#জনম_জনমে_আমি_যে_তোমার_(০৩)
#লেখিকা_সুহাসিনি_ফাতেহা
সময় যেন নদীর স্রোতের মতো চলমান। এর ভেতরে এক সাপ্তাহ পাড় হয়ে গেলো। তুবার জীবনটা যেন একটা জোকারে পরিনিত হয়েছে। তার একটুও শান্তি নেই খায়তে বসলে ঘুমাতে যায়লে সবসময় চুক্তি করা লোকটার ফোন আসে মাঝে মাঝে তো বেডরুমে ও ডাকে। নিজের কাপর কাঁচানোর কাজ,, হাত পা টিপে দেওয়া, আরো কত কি। কত ইনিয়ে বিনিয়ে বোনের শশুর বাড়ি যেতে হয় তার। তখন ড্রয়িংরুমে খেতে বসেছে মা বাবা ভাই ভাবির সাথে,
অর্ধেক খেতে না খেতেই তার ফোনটা অনর্গল বাজছিল। কান ঝাঁ ঝাঁ করার মতো। তুবা ভয়ে ভয়ে ফোনটা রিসিভ করে। এমন ও হতে পারে যদি ফোন রিসিভ না করে বাড়িতে চলে আসবে। তৎক্ষণাৎ সেটা ভেবে ও ফেলে তুবা,, কলিং বেল বাজাবে, অতঃপর তার মা,,বা ভাবি গিয়ে দরজা খোলে দিবে তখন এসে তাকে সবার মাঝে টানতে টানতে নিয়ে যাবে। ইমিডিয়েট, এটা কখনো হতেই পারে না। সবাই খাওয়া এবং কথাবার্তায় ব্যস্ত ছিল। তুবার ফোন বারবার বেজে উঠায় তৎক্ষনাৎ সবার মনোযোগ ওর ওপরে পরলো। তাহিনূর বেগম ওর পাশের চেয়ারেই বসে ভাত খাচ্ছিলো,, তিনি তুবার প্লেটে গরুর মাংসের কালো ভুনা দিচ্ছিলেন হঠাৎ তিনি স্বয়ংক্রিভাবে ভ্রু কুঁচকে বলল,
কিরে কে এত কল দিচ্ছে ধরছিস না কেন?
তুবা কান ঝাঁঝিয়ে রুঢ় গলায় বলল,
কে আর তোমার আদরের মেয়ের—”
এতটুকু কথা বলতে গিয়ে আবার থেমে যায় তুবা। কি বলতে যাচ্ছিলো সে। আল্লাহ বাঁচায়ছে। আল্লাহ যদি পুরো কথাটা এখন মুখ ফসকে বলে ফেলতো না জানি মা বাবা ভাই ভাবি কি ভেবে বসতো…
তুবা ইনিয়ে বিনিয়ে তখন বলল,
স..স্যার আম্মু স্যার ভার্সিটির কোনো পড়ার কথা জিজ্ঞেস করবে হয়তো….
তো কল তুলছিস না কেন? দেখ কি জন্য কল করেছে?
হ..হে আম্মু তুলছি….
কল রিসিভ করতে না করতেই ওপাশ থেকে গমগমে ভারী গলায় বলল,
কি ব্যাপার চুক্তির কথা ভুলে গেছো? ফোন তুলছিলে না কেন? এত তাতাড়াড়ি হাঁফিয়ে গেলে হবে। কয়বার ফেন করেছি একটু দেখো তো।
হে স..স্যার আসলে আমি ভাত খাচ্ছিলাম তো তাই আরকি বলেন কি বলবেন,,, পড়ার বিষয়ে বলার থাকলে তাড়াতাড়ি বলুন…..
ওহ তাহলে শুনো, কাল দশটায় শাড়ি পরে আসবে,, আমি ঘুরতে যাবো ফ্রেন্ডদের সাথে,, সেখানে আমার অসিসট্যান্ট হিসাবে তুমি আমার পাশে পাশে থাকবে, যখন যা প্রয়োজন হবে সাথে সাথে সামনে নিয়ে আসবে…
জ্বি স্যার .. শাড়ি পরতে হবে কেন?
আমি বলছি মানে পরবে। তোমাকে আমি নিলামে কিনে নিয়েছি। এখন বললাম না আমি উঠতে বললে উঠবে বসতে বললে বসবে একটু এদিক ওদিক হবে জানোই তো আমি কি করতে পারি…
জ্বি স্যার পড়া শিখে আসবো। ও.ওকে ওকে আসসালামুআলাইকুম এটা বলেই
তুবা টুংটুং করে কেটে দিলো। তুবা বেশ বুঝলো হিউমিলিয়েট করা মানুষের রক্তে মিশে থাকে। লোকটা ও তাদেরই একজন। কল কাটতে না কাটতেই তুবার ভাবি বলল,
কি ব্যাপার তুবা, স্যার শাড়ি পরে যেতে বললো কেন?
তুবা যেন কথার খেয় হারিয়ে ফেলল। তুতলিয়ে বলল,
এই আর কি ..কাল নাকি ভার্সিটিতে একটা অনুষ্ঠান আছে জানোই তো আমি ভালো গান পারি,,, আমি আজ যায় নি তাই স্যার জানিয়ে দিলো…
তুবার ভাবি মহনা মুচকি হেসে বলল,
ওহহ,
তুবা আর কথা না বলে অর্ধেক খেয়ে হাত ধুঁয়ে চলে গেল।
*****
সকালে যখন তুবার ঘুম ভাঙলো তখন চারপাশ নিস্তব্ধ হয়ে আছে। রাতের কথা মনে আসতেই তড়িগড়ি করে দেওয়ালে টিক্ টিক্ আওয়াজে চলতে থাকা ঘড়ির দিকে তাকায়। না সকাল বেশি হয় নি সাত টা ত্রিশ মিনিট,, কিন্তু এই সাতটা ত্রিশ মিনিট ও তুবার কাছে খুব বেশি মনে হলো। একটু লেট হলেই ব্যাটা তাকে ছাড় দিবে না। নিভুনিভু চোখে হাই তুলে উঠে বসল।
*****
তুবা একটা ধূসর রঙের কারুকাজ করা শাড়ি পরেছে। সাথে শর্ট স্লিভ পাতলা ব্লাউজ। তুবা আশমীনের সাথে এক গাড়ি করে যাচ্ছে, কোথায় যাচ্ছে, কোথায় নিয়ে যাচ্ছে ওসব কিছুই জিজ্ঞেস করলো না তুবা। যেহেতু সে অসিসট্যান্ট তাই চুপচাপ সব কিছু মেনে নিচ্ছে। কোনদিন যে এর থেকে মুক্তি পাবে কে জানে। লোকটা তো তাকে বলছিলো যাকে সে ড্রাইভিং করে। অসিসট্যান্ট বলে সে গাড়ি চালাতে হবে, কিয়ৎক্ষন আগে এটা নিয়ে কয়েকখানি কথা কাটাকাটি হলো আশমীনের সাথে। এখন চুপচাপ জানালার বাহিরে তাকিয়ে আছে।
তখন আশমীন বিদ্রুপ কণ্ঠে বলল,
তো অসিসট্যান্ট সাহেবা তোমার কি এমন ব্লাউজ পরতে খুব বেশি ভালো লাগে,, নাকি আর ছিলো না…
তুবা খানিকটা চমকে উঠলো সে কথায়। এমনিতে তার মাথার উপর আকাশ ছুঁইছুঁই রাগ কিছুক্ষণ আগের ঘটনায়।
আমি কি পরব না পরবো সেসব আপনার ভাবার প্রয়োজন নেই আশা করে। নিজের ছরকায় তেল দিন।
আশমীন দমে গেল না। তুবার কথায় পাল্টা জবাবে বলল,
“ওহ, ঠিকই তো বললাম! একটু কড়া লাগলো বুঝি? তুমি এমন খোলামেলা ব্লাউজ পরে পিঠ গলা হাত দেখিয়ে ঘুরে বেড়াবে, আর কেউ কিছু বলতে পারবে না। মামাবাড়ির রাজকন্যা নাকি?
বাই দ্যা ওয়্যে, শুধু আমি না যে কারোই এখন তোমার দিকে চোখ যাবে তোমাকে আমি শাড়ি পরে আসতে বলছি এভাবে খালি গায়ে না….
তুবা ক্ষেপে গিয়ে বলল,
চুপ করুন,, আর একটা কথা বলবেন এক্ষুনি নেমে যাবো। কি ভাবছেন টা কি আপনি, যা ইচ্ছে তাই বলবেন, যখন যা ইচ্ছে ডাকবেন, কাজের বোয়ার মতো কাজ করাবেন আমি কি আপনার বিয়ে করা বউ আশ্চর্য ব্যাপার, আজই শেষ চুক্তি আর কোনো লেনদেন থাকবে না আমাদের মাঝে…
ও হ্যালো,, চুক্তি এখনো শেষ হয় নি। তোমার সাথে আমার কথা ছিলো আজকের পর থেকে যতগুলো দিন আসবে,, এক সাপ্তাহ দু সাপ্তাহ না সেটা,, এখন থেকেই দেখছি ফাঁকি দেওয়ার টালবাহানা খুঁজে বেড়াচ্ছো।
শান্ত অথচ নিরেট ছিলো কথাটা…
কটাক্ষটা আপাতত গায়ে মাখলো না তুবা। আশমীনের সে কথার কোনো জবাব দিলো না তুবা। খুব দ্রুত এর এটা বিহীত করেই ছাড়বে সে। আর সেটা যেভাবেই হোক। তাকে সহজ সরল পেয়েছে ভেবেছে, মোটেই না…
*******
সুমদ্র আশেপাশে তখন মানুষ জনের অনেক ভীড়। অদূর থেকে হালকা হিমেল বাতাস মন প্রাণ ছুঁয়ে যাওয়ার মতো। গাড়ি থেকে নেমে কয়েকটা ছেলে মেয়ের দিকে এগিয়ে যায় আশমীন। আগত তার সেই ফ্রেন্ড গুলোই হবে। তুবা এদিক ওদিক তাকিয়ে হাটছে। আশমীন সেখানে যেতেই সবার সাথে এক এক করে কোশল বিনিময় করলো।
তখন সেখান থেকে অন্য একটা ছেলে বলল,
কিরে মামা, এটা আমাদের ভাবি নাকি…
তুবা সঙ্গে সঙ্গেই আশমীন কিছু বলার আগে কিছু বলতে যাচ্ছিলো,,তখন আশমীন বিদ্রুপ কণ্ঠে বলল,
নারে ও আমার অসিসট্যান্ট, আমার সব কাজ ও করে,
কিহহহ,
এত সুন্দর একটা মেয়ে তোর অসিসট্যান্ট, ভাই কি বলছিস, আমাদের কপালে তো একটা গালফ্রেন্ড ও জোটে না,, আর তুই সোজা অসিসট্যান্ট বানিয়ে নিলি সিরিয়াস লি ব্রো….
তখন আশমীন বলল,
আরে চিল ব্রো,,
আমার অসিসট্যান্ট মানে তো তোদের ও অসিসট্যান্ট, একদিন তোর কাছে, রাখ আমার পরিবর্তে, ফিডব্যাক পাবি….
তুবার চোখের আকৃতি বৃহৎ থেকে বৃহৎতাকারে দারণ করলো। বেশ অপমানিত হলো সে। রাগে তুবার কান্না চলে আসছে যেনো। কোনো উপায়ন্তর না পেয়ে হনহনিয়ে সেখান থেকে চলে আসে সে,,
অজ্ঞতেই তার চোখ ছলছল করে উঠে।
..
কিরে দোস্ত মেয়েটা চলে গেলো কেন রে?
আশমীন নিজে ও একটু চিন্তিত হয়ে বলল,
তোরা দাড়া আমি দেখে আসছি….
আশমীন যেতে যেতেই তার আগেই কেউ তুবাকে সরিয়ে ফেলল সে জায়গা থেকে। এত মানুষের ভীড়ে যেন চোখের সামনেই উধাও হয়ে গেল।
চলবে।
