে ভালোবেসে কখনো শাসন করেছে? কখনো ভালোবাসা প্রকাশ করে, আদুরে স্নেহময় কন্ঠে বলেছে, মা তুমি এমন বিপথে যেও না? বরং সে শুধু ভেবেছে নিজের সম্মান, নিজের পদমর্যাদা, এখানে যেনো কোনো ধুলো না আসে সেই চিন্তায় সে করেছে, কেবল নিজের জোশ, খ্যাতি ধরে রাখতে লোকটা এমন মরিয়া হয়ে তাকে শাসন করে। সে ধীর পায়ে সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠতে লাগল। পেছন থেকে বাবার গর্জন শোনা গেল,
“কাল থেকে তোমার বাইকের চাবি আমার কাছে থাকবে। কোনো হাতখরচ পাবে না তুমি। এই ছন্নছাড়া জীবন আমি বন্ধ করেই ছাড়ব!”
মিরা তার নিজের ঘরে ঢুকে দরজাটা সশব্দে বন্ধ করে দিল। সে অন্ধকারের মধ্যে জানালার পাশে গিয়ে দাঁড়াল। তার শরীরে প্রচণ্ড ব্যথা, কিন্তু তার মন পড়ে আছে সেই হসপিটালের বেডে। কে ছিল সেই ছেলেটা? যার চোখের দৃষ্টিতে একাধারে হাহাকার আর রাজকীয়তা ছিল?
মিরা জানত না, এই এক রাতের ঘটনা তার পুরো জীবনটাকে পাল্টে দিতে যাচ্ছে। সে যখন নিজের রক্তাক্ত জ্যাকেটটা খুলছিল, তখন সে লক্ষ্য করল আর্যানের শার্টের একটা বোতাম তার চেইনে আটকে আছে। সেই ছোট রুপালি বোতামটা হাতে নিয়ে মিরা ভাবল, এ কি শুধুই কোনো অ্যাক্সিডেন্ট, নাকি কোনো বড় ধ্বংসের শুরু?
ওদিকে হসপিটালের বেডে জ্ঞান ফেরার পর আর্যান প্রথম যে নামটি তার বিশ্বস্ত দেহরক্ষী ‘জ্যাক’-কে বলল, তা হলো, “সেই মেয়েটা। যার বাইকের পেছনে আমি চড়েছিলাম। কাল সূর্যাস্তের আগে তার পরিচয় আমার হাতে চাই। সে এখন থেকে কেবল শাহরিয়ার আর্যানের।”
#চলবে
