#ঝাঁঝ_লবঙ্গ |শেষ পর্ব|
#লেখনীতে_মুসতারিন_মুসাররাত
সিমি বিস্ময় নিয়ে বিন্দুর দিকে চেয়ে। কত সুন্দর করে আংশিক সত্যের সাথে রঙচঙ মাখিয়ে মিথ্যে বলল, তবুও এই মেয়ের বিশ্বাস হলো না। উল্টো এই মেয়ে নরম স্বরে বাঁশ দিয়ে কথা বলছে। সিমির মুখটা দেখার মতোন হলো। অথচ বিন্দুর চোখমুখে উত্তেজনা নেই, বরং শান্ত। চোখদুটোতে এমন এক শান্ত দৃঢ়তা যেন বহু ঝড় দেখে ফিরে আসা সমুদ্র, ও দুটো চোখের তারা। রোহান দূর থেকেই মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে রইল সেথায় নির্নিমেষ।
বিন্দু ক-পল চুপ থেকে সরাসরি সিমির মুখের দিকে তাকাল। ওর বানানো গল্পের প্রতিটি কথার একটা একটা জবাব তৈরি করে নিল। মুখে হাসি টেনে স্বাভাবিক ভঙিতেই বলল বিন্দু,
-” জানো সিমি, একটা কথা পরিষ্কার করে বলি।
ভালোবাসা কখনো দাবি করে বসে না; আমি আগে ছিলাম। অমুকের জায়গায় আমার থাকার কথা ছিলো। এসব বাচ্চামি কথাবার্তা। সত্যি কারের ভালোবাসা থাকলে মানুষ ধরে রাখে, আর না পারলে নীরবে সরে দাঁড়ায়।”
সিমি জিভ দিয়ে শুকনো ঢোক গিলে গলা ভেজাল। বিন্দু ঠাণ্ডা অথচ তীর্যক গলায় বলে চলল,
-” তুমি বললে, তোমরা দুবছর প্রেম করেছিলে। ভালো।
কিন্তু প্রশ্ন হলো; সেই প্রেমটা কি এতটাই শক্ত ছিল যে আজও টিকে থাকার যোগ্য?”
সিমি কিছু বলতে নিলে বিন্দু থামিয়ে দিলো,
-” ভেঙে যাওয়া সম্পর্ক নিয়ে এসে বর্তমানের ঘরে আ*গুন ধরাতে চাইলে ওটা প্রেম হয় না সিমি। ওটা ওয়ান কাইন্ড অফ কনস্পিরেসি।”
সিমির মুখের রং বদলাতে শুরু করল। বিন্দু দৃঢ় স্বরে বলল,
-” আর একটা কথা। যে পুরুষ আজ আমার স্বামী,
সে তার অতীত নিয়ে আমার কাছে জবাবদিহি করতে বাধ্য নয়, ঠিক যেমন আমি আমার আগের জীবনের প্রতিটা পাতার হিসেব কাউকে দিতে বসিনি।”
বিন্দু শেষ খোঁচাটা দিল একেবারে নিখুঁত ভাবে,
-” তুমি বললে, প্রথম ভালোবাসা ভোলা যায় না। ঠিক। কিন্তু প্রথম ভালোবাসা যদি সত্যিই এত মহার্ঘ হতো,
তাহলে আজ তুমি এখানে এসে আমার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে প্রমাণ করার চেষ্টা করতে না। আমি তোমার জায়গায় থাকলে, নিজের সম্মানটা অন্তত নিজের হাতেই রাখতাম।”
বিন্দুর প্রতিটি কথার ঝাঁঝে সিমির মুখ অন্ধকার হয়ে আসে। বিন্দু এবারে ঘৃণা মিশ্রিত কণ্ঠে বলে উঠল,
-” একটা মেয়ের যদি ন্যূনতম লজ্জা থাকত, তাহলে সে সেই পরিবারে মুখ দেখাতে আসত না; যে পরিবারের ছেলের সাথে তার বিয়ে পাকাপাকি হওয়ার পরও,
কমিটেড থাকা সত্ত্বেও, লোভে পড়ে অন্য একজনের হাত ধরে পালিয়ে গেছে।”
সিমির চোখ নামতে শুরু করল। অপমান আর লজ্জায় চোখ তুলে তাকানোর সাহস হলো না। বিন্দু দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
-” তবু মানলাম। রক্তের সম্পর্ক আছে বলে খালার বাড়িতে আসা। এ পর্যন্ত ঠিক আছে। কিন্তু তুমি? তুমি একটা মেয়ে হয়ে কেমন নির্লজ্জের মতো আমার কাছে আমারই স্বামীর সাথে তোমার প্রেমের গল্প শোনাও? এক রত্তি লাজ-লজ্জা থাকলে, এসব কথা তুমি বলতে পারতে না সিমি। আর যদি লজ্জা না-ই থাকে, তাহলে অন্তত বুদ্ধিটুকু থাকা দরকার ছিল। কার সামনে কী বলা যায়, আর কী বলা যায় না।”
অপমানে জর্জরিত সিমি বোবা বনে যায়। এখন মনে হচ্ছে ঘাট হয়েছে তার। সিমি মৃদুস্বরে ঠোঁট নেড়ে মিথ্যে বলার চেষ্টা করল,
-” তুমি ভুল বুঝছো বিন্দু, আমার খারাপ উদ্দেশ্য নেই। আমি তো শুধু__”
বিন্দু হাত তুলে থামিয়ে দিল। বলল,
-” শোনো, যাওয়ার আগে একটা ছোট্ট উপদেশ দিই।
নিতে পারো, না পারো, ওটা তোমার ব্যাপার।”
এক মুহূর্ত থামল বিন্দু। পরপর বলল,
-” নিজের স্বামীর যদি কোনো অক্ষমতা না থাকে, যদি সে তোমাকে ঠিকঠাক ভরণপোষণ দেয়, তাহলে তার কাছেই ফিরে যাও। শুনছি তুমি তাকে ছাড়তে চাইছো,
কিন্তু সে এখনো সংসার করতে চায়। হ্যাঁ, সে চিট করেছে। আমি অস্বীকার করছি না। কিন্তু প্রকৃতির মারপ্যাঁচ বোঝা বড় কঠিন সিমি। সে একা চিট করেনি। তোমার লোভও খুব কম ছিল না।”
মন থেকে উপদেশ দিয়ে শেষের কথাগুলো বলল বিন্দু,
-” ভুলের বোঝা একা বইতে গেলে মানুষ ভেঙে যায় সিমি। কিন্তু ভুলটা স্বীকার করে যদি সঠিক জায়গায় ফিরে যাওয়া যায়, তাহলে তখনো কিছুটা সম্মান, কিছুটা স্থিরতা বাঁচিয়ে রাখা সম্ভব। একজনকে ছেড়ে আরেকজনের কাছে যাওয়া, বারবার আরো বেশি পাওয়ার আশায় দিক বদলানো। এগুলো কখনো শান্তি দেয় না। লোভ মানুষকে সাময়িক উত্তেজনা দেয়, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে শুধু শূন্যতা আর অনুশোচনাই বাড়ায়। জীবনে যদি একজন মানুষকে মন থেকে বেছে নেওয়া যায়, তার ভালো-মন্দ নিয়ে যদি স্থির থাকা যায়, তাহলে অল্পতেই তৃপ্তি আসে। আর বিশ্বাস করো অল্পতেই তুষ্ট হতে শেখা মানুষগুলোই দিনশেষে সবচেয়ে শান্ত থাকে। বেশি পাওয়ার দৌড়ে যারা ছুটে চলে, তারা শেষমেশ সবকিছুই হারিয়ে ফেলে।”
সিমি স্তব্ধ। ও মনে মনে হিসাব কষল— সত্যিই তো এ পর্যন্ত হিসেব করলে ও সব হারিয়েছেই, সব নিজের দোষেই। সিমির শক্ত পাথরে পাপিষ্ঠ মনটা কেঁদে উঠল। চোখের কোণে জল জমল। না আজ আর ওর মধ্যে অভিনয় নেই। বাস্তব কথাগুলো আঙুল দিয়ে কেউ একজন এত সুন্দর করে বুঝিয়ে দিল। কই এভাবে কেউ তো বোঝায়নি! অভিভাবকরা আরো উস্কিয়েছে। সিমির অন্ধকার মনের দুয়ারে এক ফোঁটা আলোর ঝলকানি দিলো। ও মন থেকে অনুতপ্ত হলো।
দরজার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা রোহানের মুখচোখে আনন্দের ঝিলিক। মেয়েটাকে যত দেখে ততই অবাক হয়! এক রত্তি মেয়েটা অনেক বুদ্ধিমতী। এই মেয়েটা শুধু ঝাঁঝ না, সে আয়না। যার সামনে দাঁড়ালে মিথ্যে টেকে না। সর্বোপরি একটা ভালো মনের মেয়েও নিঃসন্দেহে।
.
রোহান ফ্রেশ হয়ে এসে তোয়ালে দিয়ে মুখ মুছছিলো। বিন্দু ধোঁয়া ওঠা চায়ের কাপ এনে টিটেবিলে রাখল, শব্দ করে। রোহান সেটা দেখে ভ্রু কুঁচকে শুধাল,
-” ম্যাডাম কী কোনো কারণে রেগে আছেন? তখন তো নিজ কানেই সব শুনলাম। সিমির কথা বিশ্বাস করোনি। তাহলে এখন হঠাৎ এত রাগ হলো এই অধমের উপরে যে, মুখটা বাংলার পাঁচ করে রেখেছো। ভাল-মন্দ কিছুই বলছো না। চিন্তার বিষয়।”
ড্রেসিং টেবিলের উপর রাখা পারফিউম আর প্রসাধনীগুলো গুছিয়ে রাখতে রাখতে বলল বিন্দু,
-” কে বলল সিমির কথাগুলো আমি বিশ্বাস করিনি? আমি আপনাকে এটা একবারও বলেছি?”
রোহানের চোখ ছোটো ছোটো হয়ে আসে। অবাক স্বরে বলল,
-” মানে? তখন যে সিমিকে বললে!”
বিন্দু শাড়ির আঁচল গুছিয়ে বিছানায় পা ঝুলিয়ে বসল। পা দুলাতে দুলাতে বলল,
-” পুরুষ মানুষকে চোখ বুজে বিশ্বাস করা যায় না। তবে তাই বলে তৃতীয় পক্ষকে সুযোগ দেবো এতটাও বোকা বিন্দু নয়। যা রাগ-ক্ষোভ থাকবে চারদেয়ালের মাঝে, কাউকে বুঝতে দিলে তাদের কেউ হয়তো সুযোগ খুঁজবে, কেউ আবার নয়তো মজা নিবে। তাই যাইহোক না কেনো, সারা দুনিয়ার সামনে অন্তত বোঝাতে হবে আমি আমার স্বামী বলতেই অন্ধ। সেও আমি বলতেই দিওয়ানা। দু’জনের মাঝে সুচও ঢোকানো সম্ভব নয়।”
এই মেয়ের কথা বলার ভঙি দেখে রোহানের হাসি পেল। তবে অন্য চিন্তায় হাসিটা চেপে রাখল। কপালে দু’টো চিন্তার ভাঁজ নিয়েই বিন্দুর বাহু ধরে নিজের দিকে ঘুরিয়ে নিল। ঝটপট বলল,
-” সব বাদ, আগে আমার কথার ক্লিয়ার করে উত্তর দাও। এনগেজমেন্টটা বাদে সিমি বাকি যেসব বলেছে ওগুলোর ব্যাপারে তোমার কী মনে হয়? তুমি কী আদৌও বিশ্বাস করেছো নাকি?”
নাটকীয় ভাবে দুইটা হাতে রোহানের গলা প্যাঁচিয়ে ধরল বিন্দু। মুখে বাঁকা হাসি ফুটিয়ে বলল,
-” উমম! বললাম তো পুরুষ মানুষের চরিত্র ফুলের মতোন পবিত্র এমন সার্টিফিকেট দেয়া রিস্ক। বিয়ের আগে একটুখানি ছুঁকছুঁকানি স্বভাব থাকলেও থাকতে পারে। ধরুন মহান মনের পরিচয় দিয়ে সেসব মাফটাফ করেছি।”
রোহানের মুখ গম্ভীর হয়ে যায়। বিন্দু সেটা দেখে শব্দ করে হেসে উঠল। হাসতে হাসতে বলল,
-” এমনি মজা করেই বলছি। আমি আপনাকে চিনি। তবে মিস্টার…. আমি ছাড়া অন্যকারো দিকে ঝুঁকতে দেখলে, সেদিন ডিরেক্ট..”
বলতে বলতে নাটকীয় ভাবে রোহানের গলায় আঙুল দিয়ে ছু”রি চালানোর মতো করে বলল,
-” খু*ন করে ফেলব, হুহ।”
বিন্দুর নাকে টোকা দিয়ে বলল রোহান,
-” তুমি ছাড়া অন্যকারো দিকে ঝুঁকব, রোহানের ঘাড়ে কটা মাথা আছে আর?”
বিন্দু হেসে বলল,
-” একটা।”
বউকে বাহুডোরে আবদ্ধ করে বলল রোহান,
-” এই একটা মাথা আস্ত রাখতে একটা বউই থাকবে। সেটা শুধু… আর শুধুই আমার বিন্দু ঝাঁঝ রাণী।”
_________
সিমি চলে গেছে আজ দু’দিন হবে। রোকেয়া ছেলে-বউমার উপর গোস্বা করে আছে। সে তো ঢাকঢোল পিটিয়ে এ-ও বলে বেড়াচ্ছে— রোহানের বউয়ের তাড়নায় তার বোনের মেয়ে এক দন্ড এসে থাকতে পারেনি। দু’দিন না যেতেই তাড়িয়েছে।
শুধু বলে বলেই ক্ষ্যান্ত দেননি। রোহানের উপর অভিমান করে আছেন, ছেলে আসলেই সেই একই কথা,
-” তুই সত্যি সত্যি মা’কে পর করে দিলি বাবা। তোর বউ তোরই খালা-খালাতো বোনকে টিকতে দিলো না। তুই কিচ্ছুটি বললি না। এইদিনও দেখার ছিলো।”
নাক টেনে আঁচল তুলে চোখমুখ মুছে আরো বলেন,
-” এরপর তোর বউ আমাকে তাড়াবে। এ আমি নিশ্চিত।”
রোহান বুঝিয়েছে। মা’কে সে অনেক বুঝিয়েছে। কিন্তু রোকেয়া তো রোকেয়াই। সে বুঝলে তো?
বিন্দুর হাতের রান্নাবান্না খেলেও ওর সাথে কথাবার্তা একদম বলছেনই না রোকেয়া। বিকেল বেলা এক প্রতিবেশী বয়স্ক মহিলা এসেছেন। বিন্দু রান্নাঘরে চা বানাতে যায়। দু’জন বসে ছেলের বউদের কিচছা গাইছে। অমুকের বউমাটা এমন, তমুকের বউমাটা বেশ ভালোই। শাশুড়িকে খুব মান্য করে। কথায় কথায় রোকেয়া বিষণ্ণ চিত্তে বলছেন,
-” সোহাগের মায়ের ব্যাটার বউটা ভালোই। সাত চড়ে রা নেই। কী রান্না করবে.. এখনো সবটা সেই বলে দেয়। তার সংসারে বউয়ের মাতব্বরি নেই। মানুষের কপালও।”
আগত মহিলা মাথা নেড়ে সায় দিয়ে বলেন,
-” ঠিক বলছো ভাবী।”
বিন্দু চায়ের ট্রে নিয়ে আসতে আসতে বলল,
-” একটা কথা আছে না পরের বাড়ির পিঠা খেতে লাগে মিঠা। পরের বাড়ির সবকিছুই সুন্দর লাগে আম্মা।”
রোকেয়াসহ উক্ত মহিলার মুখের আদল বদলে গেল। ট্রেটা নামিয়ে ভদ্রতা বজায় রেখেই আরো বলল বিন্দু,
-” আপনাদের চোখে যেমন পাশের বাড়ির বউটা খুব ভালো, গিয়ে দেখবেন ওদের অনেকেই আবার বলছে, ‘পাশের বাড়ির বউটা কত ভালো!’ ওদের অনেকের কাছেই হয়তোবা আমি ভালো। এই ভালোটা আসলে চোখের ভুল। যার সংসার ভেতর থেকে দেখা যায় না, তাকেই বাইরে থেকে সবচেয়ে ঠিকঠাক মনে হয়। তাই কে কেমন এই তুলনায় না গিয়ে, যার যেমন আছে তাকে আপন করে নিয়ে সন্তুষ্ট থাকাই বোধহয় সবচেয়ে ভালো।”
পাকা পাকা কথায় রোকেয়ার গা জ্বলে। আড়ালে মুখ বাকালেন। তবে তাতে এখন আর বিন্দুর যায় আসে না। অবশ্য উচিত কথা বলতে বিন্দু ভ’য়ও পায় না।
সেদিন সন্ধ্যার পরপর। রোহান বাড়িতেই ছিলো। রোকেয়া নিজের ঘর থেকেই আহাজারি করে উঠলেন। রোহান দৌড়ে যায়। মায়ের শরীর খারাপ লাগছে কীনা জিজ্ঞাসা করে। রোকেয়া হাতে ফোন ধরে আছে। ভেজা গলায় বললেন,
-” রোহান, বাবু… বাবু রে? দ্যাখ তো রুহির কী হয়েছে? রুহি কেঁদে ফোন করেছে। জামাইয়ের সাথে ঝামেলা হয়েছে। ও বলল আজই চলে আসবে। তোকে একবার যেতে বলল। হায় হায়! আমার মেয়েটার সোনার সংসারে কীসের চোখ পড়ল! কী হলো!”
বিলাপের সুরেই আরো বলতে লাগলেন রোকেয়া,
-” আমার জামাইডা তো রুহির কথায়ই উঠত-বসত। সব তো ভালোই ছিলো। আল্লাহ রে..”
বিন্দু রোহানের পিছপিছ এসেছে। ভেবেছিল কী জানি না কী হয়েছে! রোহান মা’কে আশ্বস্ত করতে বলল,
-” মা তুমি চিন্তা করো না। আমি এক্ষুনি আপাকে ফোন দিচ্ছি।”
বিন্দু ফোড়ন কেটে বলল,
-” আচ্ছা আম্মা আপনি আগেই এত অস্থির কেনো হচ্ছেন। তাদের স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে হয়তো ঝগড়া হয়েছে। আর এটা স্বাভাবিক। একসাথে চলতে গেলে কখনো একটু-আকটু হতেই পারে। এখন আপনি পুরোটা না শুনে, অস্থির হয়ে প্রেশার বাড়াচ্ছেন। সাথে তাদের প্রাইভেসিও ন’ষ্ট হচ্ছে। এরচেয়ে মেয়ের কী সমস্যা ভালো করে শুনে, বোঝাতে পারতেন। তা না এমন করে চিৎকার করছেন, আপনার চিৎকারে পাশের বাসার সবাই জেনে যাবে, ভাববে কী জানি কী হয়েছে।”
-” আমার মাইয়া, তুমি বুঝবা না। তুমি তো চাইবেই আমার মেয়ে যেন এ বাড়ি না আসে।”
দুই হাত বুকে গুঁজে ভ্রু বাঁকিয়ে শুধিয়ে বলল বিন্দু,
-” আপনি চান আপনার মেয়ে সংসার ছেড়ে একবারে এ বাড়ি চলে যেন আসে?”
-” তা কেনো চাইবো? পাগল তুমি, কোনো মা তাই চায়?”
-” সেজন্য তো বলছি, অস্থির হয়ে লোক জানাজানি না করে বিষয়টা শুনুন, আর মিটমাট করতে সাহায্য করুন।”
রোহান প্রথমে আপার কাছে ফোন করে। তারপর দুলাভাইয়ের কাছে। দুলাভাই মাটির মানুষ। পাঁচ বছরের সংসারে তাদের ঝামেলা খুব কমই হয়েছে বলা চলে। কোনো একটা কারনে মনোমালিন্য হয়েছে, আপাকে রাগ করেছে দুলাভাই। তাতেই আপা কেঁদেকেটে একশা। মায়ের কাছে ফোন দিয়ে বলেছে আসার কথা। অবশ্য পরবর্তীতে দুলাভাইই ফোনে রোহানকে আশ্বস্ত করেছে— তার রাতে কষ্ট করে আসার দরকার নেই। রুহির রাগ সেই মানিয়ে নিবে। রুহিটার রাগ হলে মাথা ঠিক থাকে না। তাই হয়তো আম্মাকে ফোন করে কেঁদে চলে যাওয়ার কথা বলেছে। রোহান এমনি এসে আপাকে যেন দেখে যায় পরে পাছে।
দুলাভাইয়ের সাথে হওয়া কথা রোহান মা’কে বলে। তবুও রোকেয়ার চিন্তা কমে না। রোকেয়া বিছানার এক পাশে বসে, আঁচলের কোণে চোখ মুছছেন বারবার। রোহান আজ এই ফাঁকে মা’কে আরেকটু বোঝানোর সুযোগ পেলো। সে ধীরে ধীরে এসে মায়ের পায়ের কাছে বসল। দুই হাতে মায়ের হাত দুটো আলতো করে ধরে ডাকল,
-” মা?”
রোকেয়া মুখ ফেরালেন না। তবু হাত ছাড়ালেনও না।
রোহান আবার বলল,
-” তুমি নিশ্চয় চাও তোমার মেয়েটা ভালো থাকুক। জামাই যেন তাকে চোখে চোখে রাখে, কষ্ট না দেয়। আর এটাই তো স্বাভাবিক। সব মায়েরাই এটা চায় মা। এতে দোষের কিছু নেই।”
রোকেয়ার চোখ ভিজে উঠল আরও।
-” তাই তো রে বাবা। আমার মেয়েটা কষ্ট পেলে আমার বুকটা ফেটে যায়।”
রোহান মাথা নোয়াল। কণ্ঠে এবার একটু দৃঢ়তা নিয়ে বলল,
-” ঠিক এই জায়গাটাতেই আমি তোমাকে একটা কথা বলতে চাই মা। তুমি আজ রুহি আপাকে নিয়ে যেমন অস্থির হচ্ছো, যদি তার এক আনাও, এক ফোঁটা হলেও বিন্দুর জন্য রাখতে, তাহলে এই বাড়িটা এতদিনে কত শান্ত হতে পারত ভাবো তো।”
রোকেয়া এবার তাকালেন ছেলের দিকে। চোখে বিরক্তির ছাঁট পড়ল। রোহান বলছে,
-” মা, তুমি তো জানো একটা মেয়ে শ্বশুরবাড়িতে আসে নিজের একটা সংসার গড়তে। সে চায় একটু নিজের মতো করে গুছাতে। কিন্তু বেশিরভাগ সময় শাশুড়িরা সেটা নিতে পারে না। তারা বারবার বোঝাতে চায়; এটা আমার সংসার, এখানে আমিই সব।’ তখন মেয়েটার মনটা ভেঙে যায় মা।”
রোকেয়া ঠোঁট শক্ত করলেন।
-” তাহলে কি সব দোষ শাশুড়ির? তুই বলতে চাইছিস তোর বউয়ের কোনো দোষ নাই? সব দোষ আমার?”
রোহান সঙ্গে সঙ্গে মাথা নাড়ল।
-” না মা। আমি সেটাও বলছি না। অনেক বউয়েরও ভুল থাকে। অনেকেই মানিয়ে নিতে চায় না। কিন্তু তুমি নিজেই বলো, একটা সংসার কি একতরফা চলে? দুদিক থেকেই তো একটু একটু করে ছাড় দিতে হয়।”
একটু থেমে সে যোগ করল,
-” ভাবী কেন আলাদা থাকতে চেয়েছিল মনে আছে?সে তার মতো করে যখন সংসার করতে পারছিল না, শেষমেশ ভাইয়াকে বলেছিল আলাদা থাকতে। আজ বিন্দুর ক্ষেত্রেও তুমি একই ভুলগুলো করছো মা। আমি জানি তুমি ওকে পছন্দ করো না। তবুও আমি দুই দিক সামলানোর চেষ্টা করছি। কিন্তু সবসময় কি একজন মানুষ এভাবে ব্যালেন্স করে চলতে পারে?”
রোকেয়ার মনটা কিছুটা থিতু হলো। রোহান মায়ের হাত দুটো আরও শক্ত করে ধরল।
-” মা, তুমি নিজেই ভাবো তুমি যদি বিন্দুকে মন থেকে চাইতে, নিজের মেয়ের ক্ষেত্রে যেমনটা চাও, এর একটু ওর জন্য চাইলে কী এমন ক্ষতি? এতে তোমার ছেলে পর হয়ে যাবে না মা। মা তুমি অযথাই সব হারানোর ভয়ে সবসময় পেরেশানিতে থাকো। সাথে অশান্তির সৃষ্টি করো। একবার মন থেকে বিন্দুকে মানিয়ে নেও, দেখবে সবঠিক হয়ে যাবে।”
___________
কেটে গিয়েছে বেশ কয়েক মাস। রোকেয়া অনেকটাই বদলেছেন। তবে কাজে খুঁত ধরার স্বভাবটা আজও আছে। টক-ঝাল-মিষ্টি টাইপের বিন্দুর সংসার চলছিলো। সে তার সংসারে কখনো হাসি-খুশি প্রাণবন্ত, কখনো আবার ঝাঁঝ লবঙ্গ। এখন অবশ্য বিন্দুর মেজাজটা চটে আছে। আজকের ছুটির বিকেলটা ঘুরতে যাওয়ার কথা ছিলো। সেখানে রোহান সেই দুপুরে খেয়েদেয়ে বেড়িয়েছে এখনো আসার নাম গন্ধ নেই। তারপর এখন আবার আষাঢ়িয়া ইলশেগুঁড়ি নামতে শুরু করেছে। বিন্দু রাগে গজগজ করতে করতে বিছানার চাদর বদলিয়ে নতুন চাদর পাড়ছিল। বালিশের কভার ভরছিল তখন রোহানের পা পড়ল ঘরে। রোহান ঘরে ঢুকেই একটা হাসি উপহার দিলো। দিয়েই বলল,
-” স্যরি বিন্দু, আজকের ঘুরতে যাওয়ার প্লানটা ক্যান্সেল হওয়ার জন্য।”
বিন্দু চোখ মোটামোটা করে তাকাল। রোহান এগিয়ে এসে বিন্দুর শাড়ির আঁচল তুলে মাথার ভেজা চুল মুছতে থাকলো। বিন্দু রাগে গজগজ করছে, তবে কিচ্ছুটি বলছে না। রোহান বলল,
-” একটু কাজে আঁটকে গিয়েছিলাম বিন্দু। তাই দেরি হলো ফিরতে। এখন আবার বৃষ্টি। বৃষ্টি না পড়লে এখুনি বেরোতাম। তুমিই বলো, এই বৃষ্টি মাথায় নিয়ে বাহিরে বেরোনোটা কী ঠিক হবে? আমার মনেহয় তারচেয়ে কাঁথা মুড়ি দিয়ে বউকে নিয়ে শোয়াটাই আরামদায়ক হবে।”
শেষ কথাটা বলেই দুষ্টু হেসে চোখ টিপল রোহান। বিন্দু সাথে সাথে রাগ দেখিয়ে হাতের বালিশ রোহানের দিকে ছুঁড়ল। রোহান সুন্দর করে ক্যাঁচ ধরল। ধরেই মুচকি হেসে বলল,
-” আমার ঝাঁঝ রাণী দেখছি রেগে ফায়ার। আজকের মতোন মাফ করো বউ আমার।”
নাটকীয় ভঙিতে কানে হাত ধরে ক্ষমা চাওয়ার মতোন করে দাঁড়াল রোহান। বিন্দু ঝাঁঝালো স্বরে,
-” নো নেভার।”
বলেই উঠে বুকে হাত গুজে উল্টোদিক ফিরে পিঠ করে দাঁড়াল। রোহান পকেট থেকে বেলি ফুলের মালা বের করে বিন্দুর কাঁধের উপর দিয়ে সামনে ধরে বলল,
-” এটা তোমার জন্য। এরপরেও রাগ কমাবে না?”
বিন্দু কিছু বলল না। রোহান যত্নসহকারে বিন্দুর চুলের খোঁপায় আঁটকে দিল। পরপর পেছন থেকে জড়িয়ে ধরে আয়নার সামনে দাঁড় করাল। বলল,
-” তাকাও বিন্দু।”
বিন্দু চোখ তুলল। আয়নায় দু’জনের চোখাচোখি হলো। কিছুপল নিঃশব্দে চোখে চোখে কথা চলল। বিন্দু আচমকা জিজ্ঞাসা করল,
-” আচ্ছা রোহান আমি যে হুটহাট করে রেগে যাই। রেগে যেটা মনেহয় সেটাই বলে ফেলি। আপনি এতে আমার উপর বিরক্ত হোন না?”
বিন্দুর কাঁধে থুতনি রেখে বলল রোহান,
-” হুটহাট করে রেগে যাওয়া মেয়েরা লক্ষ্মী বউ হয়। ওদের মধ্যে মেকি কিছু থাকে না, ওরা অভিনয় করে না। যেটা করে মন থেকে, একদম রিয়েল। ওরা সংসারটাকে খুব ভালোবাসে। আর জানো বিন্দু, রাগি, ঝাঁঝালো মেয়েদের মনটা থাকে কাঁচের মতোই স্বচ্ছ। সবশেষে তুমি যেমন, আমি তেমন তুমিটাকেই খুব ভালোবাসি বিন্দু।”
✨সমাপ্ত✨
