#প্রতিশোধ
#পর্ব_৩
#ইলোরা_ফারদিন
জহিরের নামে নারী নির্যাতনের মামলা দিয়েছে তিতলী। ডিভোর্সও ফাইল করেছে। বাচ্চাদের ভরণপোষণের জন্য এককালীন টাকাও দাবি করেছে। আর নারী নির্যাতনের যথেষ্ট প্রমাণও আছে তার কাছে।
তাই জহিরের উকিল আহবান জানিয়েছে পরস্পর সমোঝতার মাধ্যমে ডিভোর্সের আর মামলা মিমাংসার।
তিতলী আর জহির সামনাসামনি বসে আছে। আর তাদের সাথে আছে তাদের উকিল।
জহিরের
তিতলীর উকিল রহিম কায়সার দাবি রাখে যে তিতলীকে কাবিনের দশ লাখ সহ আরও দশ লাখ দিতে হবে। এছাড়াও বাচ্চাদের ভরণপোষণের জন্য এককালীন ত্রিশ লক্ষ্য টা দাবি করে।
প্রথমে জহির মানা করে দিলেও পরবর্তীতে জেল খাটার ভয়ে রাজি হয়ে যায়। এভাবেই দুজনে শর্তের ভিত্তিতে মিউচুয়াল ডিভোর্সের জন্য সম্মতি জ্ঞাপন করে।
।।।।।।।।।
আজ তিন মাস পর অবশেষে তিতলীর ডিভোর্স কার্যকর হলো। ১২ বছরের বৈবাহিক সম্পর্ক থেকে সে মুক্তি পেল! আর হাতে পেল পঞ্চাশ লক্ষ টাকা। লোকের মুখে শুনেছে জহির তার বড় রাস্তার পাশের জমিটা বিক্রি করে দিয়েছে। এ কথা শুনে তিতলী কিছুক্ষণ থম মেরে ছিল। ওর মনে পরে যায় বিয়ের এক বছর পরেই ওরা ওই জমি কিনেছিল। অনেক বড় লোন হয়েছিল সেবার। শোধ করতে পুরো দুই বছর লেগেছিল। সে সময় কতই না স্ট্রাগল করেছিল তারা। জহিরের ইচ্ছা ছিল ওখানে বড় একটা বাংলো করবে, বৃদ্ধ বয়সে তারা দুই বুড়ো বুড়ী মিলে সেখানে থাকবে! কত কত স্বপ্ন! কত কত ইচ্ছা। আজ কোথায় সে সব? এক নারীর মোহে কিভাবে জহির নিজের স্ত্রী সন্তানদের ভুলে গেল! কিভাবে!
।।।।।।
বাবা আমি ভেবেছি আমি হোম মেড ফুড এর বিসনেস স্টার্ট করব। আমার রেসাল্ট ভালো সত্যি, কিন্তু এই বয়সে আমাকে কেউ চাকরিতে নিব না। বড় জোড় প্রাইভেট স্কুল গুলোতে টিচারের চাকরি পেতে পারি। কিন্তু সেখানে কম বেতন। বাচ্চাদের ভবিষ্যতের কথাও তো ভাবতে হবে। তাই আমি বিসনেস করতে চাই।
অবশ্যই মা। তুই তোর সব সিদ্ধান্তে তোর বাবাকে পাশে পাবি।
এভাই শুরু হলো তিতলীর এক নতুন যাত্রা।
তিনমাসের মধ্যেই সে ব্যবসায় সফলতার মুখ দেখলো। একটি রেস্টুরেন্ট খুললো। এভাবেই বাবা মা আর নিজের দুই সন্তান নিয়ে কাটতে লাগলো তিতলীর নতুন জীবন। যেখানে সে অনেক সুখী।
সময় এভাবেই কেটে যায়। পেরিয়ে যা ১৫ টি বছর!
১৫ বছর পর…..
চলবে…
#প্রতিশোধ
#পর্ব_৪
#ইলোরা_ফারদিন
১৫ বছর পর,
মাম্মা, ও মাম্মা আমার নুডুলুস তূর্ণা আপি, তূর্য ভাই আর অরণ্য ভাই খেয়ে ফেলেছে। তুমি আপিকে আর ভাইদেরকে বকো। বলেই কেদে দিল দশ বছরের তুবা।
এদিকে তিতলী খুনতি হাতে রান্না ঘর থেকে বেরিয়ে এলো। তারপর গজরাতে গজরাতে বলে উঠলো,
” এই তোরাও কি তুবার মত বাচ্চা হয়েছিস? এই বান্দরের দলের জন্য শান্তি পাই না আমি। আয় তো তুবা, ওদের বকে দিয়েছি আমি।”
মামনি তোমার এই মীর জাফর মেয়ের জন্য আমাদেরকে বকলে, দেখবে এখনি দল বদল করে আমাদের কাছে এসে বসবে। বলেই অরণ্য তুবাকে জিজ্ঞেস করলো,
“বনু নতুন গেম ডাউনলোড করেছি, খেলবি নাকি মামনির সাথে যাবি?”
ব্যাস! তুবা মুহুর্তেই নিজের দল চেঞ্জ করে বড় ভাইয়ার কোলে চড়ে বসলো। মা কে উদ্দেশ্য করে বলে উঠলো,
“মাম্মা আমি বড় ভাইয়ুর কাছে থাকব, তুমি যাও, বলেও ভাইয়ের কোল দখল করে সে থাকল।”
বোনের মীর জাফরের মতো আচরণে তূর্ণা তূর্য অরণ্য এক যোগে হেসে উঠলো। ভাই বোনদের মধ্যে এতো মধুর সম্পর্ক দেখে তৃপ্তির হাসি হাসলো তিতলী। চোখের সামনে ভেসে উঠলো পনেরো বছর আগের অতীত।
অতীত
একদিন পড়ন্ত বিকেলে তিতলীদের বাসায় হাজির হয় তার উকিল রহিম কায়সার। তিতলী তখন পুরোদমে ব্যস্ত তার নতুন ব্যবসা নিয়ে।
হুট করে রহিমের উপস্থিতি তাদের অবাক করে।
রহিম কায়সার সবার সাথে কুশল বিনিময় করে কোনো রকম ভণিতা ছাড়াই নিজের বড় ভাই বাশার কায়সারের জন্য তিতলীর হাত চেয়ে বসে। সে অত্যন্ত ভদ্র ভাবে বলে উঠেন,
“আজমল চাচা, তিতলীর অতীত আমার জানা। মেয়েটা কতটা কষ্ট করেছে দেখেছি আমি। এখন সে জীবনে সফল এটাও জানি। কিন্তু তিতলীও কিন্তু আমাদের মতোই মানুষ। আর কোনো মানুষই সারাজীবন একা থাকতে পারে না। এখন সবাই আপনারা আছেন তিতলীর পাশে, মানছি। কিন্তু জীবনের নিয়মে একদিন আপনারা দুনিয়া ছেড়ে চলে যাবেন। এদিকে তূর্ণা তূর্যও আলাদা সংসার হবে। তখন? ভেবেছেন একবার? তিতলী তখন একাকীত্বে গুমড়ে মরবে। আপনার কি মনে হয় না যে ওর একজন সঙ্গী প্রয়োজন।
এদিকে আমার ভাই বাশারের স্ত্রী মারা গেছে প্রায় দশ বছর। ওর একটা বারো বছরের ছেলে আছে।
আমার মনে হয় তিতলী আর বাশার একে অপরের পরিপূরক হতে পারে!
বাকিটা এখন আপনাদের সিদ্ধান্ত। আজ তবে চলি। আমি আপনাদের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় থাকবে।
রহিম যাওয়ার পর তিতলীর বাবা মা তিতলীর সাথে আলোচনায় বসে। প্রথমে তিতলী অনিশ্চিয়তায় থাকে। কিন্তু পরবর্তীতে সিদ্ধান্ত নেয় যে বাশারের সাথে দেখা করবে। জহির তো সংসার করছে, তবে সে কেন একা থাকবে?
এক সপ্তাহ পরেই তিতলী আর বাশার দেখা করে। বাশারকে দেখে তিতলীর পরিষ্কার মনের মানুষই মনে হয়। তাই বাকিটা আল্লাহর হাতে ছেড়ে দিয়ে সে বিয়েতে রাজি হয় যায়।
এরপর ছোট খাটো অনুষ্ঠানের মাধ্যমে সে মিসেস বাশার কায়সা হয়ে উঠে। অরণ্যকেও নিজের সন্তানের মতোই আগলে নেয়। প্রথমে ভালোবাসা না থাকলে বাশারের ভদ্রতা, স্ত্রীর প্রতি শ্রদ্ধা, তার বাচ্চাদের প্রতি ভালোবাসা সব মিলিয়ে তিতলীও বাশারের প্রতি দুর্বল হয়ে যায়। আর তুবা তাদেরি ভালোবাসার ফল।
অতীত থেকে বের হয়ে তিতলী তাড়াতাড়ি বাশারকে ফোন দেয়, বলে যে,
“আজ রহিম ভাইরা আসবে, তূর্ণা আর দূর্জয়ের বিয়ের তারিখ ঠিক করতে, তুমি তাড়াতাড়ি এসো।”
রহিম কায়সারের বড় ছেলে দূর্জয় কায়সার অনেক আগে থেকেই তূর্ণাকে পছন্দ করতো। কিন্তু তূর্ণা কোনো ভাবেই তার ভালোবাসা গ্রহণ করে নি। নিজের মায়ের জীবনের ঘটনা থেকে সে প্রচন্ড ভাবে প্রেম ভালোবাসা বিয়ে বিমুখ।
তাই তো দুর্জয় নিজের ক্যারিয়ার গড়ে পরিবারকে রাজি করিয়ে তূর্ণার জন্য বিয়ের প্রস্তাব পাঠাব। প্রথমে তূর্ণা রাজি না হলেও বাশার কায়সারের কথায় রাজি হয় কারণ বাশার কায়সারকে সে প্রচন্ড পরিমাণে সম্মান করে। তার কথা সে কোনোদিনও ফেলতে পারে না।
পরিবারের সবার আলোচনার মাঝে হঠাৎ তূর্ণা বলে উঠে, “বাবাই আমার একটা আবদার আছে।”
কি মা?
বাবাই আমি আমার জন্মদাতা পিতাকে আমার বিয়েতে আনতে চাই। তুমি কি রাগ করবে?
তূর্ণার কথায় পুরো ঘরে যেন বোমা পরলো। তূর্য তো রাগের মাথায় বোনকে থা*প্পড় লাগিয়ে দিল। রহিম কায়সার যেয়ে তাকে থামালো।
তূর্য রক্তিম চোখে বোনকে শাসিয়ে বললো,
“জা*নোয়ারের বাচ্চা, বেহায়া, তুই প্রমাণ করে দিলি যে তোর শরীরে ওই শু*উর জহিরের রক্ত। বেইমান তুইও। ভুলে গেলি আমাদের ওই কষ্টের দিন। ভুলে গেলি একটা ব্যা*শ্যার জন্য কিভাবে তোর আর আমার গায়ে হাত তুলছিল।তোর ওই শু*উর বাপ ওই পতিতার ঘরে টাকা দিতে গিয়ে আমাদের খরচ দেয়া বন্ধ করে দিয়েছিল। ভুলে গেছিস? যেই আমরা গাড়ি ছাড়া চলতে পারতাম না,সেই আমরা লোকাল বাসে করে স্কুলে গেছি। ভুলে গেছিস নিমক*হা*রাম। আজকে থেকে আমাকে ভাই ডাকবি না জা*নোয়ার।
বলেই তূর্য হনহনিয়ে বাসা থেকে বের হয়ে গেল।
বাশার কায়সার যেয়ে তূর্ণার মাথায় হাত রেখে বললো, ” তুমি যা চাবে তাই হবে মা.”
অন্য দিকে তিতলী পুরোটা সময় ছিল নির্বাক। সে মাথা নিচু করে নিজের ঘরে চলে গেল। মনে মনে ভাবলো,
“তবে কি রক্ত নিজের রঙ দেখালো!”
চলবে….
