গল্পঃ #গোপন_বাক্স
লেখিকাঃ #মিশু
পর্বঃ (৩)
আমি আতঙ্কে পিছিয়ে গিয়ে ভয়ে চোখ বন্ধ করলাম। মনেমনে ভাবলাম আজকেই হয়তো আমার শেষদিন কিন্তুু ঠিক সেই মুহূর্তেই পেছন থেকে হাবিব ছুটে এসে মায়ের হাত চেপে ধরলো।
— “মা, না!” হাবিবের কণ্ঠ গর্জে উঠলো।
আমি হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে আছি। হাবিব কষ্টে মায়ের হাত থেকে ছুরিটা সরাতে সরাতে চিৎকার করে বললো—
“ভাবী, তাড়াতাড়ি ওষুধটা দাও! ডাক্তার বলেছিলেন এমন হলে ইনজেকশন দিতে!”
ভাবী তাড়াতাড়ি ইনজেকশন বের করে মাকে দিয়ে দিলো। মুহূর্তেই মা ধীরে ধীরে নিস্তেজ হয়ে গেলেন, তারপর অচেতন হয়ে পড়ে গেলেন মেঝেতে।
আমার চোখে পানি চলে এলো। কী হচ্ছে এসব? আমি তো কিছু বুঝতে পারছি না।
হাবিব তখন ঘামতে ঘামতে বসে মায়ের মাথাটা কোলে তুলে নিল। তারপর আমার দিকে তাকিয়ে বললো—
“তুমি এখানে কী করছিলে, ইতু?”
আমি কাঁপতে কাঁপতে সবটা বলে দিলাম।
হাবিব নিঃশ্বাস ছেড়ে মাথা নাড়লো।তারপর বললো,
“ইতু… ডাক্তার বলেছিলেন, মায়ের সিজোফ্রেনিয়া আছে। এটা এক ধরনের মানসিক রোগ, যেখানে মানুষ বাস্তব আর কল্পনার পার্থক্য করতে পারে না। মা যা বলেছে—সবই কল্পনা। এগুলো আসলে তাঁর অসুখের লক্ষণ। আসলে বাবার হঠাৎ এক্সিডেন্ট মা মানতে পারেনি তিনি সেই শোকটা কাটিয়ে উঠতে পারেনি। মনেমনে কল্পনা করেছে বাবা তাকে ঠকিয়েছে। আবার হঠাৎ খালামনির মৃত্যু ও মা মেনে নিতে পারে নি। দুইজন আপন মানুষকে হারিয়ে এইসব কল্পনা করে নিজেকে শান্তনা দেয়। মুলত এইটাই এই রোগ। তুমি যা দেখেছো, বাক্সে যা পেয়েছো—সবই তাঁর ভ্রম।”
আমি অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলাম। কণ্ঠ শুকিয়ে গেল।
“মানে… কিছুই সত্যি নয়?”
হাবিব চোখ মুছে ধীরে বললো—
“না, ইতু। এগুলো মায়ের অসুখের ছায়া মাত্র। তাই ডাক্তার আমাদের এই ওষুধ রাখতে বলেছিলেন, প্রয়োজনে যেন ব্যবহার করি। মা আসলে খারাপ নন… তিনি অসুস্থ।”
আমার বুক হুহু করে উঠলো।
আমি নিঃশব্দে মায়ের হাতটা ধরে ফিসফিস করে মনেমনে বললাম,
“মা, আপনি দোষী নন। আপনি শুধু অসুস্থ।আর আপনাকে আমি ঠিক সুস্থ করে তুলবো”
হাবিব আবারো বললো, “ইতু, তুমি জানো… একসময় আমার বাবা – মা না খেয়ে দিন কাটাতো। অনেক কষ্ট করেছে দুইজনে। সেই ভয়, সেই অনটনের স্মৃতি আজও মায়ের মনের ভেতর লুকিয়ে আছে। তারপর যখন অনেক কষ্ট করে সফল হলো তখন বাবা আর খালামনিকে হারিয়ে আরো অবস্থা খারাপ হয়ে যায়।ডাক্তার বলেছেন, এই অসুখ পুরোপুরি সারানো যায় না। শুধু ওষুধ আর ভালোবাসা দিয়েই সামলাতে হয়।”
আমি চুপ করে শুনছিলাম। বুকটা ভার হয়ে আসছিল। হাবিব আমার হাত চেপে ধরলো।
“তুমি ভয় পেয়ো না। মা আসলে কাউকে কষ্ট দিতে চান না। ওনার মাথার ভেতর ভয়ংকর কল্পনা তৈরি হয়, যেটা তিনি সত্যি ভেবে বসেন।”
আমিও হাবিবের হাত শক্ত করে ধরে আশ্বাস দিলাম। মায়ের দ্বায়িত্ব এখন থেকে আমারো।
সেদিনের পর থেকে আমি শাশুড়ী মায়ের দিকে নতুন চোখে তাকাতে শুরু করলাম। তাঁর আচরণে এখন আর ভয়ের কিছু দেখিনা, বরং মায়া লাগে।
দিন যায়, মাস যায়। মায়ের ওষুধ নিয়ম করে খাওয়াই, তাঁকে একা ফেলে রাখি না। মাঝে মাঝে রাতে ঘুম ভেঙে দেখি তিনি আবার রান্নাঘরে যাচ্ছেন, কিন্তু আমি চুপিচুপি গিয়ে তাঁর হাত ধরে বলি—
“চলুন মা, আবার ঘরে গিয়ে শুই।”
তিনি শিশুর মতো আমার কাঁধে মাথা রেখে ঘরে ফিরে আসেন।
এইভাবে দেখতে দেখতে আমাদের বিয়ের ছয়মাস পার হয়ে যায়। আমি হাবিবের সাথে একটা বিয়ের অনুষ্ঠানে যাই। সেইদিন ফেরার কথা ছিলনা আমাদের কিন্তুু হাবিবের হঠাৎ কাজ পরে যাওয়ায় আমাকে দুপুর ২ টার দিকে বাড়িতে নামিয়ে দেয়। সাধারণত এই সময়টায় বাড়ির সবাই ঘুমায়।মায়ের আবার ঘুম না হলে মাথা ব্যাথা করে তাই আমি দরজা নক না করে আমার কাছে থাকা এক্সটা চাবি দিয়ে বাড়ির ভীতরে ঢুকি। বাড়িতে ঢুকে ড্রয়িং রুম দিয়ে যেতেই রান্নাঘরে চোখ পরে। একি ফ্রিজটা আজকেও সড়ানো। ভাবলাম নিশ্চয়ই শাশুড়ী মা কাজটা করেছে। তাই ভাবলাম ঘরে যাওয়ার আগে ফ্রিজ টা ঠিক করে দিই। এই ভেবে ফ্রিজের কাছে যাই। কাছে যেতেই খেয়াল করি ফ্রিজটা অন্যদিনের থেকে অনেক বেশি সড়ানো। ব্যাপারটা আমার কেমন খটকা লাগে তবুও কিছু না ভেবে ফ্রিজ সরাতে যাই দেখি ফ্রিজের গোড়ায় একটা ছোট্ট কাঠের বাক্স। অনেক সুন্দর কারুকার্য করা। আমি বাক্সটা না খুলেই ফ্রিজ টা সেরে ঘরে আসি। তারপর চেঞ্জ করে ফ্রেস হয়ে একটু রেস্ট নিই। তারপর বাড়ির কাজ করতে করতে বাক্সটার কথা খেয়ালই থাকে না রাতে খেয়ে দেয়ে ঘরে যাই। হাবিব একটু বাইরে যায় বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিতে। আমি ঘরে আসতেই মনে পরে তখন না সুন্দর একটা বাক্স পেয়েছিলাম দেখি ভেতরে কি আছে?
এই ভেবে বাক্সটাকে হাত দিতেই পেছন থেকে হাবিবের গলার আওয়াজ, “ইতু। ”
হঠাৎ ডাকায় চমকে উঠলাম আমি। দরজায় দাঁড়িয়ে আছে হাবিব। তাড়াতাড়ি বাক্সটা চাদরের নিচে লুকিয়ে ফেললাম। এখনি হাবিবকে কিছু জানাতে চাই না।
হাবিব এসে আমান সামনে দাড়িয়ে জিজ্ঞেস করলো, কি করছো তুমি?”
আমি বললাম, “না, কিছু না… তোমারই অপেক্ষায় ছিলাম।”আজকে এত তাড়াতাড়ি ফিরলে যে? হাবিব বললো, এমনি। মনেহলো আজকে তোমার সাথে সময় কাটাই৷
কথাটা বলেই হাবিব এগিয়ে এসে আমার হাত ধরে টেনে নিজের কাছে নিলো । দু’জনের চোখে চোখে মিশে গেলো অচেনা উষ্ণতা। আমি লজ্জা পেয়ে হাবিবের থেকে দূরে সরে যেতে চাইলেও হাবিব যেতে দিলো না। হারিয়ে গেলাম দুইজনে ভালোবাসার রাজ্যে৷
“ মধ্যরাত “
হঠাৎ কানে এলো অদ্ভুত শব্দ। শব্দে ঘুম ভেঙে গেলে পাশে তাকিয়ে দেখি বিছানাটা খালি! হাবিব নেই।ওয়াসরুমেও নেই। হাবিব কে দেখতে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে এলাম। চারদিক অস্বাভাবিক নীরব। টুপটাপ শব্দ যেন রান্নাঘরের দিক থেকে আসছে। ধীরে ধীরে পা বাড়ালাম সেদিকে।দরজার কাছে পৌঁছাতেই স্পষ্ট শুনতে পেলাম—কেউ যেন ভারি কিছু সরাচ্ছে। কিন্তুু কাছে গিয়ে কাউকে দেখতে পেলাম না … শুধু দেখলাম ফ্রিজ আবারো সরানো হয়েছে।
আমি এইবার বেশ জোড়েই বললাম, কে আছে এখানে? ফ্রিজটা সড়ালো কে? কোনো উত্তর আসলো না । হঠাৎ মনে হলো, যেন একটা ছায়া সরে গেলো রান্নাঘরের অন্ধকার থেকে।
হৃদস্পন্দন বেড়ে যাচ্ছে। আমি তৎক্ষনাৎ শাশুড়ীর ঘরের দরজা খুলে দেখলাম, শাশুড়ী গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন।
মনের মধ্যো প্রশ্ন জাগলো তাহলে কে? কে বারবার রান্নাঘরে যায়? কেনইবা ফ্রিজ সরানো হয়?হাবিবই বা কোথায়?প্রশ্নের পাহাড় মাথায় জমে উঠতেই হঠাৎ একটা শক্ত হাত পেছন থেকে আমার মুখ চেপে ধরলো!
আমি ভয়ংকর শীতল স্পর্শে জমে গেলাম। চারপাশ অন্ধকার। নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হতে….. লাগলো…..
চলবে……
