“ঘাসফুলের ধ্রুবতারা”
পর্ব -০২
শাহজাদী মহাপারা (জোহুরা )
বাড়িতে পৌঁছানোর আগেই আকাশ কালো হয়ে এলো। সাহিল সিএনজি তে বসেই বললো, “দেখেছিস আকাশ কেমন অন্ধকার হয়ে এসেছে? ঝাঁপিয়ে বৃষ্টি নামবে। ভালো হয়েছে আগেই চলে আসতে পেরেছি।” মোহনা উত্তর করলো না যেনো সে এই জগতে নেই।
সিএনজি এসে থামলো সাহিলদের বাড়ির গেইটে। এতক্ষন মোহনা অন্য জগতে থেকে খেয়াল করেনি কোথায় এসেছে। পথ ঘাট কিচ্ছুটি দেখেনি। সাহিল ওর অবাক ভঙ্গী দেখে হাসলো।
” এতো বেখেয়ালি তুই? তোকে আমার জায়গায় অন্য কেউ ধরে নিয়ে গেলেও কিছু বলতে পারতি না। ”
” আমরা এখানে কেনো এসেছি? ”
” তুই যেহেতু বিয়ের দাওয়াতে এসেছিস তার মানেতো বিয়ে বাড়িতেই থাকবি তাই না? আমিতো আর ও বাড়িতে থেকে বৌ আনতে যেতে পারবো না। আমিতো এ বাড়ির ছেলে।”
এরই মাঝে বৃষ্টি ঝাঁপিয়ে নামলো। ভিজে যাচ্ছে সে।
কিন্তু মোহনার ইচ্ছে করছেনা এ বাড়িতে ঢুকতে। শেষবার এ বাড়ি এসেছিলো ক্লাস এইটে থাকতে। এরপর পণ করেছিলো আর কখনো এখানে আসবে না। কিন্তু পণ ধরে রাখতে পারলো না। আসতেই হলো। ঠিকিই তো আমরা সব সময় যা ভাবি টা কি হয়? হয় না। নিয়তির সব কিছু ভিন্ন ভাবে প্ল্যান করা থাকে।
ফুফু ড্রয়িং রুমেই বসে ছিলেন মোহনাকে ঢুকতে দেখেই দৌড়ে গেলেন। জড়িয়ে ধরে আদর করলেন।
” আমার সোনা মেয়ে। আমার আরেকটা কলিজা। কতো দিন পর দেখছি। আমার মা টা কেমন আছে? ”
” আহ! ফুপি ছাড়ো তো। কয়টা কলিজা লাগে তোমার? ”
নাজিফা হাসলেন। তার এই প্রাণ চঞ্চল ভাতিজি হঠাৎ করেই একদিন বদলে গিয়েছিলো। তিনি কি জানেন না? এদের মায়েদের থেকেও তিনি কাছের ছিলেন এদের। সবার নারী নক্ষত্র জানেন। সাহিলের দিকে চেয়ে দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন তিনি। কি এক অপূর্ব দৃশ্য কিন্তু বাস্তবতা বড্ড কঠিন। নিজেকে দ্রুত সামলে নিলেন তিনি।
সাহিল মোহনার ব্যাগ রেখে মামীকে জড়িয়ে ধরলো। যেনো তার বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বন। মিথ্যে নেই এতে, মামী আসলেই তার বেঁচে থাকার অবলম্বন।
মোহনা ব্যাগ নিয়ে রুহির ঘরে চলে গেলো।
” আমার প্রচুর ক্ষুধা পেয়েছে মামী। কিছু খাবার থাকলে দাও আমি ফ্রেশ হয়ে আসি। ”
” তোরা খাস নি কিছু? এখনো না খাওয়া। দেখো কান্ড। ”
” তোমার ভাইজিতো ট্রেনে কিছু খাবে না মামী। তাই আমারও খাওয়া হয়নি। একলা ফেলে কি করে খাই বলো? অতিথিয়তার একটা ব্যাপার আছেনা?”
রুহির ঘর থেকে সব শুনতে পেলো মোহনা।
” অতিথিয়তার একটা ব্যাপার আছেনা?” বলে সাহিলকে ভেঙেলো।
মা কে ফোন করে এর মাঝে একদফা ঝেড়ে নিয়েছে সে। এ বাড়িতে কেনো উঠতে হবে!
মারিয়া জানালেন তারা মোহনার ছোটো ভাই সমেত পরশু চলে আসবেন। বিয়েতে তো আর বেশিদিন নেই ।
মোহনা কল রেখে ভেজা কাপড় পাল্টাতে রুহির ওয়াশরুমে যেতে নিতেই রুহি বাধা পেলো।
“আপু আমার ওয়াশরুমের পানির লাইনটা একটু সমস্যা করছে। তুমি রাফির ওয়াশরুমটা ইউজ করতে পারো। কোনার ঘরটা ওর। তুমিতো এ বাড়ি রিডিজাইন করার পর আর এলেই না। যাও ওটাতে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে নাও। রাফি বাসায় নেই আজ বন্ধুর বাসায় গিয়েছে ফিরবে না। তুমি আরামসে ব্যবহার করতে পারবে। আমিও করি। সমস্যা হবেনা।”
একসাথে এতো কথা বলে হাপিয়ে গেলো রুহি। মোহনা মুচকি হাসলো। আগে সেও ঠিক এভাবে কথা বলতো। এখন বোমা মারলেও প্রয়োজন ছাড়া ওর মুখ দিয়ে কথা বের হয়না।
রুহি মোবাইলের স্ক্রিনে ধ্যান দিলো। মোহনা তার কাপড় নিয়ে রুম থেকে বের হয়ে আবার ঢুকলো।
রুহিকে জিজ্ঞেস করলো কোন কোনার ঘর? রুহি ফোনের দিকে তাকিয়েই বাঁ দিকের ঘর দেখিয়ে দিলো। মোহনা সেদিকেই গেলো।
এ ঘরটা বাকি ঘর থেকে খানিকটা দূরে। মোহনা ঘরে ঢুকে দরজা ভিজিয়ে কাপড় নিয়ে ওয়াশরুমে ঢুকলো। বৃষ্টিতে ভিজে এখন শরীরে ঠান্ডা পানির স্পর্শে শীত শীত অনুভূত হচ্ছে। মোহনা বেশ খানিকটা সময় নিয়ে গোসল করলো। তাওয়াল টা আনতে ভুলে গিয়েছে কিন্তু রুম তো রাফির রুহিকে ডাকাও যাবেনা। উপায়ন্তর না পেয়ে ওরনা দিয়েই চুল বাঁধলো সে।
ভেজা কাপড়ে ওয়াশরুম থেকে বের হতেই চমকে গেলো সে। তবে অপর ব্যক্তি যে চমকায় নি তা তার মুখ দেখেই বোঝা গেলো।
মোহনার হাত কাঁপছে। সাহিল খালি গায়ে বসে আছে বিছানায়। নিশ্চই গোসলে যাবে। ইশ এটা ওনার ঘর! রুহির বাচ্চা! মোহনা দরজার দিকে তাকালো ভেতর থেকে বন্ধ। ইশ! সে কেনো দরজা লাগায় নি আগে। এখন লজ্জায় শেষ হয়ে যাচ্ছে। হঠাৎ মনে হলো দুটো চোখ তাকে গভীর ভাবে পর্যবেক্ষন করছে। চোখ দুটোর গভীরতা তার সর্বাঙ্গে সেধিয়ে যাচ্ছে। বুকে ওরনা নেই। ঢিলে সালওয়ার কামিজে নিজেকে অদ্ভুত প্রাণী মনে হচ্ছে। সাহিলের অন্তরর্ভেদি দৃষ্টি আরো কুঁকড়ে দিলো মোহনাকে।
সাহিল মোহনার দিকে নিঃস্বপলক চেয়ে রইলো বেশ খানিকক্ষন। মোহনা! সেই ছোট্ট চঞ্চল মোহনা। আগেতো খেয়াল করেনি। ট্রেনেও খেয়াল করেনি। সেই ছোট ছোট দুবেনি করা ফ্রক পরা মোহনা আর আজকের ২২ বছরের যুবতী মোহনার মধ্যে কি বিশাল ফারাক। চুল লম্বা করেছে। চেহারায় মায়া যেন উপচে পড়ছে। সাহিল মোহনার দিকে এগিয়ে গেলো। কই আগেতো এইভাবে দেখেনি। সেই শুকনো টিংটিঙে মোহনা হঠাৎই যেন ভোল পালটে ফেলেছে। দেহের অনাচে কানাচেহ হালকা মেদ যেন মোহনার রূপ আরোও বাড়িয়ে দিয়েছে। মোহবিষ্টের মতো এগিয়ে গেলো সাহিল। এ দুনিয়াতেই যেন সে নেই। মোহনা ভয়ে সিটিয়ে গেলো। হলো কি ওনার?
সাহিল এক হাত মোহনার ফুলে থাকা গেলে ছোঁয়াতেই মোহনার সমস্ত স্বত্তা যেন শিউরে উঠলো। মোহনা এক ঝটকায় সাহিলের হাত সরিয়ে দরজার পাট খুলে দৌড়ে বের হলো। কাপড়
গুলো রুহির দিকে বাড়িয়ে দিয়েই সে নিজেকে বিছানায় আপাদমস্তক কাথার নিচে ঢেকে ফেললো। কি হচ্ছিলো তখন! মোহনা আর কিছু ভাবতে পারছেনা। ক্লান্তিতে তার দুচোখের পাতা ভারী হয়ে এলো।
এদিকে সাহিলের ধ্যান ভাঙলো মোহনার ছিটকে যাওয়ায়। কি করতে যাচ্ছিলো সে! এক অসম্ভব কল্পনা আবার মাথা চারা দিয়ে উঠতে চাইছে। যাকে বহু বছর আগে দাফন করে দিয়েছিলো সে।
পুরো ঘরময় যেন মোহনার সুবাস ভেসে বেড়াচ্ছে। ওয়াশরুমেও তাই। মন খারাপি ভাব ছড়িয়ে পরলো সাহিলের মধ্যে। গোসল সেরে সেও না খেয়ে শুয়ে পরলো। নাজিফা এসে ডাকলেন খাওয়ার জন্য কেউই সারা দিলোনা না।
ভোরের আলো একটু একটু করে ফুটছে। গতকাল সন্ধ্যায় বৃষ্টির শীতলতা এখনো বাতাসে ছেয়ে আছে। মাটির ভেজা ঘ্রাণ নাকে এসে লাগতেই অদ্ভুত মাদকতা ভর করে। সাহিল আরমোরা ভেঙে ধীরে ধীরে ছাদে উঠলো। সূর্য ধীরে ধীরে বিশাল আঁকার ধারণ করছে। সাহিলের হঠাৎই খুব আনন্দ হলো। গম্ভীর সাহিলের মুখে একটু একটু করে হাসি চওড়া হলো। পিছন ফিরতেই দেখলো মোহনা ওর দিকে অবাক এবং ক্রুর দু দৃষ্টি মেলেই তাকিয়ে আছে । গতকাল রাতে ভালো ঘুম হয়নি মোহনার। ক্ষীধে পেয়েছিলো খুব কিন্তু কাউকে ডাকতে ইচ্ছে হয়নি অতপর পেতে বালিশ চেপে কোনো মতে রাতটা কাটিয়েছে। সকালে এক কাপ চা সে নিজেই করে বিস্কিট ভিজিয়ে খেতে খেতে ছাদে এসেছে। এসেই এই মসিবতের সামনে। উফ যন্ত্রনা। মোহনা একবার ভাবলো নিচে চলে যাবে। পর মুহূর্তেই ভাবলো সে কেনো যাবে? সে যাবেনা। সে ছাদে উঠে প্রথমে প্রাণ ভোরে শ্বাস নিলো। এরপর চায়ের কাপে চুমুক দিয়েই ছাদের ছোট টব গুলো দেখতে লাগলো।
সাহিল এতক্ষন মোহনাকে পর্যবেক্ষণ করছিলো। আবার! আবারও! এই মেয়ে তাকে চরম ভোগাবে।মোহনা! মোহনা! মোহনা! শান্তিতে থাকতে দিবেনা। ভুলে হয়েছে, খুব বড় ভুল। মোহনাকে চোখের সামনে আনা একদম উচিৎ হয়নি। এখন! এখন কিভাবে থাকবে সে? নিজেকে আবার গুম করে ফেলবে? বিয়ের আছে আর পাঁচ দিন। উফফ! হঠাৎ তার মাথায় অসম্ভব যন্ত্রনা হতে লাগলো। না, এবার আর সে একা ভুগবে না। চরম শাস্তি দিবে এই মেয়েকে সে।
রাগে হঠাৎ সাহিলের চোখ দুটো লাল হয়ে গেলো।
সে মোহনার দিকে এগিয়ে তার হাতে থাকা চায়ের মগটা এক চুমুকে খালি করে মোহনার হাতে ধরিয়ে নিচে চলে গেলো। পেছনে ফেলে গেলো হতভম্ব মোহনাকে।
চলবে…!
