#চেনা
#পর্ব_৮
রিপোর্ট মোটামুটি ভাল| গ্ৰামে বসেই দিব্যি চিকিৎসা চালানো যাবে| রিপোর্টে চোখ বুলিয়ে অভিজিতকে হোয়াটস অ্যাপ করে দিল, নিশ্চিন্ত হবে মানুষটা| এবার নিশ্চিন্ত মনে বাড়ি ফেরার পালা| ক্যাবে উঠে শরীরটা এলিয়ে দিল সম্রাজ্ঞী, যত ফিরছে বাড়ির দিকে, ততই বাড়ছে মনখারাপের পারদ| শরীর খারাপের ছুতোয়ও যদি মানুষটাকে কিছুদিন নিজের কাছে রাখতে পারত! কিন্তু সেও তো হওয়ার নয়| পরক্ষণেই নিজেকে শাসন করল সে, এ কি ভাবছে, রিপোর্ট ভাল এসেছে বলেই তো নিশ্চিন্ত, মানুষটা অসুস্থ হলে কি তার নিজেরই ভাল লাগত!
অফিস থেকে ফিরে ফ্রেশ হয়ে সম্রাজ্ঞী অন্যদিন ঘরে বসে ফোন বা ল্যাপটপে চোখ রাখে| নতুবা আলো বন্ধ করে অন্ধকারের ভেতর ডুবিয়ে রাখে নিজেকে| কখনো হাল্কা করে পছন্দের গান চালিয়ে দেয়| এভাবেই ব্যস্ততা ভরা জীবনের মাঝে নিজের জন্য সময় ব্যয় করে সে, এই মুহূর্তগুলো, এইটুকু সময় নিজের সঙ্গে থাকা… তাকে ডিপ্রেশনের হাত থেকে বাঁচায়| এই মুহূর্তগুলো উপভোগ করে সে…
কিন্তু আজ সে সবের কিছুই না করে সোজা চলে গেল রান্নাঘরে| হাল্কা হেসে সুকুমারীর দিকে তাকিয়ে বলল, আমি কি আপনাকে কোনরকম সাহায্য করতে পারি?
হাঁ হাঁ করে উঠলেন তিনি, এই তো মোটে দুজনের রান্না, তোমার ওই মেয়েটা, কি যেন নাম গুছিয়ে দিয়ে গেছে সব, আমি দিব্যি বাকিটা সামলে নিতে পারব| তুমি তো এখুনি এলে অফিস থেকে… অফিসে কতখানি পরিশ্রম করতে হয় আমি কি তার কিছুই জানি না ভেবেছ? রেস্ট করো| শরীর বিশ্রাম পেলে মনটাও যে ফুরফুরে থাকে! ঠিক সেই সময় চোখটা তাঁর সম্রাজ্ঞীর চোখের সঙ্গে আটকে গেল, থেমে গেলেন সুকুমারী| বুঝলেন, আজ মেয়েটা অন্তর থেকে চাইছে তাঁকে সাহায্য করতে| সামান্য হাসলেন, এসো আমার সঙ্গে|
এই যে দেখছ ছোট ছোট লেচি কেটে রেখেছি, আর এই বাটিতে রয়েছে পুর… আস্তে আস্তে লেচির ভেতর ভরে ফ্যালো দেখি| সম্রাজ্ঞী অবাক হয়ে সেদিকে তাকিয়ে রয়েছে দেখে হাসলেন, এসো আমি কয়েকটা বানিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছি|
চেষ্টা করতে লাগল সম্রাজ্ঞী| হচ্ছে, কিন্তু নিখুঁত হচ্ছে না| সুকুমারী যেমন নিখুঁত দক্ষতায় কয়েক সেকেন্ড পুর ভরে লেচি রেডি করে ফেললেন তেমনটা তো অনেক চেষ্টা করেও…. নিজের ওপরেই বিরক্তি আসছিল তার| অফিসের কাজ কিন্তু সে দিব্যি নিখুঁতভাবে উতরে দেয়| বসের প্রশংসাও পায়| অথচ আজ? এই সাধারণ কাজটুকুও ঠিকমতো করতে পারছে না কেন?
মুখের দিকে একবার তাকিয়েই মনের ভাব টের পেলেন সুকুমারী| ঠিকমতো না পারার কারণে মনখারাপে ভুগছে সম্রাজ্ঞী| উৎসাহ না দিলে হয়ত আর কখনোই রান্নাঘরে ঢোকার ইচ্ছে জাগবে না তার, হেসে বললেন, আমিও একসময় পারতাম না| লেচির মধ্যে পুর ভরা কি অত সহজ? শিখতে শিখতেই কত সময় চলে যায়|
ঘাড় বাঁকানো জেদী বুনো ঘোড়ার ভঙ্গীতে বলল সম্রাজ্ঞী, আমায় সান্ত্বনা দিচ্ছ তো, ভাবছ আমি বিশ্বাস করব! এসব আবার তুমি পারতে না, হতেই পারে না| কি সুন্দর রান্না করো তুমি, কাল রাতের চিকেনটাই তো, মুখে দিলে মন ভরে যায়| আমাকে দ্যাখো রান্নাবান্না তেমন একটা পারিই না…. কেন পারি না?
যে মেয়ে অফিসে গিয়ে অত লোকজন, বড় বড় কাজকর্ম একা হাতে সামলে আসছে, সে সামান্য রান্না পারবে না হতেই পারে না| মনে পড়ে ছেলেবেলার কথা? পড়াশোনা যখন করতে, তখন সিলেবাসের এক একটা জিনিস মনে রাখার জন্য কুড়িবার, তিরিশবার এমনকি পঞ্চাশবার অবধি পড়তে হত… কেমন লাগত বলো দেখি?
খুব বোরিং| মনে হত কেন যে এতবার পড়তে হচ্ছে? একবারেই কেন মাথায় গেঁথে যাচ্ছে না… তাহলে সেই সময়টায় টিভি দেখা, গান শোনা কিংবা বই পড়া যেত… সেসব কিছু না করলেও খানিক সময় নিজের সঙ্গে কাটানো যেত|
তবু পড়তে তো মন দিয়ে… তারপর যখন বড় পরীক্ষার সময় আসত, দিনের পর দিন ঘন্টার পর ঘন্টা বসে বসে টেস্ট পেপার সলভ করতে? চেনা অঙ্ক, থিয়োরেম, ফর্মুলাগুলো ঝালিয়ে নিতে… ধৈর্য্যের পরীক্ষা দিতে রোজ?
ইনি ঠিক কি বোঝাতে চাইছেন সম্রাজ্ঞীর মাথায় ঢুকল না| এককালে নিয়মিত টেস্ট পেপার সলভের কথা সে প্রায় ভুলেই গিয়েছিল কর্পোরেট প্রতিযোগিতার জাঁতাকলে পড়ে… কিন্তু ঘরোয়া রান্নার সঙ্গে সময় ধরে নিয়ম মেনে টেস্ট পেপার সলভের কি সম্পর্ক? তবুও একটা উত্তর তো দিতেই হয়, তাই উদাসীন ভঙ্গিতে বলল, সে তো করতেই হত| ফাইনাল এক্সামে ভাল মার্কস তুলতে গেলে এগুলো তো করতেই হবে, নইলে বাকিদের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ব যে…
রান্নাটাও ওই একই রকম ব্যপার| যতটা ধৈর্য্য নিয়ে, যত্ন আর ভালোবাসা মিশিয়ে সব্জীর সঙ্গে মশলা কষাবে, রান্নাও ততখানি সুস্বাদু হবে| এখানেও প্রতিযোগিতা আছে কিন্তু!
অবাক হয়ে বলল সম্রাজ্ঞী, এখানেও প্রতিযোগিতা?
অবশ্যই| তবে এই প্রতিযোগিতা কিন্তু অন্য কারোর সঙ্গে নয়, নিজের সঙ্গে নিজের| দিনে দিনে দেখবে তোমার রান্না ইম্প্রোভাইজ হচ্ছে| তোমার হাতের ছোঁয়া পেয়ে পদগুলো আগের থেকে আরো সুস্বাদু হয়ে উঠছে| নুন, মিষ্টি আর চেখে দেখতে হচ্ছে না… তেল জলের মাপ অনায়াসেই আন্দাজ করতে পারছ| এখানে তথাকথিত ভাল মার্কস নেই কিন্তু পুরস্কার আছে|
অবাক চোখে শাশুড়ির দিকে তাকাল সম্রাজ্ঞী| হেসে ফেললেন সুকুমারী, বয়স বাড়লে কি হবে মনের দিক থেকে মেয়েটা এখনো বাচ্চাই রয়ে গেছে| তাই বোধহয় এই ক’দিনেই তাঁর মেয়েটার ওপর বড্ড মায়া পড়ে গেছে| আলতো করে মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন, খাওয়া শেষে প্রিয়জনের তৃপ্তিমাখা হাসিমুখ| এর চাইতে বড় পুরস্কার পৃথিবীতে আর কিছু আছে নাকি?
( ক্রমশ )
©️ Monkemoner dakbakso – Anindita
