#হিজলতলার_হিয়াফুল[২]
#অর্কিড_রিধি
সাঁতার না জানা আফবাত ফেঁসে গেলেন বিপাকে। যেই নারীকে বাঁচাতে ঝাপ—দিলেন জলে, ওই নারী তো লাফিয়ে ঘাটে ওঠেছে। কিন্তু জলে ডুবে মরছেন যুবক,ছটফট করতে—করতে সাহায্য চায়লেন,
‘বাঁচান আমায়, আমি ডুবে যাচ্ছি। বাঁচান আমায়!’
হিয়াফুল এতো বড় ছেলেকে—ডুবে পড়তে দেখে কিছু সময় থমকে ছিলো অতঃপর মুখ অদ্ভুত রকম কুঁচকে জিজ্ঞেস করল—’এমা আপনি কি সাঁতার জানেন না?’
আফবাত ততক্ষণে পানি খেয়ে ফেলেছেন অনেক টাই। ছটফট করতে করতে বললেন, —’না, না আমি সাঁতার জানি না। আমায় দয়া করে পাড়ে তুলুন।’
ললাটের ভাঁজ গাঢ় হলো রমনীর, ও সন্দেহের গলায় বল—’সাঁতার না জানলে, পানিতে নামলেন ক্যান?’
‘আপনাকে…আপনাকে বাঁচাতে!’—ওনি ডুবে যাচ্ছিলেন। তবুও বললেন, এদিকে হিয়াফুল নিরব।
‘আমায় বাঁচাতে?এর সারমর্ম কী?’
আফবাত লাফিয়ে উঠার চেষ্টা করলেন,
‘আমি মনে করেছিলাম আপনি হয়ত—ডুবে যাচ্ছেন!’
হিয়াফুলের মুখখানি—হাঁ হয়ে গেল। ও হেসে বলল,
‘কি নাদান আপনি, আমি ডুবো যাব ভেবে আপনি পানিতে ঝাপ দিলেন? অথচ আপনি নিজেই সাঁতার জানেন না? কি হাস্যকর ব্যাপার তাই না!’
আফবাত বিরক্তি নিয়ে বললেন—’আপনি হাঁসবেন দেরিতে, আগে আমাকে দয়া করে তুলুন। আপনার কারণেই তো ডুবেছি!’
হাসি উড়ে গেল তরুণীর। মুখ গোমড়া করে কড়া গলায় শুধাল—’আমি আপনাকে বলি নি আমার জন্য ঝাপ দিতে। আপনি স্বেচ্ছায়—নদীতে পড়েছেন!’
‘আপনি কি এখন এই বিষয় নিয়ে—আমার সঙ্গে র্তক করতে ইচ্ছুক!’
‘কে র্তক করছে? আমি নাকি আপনি? দেখুন সাহেব এই হিজল পুকুরে ডুবে—যাওয়ার মতো তরুনী নয়, সে সাঁতার জানে ভালো। বুঝলেন?’
নামটা শুনে ছটফট করা বন্ধ করে দিলেন আফবাত। যাকে কিনা এতোক্ষণ যাবত—খুঁজ করছিলেন,সেই ওনা সম্মুখে দাঁড়িয়ে। চুপ করে থাকতেই ডুবে যেতে নিলেন। ওমনি হিয়াফুল চেঁচিয়ে ওঠে,
‘আরে আরে ডুবে যাচ্ছেন যে.. আসুন চট করে আমার হাত টা চেপে ধরে পাড়ে উঠে—আসুন তো দেখি!’
আফবাত মুগ্ধ নয়নে, তরুনীর আনন পানে তাকিয়ে
মেয়েটা তাড়া দিলো—’কি হলো ধরুন?’
যুবক পলক না ফেলে প্রশবাণ করলেন, —’ধরব?’
হিজল মাথা ঝাকাল—’হূ, জলদি উঠে আসুন।’
‘ভেবে বলছেন তো?’
ললাটে ভাঁজ পড়ল—’হাত ধরাতে ভাবাভাবির কি রয়েছে?’
‘আছে, হাত একবার ধরলে—আর ছাড়ব না কিন্তু।’
হিজল কিছুই বুঝল না, ও মাথা ঝাকাল—’আগে উঠুন।’
‘ধরব?’
‘ধরুন।’
‘সত্যি?’
হিজল বিরক্ত বোধ করল—’না মিথ্যে!’
আফবাত ওর হাত ধরে পাড়ে ওঠে পড়লেন। হিজল জোরে—জোরে শ্বাস ছাড়ল
‘বাবারে আপনি তো মহাশয় বেশ ওজনিওয়ালা লোক। এতো ওজন আপনার? রোজ কি নিয়ম করে লোহা চিবোন হয়? আমার হাতে ব্যথা ধরে গেলো!’
আফবাত শুধু হিজল কেই দেখে যাচ্ছিলেন— মেয়েটা ওনাকে অনেক কিছুই শুনাচ্ছিলো। কিন্তু তাতে ওনার হুস নেই—সে মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে, হিজল হাত নেড়ে বলল,
‘এই যে মহাশয়, আমার কথা কি আপনার কর্ণভেদ করতে সক্ষম.নাকি পানি ঢুকে শ্রবণ পথ—বন্ধ হয়ে গিয়েছে?’
আফবাত মুগ্ধ গলায় জানালেন,’—আপনার চোখ দুটি অনেক সুন্দর হিজলপ্রিয়া!’
মেয়েটা ভ্রু বাঁকিয়ে চায়লো, —’জী? কি বললেন আপনি?’
আফবাত তড়িগড়ি করে বললেন, —’আপনাকে কী আমি হিফজপ্রিয়া বলে ডাকতে পারি?’
‘মানেহ? আর আপনি আমার নাম জানলেন কি করে?’
সে প্রশ্ন চোখে তাকাল,
‘আপনি তো একটু পূর্বে বললেন, আপনার নাম হিজল। শুনেছি অনেকে আপনাকে অনেক নামে ডাকে, আমি নাহয় ভালোবেসে হিজলপ্রিয়া বলে ডাকব!আপত্তি আছে?’
হিজল নিরবে তাকাল, পা হতে মাথা অব্দি লোকটাকে মাপল। নাহ দেখতে তো ভদ্রই মনে হচ্ছে, তবুও বলা তো যায় না। ও চটপট বলল,
‘জী অবশ্যই আপত্তি রয়েছে! আপনি কেনো আমায় হিজলপ্রিয়া বলে ডাকবেন? আর আমায় কে কি নামে ডাকে তা আপনি কি করে জানলেন? আপনি কে শুনি?’
হিজলের চোখে প্রশ্ন। গম্ভীর জমিদার পুত্রের ঠোঁটে হাসি খেলা করল, ওনি ইতি—ওতি করে বললেন
‘আমি দু গ্ৰামের পরে থাকা এক অচেনা লোক। আপনার গুনগান প্রায়শই শুনা হয়। আজ ভাবলাম আপনার সঙ্গে একটু সাক্ষাত করে আসি। হিজতলতার হিয়া ফুল যার নাম, দেখি তার কিসব কাম। আপনাকে খুঁজতে—খুঁজতে এতো দূর আসা আপনার দেখা পেলাম না। অথচ এখানে আপনি!’
মেয়েটার ঠোঁট ফাঁকা হয়ে গেলো, ও অবাক গলায় বোকাদের মতো জিজ্ঞেস করে বসল—’আমার গুনগান দুগ্ৰাম ছড়িয়ে গিয়েছে?’
আফবাত মাথা ঝাকালেন,
‘অবশ্যই, তা ছড়িয়ে গিয়ে আমার কান অব্দি পৌছে গিয়েছে!’
হিজলের চোখ বড়বড় হয়ে গেলো—’এমা, এসব কখন হলো? আমি তো এসব কিছু জানিইনা।’
‘আপনাকে এসব জানতে হবে না হিজল প্রিয়া, আপনি বরং জেনে নিন—নদীতে ঝাপ দেওয়ার আগ অব্দি যদি আমি জানতাম আপনিই হলেন আমার খোঁজ করা সেই হিজলপ্রিয়া। তবে যে সর্বনাশ ঘটে যেতো!’
‘সবনাশ? কার সবনাশ?’—হিজল বিড়বিড়াল।
আফবাত সেই চোখে তাকিয়ে মুগ্ধ সুরে বললেন,
‘আমার।’
‘আপনার কিসের সর্বনাশ?’
‘বুঝবেন না। সঠিক সময় এলে—একদিন বুঝিয়ে দেব কেমন?’
হিজল মুখ বাকালঁ। দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল
‘হিজলের আর সময় আসবে না।’
‘কেনো?’—আফবাত জিজ্ঞেস করলেন, হিজল মন খারাপ করে জানাল,
‘আমার যে পরশু এক বুড়ো লোকের সঙ্গে—বিয়ে। বুড়ো লোকের সঙ্গে বিয়ে হলে কি আমি হিজল আর রঙ ঢঙ করতে পারব? এভাবে হুটহাট পুকুরে সাঁতার কাটতে পারব? কখনোই না। বুড়ো লোকের সেবা করতে করতেই জীবন শেষ। যখন সে মরে যাবে তখন তার বিধবা হয়ে আমিও মরব। আমার আর বাঁচা হবে না।’
আফবাতের এটা শুনতেই রাগ লাগল। কিন্তু হিজলের দিকে তাকিয়ে হেসে ফেললেন, মেয়েটা জানেই না তার হবু সেই বুড়ো বর টা তার সামনেই দাঁড়িয়ে আছে। আফবাত একটু বাজিয়ে দেখলেন,
‘তবে বিয়ে করছেন কেনো? বারণ করে দিন!তাহলেই তো হলো!’
হিজল দুদিকে মাথা নাড়ল—’না হলো না। কারণ আমার আব্বাজান পাত্র পক্ষ কে পাকা কথা দিয়ে ফেলেছেন। ওনি নিজের জবান ফেরাতে—পারবেন না। আর আমি নিজের জন্য আব্বাজান কে কষ্ট দিতে পারব না।’
আফবাতের ভালো লাগল। হ্যাঁ মা সাহেবা তার জন্য উওম পাত্রী বাঁচাই করেছেন। হিজল আকাশের দিকে তাকিয়ে বলল,
‘এই রে সন্ধ্যা নেমে গেলো যে, আমায় বাড়ি ফিরতে হবে। নাহলে মা যে ভীষণ বকুনী দেবেন, আমি বরং গেলাম মশাই, ভালো থাকবেন। আর এরপরের বার থেকে ভুলেও সাঁতার না জেনে পানিতে ধাপ দেবেন না। প্রতিবার হিজল আসবেনা আপনায় বাচাতে।’
মেয়েটা দৌড় লাগাল, আফবাত মুচকি হাসলেন।
‘প্রতিবার হিজলপ্রিয়াই আমায় বাঁচাবে, আর তা প্রতিবার!’
———
রাগে গা রিরি করছে হিজলের। হারিকেনের আলো তখন শেষের দিকে, চিঠিরটাকে যদি এই আগুনে জ্বালিয়ে দিতে পারত তবে বড়ই শান্তি অনুভব করতো। কিন্তু জ্বালিয়ে দিলে লাভ যে হবে না। কাল রাতেই তার বিয়ে, আর আজকে ওই অভদ্র লোকের পত্র এসেছে। হিজল রিরি করল,
‘কত বড় বেহায়া—বেশরম লোক হলে এসব কথা চিঠিতে লিখতে পারে? ছিছি বুড়ো বয়সে এমন প্রেম পত্র লিখে ওনি? নিশ্চয়ই যৌবন কালে অনেক ছোকড়িদের সঙ্গে পিড়ির ঘাটতির ব্যাপার রটিয়েছিলেন। কিন্তু সেসব জেনে আমার লাভ কি? আমার জীবন টা তো শেষ হয়ে যাচ্ছে। কি জগন্য!কি জগন্য!’
হিজল টেবিলের উপর মাথা রাখল। বাইরে আজ চাঁদ উঠেছে। রূপালী আলো এসে তার চোখে মুখে পড়ছে। শৈলী সখী কিছু ক্ষণ আগেই জমিদার পুত্রের পত্র এনে হাতে ধরিয়ে দিলো। ফিসফিস গলায় জানাল,
‘কাল রাতে বিয়ে আর চিঠি আদান প্রদান চলবে না। এটাই শেষ!’
হিজল ভেবেছিলো—তার দেওয়া কটু কথা শুনে জমিদার পুত্র বিয়ে ভাঙার কথা লিখবেন। কিন্তু হলো উল্টো। পত্র মেলে ধরতেই তাতে দেখা,
‘প্রিয় হিজলপ্রিয়া, আমার হবু বধুয়া। সে আপনার বিয়ে—শাদি করার ইচ্ছে এখন নাই থাকতে পারে। কিন্তু আপনাকে দেখার পর থেকে—আমার যে তড় সইছে না। যদি এখুনি আপনার মতো সুন্দরী কন্যা কে আমার ঘরের—রানী করে না আনতে পারি তবে যে আজীবন তীব্র আফসোস নিয়ে কাটাতে হবে! দিনকাল ভালো নয়, আমার মতো বুড়ো মানুষ আপনার মতো হাটু বয়সী সুকন্যা কে কি করে হাত ছাড়া করতে পারে বলুন তো? যদি এখুনি আপনাকে বিয়ে না করি, তবে সত্যি সত্যি আমি আয়নাতে নিজের প্রতিবিম্ব দেখলে—বুড়ো টাক ছাড়া আর কিছুই দেখতে পাব না। আপনি শীঘ্রই আমার গৃণী হয়ে আসুন, আমার ঘর ও বুক উভয় খালি হয়ে পড়ে আছে আপনার শূন্যতায়। আসুন আর সবাই কে পূর্ণ করে তুলুন। আপনার প্রতিক্ষায় আমি সত্যিই বুড়ো হয়ে যাচ্ছি হিজলপ্রিয়া। বেনারসি খানি ঠিকঠাক পড়বেন কেমন? লাল টুকটুকে বউ রূপে আপনায় কেমন দেখায়, তা দেখার বড়ই স্বাদ আমার।
তৈরী থাকবেন, নিতে আসিবো বর যাত্রী নিয়ে। সঙ্গে আনিব সাজানো পালকি। কবুল বলিয়া বধুয়া তোমায় নিয়ে যাব নিজের বাড়ি!
ইতি আপনার বুড়ো হবু বর, জমিদার পুত্র!’
হিজল ক্লান্ত শ্বাস ছাড়ল। চোখ হতে এক ফোটা জল গড়িয়ে পড়ল। সত্যি—সত্যি কি কাল তার ওই বুড়ো লোকের সঙ্গে বিয়ে? না জানি কেমন দেখতে হবেন। কেমন বয়স্ক হবেন? দাঁত থাকবে তো? হিজলের কাঁদতে ইচ্ছে হচ্ছে, তার বর রূপে বুড়ো কাউকে মানায় না। মানায় বরং সেই ঘাটে দেখা হওয়া অচেনা কে,হিজলের ঠোঁটের কোণ ঠেসে হাসি ফুটল। কি হলো কে জানে, মুচকি হেসে আওড়াল—
‘অচেনা প্রেমিক পুরুষ হয়ে যখনি এলেন, তখন এতো সময় নিয়ে এলেন কেনো? হিজলের যে কাল ফুড়িয়ে এলো, তার আপনার কাছে যাওয়ার পথ খোলা নেই!’
সঙ্গে সঙ্গে সৎবৎ ফিরে পেলো রমনী নিজেকে শাসাল
‘ছেহছেহ হিজল, এসব কি পাপী কথা বলছিলি! মানলাম লোকটা দেখতে সুদর্শন কিন্তু কাল যে তুই অন্যের বউ হবি। এসব তোর মুখে মানায় না!’—
হিজলের চোখ ফের ভরে এলো,কেনো মানায় না? সে কি ওই সুদর্শন যুবকের রানী হলে ক্ষতি হতো? না হতো না। ওই অচেনা রাজপুত্রের ন্যায় দেখা যুবক যদি তার হবু বর হতো, তবে হিজল বোধহয় আজ খুশিতে নাচত!কিন্তু ভাগ্যে যা হওয়ার ছিলো তাই হলো। হিজলের দীর্ঘশ্বাস এলো,
‘ইশ যদি সে ওমন হতো, তবে কতই না ভালো হতো!’
আফসোস খানি রয়েই গেল কাল রাতে না জানি কি হবে ওর?
চলবে..?
