#প্রণয়_প্রত্যাবর্তন🖤 [পর্ব-১৯]
~আফিয়া আফরিন
রায়ের পরবর্তী সময়টা অবাস্তব নিস্তব্ধতায় থমকে গেল। আদালতের বারান্দায় ডুকরে ডুকরে কান্নার শব্দ আর ভারী বুটের আওয়াজ। প্রণয় আর তাওহীদকে যখন আলাদা সেলে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে, তখন কয়েক মিনিটের জন্য তাদের শেষ কথোপকথনের সুযোগ হলো। অরুনিমা শান্তকে রেখে প্রণয়ের খাঁচার মতো ভ্যানটির গ্রিল ধরে দাঁড়িয়ে ছিল। প্রণয় অরুকে কি বলবে ভাষা খুঁজে পাচ্ছে না। নিষ্প্রাণ, নিথর মূর্তির মতো বসে আছে। অরুনিমার চোখের পানি গ্রিলের লোহার ওপর পড়ে চুইয়ে নিচে নামছে, কিন্তু প্রণয় বাক্যহারা। যে মানুষটা তার কথার জাদুতে মন্ত্রমুগ্ধ করে রাখত, আজ তার ঠোঁট দুটো থরথর করে কাঁপছে, কিন্তু কোনো শব্দ বের হচ্ছে না।
প্রণয় অরুনিমার জলভরা চোখের দিকে তাকাতে পারছে না। সে শুধু ভাবছে সেই দিনগুলোর কথা, যখন তারা দুজন মিলে তিলে তিলে নতুন করে বাঁচতে শিখেছিল। অরুনিমা নদীর বুক থেকে ফিরে এসে নিজেকে মৃত ভাবত, প্রণয়ই ওকে শিখিয়েছিল কীভাবে নিঃশ্বাস নিতে হয়। প্রণয় যখন প্রতিশোধের আগুনে নিজেকে পুড়িয়ে খাক করে দিচ্ছিল, তখন অরুনিমার ভালোবাসা আর শান্তর কচি হাতের স্পর্শই তাকে শিখিয়েছিল যে জীবনের অন্য এক নাম মায়া। তারা শুধু বেঁচে ছিল না, একে অপরের পরিপূরক হয়ে উঠেছিল। একজন হারিয়ে গেলে অপরজন কীভাবে এই বিশাল পৃথিবীর শূন্যতা বইবে, সেই উত্তর কারো কাছে নেই।
প্রণয় অনেক কষ্টে হাতটা বাড়িয়ে গ্রিলের ফাঁক দিয়ে অরুনিমার একটা আঙুল স্পর্শ করল। খুব ক্ষীণ স্বরে সে শুধু বলতে পারল, “অরু, আমরা বাঁচতে শিখছিলাম ঠিকই, কিন্তু আমাদের কপালে শান্তি লেখা ছিল না। আমি তোমারে অন্ধকার থেকে আলোয় আনছি, এখন এই আলোটুকু তুমি নিভতে দিও না। আমার জন্য জ্যান্ত লাশ হয়ে থেকো না অরু।”
অরুনিমা মাথা নেড়ে আর্তনাদ করে উঠল, “কেমনে থাকব? তুমি ছাড়া তো আমার নিঃশ্বাসও গলার ভেতর পাথরের মতো আটকায়া যায়। তুমিই তো আমারে বাঁচতে শিখাইছিলা, এখন কারে নিয়া বাঁচব? শান্ত? ওর কথা ভাবলে না? ওরে ভালোবাসো না? ওকে কি বলব?”
প্রণয় উত্তর দিতে পারল না। তার বুক ফেটে কান্না আসছিল, কিন্তু সে নিজেকে পাথর করে রাখল। ভ্যানটা চলতে শুরু করলে অরুনিমার হাতটা গ্রিল থেকে পিছলে গেল। মুহূর্তটা যেন একটা যুগের অবসান। দুজন মানুষ একসাথে বাঁচতে শিখেছিল ঠিকই, কিন্তু আজ থেকে একেকজনকে একেকটা আলাদা নরকে একা একা পুড়তে হবে।
গাড়িটা যখন দূরে ধুলোর মেঘ উড়িয়ে মিলিয়ে যাচ্ছিল, অরুনিমা রাস্তার ওপর বসে পড়ল। মনে হচ্ছিল প্রণয় একা যাচ্ছে না, সে অরুনিমার আত্মাটাকেও লোহার খাঁচায় বন্দি করে নিয়ে যাচ্ছে। বেঁচে থাকা মানেই যদি এমন বিচ্ছেদ হয়, তবে সেই বেঁচে থাকাতে আর কী স্বার্থকতা!
অন্যদিকে, তাওহীদকে যখন শিকল পরিয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল, ইয়াসিফ পথ আগলে দাঁড়াল। তাওহীদের উদ্ধত চেহারা মরা চামড়ার মতো ঝুলে গেছে। ইয়াসিফ শান্ত গলায় জিজ্ঞেস করল, “কী হইলো শেষ পর্যন্ত? ক্ষমতা, জমিদারি, অহংকার সব তো আজ ফাঁসির রশিতে আইসা ঠেকলো।”
তাওহীদ ইয়াসিফের চোখের দিকে তাকিয়ে ঘৃণাভরে হাসল, “তুই জিতছস? উঁহু। মনে রাখিস, মাটি রক্ত চোষা বন্ধ করে না। আমি মরলেও এই গ্রামের রন্ধ্রে রন্ধ্রে যে বিষ আমি দিয়া গেছি, তা মুছতে তোদের সাত জন্ম লাগবে।”
ইয়াসিফ শুধু বলল, “বিষ থাকবে না, কারণ আজ বিষবৃক্ষের শিকড় যথার্থই উপড়ে ফেলা হইছে।” তাওহীদকে আর কথা বলার সুযোগ দেওয়া হলো না। টেনে হিচড়ে নিয়ে যাওয়া হলো। সালেহা বেগমের বিচার আলাদাভাবে সম্পন্ন হলো। বিজ্ঞ আদালত তার বয়স, বিগত ত্রিশ বছরের মানসিক যন্ত্রণা এবং মকবুল রহমানের দ্বারা নির্যাতিত হওয়ার ইতিহাস বিবেচনা করলেন। বিশেষ করে, তিনি যে স্বেচ্ছায় আত্মসমর্পণ করেছেন এবং তার অপরাধ যে এক প্রকার আকস্মিক প্ররোচনা ছিল, তা আমলে নেওয়া হলো। আদালত তাকে ৫ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড এবং নামমাত্র জরিমানা প্রদান করলেন। সালেহা বেগমের কাছে এই জেলখানাই এখন সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়। আর কোথায় যাবেন তিনি? যাওয়ার সময় তাহমিদকে লক্ষ্য করে বললেন, “বাবা, তোর আসল পরিচয় নিয়া বাঁচিস। আমার জন্য মায়া করিস না, আমি তো অনেক আগেই মইরা গেছি।”
অবশেষে দিন শেষে আদালত প্রাঙ্গণ খালি হয়ে গেল। ইয়াসিফ, মৃন্ময়ী আর অরুনিমা শান্তকে নিয়ে গেটের বাইরে এসে দাঁড়াল। দিগন্তের সূর্যটা তখন টকটকে লাল হয়ে ডুবে যাচ্ছে, ঠিক চব্বিশ বছর আগের সেই আগুনের রঙ। গ্রামের মানুষ এখন থেকে শান্তিতে ঘুমাবে ঠিকই, কিন্তু এই শান্তির জন্য একটা মানুষ ফাঁসির কাষ্ঠে প্রাণ দিতে যাচ্ছে। ইয়াসিফ শান্তর হাত ধরে সামনের দিকে হাঁটা দিল। পেছনে পড়ে রইল এক অভিশপ্ত ইতিহাস আর সামনে পড়ে রইল এক অনিশ্চিত কিন্তু নতুন পৃথিবী।
.
অরুনিমা নিজেকে সামলাতে পারছে না। পাগল পাগল লাগছে। এই ভালো তো এই খারাপ! ও ফিরে এসে বাবার পাঞ্জাবির হাতা ধরে ডুকরে কেঁদে উঠল। আর্তনাদে চারপাশের বাতাস ভারী হয়ে এল। বাবার দিকে তাকিয়ে ভাঙা গলায় বলতে লাগল, “আব্বা, আপনি কিছু করেন! প্রণয় নির্দোষ। ও যদি খুনি হয়, তবে ও আমারে বাঁচাইতে গিয়া নিজের জীবন বাজি রাখছিল কেন? কেন ও নিজের পরিচয় গোপন কইরা বছরের পর বছর এই শয়তানগো থ থাইকা আমারে আর শান্তরে আগলাইয়া রাখল?”
চেয়ারম্যান সাহেব পাথর হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন। মেয়ের এই অবস্থায় বুক ফেটে যাচ্ছিল। অরুনিমা তাকে ধাক্কা দিয়ে আবার বলল, “আব্বা, আপনি আজকে আপনার মেয়েকে ফিরে পাইছেন তো ওই প্রণয়ের জন্যই! ও যদি সেদিন আমারে নদী থেইকা না তুলত, তবে আজ আমারে পাইতেন? ওই যদি ফাঁসির দড়িতে ঝোলে, তবে আমি আর শান্ত বেঁচে কি করব? আমার জীবনের কোনো দাম নাই আব্বা, যদি প্রণয় না থাকে।” অরুনিমা মাটিতে আছড়ে পড়ে আর্তনাদ করে বলতে লাগল, “ওর রক্তে কোনো পাপ নাই আব্বা। ও শুধু ওনার মা-বাবার হত্যার বিচার চাইছে। চব্বিশ বছর ও জ্যান্ত শ্মশানে পুড়ছে। আপনি সরকারের কাছে যান, বড় উকিল ধরেন! দোহাই লাগে আপনার, সবকিছু এত সহজে শেষ হইতে দিয়েন না।”
চেয়ারম্যান সাহেব নিচু হয়ে মেয়ের মাথায় হাত রাখলেন। তার নিজের চোখেও পানি। তিনি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, “মা রে, আমি তো অনেক দেরি কইরা ফেলছি। কিন্তু আমি কথা দিতাছি মা, আমি আমার শেষ রক্তবিন্দু দিয়া চেষ্টা করুম। উচ্চ আদালতে আপিল করুম। প্রণয় তোমারে ফিরাইয়া দিছে, আমি আমার সর্বোচ্চ দিয়া চেষ্টা করুম ওরে ফিরাইয়া আনতে।”
অরুনিমা বিষণ্ণ হাসল। আইনের লোহার হাত অনেক শক্ত, সান্তনায় যে ওর মন ভরছে। ওর সত্যি প্রণয়কে দরকার, সত্যিই দরকার! অরুনিমা শান্তকে চেয়ারম্যানের কোলে এগিয়ে দিয়ে বলল, “দেখেন আব্বা, এই ছেলেটা ওর বাপের জন্য কেমন করতাছে? ওরে কি আপনি এতিম হইতে দিবেন?”
চেয়ারম্যান সাহেব অরুনিমা আর শান্তকে আগলে ধরলেন। দাপুটে চেয়ারম্যান আজ এক অসহায় বাবা হিসেবে নিজের মেয়ের জীবনের ভিক্ষা চাচ্ছেন পরিস্থিতির কাছে। তিনি উচ্চ আদালতে আপিলের সিদ্ধান্ত নিলেন।
পুরো এলাকা নিস্তব্ধ শোকের চাদরে ঢাকা পড়ে গেল।। শুধু অরুনিমা কিংবা শান্ত নয়, এই রায় গোটা গ্রামের সাধারণ মানুষের বুকে ভারী পাথরের মতো চেপে বসল। বিগত কতকগুলো বছর ধরে যে অন্যায়কে সবাই সয়ে এসেছে, যে অন্যায়ের বিরুদ্ধে কেউ মুখ খোলার সাহস পায়নি, আজ সেই অন্যায়ের অবসান ঘটিয়ে ত্রাতা হিসেবে যে সামনে এল, তাকেই বরণ করতে হচ্ছে ফাঁসির দড়ি। গ্রামের প্রতিটি মোড়ে, গঞ্জের পুরনো চায়ের দোকানে এখন অন্য কোনো গল্প নেই। চায়ের ধোঁয়ার সাথে মানুষের দীর্ঘশ্বাস মিশে একাকার হয়ে যাচ্ছে। গঞ্জের শেষ প্রান্তে কাশেমের চায়ের দোকানে ভিড় আজ স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি, কিন্তু কোনো হইচই নেই। সবাই নিচু স্বরে কথা বলছে, “বুঝলেন কাশেম ভাই, গ্রামের সবার পক্ষ থেইকা দাঁড়ানোর কথা ছিল। কিন্তু কেউ দাঁড়াইতে পারে নাই। ডর আর ক্ষমতার ভয়ে আমরা সবাই তো জ্যান্ত লাশ হইয়া ছিলাম। প্রতিবাদ করার কথা ছিল আমাদের সবার, কিন্তু রুখে দাঁড়াইল কেবল একজন; আমগো প্রণয় মাস্টার!”
আরেকজন প্রবীণ ব্যক্তি চায়ে চুমুক না দিয়েই বললেন, “শাস্তি পাওয়ার কথা ছিল মকবুল জমিদারের পুরো বংশের, অথচ সেই পাপের বোঝা টানতেছে প্রণয়। অথচ ওর জন্যই তো আজ আমরা বুক ফুলায়া হাঁটতে পারতেছি। যে লোকটা আমাদের চোখ খুইলা দিল, তার চোখেই এখন যমটুপি পরানো হবে? এটা কেমন বিচার?”
“মাস্টার সাব ফাঁসি নিয়া চইলা যাইব ঠিকই, কিন্তু আমাদের সবার কপালে ভীরুতার ছাপ মাইরা দিয়া গেল। আমরা বাঁচা থাইকাও মরা, আর উনি মইরা গিয়াও আমাদের মাঝে জ্যান্ত হইয়া থাকব।”
স্তব্ধ গ্রামবাসী। গ্রামের সাধারণ কৃষকেরা যারা প্রতিদিন ভোরবেলা লাঙল নিয়ে মাঠে যায়, তারাও আজ থমকে গেছে। তাদের মনে একটাই প্রশ্ন যে মানুষটা তাদের ভয় কাটিয়ে দিল, তাকেই কেন আইনের কাঠগড়ায় হার মানতে হলো? এই গ্রামে এমন কেউ নেই যে মকবুল জমিদারের অন্যায়ের শিকার হয়নি। সবাই কোনো না কোনোভাবে পাপের সাক্ষী ছিল, কিন্তু কেউ প্রতিবাদ করেনি। প্রণয় সেই কাজটা একাই করেছে বলে আজ সে খুনি, আর বাকিরা নির্দোষ সেজে বসে আছে; এই গ্লানি যেন গ্রামের মানুষকে কুরে কুরে খাচ্ছে।
.
গ্রামের বাতাস ইয়াসিফের কাছে ভারী ঠেকে। যে মাটির নিচে এত বছরের চাপা কান্না আর রক্তের দাগ মিশে আছে, সেখানে দাঁড়িয়ে বুক ভরে দম নেওয়াটা তার জন্য কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। সে থাকবে না এই গ্রামে। প্রণয়ের কথা মনে পড়লেই একটা বিশাল অন্ধকার গহ্বরে সে তলিয়ে যায়। যে মুক্তির জন্য এত আয়োজন, সেই মুক্তিই এখন শ্বাসরুদ্ধ করে মারছে। এমনই এক শূন্য মূহূর্তে, ইয়াসিফের দরজায় এসে দাঁড়ালেন চেয়ারম্যান সাহেব। তার দৃষ্টিতে অসহায়ত্বের মিনতি।
অন্যদিকে, মৃন্ময়ী আজকাল প্রায়ই অরুনিমার কাছে যায়। সান্ত্বনা দিতে নয়, কারণ ও জানে কিছু যন্ত্রণার কোনো ভাষা হয় না। তারা দুজন পাশাপাশি চুপচাপ বসে থাকে। সেই নীরবতা কান্নার চেয়েও বেশি শব্দ করে। মৃন্ময়ী মাঝেমাঝে শান্তকে নিজের সাথে নিয়ে আসে।
শান্তকে নিয়ে গ্রামে কেউ ফিসফিস করে না, ওর জন্মপরিচয় নিয়ে কেউ একটা বাঁকা কথাও বলে না। কেনই বা বলবে? এই গ্রামের প্রতিটা মানুষ জানে, শান্ত কেবল প্রণয়েরই ছেলে। জন্ম না দিয়েও যে একজন মানুষের অস্তিত্বে মিশে গিয়ে প্রকৃত পিতা হওয়া যায়, প্রণয় তার রক্ত দিয়ে সেই দৃষ্টান্ত এই মাটিতে পুঁতে দিয়ে গেছে। শান্তর ছোট অবয়বের মাঝেই গ্রামবাসী প্রণয়কেই খুঁজে পায়।
.
চেয়ারম্যান সাহেব হাল ছাড়লেন না। তিনি ইয়াসিফকে নিয়ে জেলার গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ আর গ্রামের শত শত মানুষের স্বাক্ষর সংগ্রহ করলেন। চেয়ারম্যান বললেন, “আইন তার জায়গায় কঠোর, কিন্তু মানুষের হৃদয়ের কথা শোনার জন্য তো রাষ্ট্রপতি আছেন। আমরা দেখাব যে, একটা গোটা গ্রাম একজন মানুষের জীবন কীভাবে ভিক্ষা চাইছে।”
আবেদনটা যখন বঙ্গভবনে পৌঁছাল, তখন সারা দেশে প্রণয়ের ত্যাগের কাহিনী সংবাদপত্রে তোলপাড় সৃষ্টি করর। মানুষের মনে একটাই প্রশ্ন; যে মানুষটা সমাজ থেকে পিশাচ তাড়াল, তার গলায় কি ফাঁসির দড়ি সাজে?
রাষ্ট্রপতি সব নথিপত্র এবং জনমতের চাপ গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করলেন। তিনি দেখলেন, প্রণয়ের বিরুদ্ধে কোনো পূর্ববর্তী অপরাধের রেকর্ড নেই এবং তার কাজের ফলে একটা দীর্ঘস্থায়ী অন্যায়ের অবসান ঘটেছে। শেষ মুহূর্তে, ফাঁসি কার্যকর হওয়ার মাত্র কয়েক দিন আগে রাষ্ট্রপতি তার বিশেষ ক্ষমতা বলে প্রণয়ের মৃত্যুদণ্ড মকুব করে সেটাকে মাত্র পাঁচ বছরের কারাদণ্ডে রূপান্তরিত করলেন। অর্থাৎ, প্রণয়কে আর ফাঁসির কাষ্ঠে ঝুলতে হবে না, তবে তাকে পাঁচটা বছর কারাগারে থাকতে হবে।
খবরটা যখন গ্রামে পৌঁছাল, মানুষজন উল্লাসে অন্ধ হয়ে গেল। অরুনিমা জ্ঞান হারিয়ে পড়ে গেল। যন্ত্রণায় নয়, স্বস্তিতে। শান্তকে বুকে জড়িয়ে ও শুধু আকাশের দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করল, “তুমি বেঁচে আছো প্রণয়, তুমি বেঁচে আছো। আমি তোমার জন্য সারাজীবন অপেক্ষা করব।”
ইয়াসিফ দীর্ঘশ্বাস ফেলল। ফাঁসি হয়নি ঠিকই, কিন্তু প্রণয়কে অনেকগুলো বছর ওই চার দেয়ালের মাঝেই কাটাতে হবে। তবে অন্তত শান্তর মাথার ওপর বাবার ছায়াটা তো রইল। আর ইয়াসিফ কিছুটা হলেও অপরাধ থেকে মুক্তি পেল। ভীষণ অপরাধবোধ হচ্ছিল! দায় তো তারও ছিল, কিন্তু সে নিতে পেরেছে কি? তার হয়ে প্রণয় করে দেখিয়েছে। দ্যাট ম্যান ইজ ফুল অব কারেজ!
রাষ্ট্রপতির আদেশের পর প্রণয়কে জেলা কারাগার থেকে কেন্দ্রীয় কারাগারে স্থানান্তরের প্রক্রিয়া শুরু হলো। তবে স্থানান্তরের আগে বিশেষ মুহূর্তের অনুমতি মিলল। চেয়ারম্যান সাহেব আর ইয়াসিফের বিশেষ অনুরোধে জেলার সাহেব জেলগেটের সামনেই অরুনিমা আর শান্তর সাথে প্রণয়ের দেখা করার একটা ছোট সুযোগ করে দিলেন।
সেদিন জেলগেটের বাইরে মানুষের উপচে পড়া ভিড় ছিল।
অরুনিমা দাঁড়িয়েছিল শান্তর হাত ধরে। গত কয়েক মাসের লড়াই, নির্ঘুম রাত আর চোখের পানি ওর চেহারা ফ্যাকাসে করে দিয়েছে। কিন্তু প্রণয়কে সামনে দেখে তার ভেতরের সব বাঁধ ভেঙে গেল। ও আর আইনের শাসন, সমাজের চোখ বা লোকলজ্জার তোয়াক্কা করল না।
সবাইকে অবাক করে দিয়ে অরুনিমা দৌড়ে গিয়ে প্রণয়কে জড়িয়ে ধরল। হাতকড়া পরা অবস্থায় প্রণয় টলমল পায়ে নিজেকে সামলে নিল। অরুনিমা তার বুকের মাঝে মুখ লুকিয়ে অঝোরে কাঁদতে লাগল। এতদিনের জমানো সব ভয়, হাহাকার আর প্রতীক্ষা এই একটা আলিঙ্গনে মুক্তি পেল।
.
.
.
চলবে….
