#মরিচীকা
#সূচনা_পর্ব
#মাকামে_মারিয়া
নাজেরা সুইসাইড করতে চায়। মানুষ প্রেমে ব্যর্থ হয়ে কিংবা পরিক্ষায় অকৃতকার্য হয়ে সুইসাইড করে।।নাজেরার এসব কিছুই না। সে সুইসাইড করতে চায় ফ্যামিলি থেকে বাঁচতে। তার ভাবির অত্যাচার থেকে বাঁচতে। মায়ের অবহেলা অপমান অবজ্ঞা থেকে মুক্তি পেতেই বরং মেয়েটা সুইসাইড করতে চায়। কিন্তু সুইসাইড করতে চাইলেই কি করা যায়? হয়তো যায় না। আর তাই তো নাজেরা এখনো জীবিত।
আমি মুক্তি চাই, আমি মুক্তি চাই। এরকম ছোট একটা বাক্য লিখতে লিখতে ডায়েরির পাতা কালো কালিতে পরিপূর্ণ হয়ে গেলো। কিন্তু নাজেরা একটু ফাঁকফোকর পেলেই লিখে যাচ্ছে — আমি মুক্তি চাই।
যেখানে সে নিজেই ডায়েরির সাদা পাতাকে কালো কালি থেকে মুক্তি দিচ্ছে না। জীবন তাকে কি করে মুক্তি দেয়??
লিখতে লিখতে ক্লান্ত হয়ে মাথাটা হাতের বাজে গুঁজে শুয়ে পড়লো মেয়েটা। নিশ্বাস আটকে রেখে একটু পর পর নিশ্বাস নিচ্ছে। মস্তিষ্ক এতোটাই ক্লান্ত যে কোনো রকম কল্পনা শক্তি কাজে লাগে না। বড্ড অসহায় লাগে নিজেকে। কল্পনা ছাড়া কি মানুষ বাঁচে? কিন্তু নাজেরা বেঁচে আছে।
মায়ের কর্কশ গলার শব্দে আঁতকে উঠল নাজেরা। ডায়েরি কলম বিছানায় ফেলে রেখে দৌড়ালো মায়ের ডাকের শব্দের পিছনে। একটু দেরি হলেই কথা শুনিয়ে দিবে।
আম্মু ডাকছিলেন?
জামিনা খাতুন পান বানাতে বানাতে একবার নাজেরার দিকে তাকালেন, কিছু বললেন না। পান বানিয়ে মুখে পুড়ে নিলেন। গালের এপাশ ওপাশ করে চিবিয়ে নাজেরা দিকে তাকিয়ে মোটা কন্ঠে বললেন, রাণী সাহেবা ছিলেন কই?
একটু শুয়ে ছিলাম আম্মু।
নাজেরা শুয়ে ছিল, এটা যেনো মহা অন্যায়। তারউপর অন্যায় করে মেয়েটা খুব সুন্দর করে বলছেও। জামিনার পান খাওয়া ঠোঁটের মতোই লাল টকটকে হয়ে গেলো মুখশ্রী। কন্ঠে কঠোরতা এনে বললেন, সারাদিন শুয়েই থাকো? কাজ কাম কি নেই?
কাজ কাম শেষ করে মাত্রই শুয়েছি আম্মু। এখন তো আর কোনো কাজ কাম নেই। কিছু করতে হলে বলুন করে দিচ্ছি।
জামিনা খাতুন জানে এই অসময়ে তেমন কোনো কাজ কাম নেই। কিন্তু নাজেরার শুয়ে থাকাটাও উনার হজম হচ্ছে না। পান চিবাতে চিবাতে এদিক সেদিক তাকাচ্ছিলো। হুট করেই দেখতে পেলো, এলোমেলো পায়ে এগিয়ে আসছে নুরজাহান। জামিনা তড়িঘড়ি করে আহ্লাদ দেখিয়ে বললো, কি হয়েছে নুর? তোমাকে এমন দেখাচ্ছে কেনো?
নুরজাহানের ভাবভঙ্গি সব সময়ের মতোই আহ্লাদী। সে ন্যাকা স্বরে বললো, ফুফু আম্মা গায়ে খুব ব্যথা। হঠাৎ কেনো যে ব্যথা করছে।
জামিনা বসা থেকে উঠে গেলেন। নুরজাহানকে আগলে ধরে সোফাতে বসালেন। কাচুমাচু হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা নাজেরাকে ধমক দিয়ে বললেন, দাঁড়িয়ে আছো কেনো?? গরম পানি করে নিয়ে আসো।
নাজেরা দ্রুতই রান্না ঘরে ছুটলো। কিন্তু বুঝে আসলো না গরম পানি দিয়ে করবেটা কি! বুঝে না আসলেও প্রশ্ন করার মতো সাহস নেই তার। অবশ্য কোনো কালে ছিলও না।
গরম পানি নিয়ে আসতেই দেখলো নুরজাহান দিব্যি হাসছে জামিনার সঙ্গে। যেনো নাজেরাকে দেখলেই বেচারির শরীরের যত রোগ আছে সব মাথা চাড়া দিয়ে উঠে।
নুরজাহানের হাসি হাসি মুখটা দেখে নাজেরার ইচ্ছে করলো পাত্রের গরম পানি গায়ে ঢেলে দিতে। যদিও এমন ইচ্ছে এ জীবনে পূর্ণ হবেনা।
জামিনা খাতুন উঠে এসে নাজেরা হাতে থাকা গরম পানির পাত্রে উঁকি দিয়ে দেখে বললো, নিমপাতা কোথায়?? উঠানের গাছে কি কম নিমপাতা ছিল যে দুটো নিমপাতা দিতে পারো নাই?
নাজেরা হতবুদ্ধি হয়ে গেলো। নিমপাতা দিয়ে পানি গরম করতে হবে সেটা বললেই হতো। ওমন কিছু তো বলেনি।
আপনি তো নিমপাতা দিতে বললেন নাই আম্মু।
ওহহহ! সব তোমাকে বলেকয়ে করাতে হবে?? তুমি কি কিছু বুঝো না?? ওতোটুকু আক্কেল জ্ঞান তোমার হয় নাই? নাসের সাহেব ঘরে আসলে তো সবার নামে বিচার দিতে ভুলো না।
নাজেরা অবাক হয়না এসব কথায়। তার মা যে ছোট বিষয় নিয়ে তুলকালাম বাঁধিয়ে দেয় এটা নতুন না। নাসির উদ্দীন হচ্ছেন নাজেরার বাবা! শুধু বাবা নয় নাজেরার একমাত্র বন্ধু আর আপনজন। জগতে এই একজনই আছে যে নাজেরাকে ভালোবাসে, আদর করেন।
নাজেরাদের বাড়ির সুন্দর একটা নাম আছে। সেটা হলো, চাপাঁ কুঞ্জ। ভীষন সুন্দর এই বাড়ির ভেতরকার অবস্থা খুবই থমথমে থাকে। দোতলা বাড়িটিতে সবার জন্য শান্তি বরাদ্দ থাকলেও নাজেরার জন্য শুধুই বিষাদ। অবশ্য এর জন্য নাজেরা বাড়ির দোষ দেয় না, দোষ তো ভাগ্যের।
ধরণীতে সন্ধ্যা নেমে এসেছে। চারপাশে কুটকুটে অন্ধকার। কিছু দূরেই কিচকিচ শব্দে পাখিরা ঘরে ফিরছে। মসজিদের মাইকে আজান হচ্ছে। নাজেরা বিভোর ঘুমে।
জামিনা খাতুন এসে ঠাস ঠাস শব্দ করে দরজা জানালা বন্ধ করতে লাগলেন। বারান্দা থেকে নাজেরার মেলে দেওয়া কাপড়চোপড় গুলো কাঠের টেবিলের উপর কিছুটা রাগান্বিত হয়েই ছুঁড়ে ফেললো।
জমিদারের বেটিরে বলছি, এই অবেলায় ঘুমাতে না। কিন্তু কে শুনে কার কথা! একটু ফাঁকফোকর পেলেই সে বিছানাকে আপন করে নেয়। যেনো দিন দুনিয়ায় তার আর কোনো কিছু নেই।
জামিনার চিৎকার চেচামেচিতে নাজেরার ঘুম ছুটে গেলো। কিন্তু চোখ খুলতে পারছিলো না। মাথাটা ঝিম মেরে আছে। চোখ জ্বালা করছে। গায়ে কেমন ঠান্ডা ঠান্ডা লাগছে। পায়ের নিচ থেকে কাঁথাটা টেনে এনে গায়ে জড়িয়ে শুয়ে পড়লো। শরীর মৃদু কাঁপছে। বুঝতে অসুবিধা হলো না শরীর কাঁপিয়ে জ্বর এসেছে।
মেয়েটা জ্বরকে ভীষন ভয় পায়। এই জ্বর তার জন্য কাল হয়ে দাঁড়ায়। কত করে সৃষ্টিকর্তার কাছে অনুরোধ করে, তুমি আমায় জ্বর দিও না মাবুদ! জ্বর হলে মানুষ আদর যত্ন চায়। স্নেহের হাত কপালে ঠকবে এমন কেউ নাজেরার নেই।
নুরজাহান সন্ধ্যা হতেই টিভি চালিয়ে বসে। সন্ধ্যা থেকে রাত দশটা অব্দি সিরিয়াল দেখে বউ শাশুড়ী উঠেন। এর মধ্যে নাজেরা সমস্ত কাজকর্ম গুছিয়ে রাখে৷ সন্ধ্যার নাস্তা থেকে শুরু করে রাতের খাবার।
কিন্তু আজকে কিছুটা ব্যতিক্রম হলো। নুরজাহান সিরিয়ালে মনোযোগী ছিল। হঠাৎ করে খেয়াল হলো এখনো সন্ধ্যার নাস্তা পায়নি। গলা উঁচিয়ে ডাকলো নাজেরাকে—
নাজরু, নাস্তা দিলে না তো! ব্যাপার কি? মরলে নাকি?
পাশ থেকে জামিনা এদিক ওদিক তাকিয়ে বুঝলো নাজেরার অস্তিত্ব নেই। তার মানে মেয়েটা ঘুম থেকে উঠে নাই। মেজাজ গরম হয়ে গেলো দুজনেরই। নুরজাহান শাশুড়ীর চেহারার দিকে তাকিয়ে বুঝলো নাজেরা অনুপস্থিত। ওমনি রুক্ষ কন্ঠে বললো, ফুফু আম্মা! তোমার মেয়েটা দিনদিন ফাঁকিবাজ হচ্ছে। বলেছিলাম ফোন কিনে দিও না। শুনলে না তো আমার কথা। আগেই ভালো ছিল সময়ের আগেই সমস্ত কাজকর্ম গুছিয়ে রাখতো। আর এখন তো ডেকেও পাওয়া যায় না রাণী ভিক্টোরিয়াকে!
জামিনা একটু বেশিই ভয় পায় নুরজাহানকে। একে তো ভাইয়ের আদরের মেয়ে, তারউপর ছেলের বউ। খুব আদরের বলেই ছেলের বউ করে নিয়ে এসেছে। কিন্তু আদরের বদলে বাদর নাচায় সে।
জামিনা মিনমিনে স্বরে বললো, আহা রাগ করো না নুর! আমি দেখছি নবাবজাদি গেলো কোথায়!
নুরজাহান বিরক্তিতে মুখ ফিরিয়ে নিলো। টিভিতে মনোযোগ দেওয়ার চেষ্টা করতেই ফোনটা সশব্দে বেজে উঠলো। তাহির কল দিয়েছে। তার এখন অফিস থেকে ফেরার সময়। প্রতিদিন ফেরার সময় নুরজাহানকে কল দিয়ে জানায় সে ফিরছে। এতে নুরজাহান যথেষ্ট বিরক্ত হয়। মাঝে মাঝে বিরক্ত হয়ে বলে, ফিরছো তো ফিরছোই! বাসায়ই তো আসছো। সেটা আবার জানাতে হবে??
তাহির হেঁসে উড়িয়ে দেয়। বউয়ের ষোলো আনা রাগ মাথা পেতে নিতে হবে এই দায়বদ্ধতা নিয়েই বিয়ে করছে। তাই হেঁসে বলে, কি আনবো বললে না তো??
নুরজাহান তখন আহ্লাদী হয়ে হরেকরকমের চাহিদা জানান দেয়। এটা এনো ওটা এনো। তাহির সমস্ত লিস্ট দেখে দেখে সব কিছু নিয়ে তবেই বাসায় ফিরে। যত যা-ই হোক বউকে খুশী রাখতে হবে।
কলটা রিসিভ করতেই তাহির বললো, কি করছো নূর??
সন্ধ্যার নাস্তা না পেয়ে নুরজাহানের মন মেজাজ তিক্ত। তারউপর তাহিরের আহ্লাদ মেয়েটার ভালো লাগে না। সে তিক্ত কন্ঠে বললো, কি আর করবো?? তোমার বাসায় কি আমার শান্তি আছে?? সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত হতে চললো এখনো এক কাপ চা পেলাম না।
তাহির গুটিয়ে গেলো। বউ চা পায়নি। এই খবর শশুর বাড়ি যাওয়ার আগেই থামতে হবে। বউকে বুঝাতে হবে। তাহির মিষ্টি কন্ঠে বললো, কি খাবে বলো আমিই নিয়ে আসছি।
নুরজাহান ভেবেছিলো তাহির জানতে চাইবে, কি হয়েছে চা কেনো পায়নি। আর ওই সুযোগে সে স্বামীর কাছে আরও একবার ননদ ও শাশুড়ির বদনাম রটাতে পারবে। কিন্তু তাহির সে-ই সুযোগ না দেওয়াতে ফট করে কলটা কেটে দিলো সে।
তাহির আহত হলো। বউ হচ্ছে সাপ প্রকৃতির মহিলা। তাহির কখনোই বউয়ের সাথে ঝামেলায় জড়াতে চায়না। যত পারে ঝামেলা এড়িয়ে যেতে। কিন্তু আজ একটা ঝামেলা হবে সেটা ইতিমধ্যেই টের পেয়ে গিয়েছে।
রুম অন্ধকার, এখনো আলো জ্বালায়নি। জামিনা রুমে ঢুকতে গিয়ে হুঁচট খেলো। এমনিতে মন মেজাজ খারাপ। নুরজাহান অসন্তুষ্ট হয়েছে মানেই সংসারে ঝামেলা। এখন এসে খেলো হুঁচট। তারউপর মেয়েটা পড়ে পড়ে ঘুমাচ্ছে। সব মিলিয়ে জামিনার মাথায় রক্ত উঠে গেলো। পায়ের ব্যথা মনের ব্যথা সব একাকার হয়ে গেলো।
রুমে আলো জ্বালাইতে দেখলো নাজেরা কাঁথা মুড়িয়ে শুয়ে আছে। এই দৃশ্য যেনো দুনিয়ার সবচেয়ে জগন্যতম দৃশ্য। জামিনা চেচিয়ে উঠলো, নবাবজাদি ঘুমাচ্ছেন!! কত্তবড় সাহস দেখছো মেয়ের। জামিনা নাজেরা গায়ে হাত দিতে গেলে ওমনি কাঁপা কাঁপা হাতে নাজেরা মায়ের হাতটা ধরে টেনে কপালে ঠেকালো। শুকনো ঠোঁটে মিনমিনিয়ে বললো,
আম্মু আমার কপালে একটু হাতটা রাখুন। আপনার ছোঁয়া পেলে জ্বর পালাবে। আমিও জ্বর নিয়ে থাকতে চাইনা। জ্বর খুব পুড়ায় আমারে।
জামিনার হাতটা তখনও নাজেরা কপালে। জামিনা খাতুনের ব্রু কুঁচকে আসলো। মেয়েটা জ্বরে পুড়ে যাচ্ছে। তাই তো শুয়ে আছে। না হয় এই মেয়ে অবেলায় শুয়ে থাকার কথা নয়।
জামিনা দ্রুত রুম থেকে বের হয়ে আসলো। মানিককে ডেকে বললো ডাক্তারকে যেনো বাড়িতে আসতে বলে। ততক্ষণ নাজেরার পাশে থাকার জন্য কাজের খালা মালেকাকে পাঠিয়ে দিলো।
জ্বরের ঘোরে নাজেরার গলা শুকিয়ে আসছে। তারচেও বেশি শুকিয়ে আসছে হৃদয়। শুঁকনো ঠোঁটে মেয়েটা অসহায়ের মতো জপছে, আম্মু, আম্মু আপনি কোথায়…..!
চলবে…….
