#প্রেমাতাল
#পর্ব–১৮
#Fatema_Aktar_mim
আজ আকাশটা অদ্ভুতভাবে শান্ত।আকাশে কোনো মেঘ নেই,শুধু অসংখ্য তারার মেলা। হালকা মৃদু বাতাসে প্রকৃতি যেন দোল খাচ্ছে।এই বাতাসটা-ই যেন নবাগত ঝড়ের আবাস।
রুদ্র আর তানহা দাড়িয়ে আছে তালুকদার বাড়ির সামনে।রুদ্রের হাতে ফুলের মালা, যেটা নিয়ে আনমল তার কোলে বসে খেলছে।তানহা ঠিক ভীতু হয়ে তার পাশেই দাঁড়িয়ে আছে।রায়হান তালুকদারের সামনে দাড়িয়ে কথা বলতেও সাহসী মেয়েটার গলা আজ কেমন আটকে যাচ্ছে।শুধু ফ্যালফ্যাল চোখে আশেপাশে তাকিয়ে আছে।প্রতিবেশী দুই-একজন মহিলা মুখে কাপড় চেপে কানাঘুষা করছে।আবেগে পড়ে বিয়ে করে কোনো ভুল করলো না তো তানহা?ভেবেই তার বুক কেঁপে উঠছে।
~দীর্ঘদিনের অপেক্ষা, সমাজের ভয়,অতীত সবকিছুকে পিছনে ফেলে অবশেষে দুটি মাতাল মনের ভালোবাসা পুর্ণতা পেল।”এই ভালোবাসার পথটা এতোটা সহজ ছিল না,বা ভবিষ্যতে হয়তো আরও ভয়ংকর কিছু অপেক্ষা করছে।
একটা সময় ছিল, যখন ভয় তানহাকে সবকিছু থেকে আটকে রেখেছিল।অতীতের ক্ষতগুলো তাকে নিশ্বাস নিতে পর্যন্ত দেয়নি।বরাবরের মতোই সমাজের নিয়মগুলো তার সমস্ত সাহস কেড়ে নিয়েছিল।কিন্তু আজ, সবকিছুকে পেছনে ফেলে সে শুধু হৃদয়ের কথাই শুনেছে।
~এই মুহুর্তে রুদ্রের পরিবারের সামনে দারিয়ে তানহা শুধু শুকনো ঢোক গিলছে।তার নিজেরই যেন বিশ্বাস হচ্ছে না,তার মতো একজন আত্মকেন্দ্রিক মেয়ে শেষ পর্যন্ত এমন একটা কাজ করে ফেললো।
হঠাৎ করে তালুকদার বাড়ির ভেতর থেকে ভারী পায়ের শব্দ ভেসে আসে। তানহার বুকটা ধক করে ওঠে। হাত দুটো আপনাতেই শক্ত করে রুদ্রের হাত আঁকড়ে ধরে সে। রুদ্র টের পায়, কিছু না বলেই শুধু তার হাতটা আরও দৃঢ়ভাবে চেপে ধরে—শান্ত চোখে তানহার দিকে তাকিয়ে আশ্বাস দেয়,
“চিন্তা করবেন না, কিছু হবে না। আমি তো আছি।”
তানহা ইতস্তত বোধ করে হালকা হাসে।
দরজার সামনে এসে দাঁড়ান রায়হান তালুকদার।চোখে মুখে কঠোরতা ছাপ স্পষ্ট।আশেপাশের মানুষ জন রায়হান তালুকদারের আগমনে ভয়ে কেউ আর এক সেকেন্ডেও দাড়ালো না, যে যার যায়গা থেকে প্রস্থান করলো।তিনি গম্ভীর চোখে রুদ্রের দিকে তাকাতেই রুদ্র কপাল ভাজ করে।যেন বাপের কঠোরতা তার কাছে কিছুই না।কয়েক সেকেন্ড কারও মুখে কোনো কথা নেই।একে অপরের দিকে তীক্ষ্ণ চোখে তাকিয়ে আছে।
চারপাশের নিস্তব্ধতা আরও ভারী হয়ে ওঠে।যেন মুহুর্তেই বাপ ছেলের স্নায়ুযুদ্ধ বাধবে।
রায়হান তালুকদার ভারি গলায় বলল,
–কোনো ভদ্র ফ্যামিলির ছেলে এভাবে পালিয়ে বিয়ে করে না?তাও আবার একটা মেয়েকে জোর করে বিয়ে করেছিস।এর শাস্তি কি হতে পারে জানিস?
রুদ্র আনমলকে নিয়ে এক কদম এগিয়ে আসে।কিন্তু বাবার দিক থেকে চোখ নামায় না সে।বরং তার বাবার থেকে-ও তেজি গলায় বলে উঠে,
–যা করেছি বেশ করেছি।নিত্যদিন তোমাদের নাটক দেখতে রাজি নয় আমি।নাটক দেখতে দেখতে ক্লান্ত আমি।মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে ঠকিয়েছিলে তুমি আমায়।এখনও যে ঠকাতে না,তার কি গ্যারান্টি?
–রুদ্র ভুলে যাস না আমি তোর বাপ।আর বাপের সাথে এভাবে গলা উঁচু করে কথা বলছিস কোন সাহসে?
–বাপ না ছাই।আমার তো মনে হয় আমি তোমার পালিত সন্তান,যার জন্য আমাকে ঠকিয়েছো।
–রুদ্র…..![রায়হান তালুকদার হুংকার দিয়ে উঠলো]
রুদ্র রায়হান তালুকদারকে পাত্তা না দিয়ে হেয়ালি করে বলে উঠে,
–জানি আব্বাজান,এখন আপনি কি বলবেন?সিনেমার শশুড়ের মতো গলা ফাটিয়ে বলবেন,__এই মেয়েকে আমি বাড়ির বউ হিসেবে মানি না।এই পরের সন্তান নিয়ে এখনি আমার বাড়ি থেকে বেরিয়ে যা।তোদের জন্য তালুকদার বাড়ির দরজা চিরদিনের জন্য বন্ধ।উফফ!,ঠিক বলছি না আব্বা?
রায়হান তালুকদার তীক্ষ্ণ চোখে তাকিয়ে আছে।যেন চোখ দিয়েই রুদ্রকে ভস্ম করে ফেলবে,
রুদ্র হেসে আবার বলে,
–এসব বলার দরকার নেই।আমি এখনই তানহাকে নিয়ে এই বাড়ি ছেরে চলে যাচ্ছি।এখানে শুধু এসেছিলাম দোয়া নিতে।দোয়া নেওয়া শেষ এখন চলে যাচ্ছি।
–কই যাবি?শশুড় বাড়ি?ঘর জামাই থাকবি?
–অবশ্যই ঘর জামাই থাকব।তানহার এতো বড়ো বাড়ি আমার কি যায়গা হবে না?তাছাড়া আমি শিক্ষিত, মার্জিত ছেলে।খুব সহজেই কোনো কোম্পানিতে কাজ পেয়ে যাব।কোম্পানি গুলো আমাকে নেওয়ার জন্য হা হয়ে আছে।আমার মুল্য তুমি না বুঝলেও পর মানুষ ঠিকই বুঝে।
“বাই দ্যা ওয়ে আব্বা,আপনার ছেলের জন্য মন খুলে দোয়া কইরেন,যেন বউ বাচ্চা নিয়ে সুখে সংসার করতে পারি।
বলেই রুদ্র রায়হান তালুকদারের পা ছোঁয়ালো।
–নির্লজ্জ ছেলে!
তানহার মাথায় যেন কিছু ঢুকছে না।এরা কিসের কি নিয়ে এতো আলোচনা করছে?বাবা ছেলেকে ঠকিয়েছে?রুদ্র ঘর জামাই থাকবে?এই বাড়ির সাথে সব সম্পর্ক শেষ করবে?এসবের মানে কি?তানহার মস্তিষ্ক ফাকা হয়ে গেল।শুধু অবাক হয়ে রুদ্রের নাটক দেখছে।ছেলেটা অসম্ভব পাজি,নাহলে কেউ বাবার সাথে এভাবে কথা বলে?ভয় ডর কিছু নেই তার মাঝে।আর লজ্জা টাও তো নেই।
রুদ্র উঠে দাঁড়িয়ে আর কোনো কথা না বলে তানহার হাত শক্ত করে চেপে ধরলো।তানহা চমকে উঠল।এতো মানুষের মধ্যে রুদ্র কি করতে চাইছে,
–কি করছো রুদ্র?
— চলুন।
বলেই রুদ্র তানহার হাত ধরে টেনে নিয়ে যেতে থাকে।রুদ্রের মা রেহানা বেগম স্বামীর বুকে ধাক্কা দিয়ে কান্না করতে করতে বলে উঠে,
–পাগল হয়ে গেছো তুমি? আমাদের বাড়ির ছেলে বউ নিয়ে ঘরজামাই থাকবে? লোকে কী বলবে! তুমি আটকাচ্ছ না কেন? এমন হলে আমিও বাবার বাড়ি চলে যাব। এখনই ওদের আটকাও।
রায়হান তালুকদার বউকে এক ধমক দিয়ে গা থেকে ছাড়িয়ে নেয়,
–তোমার ছেলেকে আমি বলেছি ঘর জামাই থাকতে?সে নিজ ইচ্ছাতেই যাচ্ছে।উফফ!পাগল করে দিবে এই মা-ছেলে মিলে আমায়।
বলেই রায়হান তালুকদার চিৎকার করে রুদ্রকে দাড়াতে বলে।তারপর গটগট পায়ে রুদ্রের সামনে গিয়ে দাঁড়ায়,ঠাস করে পাঁচ আঙ্গুলের চর বসিয়ে দেয় রুদ্রের গালে।আনমল কেঁপে উঠে রুদ্রকে জরিয়ে ধরে ফুপিয়ে কেঁদে ফেলে।তানহা স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো কিছুক্ষণ।আনমলের কান্না দেখে ছেলেকে নিজের কোলে নেওয়ার জন্য সামনে এগোতেই রায়হান তালুকদার আনমলকে নিজের কোলে তুলে নেয়।তানহা অবাক হলো।তাকে আরও অবাক করে দিয়ে রায়হান তালুকদার বলে উঠে,
–হতচ্ছড়া এখন যা ঘর জামাই থাকতে।আমার নাতি এই বাড়িতেই থাকবে।তার দাদা দাদির কাছে সে মানুষ হবে।তোকে যেন ভুলেও দেখি না আমার বাড়ির চৌকাঠে পা রাখতে।তাহলে ঠ্যাং কেটে হাতে ঝুলিয়ে দেব।চুপচাপ বেরিয়ে যা আমার বাড়ি থেকে।
বলেই রায়হান তালুকদার আনমলের কান্না থামাতে থামাতে সামনে এগিয়ে যায়।রুদ্র গালে হাত দিয়ে অবাক হয়ে দাড়িয়ে আছে।সব যেন তানহার মাথার উপর দিয়ে চলে গেল,তার ছেলেকে নিয়ে চলে যাচ্ছে,সে এখন কি করবে।অসহায় হয়ে সেদিকে তাকিয়ে রইলো। রায়হান তালুকদার তানহাকে উদ্দেশ্য করে বলল,
–আমি চাইনা বাড়ির বউ তার বাবার বাড়িতে গিয়ে থাকুক।তুমি চাইলে এই বাড়িতে থাকতো পারো।কিন্তু অই হতচ্ছাড়া যেন বাড়িতে না ঢুকে।
তানহা খুশি হয়ে সামনে এগোতেই রুদ্র হাত ধরে ফেলে।তানহা থেমে যায়।রুদ্র বিরক্ত হয়ে বলে উঠে,
–কি করছেন আপনি পাগল হয়ে গেছেন নাকি?আনমলকে নিয়ে আসুন।আমরা অই বাড়িতে যাব।
তানহা ঝাড়া দিয়ে রুদ্রের থেকে হাত সরিয়ে নিয়ে চোখ রাঙিয়ে রায়হান তালুকদারের সামনে চলে যায়।তারপর নিজের শশুড় শাশুড়ীর সাথে বাড়ির ভিতর ঢুকে যায়।রুদ্র যেতে চাইলে তানহা গম্ভীর স্বরে বলে উঠে,
–আমি আমার শশুড় বাড়িতে গৃহিনী হয়ে থাকতে চাই।তুমি চাইলে তোমার শশুড় বাড়ি গিয়ে ঘর জামাই থাকতে পারো।আমার কোনো আপত্তি নেই।ঘর জামাই থাকার শখ তোমার মিটে যাবে।ভুলেও আমার শশুড় বাড়ি আসবে না।
________________ফ্ল্যাসব্যাক
রুদ্র জুইকে থাপ্পড় মারার পর থেকে সে আর ভুলেও রুদ্রের আশেপাশে ঘেঁসেনি।সেদিন সে রিফাতের থেকে জানতে পেরেছিলো রুদ্র তানহাকে ভালোবাসে,একদম পাগলের মতো সে ভালোবাসা।জুই যেন তাদের মাঝখানে না যায়,রুদ্র কখনো তাকে বিয়ে করবে না।জুই সেদিন থেকেই রুদ্রের পিছু নেওয়া ছেরে দেয়।এই সুযোগে রিফাত জুইয়ের সাথে ফ্লার্ট করা শুরু করে দেয়।জুইকে এটা সেটা গিফট দিয়ে খুশি করতো।জুইয়ের যেহেতু টিনএজ বয়স,তাই সে অল্পতেই রিফাতের প্রেমে পড়ে যায়।আর রিফাত দেখতেও যতেষ্ট সুন্দর,রুদ্রের থেকে কোনো অংশে কম না।তাদের রিলেশনে যাওয়ার খুব বেশি দিনও হয়নি।শুভকে রিফাত ভয়ে জানায়নি,__কারণ জুই তো শুভর চাচাতো বোন,এসব শুনে যদি রেগে যায়।আর রুদ্রকে জানানোর সময় পায়নি।আনমল কিডনাপ হওয়ার পর থেকে রুদ্রের সাথে তার খুব একটা দেখা হয়নি।রুদ্র তার বাবার বিজনেস নিয়ে ব্যস্ত ছিলো।সেভাবে চাপা পড়ে ছিলো তাদের সম্পর্ক।
হুট করে তারা তিন বন্ধু একদিন এক হয়ে চমলক্ক এক প্ল্যান করলো।মেয়েরা তার প্রিয় মানুষের সাথে অন্য মেয়েকে দেখতে জেলাস হয়।রাগে প্রিয় মানুষকে থাপ্পড় মেরে ভালোবাসা প্রকাশ করে।এই প্ল্যান অনুযায়ী শুভ জুইয়ের কথা তানহাকে শুনিয়ে শুনিয়ে শুনিয়ে বলেছিলো।তারপর তো সবারই জানা,তানহা জুইয়ের চৌদ্দ গুষ্টি খুজে বের করে বিয়ের প্রস্তাব দেয়।এই কথা শোনা মাত্র রিফাত চমকে গিয়ে বড়সর শক খেল।বন্ধুর প্রেম স্যাটেল করাতে গিয়ে তার প্রেমেরই বারাটা বেজে গেল।মনের দুঃখে গাছতলায় বসে ছিলো সে আর শুভ।ততক্ষণে শুভকে সে তার আর জুইয়ের সম্পর্কের কথা বলে দিয়েছে।কিন্তু হুট করে রুদ্র কথা থেকে এসে শুভকে বেকাদায় মারতে থাকে।তাদের প্ল্যানের জন্য আজ সে কতো বড়ো মুসিবতে ফেসেছে, যেদিকে যায় সেদিকেই মাইনকার চিপা।কোথাও শান্তি নেই।
শুভ আর রিফাত মার খেয়ে রুদ্রের সাথে ঝগড়া করে।রুদ্র রাগারাগি করে সেখান থেকে চলে আসে।ঠিক তখন তারা আরও একটা প্ল্যান কষে।জুইয়ের সাথে রুদ্রের সম্পর্ক আছে জেনেও তানহা যখন মনের কথা প্রকাশ করেনি।কিন্তু যখন শুনবে জুই আর রুদ্রের সত্যি বিয়ে হচ্ছে।তখন নিশ্চয়ই চোখের সামনে এই দৃশ্য দেখতে পারবে না।পাগল হয়ে সব বলে দিবে।
শুভ বলে,
–ততদিন জুইকেও রুদ্রের সাথে এক্টিং করতে হবে।বিয়ের দিন সুযোগ বুঝে জুইকে নিয়ে তুই পালিয়ে যাবি।আর নাহলে যখন জামাই আসবে না,তখন চাচাকে বলে তোর সাথেই জুইয়ের বিয়ে হবে।
~বিয়ের দিন রুদ্র মাতাল অবস্থায় শেরওয়ানি গায়ে চাপিয়ে ড্রয়িংরুমে ঢুকে পড়ে।রাগে তার চোখ লাল হয়ে আছে।ইতিমধ্যে সে জানতে পেরেছে সেই রাতে রুদ্রের চলে আসার পর তানহার বলা কথাটা।তানহা এমনি এমনি সেদিন বিয়ে করেনি।কেউ তাকে বাধ্য করেছিলো।আর রুদ্রের ধারণা সেই মানুষটা তার বাবা।
এই মুহুর্তে রুদ্র তার বাবার সামনে দারিয়ে আছে।অগ্নি চোখে রায়হান তালুকদারের চোখের দিকে তাকিয়ে অদ্ভুত শান্ত কন্ঠে বলে উঠে,
–তানহা অন্য কোথাও কেন বিয়ে করেছিলো আব্বা?
রায়হান তালুকদার চমকে যায় ছেলের এই প্রশ্নে।তবু্ও সে তাকে কিছু বুঝতে দেয় না,গম্ভীর স্বরে বলে উঠে,
–আমি কিভাবে জানব?অইতো,তার বাবা অসুস্থ ছিলো,তার কথা রাখার জন্য বিয়ে করেছিলো।
–মিথ্যা বলছো তুমি?
চিৎকার করে কথাটা বলেই রুদ্র হাতের কাছে যা পাচ্ছে, সেটাই ছুড়ে মারছে ফ্লোরে।ঘরের সাজানো পরিবেশ মুহূর্তে এলোমেলো হয়ে যায় ভাংচুরে।
রুদ্র একটা কাচের বোতল ভেঙে হাতের ধমনীর ওপরে চাপ দিয়ে চিৎকার করে উঠে—
–তারাতাড়ি বলো নাহলে কিন্তু আমি সবকিছু শেষ করে দেব।এমনকি নিজেকেও।
রায়হান তালুকদার কেঁপে উঠে।বিচলিত হয়ে রুদ্রকে বাধা দিতে গেলে,রুদ্র রাগে নিজের হাতে কাচের টুকরো ঢুকিয়ে দিতেই যাবে,ঠিক তখনই রায়হান তালুকদার তার হাত চেপে ধরে।ফলে তার বাবার হাতে কাচ ঢুকে যায়।রায়হান তালুকদার ব্যথায় আর্তনাদ করে উঠে।বাবার হাত থেকে তাজা রক্ত ঝড়তে দেখে রুদ্র হুসে ফিরে,তরিঘরি করে বাবার হাত ধরে ফাস্ট এইড বক্স আনার জন্য চিৎকার করে উঠে।
মার্জিয়া দৌড়ে গিয়ে ফাস্টএইড বক্স এনে বাবার হাত ওয়াশ করতে থাকে।রায়হান তালুকদার ব্যথায় মৃদু আওয়াজ বের করে।রুদ্র বাবাকে জরিয়ে কেঁপে উঠে।কাঁপা কাঁপা গলায় বলে উঠে,
–সরি, সরি,আব্বা।আমি বুঝতে পারিনি তুমি এভাবে ব্যথা পাবে।তোমার খুব কষ্ট হচ্ছে তাই না।ড..ডক্টরকে কল কর মার্জু।আব্বা কষ্ট পাচ্ছে।আমার সহ্য হচ্ছে না,কতো রক্ত ঝড়ছে হাত থেকে।ফ..ফোন কোথায় আমার,এম্বুলেন্স কল করতে হবে।কি হলো মা ফোন…….
সামান্য রক্ত ঝড়ায় ছেলের এমন পাগলামি দেখে রায়হান তালুকদার ছেলেকে জরিয়ে ধরে ডুকরে কেঁদে উঠে।রুদ্রের বুকের ভিতর মোচড় দিয়ে উঠে,
–ক-ক কি হলো আব্বা?খুব কষ্ট হচ্ছে তোমার?
রায়হান তালুকদার মাথা নেড়ে বলে উঠে,
–হয় রে বাপ খুব কষ্ট হচ্ছে আমার!
–মার্জু আব্বাকে ধর হাস্পাতালে নিতে হবে।আমি গাড়ি বের করছি।
রায়হান তালুকদার ছেলেকে থামিয়ে বুক দেখিয়ে বলে উঠে,
–বুকে কষ্ট হচ্ছে বাপ।বিশ্বাস কর হাতে একটুও ব্যথা নেই।এই সামান্য ক্ষত তে কি ব্যথা হয় পাগল।কিন্তু তোকে যে এতোদিন ধরে আমি কষ্ট দিয়েছি,তার কাছে এই ব্যথা কিছুই না।
–কি বলছো আব্বা?
–হুম,আমার কারণেই তানহার অন্য কোথাও বিয়ে হয়ে ছিলো।কারণ আমি কিছুদিন ধরে লক্ষ্য করেছিলাম তুই তানহার প্রতি দিন দিন কেমন আসক্ত হয়ে যাচ্ছিস।যা আমি মেনে নিতে পারছিলাম না।আমার ছোট ছেলেটা তার সুন্দর ভবিষ্যৎ ভুলে এভাবে আবেগের পিছনে ছুটছে,তা বাপ হয়ে আমি কিভাবে সহ্য করি?তানহার বিয়ের বয়স হয়ে গেছে,কিন্তু তুই অপ্রাপ্তবয়স্ক।এই সম্পর্ক বেশিদূর এগোলে তোদের দুজনের ভবিষ্যৎ নষ্ট হবে ভেবে আমি তানহার বাবার সাথে কথা বলি,তাকে বুঝিয়ে তানহাকে বিয়ে দিতে বলি।কারণ তোর বিয়ের বয়স হতে হতে তখন যদি তুই আবেগ ভুলে গিয়ে বলিস তানহাকে আমি আর বিয়ে করবো না,তখন মেয়েটার জীবন নষ্ট হতো।মা মরা এক মেয়ের শরীরে কলংক লেগে যেত।তখন সমাজের মানুষ তাকে বাঁচতে দিতো না।তাই আমি তানহাকেও বুঝিয়ে বলেছিলাম বিয়ে করে নিতে,মেয়েটা যতেষ্ট বুদ্ধিমতী, সে শুধুমাত্র তোর ভবিষ্যতে কথা ভেবে অন্য কাউকে বিয়ে করতে রাজি হয়।কিন্তু আমি ভুল ছিলাম,আমার ছেলে তো মেয়েটাকে সত্যিই ভালোবাসে।এমনকি এক বাচ্চার মা হয়ে যাওয়ার পরেও সেই মেয়েটার প্রতিই আসক্ত।আমায় ক্ষমা করে দিস বাপ।বুঝতে পারি নি।বাপ তো,সন্তানের কথা চিন্তা করতে গিয়ে কঠোর হয়ে গেছিলাম।তুই যেদিন বাপ হবি সেসিন বুঝবি,এইসব পরিস্থিতি কতো কঠিন।তোকে কষ্ট দেওয়ার জন্য পারলে এই বুড়ো বাপকে ক্ষমা করে দিস।
বলেই রায়হান তালুকদার কান্না করতে শুরু করে।রুদ্র স্তব্ধ হয়ে বসে রইলো।সেখানে আনমল ছিলো বর্ণার কোলে।সে কোল থেকে নেমে গুটিগুটি পায়ে রায়হান তালুকদারের সামনে এসে দাঁড়ায়।তারপর রায়হান তালুকদারের কোলে উঠে আদুরে হাতে তার চোখের পানি মুছে দেয়।হাতে ব্যান্ডেজ করা ক্ষত যায়গায় ফু দিতে থাকে,
–তুমি কাঁদছো কেন?ব্যথা কলছে এখানে?কেঁদো না আমি ফু দিয়ে দিচ্ছি।আমাল কেটে গেলে আম্মু এভাবে ফু দিয়ে দেয়।ভালো হয়ে যাবে,তুমি কেদো না,দাভাই।
রায়হান তালুকদার কান্না থামিয়ে স্তব্ধ হয়ে আনমলের দিকে তাকিয়ে থাকে।তারপর দু’হাতে আঁকড়ে নিজের কোলের মধ্যে বসিয়ে নেয়।
রুদ্রও নিজের বাপকে জরিয়ে ধরে বলে উঠল,
–প্লিজ বাবা ক্ষমা করো আমায়।আমি বুঝতে পারিনি তুমি আমায় এতোটা ভালোবাসো।না বুঝেই তোমায় কষ্ট দিয়ে ফেললাম।তোমার যায়গায় যেকোনো বাপ থাকলে এমন কাজই করতো।তুমি তোমার যায়গা থেকে একদম ঠিক আছো।প্লিজ শান্ত হও,
রায়হান তালুকদার থেমে যায়।তারপর কিছুক্ষণ নিশ্চুপ থেকে রুদ্রের হাত ধরে বলে উঠে,
–জুইকে তোর বিয়ে করতে হবে না।তুই পালিয়ে যা।কয়দিন পর বাড়িতে ফিরে আসবি।আমি জুইয়ের বাবাকে বলবো তুই কোথাও রাগ করে চলে গেছিস।এইদিকটা আমি সামলে নেব।তুই শুধু দুইদিন পর বাসায় ফিরবি।ভুলেও তানহাকে উত্ত্যক্ত করবি না।আমি ধুমধাম করে তোদের বিয়ে দেব।কথাটা যেন মাথায় রাখিস……….
#চলবে………
#প্রেমাতাল
#পর্ব–১৯[🚫রোমান্টিক এলার্ট]
#Fatema_Aktar_mim
রাত গভীর।
তালুকদার বাড়িটা ঘুমিয়ে আছে—শুধু মৃদু আলোয় বারান্দার লাইটটা জ্বলছে। নিস্তব্ধতার মাঝে অন্ধকারে ছেঁয়ে গেছে চারপাশে, আর দূরে কুকুরের ডাকে রাতটা আরও গা ছমছমে।
গেটের বাইরে দাঁড়িয়ে আছে রুদ্র।চোখ মুখে তার বিরক্তকতার ছাপ স্পষ্ট।এই নিয়ে তিনবার সে বাড়িতে ঢোকার চেস্টা করছে।প্রতিবারই তাকে কেউ না কেউ বের করে দিচ্ছে।তানহা পর্যন্ত রাগে মুখের উপর দরজা বন্ধ করে দিয়েছে।সেই রাগে রুদ্র এতক্ষণ তানহার বাড়িতে গিয়ে শুয়ে ছিলো।কিন্তু সদ্য বিবাহিত বউ রেখে কি কোনো পুরুষের ঘুম আসবে?এতদিন পর সে তার প্রিয় মানুষকে নিজের করে পেয়েছে।একটু বসে থেকে দুইজন মিলে সারা রাত সুখ দুঃখের গল্প করবে,তা না রাগ অভিমান করে আছে সব।
রুদ্র আশেপাশে তাকাচ্ছে আর দুই হাত উঁচু করে মেলে পায়চারি করছে।হুশ হুশ করে কুকুর তারাচ্ছে,শিশ বাজাচ্ছে,তো একটু পর পর গলা ফেটে গান গাইছে।
–সখি তোরা প্রেম করিও না,
পিরিত ভালা না,
সখি তোরা প্রেম করিও না…
গান গাইতে গাইতে গেইটের ভিতর উঁকি দিচ্ছে কেউ আছে নাকি?চারপাশে তাকিয়ে নিশ্চিত হয়, কেউ নেই,সবাই ঘুমিয়ে।তারপর দারোয়ানকে গেট খুলে দিতে বলে।শালা দারোয়ান পর্যন্ত তার বাপের কথা শোনে।রুদ্র অনেক কষ্ট করে ম্যানেজ করে তারপর ধীরে ধীরে গেট ঠেলে ভেতরে ঢোকে।
জুতা খুলে হাতে নিয়ে সে পা টিপে টিপে বারান্দা পার হতেই। হঠাৎ—
–চোর ধরো!
রুদ্র আঁতকে উঠে ঘুরে দাঁড়ায়। দেখে, বারান্দার কোণে দাঁড়িয়ে আছে মার্জিয়া। চোখে মুখে দুষ্টু হাসি, হাতে একটা কফির কাপ।সে রুদ্রের দিকে তাকিয়ে মুখ চেপে হেসে বলল,
–চোরের মতো পা টিপে টিপে ঘরে ঢুকছিস কেন ভাই?শেষ পর্যন্ত আমার ভাই তুই নিজেই নিজের বাড়িতে চুরি করতে আসছিস!
রুদ্র মার্জিয়ার কাছে ছুটে গেল।মার্জিয়ার মুখে হাত চেপে ধরে বিরক্ত গলায় বলে,
–চুপ কর বইন। কি করছিস তুই?আমাকে কি রাতের বেলায় কট খাইয়ে নিতে চাস?আব্বা জেগে গেলে কি হবে জানিস?
মার্জিয়া নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে চোখ টিপে বলল,
–আব্বা তো অনেক আগে থেকেই জেগে আছে।বাইরে যখন দারোয়ান কাকার সাথে ঝগড়া করছিলি,তখন আব্বা পানি খেতে উঠছিল।তোর গলা শুনে ড্রয়িং রুমে বসে আছে।এবং খুব রেগে আছে।বারবার চান্দু মাথায় হাত বুলিয়ে বিরবির করছে।অখানে যাস না এখন।
রুদ্র থমকে যায়।
–কী?
–হ্যা ভাই!
রুদ্র ঠাস করে ফ্লোরে বসে পরে।মাথায় হাত দিয়ে দুঃখী মনে বলে উঠে,
–ফাটা কপাল আমার।যার জন্য বাবার সাথে পাকনামি করে ঝগড়া করলাম,সেও আমায় বাড়ি থেকে বের করে দিলো।
মার্জিয়া মুখ টিপে টিপে হাসে।তারপর কফির মগে চুমুক দিয়ে বলে উঠে,
–পাঁচ মিনিট দাঁরা এখানে।আমি আব্বাকে ম্যানেজ করে ঘুম পাড়িয়ে দিয়ে আসছি।
মার্জিয়া চলে যেতে নিলে রুদ্র ডেকে বলে উঠে,
–আনমল কোথায়?তখন তো কান্না করছিলো।এখন কি কান্না থেমেছে?
মার্জিয়া থেমে যায় মুচকি হেসে বলে উঠে,
–আনমল তো আব্বুর সাথে এতক্ষণ খেললো।তারপর খাবার খেয়ে অর মায়ের সাথে ঘুমিয়ে পড়েছে তোর রুমে।
–অহ আচ্ছা।যা এখন।
কিছুক্ষণ পর মার্জিয়া এসে রুদ্রকে বাড়ির ভিতর নিয়ে যায়।তারপর সে নিজের রুমে চলে যায়।
_______________
রুদ্র ধীরে ধীরে নিজের রুমের দরজার সামনে এসে দাঁড়ায়। হাত বাড়িয়ে দরজাটা খুলতেই ভেতর থেকে নরম হালকা আলো বেরিয়ে আসে। ঘরটা পরিচিত, কিন্তু আজ যেন একেবারেই অন্যরকম লাগছে।
বিছানার এক পাশে তানহা ঘুমিয়ে আছে। মুখটা বালিশে আধা ঢাকা, কপালের চুল এলোমেলো হয়ে পরে আছে। তার বুকের উপর ছোট্ট আনমলটা জড়িয়ে ঘুমাচ্ছে। শিশুটার নিঃশ্বাসের ছন্দে পুরো ঘরটা শান্ত হয়ে আছে।
রুদ্র দাঁড়িয়ে থেকে কিছুক্ষণ মুগ্ধ নয়নে মা-ছেলের দিকে তাকিয়ে থাকে।ঘুমের রাজ্যে ডুবিয়ে থাকা দুজন ঘুমন্ত পাখিকে দেখে তার কলিজা যেন শীতল হয়ে যাচ্ছে।ঠোঁটের কোণে স্মিথ হাসি ফুটে উঠলো।তার যেন বিশ্বাস হচ্ছে না,”এই সন্তান আজ থেকে সম্পুর্ন তার,এই সন্তানের মা টাও তার,যাদের সে অসম্ভব ভালোবাসে।তাদের সুন্দর একটা সংসার হবে।আনমল তাকে সারাদিন আব্বা বলে ডাকবে।ছেলেটা তার বাপের পাগল হবে হুম।ছেলের ছোট ছোট হাত ধরে সে বিদ্যালয়ে নিয়ে যাবে।আর ছেলেকে সে তার মতোই দুষ্টু বানাবে,যাতে তারা দুইজন মিলে তানহাকে জ্বালাতে পারে।
কথাগুলো ভেবেই রুদ্র প্রশান্তির এক হাসি দিল।তারপর সে খুব আস্তে করে দরজা ঠেলে বন্ধ করে দেয়।জুতা জোরা সাইডে খুলে রেখে বিছানার কাছে এসে বসে পড়ে। আনমলের গালে হালকা করে আঙুল ছোঁয়ায়। শিশুটার ভ্রু কুঁচকে ওঠে, কিন্তু ঘুম ভাঙে না।
রুদ্র আনমলের কপালে চুমু খেয়ে চাপা স্বরে বিড়বিড় করে বলে,
–আমার ছেলেটা কি ঘুমোচ্ছে?শুনছো পাপাকে?আচ্ছা ঘুমাও পাপা।
রুদ্র আবার আনমলের তুলতুলে নরম গালে হাত ছুয়ে বলে উঠে,
–ছেলেটা একদম বাবার মতোই ঘুমকাতুরে।
তানহা নড়ে ওঠে।ঘুম ঘুম চোখ মেলে তাকিয়ে রুদ্রকে দেখে চমকে উঠল।ভ্রম ভেবে হালকা চোখ মুছে আবার তাকায়।স্পষ্ট সে রুদ্রের হাসিখুশি মুখ দেখতে পারছে।যে এখন ঘুমন্ত আনমলের আঙুল ধরে খেলছে।তানহা হালকা হাসলো।রুদ্রকে বুঝতে না দিয়ে বিরক্ত গলায় বলল,
–তুমি…? এত রাতে এখানে কীভাবে এলে?
রুদ্র আনমলের হাত ছেরে দেয়।তানহার দিকে তাকিয়ে ঠোঁটে দুষ্টু হাসি টেনে ফিসফিস করে বলে,
–নিজের ঘরে ঢুকতেও এখন লুকিয়ে আসতে হয়, জানেন?
তানহা ভ্রু কুঁচকে উঠে বসল,
–চুপ করো। আনমল জেগে যাবে।তা তুমি লুকিয়ে আসতে গেলে কেন?ঘর জামাই থাকবা বলে?তে থাকো ঘর জামাই,কে মানা করছে!?
–বউ ছাড়া ঘর জামাই থাকা পাপ।
–পাপ মানে?
রুদ্র আনমলের পাশে চিৎ হয়ে শুয়ে রাস ভারি গলায় বলল,
–ধুর বউ ছাড়া তাই ঘর জামাই থাকা যায়?কাকে নিয়ে থাকবো শুনি?কার কাপড় কাইচা দিমু।কার সাথে প্রেম আলাপ করমু।এক আছে দাদি শাশুড়ী তাও এইটুকু সময়ে চারবার জরদা দিয়ে পান খাওয়াইছে আমারে।চুনে পুরে মুখ জিভ পুরে গেছে আমার।আরও একটা পান বানাইতেছে আমারে দেওয়ার জন্য,শেষ পর্যন্ত দাদুর সাহায্যে পালিয়েছি।
–ভালো! তা এখানে কেন এসেছো?
–অক্সিজেন নেওয়ার জন্য!
তানহা চিৎকার করে উঠে,
–মানে?
রুদ্র একটু উঠে বসে আরচোখে তানহার দিকে তাকায়।মুহুর্তে দুজনের চোখাচোখি হয়।তানহার কেমন অস্বস্তি অনুভব হতে লাগল।রুদ্রের উপস্তিতিতে এতক্ষণ সে স্বাভাবিক থাকলেও এখন অজানা ভয়ে তার শরীর শিউরে ওঠে।হাসফাস করতে করতে চোখ সরিয়ে নেয়।রুদ্র বাঁকা হেসে তানহার দিকে এগিয়ে আসে।এতটা কাছে চলে আসায় তানহার বুকের ভিতর ধক করে উঠে।বুকের ধুকপুকানিতে যেন পুরো ঘর ফেটে যাবে এখন।তানহা ইতস্তত বোধ করে সামান্য পিছিয়ে যায়।রুদ্র আরও এগিয়ে যায়, তানহার দুপাশে হাত রাখতেই তানহা ভয়ে চোখ বন্ধ করে নেয়।রুদ্র দুষ্টু হাসি দিয়ে বলে উঠে,
–দয়া করে ওড়নাটা গায়ে দিবেন ম্যাম।আমার কেমন কেমন যেন লাগছে।ভেতর থেকে প্রেম প্রেম ফিলিংস চলে আসছে।কেমন যেন কন্ট্রোলেস হয়ে যাচ্ছি।
তানহার কান দিয়ে যেন গরম ধোয়া বের হচ্ছে।সে ধাক করে চোখ খুলে তাকায়।নিজের দিকে তাকিয়ে অস্বস্তিতে রুদ্রকে ধাক্কা দিয়ে দুরে সরিয়ে দেয়,কিন্তু রুদ্র সামান্য এক ইঞ্চিও নড়ে না।তানহা বিছানার পাশে হাতিয়ে ওড়নাটা খুজে বের করে কোনো মতে গায়ে জরিয়ে নেয়।রুদ্র ঠায় যায়গায় বসে বত্রিশটা দাঁত বের করে হেসে উঠে।তানহা বিরক্ত হয়ে আনমলের ছোট একটা বালিশ দিয়ে রুদ্রকে মারতেই যাবে,ঠিক তখনই রুদ্র তানহার হাত ধরে ফেলে।তারপর হেচকা টান মেরে নিজের কাছে আনে।তানহা রুদ্রের প্রশস্ত বুকে হুমরি খেয়ে পড়ে।
রুদ্রের স্পন্দনের শব্দ স্পষ্ট ভাবে তার কানে এসে বাজছে।তানহা আচমকা সামলে নিয়ে রুদ্রের বুক ঠেলে নিজেকে আলাদা করে নেয়।রুদ্র আবারও তাকে কাছে টেনে নিয়ে দু’হাতে কোমড় জরিয়ে নেয়।তানহা চমকে উঠল।ড্যাবডেবে চোখে রুদ্রের দিকে তাকালো।রুদ্র অদ্ভুত ঘোর লাগা দৃষ্টিতে তার দিকে চেয়ে আছে।তানহা শুকনো ঢুক গিলে ফিসফিস করে কড়া স্বরে বলে,
–রুদ্র! কী করছো?ছাড়ো আমায়।
রুদ্র মাতাল করা স্বরে বলল,
–ছাড়ার জন্য তো ধরি নি?
–ছাড়ো আনমল আছে এখানে।
–ছাড়তে পারি এক শর্তে!
তানহা অবাক হয়ে বলল,
–কি শর্ত?
রুদ্র ঠোঁট কামড়ে হেসে বলল,
–তখনকার মতো আবার আমার গালে চুমু খেতে হবে।তাহলে ছেড়ে দেব।
–কিহ?অসম্ভব।
–তাহলে আমি ঠোঁটে চুমু খেলাম।সহজে কিন্তু ছেরে দেব না কথাটা মাথায় রাইখেন।
বলেই রুদ্র তানহার দিকে ঝুকে আসে।
তানহা কেঁপে উঠল।তার গাল অসম্ভব লাল টুকটুকে হয়ে আছে।সে রুদ্রকে হালকা ধাক্কা দিয়ে অসহায় চোখে তাকিয়ে বলল,
–ঠিক আছে।
রুদ্র খুশি মনে গাল এগিয়ে দেয়।তানহা কিছুক্ষণ হাসফাস করে। তারপর চোখ বন্ধ করে রুদ্রের গালের দিকে এগিয়ে আসে।ছোট করে একটা চুমু একে দেয় রুদ্রের ডান গালে।
–এবার ছাড়ো?
রুদ্র তানহাকে আরো শক্ত করে নিজের সাথে চেপে ধরে।তানহা ঘাবড়ে গিয়ে নিজেকে ছারানোর চেস্টা করে,কিন্তু কোনো লাভ হয়না।রুদ্রের মনে আজ অজানা অনুভূতি ঝেকে বসেছে।সে ঘোর লাগা দৃষ্টিতে তানহার ওষ্ঠের দিকে এগিয়ে যেতে থাকে।দুটো ওষ্ঠ মিলিত হতেই যাবে,ঠিক তখনই লজ্জা পেয়ে তানহা মুখ ঘুরিয়ে নিতেই চমকে উঠে।তরিৎ গতিতে রুদ্রকে ধাক্কা মেরে নিজের থেকে ছাড়িয়ে নেয়।
রুদ্র ছিটকে দুরে সরে যায়।মেজাজ হারিয়ে পাশে তাকাতেই চমকে উঠে,
আনমল ঘুম থেকে উঠে দুই গালে হাত দিয়ে বসে আছে। আরচোখে তাদের দিকে তাকিয়ে আছে।মুখে কিছু বলছে না।কপালে তার অসংখ্য ভাজ পড়েছে।যেন সে গভীর কিছু নিয়ে গবেষণা করতে ব্যস্ত।
–তুমি এখানে কি কলছিলে লুদ্র আংকেল?
রুদ্র থতমত খেয়ে কপাল চুলকায়।তারপর আনমলকে কোলে নিয়ে বলে উঠে,
–এমনি,তোমার আম্মুর মাথায় উকুন হয়েছে।তাই তুলতে আসছিলাম বাবা।
–অহ।তুমি এখানে থাকবে আংকেল?
— হুম পাপা,আজ থেকে আমি তোমাদের সাথেই থাকব।
তানহা চোখ গরম করে তাকায়।আনমল সেদিকে তাকিয়ে রুদ্রের কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলে উঠে,
–পাপা ডেকো না আংকেল আম্মু লেগে যাচ্ছে তো।লুকিয়ে লুকিয়ে ডেকো।
রুদ্র মুচকি হাসে।আনমলের গালে চুমু খেয়ে বলে উঠে,
–আর লুকোচুরি করে ডাকতে হবে না পাপা।আজ থেকে তুমি তোমার আম্মুর সামনেই আমায় ডাকতে পারো।কিছু বলবে না।
আনমল অসহায় চোখে তার মায়ের দিকে তাকায়।তানহা ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে না চাইতেও হালকা হেসে উঠে,
— হুম।
আনমলের মুখ খুশিতে চকচক করে উঠে।সে উঠে দাঁড়ায়, বিছানার উপর লাফাতে থাকে।চিৎকার করে বলে উঠে,
–ইয়ে, আমাল পাপা চলে এসেছে।আমাল পাপা।
তানহা না চাইতেও ছেলেকে এতটা আনন্দ হতে দেখে খুশিতে কেঁদে উঠে।চোখ বেয়ে দুফোঁটা জল গড়িয়ে পরলো।রুদ্র সে জল নিজ হাতে মুছে দিতেই তানহা আবার কেঁদে উঠে।রুদ্র এক ধমক দিলে তানহা কান্না থামিয়ে রুদ্রের বাহুতে মাথা রাখে।তারপর আনমল সেখানে এসে তাদের কোলে বসে পরে।পুরো ঘর যেন তাদের পুর্নতায় ছেয়ে গেল………
#চলবে……..
