#প্রণয়_প্রত্যাবর্তন🖤 [পর্ব-০৯]
~আফিয়া আফরিন
আলিফ তাওহীদকে বাড়ি নিয়ে এলো। তাওহীদের অবস্থা শোচনীয়। সালেহা দেখেই কান্নায় ভেঙ্গে পড়লেন। মকবুল রহমান এসে দেখলেন, ছেলের শ্বাসের ওঠানামা এখনও অনিয়মিত, চোখেমুখে আঘাতের চিহ্ন স্পষ্ট। শরীরের কোথাও কোথাও রক্ত শুকিয়ে জামাট বেঁধে গেছে। তাওহীদ কোনো কথা বলতে পারছে না, সেই শক্তি নেই তার। আততায়ীর পরিচয় বা উদ্দেশ্য, কিছুই সে বলতে পারল না। লোকটা কয়েক বছর আগের কোনো ঘটনা নিয়ে কথা বলছিল। কিন্তু সেই ঘটনাটা কি? তাওহীদ চেষ্টা করেও কিছু মনে করতে পারল না। ডাক্তার এসে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে গেলেন। বললেন, “পুরোপুরি সুস্থ হতে অন্তত দু’দিন সময় লাগবে।”
এই সুযোগে মকবুল রহমান কাজে নেমে গেলেন। ছেলেকে বোঝালেন, “হামলাকারী যে হোক না কেন, ইয়াসিফকে এই কেসটায় ফাঁসিয়ে দেওয়া উচিত। আমাদের সুবিধা তখনই হবে, যখন একজন একজন করে প্রতিপক্ষ কমবে। ইয়াসিফ কিন্তু তক্কে তক্কে আছে, ব্যাটার বুদ্ধি রগে রগে। যখন যা খুশি তাই করতে পারে।”
তাওহীদ ভাবল, হ্যাঁ সময় এখন তাদেরই পক্ষে। বাবার কথায় রাজি হয়ে গেল। পুলিশ তার বয়ান নিল। সেইদিনই ইয়াসিফকে গ্রেপ্তার করা হলো। কারণ হিসেবে বলা হলো, তাওহীদের উপর হামলার ঘটনার সাথে তার জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া গেছে। তাহের আকন্দ যতোই প্রতিবাদ করতে চাইলেন, আর কোনো কার্যকর উপায় হাতে ছিল না। ইয়াসিফও প্রতিরক্ষা করার চেষ্টা করল না। সে ভালো করেই জানে, এখানে কোনো কথা বলার লাভ নেই। জমিদার বেশ চালাক! তার সাথে তারই মত করে খেলতে হবে। এমন লোকের সামনে সরল হয়ে দাঁড়ালে নিজেরই ক্ষতি হবে। সময় এবং সুযোগ দুটোকেই নিজের আয়ত্তে আনতে হবে। তার আগে বরং একটু জেলের হাওয়া খেয়ে আসা যাক! ওই চার দেয়ালের ভেতর বসে মাথার বুদ্ধিতে শান দেওয়া যাবে। অপরাধীদের সাথে দিন কাটিয়ে মানুষ চিনতে শেখা যাবে; কে কীভাবে ভাবে, কে কোথায় দুর্বল, কে কাকে ভয় পায়! অভিজ্ঞতা না নিলে লড়াই জেতা যায় না, এই সত্যটা ইয়াসিফ খুব ভালো করেই জানে।
এতদিনে এত ঘটনা ঘটে গেল, এই সবের মাঝে তাওহীদের সঙ্গে ইয়াসিফের মুখোমুখি দেখা হয়নি। আজ হলো, হঠাৎ করেই। আকন্দ বাড়ির সামনের ভিড়ের মধ্যে মানুষ কৌতূহলী চোখে তাকিয়েছিল। ইয়াসিফ তখন পুলিশের মাঝখানে। হাতে হাতকড়া পড়ানো, দুই হাত সামনের দিকে বাঁধা। তাকে জিপে তোলার আগ মুহূর্তে ভিড় ঠেলে তাওহীদকে আসতে দেখা গেল। চোখাচোখি হতেই মুহূর্তের মধ্যে সবকিছু স্থির হয়ে গেল। তাওহীদ এগিয়ে এলো। তার চোখে জয়ীর দম্ভ। ঠোঁটের কোণে বক্র হাসি যেন বলছে, “দেখলি? শেষমেশ তোকে এখানে এনেই ছাড়লাম।”
ইয়াসিফ অলক্ষ্যে সামান্য এগিয়ে এলো। দুই হাত একসাথে বাঁধা থাকায় সে মুষ্টি করতে পারল না, কিন্তু কনুইটা তুলতে পারল। প্রচণ্ড জোরে কনুই চালিয়ে দিল তাওহীদের মুখের দিকে। আচমকা আঘাতে তাওহীদ সামলে নিতে পারল না। নাকের পাশটা ফেটে গেল, মুখ বেঁকে গেল যন্ত্রণায়। ভিড়ের মধ্যে হৈচৈ পড়ে গেল। পুলিশ তৎক্ষণাৎ ইয়াসিফকে টেনে ধরল, দু’জন কনস্টেবল শক্ত করে চেপে ধরল তার কাঁধ। তাওহীদ চিৎকার করে উঠল। ইয়াসিফ পুলিশের ধরে রাখা অবস্থাতেই তাকাল তার দিকে। নিজের ভেতর জমে থাকা আগুনটা আর চেপে রাখা গেল না। কোন বাঁধা নিষেধ মানল না। কনুইয়ের আঘাতে তাওহীদ যখন সামলে উঠতে ব্যস্ত, ঠিক তখনই ইয়াসিফ শরীরটা নিচু করে পা দিয়ে আঘাত করল। প্রথম লাথিটা পড়ল তাওহীদের হাঁটুর একটু ওপরে। আকস্মিক যন্ত্রণায় তাওহীদের পা বেঁকে গেল, সে এক কদম পেছনে হোঁচট খেল। চিৎকারটা গলার ভেতরেই আটকে গেল। দ্বিতীয় লাথিটা আরও নির্মম ছিল। সরাসরি পেটের নিচে। নিঃশ্বাস আটকে এলো তাওহীদের। মুখ দিয়ে একটা অস্পষ্ট গোঙানি বেরিয়ে এলো। আবারও হইচই পড়ে গেল, “আরে ধরো! কি করছেটা কি?”
পুলিশ আর ঝুঁকি নিল না। তিনজন মিলে ইয়াসিফকে টেনে জিপে তুলল। একজন কনস্টেবল রাগে চেঁচিয়ে উঠল, “এই! খবরদার। বেশি বাড়বাড়ি করার চেষ্টা করলে কিন্তু এক্কেরে খুনের দায়ে সারাজীবনের লাইগ্যা হাজতে হান্দাইয়া দিমু।”
ইয়াসিফ কর্ণকুহরে কোন কথাই প্রবেশ করছিল না। সে রীতিমতো রাগে কাঁপছিল। বুক উঠানামা করছে দ্রুত। তাওহীদের দিকে শেষবারের মতো তাকাল। তাওহীদ মাটিতে আধা বসা অবস্থায় পড়ে আছে। নাক দিয়ে রক্ত পড়ছে। যন্ত্রণায় কুঁকড়ে থাকলেও জেদের আগুনটা নিভেনি। দাঁতে দাঁত চেপে বলার চেষ্টা করল, “তোকে আমি দেখে নিব।”
হাতকড়ার শিকলটা ঝনঝন করে উঠল। ইয়াসিফ থমকাল। পুলিশ টান দিচ্ছিল, তবুও সে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাল। নিরপেক্ষ শীতল গলায় বলল, “যে দায় জেল খাটতে হচ্ছে, সেই দায়ের সামান্য শোধ দিলাম। এরপর তুই আর আমাকে দেখার সুযোগ পাবি না। কসম, সেদিন রাতে যদি আমি থাকতাম তোকে লা’শ বানিয়ে ক্ষান্ত হতাম। যতদিন আমি আটকে আছি, মনে রাখিস তোর হায়াত ততদিনই। বেঁচে নে। বুক ভরে নিঃশ্বাস নে… আমি আসছি, শুয়োরের বাচ্চা।”
এইবার তাওহীদ উঠে দাঁড়াল। ব্যথায় শরীর কাঁপছে। তবুও দম্ভ-অহংকারে বুক চাপড়ে চেঁচিয়ে উঠল, “আমাকে ভয় দেখাস? আমাকে?”
ইয়াসিফ আর কিছু বলল না। ঠোঁটের কোণে ক্ষীণ একটা হাসি খেলল মাত্র। তারপর পুলিশের টানে ঘুরে গেল সে। জিপের দরজা বন্ধ হলো শব্দ করে।
.
তাওহীদ গ্রামে ফেরার পর রশিদ একাই ছিল। ইয়াসিফ আটক; এই খবরে জমিদার পক্ষ থেকে সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো, রশিদকে দ্রুত গ্রামে ফিরিয়ে আনতে হবে। কিন্তু ফোনে তাকে পাওয়া গেল না। একবার, দু’বার… শেষমেশ গ্রাম থেকে একটা ছেলেকে পাঠানো হলো। ঠিকানা অনুযায়ী ছেলেটা পৌঁছাল বিকালে। ভেতর থেকে কেমন এক চাপা গন্ধ ভেসে আসছে। দরজাটা আধখোলা। সাহস করে ভেতরে পা রাখতেই চোখ দুটো স্থির হয়ে গেল। রশিদ কোথায়? এ তো রশিদের লা’শ। শরীরটা অস্বাভাবিকভাবে মোচড়ানো। দু’হাত ছড়িয়ে, আঙুলগুলো শক্ত হয়ে মুঠো পাকানো। চোখজোড়া আধখোলা, বিস্ফারিত দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে শূন্যের দিকে। ঠোঁট ফেটে গেছে, দাঁতের ফাঁকে শুকনো রক্ত জমে কালচে হয়ে আছে। গলার চারপাশে গভীর দাগ। যেন তার পেঁচিয়ে ধরা হয়েছিল। নখের আঁচড়, রক্তজমাট ক্ষত স্পষ্ট। বুকের উপর আর পেটজুড়ে একাধিক আঘাতের চিহ্ন। কোথাও ছুরির কোপ, কোথাও ভোঁতা কিছুর আঘাত। জামাকাপড় ছিঁড়ে গেছে, রক্তে ভিজে শক্ত হয়ে মেঝের সাথে লেপ্টে আছে। ঘরের দেয়ালে রক্ত ছিটকে লেগে আছে। বোঝা যাচ্ছে, প্রাণপণে বাঁচার চেষ্টা করেছিল রশিদ। সেই চেষ্টার শেষটা হয়েছে ভয়াবহভাবে। লা’শটার পাশেই ভাঁজ করা একটা চিরকুট। রক্তে ভেজা হলেও লেখাটা স্পষ্ট, “হু ইজ দ্যা নেক্সট টার্গেট?”
ছেলেটা আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারল না। হাঁটু ভেঙে বসে পড়ল। কোনোরকম খবর ফোন করে খবর দিতে পারল।
রশিদকে শুধু হত্যাই করা হয়নি, তার মৃ’ত্যুর সাথে নিষ্ঠুর খেলা খেলেছে। পুলিশি রিপোর্টে স্পষ্ট ভাষায় উঠে এলো সেই ভয়াবহ সত্য। তাকে মা’রার পরেও শরীরের উপর একের পর এক আঘাত করা হয়েছে। ক্ষতগুলোর গভীরতা আর সংখ্যাই বলে দিচ্ছে, এটা শুধুমাত্র রাগের বিস্ফোরণ নয়। এটা বিকৃত আনন্দ। ফরেনসিক রিপোর্ট দেখে তদন্তকারীদের মুখ গম্ভীর হয়ে উঠল। একাধিক অফিসার একই কথায় একমত হন, “খু’নি মানসিকভাবে স্থিত নয়। এটা পরিকল্পিত প্রতিশোধ এবং তাতে মিশে আছে সাইকোটিক প্রবণতা।”
শত্রু যে রশিদের উপর চড়াও হতে পারে, এটা কল্পনাতেও আসেনি কারো। হিসেব অনুযায়ী পরের নিশানা নির্ধারিত। কেউ নিশ্চিত নয়, কে নিরাপদ আর কে পরবর্তী শিকার? গ্রামেজুড়ে আতঙ্ক নেমে এসেছে। প্রতিটি ঘরে রাতে দরজা-জানালা আগেভাগেই বন্ধ হচ্ছে। জমিদার বাড়িতে পুলিশি পাহারা বসেছে কড়াভাবে। রাতদিন মিলিয়ে টহল চলছে। তবুও মকবুল রহমানের কপালের ভাঁজ সোজা হচ্ছে না। এত বড় শত্রু! এত নিখুঁতভাবে একের পর এক আঘাত করছে, কিন্তু কে?
ইয়াসিফ সন্দেহের তালিকায় ছিল ঠিকই, কিন্তু সে এখন জেলের চার দেয়ালের ভেতর। কীভাবে সম্ভব? এই প্রশ্নটাই তাওহীদের মাথার ভেতর ঘুরপাক খাচ্ছিল। অন্যদের মতো সে হইচই করছে না বরং অস্বাভাবিক রকম ঠান্ডা মাথায় বসে ঘটনাগুলো মেলাচ্ছে। ময়ূরী, রাজিব, রশিদ; সবাই কোনো না কোনোভাবে যুক্ত। কিন্তু যোগসূত্রটা কোথায়?
হঠাৎ করেই কয়েক বছর আগের একটা নাম বুকের ভেতর কাঁটার মতো বিঁধে গেল, অরুনিমা… কিন্তু ও তো বেঁচে নেই। গ্রামের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া কালিন্দী নদীতে ডুবে আত্মহ’ত্যা করেছিল। সবচেয়ে বড় কথা, অরুনিমা আর তাওহীদের মধ্যেকার বিষয়টা তো কারো জানার কথা নয়। এত বছর পর হঠাৎ করে সেই অধ্যায় কেন ফিরে আসবে?
তাওহীদের কপালে ঘাম জমল। তাহলে কে? মস্তিষ্কের অন্ধকার কোণে আরেকটা নাম নড়ে উঠল, শিশির। সে কি কোনোভাবে বোনের মৃত্যুর পেছনের সত্যটা জেনে গেছে? এই প্রতিশোধের আগুন কি তার ভেতরেই এতদিন জ্বলছিল?
পরদিন সকালবেলা কাউকে কিছু না বলেই তাওহীদ শিশিরকে খুঁজতে বেরিয়ে পড়ল। এখন চেয়ারম্যান বাড়ি গিয়ে তাকে খোঁজা বোকামি। তাই উদ্দেশ্যহীনভাবেই বাজারে খুঁজল, কোথাও দেখল না। বিরক্তি আর অস্থিরতা নিয়ে ঘুরতে ঘুরতে দক্ষিণ দিকের পুকুরপাড়ে এসে থামল। পুকুরপাড়টা তখন নিস্তব্ধ। সকালের রোদটা পানির ওপর পড়ে ঝিলমিল করছে। দূরে কয়েকটা শালিক ডাকছে, বাতাসে কচুরিপানার কাঁচা গন্ধ। পুকুরের ধারে একা বসে আছে মৃন্ময়ী। পা দুটো পানিতে ডুবিয়ে, ছোট ছোট ঢিল তুলে নিয়ে পানিতে ছুড়ছে। ঢিল পড়লেই টুপটাপ শব্দ হচ্ছে, তারপর গোল হয়ে ছড়িয়ে ঢেউ ছড়িয়ে পড়ছে। ওকে দেখে তাওহীদের মাথার ভেতরের ঘুমন্ত শয়তানটা নড়ে উঠল। ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসি ফুটে উঠল। ধীরে ধীরে এগিয়ে এলো, পদচারণা ইচ্ছে করেই চাপা রাখল। পেছন থেকে বলল, “কি সুন্দরী, কার জন্য অপেক্ষা করছো?”
মৃন্ময়ী একটুও চমকাল না। তাওহীদ বিড়ালের মতো নিঃশব্দে এলেও পানিতে তার অবয়ব ধরা পড়ে গেছে। না তাকিয়েই ও আরেকটা ঢিল ছুঁড়ে দিল। টুপ করে শব্দ হলো। বলল, “আপনার জন্য নয়, নিশ্চিত থাকুন।”
তাওহীদ হেসে উঠল। হাসিটা কানে ঠেকার মতো। সে আরও কাছে এগিয়ে এসে বক্র সুরে বলল, “আহা, আমার জন্য একটু অপেক্ষা করলে কি হয়?”
মৃন্ময়ীর ঘুরে সরু দৃষ্টিতে তাকাল, “সোজা কথা বলুন, এখনও বেঁচে আছেন আপনে? আপনের না মরে যাওয়ার কথা ছিল।”
তাওহীদ ভুরু কুঁচকে ফেলল, “আমারে মারা এত সহজ?”
মৃন্ময়ী ঠোঁট বাঁকিয়ে হাসল, “সহজ না? ইয়াসিফ ভাই তো সেদিন রাস্তায় ফেলে মারল। হাতকড়া পড়ানো না থাকলে নির্ঘাত মেরেই ফেলত। তারপর আরেকদিন রাতে কে যেন আপনার উপর আক্রমণ করল। এগুলো কী? আদর-আপ্যায়ন করে বসিয়ে খাওয়ানো?” মৃন্ময়ীর ঠোঁটে হাসি খেলল। হাসিটা তাওহীদের ভেতরে আগুন ধরিয়ে দিল। তার চোয়াল শক্ত হয়ে এলো। মৃন্ময়ী আবার বলল, “আচ্ছা, আপনার সাঙ্গপাঙ্গরা তো খুন হচ্ছে। শুনলাম, পরবর্তীতে নাকি আপনি মরবেন? আপনার চল্লিশায় বিরিয়ানি দিয়েন কিন্তু। শুধু শুধু দু’টো জিলাপি দিয়ে দায় খালাস কইরেন না। আমার জিলাপি পছন্দ না।”
তাওহীদ নিজেকে সামলাতে পারল না। খপ করে মৃন্ময়ীর হাত চেপে ধরল, “খুব শখ বিরিয়ানির?”
মৃন্ময়ী নিজের হাতের দিকে তাকাল। চোখ তুলে ঠান্ডা স্বরে বলল, “যা বলার মুখে বলেন। হাতটা ছেড়ে দেন।”
পরের মুহূর্তেই ও জোর করে নিজের হাত ছাড়িয়ে নিল। কিন্তু তাওহীদ ছাড়ার পাত্র নয়। ক্ষণিকের মধ্যেই সে আবার ঝাঁপিয়ে পড়ল। এক হাত বাড়িয়ে মৃন্ময়ীর থুতনিটা শক্ত করে চেপে ধরল। আঙুলের চাপে চোয়াল কেঁপে উঠল। দাঁতে দাঁত চেপে হিসহিস করে বলল, “এত দেমাগ আয় কইত্তে? তোর বোনের কথা মনে আছিল না? শইল্যের এই দেমাগের কারণেই মা* মরছে। তুইও মরবি।”
মৃন্ময়ীর মুখটা ব্যথায় টানটান হয়ে গেল। তবুও চোখ নামাল না। ঠোঁটের কোণে একফোঁটা তাচ্ছিল্যের হাসি ফুটে উঠল। স্পষ্ট স্বরে বলল, “আপনে মারবেন? আপনে নিজেই তো মরবেন।”
এই কথাটুকুই যথেষ্ট ছিল তাওহীদের পায়ের রক্ত মাথায় উঠাতে। তার আঙ্গুল আরও শক্ত হয়ে চেপে বসল। মৃন্ময়ীর নিঃশ্বাস আটকে আসছিল। তাওহীদ মুখটা কাছে নিয়ে এলো, “বুঝোস না কার সামনে কথা কইতেছস? বেশি বাড় বাড়লে এই পুকুরেই তোর লাশ ভাসবে।”
“হাত সরান।”
মুহূর্তের ভেতর তাওহীদের চোখের দৃষ্টি বদলে গেল। মৃন্ময়ীর চোখে ভয় না দেখে, স্থির ঘৃণা দেখে সে ক্ষণিক থমকাল। ঠিক তখনই মাথায় আরেকটা নাম খচ করে উঠল, শিশির। সে থুতনির চাপটা সামান্য ঢিলে দিয়ে ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল, “এই দেমাগটা ওই শিশির শিখাইছে? দিনে দিনে তোর বাড়িতে যাতায়াত বাড়ছে শুনি। খুব দরদ দেখায় না?”
“তার নাম আপনের নোংরা মুখে মানায় না।”
ব্যস, তাওহীদের ভেতরের সন্দেহ আরও পাকাপোক্ত হয়ে গেল। ওকে ছেড়ে দিয়ে এক পা পেছনে সরে এসে আঙুল তুলে বলল, “আমি জানতাম। ওই শিশির সবের মূলে। ওই সব করতাছে না?”
মৃন্ময়ী সোজাসুজি তাকাল, “আপনি ভুল মানুষরে ভাবতেছেন।”
তাওহীদ হুঙ্কার ছাড়ল, “ভুল না। যদি এইসব কাণ্ডের পেছনে ওই শিশিরের হাত থাকে, তাইলে মনে রাখিস তোর আগে ওর গলায় দড়ি পড়বে।”
এই কথা বলেই সে ঘুরে দাঁড়াল। মৃন্ময়ী আর কিছু বলার সুযোগ পেল না। তাওহীদ চোখের আড়াল হতেই ও নিজেও অস্থির ভাবে দৌড়াতে শুরু করল। উদ্দেশ্য, চেয়ারম্যান বাড়ি। শিশিরকে সাবধান করতে হবে। নরপিশাচদের নজর পড়েছে তার উপর!
বাড়ি এসে শিশিরকে পাওয়া গেল না। চেয়ারম্যানের সাথে পাশের গ্রামে গেছে একটা সালিশে। আগামীকাল সকাল সকাল আসবে।
.
এই রাতটাও অভিশপ্ত হয়ে উঠল। উক্ত ঘটনা এবং তাওহীদের সঙ্গে জড়িত আরও দু’জন, মোহন আর পারভেজ; দু’জনকেই খু’ন করা হলো।
ভোরের আলো ফুটতেই প্রথমে পাওয়া গেল মোহনের লা’শ। গ্রামের বাইরে পুরোনো ইটভাটার ধ্বংসস্তূপের পাশে পড়েছিল। তার হাত-পা অস্বাভাবিক কোণে বাঁকানো। গায়ে অসংখ্য আঘাতের চিহ্ন। বুকের ওপর কাঁদায় ভেজা ফতুয়ার পকেটে র’ক্তে লেখা একটাই বার্তা, “খু’নি শুধু খু’ন করেই ক্ষ্যান্ত হচ্ছে না, সময়ের তালে ওদের নিয়ে খেলেছে।”
পারভেজের লা’শ মিলল ঘণ্টাখানেক পরে। গ্রামের পাশের শুকনো খালের ধারে। তার অবস্থাও একই। শরীরজুড়ে আঘাতের দাগ, মুখটা বিকৃত হয়ে গেছে। চোখ দুটো খোলা, স্থির, শূন্যে তাকিয়ে আছে। তার পাশে আরেকটা বার্তা পাওয়া গেল, “চূড়ান্ত হিসেবের সময় ঘনিয়ে আসছে। আর মাত্র একজন! তারপর…”
.
.
.
চলবে….
#প্রণয়_প্রত্যাবর্তন🖤 [পর্ব-১০]
~আফিয়া আফরিন
এতগুলো খু’নের পর প্রশাসনের আর চুপ করে থাকার সুযোগ ছিল না। ভোর হতেই পুরো এলাকা কার্যত ঘেরাও করে ফেলা হলো। থানার সামনে বাড়তি পুলিশ, গ্রামে ঢোকার মুখে অস্থায়ী চেকপোস্ট বসানো হলো। যাতায়াতের পথে কড়া নজরদারি বাড়ানো হলো। বাইক, ভ্যান, এমনকি পথচারীকেও থামিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। ডিসি অফিস থেকে সরাসরি নির্দেশ এলো, ঘটনাটাকে সিরিয়াল কিলিং হিসেবে দেখা হবে। জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার নিজে ঘটনাস্থলে হাজির হলেন। মোহন আর পারভেজের লা’শ ঘিরে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাজ চলল। আগের খু’নগুলোর সঙ্গে প্যাটার্ন মিলিয়ে দেখা হচ্ছে। আনুষ্ঠানিকভাবে ইন্সপেক্টর অনিন্দিতা রায়কে পুরো তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হলো, তিনি আর দেরি করলেন না। কেন শুধুমাত্র জমিদারের ছোট ছেলে তাওহীদ রহমানের বন্ধুদেরই টার্গেট করা হচ্ছে? সে ময়ূরীর সাথে ঘটে যাওয়া অন্যায় সম্পর্কে অবগত কিন্তু পরবর্তীতে ওর পরিবার থেকে কেস তুলে নেওয়া হয়েছিল এবং ইয়াসিফও গুরুত্ব দেয়নি। খু’নগুলো কি তার ফল?
গ্রামে সন্ধ্যা নামার আগেই ১৪৪ ধারা জারি হলো। রাতের বেলা অকারণে বেরোনো নিষেধ। ক্ষনে ক্ষনে মাইকিং করা হচ্ছে কেউ যদি সন্দেহজনক কিছু দেখে, সঙ্গে সঙ্গে থানায় খবর দিতে হবে। জমিদার বাড়িতে পুলিশের পাহারা আরও জোরদার করা হলো। কারণ খু’নি কোনো চিহ্ন রাখছে না। যেটুকু রাখছে, সেটা ইচ্ছাকৃত ভয় দেখানোর জন্য। অনিন্দিতা রায় গভীর রাতে ফাইল বন্ধ করে শুধু একটা কথাই বললেন, “এই লোকটা পালানোর বদলে সামনে এগিয়ে আসছে। আর ক’জন টার্গেট? পরবর্তী জন কে?”
অনিন্দিতা ইনভেস্টিগেশন রুমের দেয়ালের বড় বোর্ডটায় রাজিব, রশিদ, মোহন, পারভেজের তাহলে ছবির দিকে তাকালেন। তিনি একটার পর একটা ফাইল খুললেন। থানার পুরোনো রেকর্ড, অভিযোগের খাতা, জিডির কপি; পাতার পর পাতা উল্টালেন কিন্তু কোথাও সরাসরি কোনো অপরাধ নেই ওদের। রাগে অনিন্দিতা রায়ের মাথার ভেতর ঝড় বয়ে যাচ্ছে। মুখের শিরা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। তিনি ফাইলটা ছুঁড়ে ফেলে টেবিলের ওপর সজোরে ঘুষি মারলেন। অনেক খুঁজেও এই ভিক্টিমদের বিরুদ্ধে কোন তথ্য প্রমাণ পেলেন না। পাবে কিভাবে? এদের জীবনে কখনো জবাবদিহি করতে হয়নি, এরা বেপরোয়া আত্মবিশ্বাসী। অন্যায় করেছে, ধরা পড়েনি। অভিযোগ উঠলেও তা গিলে ফেলেছে ভয়, টাকা আর ক্ষমতা। প্রতিবারই ঢাল হয়ে দাঁড়িয়েছে জমিদার মকবুল রহমান। আইনকে ব্যবহার করে তারা আইনকেই ফাঁকি দিয়েছে প্রতিনিয়ত। আর তাওহীদ? সে তো বাবার ছায়ায় দাঁড়িয়ে অজেয় হয়ে আছে।
এতদিন অন্যায় করে পার পেয়ে গেছে। কিন্তু এবার? এবার তাকে বাঁচাবে কে? সময় খুব কম, খু’নি ঘোষণা দিয়েই খেলায় নেমেছে।
.
সকালের আলো ঠিকমতো উঠতেও পারেনি। মকবুল রহমান নামাজ শেষ করে উঠেছিলেন। এমন সময় ফোনটা বেজে উঠল। ওপাশ থেকে দম আটকানো কণ্ঠস্বর, “সাহেব পোর্টে সমস্যা হইছে। বড় সমস্যা। আজ ভোরের দিকে কাস্টমস আর কোস্ট গার্ড হঠাৎ কইরা চেকিং বাড়ায়। আমাদের যে চালানটা ঢোকার কথা ছিল, ওটা ধরা পড়ে গেছে। কাগজপত্র মিল নাই বইলা কনটেইনার আটকায়, তারপর তল্লাশি চালিয়ে ভেতর থেকে অস্ত্রগুলান বের করছে। এখন পুরা পোর্ট এলাকা লকডাউন টাইপ। কয়েকজনরে আটকাইছে, বাকিরা গা ঢাকা দিছে। মিডিয়ার লোকও খবর পাইছে। পরিস্থিতি খুব সিরিয়াস, সাহেব।”
চারদিক ঘুরে গেল মকবুল রহমানের। ফোনটা হাত থেকে পড়ে গেল। তিনি চেয়ারে বসে পড়লেন, কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমে উঠল। ভাবনার জাল গুছিয়ে ওঠার আগেই বাইরে গাড়ির ব্রেক কষার শব্দ। বাড়ির সামনে পুলিশের গাড়ি। কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই ভেতরে ঢুকলেন ইন্সপেক্টর অনিন্দিতা রায়। “শুভ সকাল।” বলেই থামলেন। তারপর সোজা কথায় এলেন, “তাওহীদকে ডাকুন। ওর সাথে কথা আছে।”
মকবুল রহমানের গলা শুকিয়ে এলো। তিনি কিছু বলতে চাইলেন, শব্দ বেরোল না। লোক মারফত তাওহীদকে ডাকলেন। তাওহীদ আসতেই তিনি সরাসরি প্রশ্নে গেলেন, “আপনার বন্ধুদেরই কেন একে একে টার্গেট করা হচ্ছে?”
তাওহীদ ভ্রু কুঁচকে বলল, “আমি কী করে জানব?”
“রাজিব, রশিদ, মোহন, পারভেজ সবাই তোমার ঘনিষ্ঠ।”
তাওহীদের চোয়াল শক্ত হয়ে গেল। সে কিছু বলল না। অনিন্দিতা ধারাল গলায় বলল, “এবার কি আপনি টার্গেট?”
তাওহীদ বিরক্তির ভান করে বলল, “আমাকে ভয় দেখাচ্ছেন?”
অনিন্দিতা উঠে দাঁড়ালেন, “ভয় দেখানো আমার কাজ না। সাবধান করে দিতে এলাম।”
জমিদার হঠাৎ করেই বলে উঠলেন, “ইয়াসিফরে রিমান্ডে নেন। সব সত্য বাইর হয়ে আসবে।”
অনিন্দিতা ক্রুদ্ধ দৃষ্টিতে তাকাল, “কেন? সে কি করেছে?”
“সেই মূলহোতা। মানুষ দিয়ে এসব করাইতেছে। পোলা ভাবছে ওর হবু বউরে আমরা খু’ন করছি।”
“কেনো ভাবছে? কারণ? আপনারা কি করেছেন?” অনিন্দিতা প্রশ্ন করলেন।
“কিছুই না। মানুষের খায়া-দায়া কাজ না থাকলে যা হয়, আর কি!”
তাওহীদ চুপচাপ শুনছিল। অনিন্দিতা ফের বলল, “তাকে রিমান্ডে নেওয়া যাবে না। এমনিতেই তাঁর উপর আনিত অভিযোগের প্রমাণ নেই। আবার রিমান্ড? হাসালেন!”
“আপনেরা চাইলে সব সম্ভব!”
অনিন্দিতা যাওয়ার আগে দরজা ঘুরে তাকাল, “আপনার জন্য আরেকটা সুসংবাদ, ইয়াসিফের জামিনের ব্যবস্থা হয়ে গেছে। খুব তাড়াতাড়ি ছাড়া পাবে।”
বলেই তিনি চলে গেলেন। মকবুল রহমান আর তাওহীদ চোখ চাওয়াচাওয়ি করল। তিনি ভাবছিলেন শহরে যাবেন। কিন্তু এই অবস্থায় হয়ত বের হওয়া ঠিক হবে না। তার জীবনেরও ঝুঁকি আছে।
তাওহীদের চোখে আগুন জ্বলে উঠল। নিশ্চিত ওই শিশির সব নিয়ন্ত্রণের হুঁশিয়ার তন্ত্রী। দাঁতে দাঁত চেপে বলল, “আব্বা মনে হয়, শিশির সব করাইতেছে। ওর একটা ব্যবস্থা নেই।”
মকবুল রহমান ঘুরে তাকালেন, “যা মন চায় কর, কিন্তু সাবধানে, আড়ালে। দরকার হলে এই পুরো গ্রামটাকে শেষ করে দে। ছারখার করে জ্বালিয়ে-পুড়য়ে দে সব।”
তাওহীদ মনে মনে সে হিসাব কষছে শিশিরকে পাকড়াও করবে, সঙ্গে মৃন্ময়ীকেও। মেয়েটার খুব অহংকার! সে এর শেষ দেখে ছাড়বে। মেয়ের অহংকার ভেঙ্গে চুরমার করে মাটির সাথে মিশিয়ে দিবে। ভাবতেই তার শিরদাঁড়া বেয়ে শীতল স্রোত বয়ে গেল।
অনিন্দিতা রায় এক এক করে গ্রামের সব মানুষের সঙ্গে, অর্থাৎ যারা এই ঘটনার সাথে কোনো না কোনোভাবে জড়িত তাদের সাথে কথা বললেন। চেয়ারম্যান, মেম্বার কাউকে বাদ দিল না। কিন্তু কোথাও থেকে কোনো সুরাহা, কোনো স্পষ্ট উত্তর পেলেন না। সব জায়গায় নীরবতা, অস্বচ্ছতা। কেউ তথ্য দিতে রাজি নয়, কেউই দায়ভার নিতে চায় না। যারা প্রমাণ দিতে পারত, তারা পালিয়ে গেছে অথবা চুপ করে আছে।
অনিন্দিতাকে হতাশা ঘিরে ধরল। এই কেসের জটিলতা সাধারণ আইন বা প্রশাসনের মাধ্যমে মেলানো কঠিন। খুনির খেলা নিখুঁতভাবে সাজানো, যে কোনো সরাসরি তথ্য পাওয়া প্রায় অসম্ভব।
মৃন্ময়ী মায়ের পাশে সেবা করছিল। এত ভাল সইতে না পেরে অর্ধেক মরে যাওয়া মায়ের ব্যথা লাঘব করার জন্য মাথা টিপে দিচ্ছে। রওশন আরা টুকটাক কথা বলার চেষ্টা করল, গ্রাম সম্পর্কিত খবর জানাতে চাইল, “মৃন্ময়ী মা, গ্রামে কি ঘটছে? কারা খু’ন হইতাছে? কে করতাছে? পুলিশ ম্যাডাম আইছিল কিয়ারে?”
মৃন্ময়ী নির্বিকার ভঙ্গিতে তাকিয়ে বলল, “কইতে পারি না মা। তোমার এসব ভাবতে হইব না। তুমি চুপচাপ শুইয়া থাকো।”
রওশন আরা কোমল দৃষ্টিতে মেয়ের দিকে হাত বাড়িয়ে বললেন, “তুই আর বাইরে যাইস না মা। আমার লগেই থাক। আমার লগেই থাক…”
“আইচ্ছা, আছি মা।”
মাকে খাইয়ে দিয়ে মৃন্ময়ী উঠোনের কলপাড়ে বসে এঁটো থালাবাসন মাজছিল। কলের পানির একটানা শব্দে মাথা ধরে গেছে। এমন সময় দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকতে দেখা গেল শিশিরকে। মৃন্ময়ী উঠে এসে হাত ঝাড়ল। শিশির একটু চিন্তিত গলায় বলল, “তুমি নাকি আমাকে খুঁজতে বাড়িতে গিয়েছিলে? কিছু হয়েছে?”
মৃন্ময়ী সরাসরি চোখে চোখ রেখে বলল, “না। কিন্তু হইতে পারে।”
শিশির ভ্রু কুঁচকাল, “কী?”
মৃন্ময়ী অনুরোধের সুরে বলল, “আপনি এই গ্রাম ছাইড়া চইলা যান। তাওহীদ আপনের পেছনে লাগছে। আপনেরে খুঁজতেছে।”
মৃন্ময়ীর অস্থিরতা দেখে শিশির সত্যিই থমকে গেল। এই মেয়েটা এমন করছে কেন? সবসময় রুক্ষ, ঠোঁট আঁটসাঁট করে রাখা, চোখে ‘ডোন্ট কেয়ার’ ভঙ্গিটা আজ নেই। আজ ও দুর্বল, ভেতরটা ভাঙাচোরা। শিশির এগিয়ে এসে নরম গলায় বলল, “কি হয়েছে বলো তো আমাকে? আমাকে তাওহীদ কেন খুঁজবে?”
মৃন্ময়ী কিছু বলতে পারল না, ঠোঁটজোড়া কেঁপে উঠল। চোখের কোণে জমে থাকা অশ্রুকণা আর ধরে রাখতে পারল না। হঠাৎ করেই হাউমাউ করে কেঁদে উঠল। ঝাপসা দৃষ্টিতে ও শিশিরের অবাক হয়ে যাওয়া মুখটা দেখল। সেই অবাক দৃষ্টির ভেতরেও একরাশ চিন্তা, একরাশ প্রশ্ন। কিন্তু কোনো প্রশ্নের উত্তর ওর কাছে নেই। থাকলেও বলা যাবে না… মৃন্ময়ী দু’হাতে শিশিরকে ঠেলে দিল। কাঁদতে কাঁদতেই বলল, “আপনি গ্রাম ছাইড়া যান, এখনই যান।”
শিশির খুব আলতো করে মৃন্ময়ীর কাঁধে হাত রাখল। নিচু গলায় বলল, “আমাকে সবটা পরিষ্কার করে বলো।”
মৃন্ময়ী চোখ তুলে তাকাতে পারল না। ভাঙা কণ্ঠে যতটুকু পারল, বলল। তাওহীদের সন্দেহ, হিংস্রতা আবার কিছু কথা গলার ভেতরেই আটকে থাকল। শেষে কাঁপা স্বরে বলল, “আমি আর কাউরে হারাইতে চাই না। হারাইতে হারাইতে আমি এখন নিঃশেষ। আপনি চইলা যান, ওরা আপনেরে…” কথাটা শেষ হলো না।
শিশির চোখ তুলে তাকাল। মুখে শান্ত অভিব্যক্তি। ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি ফুটে উঠল, “তাওহীদ তোমাকে বিভ্রান্ত করার জন্য এসব বলেছে। মাথা থেকে ঝেড়ে ফেল তো সবট।”
মৃন্ময়ী দ্রুত বেগে মাথা নাড়ল, “না না…”
শিশির এক পা এগিয়ে এসে স্পষ্ট গলায় বলল, “আমার জন্য এত চিন্তা কীসের তোমার? আমি ম’রে গেলে কার কি?”
মৃন্ময়ী কেঁপে উঠল আচমকা। চোখের পানি গড়িয়ে পড়ল গালে, “আপনের মা–বাবা কষ্ট পাবে।”
“আর তুমি? তুমি পাবে না?”
মৃন্ময়ী কিছুই বলতে পারল না। মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল। তার কান্নার বেগ একটু কমলেও শরীরের কাঁপুনি থামেনি। শিশির এক পা আরও এগিয়ে এলো। মৃন্ময়ীর চিবুক আলতো করে ছুঁয়ে ওর মুখটা একটু উঁচিয়ে ধরল। শিশিরের শান্ত চোখে তখন গভীর অনুসন্ধান চলছে। সে দৃঢ় কণ্ঠে বলল, “চুপ করে থেকো না মৃন্ময়ী। আমাকে গ্রাম ছেড়ে চলে যেতে বলছ, আমার জীবনের মায়া করছ এসব কেন? কেবল একজন অপরিচিত মানুষের জন্য? নাকি অন্য কিছু?”
মৃন্ময়ী মাথা নাড়িয়ে সম্মতি জানাল যে, ও সত্যিই ভয় পাচ্ছে। ওর চোখের পানি তখন শিশিরের আঙুলে এসে ঠেকেছে। শিশির সোজাসুজি চোখের দিকে তাকিয়ে প্রশ্নটা ছুঁড়ে দিল, “কেন? আমাকে ভালোবাসো?”
মুহূর্তের জন্য পুরো পৃথিবীটা স্তব্ধ হয়ে গেল। মৃন্ময়ীও স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে রইল। এই প্রথম শিশির স্পষ্টভাবে ওর হৃদয়ের সেই গোপন ক্ষতটা সরাসরি স্পর্শ করল, যা নিজেও স্বীকার করতে ভয় পেত। ও ছিটকে যেতে চাইল, কিন্তু পারল না। তার বুক ফেটে কান্না এল। ধরা গলায় কোনোমতে বলল, “এইসব কথা কওনের সময় এইটা না। আপনে জানেন না ওরা কতটা ভয়ংকর! এখন ওরা খুনের নেশায় উন্মাদ হয়া আছে। আপনে শিক্ষিত মানুষ, আপনের ভবিষ্যৎ আছে। আমার মতোন এক অভাগীর লাইগা নিজের জীবনটা বিপদে ফালাইয়েন না।”
শিশির বিষাদের সুরে হাসল, “ভবিষ্যৎ? যে গ্রামে মানুষ পশুর মতো মরে, যেখানে বিচার নাই, সেখানে কিসের ভবিষ্যৎ মৃন্ময়ী? তুমি ভাবছ, আমি চলে গেলে আমি বেঁচে যাব। কিন্তু তুমি? তুমি তো এই নরকেই পড়ে থাকবে। তাওহীদের লোলুপ দৃষ্টি তোমার উপরেও আছে। আমি চলে গেলে তোমাকে বাঁচাবে কে?”
মৃন্ময়ী ফুঁপিয়ে উঠে বলল, “আমার কপালে যা আছে হবে, কিন্তু আপনের কিছু হইতে দিব না। ওগো সন্দেহ একবার যার ওপর পড়ে, তার নিস্তার নাই।”
শিশির মৃন্ময়ীর দু’হাত শক্ত করে ধরল, “তাহলে স্বীকার করো। আমাকে চলে যেতে বলছ কারণ তুমি চাও আমি বেঁচে থাকি। তুমি আমাকে ভালোবাসো বলেই এই আকুতি, তাই না?”
মৃন্ময়ী মাথা নিচু করে ঝরঝর করে কেঁদে দিল। অস্ফুট স্বরে বলল, “বাসি কি না জানি না, শুধু জানি আপনের কিছু হইলে আমি সইতে পারব না। কলিজাটা ছিঁড়া যায় ওসব ভাবলে।”
চারদিকে আসন্ন বিপদের ঘনঘটা, পেছনে জমিদার বাড়ির অন্ধকার ষড়যন্ত্র, আর সামনে দাঁড়িয়ে থাকা ভীত তড়িৎকন্যার পাশে এসে দাঁড়াল শিশির। ফিসফিস করে বলল, “তবে শোনো, আমি কোথাও যাচ্ছি না। যে আগুন লেগেছে, তার শেষ না দেখে আমি পালাব না। তুমি সব জানো তো? চলো আমার সাথে, থানায় যেতে হবে।”
মৃন্ময়ীর চোখে আতঙ্ক ঘনিয়ে এল। তবে শিশিরের অবিচল আত্মবিশ্বাস ওর মনে দোলা দিল। ভয়ের মেঘ পুরোপুরি না কাটলেও, রাজি হলো। শিশির আবার তাগাদা দিল, “দেরি করার সময় নেই মৃন্ময়ী।”
মৃন্ময়ী দ্বিধায় পড়ল। ভেতরে তার অসুস্থ মা শুয়ে আছে। ও ঘরে ঢুকে রওশন আরার পাশে গিয়ে বসে কপালে হাত রাখল। বলল, “মা, আমি একটু আসতেছি। জরুরি কাজ আছে।”
রওশন আরা মেয়ের হাত শক্ত করে ধরে আতঙ্কিত গলায় বললেন, “বাইরে যাস না মা! চারদিকের অবস্থা ভালো না।”
মৃন্ময়ী মায়ের হাতটা আলতো করে ছাড়িয়ে নিয়ে বলল, “কিছু হইব না মা। সাথে তোমাদের মাস্টার আছে, আমি তাড়াতাড়ি আসুম।”
মায়ের নিষেধ আর চোখের জল উপেক্ষা করেই মৃন্ময়ী ঘর থেকে বেরিয়ে এল। শিশির বাইরে অপেক্ষা করছিল। দুজন গ্রামের নির্জন মেঠো পথ পেরিয়ে থানার দিকে এগোচ্ছিল। কয়েকটা বুনো পাখির ডাক আর শুকনো পাতার মড়মড় শব্দ ছাড়া আর কিছুই শোনা যাচ্ছিল না। গ্রামের মোড় পার হয়ে বাজারের দিকে যেতেই নিস্তব্ধতা ভেঙে কয়েকটা বাইকের গর্জন শোনা গেল। মুহূর্তের মধ্যে হেডলাইটের তীব্র আলোয় তাদের চোখ ধাঁধিয়ে গেল। সামনে থেকে চার-পাঁচজন মুখোশধারী লোক পথ আটকে দাঁড়াল। প্রত্যেকের হাতে দেশীয় অস্ত্র আর লাঠি। শিশির মৃন্ময়ীকে আগলে ধরে পেছনে সরিয়ে দিল। দৃঢ় গলায় জিজ্ঞেস করল, “কে তোমরা? পথ ছাড়ো।”
মুখোশধারীদের মধ্য থেকে একজন কর্কশ হাসিতে ফেটে পড়ল। মৃন্ময়ী ভয়ে শিশিরের শার্ট খামচে ধরল। তাওহীদের লোকগুলো নিশ্চয়ই তাদের ওপর নজর রাখছিল। হঠাৎ কিছু বুঝে ওঠার আগেই পেছন থেকে ভারী কোনো বস্তু দিয়ে দুজনের মাথায় সজোরে আঘাত করা হলো। তীব্র যন্ত্রণায় জ্ঞান হারিয়ে লুটিয়ে পড়ল ওরা। মুখোশধারীরা সময় নষ্ট না করে অবশ দেহ দুটিকে পাঁজাকোলা করে তুলে নিল। ছুটল গ্রামের শেষ প্রান্তে থাকা পরিত্যক্ত ইটভাটার দিকে। জনশূন্য সেই জায়গায় শুধু আগুনের উত্তাপ আর ধ্বংসের গন্ধ; যেখানে নিষ্ঠুর পরিণতির অপেক্ষায় বসে আছে তাওহীদ।
.
অরুনিমা অস্থিরভঙ্গিতে পায়চারি করছিল। ওই গ্রামের প্রতিটি লোমহর্ষক ঘটনার খবর ওর কানে পৌঁছেছে। অরুনিমার কপালে চিন্তার ভাঁজ আরও গভীর হলো। বিড়বিড় করে নিজেকেই নিজে প্রশ্ন করল, “কে করছে এসব? ওদের সাথে আসল শত্রুতা তো আমার। আর কে আছে যে এইভাবে একে একে সবাইকে সরিয়ে দিচ্ছে? কে আমার আগেই প্রতিশোধের খেলা শুরু করে দিল?”
এমনিতেই গ্রামের পরিস্থিতি নিয়ে মাথা ঠিক নেই, তার ওপর ঘরের ভেতরেও অস্বস্তি। গতকাল রাতে শান্তকে নিয়ে প্রণয়ের সাথে বড়সড় একটা ঝগড়া হয়ে গেছে। অরুনিমা সোফার হাতলে সজোরে চাপ দিল। ওর মাথায় কিছুতেই ঢোকে না, অন্যের ছেলের প্রতি প্রণয়ের এত দরদ কিসের? শান্ত কেন প্রণয়কে এত বিচলিত করে তোলে?। অথচ শান্তকে ও নিজের পেটে ধরেছে, মা হয়েও সে শান্তর প্রতি ওইরকম অন্ধ মমতা দেখাতে পারে না। মনের ভেতরটা পাথরের মতো শক্ত হয়ে গেছে। প্রণয়ের এই বাড়াবাড়ি বিষের মতো ঠেকছে। ও দীর্ঘশ্বাস ফেলে মাথাটা যতটা সম্ভব ঠান্ডা করার চেষ্টা করল। এগিয়ে গেল প্রণয়ের কাছে। দরজার পাশে দাঁড়িয়ে দেখল, প্রণয় খুব মন দিয়ে শান্তর সাথে খেলছে। শান্তর খিলখিল হাসিতে ঘরটা মুখরিত, কিন্তু সেই হাসি অরুনিমার বুকে কোনো দোলা দিল না। বরং প্রণয়ের এই একনিষ্ঠ মনোযোগ তাকে আরও বিড়ম্বনায় ফেলল। অরুনিমা শান্তর মাথার চুলে হাত বুলিয়ে মৃদু স্বরে বলল, “বাবা, তুমি একটু ওই ঘরে যাও তো। তোমার বাবার সাথে আমার কথা আছে।”
শান্ত বাধ্য ছেলের মতো এক কথায় খেলনা রেখে উঠে চলে গেল। প্রণয় ওর যাওয়ার পথের দিকে তাকিয়ে রইল, অরুনিমার দিকে একবারও চাইল না। অরুনিমা কুণ্ঠিত স্বরে বলল, “আমার ওপর এখনও রাগ করে আছো? কাল আসলে মাথাটা একটু গরম ছিল।”
প্রণয় শান্তর ফেলে যাওয়া খেলনাটার দিকে তাকিয়েই তাচ্ছিল্যের সাথে বলল, “তোমার মাথা ঠান্ডা থাকে কখন অরুনিমা? কিসের রাগ তুমি আমার ছেলের ওপর ঝাড়ো?”
অরুনিমার ভেতরের সেই পাথরচাপা বিরক্তিটা আবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠল। গলা নামিয়ে তীক্ষ্ণ স্বরে বলল, “ও কিন্তু তোমার রক্ত না প্রণয়, তোমার নিজের ছেলে না।”
প্রণয় উঠে দাঁড়াল। তার দুচোখে তখন আগুনের ফুলকি। সে অরুনিমার দিকে তর্জনী উঁচিয়ে ধমক দিল, “মুখ সামলে কথা বলবে। আর একটাও বাজে কথা যদি শান্তকে নিয়ে তোমার মুখ দিয়ে বের হয়, তবে আমি ভুলে যাব তুমি ওর মা!”
অরুনিমা প্রণয়ের চোখের দিকে সরাসরি তাকাল, “কেন এই দরদ প্রণয়? কেন নিজেকে এভাবে বিলিয়ে দিচ্ছ? আমি তো সত্যটাই বলেছি। যার পরিচয়টাই একটা মিথ্যে, তাকে নিয়ে এত আবেগ কেন? এভাবে পরগাছাটাকে কেন আঁকড়ে ধরছ?”
প্রণয় কিছুক্ষণ পাথরের মতো দাঁড়িয়ে রইল। তারপর ধীর পায়ে অরুনিমার কাছে এলো। রাগ মূর্ছা গিয়ে তার চোখে এখন গভীর আকুতি। শান্ত গলায় বলল, “রক্তের সম্পর্কই কি সব অরু? এই ছোট্ট ছেলেটা যখন দৌড়ে এসে আমায় জড়িয়ে ধরে, যখন ওর গলায় আমাকে ‘বাবা’ বলে ডাকে, তখন দুনিয়ার সব অশান্তি ভুলে যাই। ওই ডাকটার মধ্যে যে কতটা শক্তি আছে, তা বোধহয় তোমার এই পাথর হৃদয়ে কখনও পৌঁছাবে না।”
অরুনিমা মুখ ফিরিয়ে নিল। আবারও চোখজোড়া অশ্রুতে টইটুম্বর। প্রণয় অরুণিমার হাতদুটো আঁকড়ে ধরল, “তুমি অন্ধ হয়ে নিজের ভেতরটা পুড়িয়ে ছাই করে ফেলেছ। তাই একটা বাচ্চার নিষ্পাপ ভালোবাসা তোমার কাছে নাটক মনে হচ্ছে। কিন্তু আমার কাছে ওই ‘বাবা’ ডাকটাই বেঁচে থাকার একমাত্র রসদ। তুমি যাকে পরগাছা বলছ, সেই আমাকে নতুন করে বাঁচতে শিখিয়েছে।”
অরুনিমা তাচ্ছিল্যের সুরে বলল, “আবেগ দিয়ে জীবন চলে না প্রণয়। তুমি জানো ও কার অংশ। ওর অস্তিত্ব আমার পরাজয়।”
প্রণয় দীর্ঘশ্বাস ফেলে উঠে দাঁড়াল। যাওয়ার আগে শুধু একটা কথা বলে গেল, “পরাজয় ওর অস্তিত্বে নয়। পরাজয় তোমার ঘৃণায়। তুমি যদি কখনও ওকে মন থেকে মা ডাকার অনুমতি দিতে, তবে দেখতে এই পৃথিবীটা অতটাও নিষ্ঠুর না।”
অরুনিমার চোখের কোণটা চিকচিক করে উঠল। প্রণয় যখন ঘর থেকে বেরিয়ে যাচ্ছিল, অরুনিমা বিদ্যুৎবেগে গিয়ে তার হাতটা শক্ত করে আঁকড়ে ধরল। যেন এই হাতটা ছেড়ে দিলেই সে কোনো এক অতল গহ্বরে হারিয়ে যাবে। রুদ্ধ স্বরে বলল, “আমি ওই জানোয়ারটাকে কখনোই ক্ষমা করতে পারব না। ওর দেওয়া প্রতিটি ক্ষত আজও দগদগে।”
প্রণয় অরুনিমার দিকে ঘুরে তাকাল। নরম গলায় বলল, “ক্ষমা করতে হবে না, শুধু ভুলে যাও। নিজের শান্তির জন্য হলেও অতীতটাকে মাটি চাপা দাও।”
অরুনিমা তীব্র যন্ত্রণায় মাথা নাড়ল, “কীভাবে? পারি না তো। ও আমাকে মিথ্যে প্রতিশ্রুতি দিয়ে বিয়ে করেছিল, আমার সরলতার সুযোগ নিয়ে তিলে তিলে আমাকে শেষ করে দিয়েছে।”
প্রণয় কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে অরুনিমার চোখের দিকে চাইল। তারপর খুব সাবধানে একটা প্রস্তাব দিল, “যাবে গ্রামে? অনেক বছর তো হলো। দূর থেকে এক পলক দেখে আসবে তোমার বাবা-মাকে? আমরা আমাদের আসল পরিচয় দিব না। কেউ জানবে না আমরা কে।”
ফেলে আসা গ্রাম, বাবা-মায়ের মুখ ঝাপসা হয়ে চোখের সামনে ভেসে উঠল। অপমানের দগদগে ঘা-য়ের পাশে একবিন্দু সুপ্ত মমতা বোধহয় এখনও কোথাও অবশিষ্ট ছিল। ও সম্মতিসূচক মাথা নাড়ল।”
.
.
.
চলবে….
