#হিজলতলার_হিয়াফুল[অন্তিম পর্ব]
#অর্কিড_রিধি
৩
আজ ছিলো হিয়াফুর ও জমিদার পুত্রের বিবাহের শুভ লগ্নের—দিন। সকলের গায়েই আজ নতুন পোশাক, চকচকে গাল ভর্তি হাসি—ও মন ভর্তি আনন্দ।
ঢাকঢোলের রব শ্রবণ হতেই, গোটা গা উল্লাসে মেতে ওঠে। বর যাত্রী এসেছে!সঙ্গে নিয়ে এসেছে সুন্দর একখানা পালকি। হিয়াফুল বরং এই গ্ৰামের সকলের আদরের কন্যা—তার চঞ্চলতা ও মিষ্টি স্বভাবের কারণে সকলেই তাকে স্নেহ করে।
তার বিয়েতে কোনো রূপ খামতি রাখছে না—কেউ। খাওয়া দাওয়া, গান নাচ সবাই হচ্ছিলো। বাচ্চারা হইচই করছিলো, আনন্দে—আনন্দে পালকি এসে উঠনে থামল। লাল বেনারসিতে বধু সাজা হিয়াফুলের
কর্ণে—সুসংবাদ টুকু শৈলি সই বলতেই, তার আখিঁতে অশ্রু কণাদের ভিড় জমল। নাহ,তার ভাগ্যটা আর সহায় হলো না—ভীষণ বাজে ভাবে বেঈমানি করল!
‘ইশ, জীবন যদি দুবার আসত। তবে এক জীবন আব্বাজানের পছন্দে বিয়ে করে—আরেক জীবন সেই সুদর্শন অচেনা কে বিয়ে করে কাটিয়ে দিতাম।’—কিন্তু এসব স্রেফ ভাবনা’ই ছিল। জীবন একটাই, এর দ্বিতীয় কোনো ভাগ নেই। তাহলে হয়তো অনেকের কষ্টেই লাঘব পেতো।
অতঃপর সেই শুভ লগ্ন এসেই পড়ল। হিয়াফুলের সঙ্গে জমিদার পুত্রের বিবাহ পবিত্র ভাবে সম্পূর্ণ হয়ে গেল। এর মাঝে একবার ও হিয়াফুল চোখ মেলে মানুষ টাকে দেখল না। দেখবে না বলে প্রতিজ্ঞা করেছে। দেখলে যে কষ্ট বাড়বে!
—
‘আব্বাজান আপনার মান—বাঁচাতে নিজের শখ কে বলি দিলাম। দোয়া করবেন যেনো সুখি থাকি!’
বিদায় বেলা মেয়ের মুখের কথা শুনে কান্নায় ফেটে পড়লেন পিতা। মায়ের সে কি নাজেহাল অবস্থা, হিয়াফুলমাকে ধরেও বেশ অনেক টা সময় কাদল। কাঁদতে কাঁদতে জ্ঞান হারাবার মতো অবস্থা হয়ে এলো। চোখে সমানে আঁধার দেখতেই মাথা ঘুরে পড়ে যেতে নিল হিয়াফুল, ওমনি একটা হাত এসে তাকে আগলে নিল। মেয়েটা চোখ মেলে তাকাবে ওমনি, আব্বাজান শুধালেন,
‘বাবা আমার মেয়েটা বড়ই অবুঝ, আপনি ওকে একটু বুঝিয়ে শুনিয়ে রাখবেন। ও কোনো ভুল করলে আপনি ওকে মাফ করে দেবেন। শিখিয়ে পড়িয়ে নিবেন। আমাদের ছাড়া ও একদম ছোট বাচ্চার মত!’—হিজল বুঝল হাতটা ওর বুড়ো বরের, এটা বুঝতেই সে আর চোখ মেলল না। বরং ইচ্ছে করে জ্ঞান হারানার ভান করল। ওদিকে তার বুড়ো বর ভরাট গলায় তার পিতা কে শান্তনা দিচ্ছে,
‘আপনি কোনো চিন্তা—করবেন না। আপনার মেয়ে এখন আমার অর্ধাঙ্গিনী, এতদিন যাবত ওনি আপনার সম্মান হলেও। এখন থেকে সে কেবল—আমার পোশাক সমান। আমার লজ্জা—আমার বক্ষের রানী।
মৃত্যুর আগ অব্দি আমি হিজলপ্রিয়ার হাত ধরে রাখব।কষ্ট তাকে স্পর্শ করার পূর্বে আমাকে পার করার স্পর্ধা দেখাতে হবে। হিজল প্রিয় হাতটি আমি ছাড়ার জন্য ধরিনি, দেহের শ্বাস চলাকালীন আমি ওনার
পাশ থেকে সরব না। তাকে আগলে রাখব!’
হিজল এটা শুনতেই—মনেমনে মুখ বাকাল
‘ব্যাটা তুমি বাঁচবেই বা কতদিন? সাত আট দিনের জন্য হাত ধরে মৃত্যু অব্দি থাকার কথা দিচ্ছো?’
পালকিতে বউ তোলা হলো। তা দেখতেই সখিরা কান্নার জোড় বারিয়ে দিল—নিয়ম অনুযায়ী হিয়াফুলের চোখ থেকে ও অশ্রুর স্রোত থামছিল না।
আর থামবেই বা কেনো, বাপের ভিটে ছেড়ে স্বামীর ঘরে যাওয়া কি আর সহজ হয় মেয়েদের জন্য? কখনোই না! পালকিতে উঠে ও বার বার ঘাড় ফিরিয়ে বাবা মায়ের দিকে তাকাচ্ছিল। যারা বিদায় জানিয়ে বলছে,
‘যাও মা, এবার তোমার বিদায়ের পালা। কোনো মেয়েই চিরকাল বাপের ঘরে থাকে না। একদিন না একদিন স্বামী সংসার সাজাতেই হবে—তুমিও সাজাও। যাও মা, এবার যাও। সুখী হও
স্বামী সোহাগী হও!’
হিয়াফুল পৃথিবীর এই জগন্য নিয়ম কে ঘৃনা করে। তারা কেনো মেয়েদের বাবার বাড়ি থাকতে দেয় না? কেনো দেয় না?
————
বাসর ঘর। নিজেকে নিজের মাঝে গুটিয়ে বসে আছে হিয়াফুল, ঘর জুড়ে তাজা ফুলের গন্ধ ছড়িয়ে আছে। একটা অচেনা—অজানা মানুষের ঘরে তার বউ সেজে তার জন্য অপেক্ষায় বসে আছে সে। গা ছমছমে এক অনুভূতি হচ্ছে। বার বার ফাকা ঢোক গিলছে রমনী, গ্ৰামের কাকিমারা ওর কানে—কানে কি সব কথা বলে গেলেন। ওগুলো মনে পড়তেই ভয় ধরে যাচ্ছে। বার বার ভয়ে কুকরে ওঠে, মনে মনে প্রার্থনা করছে,
‘রাত টা যেনো এমনি পার হয়ে যায়। কেউ যেনো দরজা খুলে আমার কাছে না আসে। আমি যে মরে যাব, মরে যাব!’
হিয়াফুলের ভাবনার মাঝেই দরজা বন্ধ হলো। নারীটি আরো নিজেকে গুটিয়ে বসল। কায়া জুড়ে তীব্র কম্পন চলমান। ওদিকে সামনে—মানুষ টা ধীর কদমে ওর দিকে এগিয়ে আসছেন,হিয়াফুল ঘোমটা আরো টেনে আনল। বুক ধকধক করছে, কি বুড়ো লোক, আবার আসছে বাসর করতে? হিয়াফুলের কান্না পাচ্ছে এবার। লোকটার তার পাশেই বসেছে, হাত ধরল ওর। ওমনি চোখ খিচে চিৎকার দিয়ে কেঁদে বসল,
‘না, আমি বাড়ি যাব, বাড়ি যাব আমি। আমাকে ধরবেন না দাদু, আমি আপনার বউ হতে চাইনি। ওরা জোর করে বানিয়ে দিয়েছে। আমায় ধরবেন না। মা!ও মা তুমি কোথায়?’
হিয়াফুল কান্না করছিল, আফবাত ওর হাতে বেলি ফুলের মালা টা আলগোছে পরিয়ে দিয়ে হতম্ভব হয়ে তাকালেন। বাসর ঘরে বউয়ের কান্নার শব্দ যদি বাইরে যায়। তবে তুলকালাম বাধবে, ছিহছিহ। ও চট জলদি হিয়াফুলের মুখ চেপে ধরলেন। বাধা দিলেন ফিসফিস করে,
‘আই কন্যা চুপ, মৌন থাকুন। কান্না থামান, যদি আপনার কান্নার আওয়াজ কেউ শুনতে পান। তবে সাত গ্ৰামে আমার মান—ইজ্জত আর রইবে না। চুপ করুন হিজলপ্রিয়া দহাই লাগে আমার সম্মান নষ্ট করবেন না!’
হিয়াফুলে কান্নার স্বর দিগুন হলো, আফবাত আর কোনো দিক উপায় না পেয়ে, তড়িগড়ি ওর ঘোমটা টা তুলে দিলেন। জোরে শুধালেন,
‘থামো, মেয়ে। আমি কোনো বুড়ো বর নই। আমি দেখো, দেখো আমায়। হিজলপ্রিয়া, প্রিয় বউ কান্না খানি থামাও!একটু কান্না থামাও গৃনী। নাহলে যে আমার মান—থাকবে না। ‘
মেয়েটা থেমে যায়, ড্যাব—ড্যাব করে সে আফবাত কে দেখতে লাগল। দৃশ্য টা এমন, আফবাত হিয়াফুলের ঘোমটা তুলে তার মুখ চেপে ধরে আছেন। আর মেয়েটা অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে, নিজের চোখ কে যেনো বিশ্বাস করাতে পারছিলো না। ও অবাক হয়ে বলল,
‘আপনি?, আপনি?’—আফবাত স্বস্তির শ্বাস ছাড়লেন, মাথা নাড়ালেন।
‘যাগ, সুকন্যা আমায় চিনতে ত পেরেছেন। হ্যাঁ আমি।’
হিজলের বোধগম্য হল না কিছু টি,
‘আপনি? কিন্তু আপনি আমার বাসর ঘরে কি করছেন?’
‘বাসর ঘরে মানুষ কি করে?’
হিজল অবুঝের মতো বলল, —’তা আমি কি করে জানব?’
আফবাত হাসলে—’আসলেই তা আপনি কি করে জানবেন? আপনি তো জানেন কেবল বাসর ঘরে গলা ফাটিয়ে কাদতে, আর লোকদের জানাতে—যে আমার বুড়ো বর আমায় অত্যাচার করছে তাই না? ছিহছিহ বাসর ঘরে আমার বউ কাঁদছে বিষয় টা জানলে আমার নাককাটা যাবে।’
হিজল তেড়ে শুধাল,
‘এই একদম আমাকে—দোষ দেবে না। আমি গলা ফাটিয়ে কাঁদি না, বুঝলেন…’ সে থেমে যায়, বিড়বিড় করল
‘আমি আপনার বউ?’
আফবাত ওর হাত ধরে একটু কাছাকাছি টানলেন,
‘তো কার বউ?’—হিজল চট করে বলল
‘আমি আপনার বউ?’
‘আমার জানা মতে, আপনি আমারই বউ!’
সে বিশ্বাস করতে পারল না, চেচিয়ে বলল
‘আমি আপনার বউ?’
‘হ্যাঁ আমার বউ!আমার ঘরের গৃনী।’
মেয়েটা দাঁড়িয়ে পড়ল, আরো জোরে চেচিয়ে বলল,
‘আমি সত্যি সত্যি আপনার বউ?’
আফবাত ও দাড়ালেন, ওর হাত ধরে বোঝালে,
‘ নিঃসন্দেহ আপনি আমার বউ। আমার গৃনী!’
হিজল এবার বসে পড়ল, ঘাড় কাত করে গালে তর্জনী ঠেকিয়ে অবাক গলায় তবে বাচ্চাদের মতো শুধাল,
‘আমি সত্যি আপনার বউ?’
শব্দ তুলে হাসলেন যুবক। ওর কপালে টোকা মেরে আওড়ালেন,
‘হ্যাঁ পাগলি, আপনি আমার বউ। আমার বউ, আর শুধু আমার বউ!বুঝলেন? ‘
হিজল নিজের কান কে বিশ্বাস করাতে পারছিলো না, ও আফবাতের হাত চেপে ধরে ঝাকাল,
‘আই আবারো বলুন, আবারো বলুন তো আমি কার বউ?’
‘আমার বউ!হিজলপ্রিয়া আমার বউ!’—হাতে চাঁদ পেলে মানুষ কত খুশি হয়? এর চেয়ে দিগুন খুশি হিজল ছিল। ও কি করবে না করবে বুঝে পেল না। আফবাত কে ঘুরেঘুরে দেখতে লাগল, বিশ্বাস হচ্ছিল না—এই সুদর্শন যুবক তার স্বামী ছিলো,
‘একটু ধরি আপনাকে?’—হিজল অবুঝের মতো বলতেই আফবাম হাসলেন, লজ্জা দিতে জানালেন।
‘একটু ধরবেন? ধরুন। যদি নিজের লজ্জা ভেঙে ধরতে পারেন তো!অবশ্য আমি কি লজ্জা পাওয়ার মতো কোনো কাজ করিনি এখনো!’
হিজল সত্যি সত্যি লজ্জা পেলো। মাথা নত হয়ে বুকে ঠেকল।আফবাত বললেন’—কি বিবিজান, বুড়ো বর কে বুঝি ধরে দেখবেন না?’
হিজল মুখ তুললো না। লজ্জায় তাকাবে না ও, আফবাত ওর থুতনিতে হাত ঠেকালেন। আঙুলের সহযোগিতায় তার আনন-খানা উপরে তুললেন,
‘দেখি দেখি লজ্জা পেলে আমার হিজল প্রিয়াকে কেমন দেখায়? ‘
মেয়েটা লজ্জায় ওর হাত সরিয়ে দিলো,
‘দয়া করে আমায় আর লজ্জায় ফেলবেন না। এমনিতেই আমার কাজের জন্য আমি ভীষণ লজ্জিত, ইশ!সেদিন কেন বললেন না আপনিই আমার…’
থেমে পড়ল হিজল, আফবাত জিজ্ঞাসা করলেন,
‘আমি আপনার কি?’
হিজল মুখ ঘুরিয়ে নিলো,’বলবো না।’
‘না বলুন!’
‘উহুম বলবো না।’
সে হাটুতে মুখ গুজে দিল। আফবিত হাসলেন,
‘আগে তো জানতাম না আমার হিজলপ্রিয়ার এতো লজ্জা। দেখি দেখি এই লজ্জা কি করে ভাঙা যায়!’
সে রমনীর মুখ নিজের দিকে তুলে ধরল। মেয়েটা চোখ খিচে বন্ধ করে আছে। হিজলের মুখ দেখে তারিফ করলেন—”আমার ঘরের চাঁদ, আকাশের চাঁদের চেয়ে দিগুন সুন্দর!’
লজ্জায় মেয়েটা আফবাতের বুকে মুখ লুকালো,
‘ইশ।’
আফবাত হুট করেই বেলি ফুলের মাথায় পেছানো হাতে পিঠে নিজের অধর ছোয়ালেন। শিউরে উঠল হিজল। খামচে ধরল আফবাতের শেরওয়ানির অংশ। মুখ আরো লুকিয়ে ফেলল।
‘আমার বোকা হিজলপ্রিয়া, আপনাকে প্রথম এক নজর দেখেই যেই নেশা এই চোখে দোল দিয়েছে, তা কি কাটাবেন না? আমি বিমোহিত আপনার রূপে ছন্নছাড়া আমার বাক্যে, জগত হারা আপনার চোখে। বোকা আপনার পত্রে,আর পিপাসিত আপনার অধরে..!’
হিজল চোখ খিচে নিল, আফবাত তার নিকট এলেন। কাছাকাছি আসবে ঠিক তখনি দরজায় হাক ডাক, হিজল ছিটকে সরল ওনা কাছ হতে।
‘সাহেব!সাহেব জলদি বেড়িয়ে আসুন। বিরাট ঝামেলা বেঁধেছে। আপনার ডাক পড়েছে।’
৪
বাসর ঘরে হিজল কে একা ফেলে বেড়িয়ে আসতে হলো আফবাত’কে। বাইরে তিন গ্ৰামের জমিজমা নিয়ে বিশাল এক ঝামেলা বেধেছে। বাবা মশাই একা সামলাতে পারছেন না দেখেই, নব্য বধূ কে একা ফেলে পুত্র কে তলব পাঠালেন। আফবাতের ইচ্ছে না থাকা সত্ত্বেও বেড় হতে হলো। সে কি দ্বন্দ্ব—বেশ বড় সারলিশের আয়োজন করা হয়েছে। রাত টা তিন গ্ৰামের মধ্যেই সকলের মাঝে ঝামেলা মিটমাট করতে করতেই কেটে গেল। তবুও ঝামেলা শেষ হলো না। রাত পার হয়েও ভোরের দেখা মিললো,
সবাই তখনো ঝামেলা করে যাচ্ছেন। অতঃপর একটা সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো যে সন্ধ্যার পরে সবাই এ নিয়ে আবারো আলোচনায় বসবে।
জমিদার মশাই আর আফবাত মিলে কাক ভোরে বাড়ি ফিরলেন। তখন পুরো জগত ঘুমিয়ে। বাবা সাহেব নিজ—কক্ষে দিকে চলে যান। আর ক্লান্ত আফবাত নিজের ঘরে, ওনি ঘরে পা রাখতেই স্মরণে এলো। গত রাতে তার বিয়ে হয়েছিল, রমনীর নাম হিজল প্রিয়া। ওনি চট করে তাকালেন, ঘরময় খুঁজলেন নারীটিকে। তবে হদিস পেলেন না—এতে ছটফট করলেন ওনি। হাঁক ডাক ছাড়লেন
‘হিজল প্রিয়া? হিজল প্রিয়া? কোথায় আপনি? কোথায় গেলেন?’—ভয় জাগল মনে, নারীটি তাকে ছেড়ে চলে গিয়েছে নাকি। কিংবা এতোদিন যাবত সে এক স্বপ্নের রাজ্যে ছিলো। কিন্তু গত রাত কি সব মিথ্যে ছিল?
ভয়ের মাঝেই হুট করে মা সাহেবার সঙ্গে দেখা। ওনি হাতের ইশারায় কাছে ডাকলন। তার কক্ষে প্রবেশ করতেই দেখা মিলল ঘুমন্ত রমনীর। স্বস্তির এক বড় শ্বাস ছাড়লেন আফবাত। এসে মা সাহেবার কোলে শির রাখলেন,
‘কি বউয়ের তালাশ করছিলেন বুঝি? মনে করেছিলেন বউ আপনায় ছেড়ে চলে গিয়েছে? বলেছিলাম না, বিয়ের পর বউয়ের প্রতি মায়া বাড়বে—দেখলেন আমার কথা সত্যি হয়েছে। অচেনা দুজন আপনারা এখন একে অন্য কে না দেখলে ছটফট করেন। এটাই হচ্ছে বিয়ের পবিত্র, টান ভালোবাসা!বউয়ের প্রতি ভালোবাসা জন্মাতে সময় লাগে না। সে সব থাক, মেয়েটা একা ঘরে—ভয় পাচ্ছিল। জানতাম আপনি আর আপনার বাবাসাহেব রাতে আর ফিরবেন না, তাই আমার কাছে নিয়ে এলাম। এবার আপনিও এবার বিশ্রাম নিন!’
আফবাত মায়ের দৃষ্টির আড়ালে ঘুমন্ত হিজলের হাত ধরলেন। চোখ বন্ধ করে প্রশান্তির শ্বাস ছাড়লেন,
‘আমার হিজলপ্রিয়া, সত্যিই ভালো লাগা থেকে ভালোবাসা হয়ে গিয়েছে!’
____
জমিদার বাড়িতে দুপুরের ভোজ টা বড় ভোজ হয়। বাড়ির গৃনীদের কাজ তখন বেশি থাকে। হিজল সকাল থেকেই রান্না ঘরে হাত দিয়েছে। প্রথম দিনেই নিজের সংসার নিজে বুঝে নিতে চায়। কাল আব্দি ভাবতো সে বোধহয় বুড়ো বরের সংসারে কিছুই করতে পারবে না। অথচ বর কে দেখে সংসার করার যে তীব্র ইচ্ছে জেগেছে। যেমনটা আফতাবের জেগেছিল গত রাতে, ইশ হিজল হাসল—মিটমিট করে হাসে আর কাজ করে। এসব শাশুড়ি দেখে মুচকি হাসলেন। যাক বর বউ একে অন্যকে পছন্দ করেছে। এবার সংসারে কোনো ঝামেলা হবে না। তার পছন্দ বলে একটা কথা! জমিদার পুত্রের ছোট্ট একখানা বউ কে সকলেই মাথার তাজ ভেবে আদর করছেন, রমনীর মিশুক স্বভাব ও চঞ্চলতা প্রথমদিনেই সকলের মন জয় করে ফেলেছে। শশুড় সাহেব সকলের সম্মুখে নিজের মেয়ে বলে বলে দিলেন,
একটা কুটু কুটু সংসার সেজে গেল যেন হিয়াফুলের। যার কল্পনা ও সেই শুরু থেকে করে এসেছিলো—তা আফবাতের আগমনে এভাবে পূরণ হয়ে যাবে কে জানত? শশুড় সাহেব হতে মজার রান্নার জন্য উপহার পেয়ে তা দেখাতে রমনী ছুটল নিজের বরের নিকট।
কিন্তু সেই পুরুষের দেখা কোথায়? পিতাজন থাকতেও এখুনি সব দায়িত্বের ভার যেনো ওনার কাঁধে। এদিকে মেয়েটা যে তার জন্য সেজেগুঁজে গৃনী সেজে টইটই করে ঘুরছে। অথচ যার জন্য এতো কসরত সেই সাহবের হদিস নেই,
পুকুর ঘাটে আফবাত কে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে হাত নেড়ে ডাকল।
‘আই যে, শুনছেন?’
কিছু জরুরি কাগজ পত্র পড়ে তা নিজেদের দোকানে পাঠানোর বন্দোবস্ত করে দিলেন ওনি। হিজলের ডাক কর্ণে শ্রবণ হল না—তিনি লোকের সঙ্গে কথায় ব্যস্ত। নারীটি এতে ফের হাত নাড়লেন,
‘আই যে, শুনছেন না?’
অদ্ভুত ডাকল ঠেকল, আফবাত ঘাড় ফিরিয়ে তাকালেন, চোখটা জুড়িয়ে এলো ওনার। তার গৃনী, তার ঘরের রানী। সে এগিয়ে আসছিল, ওনি লোকদের দিকে তাকিয়ে জানালেন
‘এবার আসতে পারেন!’
তারা চলে যেতেই আফবাত একবার বউ কে দেখলেন। অতঃপর নদীর দিকে তাকালেন, মাথায় হুট করেই বুদ্ধি এলো—সে পড়ে যাওয়ার অভিনয় করলেন।
‘হিজল প্রিয়া বাঁচান আমায়? বাঁচান আমায়! পড়ে গেলাম!’
হিজলের চোখ কপালে, ছুটে এসে মানুষ টাকে ধরবে এর পূর্বেই দুজনেই ধপাস করে পড়ে গেল জলে। হিজল জড়িয়ে ধরলা মানুষটার গলা,
‘হায় হায়, কিভাবে পড়লেন?’
‘আপনাকে দেখে!’
‘মানে?’
‘আপনার রূপের ঝলকে!’—হিজল মুখ বাকালো,
‘এই আপনি না সাঁতার জানেন না?’
‘হু জানি না তো!’
‘তাহলে পানিতে পড়লেন কেনো? ‘
‘আপনি আমায় বাঁচাতে ঝাপ দেবেন বলে!’
হিজর আফবাতের দুকাধে হাত ঠেকাল,
‘আজ যদি আমি সাঁতার না জানাতাম, তাহলে?’
আফবাত গাল টেনে দিলেন,
‘আমি জানি, আমার মতো করে আমার হিজলপ্রিয়া সাঁতার না জানা থাকলেও, আমায় বাচাতে ঝাপ দিতো। কি দিতো না?’
হিজল লজ্জা পেলো, আফবাত ওকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল।
‘একটা কথা বলি বউ?’
‘জী বলেন!’
আফবাত চোখে চোখ রাখল,’ভালোবাসি!’
হিজল সেই চোখেই তাকিয়ে থাকল। কিছু বলতে পারল। অতঃপর হুট করেই আফবাতের বুকে মুখ লুকালো। গুনগুন স্বরে আওড়াল,
‘ভালোবাসা কারে কয় জানি না। তবে যদি আঘাত করে কেউ এই দিলে,তবে আপনি নাহয় বাড়িয়ে দিয়েন, ভরসায় ভরা হাত। এগিয়ে দিয়েন নিরাপত্তার শান্ত আশ্রয়ী কাঁধ—মাথায় আলতো করে স্পর্শ বুলিয়ে দিয়েন,ঠাঁয় দিয়েন আপনার হ্দপিন্ডের উপরিভাগের পাশটায়। যেথায় লাভডাব চল্লমানের স্পন্দন শ্রবণ হয়। যেথায় আমার সকল অশ্রুদের বিনাশ ঘটে,
আপনি বরং আপনার দিলের কাছাকাছি আমায় একটু স্থান দিয়েন!কি দেবেন না?’
আফবাতের ঠোঁট হাসলেন। ভেজা আনন খানা স্থতের মাঝখানে নিয়ে শুধালেন,
‘আগে ভালো লেগেছে, অতঃপর বিয়ে হল। বিয়ে হয়েছে এখন ভালোবাসব। পরিশেষে সংসার করব, আমার বউ নয়!সখী হবেন!জীবন চলার সঙ্গী হবেন। তবে ঠাঁয় দিব!একটা ছোট সংসারের রানী হবেন?’
রমনী তড়িগড়ি মাথা ঝাকাল, আফবাত শব্দ তুলে হাসলেন।
——–
আজ ছিলো কাল বৈশাখীর দিন। আফবাত ঘুমোচ্ছেন। বিয়ের এই বছর খানেকের মাঝে সে ঘুম দিতে বেশি ভালোবাসে। সকাল সকাল হিজলের কেশের সুগন্ধে তার তন্দ্রা ছুটে, কিন্তু আজ ওটা নেই। বিছানাটা কেমন ফাঁকা ফাঁকা ঠেকছে। আফবাত চমকে উঠে,
‘হিজলপ্রিয়া, হিজলপ্রিয়া কোথায় আপনি? ‘
ছোট—ছোট কদম ফেলে নারীটি ঘরে অনুপ্রবেশ করল, দরজার কোণ ঠেসে দাঁড়িয়ে শুধাল,
‘শুনুন!’
আফবাত উঠে বসলেন। হাত নেড়ে তাকে কাছে ডাকল,
‘শুনান!’
‘একটা সংবাদ রয়েছে।’
‘কি সংবাদ?’
‘আপনি বাবা হতে যাচ্ছেন!’
সে যেন কথাটা শুনল না। একবার তাকিয়ে বললো
‘ওহ। ভালো সংবাদ!’—রমনী রাগী চোখে তাকাল
কথাটা যখনি যুবকের মস্তিস্কে আঘাত করত। ওমনি চমকে উঠে—’কি বললে? আমি কি? আমি কি হতে যাচ্ছি?’
রমনী মুখ বাকালো—’ঘোড়ার ডিম, কত বার বলবো আপনি বাবা হতে যাচ্ছেন? আমার একথা মুখ ফুটে বলতে বুঝি লজ্জা করে না? ফাজিল লোক আমার
সর্বনাশ করে এখন অভিনয় করছেন?’
যুবক ঠাস করে জ্ঞান হারিয়ে পড়ে গেলেন, মেয়েটা চিৎকার করল
‘আয়হায় কি হলো আপনার? কি হলো?’
মাথা তুলে তাকিয়ে সে কোনো মতে জানাল,
‘এ তুমি কি শুনালে, আমি যে খুশিতে? খুশিতে.. জ্ঞান হারিয়ে…’—বলতে বলতেই ওনি জ্ঞান হারিয়ে ফেললেন। মেয়েটা তার বুকে ঘুষি মারল
‘পচা লোক। একাই সব খুশি হবেন!ধ্যাত বলাই উচিত হয় নি।’
সমাপ্ত….
