গল্পঃ #গোপন_বাক্স
লেখিকাঃ #মিশু
পর্বঃ (২)
দেয়াল ঘড়িটা টং করে বেজে উঠলো। মানে মধ্যে রাত এখন। আমার গা কেমন শিউরে উঠলো। আমি আড়াল থেকে দেখলাম,
শাশুড়ী মা আজ কোনো খাবার খাচ্ছেন না। বরং ফ্রিজটা ঠেলে একটু সরিয়ে ফাঁক তৈরি করে তার পেছনে হাত ঢুকিয়ে কী যেন বের করার চেষ্টা করছেন। তাঁর চোখে মুখে আতঙ্ক আর অদ্ভুত এক ব্যস্ততা।
আমি অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলাম—
“ফ্রিজের পেছনে আসলে কী আছে?”
আমি নিঃশব্দে রান্নাঘরের দরজার আড়াল থেকে তাকিয়ে রইলাম। শাশুড়ীর হাত ফ্রিজের পেছনে ঢুকে গেছে, আর তিনি যেন ভীষণ ব্যস্ত কিছু খুঁজছেন। মুখে বারবার বিড়বিড় করছেন—
“আজ তো অনেক রাত হয়ে গেল… যদি কেউ দেখে ফেলে!”
আমার গা শিউরে উঠলো।
কিছুক্ষণ পর হঠাৎ তিনি ফ্রিজটা কাত করে একটু সরালেন। আমি চোখ কচলে তাকিয়ে দেখলাম—ফ্রিজের পেছনে দেয়ালের ভেতর এক ফাঁপা জায়গা। অন্ধকার গহ্বরের মতো। সেখান থেকে তিনি ধীরে ধীরে একটা ছোট টিনের বাক্স বের করলেন।
বাক্সটা হাতে নিয়েই তিনি কাঁপতে কাঁপতে ঢাকনা খুললেন। আমার নিঃশ্বাস আটকে গেল—ভেতরে কোনো খাবার নয়, বরং শুকনো রক্তের দাগ লেগে থাকা এক টুকরো কাপড়, কিছু পুরনো কাগজ আর একটা মরিচা ধরা ছোট ছুরি।
শাশুড়ী কাপড়ের টুকরোটা বুকে চেপে ধরে অদ্ভুত স্বরে কেঁদে উঠলেন—
“আমি কাউকে বলিনি… কাউকে বলতে পারবোও না…!”
মুহূর্তে আমার বুক ধড়ফড় করতে লাগলো। আমি জানি, আমাকে এখনই সরে যেতে হবে। কিন্তু পা যেন জমে গেল মাটিতে।
তখনই হঠাৎ করে শাশুড়ী ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালেন। অন্ধকার রান্নাঘরে তাঁর চোখদুটো ফ্রিজের আলোয় ভয়ংকরভাবে জ্বলজ্বল করছে।
“ইতু… তুমি এখানে কী করছো?”
আমার শরীর হিম হয়ে গেল।
শাশুড়ী আমার দিকে তাকিয়ে আছে। আমার গলা শুকিয়ে গেলেও কোনো রকমে বললাম—
“মা… এই জিনিসগুলো… এগুলো কী?”
শাশুড়ী প্রথমে চুপ করে ছিলেন। তারপর আস্তে আস্তে বাক্সের ভেতরের কাপড়ের টুকরোটা মুঠো করে ধরলেন। কণ্ঠ কাঁপছিল, কিন্তু চোখে তখন অদ্ভুত আগুন—
“তোমার দেখি খুব আগ্রহ আমাকে নিয়ে। কতবার সাবধান করেছি আকার ইজ্ঞিতে যে আমার পিছে পরো না। কিন্তুু তুমি তো বোঝার পাত্রী নও। আজ পর্যন্ত এইবাড়ির কোনো মানুষ আমাকে জিজ্ঞেস করার সাহস পায়নি কি আছে এই বাক্সে কিন্তুু তোমাকে তো জানতে হবে? কি জানতে চাও তো?
আমি কোনোরকম মাথা নাড়ালাম।
শাশুড়িমা হাহা করে হেসে উঠে বললেন, তাহলে শোনো। তোমার শশুর… মানে আমার লাবিব আর হাবিবের বাবা। যাকে আমি খুব ভালোবাসতাম কিন্তুু সেই মানুষটা কোনোদিন আমার ছিল না, ইতু।সে ছিল একটা দুশ্চরিত্রের ব্যাক্তি। আমি বউ হয়ে তার ঘরে থাকার পরও সে দিনের পর দিন অন্য নারীতে আসক্ত ছিল। আমি দুই ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে দিনের পর দিন সব সহ্য করে গেছি। কিন্তুু সেইদিন আমার সব সহ্যেে সীমা পার হয়ে যায় যখন দেখি আমার স্বামী আমারই বোনের সাথে খারাপ সম্পর্কে জড়িত ।
কথাটা বলেই তিনি হাঁপাতে হাঁপাতে এগোতে লাগলেন।বুঝতে পারলাম কষ্ট পাচ্ছে। কিন্তুু আবারো লম্বা একটা দম নিয়ে বললেন,
“সেদিন হাতে নাতে ধরে ফেলি ওদের। আমার চোখের সামনে আমার বোন আর আমার স্বামী…ছি ছি কি নোংরা খেলায় মত্ত ছিল। আমার নিজের মায়ের পেটের বোন পর্যন্ত আমার কথা একটাবার ভাবলো না। ”
কথাগুলো বলতেই শাশুড়ীর গলা ভেঙে গেল। চোখে জল জমে উঠলো, কিন্তু ভেতরের দমে যেন আরও ভয়ংকর লাগছিল তাঁকে।
তিনি দম নিয়ে আবারো বললেন, “আমি সহ্য করতে পারিনি ইতু । এক মুহূর্তে মাথা কাজ করা বন্ধ করে দিল। আমি দৌড়ে রান্নাঘরে গেলাম হাতের সামনেই ছুরিটা ছিল।আমি বিনা দ্বিধায় ছুরিটা তুলে নিয়েছিলাম… তারপর…”
আমার গলা শুকিয়ে গেলো। কিন্তুু জানার আগ্রহ থেকে বললাম, তারপর?
তিনি আর কিছু বললেন না। শুধু ছুরিটা হাতে তুলে নিলেন। মরিচাধরা ধাতব ঝিলিক রান্নাঘরের আলোয় ভৌতিকভাবে কাঁপলো।আর হালকা আওয়াজে হাসলো। আর বললো,
“তারপর আর কি। ছুরিটা বসিয়ে দিলাম ওদের বুক বরাবর। জানো ওদের দুজনের চিৎকার আজও কানে বাজে। আমার শান্তি লাগে সেই আওয়াজ শুনলে৷
আমি আবারো প্রশ্ন করলাম, কেউ জানতে পারেনি কিছু?
তিনি এইবার মুখ গম্ভীর করলেন আর বললেন, না কেউ কিছু জানতে পারেনি। তখন আমাদের বাড়ির কাজ চলছিল এই রান্নাঘরের উপারেই ওদের পুতে দিয়েছিলাম৷ তারপর আমি নিজেই সব প্রমান মুছে দিয়েছি । ওদের উপর তুলে দিয়েছি দেয়াল। কিন্তুু তখন থেকে প্রতি রাতে ভয় পেতাম—যদি ওরা ফিরে আসে, যদি কেউ আমাকে ধরে ফেলে! তাই ফ্রিজ… খাবার… এসবের আড়ালে লুকিয়ে লুকিয়ে ওদের পাহারা দিই যেন ওরা না আসে।
আমি স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম। চারপাশটা যেন হঠাৎ করেই আরও ঠান্ডা হয়ে উঠেছে।
শাশুড়ী হঠাৎ আমার হাত চেপে ধরলেন। তাঁর চোখ ভেজা, কিন্তু ভয়ংকর শীতল—
” কিন্তুু আজকে তো তুমি সবটা জেনে গেলে ইতু? যদি কাউকে বলে দাও? কি হবে আমার? পুলিশ আমাকে ধরে নিয়ে যাবে। না তা তো আমি হতে দিবো না।
এই বলে হঠাৎ তাঁর হাতে ধরা ছুরিটা উঁচিয়ে আমার দিকে ঝাঁপিয়ে পড়লেন।“
চলবে………
