#চেনা
#পর্ব_১০
সুকুমারীর সঙ্গে নিজের মাকে এক ট্রেনে উঠতে দেখে সম্রাজ্ঞী খানিক অবাক হলেও অভিজিতকে কিন্তু বিন্দুমাত্র অবাক হতে দেখা গেল না, যেন সে জানত এমনটাই হতে চলেছে| তার মায়ের ভালোবাসার জাদু এমনই| হাসিমুখে বলল সে, দিনগুলো ভাল কাটুক| সাবধানে থাকবেন| আপনাদের যাত্রা শুভ হোক|
গ্ৰামের পরিবেশের সঙ্গে তুমি মানিয়ে নিতে পারবে তো মা? কখনো তো থাকো নি গ্ৰামে, তোমার কোনোরকম অসুবিধা হবে না তো? আর মামণি তুমি… তুমি পারবে তো সামলাতে? মা হঠাৎ যে ওখানে যাচ্ছে?
কে কাকে সামলায় সোনা, হেসে উঠলেন গার্গী সরকার| যখন আমি বাইরে ঘুরতে যাই, তখন নিজেই নিজেকে সামলাই| এখানে তো তাও বেয়ান সঙ্গে রয়েছেন| তাছাড়া আমি আর বেয়ান দুজনেই প্রাপ্তবয়স্ক| তুই কোনো চিন্তা করিস না সোনা… আমরা নিজেরাই নিজেদেরকে সামলে নিতে পারব| তোরা বরং সাবধানে থাকিস, ভাল থাকিস|
বেজে উঠল হুইসেল, ছেড়ে দিল ট্রেন| যতদূর চোখ যায় তাকিয়ে রইল সম্রাজ্ঞী| ধীরে ধীরে ছোট হল ট্রেন, লেজটুকু দেখা গেল কয়েক সেকেন্ডের জন্য, তারপর… যেন আঁকাবাঁকা পথ ধরে হা রিয়ে গেল দৃষ্টিসীমার আড়ালে… তুমি জানতে মা মামণির সঙ্গে যাবে? সেজন্যই মামণি কাল মাকে ফোন করতে বলছিল?
মামণি? মামণি কে? একটু যেন অবাক হল অভি|
আমার আরেক মা| মাকে কি কখনো অন্য নামে ডাকা যায়… কাল যখন মাকে বললুম, মা বললেন নিজের মা ছাড়া অন্য কাউকে মা বলে ডাকা যায় নাকি! নাকি তাতে সেই আন্তরিকতা আসে… মন থেকে ইচ্ছে হলে তুই আমায় মামণি বলে ডাকিস| মামণিও তো মায়েরই রূপ|
তাই? বলছ? আসার পর থেকেই তো একবার, বারবার তোমার মা বলেই সম্বোধন করে এসেছ মানুষটাকে তাই ঠিক ধরতে পারি নি… অভির গলায় যেন প্রচ্ছন্ন বিদ্রুপের সুর বাজে, বুকের ভেতরটা কেমন করে ওঠে সম্রাজ্ঞীর| তবে কি অভি এবার তার থেকে দূরে সরে যাবে… বুঝবে না হৃদয়ের গভীরে অনুভবের কথা| যে অভি একদিন তাকে চোখে হা রাত, রাখত তার সব মনখারাপের খবর কিভাবে সে তার সঙ্গে এমনটা করতে পারে? বুকের ভেতর উথালঙপাথাল ঝ ড়, কিন্তু চোখে জল আসে না, হাসিমুখেই গাড়িতে গিয়ে বসে সম্রাজ্ঞী… ভা ঙনের গল্প ছোট থেকেই তাকে শক্ত করেছে, খামোখা চোখের জল ফেলার দুর্বলতা সে করবে না|
ভারী সুন্দর জায়গায় আপনার দোকানটা| গাছেরাই যেন ছাউনি মেলে দিয়েছে… ছোট্ট কাঠের বেঞ্চ, উনুন… বাসনকোসন| সবটাই সুকুমারীর মনের মতো ঝকঝকে| কয়েকদিন পরে এলেও তাতে কোনো মালিন্যের ছাপ পড়ে নি| এই ‘ ছায়া সুনিবিড় শান্তির নীড় ‘ দেখে গার্গীর ভারী ভাল লাগল| যদি একটু অন্যরকমভাবে আপনার চা খানাকে সাজাতে… আপনি কি আপত্তি করবেন? আসলে এত সবুজের মাঝে, একটু রঙ তুলি ছুঁইয়ে দিলে দৃশ্যপটই বদলে যাবে|
আপত্তির কি আছে বেয়ান, যেমনটা আপনার ভাল লাগবে, হাসলেন সুকুমারী| অচেনা একজনকে ভালোবেসে আপন করে নেওয়ার মধ্যে যে সুখ আছে, সেই সুখ আপনি আমায় দিয়েছেন, স্বেচ্ছায় এসেছেন আমাদের গ্ৰামে, ভালোবেসেছেন এখানকার সবুজে সাজানো প্রকৃতিকে| আর কি বা চাওয়ার আছে আমার….
তাহলে এখানকার রঙের কারিগরকে ডাকুন, একটু বুঝিয়ে দিই সবটা| আপনিও আমার সঙ্গে থাকবেন, যদি পরিকল্পনা পছন্দ না হয়… তবে বদলের কোনো দরকার নেই| এই ছোট্ট দোকানঘরটা আপনার স্বপ্ন, তাই চিন্তাভাবনা আপনারই প্রাধান্য পাবে|
রূপকথা যখন বাস্তবে ডানা মেলে, রঙহীন ঘর সেজে ওঠে নীল, সবুজের স্পর্শে তখন কি কেউ আপত্তি জানাতে পারে? সুকুমারী দেবীও পারেন নি… রঙের ছোঁয়া মেখে রঙিন হয়ে উঠছিল স্বপ্ন দিয়ে গড়া তাঁর ছোট্ট চায়ের দোকান| খদ্দেরের বেঞ্চিতেও লেগেছিল রঙের প্রলেপ…. কিন্তু এখানেই শেষ নয়| সুকুমারী দেবী জানতেন না একটা ছোট্ট বিস্ময় অপেক্ষা করছিল তাঁর জন্য, সেই বিশেষ প্রস্তুতি যা খানিকক্ষণের জন্য তাঁকে বাকরুদ্ধ করে দেবে…
উদ্বোধনের জন্য ডাকা হল সেই তিনজনকে, তারক, রতন, সবুজ যাদের মাঝেমধ্যেই অল্পস্বল্প খাবার দিয়ে গো পনে সাহায্য করতেন সুকুমারী| গ্ৰামের সব লোক এই তিনজনকে ভ্যা গাবন্ড বলেই জানত, হঠাৎ তাদের এমন সৌভাগ্য প্রাপ্তিতে অবাক হয়ে গেল| এ কি সম্ভব? সুকুমারী দেবীর নতুনভাবে সাজানো দোকানের ফিতে কাটবে এই তিনজন?
চাপা গলায় সুকুমারী বললেন, আমার মনের কথা আপনি কিভাবে জানলেন বেয়ান? কে খোঁজ দিল এদের?
মন চাইলে খোঁজ পাওয়া শক্ত কিসের? আপনার ভাল লাগছে তো?
ভীষণ ভাল লাগছে| আমি ভাবতেই পারি নি আপনি এমন কিছুর ব্যবস্থা করবেন|
ফিতে কাটতেই জ্বল জ্বল করে উঠল ট্যাঁরাব্যাকা কাঠের ওপর কাস্টোমাইজ করা দোকানের নেমপ্লেটখানা… ” সুকুমারী দিল খুশ চা| ” তলায় ছোট ছোট অক্ষরে, এখানে চায়ের সঙ্গে সুলভ মূল্যে টা’ও মেলে|
এ কি বেয়ান? এ কি করেছেন আপনি? সুকুমারী বিস্ময়মাখা চোখে তাকান গার্গী সরকারের দিকে|
কেন… মিথ্যে কিছু লিখেছি নাকি বেয়ান? আপনার উপস্থিতিই তো যে কোনো মানুষের অন্তরকে আনন্দে পরিপূর্ণ করে তুলতে পারে| সেখানে আপনার নিজের হাতে বানানো চা… দিলখুশ হতে আর কি কিছু লাগে? আপনার জন্য আমার কাছে আরেকটা উপহার আছে| খুব সামান্য, তবু কেন জানি মনে হয় আপনার ভাল লাগবে|
আবারো উপহার? আপনি যে আমায় ঋণী করে চলেছেন বেয়ান| এই সময় ওরা দুজন যদি থাকত দুপাশে, তাহলে বোধহয় এক লহমায় সব পেয়েছির দেশে পৌঁছে যেতাম, দীর্ঘশ্বাস ফেলেন সুকুমারী, কিন্তু কি জানেন এক জীবনে সব সুখ পাওয়া যায় না| সন্তান যে একের পর এক সাফল্যের সিঁড়ি বেয়ে এগিয়ে চলেছে, মা হিসেবে এই তো জীবনের সেরা পাওয়া… ‘ আমার এই পথ চাওয়াতেই আনন্দ| ‘ পথে চলতে চলতে হঠাৎ করে আপনার মতো বন্ধু পেলাম এই কি কম প্রাপ্তি?
ঋণী তো আমি হয়ে আছি, মৃদু হাসলেন গার্গী সরকার| আপনার সংস্পর্শে এসে আমার সোনার চোখে আবারো হাসি দেখেছি, ওর বাবার আর ঠাকুমার অ সংযত আচরণ ওকে মনে মনে ভে ঙে দিয়েছিল, কেমন যন্ত্রের মতো হয়ে গেছিল, অফিস আর কাজকর্ম নিয়ে মেতে থাকত| ভাবত সবাই চায় ওকে কষ্ট দিতে, তাই শক্ত হয়ে থাকতে থাকতে ভুলেই যাচ্ছিল মানুষকে পাশে নিয়েই জীবনপথ পরিক্রমা করতে হয়, এই পৃথিবীতে একাকী জন্মালেও, একাকী বাঁচা যায় না| আপনার ছেলেকে ভালোবেসে বিয়ে করেছিল ঠিকই, কিন্তু বিয়ে আসলে কি, বিয়েতে পরিবারের কি ভূমিকা একজন ভালো জীবনসঙ্গী যে ভালোমন্দ সব পরিস্থিতিতে পাশে থাকে, আগলে রাখে… তা বোধহয় এতদিনে অনুভব করল| মনের গভীরে দুঃখ পাবেন না বেয়ান, দেখুনই না ওরা এসে পড়বে খুব তাড়াতাড়ি| আমি যে আমার মেয়েকে চিনি, ওর ভাবনাচিন্তা নিজের অন্তর দিয়ে অনুভব করতে পারি|
( ক্রমশ )
©️ Monkemoner dakbakso – Anindita
