#চেনা
#পর্ব_৩
টোস্ট, অমলেট আর মিল্কশেক টেবিলে সাজানো দেখে বেশ একটু অবাকই হল সম্রাজ্ঞী| কাল রাত থেকে পেটে সলিড কিছু পড়ে নি, তাই খিদেটাও পেয়েছে জব্বর| অফিস যাওয়ার তাড়া ছিল, কোনকিছু না ভেবেই চেয়ার টেনে খেতে বসে পড়ল সে| এমন সময় দেওয়ালে একটা ছোটখাটো ছায়া পড়ল…. চকিতে মনে পড়ে গেল বাড়িতে একজন নতুন অতিথির আগমন ঘটেছে, অভি’র মা| পলকে মেজাজটা খিঁচ ড়ে গেল তার… চিৎ কার করে উঠল অভি তুমি কোথায়? আজ কি অফিসে যাবে না বলে ঠিক করেছ?
ছায়াটা সামান্য কাঁপল, না তাকিয়েও অনুভব করতে পারল সম্রাজ্ঞী| কে যেন তার মুখ থেকে বলিয়ে নিল, আপনি কি কিছু বলবেন? অভি কোথায়?
এগিয়ে এল ছায়াটা| সাদামাটা ছাপা শাড়ি পরনে| হাতে দু গাছি চুড়ি| অবাক হয়ে চেয়ে দেখল, সে মুখে কোনো কর্তৃত্বব্যঞ্জক অভিব্যক্তি নেই, নিতান্তই সাধারণ ঘরোয়া এক মানুষের প্রতিচ্ছবি| ঈষৎ কুন্ঠিত স্বরে বললেন, সকালের ট্রেনে ফিরে যেতে চাইল তপন, তাই বাবু ওকে স্টেশনে ছাড়তে গেছে| অনেকদিনের বন্ধু তো, বলল চল এগিয়ে দিয়ে আসি| অফিস থেকে ক্লান্ত হয়ে ফিরছ কালকে, ঘুমোচ্ছিলে| তাই আর ডাকে নি বোধহয়….
ঘুমোনোর বিষয়টা অজুহাত| ভাল করেই জানে সম্রাজ্ঞী| অভি জানে অফিস কামাই করে বন্ধুকে স্টেশনে ছাড়তে যাওয়ার প্রস্তাব সম্রাজ্ঞী কিছুতেই মেনে নেবে না, তাই… না বলেই| কিন্তু নিজের মনের কথা সম্পূর্ণ অচেনা এক মানুষের সামনে বলা যায় না, তার ওপর ভদ্রমহিলা অভির মা| কথা না বললেও মুখের ভাবে স্পষ্ট বুঝিয়ে দিল অভির এ হেন আচরণে সে ভীষণই বিরক্ত| নিজের অভিজ্ঞতায় সম্রাজ্ঞী জানে, ভা ঙন এভাবেই আসে, ধীর পায়ে| তারপর বাঁধ ভা ঙা বন্যা হয়ে ভা সিয়ে নিয়ে যায় নগর, জনপদ| সম্পর্কও|
কুন্ঠিত স্বরে বললেন বৃদ্ধা, তোমার কি আর কিছু লাগবে মা?
মানে? কথাগুলো মাথায় পৌঁছতে খানিক সময় লাগল সম্রাজ্ঞীর|এতক্ষণে চোখ তুলে বৃদ্ধার দিকে তাকাল সে, এই খাবারগুলো আপনি বানিয়েছেন? আমি ভেবেছিলাম যাওয়ার আগে অভি আমার জন্য ব্রেকফাস্ট বানিয়ে রেখে গেছে|
একটু বুঝি ভ য় পেলেন মহিলা| শুনতে পাওয়া যায় না প্রায় এমন স্বরে বলে উঠলেন, সকালের খাবারটা ঠিকমতো হয় নি বোধহয়? কিন্তু আমি এসব বানাতে জানি, বিশ্বাস করো| অনেকদিন ধরে বানাচ্ছি| চায়ের দোকানে এসবই তো বানাতাম|
চায়ের দোকান? সম্রাজ্ঞী যেন অবাক হতেও ভুলে গেল| আপনি… আপনি চায়ের দোকানে কাজ করতেন? এই প্রথমবারের জন্য নিজের হঠকারী সিদ্ধান্তের জন্য আফশোস হল তার, বিয়ের আগে অন্ততঃ অভির পারিবারিক ব্যাকগ্ৰাউন্ড যাচাই করা উচিত ছিল| মনে হচ্ছে সেটা না করে সে ভুলই করেছে| অনেকবার অভি তাকে বলতে চেয়েছে স্ট্রাগলিং পিরিয়ড সম্বন্ধে, শুনতে চায় নি সে, বলা ভাল গুরুত্ব দেয় নি| বর্তমানে বাঁচতে ভালোবাসে সম্রাজ্ঞী, বর্তমানেই বাঁচে|
কাজ কেন করব মা? ফতেপুকুরে আমাদের নিজেদেরই তো সাজানো গোছানো চায়ের দোকান ছিল| বাবুর বাবা চা বিক্রি করে সংসার চালাতেন| ওই চা খেয়েই তো একদিন… সামান্য থামলেন, বোধহয় নিজেকে গুছিয়ে নিলেন খানিক, আমার সঙ্গে বিয়ের পর চা বিস্কুটের সঙ্গে ঘুগনি, মামলেট, ডিম টোস্ট চালু করি…. তখন থেকে বিক্রি বাটাও বেড়েছিল কিছুটা! কিন্তু হঠাৎ করে এক গাড়ির ধা ক্কায়… মানুষটা সে ধা ক্কা আর সামলে উঠতে পারল না| এতদিন আগেকার ঘটনা, তবু তার অভিঘা ত কি তী ক্ষ্ণ! সেই অভিঘা তেই বোধ করি ভদ্রমহিলা কেঁপে উঠলেন|
আপনি বসুন, প্লিজ| কতদিন বাদে এমন কোমল স্বরে কারোর সঙ্গে কথা বলল সম্রাজ্ঞী নিজেও জানে না সে, আছেন তো এখন কিছুদিন| একদিন সময় করে আপনার জীবনের গল্প শুনব| আজ কোম্পানির নামী ক্লায়েন্টের কাছ থেকে অ্যাপ্রুভাল… বলেই বুঝল বড্ড ভুল করে ফেলেছে সে, জরুরি একটা কাজ আছে| আমায় এবার বেরোতে হবে|
নিভাঁজ ঝকঝকে পোশাকে বেরোনোর সময় দেখল দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছেন সুকুমারী, হাতে লাঞ্চ বাক্স| কাজের ফাঁকে সময় করে খেয়ো কিন্তু| পেট কাঁ দলে কাজে গতি আসে না|
কি ভেবে যেন টিফিন বাক্সটা হাতে নিল সম্রাজ্ঞী| কিছু মানুষের ব্যবহারের মধ্যেই স্নেহের এক অনাবিল প্রকাশ থাকে, সুকুমারী সেই বিরল গোত্রীয় মানুষদেরই একজন| টের পেল সম্রাজ্ঞী, কঠিন হৃদয় ভালোবাসার স্পর্শ পেয়ে আবারো দ্রব হয়ে যাচ্ছে| নিজেকে বোঝাল সে, কিছুতেই এমনটা হতে দিলে চলবে না| দিনের শেষে সব শাশুড়িরাই এক, সবাই চায় অন্দরমহলের কর্তৃত্ব নিজের হাতে রাখতে|
টিফিন ব্রেকে লাঞ্চ বক্স খুলে মনটা ভাল হয়ে গেল সম্রাজ্ঞীর| বাবার সঙ্গে সমস্যার পর তারা যখন মায়ের ফ্ল্যাটে চলে এল, তখন তাকে দেখাশোনার জন্য মা রতুপিসিকে রেখেছিল| কখনো সে রা গ করলেই, আলু, পিঁয়াজ, ডিম আর বাদাম দিয়ে কি স্বাদু হলদে রঙা চাউমিন বানিয়ে দিত রতুপিসি, নিমেষের মধ্যে ভাল হয়ে যেত মন| মাঝেমধ্যে ওই সুস্বাদু চাউমিন খাওয়ার লোভে সে এমনি এমনিই মানুষটার ওপর রা গ দেখাত| এতদিন বাদে আবারো সেই পুরনো চাউমিনের গন্ধ, এই গন্ধের মধ্যে কিশোরী বেলার সুবাস মাখামাখি হয়ে আছে|
নিজের কিশোরী বেলার গল্প আলাদা করে কখনো তো করে নি সে অভির কাছে, তবে সুকুমারী এই হলুদরঙা চাউমিন বানালেন কিভাবে? কিভাবে জানলেন তার মনের কথা? তবে কি মা’ই ঠিক বলে? মা মাত্রেই ছেলেমেয়েদের মনের কথা পড়তে পারে| তবে কি সুকুমারী তাকে বৌমা নয়, নিজের মেয়ে বলেই ভাবেন? ভাবনাটা মাথায় আসতেই নিজের মনেই সে হেসে ফেলল, না শাশুড়ি কখনো মা হয়, না বৌমা কখনো মেয়ে… গল্প আর বাস্তবের মধ্যেকার ফারাক যে যোজনের…
( ক্রমশ )
©️ Monkemoner dakbakso – Anindita
