#প্রতিশোধ
#ইলোরা_ফারদিন
#পর্ব_১
স্বামীর পরকীয়ার কথা যেদিন জানতে পেরেছিল তিতলী তখন থেকেই সে যেন মৃত মানুষে পরিণত হয়েছে। তবু সন্তানদের কথা ভেবে সে এই সংসারে পরেছিল। সহ্য করছিল স্বামীর অবহেলা, উপেক্ষা।
কিন্তু আজ যখন জহির ডিভোর্সের কথা বললো, তখন সে যেন দিশেহারা হয়ে পরলো। পা জড়িয়ে সংসার ভিক্ষা চাইলো। কিন্তু নির্দয় জহির লাথি মেরে তাকে সরিয়ে দিয়ে হন হন করে বাসার বাহিরে চলে গেল। আর তিতলীকে দিল দু’দিনের সময়। দু’দিনেই যেন এই ফ্লাট খালি করে সে। কারণ এই ফ্লাটের নতুন মালকিন রুমি এখানে এসে উঠবে। তিতলীর হাতে গোছানো সংসারটা হয়ে যাবে রুমির।
ছোট বেলা থেকেই নিজের নামের মতোই হাসিখুশি চঞ্চল মেয়ে সে। পড়াশুনায়ও দাড়ুন মেধাবী ছিল। তার নামে কোনো খারাপ রেকোর্ড আছে কি না সন্দেহ। বাবা মায়ের একমাত্র মেয়ে হওয়ায় ছোট বেলা থেকেই সে তার প্রতিটা পদক্ষেপ মেপে মেপে ফেলতো যাতে তার কারণে তার বাবার সম্মানে দাগ না লাগে। তাই তো প্রাপ্ত বয়স্ক হওয়ার পর বাবা মায়ের পছন্দকেই প্রাধান্য দিয়েছিল। বিয়ের পর স্বামীর পছন্দ অপছন্দকে মাথায় রেখে নিজের ক্যারিয়ারকে বিসর্জন দিয়ে সংসারেই পুরোপুরি মননিবেশ করেছিল সে। সে ছিল এক নিপুণ গৃহিণী, যার কোনো খুত বের করা নেহাৎ ই অসম্ভব!
কিন্তু একি হলো? এতোটা পারফেক্ট থাকার পরেও, তার স্বামী অন্য মেয়ের দিকে ঝুকলো?
তার স্বামী কি করে তাদের ১২ বছরের সংসার জীবনকে নিমিষেই ভুলে যেয়ে নতুন করে সংসার গড়ার স্বপ্ন দেখার সাহস করলো? একবারও কি সে তার দুটো সন্তানের কথা ভাবলো না? তাদের ভবিষ্যতের কথা ভাবলো না?? তার বড় ছেলে তূর্য মাত্র ১১ বছর আর মেয়ে তূর্ণার বয়স ৮। এই দুটো ছোট ছেলে মেয়ে নিয়ে সে কোথায় যাবে? বাবার বাসায়? তাহলে বাবার সম্মান? তা তো ধুলোই মিশে যাবে! আর তার নিজের বয়স এখন ৩৭। নিজে উচ্চশিক্ষিত হলেও তার যে কোনো ওয়ার্ক এক্সপিরিয়েন্স নেই। এতো বয়সী একজন নারী যার কিনা কোনো অভিজ্ঞতা নেই তাকে কে চাকরি দিবে।
বাচ্চাদের পড়াশুনার এতো খরচ সে একা কিভাবে বহন করবে, দুটো বাচ্চাই যে তার ইংলিশ মিডিয়ামে পড়ে। জহির যে ডিভোর্সের পর তাদের খরচ দিবে না তা তিতলী বোঝে, কারণ বিগত ছয় মাসে জহির সংসারে এক টাকাও দেয় নি। তিতলী নিজের সোনার চেন বিক্রি করে বাচ্চাদের স্কুল ফি, টিউশন ফি, বাজার করেছে।
তাহলে এখন কি করবে সে? বেহায়ার মতো মাথা গুজে এই ভাঙ্গা সংসারেই পরে থাকবে?
কিন্তু তাও তো সম্ভব না। জহিরের প্রেমিকা রুমি তো বলেই দিয়েছে সে সতীনের সংসার করবে না। তাই জহির বলে দিয়েছে যে সে তাকে ডিভোর্স দিতে চায়।
এভাবেই কাদতে কাদতে সারারাত কাটিয়ে দেয় তিতলী। অন্যদিকে জহির অফিস করেই চলে গিয়েছে রুমিদের বাসায়। সে আজকাল সেখানেই থাকে। ওখানে রুমির মা বাবা আর ভাইও থাকে । গত দুই বছর ধরে রুমিদের পরিবারের সব দায়িত্ব জহিরের কাধেই। লোকমুখে তিতলী শুনেছিল জহির নাকি রুমিকে বিয়ে করেছে অনেক আগেই। এতোকিছু শোনার পরেও দাতে দাত চিপে বেহায়ার মতো এই সংসারেই পরে ছিল তিতলী। কারণ সন্তানের ভবিষ্যৎ ও তার বাবার সম্মান।
মেয়েদের আসলে সুন্দর চেহারার চেয়ে সুন্দর ভাগ্য থাকাটা বেশি জরুরি!
#প্রতিশোধ
#পর্ব_২
#ইলোরা_ফারদিন
বাবার বুকে পরম আদরে লেপ্টে আছে তিতলী। বার বার হিচকি তুলে তুলে বার বার কেদে উঠছে। তার বাচ্চা দুটো পাশের ঘরে বিছানায় ঘুমোচ্ছে। বড্ড ক্লান্ত যে আজ তারা। নিজের বাবার পশুর মতো রূপটি আজ দেখেছে তারা। ভীষণ ভাবে ভয় পেয়েছে দুই ভাই বোন।
এতো কিছুর পরেও তিতলী জহিরের ওই ফ্লাটেই পরে ছিল। বিকেলের দিকে হুট করে জহির ফ্লাটে এসে হাজির হয়। সাথে ছিল রুমির বাবা আর ভাই। তারপর তারা টেনে হিচরে তিতলী আর ওর দুই বাচ্চাকে সেখান থেকে বের করে দেয়। রুমির বাবা ভাই তাকে জহিরের সামনে গায়ে হাতও তুলেছে।
তিতলী তবুও চুপ ছিল। জহিরের পা ধরে ভিক্ষা চাচ্ছিল তার সংসারটা। কিন্তু জহিরকে যেন তারা বশ করে রেখেছে।
এদিকে তূর্য যখন নিজের মাকে বাচাতে এগিয়ে আসে তখন রুমির বাবা তূর্যের পেট বরাবর লাথি মারে। ব্যাথায় তার বাচ্চাটা আর্তনাদ করে উঠে। এদিকে কিছুক্ষণ আগে বাবার কাছে থাপ্প*ড় খেয়েছে তূর্ণা।
তার দোষ শুধু এতোটুকু ছিল যে সে তার বাবাকে দেখে জড়িয়ে ধরেছিল।
নিজের প্রতি সব অন্যায় মেনে নিলেও, নিজের সন্তানদের শরীরে আঘাত মেনে নিতে পারলো না তিতলী।
সাথে সাথে রূমে দৌড়ে যেয়ে ৯৯৯ এ ফোন দিল।
এদিকে জহির আর রুমির বাবা ভাই কিছু বুঝে ওঠার আগে ফ্লাটে পুলিশ এসে হাজির হলো। এরেস্ট করে নিয়ে গেল তিন নরপশুকে।
তিতলীও এক মুহুর্ত দেরি না করে নিজের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র গুছিয়ে নিয়ে বাচ্চা দুটোকে বুকে আগলিয়ে নিয়ে আসলো বাবার বাসায়, যা তার শেষ আশ্রয়।
বাসায় এসেই সে আজমল সাহেবকে সব খুলে বললো।
সব শুনে আজমল সাহেব যেন স্তব্ধ হয়ে গেলেন। এদিকে তিতলীর মাও মেয়ের কষ্টে কেদে ফেললেন।
আজমল সাহেব মেয়েকে বুকে নিয়েই জোর কন্ঠে বলে উঠলেন, “এতো দেরি করলি কেন রে মা? আরো আগে কেন ছেড়ে আসলি না ওই কাপুরুষকে?তোর বাবা কি মরে গেছে। তোর বাপটা আল্লাহর রহমতে বেচে আছে মা। তুই আমাদের একটাই মেয়ে রে মা
তুই ছাড়া আর কে আছে? তুই তোর বাবা মায়ের বোঝা না, আমাদের শক্তি। আমরা সমাজের পরোয়া করি না। তুই আমাদের অনেক শখের সন্তান তিতলী।”
বাবার থেকে সাহস পেয়ে তিতলী যেন আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠলো।
নাহ! তাকে এভাবে হেরে গেলে চলবে না। তাকে আবার উঠে দাড়াতে হবে। অন্তত নিজের সন্তানদের জন্য।
বাবার বুক থেকে মাথা তুলে তিতলী বলে উঠলো,
“বাবা আমরা কালকেই উকিলের কাছে যাব। ওই পশুটাকে ডিভোর্স দিব, নারী নির্যাতনের মামলাও দিব, আর আমার বাচ্চাদের ভরণপোষণের টাকাও আদায় করব। ওকে আমি মোটেও ছাড় দিব না বাবা। অনেক সহ্য করেছি। কিন্তু আর না।”
বলেই নিজের ঘরে চলে গেল তিতলী। সে এবার বাচবে, নিজের জন্য বাচবে, নিজেকে ভালোবাসবে। আর সো কল্ড পারফেক্ট হওয়ার চেষ্টা করবে না। সমাজ যা মন চায় বলুক। তাদের মুখে এক দলা থু।
চলবে….
