#মরিচীকা
#পর্ব ০৯
#মাকামে_মারিয়া
শীতের সকাল, তখন ভোর সাতটা বাজে শীতে কাঁপতে কাঁপতে নাজেরা চাঁপা কুঞ্জ থেকে ছায়ানীড়ে আসলো। ছায়ানীড় নাজেরার প্রতিবেশী বাড়ি অর্থাৎ তাযিনদের বাড়ি। সে তো একই সাথে প্রতিবেশী আবার বন্ধুও।
কলিং বেল চাপতেই সাথে সাথে তাযিনের আম্মু দরজা খুলে দিলো। বিশাল হেঁসে বললো, আরেহ! সকাল সকাল জারুলতা যে! কি মনে করে গো হঠাৎ? আসো ভেতরে আসো।
আসসালামু আলাইকুম আন্টি। আন্টি তাযিন ঘুমাচ্ছে তাই না? ওর কাছেই আসছিলাম।
ওয়া আলাইকুমুস সালাম। হ্যাঁ ওর কাছেই তো আসবা। আমাদের কাছে কি আর আসবা! আমরা বুড়ো মানুষ।
নাজেরা হেঁসে বললো, এ ভাবে বলবেন না তো আন্টি। লজ্জা লাগে আমার।
সোফিয়া ছেলের রুমে নিয়ে ছেড়ে আসলো নাজেরাকে। তাযিন ঘুমাচ্ছে। শীতের সকালের ঘুম আরামের হয় কিন্তু সে ঘুমিয়ে থাকলেও তার মুখটা কেমন শুকনো। কপালে অবাধ্য চুল গুলো ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। বড্ড মায়া মায়া লাগছে। নাজেরা পাশে বসলো, ওর প্রতি একটা টান কাজ করে, আলাদা রকমের এক মায়াও আছে। কিন্তু এটা প্রেম ভালোবাসার নয়। বিশস্ত সঙ্গীর প্রতি যেই মায়া থাকে সেটাই।
তাযিন, এই তাযিন! নাজেরা ডাকলো।
কিন্তু তাযিনের ঘুম ভাঙলো না। এতো সকালে ঘুম ভাঙাতেও ইচ্ছে করছে না।কিন্তু উপায় নেই জরুরি কাজ আছে উঠতেই হবে। নাজেরা ডাকছে কিন্তু উঠছে না, উঁচু স্বরে সোফিয়াকে ডেকে বললো, সোফিয়া আন্টি! আপনার ছেলে কেমন মরার মতো ঘুমাচ্ছে দেখেন।
সোফিয়া কিচেন থেকে জিহ্বায় কামড় বসিয়ে মাথা দু’দিকে নাড়িয়ে বললো, তওবা তওবা! এ ভাবে বলে না রে মা। মরার মতো আবার কি? আমার জ্যান্ত ছাওয়াল।
নাজেরা হাসি চেপে রাখতে পারলো না। সোফিয়া আন্টির নয়নের মনি এই ছেলে। সে খুব কুসংস্কারে বিশ্বাসী আর ছেলের বেলায় তো আরও বেশি। সব সময় ছেলেকে দোয়া দরুদ পড়ে ফু দিতেই থাকে আর বিরবির করতে থাকে, আমার দশটা না পাঁচ টা একটা মাত্র ছাওয়াল।
নাজেরা মাঝে মাঝে তাযিনকে ক্ষেপাতো এটা বলে যে, বরিশাইল্লা মনু! তাযিনও ছেড়ে দিতো না বলতো তুই হচ্ছিস ঢাকাইয়া ব্যাঙ।
নাজেরা এবার তাযিনের একটা হাত ধরে টেনে দাঁড়ালো। জোরসে বলছে, তাযিননননন উঠঠঠঠঠ।
তাযিন একটানে মেয়েটাকে বিছানায় শুইয়ে দিলো। একটা পা নাজেরার শরীরের উপর দিয়ে আরামসে ঘুম দিলো। মনে হচ্ছে আগের থেকে আরও বেশি আরামে ঘুম হচ্ছে এখন। একটা হাত নাজেরার ঘাড়ে একটা পা ওর কোমর জড়িয়ে আছে। নাজেরা পিষে যাচ্ছে। কোনো রকমে ডাকলো, আন্টি বাঁচাননন! আপনার ছেলে মেরে ফেললো আমায়।
সোফিয়া কিচেন থেকে এসে এমন অবস্থা থেকে মাথায় হাত। দ্রুত নাজেরাকে উদ্ধার করে ঘুমন্ত ছেলের নামে অনেক গুলো বকা দিলেন, হয়েছে বাপের মতো। ঘুমাইলে এদের দিন দুনিয়ার খবর থাকে না৷ জারু তুমি ঠিকই বলছো এরা মরার মতোই ঘুমায়। বাপ টাও হয়েছে এমন। মানুষ মরে গেলেও এদের হুঁশ ফিরে না।
নাজেরা হাসবে নাকি কাঁদবে বুঝতে পারছে না। মায়ের চিৎকার চেচামেচিতে তাযিনের ঘুমের আর রক্ষা হলো না। চোখ পিটপিট করে তাকালো। রাতে নাজেরার অপেক্ষায় থাকতে থাকতে কখন ঘুমিয়ে গেলো বুঝতে পারেনি সকালে ঘুম থেকে উঠতে না উঠতেই নাজেরাকে সামনে রাগী লুকে তাকিয়ে আছে দেখে ভেবেই নিলো নিশ্চয়ই সে ঘুমিয়ে গেলো বলে মেয়েটা রাগ করেছে। তাযিনের গলা শুকিয়ে আসলো। গাঁ থেকে কম্বল সরিয়ে শুকনো কন্ঠে বললো, পানি।
নাজেরা পানি এগিয়ে দিলো। তাযিন বললো, স্যরি।
নাজেরার হাতে সময় নেই এখন স্যরি শুনার সময়ও না। কিন্তু তাযিন কোনটা ভেবে স্যরি বলছে সেটা কিন্তু বুঝলো না। তাড়া দিয়ে বললো, দ্রুত রেডি হ।
তাযিন বিছানা থেকে উঠে ওয়াশরুমের দিকে যেতে নিবে নাজেরা ওর হুডি টেনে ধরলো পিছন থেকে। দাঁত কামড়িয়ে বললো, তোর আজকে ওয়াশরুমে যাওয়া নিষেধ। ওয়াশরুমে ঢুকলো তোর একঘন্টা লেগে যাবে।
তাযিন নাক ফুলিয়ে বললো, জাস্ট দুই মিনিট ডেয়ার। ছাড় এখুনি চলে আসছি।
নাজেরা বিছানায় বসে পা নাড়াচ্ছে তাযিন রেডি হচ্ছে। নাজেরা খুব তাড়া দিচ্ছে। এতোই তাড়া দিচ্ছে যে তাযিন জিজ্ঞেস করার সুযোগ পাচ্ছে না যে কোথায় যাবি?
ছেলেটা ড্রেসিং টেবিলের সামনে যাবে ওমনি নাজেরা টেনেহিঁচড়ে নিয়ে বের হয়ে গেলো। বের হতে হতে বললো, আয়নার সামনে গিয়ে এখন ঠোঁটে লিপস্টিক লাগাতে হবে না। তোর ঠোঁট যথেষ্ট পিংকি!
তাযিন লজ্জা পাওয়ার ভঙ্গিমা করে বললো, আমার ঠোঁটের দিকেও নজর দিয়েছিস দুষ্ট মহিলা!
সেটআপ! ক্লাসে সব মেয়ে তোর ঠোঁটের উপর ক্রাশ। আমাকে নজর দিতে হয় না। ওরাই এসে আমার কাছে জানতে চায় তুই কোন ব্যান্ডের লিপস্টিক লাগাস।
হোয়াট দ্য ফালতু কথাবার্তা! ওদের বলে দিবি আমি ঠোঁটে কোনো লিপস্টিক ফিপস্টিক দেইনা। মাই লিপস আর ন্যাচরালি পিংক।
হয়েছে! তোর ঠোঁটের উপর পিএইচডি করার ইচ্ছে নেই আমার। দ্রুত চল। বাইক বের কর।
নাজেরা রাস্তায় এসে দাঁড়িয়ে আছে, তাযিন বাইক বের করছে। দুজনে দুটো হেলমেট মাথায় দিয়ে বাইক স্টার্ট করলো। নাজেরা বললো, যত দ্রুত সম্ভব আমাদের কলেজে চল।
তাযিন এখনো জানে না তারা কলেজে কেনো যাচ্ছে। আজ ওদের ক্লাস নেই তাই কলেজে যাওয়ার কথাও না। কিন্তু জানতেও চাচ্ছে না। ওর তো মন চায় চিৎকার করে বলতে, আমার জারুলতা তোমার ইশারায় আমি মরতেও রাজি। আর এ তো একটা সামান্য যাত্রা কেবল।
তাযিন সাবধানে বাইক চালাচ্ছে মাঝে মাঝে রিয়ার ভিউ মিররে নাজেরার চোখ দুটো দেখছে। নাজেরা ওর পিঠে ধাক্কা দিয়ে বললো, আরেকটু ফাস্ট চালা না ভাই!
তাযিন শান্ত কন্ঠে বললো, ভালো করে ধরে বসেন ম্যাডাম।
নাজেরা তাযিনের পেটে দু’হাতে জড়িয়ে বসলো।
কলেজ ক্যাম্পাসে এসে নাজেরা বাইক থেকে নামলো। হেলমেট তাযিনের হাতে দিয়ে আশেপাশে ঘুরে তাকিয়ে একটু দূরে চোখ আঁটকে গেলো। ওই তো নিহালকে দেখা যাচ্ছে।
তাযিন এখনো ব্যাপারটা বুঝে উঠতে পারেনি। সে স্বাভাবিক কন্ঠে বললো, এবার তো বল? আমরা কলেজে আসছি কেনো?
নাজেরা একটু পিছিয়ে এসে আচমকা তাযিনের হাতটা ধরে ফেললো। মেয়েটা হুটহাট এমন স্বাভাবিক ভাবেই তাযিনের হাতে হাত রাখে কিন্তু সে স্বাভাবিক হলেও কি? তাযিন তো স্বাভাবিক থাকতে পারে না। বুঝাতেও পারে না এই মেয়ের স্পর্শে সে নিজেকে কতটা পুড়ায়।
তাযিন বললো, কিছু হয়েছে?
নিহাল এসেছে।
নিহাল? তাযিন প্রথম বুঝতে পারেনি। নাজেরা আঙুলের ইশারায় দূরে দেখালো। একজন হ্যান্ডসাম ছেলে দাঁড়িয়ে আছে। বেশ পরিপাটি ছেলেটা। তাযিন খুব সুন্দর দেখতে হলেও পরিপাটি না,এলোমেলো। ওর মধ্যে এখনো একটা বাচ্চামোর আভাস পাওয়া যায়। কিন্তু নিহাল যথেষ্ট ম্যাচিউর। অবশ্য দু’জনের মধ্যে বয়সের একটা ফারাক আছে। তাযিনের থেকে তিন চার বছরের বড় নিহাল।
তাযিন অবাক হয়ে বললো, তোরা মিট করতে চলে আসছিস? প্রেম এতোটা এগিয়ে গেলো কখন?
বাজে কথা বলিস না তো! প্রেম এগোয়নি। নিহাল গতরাতে কল করেছিলো বললো দেখা করতে চায়। আমি না করতে পারিনি।
তাযিন একদৃষ্টিতে নাজেরার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলো। কি অবলীলায় কথা গুলো বলে যাচ্ছে সে। অথচ কি বিষাক্ত কথা এগুলো সেটা কেবল তৃতীয় পক্ষই টের পাচ্ছে।
কিন্তু এতো তাড়াতাড়ি মিট করার কি দরকার ছিল?
নাজেরা কিছুটা রুক্ষ স্বরে বললো, কেনো তোর সমস্যা হচ্ছে?
তাযিন ঝামেলা সৃষ্টি হোক চাচ্ছে না তাই এড়িয়ে গেলো। বললো, আচ্ছা চল যাই তাহলে।
নাজেরা ওকে থামিয়ে দিয়ে বললো, তুই এখানে থাক। আমি যাচ্ছি। একটু নজর রাখিস প্লিজ চেনাজানা কেউ দেখে না ফেলে!
তাযিন ভাবছে আশ্চর্য আমার চোখে পানি আসছে কেনো! তাযিন বললো, তাহলে আমাকে সাথে নিয়ে আসলি কেনো?
নাজেরা সহজ সরল ভাবে বললো, এই সকালে আমাকে কে নিয়ে আসতো? রাস্তার জ্যামের কারনে সে-ই লেইট হলো! সব স্টুডেন্ট চলেই আসছে।
তাযিন নাক ফুলিয়ে বললো, তাহলে দেখা করার জন্য এই খোলা ক্যাম্পাসে কেন আসলি? কোনো চিপায় চলে যেতি।
নাজেরা হাতে থাকা নোটপ্যাড দিয়ে তাযিনের গায়ে একটা ভারি মেরে বললো, ধ্যাতেড়ি! রামছাগল একটা!
তাযিন হেঁসে বললো, আচ্ছা তুই যা আমি দেখছি। পাহারা দেই তোদের।
নাজেরা একটু একটু করে নিহালের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে তাযিনকে পিছন ফেলে। নিজেকে ভীষণ অসহায় লাগছে তাযিনের। কেমন হাসফাস লাগছে যেনো চোখ বার বার ভিজে আসছে। চারপাশে চেনাজানা সিনিয়র জুনিয়র ভাই ব্রাদার। তাযিনকে অন্য ডিপার্টমেন্টে প্রায় অনেকেই চিনে বিধায় দেখেই কেমন আছো? কেমন আছেন? জিজ্ঞেস করছে। তাযিন চোখের পানি লুকিয়ে হাসার চেষ্টা করে যাচ্ছে।
চলবে………
#মরিচীকা
#পর্ব ১০
#মাকামে_মারিয়া
আসতে অসুবিধা হয়নি তো শ্যামলি?
নাজেরা কাচুমাচু হয়ে বসে আছে। অনেক টা সময় পর নিরবতা ভেঙে নিহালের কথায় নাজেরা মাথা তুলে তাকালো। হালকা হেঁসে বললো, একটু হয়েছে।
ইশ তোমায় অসুবিধেয় ফেলে দিলাম। স্যরি।
নাজেরা ভীষণ লজ্জা পাচ্ছে। কে জানতো এই ছেলের প্রেমে পড়ে যাবে। প্রেম কি জিনিস সেটা কেবল সিনেমায় দেখেছে। বাস্তব জীবনে খুব কাছ থেকে কারো প্রেম দেখেনি। কারণ ওর কোনো ক্লোজ মেয়ে বন্ধুই ছিল না। এখনোও নেই। তাযিন এতোটাই একরোখা ছিল যে নাজেরাকে কারো সাথে তেমন ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্ব করতেই দেয়নি। বলতো, আমি থাকতে তোর আরও বন্ধু লাগবে কেনো? মেয়ে বন্ধুরা কি এমন আলাদা শুনি? আমায় বল আমি মেয়েদের মতোই হবো। নাজেরা নাক ফুলিয়ে বলতো হিংসুটে কোথাকার! এতোটুকুতেই শেষ হলেও বাঁচা যেতো কিন্তু নাজেরাও এতো সহজে ছেড়ে দেওয়ার পাত্রী ছিল না। সে উদাস হয়ে বলতো, আহা এখন একটা বান্ধবী থাকলে তো ওরে সাথে নিয়ে শাড়ি চুড়ি পড়ে সেজেগুজে ছবি তুলতে পারতাম। নাজেরাদের প্রতিবেশী কোনো সববয়সী মেয়েও ছিল না যে তার সাথে বন্ধুত্ব করবে। তাযিন তখন মায়ের কাছে গিয়ে আবদার করতো, আম্মু আমাকে শাড়ি পড়িয়ে দাও।
সৌফিয়া তো বিরাট খুশী। মহিলা খুব সৌখিন মানুষ কিনা! তারউপর একটাই সন্তান, কোনো মেয়ে বাবু নেই। তাযিনকেই মাঝে মাঝে মেয়ে সাজাতো, এতে তাযিন খুব ক্ষেপে যেতো কারণ তাকে পাড়ার ছেলেরা হাফ লেডিস বলে ক্ষেপায় এতে তাযিনের খুব কান্না পায়। যেই ছেলেকে মা শখ করে মেয়ে সাজালে সে রাগ করতো সেই ছেলে নিজে এসে শাড়ি পড়তে চাইলে মা তো খুশী হবেই।
সোফিয়া আলমারি থেকে নিজের যত্নের শাড়ি গুলো থেকে ছেলেকে সুন্দর করে শাড়ি পড়িয়ে দিলো, হাতে চুড়ি দিয়ে দিলো। শখ করে এই ছেলের জন্য মেয়েদের সব সাজসজ্জাই কিনে রেখেছিল!
তাযিন শাড়ি পড়ে অপেক্ষা করতে লাগলো কিন্তু নাজেরা তো আসছে না। সে তো বললো রেডি হয়ে আসবে। আসছে কেনো? তাযিন আবার জেদ ধরলো। সোফিয়াকে ঠেলেঠুলে পাঠালো চাঁপা কুঞ্জে, নাজেরা আসছে না কেন দেখে আসতে এবং সাথে নিয়ে আসতে।
সোফিয়া ছেলেকে বাসায় রেখে চাঁপা কুঞ্জে আসলো। খুব দরকার না হলে এ বাড়িতে আসে না সে। জামিনার স্বভাব তেমন একটা ভালো না, মহিলা কেমন খিটখিটে। আজও বাড়িতে কিছু একটা হয়েছে বুঝা যাচ্ছে কেমন থমথমে পরিবেশ।
সোফিয়া বাসায় ঢুকেই দেখলো জামিনা বসে আছে সোফায়, চোখ মুখ লাল টকটকে। নুরজাহান আসছে বেড়াতে। তখনও সে এ বাড়ির বউ হয়নি যদিও বউ হওয়ার আগে থেকেই বছরের ছয় মাস এখানেই থাকতো। জামিনা ভাইয়ের মেয়েকে একটু বেশিই আহাল্দ করতেন।
কি ব্যাপার সোফিয়া? আসো বসো।
জামিনার কন্ঠস্বরকেও ভয় লাগে। কেমন কর্কশ যেনো। ভালো কথাকেও তেঁতো লাগে। সোফিয়া হেঁসে বলেছিল, না ভাবি বসবো না। নাজেরা কোথায়?
নাজেরার নামটা শুনেই যেনো তেলেবেগুনে জ্বলে উঠলো জামিনা। বললো, নবাবজাদি ঘরে আছে। দেখো গিয়ে!
সোফিয়া আর এক মূহুর্তও এখানে দাঁড়িয়ে থাকলো না। কিছুটা দ্রুতই নাজেরার কাছে চলে আসলো। খাটের এককোনায় বসে মেয়েটা গুমরে কানছে।
সোফিয়া কাছে এসে মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বললো, কি হয়েছে নাজেরা? কাঁদছো কেনো?
ছোট নাজেরা ফুপিয়ে উঠলো। ঢেকুর তুলতে তুলতে বললো, আন্টি! আম্মু মেরেছে আমায়।
সোফিয়ার বড্ড মায়া লাগলো। এতো মিষ্টি একটা মেয়েকে মারে কি ভাবে? সোফিয়া কত সাধ করে সন্তান পালে। নাজেরাকে বুকে টেনে নিয়ে বললো, কোথায় মেরেছে মা?
নাজেরা হাতটা সামনে এনে ধরলো। সোফিয়া লাফিয়ে উঠলো। নাজেরার হাতটা ধরে বললো, একি! এমন ডাকাতের মতো কাজ কি ভাবে করলো উনি?
নাজেরা কান্না থামিয়ে দিয়ে বললো, আম্মুকে না বলে আম্মুর শাড়ি ধরেছিলাম বলে আমার হাতে গরম ছ্যাকা দিয়েছে। বলেছে উনার শাড়ি যেনো আর কখনো শাড়ি না ধরি।
সোফিয়ার চোখ টলমল করে উঠলো। কি ভাবে শান্তনা দিবেন বুঝতে পারলেন না। ওদিকে নিজের ছেলেটাও চাতক পাখির ন্যায় অপেক্ষা করছে। নাজেরাকে নিয়ে বের হয়ে আসতে চাইলে নাজেরা বললো, আমি কোথায় যাচ্ছি আন্টি?
আমাদের বাসায় চলো নাজেরা।
নাহ আন্টি আম্মু তাহলে আরও মারবে।
সোফিয়া অভয় দিলেন, নিজের গায়ের ওড়না টেনে নাজেরার চোখ মুখ মুছে দিয়ে বললেন কেঁদো না কিছু বলবে না।
সোফিয়া ড্রয়িং রুমে এসে বললো, ভাবি নাজেরাকে একটু সাথে নিচ্ছি! কাল সকালেই চলে আসবে।
জামিনা গর্জে উঠে বললো, মেয়ে মানুষ রাতবিরেতে বাহিরে থাকবে এটা ভালো দেখায় না ভাবি। রাইখা যান ওরে। পরে কিছু হলে মেয়ের বাপ আমার সাথে ক্যাচাল করবে।
সোফিয়া এবার কিছুটা সাহসের সাথেই বললো, নাসির ভাইয়া আমাদের ভরসা করেন। তার মেয়ে যে আমাদের কাছে নিরাপদ সেটা উনি খুব ভালো করেই জানে। আমি নিয়ে গেলাম।
সোফিয়া বের হয়ে গেলো নাজেরাকে নিয়ে। বাসায় গেলে আরেক তুলকালাম বাঁধবে এটা জেনেও নাজেরাকে সাথে না নিয়ে এসে পারলেন না। তুলকালাম বাঁধবে কারণ তার ছেলে কাটাছেঁড়া কিংবা পুড়ে যাওয়া দেখতে পারে না ভয় পায়,তারউপর নাজেরার এমন হয়েছে দেখলে তো আরও চিল্লাবে।
তাযিন অর্ধেক শাড়ি খুলে ফেলছে অপেক্ষা করতে করতে। এগারো বছরের একটা বাচ্চা ছেলে শাড়ি কতটুকুই বা সামলাতে পারে। নাজেরা রুমে ঢুকে তাযিনের একটা ব্লাউজ উদোম দেখেই খিলখিল করে হেঁসে দিলো। তাযিন ব্রু কুঁচকে তাকিয়ে বললো, একি! তুই শাড়ি পড়িস নাই? আমায় বোকা বানিয়েছিস? খুব মজা পাচ্ছিস তাই না?
নাজেরা হাসি থামিয়ে ফ্যালফ্যাল করে সোফিয়ার দিকে তাকালো। সোফিয়া হাত ধরে রুমে নিয়ে গেলো। বিছানায় বসিয়ে দিয়ে ফাস্টএইড বক্স এনে ক্ষতস্থান ক্লিন করে নিলো তারপর ঘরে থাকা একটা মলম হাতে লাগিয়ে দিলো ওদিকে তাযিন তখন থেকে জিজ্ঞেস করেই যাচ্ছিলো, এমন কি করে হলো? নাজেরার হাত পুড়িয়ে দিলো কে? কার এতো সাহস? আম্মু বলো কার এতো সাহস আমি মেরেই ফেলবো তাকে!
সোফিয়া কড়া স্বরে বলে, গুন্ডামী করো না তাযিন। দূরে গিয়ে দাঁড়াও। তুমি এসব দেখতে পারো না। ভয় পাও।
তাযিন দূরে গেলো ঠিকই তবে দরজার চিপায় দাঁড়িয়ে তাকিয়ে রইলো মাঝে মাঝে কাঁদছেও ছেলেটা। ওর প্রায় অনেক স্বভাবই মেয়েদের মতো। এই যেমন মেয়েদের মতোই খুব কাঁদতে পারে, কাঁদতে কাঁদতে ঢেকুর চলে আসে। সোফিয়া কপাল চাপড়ে শুধায়, খোদা আমায় একটা সন্তান দিয়েছে আর এর মধ্যে সব রকমের বৈশিষ্ট্য দিয়েছে যেনো আমি ছেলে মেয়ে দুটোরই স্বাদ পাই।
তাযিন সেদিন জেনে তবেই ক্ষ্যান্ত হয়েছিল নাজেরার হাতে কি হয়েছে! সোফিয়া মিথ্যা বলা পছন্দ করে না তাই সত্যিটাই বললো নাজেরার আম্মু মেরেছে শাড়িতে হাত দিয়েছে তাই।
তাযিন নাজেরাকে জোর করে টেনে নিয়ে দাঁড় করালো মায়ের আলমারির কাছে। আলমারি খুলে বললো এখানের সব শাড়ি তোর নামে করে দিলাম নাজেরা। সোফিয়া ছেলের দিকে দুষ্ট হেঁসে তাকাতেই তাযিন মাকে জড়িয়ে ধরে বলে, আমার আম্মু খুব ভালো কিছু বলবে না। তাই না আম্মু?
সোফিয়া দুটো ছেলেমেয়েকে কাছে টেনে মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়, কপালে চুমু খায়। নাজেরার চেহারার দিকে তাকালেই ওর আপন মায়ের চেহারা ভেসে উঠে ভীষণ মায়াবী মা মেয়ে দু’জনেই। মা’য়ের মতো কপাল না হলেই হয় মেয়েটার। সোফিয়া সেদিন দুটোকে আবার নতুন করে শাড়ি চুড়ি পড়িয়ে সাজিয়ে ফটো তুলে দিয়েছিলো সেই ফটো তাযিন এখনো লুকিয়ে লুকিয়ে দেখে কাউকে দেখায় না কারণ এটাতে সে শাড়ি পড়ে আছে কেউ দেখলে পঁচাবে এখন এটা দেখলে দারুণ লজ্জা পায় ছেলেটা।
_____________
নিহাল কিছুটা বিনয়ের সঙ্গে বললো, কিছু মনে করো না শ্যামলি। আমি আজকেই চট্টগ্রাম চলে যাচ্ছি। তাই তোমাকে এতো জরুরি আসতে হলো।
নাজেরা বললো, এ ভাবে বলবেন না নিহাল! আমি একদমই কিছু মনে করছি না।তবে একটু ভাবছি।
কি ভাবছো?
চট্টগ্রাম যাচ্ছেন তো যান, আমাকে জরুরি ভিত্তিতে ডেকে আনার কারণ খোঁজে পাচ্ছি না। নাজেরা কথাটা বলতে গিয়ে লজ্জায় মিয়িয়ে আসলো।
নিহাল বললো, অনেক কারণ আছে তোমাকে ডেকে আনার।
একটা বলুন শুনি।
তোমাকে দেখতে বড্ড মন চাচ্ছিলো। বেলায় অবেলায় তুমি মনের মধ্যে কিটকিট করে কামড় দেও। বড্ড মনে পড়ে। এতো মনে পড়ার মানে কি বলো তো?
নাজেরা লজ্জায় পড়ে যায়, আপাতত কোনো কিছুর মানে খোঁজে পাচ্ছে না সে। শুধু বুঝতে পারছে প্রেমে পড়ার মূহুর্ত গুলো কত্ত সুন্দর হয়,এতো মধুর হয় কেন?
তুমি কিছু বলবে না শ্যামলি?
নাজেরা কিছু বলতে পারছে না সব গুলিয়ে ফেলছে। একটু নড়েচড়ে বসে বললো, জ্বি ফিরবেন কবে আপনি?
তুমি যখন চাইবে।
আমি চাইলেই চলে আসবেন?
জ্বি আপনার আমাকে দেখতে মন চাইলে সেটা কেবল আমায় জানাবেন। আমি উড়ে চলে আসবো।
নাজেরা বললো, যদি প্রতিটা মূহুর্তেই দেখতে মন চায়?
নিহাল একটু এগিয়ে এসে বললো, এতোটাই প্রেমে পড়ে গিয়েছেন নাকি ম্যাডাম?
নাজেরা খিলখিল করে হেঁসে দিলো। নিহাল বাঁধা দিয়ে বললো, এমনে হেঁসো না তো! আমি সব ভুলে যাই।
তাযিন ঠায় দাঁড়িয়ে আছে কিন্তু ওদের দিকে তাকাচ্ছে না। অন্য কারো প্রেমে নজর দিতে নেই। বাই এনি চান্স যদি নজর লেগে যায়?
চলবে……….
