#তুই_আমার_শেষ_ক্ষুধা
#শারমিন_প্রিয়া
১৭.
কায়ান নিরুপায় হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। অগ্নীমা বলে, “চুপ কেন তুমি? কি চাও, বলো?”
কায়ান এপাশ ওপাশ ঘুরে তারপর ঢোক গিলে, অগ্নীমার হাত ধরে নরম স্বরে বলে, “তুই আমার ভালো লাগার একটা অনুভূতি, তোকে অনেক স্নেহ করি আমি। এমন কোন কাজ করবি না যাতে আমি কষ্ট পাই। আমার জন্য এইটুকু মায়া কর প্লিজ, তুই নতুন করে বিয়ে করে নে। আমি আরশীকে হারাতে পারব না।”
অগ্নীমা কথা বলতে পারল না। ঝরঝর করে কেঁদে ফেলল। কাঁদতে কাঁদতে বলল, “ধরো, তুমি আরশীকে ভালোবাসো। এখন আরশী অন্য কাউকে ভিক্ষা চাচ্ছে তোমার কাছে, কেমন লাগবে তোমার? সহতে পারবে তো?”
কায়ান চোখ বুজে শ্বাস ছাড়ে। অগ্নীমার কষ্টটা সে বুঝতে পারছে। কিন্তু অসহায় সে। সে চুপচাপ সরে যেতে চায় গুহা থেকে।
অগ্নীমা তাকে আটকায় না। রাগে, দুঃখে তার কলিজা এফোঁড়ওফোঁড় হয়ে যাচ্ছে। সে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে না পেরে, হাতের ধারালো নখ দিয়ে নিজের গলা নিজে খামচে ধরে। গলগল করে রক্ত পড়তে শুরু করে।
দ্রোহান ও রাভান আঁতকে উঠে চিৎকার করে। কায়ান পিছু ফিরে তাকায়। দৌড়ে এসে অগ্নীমাকে ধরে।
অগ্নীমা গুঙ্গাচ্ছে, “আমাকে বাঁচাবে না প্লিজ। আমি মরে যেতে চাই।”
কায়ান অগ্নীমার কথা গুরুত্ব দেয় না। সে তার ক্ষমতা দিয়ে ক্ষত সারিয়ে দেয়।
অগ্নীমা কাতর চোখে তাকায় কায়ানের দিকে, “তুমি আমার জন্য চিন্তা করো, তাই বাচিয়েছো। আমি মারা গেলে তোমার কষ্ট হবে। তাহলে কেন আমাকে তোমার একেবারে করে নিচ্ছো না? কয়বার বাঁচাবে তুমি আমাকে? আমি যখন তখন এসব করতে পারি।”
কায়ান দৃঢ়তা নিয়ে বলে, “না, তুমি এসব করবে না। আর যদি করো?” কায়ান থামে।
অগ্নীমা নরম করে বলে, “করলে?”
“আমি আমাকে শেষ করে দেবো।”
জোরে হেসে উঠে অগ্নীমা। দুলে দুলে হাসে। হাসতে হাসতে কান্না করে দেয়।
কায়ান অস্বস্তিকর পরিস্থিতিতে পড়ে যায়। কি করবে, মাথায় কাজ করে না তার। অগ্নীমার কাছে অনুরোধ করে, “আমাকে আর আটাকায়ো না। পাগলামো থামাও। আমাকে যেতে দাও। আমার বউ অসুস্থ। বাচ্চা হবে। আমার অপেক্ষায় আছে সে।”
অগ্নীমা আরও চমকাল, ভেঙে ভেঙে বলল, “বা..চ্চা হবে? এতদূর?”
আরও অনেক কিছু বলার ছিল অগ্নীমার, কিন্তু আর বলল না। তার ভেতরে আগুন জ্বলছে দাউদাউ করে। এতগুলো বছর যে মানুষটাকে নিয়ে তিলে তিলে স্বপ্ন সাজিয়েছে। সেই মানুষটা অন্য কাউকে ভালোবাসে। অন্য কাউকে নিয়ে ঘর বেধেছে। সবকিছু দেখে হতবাক সে। চুপচাপ থাকা ছাড়া আপাতত আর কিছুই দেখতে পাচ্ছে না।
কায়ান আর সময় নেয় না। দ্রোহান রাভানকে ইশারা করে বলে, “অগ্নীমাকে দেখে রাখতে।” তারপর সে হাওয়া হয়ে যায়।
অনুষ্ঠান শেষে সবাই ফিরে গিয়েছে। আরহামের প্রাসাদ এখন শান্ত। পুরো বাড়িটাকে ঘীরে ধরেছে সন্ধ্যার নিরিবিলি হাওয়া।
নজরুল ও রুদ্রাণী মেয়ের ঘরে গল্প করছেন। সব আগেকার ফেলে আসা গল্প। কাজের খালা রং চা রান্না করে সবার জন্য এনে দিলেন। উনি চলে যেতে চাইলে আরশী বলল, “আপনিও বসুন না খালা। আমাদের সাথে চা খাবেন।”
খালা অনুভূতিহীন মুখে বললেন, “আমার ভালো লাগে না চা।”
বলে চলে গেলেন উনি।
রুদ্রাণী কিছু ভেবে আরশীকে বললেন, “এই মহিলা কতদিন ধরে আছে আরশী?”
“বিয়ের পর থেকে মা। ধরো সাত/আট মাস হবে। কেন?”
“মহিলাকে আমার কাছে অদ্ভুত মনে হচ্ছে। বাড়িঘর কই জানিস?”
“উনি জানেন মা?”
“তুই কিছু অদ্ভুত খেয়াল করেছিস তার মধ্যে?”
আরশী দম ধরে মাথা ঝাকালো, “না, তেমন কিছু না। তবে উনি সারারাত লাইট জ্বালিয়ে ঘুমান আর কখনও ঘর অন্ধকার করে ঘুমান।”
নজরুল হেসে উঠলেন, “এটা কোন সন্দেহ হইলো।”
আরশী স্তব্ধ হয়ে বাবাকে দেখলো। বাবার দিকে তাকিয়ে তার মুখে হাসি ফুটে উঠলো। বাবার মুখে কত মায়া। পাগল অবস্থায় ও বাবার জন্য তার কত টান ছিল। হয়তো বাবা বলেই ছিল।
আরশী বুক ভরে ডাকল, “বাবা! ও বাবা!”
নজরুল আরশীর দিকে তাকালেন, “কি মা বল?”
“পাগল অবস্থায় কত কষ্ট করেছো তুমি? আমার জন্য কত রাত তুমি রাস্তায় কাটিয়েছে। মনে হলে, আমার খুব খারাপ লাগে। তবে মজার বিষয় হলো, তুমি আমার বাবা জানতাম না। তবু তোমার জন্য আমার খুব মায়া হতো।”
নজরুল চশমা খুলে চোখ জোড়া মুছলেন। নিভে যাওয়া গলায় বললেন, “এই পৃথিবীতে আমার রক্তের একটা মাত্র মানুষ বেঁচে আছে। যত কষ্টে থাকি না কেন, তার কাছাকাছি থাকলেও একটা শান্তি লাগতো। রোজ একবার তাকে দেখলে বুক ভরে যেত। নিজের জীবন বিসর্জন দিয়ে তাকে সবসময় আগলে রাখতে চেয়েছিলাম। ভাগ্য ভালো, রাক্ষসরা আমাকে চিনতে পারেনি তখন।”
রুদ্রাণী দুজনকে থামিয়ে দিয়ে বললেন, “এসব কথা থাক। এখন বাবা-মেয়ে মিল হয়েছে এটাই অনেক। আগের কথা বলে ইমোশনাল হওয়া, কান্না-কাটি করা এসব এখন বাদ। আরশীর শরীর খারাপ। বাচ্চার উপর এর প্রভাব পড়বে।”
আরশী হাতের তালু দিয়ে চোখ মুছলো। মুখে হাসি ফুটিয়ে বলল, “মা ঠিক বলেছেন, বাবা। আগের কথা আর আমরা ভাবব না।”
“সেই কখন সন্ধ্যা হলো আরশী। জামাই কোথায় গেলো?” রুদ্রাণী জিঞ্জেস করলেন।
“কই আবার মা, বাজারে হবে।”
“যা যা ঘটছে আমাদের সাথে, তা নিয়ে ভয় লাগে। জামাইর জন্যও ভয় লাগে। কল দে তো মা। এতরাতে বাহিরে থাকার কোন দরকার নেই।”
_________________
কায়ানের মনে অস্থিরতা কাজ করছিল। সে নিরিবিলি একাকী সময় কাটাতে গুহা থেকে বেরিয়ে বিলের ধারে গিয়ে বসেছে। আকাশে চাঁদ ঝলমল করছে। তারারা জ্বলছে। চাদের আলোয় পৃথিবী চকচক করছে। বিলের পানির উপর চাদের আলো পড়ে সোনালী আকার ধারণ করে, চিকমিক করছে। যতদূর চোখ যাচ্ছে, দেখা যাচ্ছে সীমাহীন জমিন। অনেক দূর থেকে একটু আধটু আলোর ঝলকানি আসছে। সম্ভবত সেগুলো গাড়ির।
কায়ান কয়েকটি মাটির ধলা একটু পরপর ছুড়ে ফেলছে পানিতে। পানি শব্দ করে উঠছে। কায়ান দীর্ঘশ্বাস ফেলে, মনে মনে তার আর্তনাদ। তার জীবনটা এমন অস্বাভাবিক হয়ে উঠছে কেন? এই বিলের পানির স্রোতের মতো শান্ত নিরিবিলি তার জীবনটা কেন হতে পারলো না? কেন সে আরশীকে নিয়ে অনায়াসে কাটিয়ে দিতে পারছে না বাকি জীবনটা?
পকেটের ভেতর মোবাইল ফোনটা বেজে উঠলে কায়ান রিসিভ করে, “আসছি।” তারপরই সে বাড়ি ফিরে যায়। চিন্তার ছাপ সরানোর জন্য বরাবরের মতো মুখে হাসি ফুটায়।
খালা ভাত বাড়েন। আরশী, আরহাম, রুদ্রাণী আর নজরুল একসাথে রাতের খাবার খান। খাওয়া শেষে সবাই ঘুমাতে যান। রুদ্রাণী আরশীকে বলেন, “বেশি রাত জেগো না। তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়ো।”
আরশী খাটের উপর উঠে বসে। আরহাম ওয়াশরুম থেকে ফ্রেশ হয়ে বের হতেই আরশীর চোখ থেমে যায় আরহামের উপর। গতকাল সে সেভ করেছে। মুখে খোঁচা-খোঁচা দাড়ি । পরনে কালো টিশার্ট। ফর্সা মুখে কালো শার্টে আরও দীপ্তি এনে দিচ্ছে চেহারায়। ভেজা চুল কপালের দুপাশে হেলে পড়েছে। চোখ দুটো আরও গভীর।
আরশী মনে মনে বলে, “একজন পুরুষ মানুষ এত সুদর্শন হয় কীভাবে?”
আরহাম আরশীকে লক্ষ্য করে চোখ নাচিয়ে জিজ্ঞেস করল, “কি?”
আরশী মাথা ঝাকালো, “কিছু না।”
“তাহলে ওমন করে তাকিয়ে আছো কেন?”
আরশী মাথা কাত করে, “আপনাকে যে ভীষণ ভালো লাগে।”
আরহাম হাসে, চোখে দুষ্টু হাসি নিয়ে বলে, “তাহলে দেখো। মন ভরে দেখো।”
আরহামের হাসি ভরা এই চাহনিই বারবার আরশীকে আষ্টেপৃষ্ঠে বেধে ফেলে।
আরহাম হাত থেকে টাওয়াল সরিয়ে খাটের ধারে আসে। আরশীকে বলে, “বাহিরে খুব সুন্দর চাঁদ উঠেছে। জোৎস্না রাত। পৃথিবী আলোকিত হয়ে আছে। আমার খুব ইচ্ছে করছে তোমাকে নিয়ে বিলের ধারে যেতে। ওখানটা খুব সুন্দর। মন চাচ্ছে তোমাকে সাথে নিয়ে নিরিবিলি পরিবেশে ওই বিলের ধারে বসে থাকি। যাবে?”
“এই রাতের বেলা? যদি বাচ্চার ক্ষতি হয়?”
আরহাম আরশীর হাত চেপে ধরে বলে, “যতক্ষণ আমি তোমার কাছে আছি, তোমার বা তোমার বাচ্চার এক বিন্দু পরিমাণ ক্ষতি কেউ করতে পারবে না। তুমি নিশ্চিন্তে আমার সাথে আসতে পারো।”
“মা যদি বকেন।”
“উনারা আর সকালে উঠবেন। আমরা তার আগে চলে আসব।”
আরশী মাথা কাত করলো, ” তাহলে চলো।”
আরহাম একটা চাদর দিয়ে ভালো করে আরশীকে জড়িয়ে কোলে নিয়ে নিচে নামল। তারপর গেট খুলে বাহিরে বের হলো তারা। আরহাম ফের আরশীকে কোলে নিতে চাইলে আরশী বাধা দিলো, “কি চমৎকার রাত! আমি হেটে যাব। তোমার হাত ধরে হেটে যাব।”
বাহিরে হাওয়া বইছে। গাছের পাতাগুলো শো শো করে শব্দ করছে। ঠান্ডা হাওয়ায় আরশীর কাপড় উড়ছে। আরহাম একদম কাছে নিয়ে আসলো আরশীকে। আষ্টেপৃষ্ঠে ধরে রাখলো।
বিলের ওই পাড়ে একটা ছোট্ট কুঁড়েঘর আছে। কুঁড়েঘরের ভেতর ল্যাম্পটন ঝলছে। বিলে মাছ চাষ করে লোকে, তারাই খড় দিয়ে এই ঘর বানিয়েছে। চুরের উৎপাত বাড়লে তারা এইখানে এসে থাকে।
আরহাম আরশীকে নিয়ে সেই কুঁড়েঘরে উঠে। ছোট্ট একটা চৌকি রাখা তাতে, আছে ছোট্ট একটা জানলা। জানলায় বসে পুরো বিল দেখা যায় একসাথে।
আরশী আর আরহাম জানলার পারে বসে। আরহাম জিজ্ঞেস করে, “কেমন লাগছে?”
“চমৎকার। এত সুন্দর রাত, এত বড় বিল। চারদিকে সুনসান নিরবতা। কারও টু শব্দ নেই। জোনাক পোকারা টিমটিম করে জ্বলছে। দলবেঁধে ঘুরে বেড়াচ্ছে। বিলের স্থীর পানিতে চাদের আলো পড়ে সোনালী রঙের ঢেউ খেলে যাচ্ছে। দূরের আকাশ এক অসীমতার গল্প বলছে। ভাগ্যিস তুমি আমাকে নিয়ে এসেছো, নয়তো মিস করতাম এই সুন্দর রাতখানা।”
আরহাম দীর্ঘশ্বাস ফেলে আকাশপানে চেয়ে বলে, “এই রাতগুলো কি তোমার মনে বিশেষভাবে বেচে থাকবে?”
“কেন নয়? তোমার সাথে কাটানো প্রতিটা মুহূর্ত আমার বুকের গভীরে বেচে থাকবে। যখন আমরা বুড়ো হব, তখন নাতি-নাতনী সাথে এসব গল্প করব। তারা চিনবে, জানবে এক মহামানবকে। যে বউকে প্রচন্ড ভালোবাসতো। রাত-বিরাতে পাগলামো করত।”
“তুমি আমার জীবনে না এলে, আমার জীবন এত রঙিন হতো না, আরশী।”
তারপর মনে মনে বলে, তুমি এসে সব ছারখার করে দিয়েছো, আরশী। তোমাকে দেখে আমি দুনিয়া ভুলে গিয়ে, সব বাস্তবতা ভুলে গিয়ে তোমার পিছু ছুটেছি। আমার কেন জানি মনে হচ্ছে , আমার সব সত্যি ফাঁস করে দেবে আমাদের অনাগত বাচ্চাটা। তুমি কি করবে তখন? সেটা ভেবে হয়রান হয় যাচ্ছি আমি। আমাকে মেনে নিবে? বাচ্চাকে মেনে নিবে? নাকি আমাদের দুজনক ছুড়ে ফেলে দিবে? জানো তো? তোমার বিরুদ্ধে লড়ার ০% চেষ্টা করব না আমি। তুমি আমাকে মারতে চাইলে, ধ্বংস করতে চাইলে, নির্ধিদ্বায় সব করতে দেব আমি।
আরশী চিমটি কাটে আরহামকে। চুপ হয়ে গেলেন যে।
“দেখা তো শেষ, চলো। হুট করে মাথা চিনচিন ব্যথা করছে। রুমে গিয়ে তোমার বুকে মাথা রেখে শান্তিতে একটা ঘুম দেবো।”
_________
অগ্নীমা সারারাত এক ফোটা ঘুমায়নি। কান্না করেছে। চোখ-মুখ লাল করে ফেলেছে। অনেক চেষ্টা করেছে নিজেকে শান্ত করার, কিন্তু পারেনি। নিজেকে অপরাধী মনে হয় তার কাছে। সে যদি কায়ানকে ছেড়ে এতগুলো বছর দূরে না যেতো, তাহলে তো কায়ানের জীবনে অন্য কেউ আসার সুযোগই পেতো না। সে আসতে দিতো না। এখন কষ্ট পাওয়া আর কান্না করা ছাড়া তো আর কিছু করার নাই।
রাভান কায়ানের আদেশে রাক্ষস রাজ্যে গিয়েছে। কায়ান বউয়ের কাছে। দ্রোহান একা গুহায় অগ্নীমার সঙ্গে। অগ্নীমা মেয়েটা ফ্যাতফ্যাত করে এমন কান্না করছে, দ্রোহান ঘুমাতে পারেনি। ভোর হতে গেলো মেয়েটা তাও থামেনি।
দ্রোহান বিরক্তি নিয়ে বলল, “এই, আপনি কি থামবেন? নিজে ঘুমাচ্ছেন না, আমাকেও ঘুমাতে দিচ্ছেন না।”
তেলে বেগুনে জ্বলে উঠলো অগ্নীমা, “আমার ভুল ধরার সাহস হয় কী করে? হু? বাবাকে বলে রাজ্য ছাড়া করব তোমাকে?”
দ্রোহান মনে মনে বলল, “তোমাদের এই এক ধমকানি ছাড়া আর কি আছে।” দ্রোহান চুপ থাকলো।
একটু পর অগ্নীমাও চুপ হয়ে গেল। আস্তে করে বলল, “আমি আর কাঁদব না। শব্দ করব না। তুমি ঘুমাও। আসলে আমার বুকটা জ্বলছে শুধু। কান্না করতে চাইনি, তাও কান্না আসে। এতে আমার কি দোষ?” বলে আবারও গুঙ্গানির মতো শব্দ করতে লাগলো অগ্নীমা।
দ্রোহানের এবার আর রাগ হলো না। এবার অগ্নীমার প্রতি মায়া হলো তার। সে ভাবে, ভালোবাসা কী? কি এমন আছে এতে? যার জন্য সর্দার নিজেও ভুল পথে গেলেন। এই মেয়েটাও পাগল হয়ে যাচ্ছে। পাগলের মতো করছে।
সে গম্ভীর গলায় বলল, “আপনি নিজেকে সামলান। সর্দার সর্দারনীকে খুব ভালোবাসেন। এই পৃথিবীর সবকিছু থেকেও বেশি ভালোবাসেন। তিনি কখনও এমন কিছু করবেন না, যাতে সর্দারনী দূরে সরেন। সর্দারনীর জায়গা তিনি আর কোন মেয়েকে দিবেন না। তাই আপনার জন্য ভালো হবে, নিজেকে সামলানো।”
“আমি মরে যাব।”
দ্রোহান ক্ষিপ্ত হলো, “বোকার মতো কথা বলবেন না। কারো জন্য নিজের জীবন দেওয়াটা বোকামী। এই পৃথিবীতে বাঁচতে হয়, প্রাণ ভরে বাঁচতে হয়, শ্বাস নিতে হয়। উপভোগ করতে হয়।”
অগ্নীমা করুণ গলায় বলে, “আমার যে কষ্ট হচ্ছে?”
দ্রোহান সোজা হয়ে বসে, “জানেন? দুদিন আগে ও আমার গায়ে অনেক আঘাত ছিল, ধীরে ধীরে ব্যথা কমে যাচ্ছে। খুব দ্রুত সুস্থ হয়ে যাব। যে কোন ব্যথা একেবারে সারে না। সারতে সময় দিতে হয়। একটু একটু করে, একদিন দুইদিন করে একেবারে সেরে যাবে। আপনার টা ও সারবে। চ্যালেঞ্জ। শুধু ধৈর্য ধরুন। সর্দারকে স্বাভাবিক মাইন্ডে দেখুন। আপনার জীবনেও কেউ আসবে, যে আপনাকে খুব ভালোবাসবে।”
অগ্নীমা গাল ফুলিয়ে বলে, “কবে আসবে?”
“আমি কি সেটা জানি?”
“তাহলে বললেন কেন?”
“কি মসিবত, বলা যাবে না?”
“না, যা হবে না বলা যাবে না।”
“আপনি জানেন, আপনি একটা পা…”
দ্রোহান পাগল বলতে চাইছিল, কিন্তু আর বলল না।
অগ্নীমা চোখ ছোট করে বলল, “পা কি?”
দ্রোহান গলা খাঁকারী দিয়ে বলল,
“পা, পা হলো আসলে বলতে চেয়েছি আপনি খুব পবিত্র মন নিয়ে সর্দারকে ভালোবেসেছেন।”
“ তুমি কথা ঘুরাচ্ছো, অন্য কিছু বলতে চেয়েছিলে।”
“না, না, সত্যি, আপনার মন পবিত্র। আপনি পবিত্র।”
“সত্যি!”
দ্রোহান নার্ভাস হয়ে মাথা নাড়িয়ে বলল,
“হ্যাঁ, খুবই পবিত্র। একদম ঝকঝকে, থকথকে। শুধু পাগলামোটা বেশি করেন।”
অগ্নীমা চোখ পাকিয়ে বলল,
“আর একবার আজেবাজে বললে নখ বসিয়ে দেবো।”
দ্রোহান গোগ্রাসে ঢেকে গিলে বলল,
—“ঠিক আছে, বুঝেছি।”
অগ্নীমা একটু থেমে আবার বলল,
“তুমি তো খুব সুন্দর বোঝাতে পারো। নাম কি তোমার?”
“দ্রোহান। দ্রোহান আমার নাম।”
“বলোতো, কায়ানের বউ দেখতে কেমন? খুব সুন্দরী?”
দ্রোহান মাথা ঝাকিয়ে বলল,
“হুম।”
“আমি তাকে দেখব।”
“ মানুষ হতে হবে।”
“ সমস্যা কি?হব। আমি হতে পারি।”
“দেখা করে কি করবেন? কোন ক্ষতি করবেন নাতো আবার?”
“না না, এমন করব কেন? যাকে আমার কায়ান ভালোবাসে তার ক্ষতি আমি কেন করব। করব না। শুধু মেয়েটাকে মন ভরে দেখব।”
দ্রোহান টের পায়। অগ্নীমা ভীষণ আবেগী, সরল ও সহজ একটা মেয়ে। ভিতরে কোনো দূর্নীতি নেই। একদম রুদ্রাণীর মতো ভালো।
চলমান…..!
#তুই_আমার_শেষ_ক্ষুধা
#শারমিন_প্রিয়া
১৮.
খুব ভোরে রুদ্রাণী ঘুম থেকে উঠেন। সারা বাড়ি হাঁটেন। বাড়িতে থাকতে থাকতে কিছু একটা টের পাচ্ছেন তিনি। তার অবচেতন মন বারবার কিছু একটা ইশারা করছে, কিছু একটা ঠিক নেই। কিন্তু কী তা পরিষ্কারভাবে এখনও বোঝা যাচ্ছে না। আরশীর দিকে কে যেন হাত বাড়িয়ে ছিল, নজরুলকে এ বাড়িতে বস্তাবন্দি করে ফেলে রেখেছিল। তার মানে এ বাড়িতে বা আশেপাশে কিছু একটা আছে। রুদ্রাণী এই ভেবে ভেবে জহুরি চোখে সবকিছু পরখ করলেন। বাড়ির এ মাথা থেকে ও মাথা অব্দি খুঁটিয়ে দেখতে বেশ সময় গেলো রুদ্রাণীর। তবু কিছু সন্দেহের মতো দেখতে পেলেন না। তিনি ফিরে এসে উঠোনে বেলি ফুলের ধারে রাখা বেঞ্চিতে বসলেন। এখানে রোদ এসে পড়েছে। গাছে গাছে পাখিরা কিচিরমিচির করে ডাকছে।ে
রুদ্রাণীর চোখ গেলো কাজের খালার ঘরের দিকে। দরজাটা ভেতর থেকে বন্ধ। হয়তো ভেতরে মহিলা ঘুমাচ্ছেন। রুদ্রাণীর অনেক সন্দেহ হয় কাজের মহিলাকে। এই মহিলার হাঁটা চলা, ভাবভঙ্গি—কোনো কিছুই ঠিক লাগে না রুদ্রাণীর। কীভাবে কীভাবে যেন তাকিয়ে থাকে মহিলাটা। অসহ্য লাগে রুদ্রাণীর।
আরশীর প্রেগন্যান্সির অনেক দিন হলেও সে আলট্রা করেনি। শুরুতে ডাক্তার দেখিয়েছিল, এরপর কায়ান এমনি ভিটামিন-ওষুধ কিনে এনে দেয়। আজ দুপুরে খাওয়া-দাওয়ার পর আরশী আরহামকে বলল, “আমি আলট্রা করব। বাচ্চা ঠিক আছে কিনা দেখব।”
কায়ান পড়লো বিপদে। আরশীকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে গেলে ঝামেলা। যদি বাচ্চার কোনো গঠন রাক্ষসের মতো হয়, বা কিছু একটা পাওয়া যায়, তাহলে নিমিষেই সব শেষ হয়ে যাবে। না, না—ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাওয়া যাবে না। সে আরশীকে বলল,
“বাচ্চা সুস্থই আছে। তুমি ভালো আছো মানে, বাচ্চা ভালো আছে। আলট্রার দরকার নাই। আমি ডাক্তার বাড়ি নিয়ে আসব। চেকআপ করে বলবেন বাচ্চা কেমন আছে। তাহলে এখন যাই। বাজারে একটু কাজ আছে আমার, আর আসার সময় নিয়ে আসব ডাক্তারকে।”
কায়ান চলে যায় গুহায়। তার মাথায় একটা বুদ্ধি এসেছে। সে দ্রোহানকে ডাক্তার সাজিয়ে নিয়ে আসবে। কিন্তু দ্রোহান তো বড়জোর পালস চেক করতে পারবে, এর বেশি পারবে না। যদি সত্যি বাচ্চার কোনো সমস্যা থাকে? পরে কী হবে?
“না না, কোনো সমস্যা হবে না। আরশী ভালো আছে মানে বাচ্চাও ভালো আছে।”
সবশেষে, আমার আরশীর কিছু না হোক। বাচ্চা যাবে-আসবে। আরশীকে হারালে আরশীকে আর পাব না।
কায়ান গুহায় ঢুকে দেখে দ্রোহান বাসি একটা পশু খাচ্ছে, অগ্নীমা শুয়ে আছে। কায়ানকে দেখে দ্রোহান থামে। কায়ান অগ্নীমার দিকে ইশারা করে দ্রোহানকে জিজ্ঞেস করল,
“ওর অবস্থা কী?”
“সারারাত কান্নাকাটি করেছিলেন। সকালে শুয়েছেন বোধহয়।”
“খেয়েছে কিছু?”
“না, খাননি।”
“খাবার কি আছে?”
“বাসি মাংস। শীত বলে নষ্ট হয়নি।”
“ মানুষ সেজে গরম গরম খাবার নিয়ে এসো হোস্টেল থেকে। পারবে?”
দ্রোহান উঠতে উঠতে বলল,
“জি সর্দার।”
“তাহলে এখনই যাও। ঝড়ের বেগে যাবে আর আসবে।”
দ্রোহান চলে যায়। কায়ান রাত্রেশ অগ্নীমার মাথার কাছে গিয়ে বসে। অগ্নীমা ঘুমাচ্ছে। কায়ান চোখ বন্ধ করে, তার চোখের সামনে ভাসতে থাকে ছোট্ট অগ্নীমা। লাজুক, চঞ্চল, টকটকে লাল চুলের অভিমানী সেই মেয়ে, যে মেয়েটা তার শৈশব রাঙিয়ে ছিল। যার সাথে খেলাধূলা ছাড়া ছোট্ট কায়ানের দিনই কাটতো না৷ সেই অগ্নীমা আজ কত বড়। কত বড় হয়েছে। তার জন্য মেয়েটা রাতভর কান্না করছে। অথচ ছোটবেলায় অগ্নীমার চোখের জল দেখলে সে আগুন হয়ে যেত। সময় কি নিষ্ঠুর! সবকিছু কীভাবে যেন পরিবর্তন করে দেয়।
কায়ান দীর্ঘশ্বাস ফেলে চোখ খুলে। তার চোখের কোনা ভিজে উঠে। সে সেটা মুছে মলিন হেসে অগ্নীমার মাথায় হাত বুলায়।
ওমন আদরমাখা স্পর্শে অগ্নীমার চোখ খুলে। সে বোঝার চেষ্টা করে, কে ওমন যত্ন নিয়ে মাথায় হাত বুলাচ্ছে। গুহায় তো শুধু দ্রোহান। দ্রোহানের স্পর্শ এত মধুর হতে পারে না। তাহলে কায়ান… কায়ান কি এসেছে? অগ্নীমা ধড়ফড়িয়ে উঠে। সত্যি সামনে কায়ানকে দেখে আবেগে আপ্লুত হয়ে সে কায়ানকে জড়িয়ে ধরে। কায়ান তাকে সরিয়ে দেয় না, বরং আগলে রেখে ধীরে ধীরে পিঠে হাত বুলায়। তারপর আগলা করে আরশীকে। আরশী জিজ্ঞেস করে, “তুমি কখন এলে?”
“মাত্র।”
“আমার প্রতি তোমার অনেক মায়া, তাই না?”
কায়ান মাথা নাড়ায়,
“হু। ছোটবেলার স্মৃতিগুলো মানুষের মনে সফট অনুভূতি তৈরি করে। ওই বাচ্চা-বাচ্চা স্মৃতিগুলো হৃদস্পটে জমা থাকে। সেটা চোখের সামনে ভাসলে অদ্ভুত ভালো লাগা কাজ করে। মায়া কাজ করে। ওই মানুষটাকে কখনও ঘৃণা করা যায় না। কারণ ঘৃণা করতে গেলে তার ছোট্ট মুখটা চোখের সামনে ভেসে উঠে।”
“তুমি তো বউয়ের অধিকার দিতে নারাজ। তাহলে এসব বলছো কেন?”
“বউয়ের অধিকার দিতে নারাজ তাই বলে তোমার যে জায়গা নেই, এমন তো না। তোমার জন্য আলাদা জায়গা আছে আমার মনে।”
অগ্নীমা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে,
“আসলে কিছু বলার মতো নাই তোমাকে। তবে সত্যি আমার খুব কষ্ট হচ্ছে। খুব।”
“এত চাপ নিস না। দেখবি, ধীরে ধীরে কমে যাবে।”
“আমি তাহলে সত্যি তোমাকে হারিয়েছি। এ যে সহ্য হচ্ছে না আমার।”
“তুই একটা বিয়ে করে নে অগ্নি। দেখবি, আমার প্রতি তোর ওই ফিলিংস আর থাকবে না।”
“পাগল নাকি! কাকে বিয়ে করব? আমার মনে তুমি—শুধু তুমি আছো। তুমিই আমার বর।”
“আরে বোকা মেয়ে, ছোটবেলার বিয়ে রিয়েল হয় না। ওটা ধরে রেখে থেমে গেলে হয় না। পুরো জীবন পড়ে রয়েছে তোর। সেটা সাজাবি না?”
অগ্নীমা চোখ নামিয়ে বলে,
“আমার যে আর কাউকে ভালো লাগে না।”
“লাগবে, লাগবে।”
কায়ান এক মিনিট ভাবে, তারপর বলে,
“আমার কাছে খাঁটি একটা ছেলে আছে। বংশ নিচু, কিন্তু সে খুব ভালো। বিয়ে করবি?”
“কে সে?”
“দ্রোহান। আমার সাথে কিশোর বয়স থেকে আছে সে। অনেক অনুগত আর ভালো।”
অগ্নীমা হকচকিয়ে সরে যায়।
“কি সব বলছো! তোমার ঘাড় থেকে আমাকে নামানোর জন্য যা খুশি বলবে?”
কায়ান হাত ধরে অগ্নীমার,
“আমি মানুষ চিনতে ভুল করি না। দ্রোহান তোর জীবনসঙ্গী হলে তুই আমার মতো সুখী হবি।”
“এসব হয় না। বাদ দাও। শুনো, তোমার বউকে দেখব। নিয়ে যাবে?”
কায়ান থমকায়। কোনো কথা বলে না।
অগ্নীমা হাত নেড়ে বলে,
“কি হলো?”
কায়ান মাথা নাড়ায়,
“কিছু না।”
“তুমি ভাবছো, আমি কোনো উদ্দেশ্য নিয়ে গিয়ে কিছু করব? ভয় পেয়ো না। আমি শুধু দেখব। সন্দেহজনক কিছু করব না, বা ক্ষতি করব না।”
“কি পরিচয় দেবো?”
“বলবে মামাতো বোন। নেবে?”
কায়ান মাথা ঝাঁকায়,
“নেবো।”
“কখন?”
তখনই দ্রোহান ঢুকে গুহায়। কায়ান অগ্নীমাকে বলে,
“আগে খেয়ে নিতে হবে। যদি তাড়াতাড়ি খেয়ে নিস, তবেই নিয়ে যাব।”
অগ্নীমা গোগ্রাসে খেতে থাকে। কায়ান হাসে অগ্নীমার পাগলামি দেখে। মনে মনে চায়, “অগ্নীমা, তুই স্বাভাবিক হয়ে যা। তোর কষ্ট দেখে আমারও খারাপ লাগে।”
দ্রোহানকে ডাক্তার সাজিয়ে কায়ান রাত্রেশ নিয়ে আসে প্রাসাদে। সঙ্গে অগ্নীমাও আসে। অগ্নীমাকে মানুষরূপে শাড়িতে দেখে দ্রোহান অবাক হয়ে মন্তব্য করে,
“আপনাকে কিন্তু অনেক সুন্দর লাগছে।”
অগ্নীমা মৃদু হেসে জবাব দেয়,
“তোমাকেও মানুষরূপে দুর্দান্ত লাগছে।”
কায়ান এক পলক একসাথে দেখে নেয় অগ্নীমা আর দ্রোহানকে। মনে মনে ঠিক করে, তোদের দুজনকে ভীষণ সুন্দর মানিয়েছে। তোদের আমি বিয়ে দেবই।
প্রাসাদে সন্ধ্যা নেমেছে। কক্ষে কক্ষে জ্বলে উঠেছে বাতি। রুদ্রাণীর মাথা ধরেছে। তিনি রুমে শুয়ে আছেন কম্বল মুড়ি দিয়ে। নজরুল একটু বাহিরে গেছেন। মেয়ে উনাকে বাহিরে যেতে দেয় না। পুরুষ মানুষ কতক্ষণ ঘরে থাকা যায়! নজরুল মেয়ের থেকে বিশেষভাবে অনুমতি নিয়ে বের হয়েছেন। আরশী মনে করে সঙ্গে দিয়ে দিয়েছে যাদুর ছোট্ট ছুরি। কাজের খালা রান্না করছেন। আরশীর আট মাস চলছে, বাচ্চা খুব নড়ে। যখন নড়ে তখন সে হাত দিয়ে ফিল করে আর হাসে। আরশী টেবিলে বসে ডায়রিতে সেটা লিখছে। সে তার বাবুর সাথে মনে মনে অনেক কিছু গল্প করে আর সেটা রোজ ডায়রিতে লিখে, যখন কায়ান বাসায় থাকে না। কায়ান দেখলে লজ্জা লাগবে তাই সে লুকিয়ে রাখে।
বাহিরে কথাবার্তা শুনে আরশী দ্রুত ডায়রি সরিয়ে ফেলে। দরজার সামনে এসে দাঁড়ায়। কায়ানের সঙ্গে আরও দুজনকে দেখে আরশী সরে দাঁড়ায়।
কায়ান রুমে ঢোকে। অগ্নীমা হাঁ চোখে তাকিয়ে থাকে আরশীর দিকে। সে চোখের পাতা ফেলে দীর্ঘশ্বাস ফেলে। আলতো হাতে চোখের কোনায় চলে আসা অনাকাঙ্ক্ষিত জল মুছে। মলিন হেসে কায়ানের দিকে তাকায়। কায়ান আরশীর কাছে পরিচয় করায়,
“আমার মামাতো বোন মৌ।”
আরশী হাসিমুখে স্বাগত জানায়। বসতে বলে। তারপর কায়ানকে বলে,
“আমার পরিচিত ডাক্তার নিয়ে এসেছি। তুমি তো চেনো তাকে। সে সদ্য জয়েন হয়েছে হাসপাতালে। সে তোমাকে চেকআপ করবে।”
আরশী রাকেশের সাথে হাসিমুখে কথা বলে,
“সেই যে গেলেন, আপনি আর আসার নাম নেই। এসে একটু ঘুরে তো যেতে পারেন।”
“সময় হয় না ভাবি। জব হয়েছে, কাজ বেড়েছে।
আর কথা না বাড়িয়ে রাকেশ চেকআপ করে আরশীকে। বলে,
“আরশী এবং বাচ্চা দুজনই সুস্থ আছে।”
আরশী উঠে রান্নাঘরে যায়। অগ্নীমাকে বলে,
“আমার সাথে চলো, গল্প করবে। ভালো লাগবে।”
অগ্নীমা সাথে যায়। প্রশ্ন করে আরহাম আর তার বিষয়ে—কীভাবে প্রেম হলো এইসব…..। আরশী আগ্রহ নিয়ে সব গল্প করে অগ্নীমার সাথে। অগ্নীমা চুপচাপ গিলে তা। তার বুক চিনচিন ব্যথা করে।
আরশী নিজের হাতে নাশতা বানায়। রুদ্রাণী ঘরে শোয়া ছিলেন। কথাবার্তা শুনে তিনি আসেন। আরশীকে রাঁধতে দেখে বকেন,
“তুই এসব কেন করছিস? কাজের খালা তো আছেন!”
“আমি নিজ ইচ্ছেয় করছি মা।
“না, এ সময় এসব করতে হবে না। তুই যা, মেহমানদের সাথে গল্প কর। আমি সব রেডি করে নিয়ে আসছি।”
আরশী রুমে আসে। কায়ান, দ্রোহান, অগ্নীমা, আরশী মিলে গল্প করে। অগ্নীমার খুব ভালো লেগে যায় আরশীকে। সে কায়ানকে আড়ালে বলে,
“তোমার বউ সত্যি অতুলনীয়। কি সুন্দর দেখতে। কি নমনীয় তার ব্যবহার। আমি মুগ্ধ। তুমি কেন এত ঘায়েল হয়েছো, এবার বুঝতে পারছি।”
অগ্নীমার মুখ থেকে এসব পজেটিভ কথা শুনে কায়ান খুশি হয়।
আরশী রাতে কাউকে আর যেতে দেয় না। বলে,
“রাতটা থেকে যাও প্লিজ।”
কায়ান চোখ ইশারা করলো বাকি দুজনকে, বলল—
“থাকো।”
________
মাঝরাতে ঘুম ভাঙে আরশীর। বড্ড প্রস্রাবের বেগ পেয়েছে তার। আরহাম বলেছে ওয়াশরুমে যেতে হলেও তাকে ডেকে তুলতে। আরহামকে ঘুমাতে দেখে মায়া লাগে আরশীর। সে আর ডাকে না। রুমেই তো ওয়াশরুম। খামাখা কেন ডাকতে হবে।
আরশী ধীরে ধীরে পা নামায় খাট থেকে। সাবধানতার সঙ্গে ওয়াশরুমে ঢোকে। বের হয়ে শুতে যাবে তখন শুনে দরজায় রুদ্রাণী ডাকছেন। আরশী একটু দাঁড়ালো। রুদ্রাণী তিন চারবার ডাকলে মায়ের কিছু হলো কিনা ভেবে আরশী দরজা খুলে। জিজ্ঞেস করে,
“কি হয়েছে মা?”
রুদ্রাণী কেঁদে ফেলেন। আরশী ভয় পেয়ে যায়।
“মায়ের কি হলো হঠাৎ? কি হলো মা? বলো? কাঁদছো কেন?”
রুদ্রাণী হাত ধরে সিঁড়ির দিকে টানেন আরশীকে।
আরশী “আহ” করে বলে,
“লাগছে মা, আমাকে টেনো না। আমি ধীরে আসছি। আগে বলো কি হয়েছে? বাবার কিছু হয়েছে? তোমার জামাইকে ডাকব।”
রুদ্রাণীর নামে সামনের মানুষটা পেছনে ফিরে তাকাবার আগে, কথা বলবার আগে—আরশী আরেকটা গলা শুনতে পায় উপর থেকে,
“ওখানে কার সাথে কথা বলিস আরশী?”
আরশী কেঁপে উঠে। তার শরীর বরফের ন্যায় ঠান্ডা হয়ে যায়। উপর থেকে মায়ের গলা ভেসে আসছে। তাহলে সামনের মানুষটা কে?
আরশী বাম হাত দিয়ে সিঁড়ির রেলিং ধরে। আরেকটা হাত ওই মানুষটা ধরে আছে। আরশী বলে,
“তুমি কে? মা তো…?”
মানুষটা পেছনে ফিরে তাকাতেই আরশী এক চিৎকার করে ওঠে। এত ভয়ংকর তার রূপ! উপরে দুটো শিং, চোখ দুটো অগ্নিবর্ণ, মুখটা দানবের মতো বিকৃত, ভয়ংকর। মানুষটা ভয়ানক কণ্ঠে বলে,
“চলে আয় আমার সাথে।”
বলে হেঁচকা টান দেয়।
তখনই আসল রুদ্রাণী হাত লম্বা করে আরশীকে সরিয়ে আনেন। আরশী ততক্ষণে জ্ঞান হারিয়ে ফেলে। ভয়ংকর দানবটা সঙ্গে সঙ্গে উধাও হয়ে যায়।
রুদ্রাণী চিন্তায় অস্থির হয়ে উঠেন। কে এমন লুকানো যে আরশীর ক্ষতি চায়? এই রাক্ষস মহিলাটা কে? সর্দার কায়ান আবার আরশীকে নিয়ে যেতে এই মহিলাকে পাঠাননি তো? কী বিপদ। কি বিপদ।
আমি কীভাবে এখন আমার মেয়েকে রক্ষা করব? যদি ঘুম না ভাঙতো, টের না পেতাম তাহলে আজই হারিয়ে ফেলতাম আমার মেয়েকে।
রুদ্রাণী আরশীকে নিয়ে রুমে যান। মুখে পানি ছিটিয়ে আরহামকে ডাকেন। আরহাম উঠে আরশীকে সেন্সলেস দেখে ঘাবড়ে যায়।
“কি হয়েছে মা ওর?”– জিজ্ঞেস করে রুদ্রাণীকে।
রুদ্রাণী বলেন,
“আমার হঠাৎ ঘুম ভাঙলো বাহিরে কারো কথায়। বের হয়ে দেখি আরশী সিঁড়িঘরের ওদিকে কার সাথে কথা বলতে বলতে নামছে। পিছু নিয়ে দেখি সে অজ্ঞান হয়ে পড়ে আছে।”
রুদ্রাণী রাক্ষসের কথা লুকালেন আরহাম ভয় পাবে বলে।
আরহাম চিন্তিত হয়ে পড়ে। কে ক্ষতি করতে চাইলো আরশীর?
আরশীর তখন জ্ঞান ফিরে। চিৎকার করে উঠে সে। মাকে জড়িয়ে ধরে কাঁপতে থাকে। আরহাম, রুদ্রাণী দুজন জিজ্ঞেস করেন,
“কি হয়েছে? এত রাতে বাহিরে কেন গিয়েছিলে তুমি?”
আরশী বলে,
“আমি শুনলাম দরজায় তুমি ডাকছো মা। কয়েকবার ডাকলে বের হই। তুমি কান্না করছিলে, সিঁড়ি অব্দি তুমি আমাকে সাথে নিয়ে গেলে—পরে দেখি তুমি আবার উপর থেকে কথা বলতেছ। আমি ভয় পেয়ে যাই। পরে ওই মানুষটা আমার দিকে তাকালে দুনিয়া ওলটপালট হয়ে যায় আমার। কি ভয়ংকর ও মা! ও মানুষ না, অন্য কিছু…”
কেঁদে উঠে আরশী।
“কে আমার ক্ষতি চায় মা? সেদিনও ভয় পেলাম আর আজ কত বড় ঘটনা ঘটলো। ওই জন্তু তোমার মতো রূপ আর কণ্ঠ হলো কি করে?”
আরহাম বুঝে ব্যাপারটা। নিশ্চয়ই কোন রাক্ষস রুদ্রাণীর রূপ নিয়ে আরশীকে নিয়ে যেতে চাইছিল। কিন্তু কে সেটা? কে?
আরহামের রাগ প্রচণ্ড বাড়ে।
“কার এত বড় সাহস আমার বউয়ের দিকে হাত বাড়ায়!”
সে রুদ্রাণীকে বলে,
“আপনি ওর কাছে থাকুন। আমি বাহির দেখে আসছি।”
আরশী তবু টের পায়, ভয়ংকর কেউ তার আর তার বাবার পেছনে লেগে আছে। হয়তো রাক্ষসদের কেউ হবে। কিন্তু আরহামকে বলে না। আরহাম বাহিরে যেতে চাইলে শাড়ি আঁকড়ে ধরে আরশী বলে,
“আপনি যাবেন না বাহিরে। বিপদ হবে।”
আরহামের রাগ নিয়ন্ত্রণ হচ্ছে না। সে আরশীর কথাকে গুরুত্ব দেয় না। বাহিরে যায়।
আরশী আবার হাত বাড়িয়ে ধরতে চাইলে রুদ্রাণী থামালেন,
“যেই হোক, আমি উপস্থিত আছি—এখন আর ফিরে আসবে না।”
আরহাম চারপাশ দেখে অগ্নীমার ঘরে যায়। ঘুমন্ত অগ্নীমাকে ডেকে তুলে। খাঁকাতে থাকে,
“ভান ধরছিস ঘুমের? আমার বউয়ের পেছনে লাগার জন্য এসেছিস? মেরে ফেলব তোকে, ওর ক্ষতি করলে!”
অগ্নীমা চোখ কচলে তাকায়। সে কায়ানের কথার আগাগোড়া কিছুই বুঝতে পারছে না।
“আমি তো তখন থেকে ঘুমাচ্ছি। কায়ান, কি বলছো তুমি? আমি ক্ষতি করব কেন? পেছনে লাগব কেন?”
— ঘুমের ভান করছিস? আমাকে বোবা ভাবছিস?
— আমি সত্যি বুঝতে পারছি না কায়ান, কি করেছি আমি?
— আমার বউকে ঘর থেকে ডেকে এনে নিয়ে যেতে চাইনি?
অগ্নীমা মাথা ঝাঁকায়,
— না তো!
কায়ানের মেজাজ আরও গরম হয়। দুহাত দিয়ে শক্ত করে ধরে অগ্নীমার দুগাল,
“মিথ্যে বলবি না! তুই আমাকে পাওয়ার জন্য এসব করতে পারিস!”
অগ্নীমা কেঁদে ওঠে,
“আমার লাগছে… ছাড়ো…”
দ্রোহান তখন হাজির হয়। বলে,
“সর্দার, ছাড়ুন। লাগছে উনার।”
অগ্নীমার চোখের পানি ঝরঝর করে পড়ে।
কায়ান ছাড়ে। জহুরি চোখে দেখে অগ্নীমাকে। বিশ্বাস করতে পারছে না সে। এই রাতে আরশীর কে শত্রু হতে পারে? সন্দেহের তীর অগ্নীমার দিকেই।
সকাল হলেই অগ্নীমাকে বিদায় করতে হবে। আরশীর ধারেকাছেও থাকতে দেবে না সে।
কায়ান চলে যায়।
অগ্নীমা ফুপিয়ে কাঁদে। দ্রোহানকে বলে,
“বিশ্বাস করো, আমি কোন ক্ষতি করিনি। কিচ্ছু করিনি। তখন থেকে ঘুমাচ্ছি। কায়ান কেন আমাকে দোষী করছে? তার বউয়ের হয়েছে কি?”
দ্রোহান শান্ত গলায় বলে,
“কি হয়েছে আমিও জানি না। তবে মনে হচ্ছে কেউ সর্দারনীর ক্ষতি করতে চাইছে। আপনি সর্দারকে ভালোবাসেন তো—তাই তিনি আপনাকে সন্দেহ করছেন। তবে আমি বিশ্বাস করি আপনাকে। আপনি কিছুই করেননি।”
চলমান…..!
