#মরিচীকা
#পর্ব ১৩
#মাকামে_মারিয়া
অন্ধকার রাতের পর ভোরের দেখা মিললো। সারারাত তাযিনের ঘুম হলো না। কেনো হলো না জানে না। এপাশ ওপাশ করেছে। নাজেরাকে পড়া গুলো সেন্ট করে ফোন অফ করে রেখে দিয়েছে। কেন জানি কথা বলতে ইচ্ছে করে না। চোখের দিকে তাকাতেও পারে না। কেবল মনে হয় সে অন্য কারো আমার না। এপাশ ওপাশ করতে করতেই রাত শেষ হলো। ফজরের আজান কানে এসেছে, সারারাত ঘুম হয়নি বিধায় শরীর বড্ড খারাপ লাগছে। সোফিয়া বোধহয় ছেলের অস্থিরতা টের পেয়েছেন। মায়েরা নাকি সন্তানের দুঃখ কষ্ট একটু আগেই টের পেয়ে যায়।
তাযিন জেগে আছিস?
তাযিন বালিশে মুখ চেপে রেখে বললো, হুমম।
ঘুম হয়নি?
তাযিন চুপ করে রইলো। মাথা ঘুরাচ্ছে, বমি বমি লাগছে। ঘুম না হলে এমনই লাগে।
মা একটা কথা বলবো শুনবি বাবা?
তাযিন বিরক্ত হয়ে বললো, তোমার কোন কথা আমি শুনি না আম্মু?
সোফিয়া রুমের লাইট অন করলো,ছেলের মাথার পাশে বসে চুল গুলো গুছিয়ে দিতে দিতে বললো, উঠে মসজিদে যা-ও। নামাজটা পড়ে আসো। একটু হাটাহাটি করো দেখবে ভালো লাগবে। শরীর মন দুটোই হালকা লাগবে।
তাযিন এমনিতে খুব দুষ্ট কিন্তু মায়ের ভক্ত ভীষণ। মা যেটা বলে সেটাই করে, কখনো অবাধ্য হয় না।
নামাজ পড়ে কি মনে করে ছাঁদে চলে আসলো। কথা ছিল ছাঁদে আসবে না। নাজেরার মুখোমুখি হতে চায় না। কিন্তু চলেই আসলো যদিও এই সকালে সে আসবে না ছাঁদে।
বেশ অনেক্ক্ষণ যাবৎ ছাঁদে বসে ছিল, সত্যি মনটা হালকা লাগছে। মৃদু ঠান্ডা বাতাসে বমি বমি ভাবটা আর নেই। সূর্য উঁকি দিতেই নাজেরাও উঁকি দিলো। দুজনেরই স্বভাব ছাঁদে এসেই প্রথমে পাশের বাসার ছাঁদের দিকে তাকানো। এটা একটা লিখিত স্বভাব হয়ে গিয়েছে যেনো। তাযিন বসে বসে ঝিমাচ্ছে। নাজেরা ডেকে বললো—
জিলাপি! ঘুমাচ্ছিস যে? রাতভর কি করেছিস?
তাযিন কিছুটা ভয় পেয়েই চোখ মেললো। নাজেরা দাঁড়িয়ে আছে হাসি মুখে। ভালো লাগছে মেয়েটাকে। মিষ্টি করে হাসে। তাযিনের লোভ হচ্ছে, খুব করে চাচ্ছে প্রতিটা সকাল এমন হোক, নাজেরার মিষ্টি হাসি দেখে যদি প্রতিটা সকাল হয় তবে রাতভর না ঘুমিয়ে কাটিয়ে দিতেও রাজি।
কিরে? কিছু বলছিস না যে? আজকাল তোর হয়েছে কি বল তো? একদম চুপচাপ থাকিস?
তাযিন দেয়ালে হেলান দিয়ে বসে ছিল। উঠে এসে রেলিং এর পাশে নাজেরার মুখোমুখি দাড়িয়ে বললো, কই কিছু না তো। তুই এতো সকালে?
রেলিং এর কারনে নিচে থাকা ফুলের গাছ গুলো দেখা যাচ্ছিল না। নাজেরা নিচু হয়ে সেগুলো একটু দূরে সরিয়ে রেখে বললো, দেখ তো দেখা যায়?
হ্যাঁ দেখতে পাচ্ছি। গোলাপ গাছ যে।
নিহাল কিনে দিয়েছে। সুন্দর না?
তাযিন চুপসে গেলো। শান্ত কন্ঠে বললো, খুব সুন্দর।
নাজেরা উৎসাহী কন্ঠে বললো, তিনটা গাছ, তিন কালার ফুল। লাল, গোলাপি, আর সাদা। একটা আমি একটা নিহাল আরেকটা তুই। গোলাপি আর লাল হলো আমি আর নিহাল, আর এই যে এই সাদাটা তুই।
মেয়েটার চোখে মুখে সে কি আনন্দ, কত সহজ ভাবে কথাগুলো বলে যাচ্ছে অথচ তাযিনের মনের ভেতরকার অবস্থা করুণ।
বরিশাল যাচ্ছি। তাযিন বললো।
হঠাৎ বরিশাল যাচ্ছিস কেনো?
অনেক কিছুই তো হঠাৎ হয় নাজেরা।
তোর মন খারাপ তাযিন?
মনে হয়।
কি হয়েছে বল তো? জেনিফা দেখলাম গাল ফুলিয়ে রেখেছে। আমাকে দেখে কেমন যেনো করলো। আমি কি কিছু করেছি? ওমন ফুলে আছে কেন? এদিকে দেখি তোরও মন খারাপ। বাই এনি চান্স তোদের মধ্যে কিছু-মিছু হয়নি তো?
তাযিনের ইচ্ছে করলো নাজেরার গালে ঠাটিয়ে একটা থাপ্পড় মারতে। কেমন উল্টো বুঝে মেয়েটা। যার জন্য রাতের ঘুম উড়ে যাচ্ছে সে-ই কিনা এমন অবুঝের মতো কথাবার্তা বলে যাচ্ছে। নিজেকে শান্ত করলো সে, যেই মেয়েকে খুশী রাখতে নিজের সবটা বিলিয়ে দিতো তাকে কি করে মারবে! মেরে তো আর কাউকে কিছু বুঝানো সম্ভব নয়। আর যেই গালে একটা সময় আদর করে, দুষ্টমির ছলে চুমু খেতো সেই গালে মারবে?
ওরা যখন খুব ছোট, সোফিয়া প্রায় নাজেরাকে নিজেদের কাছে নিয়ে আসতেন। জামিনা এতে অবশ্য খুশীই হতো। ঝামেলা নিতে ইচ্ছুক ছিল না সে। তাই নাজেরা সোফিয়ার কাছে থাকতো অনেকটা সময়। তাযিন আর জাহেরা হাঁড়িপাতিল খেলতো। বউ পুতুল খেলতো, মাঝে মাঝে যখন কোনো কিছু নিয়ে দুজনের মধ্যে তর্ক হতো, নাজেরা গাল ফুলিয়ে বসে থাকতো। বলতো, তোর সাথে আমি খেলবোই না৷ তুই পঁচা।
তাযিন ছোট্ট নাজেরার গাল চেপে চুমু দিয়ে বলতো, এই যে তোকে আদর করে দিয়েছি। এখনো কি আমি পঁচা?
নাজেরা কান্না করতে করতে গাল মুছতো আর বলতো, ছিঃ তুই আমায় চুমু দিয়েছিস কেনো? আমি আন্টির কাছে বলে দিবো।
তাযিন বুঝতো না এটা বিচারের কি হলো? সে ঠোঁট উল্টে বলতো, আমি রাগ করলে আম্মুও তো আমায় চুমু দিয়ে রাগ ভাঙায়। তাই তো আমিও চুমু দিলাম।
নাজেরা শর্ত জুড়ে দিতো,বলতো, কিন্তু তুই রাগ করলে আমি চুমু দিয়ে রাগ ভাঙাবো না। তাযিন ঘাড় কাত করে বলতো, আচ্ছা। কিন্তু তুই কি ভাবে রাগ ভাঙাবি?
একদিন তাযিন সত্যি সত্যি খুব রাগ করলো। কারণ সে বার নাজেরা জন্মদিনে সে চট্টগ্রাম ছিল। তাযিন মনে মনে ভেবে রেখেছিলো এবার জন্মদিনে সারাদিন হাঁড়িপাতিল খেলবে। অন্য সময় আম্মু সারাদিন খেলতে দেয় না। জোর করে পড়তে বসিয়ে দেয়। নাজেরা চট্টগ্রাম থেকে এসেই সোফিয়া আন্টিদের বাসায় দৌড়ে চলে আসে। তাযিন বারান্দার এককোনায় বসে আছে চুপচাপ। তাকিয়ে আছে নাজেরাদের হলদে রংয়ের বাড়িটাতে। নাজেরা কি মনে করে দৌড়ে এসে ছোট্ট তাযিনকে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে ধরলো। বাচ্চাটার গুলুমুলু টসটসে গালে চুমু দিয়ে বললো, জানিস তোকে আমার এত্তগুলা মনে পড়েছে। দুহাত মেলে দেখালো। তাযিনের মন খারাপ প্রকাশ করার আগেই মন খারাপ উড়ে গেলো আকাশে।
এরপর আর দুজনের মধ্যে চুমু দিয়ে রাগ ভাঙানো হলো না। তারা বড় হয়ে গেলো। সোফিয়া আন্টি নিষেধ করে দিলো। ভীষণ যত্নে বুঝিয়ে দিলো তোমরা নারী পুরুষ। তোমাদের মধ্যে অনেক তফাৎ, সব সময় এমন জড়াজড়ি করতে হয় না। তোমরা খুব ভালো বন্ধু আমি জানি তাই বলে সব খুশীতে জড়িয়ে ধরতে হবে না। ঠোঁটের হাসি দিয়েও আনন্দ প্রকাশ করা যায়।
এরপর থেকে দুজনের দেহের দুরত্ব বাড়লো, ঠিক দুগুণে মনের দুরত্ব কমলো। কোনো কিছুতে খুশী হলেই আর দুজন দুজনকে জড়িয়ে ধরে না। চুমু দিয়ে রাগও ভাঙাতে হয় না।
তারাও ততদিনে সোফিয়া কি বুঝাতে চেয়েছিল সেটা বুঝে গিয়েছে। তাযিন এসব কিছু ভুলেনি। আশ্চর্যজনক ভাবে এগুলো স্মৃতিপটে খোদাই করা হয়ে গিয়েছে। কিন্তু নাজেরার এসব মনে আছে কিনা সে জানে না। কখনো এসব মনে করিয়ে মেয়েটাকে অস্বস্তিতে ফেলতেও মন চায়নি তার। যতই হোক সে মেয়ে মানুষ। মেয়েরা একটু বেশিই লজ্জাবতী হয়। আর নাজেরা বোধহয় একটু বেশিই লজ্জাবতী,সে অসভ্যতামি সহজে নিতে পারে না।
তাযিন কিছু না বলেই ছাঁদ থেকে বের হয়ে গেলো। রুমে গিয়ে ঘুমাবে, লম্বা ঘুমের পর বরিশালে চলে যাবে। সোফিয়া বলেছে কয়েকদিন বেড়িয়ে আসলে ভালো লাগবে।
নাজেরা আপন মনে যত্ন নিয়ে গাছগুলো তিনটা আলাদা টপে লাগিয়ে দিলো। সাদা ফুলের গাছটা মাঝে রাখলো দুপাশে লাল ও গোলাপি। তাযিন ওর কাছে একটা যত্নের নাম৷ এই ছেলের প্রতি প্রচন্ড মায়া কাজ করে একদম আপন লোকের মতো। এটার নাম প্রেম নয়,নাজেরার কাছে প্রেম হলো নিহাল।
______
জাহেরা ছাঁদে লুকিয়ে লুকিয়ে কামরান হায়দার এর সাথে প্রেম আলাপ করছিলো। নিহাল পিছন থেকে এসে ফোনটা হাতে নিয়ে নিলো।
কানে ধরে বললো, কিরে বইন জামাই! আমার চাচাতো বোনের জামাই হওয়ার খুব শখ তাই না রে? তোরে সামনে পাইলে জামাই আদর করবো।
কামরান হায়দার কিছুটা তোতলানো স্বরে বললো, এই তুই কে রে? চিনিস আমাকে? আমি এলাকার নেতা। সবাই লিডার ডাকে আমারে।
নিহাল বললো, হ্যাঁ তুই যে এলাকার পাতি নেতা সেটা আমি জানি। বেচারা জাহেরাকে মুরগী বানিয়েছিস। জাহেরার দিকে ফিরে রেলিং এ হেলান দিলো, হাতটা জাহেরার গালে রেখে কামরানকে বললো, ভাগ্যিস এই গাধাটাকে পটিয়েছিস। তোর উছিলায় এই ন্যাকাবতীকে প্রতিদিন একটা দুটো থাপ্পড় মারতে পারি।
কামরান হায়দার উত্তেজিত হয়ে বললো, তুই আমার প্রেমিকারে থাপ্পড় মারিস? তোর এতো বড় সাহস?
নিহাল ব্রু কুঁচকে বললো, থাপ্পড় মারবো না তো কি চুমু দিবো?
বুঝছিস ভাই, মেয়ে মানুষকে থাপ্পড় মারা যে এতো মজার তোর মুরগীটাকে থাপ্পড় না মারলে জানতেই পারতাম না। তোরে ধন্যবাদ দিলেও কম হয়ে যাবে। কাছে থাকলে চুম্মা দিতাম।
ছিহ নিহাল ভাই! তুমি কামরানকে কেনো চুমু দিতে যাবে? জাহেরা উত্তেজিত হয়ে নাক কুঁচকে বললো।
নিহালের মুখ ফস্কে বেরিয়ে এলো,তাহলে কি তোকে চুমু দিবো?
জাহেরা আমতাআমতা করে বললো,ছিঃ আমাকে কেনো দিবে!
কামরান হায়দার ফোনের ওপাশ থেকে এবার বেশ রেগেমেগে বললো, এই সম্বন্ধী! চুম্মা চাটির ক্লাস নিতাছোছ নাকি! শুরু টা করলি কি!
নিহাল ফোনটা কান থেকে সরিয়ে ফেললো। জাহেরা ইশারা দিয়ে বললো, সে আমায় তুইতোকারি করছে।
জাহেরা ভয় পেলো। কামরানের তুইতোকারি করা ওর পছন্দ হলো না। নিহাল কিছু বলার আগেই হায়দার উত্তেজিত হয়ে বললো, বিকেল চারটাই তুই হাইস্কুল মাঠে আসবি। আমি আমার ছেলেপুলেদের নিয়া তোরে আপ্যায়ন করার জন্যে অপেক্ষা করুম।
নিহাল কলটা কেটে ফোনটা নিজের কাছে রেখে দিলো। জাহেরা ভয়ে ভয়ে নিহালের পিছন পিছন এসে জিজ্ঞেস করলো, কামরান কি বলেছে নিহাল ভাই?
নিহাল ধমকে উঠে বললো, চুপ! প্রেম করার জন্য আর ছেলে পাও নাই? এর নামেই তো যত গন্ডগোল। কামড়াকামড়ি নাম। নেক্সট এ প্রেম করার সময় নাম ঠিকঠাক আছে কিনা দেখে নিবে৷
জাহেরা পড়েছে মহা ঝামেলায়। কোন ভূতে ধরেছিল যে কামরানের সাথে প্রেম করতে গেলো। বান্ধবীদের ফাঁদে পড়েই এই দশা হলো। না হয় জাহেরার তো প্রেম ভালোবাসার প্রতি একদমই আগ্রহ নেই। ওর আগ্রহ কেবল সাজুগুজুর প্রতি। সেজেগুজে পটের বিবি হয়ে থাকতেই ভালোবাসে। ভীষণ আধুনিক সে।
চলবে………..
#মরিচীকা
#পর্ব ১৪
#মাকামে_মারিয়া
জাহেরা পালিয়ে গেলো কামরান হায়দারের সঙ্গে। পালিয়ে অন্য কোথাও নয় বরং একই এলাকায় কামরান হায়দারের বাড়িতে গিয়ে উঠলো। হায়দারের নাকি সম্মানে লাগে একজন এলাকার বড় ভাই হয়ে সে প্রেমিকা নিয়ে এলাকা ছেড়ে কি ভাবে যাবে? তাহলে এলাকাবাসী এমন বড়ভাইকে ভরসা করবে কি ভাবে? যে কিনা পালিয়ে যায়।
নুরজাহান তড়িঘড়ি করে রেডি হলো বের হওয়ার জন্য। জামিনাকে বললো সে বাপের বাড়ি যাচ্ছে। নাজেরা সামনেই ছিল, নুরজাহানকে এতো তাড়াহুড়ো করে বাপের বাড়ি যেতে দেখেনি কখনো। মনে ভয় ঢুকলো। কিছু হলো না তো সেখানে? নুরজাহানের বাপের বাড়ি যে নিহালেরও বাড়ি।
জিজ্ঞেস করলো, ভাবি কিছু হয়েছে? মামা মামি ঠিক আছে?
নুরজাহানের চোখ মুখে ভয় তাও ধমক দিয়ে বললো, তোমাকে ওতো সব জানতে হবে না নাজেরা। আন্টির দিকে খেয়াল রাখিও। আমি আসি।
জামিনা গেইট অব্দি এগিয়ে দিয়ে আসলো। নাজেরাও পিছু পিছু আসলো। জামিনা ফিরতেই জিজ্ঞেস করলো, আম্মু কিছু কি হয়েছে?
জামিনা একবার মেয়ের মুখের দিকে তাকালো। এই মেয়ের মুখের দিকে উনি খুব কম তাকায় কারণ সে প্রায় খেয়াল করেছে এই মেয়ের মুখের দিকে তাকালে আর বকা দিতে পারে না,রাগ দেখাতে পারে না। বড্ড মায়া তার মুখে। অবশ্য মাঝে মাঝে রাগের মাথায় ডাকে মায়াবিনী বলে। সবাইকে নাকি মায়ার জালে আঁটকে ফেলে।
জামিনা বললো, রুমে যাও। পড়তে বসো, কোথায় কি হয়েছে সব তোমার জানা লাগবে কেনো!
নাজেরা মাথা চুলকে বললো, আসলে আম্মু। চিন্তা হয়না তো তাই।
তোমাকে এতো চিন্তা করতে কে বলছে? নিজের চিন্তা নিজেই করো।
জামিনা দ্রুত পায়ে রুমে চলে গেলো। নাজেরা গেলো কিচেনে। আজকে ক্লাস ছিল না। ক্লাস না থাকলে বাড়ির সব কাজ সে একাই করে। যেদিন ক্লাস থাকে সেদিন মালেকা বেগমকে খবর দিয়ে যায়। সে এসে কাজকর্ম করে ফেলে।
সূর্য উঁকি দিয়েছে আজ। নাজেরা কাজ শেষ করলো নিহালকে নিয়ে চিন্তা করতে করতে। কাজ শেষ করেই দ্রুত রুমে এসে ফোন হাতে নিলো নিহালের খবরাখবর জানার জন্য। খুব চিন্তা হচ্ছে। একটা মানুষের জন্য এতো চিন্তা হতে পারে সেটা নিহালের সাথে প্রেম না করলে বোধহয় সে রিয়েলাইজ করতে পারতো না। হুটহাট মনের মধ্যে এসে চিন্তারা বাসা বাঁধে। কেবল মনে হয় নিহাল ঠিক আছে তো?
তিনবার কল করেও নিহালকে পেলো না। চিন্তা আরও বেড়ে গেলো। বারান্দায় পায়চারি করতে করতে হঠাৎ চোখ পড়লো ঠিক সামনের বিল্ডিং এর বারান্দায়। খাঁচায় থাকা টিয়া পাখিটা অস্পষ্ট ভাবে জারুলতা জারুলতা বলছে। নাজেরা আশ্চর্য হয়ে গেলো, ঠোঁটের কোণে অজান্তেই হাসি চলে আসলো। বারান্দার গ্রিল ঘেঁষে দাঁড়িয়ে টিয়া পাখিটার দিকে তাকিয়ে রইলো। পাখিটা তাযিনের, আর সামনের বারান্দাটা ওই বাঁদরেরই। তাযিন বেশ কয়েকমাস আগেই এই পাখিটা কিনে এনেছিলো। নাজেরা প্রায় দেখতো পাখিটার সাথে তাযিন কথা বলে, কি যেনো শিখায়। নাজেরা একদিন বায়না ধরলো, তোর পাখিটা কথা বলতে পারে তাযিন?
তাযিন বার দুয়েক নাজেরাকে এড়িয়ে গেলো। বোধহয় পাখির প্রসঙ্গে আসতে চাইছে না। কিন্তু নাজেরাও নাছোড়বান্দা সে একদম চেপে ধরে বললো, বল না তোর টিয়া কথা বলতে পারে?
তাযিন বললো, না কথা বলতে পারে না।
তাহলে তোকে যে দেখি ওটার সাথে কথা বলিস সারাক্ষণ।
তাযিন দুষ্টমির ছলে বলেছিল, খবরদার আমাদের দিকে নজর দিবি না। আমি আর টিয়া চুপিচুপি প্রেম করি বুঝলি? ওসব প্রেমের ভাষা তুই বুঝবি না। টিয়া কথা না বলতে পারলেও আমার কথা বুঝে।
নাজেরা সেদিন চেপেই ধরেছিল টিয়ার সাথে সেও কথা বলতে চায়। কিন্তু তাযিন পুরোপুরি বাঁধা দিয়ে দিলো, নাজেরা দেখা করতে পারবে না। কিন্তু কেন?
তাযিন বলেছিলো টিয়ারে একটা কথা শিখাচ্ছি। সেটা শিখে গেলে তারপর তোর সাথে দেখা করিয়ে দিবো। নাজেরার মনে হলো ব্যাপারটা ইন্টারেস্টিং। তাই মেনে নিলো। কিন্তু নিহালের সাথে প্রেমে মজে যে অনেক কিছুই সে ভুলে গিয়েছে সেটা এইমাত্র টিয়াকে দেখেই মনে হলো। আরও বেশি আশ্চর্য হলো এটা দেখে যে টিয়া জারুলতা বলে ডাকছে। জারুলতা একমাত্র সোফিয়া আন্টি এবং তার ছেলে তাযিনই মাঝে মাঝে বলে, খুব অল্পই বলে। এখন কিনা টিয়াও বলছে।
কিছু সময়ের জন্য নিহালের চিন্তা মাথা থেকে বের হলো, আরও বেশি নিশ্চিন্ত হলো নিহালের মেসেজ পেয়ে। নিহাল টেক্সট করেছে — শ্যামলি, আমি ঠিক আছি চিন্তা করো না। তোমার বেশি কল টেক্সট দেওয়ার চিহ্নই বুঝায় তুমি চিন্তিত। চিন্তার কিছু নেই আমি একটু কাজে আঁটকে গিয়েছি। ফ্রি হয়ে কল দিচ্ছি।
নাজেরা তাযিনকে কল করলো কিন্তু বন্ধ দেখাচ্ছে। প্রায় তিনদিন হলো সে বরিশালে গিয়েছে। যাওয়ার দিন কি মনে করে বারান্দায় এসে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে ছিল। নাজেরা তখন কিচেনে সে-ও কোনো কারণ ছাড়াই রুমে আসলো, রুমে এসেছে ঠিক কিন্তু নিজেই মাথা চুলকাচ্ছিলো আর ভাবছিল কিসের জন্য যেনো আসছিলাম? কিন্তু মনে করতে পারলো না। বারান্দায় চোখ যেতেই দেখতে পেলো তাযিন রেডি হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। কোথাও যাবে হয়তো। এলোমেলো চুল, কালো শার্ট প্যান্ট। নাজেরা বারান্দায় এসে দাঁড়ালো। মজার ছলে জিজ্ঞেস করলো, এই কিউট ছেলে। কোথায় যাওয়া হচ্ছে?
তাযিন মুচকি হাসলো। নাজেরা যতবার কিউট ছেলে বলে ডেকেছে ততবারই তাযিনের আদর আদর লেগেছে। কত মিষ্টি করে ডাকে। তাযিন মাঝে মাঝে এতোটাই লজ্জা পেতো এই ডাকে, তার মনে হতো নাজেরা শুধু কিউট ছেলে বলেই ডাকেনি সাথে ছোট বাচ্চাদের যেমন আদর করে গাল টেনে দেয় ঠিক সেভাবে ওরেও গাল টেনে দিয়েছে।
হা করে তাকিয়ে আছিস কেনো? তোকেই জিজ্ঞেস করছি। কোথাও যাচ্ছিস নাকি?
তাযিনের ধ্যান ভেঙে গেলো একটু নড়েচড়ে বললো, তুই শুকিয়ে যাচ্ছিস। তুই কি অসুস্থ? ঠিকঠাক খাওয়া দাওয়া করিস না?
নাজেরা কপাল চাপড়ে বললো, আমি ঠিক আছি। সুস্থই আছি।
রাত জেগে প্রেম করছিস তাই না?
নাজেরা নাক ফুলিয়ে নিলো। আশেপাশে একটু উঁকি দিলো অন্য রুমের কেউ আবার শুনে না ফেলে। দুটো বিল্ডিং এর মধ্যে বেশি দুরত্ব নয় বলেই কথা বললে শুনা যায়।
নাজেরা লজ্জা পাওয়ার ভঙ্গিমা করে বললো, হ্যাঁ একটু প্রেম করা হচ্ছে।
তাযিন তাচ্ছিল্য হেঁসে বললো, প্রেম কেনো রাত জেগে করতে হয়?
নাজেরা আশ্চর্য হয়ে বললো, এ কেমন বোকা বোকা প্রশ্ন করছিস?
তাযিনের মনে হলো হয়তো সত্যি সে বোকা বোকা প্রশ্ন করছে। প্রসঙ্গ বাদ দিয়ে বললো, আসি নিজের খেয়াল রাখিস।
নাজেরা পিছু ডেকে বললো, যাচ্ছিস কোথায়?
দেশের বাড়িতে। বলেই তাযিন অদৃশ্য হয়ে গেলো। নাজেরার বোধহয় একটু মায়া মায়া লাগছে। যতবারই তাযিন বরিশাল গিয়েছে কিংবা নাজেরা চট্টগ্রাম গিয়েছে ততবারই তাদের একটা ছোটখাটো বিদায় মূহুর্তে্ থাকতো। মুখ ফুলিয়ে রাখতো দু’জনে।
তাযিনকে কল করে পেলো না। ফেসবুকের নিউজফিডে ঢুকতেই একদিন আগের একটা স্টাটাস চোখে পড়লো। আশেপাশে সবুজ গাছগাছালি, সামনে ইয়া বড় পুকুর পাড়ে দু’হাত প্রসারিত করে আকাশের বুকে তাকিয়ে মাটিতে শুয়ে আছে চিরচেনা সেই তাযিন। ছবিতে চোখ মুখ দেখা যায় না কেবল দেখা যাচ্ছে আকাশের কাছে অভিমানের ঝুড়ি খুলে বসেছে। নাজেরার বুক চিঁড়ে কেনো যেনো একটা দীর্ঘশ্বাস বের হয়ে আসলো। নাজেরার কেবল মনে হয় কোথাও যেনো একটা কিন্তু আছে। কেমন ঘোলাটে সবটা। ক্যাপশনের দিকে চোখ যেতেই দেখলো সেখানে লিখা, নেটওয়ার্কের বাহিরে।
চব্বিশ ঘন্টারও বেশি সময় হয়েছে সে অফলাইনে চলে গিয়েছে। বুঝা যাচ্ছে ইচ্ছে করে সব কিছু থেকে দূরে থাকতে চায়। নাজেরা সোফিয়া আন্টির নাম্বারে কল করলো। ভাগ্যক্রমে সোফিয়া তখন রান্না ঘরে, উনার মা ফরিদা বেগম মাটির চুলায় শীতের পিঠা বানায়, সাথে সোফিয়া সহ তার সকল ভাই বোন। ফোনটা তাযিনের হাতে, সে গেম খেলছে। গেমের মাঝে ফোন স্ক্রিনে নাজেরার নামটা ভেসে উঠতেই বুকের ভেতর ধক করে উঠল। তাকিয়ে থাকতে থাকতেই প্রথম বারের কলটা কেটে দ্বিতীয় বারের মতো রিং হচ্ছে। তাযিন রিসিভ করে কানে দিতেই ওইপাশ থেকে সালামের আওয়াজ ভেসে আসলো। তাযিনের মনে হচ্ছে কতশত বছর পর এই কন্ঠস্বরের জলন্ত অগ্নি শিখা তাকে আবার পুড়িয়ে দিচ্ছে।
এপাশ থেকে কোনো শব্দ না পেয়ে নাজেরা বুঝতে পারলো কলটা সোফিয়া আন্টি রিসিভ করেনি। যেহেতু বেড়াতে গিয়েছে তাই হয়তো অন্য কারো হাতে আছে। তাই আন্দাজে বললো, হ্যালো? কে? সোফিয়া আন্টি?
তখনও ওপাশে নিশ্চুপ।
নাজেরা বললো, তাযিন? কথা বলছিস না কেনো?
এবার আর সে চুপ করে থাকতে পারলো না। খুবই স্বাভাবিক কন্ঠে বললো, আরেহহহ! নেটওয়ার্ক খুব দূর্বল। বুঝতে পারছিস তুই আমার কথা? হ্যালো?
নাজেরা বললো, হ্যাঁ হ্যাঁ বুঝতে পারছি। তুই নেটওয়ার্কের বাহিরে করছিস টা কি হুম?
কিছুই না। নানুর বাড়িতে সবাই এসেছে। মজা হচ্ছে।
নাজেরা আনমনা হয়ে বললো, হুম তুই তো মজায় আছিস।
তাযিন বললো, কেন? তুই কি দুঃখে আছিস?
নাজেরা দেয়ালে হেলান দিয়ে বসে পড়লো। লম্বা দীর্ঘশ্বাস টেনে বললো, জানি না রে। কিছু ভালো লাগছে না।মন কেমন জানি কু’ডাকে। শান্তি পাই না কিছুতেই।
তাযিন চিন্তিত হলেও সেটা বুঝতে না দিয়ে বললো, মুরব্বিদের মতো কথা বলিস না তো। মন আবার কু’ডাকে নাকি!
তুই ওসব বুঝবি না।
তাযিন অভিমানের স্বরে বললো, হ্যাঁ তুই তো সব বুঝিস।
হ্যাঁ বুঝিই তো। বুঝি না?
তাযিন বলেই ফেললো, হুম সবই বুঝসি। যেটা বুঝিস না সেটা হলো আমি। আমাকেই বুঝিস না।
নাজেরা চুপ হয়ে গেলো। এমন কথা সে বলবে কেনো? নাজেরার নিষেধাজ্ঞা রয়েছে তাযিন যেনো কখনোই ওদের সম্পর্কের মাঝে অন্য কিছু না টানে।তাহলে তার কথার টোন অন্য রকম কেনো?
তাযিন অভিযোগ করার মতো করে বললো, আবার চুপ করে আছিস যে? জেনিফার সাথে উল্টাপাল্টা তো তুই খুব বিশ্বাস করিস। আম্মু বকা দিলে তখন তো খুব করে আম্মুর পক্ষ নিস। তাহলে তুই আমায় বুঝলি টা কি ভাবে? কই একটু আমাকে বুঝে আমার পক্ষ নিবি।
নাজেরা হাফ ছেড়ে বাঁচল যেনো। মাত্রই বুকের ভেতর একটা কিছু আঁটকে ছিল। প্রসঙ্গ বাদ দিয়ে বললো, আচ্ছা শুন, তোর টিয়াকে সাথে করে নিয়ে গেলি না তো? তোরা কি চলে আসবি খুব তাড়াতাড়ি? না হয় তো ওটা মরে যাবে একা বাসায়, খাবার টাবার কিছু দিয়ে আসছিস?
তাযিনের আত্নায় পানি নেই। সে বেমালুম ভুলে বসে আছে টিয়ার কথা। আসার সময় টিয়ার জন্যই মূলত বারান্দায় গিয়েছিল। নাজেরার সাথে কথা শেষ করেই বাসা থেকে বের হয়ে গিয়েছিল। সোফিয়াও হয়তো খেয়াল করেনি। নাজেরাকে কলে রেখেই দৌড়ে মায়ের কাছে এসে বললো, আম্মু সর্বনাশ হয়ে গিয়েছে।
সোফিয়া প্রচন্ড ভয় পেলো, একে তো ছেলে এমন হাঁপাচ্ছে তারউপর কানে ফোন এটা তো অন্য দিকে ঈঙ্গিত করে। হয়তো কোনো খারাপ সংবাদ এসেছে। সোফিয়া দূর্বল হার্টের মানুষ, সে ভয়ার্ত গলায় জিজ্ঞেস করলো, কি হয়েছে?
তাযিন অত্যন্ত দুঃখের সাথে বললো, আম্মু আমার টিয়া? ওরে তো আনি নাই।
সোফিয়ার হাতে খুন্তি ছিল। ইচ্ছে করছিলো ওই মূহুর্তে ছেলের মাথাটা ফাটিয়ে দিতে। এ ভাবে ভয় দেখিয়ে দিবে? বোকাসোকা ছেলে!
নাজেরা ওপাশ থেকে ডেকে বললো, আচ্ছা শুন উত্তেজিত হতে হবে না। বাসার চাবি থাকলে বল আমি গিয়ে দেখবো।
তাযিন বললো, বাসার চাবি থাকবে কি করে! চাবি তো সাথে করে নিয়ে আসছি।
নাজেরা বললো, চাবি পাঠানোর ব্যবস্থা কর। তোরা শান্তি মতো ঘুরে আয় টিয়াকে আমি দেখে রাখবো।
___________
অন্ধকার সন্ধ্যা। তাযিন বসে আছে ছাঁদে। ছাঁদটা খুব পরিষ্কার। মামাতো বোন রুহি ঝাড়ু দিয়ে পরিষ্কার করে রেখেছে। না হয় পরিষ্কার থাকার কথা নয় কারণ আশেপাশে এতো গাছপালা সব গাছের পাতা ছাঁদে পড়ে। এতো পরিষ্কার হয়ে লাভের লাভ কিছু হয়নি, খুব মশা কামড়াচ্ছে। এদিকে গিটারে সুর তুলতে পারছে না সব মিলিয়ে খুব বিরক্ত হলো সে।
একটু পর খেয়াল করলো ছাঁদের দরজা ঠেলে রুহি ঢুকেছে। হাতে জ্বালানো কয়েল। তাযিন খুশী হলো, মেয়েটার প্রশংসা করতে হয়। বেশ কাজের আসার পর থেকে দেখছে কাজ করেই যাচ্ছে। রুহি চুপচাপ কয়েলটা পাশে রাখার পর তাযিন বললো, ধন্যবাদ রুহি।
রুহি মনে হয় খুশী হলো, অন্ধকারে তার আনন্দ মাখা মুখখানা তাযিনের দৃষ্টিতে পড়লো না। তাযিন ফের জিজ্ঞেস করলো, তুমি পড়ো না রুহি?
অত্যন্ত নরম স্বরে রুহি বললো, জ্বি পড়ি।
কোন ক্লাসে পড়ো?
ক্লাস এইটে।
পড়তে বসছো না যে? সারাক্ষণ এতো কাজ করো পড়ো কখন? স্কুলে যেতেও দেখলাম না।
শুক্রবার শনিবার বন্ধ থাকে স্কুল।
তাযিনের মনে পড়লো সেটা। আবারও গিটারে মনোযোগ দিলো। রুহি নড়ছে না, তাযিন বললো, কি ব্যাপার রুহি? পড়তে বসবে না?
রুহি বললো, না মেহমান আসলে পড়ায় মন বসে না।
তাযিন খানিকটা হাসলো। এমন ছোটকাল সে-ও পাড়ি দিয়ে এসেছে। তাযিনের কাছে ছোটকাল মানেই নাজেরা। সমস্তটা ছোটকাল ওই একটা মেয়েকে ঘিরে। চোখ বন্ধ করে গিটারে সুর তুলার চেষ্টা করতে করতে মনে মনে আওড়ালো, তুই আমার অতীত বর্তমান হতে পারলি ভবিষ্যৎ কেনো না নাজেরা?
রুহি বললো, ভাই কাঁদছেন?
তাযিন চোখ খুলে বললো, কই না তো। কাঁদছি বুঝি?
রুহি বললো, না আমারও ভুল হতে পারে।
না তোমার ভুল না। কয়েলের ধোঁয়ায় চোখ জ্বলে তো তাই।
কয়েলটা সরিয়ে ফেলবো?
না দরকার নেই থাকুক। তুমি দাঁড়িয়ে আছো কেনো রুহি? বসো এখানে। গান শুনবে?
রুহি জানালো সে গান শুনবে। তাযিন এবার কিছুটা বেসুরে গান ধরলো—
কোনো এক জোসনা রাতে..
ব্যথা নিয়া তোমার বুকে
আমারে ডাইকা তোমার মনের কথা কইয়ো
ওরে ওওও সাধের পাখি,শুনো তোমারে ডাকি
ওরে ওওও সাধের পাখি,,, শুনো তোমারেই ডাকি
আমারে দূরে রাইখো না ওও পাখিরে।
আমারে মনের ঘরে রাইখো প্রান পাখি গো
তোমার ওই আঁচল তলে পুইষো প্রান পাখি গো।
নাজেরা ঘুম থেকে চিৎকার করে উঠে গেলো। আশেপাশে তাকিয়ে বুকে ফু দিলো। জামিনা বার বার বারণ করা সত্ত্বেও সন্ধ্যায় ঘুমিয়েছিল। ফোনটা হাতে নিয়ে সময় দেখলো রাত আট বেজে পনেরো মিনিট। মাগরিবের নামাজের পরেই শুয়েছিল। কখন ঘুমিয়ে গেলো বুঝতে পারেনি। ওহ হ্যাঁ মনে পড়েছে নিহাল বলেছিল ফ্রী হয়ে কল দিবে।তার কলের অপেক্ষা করতে করতেই ঘুমিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু কেউ ডাকলো না ভেবেই অবাক হলো। বিছানা থেকে নামতে নামতে মনে পড়লো সে একটা স্বপ্ন দেখেছে, আর তাই ভয় পেয়ে চিৎকার করে উঠলো। কিন্তু ভয় পাওয়ার মতো তেমন ভয়ংকর স্বপ্ন ছিল না। স্বপ্ন দেখলো তাযিন ওর মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। খুব সাধারণ একটা স্বপ্ন এতো ভয় পেলো কেনো সেটাই বুঝতে পারেনি। রুম ছেড়ে বের হতেই মালেকা সমানে পড়লো। নাজেরা ঘুম ঘুম চোখে বললো, খালা আপনি? আপনি কখন আসলেন?
মালেকা কাছে এসে বললো, বাড়িত তো কেহ নাই। আপনের আম্মা আমারে রাইখা গেছে।
নাজেরা ব্রু কুঁচকে বললো, কেউ নেই কেনো? আম্মু কোথায় গিয়েছে?
মালেকা অতি স্বাভাবিক স্বরে বললো, ওমা জানেন না আপনে? জাহেরা মামুনির তো আজকা বিয়া। ওইহানে গেছে। কিন্তু আপনেরে নিলো না কামটা ঠিক করে নাই।
নাজেরা কিছু বুঝে উঠার আগেই মালেকা নিজেই বলতে লাগলো, মনে হইতাছে কুনু কাহিনি আছে নাজেরা আম্মা। এমন তাড়াতাড়ি কইরা বিয়া হইয়া যাইবো ক্যান?
নাজেরা নিজেও বুঝে উঠতে পারলো না কিছু। কেমন জানি মাথা ঘুরাচ্ছে। মাথায় কিছু আসছেও না। তবে মুখ ফুটে নিজের অজান্তেই একটা প্রশ্ন বের হয়ে আসলো, কার সাথে বিয়ে হচ্ছে খালা?
মালেকা একটু কানের কাছে এসে ফিসফিস করার ভঙ্গিমা নিয়ে বললো, আমারে তো কয় না নাই। কিন্তু নুরজাহান বউমা যহন কল করলো আওয়াজ বাড়ানো আছিলো। কইলো ওর চাচাতো ভাইটা আছে না? আমাগো এখানে যে লগে কইরা আইলো ওই পোলার লগেই বিয়া।
মূহুর্তের মধ্যেই নাজেরার চোখের সামনে সব কিছু অন্ধকার হয়ে আসলো। মাথা ঘুরিয়ে সাথে সাথে ফ্লোরে লুটিয়ে পড়লো। মুখে উচ্চারণ করা শেষ বাক্যটা ছিল নিহাল…….
চলবে……..
