#চেনা
#পর্ব_২
কিন্তু যেমনই হোক বাড়িতে আগত অতিথি বলে কথা! আর অতিথির সামনে উচ্চস্বরে কথা বলা যে ক্লাসলেস লোকজনের কাজ, তা সম্রাজ্ঞী জানে এবং মানেও| সেদিন রাতে মাথা ধরার অজুহাতে সে আর খাবার টেবিল অবধি এল না, ক্লান্তির দোহাই দিয়ে স্টাডিতে গিয়ে চুপচাপ শুয়ে পড়ল| বাথরুম লাগোয়া লম্বা অ্যান্টি চেম্বারকে সে নিজের স্টাডি বানিয়ে নিয়েছে, প্রয়োজনে ওখানেই অফিসের কাজকর্ম সারে| ছোট একটা সিঙ্গেল বেডও রেখেছে, হাইড্রোলিক| প্রয়োজনমতো তোলা নামানো যায়| আজ সেখানেই শুয়ে পড়ল, অভিজিতের বোঝা দরকার এই সংসারটা সম্রাজ্ঞীর, তাই শেষ সিদ্ধান্ত সেই নেবে|
ভেবেছিল অতিথি ঘুমিয়ে পড়লে মাঝরাতে অন্ততঃ অভিজিৎ আসবে তার মান ভাঙাতে, কিন্তু অবাক হয়ে দেখল সে, পুরনো বন্ধুর সঙ্গে দিব্যি ড্রয়িংরুমে বসে খোশগল্পে মত্ত| ঘড়ির দিকে তাকাল রাত দুটো, বরাবর নিয়মানুবর্তিতা মেনে চলা মানুষের কি হাল! পুরনো বন্ধু আসার আনন্দে কাল বুঝি অফিসেও যাবে না, এখনই ঠিক করে নিয়েছে| একজন যে মান করে আলাদা ঘরে আছে, সেই খেয়াল বুঝি আর নেই তার… নাকি এমন স্বাধীনতাই গো পনে চেয়েছিল সে, আর হঠাৎ পড়ে পাওয়া এই স্বাধীনতার স্বাদ চৌদ্দ আনার ওপর ষোলো আনা… চেটেপুটে উপভোগ করছে| তবে কি সম্রাজ্ঞীরই ভুল? মনে মনে অভিজিৎ এখনো সেই মাটির সোঁদা গন্ধমাখা গ্ৰামের সহজ সরল ছেলেটিই আছে, সভ্যতার পোশাকে সেজেগুজে নিজের ভেতরকার মানুষটাকে লু কিয়ে রাখে সে লোকচক্ষুর অন্তরালে!
পরেরদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে ঘরদোরের চেহারা দেখে চমকে গেল সম্রাজ্ঞী| উইক ডেজ’গুলো দুজনেরই অ সম্ভব ব্যস্ততায় কাটে, কোনক্রমে নিজেদের রেডি করে বেরিয়ে পড়ে অফিসের উদ্দেশ্যে| ডাস্টিং, ক্লিনিং উইকেন্ড ছাড়া হয় না, মাসির কাছে চাবি দেওয়া থাকে, ঘরদোর পরিস্কার করে রাতের ডিনার বানিয়ে চলে যায় সে…. এটুকুই| অন্য কিছু খেতে হলে ফুড অ্যাপ নয় গাড়ি নিয়ে টুক করে বেরিয়ে পড়া, কিংবা অফিস থেকে ফেরার পথে একটু দাঁড়িয়ে টেক অ্যাওয়ে কাউন্টার থেকে নিয়ে আসা, জীবন কেটে যাচ্ছিল এভাবেই কিন্তু আজ….
অবশ্য তাড়াতাড়ি ফিরতে পারলে মাঝে মধ্যে রাতের রান্নার দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নেয় অভিজিৎ| কিন্তু সে আর কদ্দিন?
ভাঙা পরিবারের মেয়ে সম্রাজ্ঞী| ছোট থেকে দেখেছে মা-বাবার মধ্যে ঝ গড়া, অশান্তি… পরস্পরকে দো ষারোপ করে কথা বলা| আর এই কাজে সবচাইতে বেশি বাবাকে উৎসাহ দিত ঠাম্মা| কে জানে কেন মায়ের চাকরি করাটা কোনদিনই ঠাম্মা সহ্য করতে পারত না, খালি বলত চাকরি করা মেয়ে আবার ঘর সংসার সামলাতে পারে? কতদিন স্কুল থেকে ঘরে ফিরে দেখেছে সে ঠাম্মা আর বাবাতে ফিসফিসিয়ে কথা হচ্ছে, তারপর অফিস থেকে মা বাড়ি ফিরতেই তুল কালাম কান্ড, ছোট্ট মেয়েটা ভ য়ে সিঁ টিয়ে থাকত একপাশে!
দুজনের অশান্তির মাঝে ঠাম্মা বিড়বিড় করত, আগেই বাবুকে বলেছিলাম, আমার পছন্দের মেয়েকে বিয়েটা কর, দেখবি তোর সংসার মাথায় করে রাখবে| শুনল কথা? নিজের পছন্দে বিয়ে করার শখ হয়েছিল বাবুর, হল তো এবার?
ছোট্ট সম্রাজ্ঞী কথার মা রপ্যাঁচ বুঝত না কিছুই…. শুধু বলত, আমার মা খুব ভাল| মাকে কিছু বলবে না তুমি| তুমি পচা… সবসময় বাবাকে পচা পচা কথা বল| তাই তো মাকে বাবা বকে….
বিরক্ত মুখে ঠাম্মা বিড়বিড় করত, যেমন মা, তেমনই তো ছাঁ হবে| সৃষ্টি ছা ড়া পরিবার একেবারে| শা সনের কোন বালাই নেই… নিজের মতো মেয়েটাকেও শিখিয়েছে বড়দের মুখে মুখে ত র্ক করতে|
পরেরদিন প্রথমবারের জন্য বাবার হাতে সে মা র খেয়েছিল| কচি গালে বসে গিয়েছিল পাঁচ আঙুলের ছা প| আর সহ্য করে নি গার্গী, ব্যাগ গুছিয়ে ঘর ছেড়েছিল, মেয়েকে নিয়ে উঠেছিল নিজের ফ্ল্যাটে| প্রাইম লোকেশনে বাবার দোতলা বাড়ি ছিল, তিন ভাইবোনের সম্মতিতে বাড়ি ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল প্রমোটারের হাতে, তাতে বাকি দুই ভাইবোনের মতো গার্গীর ভাগেও জুটেছিল দুটো ফ্ল্যাট, তার মধ্যে একটা বেশ বড় আর দক্ষিণ খোলা| ভেবেছিল ভাল দাম পেলে বেচে দেবে, টাকাটা ফিক্সড করে দেবে সম্রাজ্ঞীর জন্য| কে জানত ভাগ্যের পরিহাসে সেখানেই একদিন উঠতে হবে তাকে….
টানা চার বছর ধরে চলেছিল পরস্পরের প্রতি কাদা ছো ড়াছুড়ি| শেষ পর্যন্ত সম্রাজ্ঞীর কাস্টডি পেয়েছিল গার্গী| ততদিনে সে নিজেকে অনেকটাই গুছিয়ে নিয়েছে| নিজের ভাগে পাওয়া আরেকটা ফুল ফার্নিশড ফ্ল্যাট মোটা টাকায় ভাড়া দিয়েছে এক সম্ভ্রান্ত পরিবারকে| চাকরির মাইনে আর বাড়িভাড়ায় মেয়ের আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়েছে খানিক….
ওই ঘটনাই বুকে ধরিয়েছিল ভ য়, স্কুল, কলেজ তো বটেই ইউনিভার্সিটি অবধি যত প্রেমের প্রস্তাব পেয়েছে সে বাতিল করে দিয়েছে স্বেচ্ছায়, এটা ভেবে যে, আরেকটা গার্গী সরকার কোনমতেই হতে পারবে না সে… এখন মনে পড়ে না ঠিকমতো অভিজিৎ কিভাবে যেন তার জীবনে এল, আর তুমুল স্রোতে ভাসিয়ে নিয়ে গেল| প্রতিজ্ঞার কথা ভুলে গেল সে, ভালোবেসে ফেলল| খড়কুটো প্রতি রোধ কি বন্যার জল আটকাতে পারে?
বিয়ের সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর মা বারবার বলেছিল সম্রাজ্ঞীকে সংসার যখন করবে ভেবেছ, তখন খোলা মনে করো| সংসার মানে আপনি কোপনি নয়, সংসার মানে দুই পরিবারের মেলবন্ধন| তখন অত বোঝে নি সে… অভিজিতকে নিজের করে পাওয়ার আনন্দে মশগুল ছিল|
নিজের অবস্থানও মেয়ের কাছে স্পষ্ট করে দিয়েছিল গার্গী সরকার, এতদিনে আমার যাত্রাপথ সম্পন্ন হল| তোমার মানুষ করেছি, যথেষ্ট বুদ্ধি বিবেচনা আছে তোমার, বড় হয়েছ তুমি| সিদ্ধান্ত নিতে শিখেছ| এবার আমার ঘুরে বেড়ানোর পালা… দেশ দেশান্তরে| কোনরকম বন্ধনে আবদ্ধ হতে আর রাজি নই, তাই তোমার সংসারে থাকার জন্য কখনো ডেকো না আমায়… পারস্পরিক মতে না মিললে কি ভ য়ঙ্কর পরিণতি হয়, তোমার তা অ জানা নয়| দ্বিতীয় গার্গী সরকার হিসেবে তোমায় দেখতে চাই না| দুজন মানুষ একসঙ্গে থাকতে গেলে ঠো কাঠুকি লাগবেই, সেটা ভাবনার বিষয় নয়, তবে বড় কোন সমস্যা হলে অবশ্যই জানাবে আমায়, এই ফ্ল্যাটের দরজা তোমার জন্য চিরদিন খোলা থাকবে, সে আমার বর্তমানেই হোক, কিংবা অবর্তমানে|
মনে পড়ে গিয়েছিল সেই ভ য়ঙ্কর দিনগুলোর কথা| দিনগুলোর কথা যে সে প্রাণপণে ভুলে থাকতে চায়| টানা পোড়েনের মাঝে মায়ের বুকে মুখ গুঁজে শুয়ে থাকত সম্রাজ্ঞী, আর বিড়বিড় করত, বাবা আমাকে নিয়ে চলে যাবে না তো… মা? তোমায় ছাড়া একটা দিনও আমি থাকতে পারব না|
বুকের মাঝে জড়িয়ে নিত মা, বানিয়ে আনত তার পছন্দের ফ্রেঞ্চ টোস্ট| এক টুকরো খেত আর পরের টুকরো তুলে দিত মায়ের মুখে| মা মেয়ের খুনসুটিতে ঘরের গুমোট আবহাওয়া কখন ফুরফুরে হয়ে যেত টের পেত না সম্রাজ্ঞী|
বিয়েতে রাজি হওয়ার আগে অভিজিতকে সে একটাই শ র্ত দিয়েছিল| সংসার হবে কেবল দুজনের, না তাতে সম্রাজ্ঞীর পেরেন্টেস’র ছায়া পড়বে, না অভিজিতের| এতদিন পর্যন্ত শর্ত মেনে সবকিছুই মসৃণভাবে চলছিল কিন্তু আজ হঠাৎ এক ঝ ড়ে সব বুঝি উল টপালট হয়ে যায়….
( ক্রমশ )
©️ Monkemoner dakbakso – Anindita
