#চেনা
#পর্ব_৯
ডাঃ শুভাশিস আচার্য্যির সঙ্গে আমার কথা হয়ে গেছে মা| রিপোর্টের কপিও পাঠিয়ে দিয়েছি| কালই তুমি গ্ৰামে ফিরে যেতে পারবে| বাকি চিকিৎসা উনি ওখানেই করবেন দেখেশুনে| যেটা নিয়ে সন্দেহ ছিল রিপোর্ট দেখে তার অনেকটাই কাটিয়ে ওঠা গেছে, কাজেই… আমি নিজেই যাব কাল, নিজে গিয়ে তোমাকে পৌঁছে দিয়ে আসব|
নিশ্চিন্ত হলাম| কতদিন দোকানটা খুলি নি রে অভি| তারক, রতন, সবুজরা অপেক্ষা করছে… আমার ফেরার জন্য| দোকানটা খুললে ওরা একটু ভাল থাকে| বড্ড গরীব যে রে ওরা, এক কাপ চা টুকু মাত্র নিয়ে একসঙ্গে বসে গল্প করে, আড্ডা দেয়… ওদের কষ্টের কথা বলে আমার কাছে| চাকরি পায় নি ছেলেগুলো, বাড়িতেও তাই অপাংক্তেয়, অঙ্কের এক্সট্রার মতো| যেদিন ক্ষমতা হয় দুটো ডিম টোস্ট করে দিই, তৃপ্তি করে খায় ওরা| হয়ত এই ক’দিন দোকান বন্ধ দেখে মনখারাপ করে বসে আছে|
মাত্র তিনদিন হল তুমি এখানে এসেছ, আর এখুনি পা লাই পা লাই ভাব? এখানেই থেকে যাও না… আমরা বুঝি তোমার কেউ নই! শুধু ওদের দেখলে হবে, আমাদের কে দেখবে শুনি? বলে যেন নিজেই অবাক হল সে, এমন অধিকারবোধ সে পেল কোথায়? সুকুমারীর ভালোবাসাই কি তাকে এই সাহসের অধিকারী করে তুলল?
তা কি হয়, মা? আমার ওই ঘরদুয়ার জুড়ে অভি’র বাবার স্মৃতি ছড়িয়ে! ওই গ্ৰামের মেঠো পথ, ওই গাছপালা, ওই ছোট্ট দোকান যে আমার প্রাণের দোসর, ওদের থেকে বি চ্ছিন্ন হয়ে কি আমি বাঁচতে পারি? শিকড় থেকে উপ ড়ে নিলে গাছ কি প্রাণে বাঁচে?
কিন্তু আমি… আমরা… আমাদের কথা কি তুমি একবারও ভাববে না? তোমাকে পেয়ে আমি পুরনো…
কি হয়েছে তোমার বলো দেখি! সন্ধ্যে থেকে খালি বলছ মাকে এখানেই থেকে যেতে… সবকিছু ছেড়ে মা এখানে থেকে গেলে কি এমন সুবিধা হয় তোমার? চোখে প্রশ্নচিহ্ন মাখিয়ে অভি তাকাল সম্রাজ্ঞীর দিকে| দুদিন আগেও যে মেয়ে তার ফ্ল্যাটে কোন অচেনা অতিথিকে আশ্রয় দিতে রাজি ছিল না, কোন মন্ত্রে তার এই অ দ্ভুত পরিবর্তন? তার সাদামাটা গ্ৰাম্য মা কি জাদু করল সম্রাজ্ঞীর ওপর? আমার মনে হয় মা যেখানে থাকলে সুখী থাকবে সেখানেই তাঁর থাকা উচিত| শুধু শুধু তাকে শেকড় থেকে উৎ খাত করার কোন দরকার নেই|
তুমি বুঝবে না, এগিয়ে গিয়ে শাশুড়ি মা কে জড়িয়ে ধরল সম্রাজ্ঞী| আমার মনের ভেতরে ঘৃ ণারা এতদিন জমতে জমতে পাহাড় হয়ে ছিল, অনেক চেষ্টা করেছি সেখান থেকে বেরোতে, পারি নি| কিছুতেই পারি নি| তোমার ভালোবাসার স্পর্শ পেয়ে সেই বাঁ ধন হয়েছে ছি ন্ন, আবার নিজের চারপাশের মানুষজনকে আমি ভালোবাসতে শিখছি, তাদের কষ্ট দুঃখগুলোকে শিখেছি অনুভব করতে| তুমি চলে গেলে যদি আবারো সেই বাঁধন আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরে….
একবার যে ভালোবাসতে শিখে যায় আর কোনকিছুর সাধ্যি হয় না তাকে হা রানোর| কিভাবে হা রাবে? ভালোবাসা অপরাজেয়, আর তুমি এখন ভালোবাসতে শিখে গেছ| তোমাকে হা রায় এমন সাধ্য কার?
তখন থেকে কি যে বলে চলেছ তোমরা আমি তো কিছুই বুঝে উঠতে পারছি না, চিন্তিত গলায় বলে অভিজিৎ, বড্ড ক্লান্ত লাগছে, ফ্রেশ হয়ে আসছি এখুনি| শোনো মা, ট্রেন কিন্তু কাল সকাল সাড়ে সাতটায়, জিনিসপত্র সব গুছিয়ে নিও, রিপোর্টগুলোও| যদি ডাঃ আচার্য্যি দেখতে চান? রিপোর্টগুলো এনে তুমি মাকে দিয়েছ তো সোনু?
দিয়ে দিচ্ছি| বিষণ্ণ কন্ঠে বলল সম্রাজ্ঞী, তুমি তাহলে শুনবে না, সত্যিই চলে যাবে এখান থেকে?
যেতে তো হবেই রে মা… আমার জন্য ওরা যে অপেক্ষায় আছে| কিছু মনে করো না, তোমায় ভুল করে তুই বলে ফেললাম| আসলে…
মা বুঝি মেয়েকে তুই করে বলতে পারে না? এই ক’দিনে তোমায় বড্ড ভালোবেসে ফেলেছি…. হাঁটু গেড়ে বসে হাতদুটো ধরে ফেলে সম্রাজ্ঞী, এইভাবে ছেড়ে দিতে একদম ইচ্ছে করছে না…. অন্ততঃ আরো কটাদিন থেকে যাও না মা|
পাগলি মেয়ে আমার| এবারটা যেতে দে… ওরে মেয়ে জানিস না বুঝি ছেড়ে যাওয়া যে আসলে ফিরে আসারই নামান্তর, আমিও কি তোকে কম ভালোবাসি? যাবি একদিন আমাদের ছোট গাঁয়ে অভিকে নিয়ে…. দেখবি সবুজ প্রকৃতি কি অকৃপণ হস্তে ঢেলে সাজিয়েছে নিজের ছোট্ট জনপদ|
নিশ্চয়ই যাব… তুমি অপেক্ষায় থাকবে তো আমার….
কি হল টা কি? ভেতর থেকে অভির বিরক্তিভরা গলা শোনা যায়, তোমাদের দেখছি কথাই আর শেষ হচ্ছে না… অফিস থেকে ফিরেছি, বড্ড খিদে পেয়েছে কিন্তু! আজ কি কিছু খেতে টেতে পাব? নাকি গল্প শুনেই পেট ভরাতে হবে? তেমন অসুবিধা থাকলে বলো রাস্তার ধারে সুতোর দোকান থেকে…
আবারো সুতোর দোকান? সম্রাজ্ঞী চোখ পা কায়… মা তোমার জন্য মোমো বানিয়েছে, আমি অপেক্ষা করছি| একসঙ্গে খাবে না বুঝি?
বাবু, তুই আমার একটা কথা শুনবি| তোর শাশুড়িকে একটিবার ফোন করে কালকের ট্রেনের সময়টা জানিয়ে দিস|
মনে মনে অবাকই হয় সম্রাজ্ঞী| মায়ের সঙ্গে শাশুড়ির ঠিক কি কথা হয়েছে সেদিন, জানে না সে| তবে এই মুহূর্তে সুকুমারীর কথা শুনে মনে হচ্ছে মায়ের নিশ্চয়ই কালকের জন্য কোন বিশেষ পরিকল্পনা আছে, তবে কি গার্গী সরকার শাশুড়ি মাকে সি অফ করতে স্টেশনে যাবেন বলে ঠিক করেছেন?
( ক্রমশ )
©️ Monkemoner dakbakso – Anindita
