#কাজিন_ম্যারেজ_ডট_কম
#সূচনা_পর্ব
লেখনীতে: #তিয়াশা_চৌধুরী
❝ওহে যুবক, বিয়ে করুন।❞
ঘরের চারপাশে একই পোস্টারের ছড়াছড়ি। আলমারী, টেবিল, খাট, দেয়াল কিছুই বাদ যায়নি এই পোস্টারের হাত থেকে। নিজের রুমের অবস্থা দেখে দীর্ঘশ্বাস ফেলল শান্ত। একে-একে চোখ বুলালো সবগুলো কাগজে।
এইবারে টের পেলো, সব কাগজে আসলে একই জিনিস লেখা নয়। মাঝে-মাঝে ভিন্নতাও আছে। সাদা কাগজের উপরে বড়বড় করে এসব লিখে সর্বস্থানে সাজিয়ে রাখা হয়েছে।
এরমধ্যে বিশেষ একটা ছন্দ নজর কাড়লো শান্তর। কাছাকাছি গিয়ে ভালোভাবে পড়লো সেটা। গোটা-গোটা অক্ষরে লেখা,
❝দেখতে দেখতে বয়স তোমার হয়ে এলো আটাশ।
এবারেও ঘরে বউ না আনলে তুমি একটা কুমড়ো-পটাশ।❞
বলা বাহুল্য, এক দেখায় হাতের লেখা চিনে ফেলল শান্ত। মিমি ব্যতীত অন্য কারো কাজ হতেই পারে না। ছন্দটা পড়তে পড়তে মুচকি হাসি ফুটলো শান্তর মুখে। আপনমনে বলল,
-“সবে আঠারো পেরিয়ে উনিশেই তো পড়লো। এখনই আমাকে বিয়ের জন্য উসকে দিচ্ছে। দাঁড়া, তোর শখ আমি পূরণ করি।”
ঘড়ির কাঁটা টিকটিক করে বারোটার ঘরে পৌঁছাতেই সকলে হাজির হলো শান্তর ঘরে। একযোগে চেঁচিয়ে উঠলো,
-“হ্যাপি বার্থডে টু ইউ.. হ্যাপি বার্থডে টু ইউ, ডিয়ার শান্ত ভাইয়া।”
মিমির বড় বোন ফিহার হাতে একটা বড়সড় কেক। ডিজাইন খুব একটা নিঁখুত নয়। বোঝাই যাচ্ছে, বাড়িতে বানানো। ফিহা সেটা শান্তর দিকে বাড়িয়ে বলল,
-“নাও ভাইয়া, তোমার বার্থডে কেক। কেটে আমাদের ধন্য করো।”
-“এখানেই? ডাইনিং রুমে গিয়েও তো কাটা যাবে।”
মিমি সাথে সাথে বলল,
-“সেটাই তো আমি আপুকে বলছিলাম। ওরা আমার কথা শুনলোই না। ভেতরে নিয়ে চলে এলো। সবাই চলো, ডাইনিং এ গিয়েই কেক কাটা হোক।”
কাজিনমহলের সকলে বের হতে নিয়েছে, তৎক্ষনাৎ শান্ত বলল,
-“এক মিনিট। কেক নিয়ে ওখানে দাঁড়িয়ে থাকবি না। টেবিলে কেকটা রেখে আমার রুমে আয়। কথা আছে।”
ফিহা সম্মতির সুরে মাথা নেড়ে বেরিয়ে গেলো রুম থেকে। ঘুণাক্ষরেও টের পেলো না শান্তর ফন্দি। কেক রেখে ফিরে এলো খুশি খুশি। সেই মুহূর্তে শান্ত ঘোষণা দিলো,
-“তোরা সবাই মিলে যেভাবে আমার রুমের বারোটা বাজিয়েছিস, সেভাবেই সবাই মিলে এখন আমার রুম পরিষ্কার করবি। শুরু কর কাজ।”
তব্ধা লেগে গেলো সবাই। নিজের জন্মদিনের দিনও যে শান্ত এমন কাজ করবে, তারা ভাবতেও পারেনি। পাশ কাটানোর জন্য সুন্দরমতো সব চাপিয়ে দিলো মিমির ঘাড়ে,
-“এই বুদ্ধি আমাদের কারো না। এগুলো মিমির বুদ্ধি। মিমি সব পরিষ্কার করবে। আমরা নেই।”
মিমি প্রতিবাদ করলো,
-“এ মা? সব আমার উপর চাপিয়ে দিচ্ছো কেন? তোমরা কিছু করো নি? কাজ বাড়িয়েছো তোমরা, আর ফাঁসবো আমি?”
শান্তর বোন সিঁথি মিমির কাছাকাছি এসে চাপা স্বরে বলল,
-“আমরা কেন পরিষ্কার করবো? ভবিষ্যতে এটা তোর রুম হবে, তুই পরিষ্কার কর। আমরা এসবে নেই।”
নিজেদের কথা শেষ করে একে-একে বেরিয়ে গেলো সবাই। শান্তও বাঁধা দিলো না। ঘরখানা খালি হওয়ার পরই মিমি বলল,
-“তুমি ওদেরকে কিছু বললে না কেন? সবাই যে আমার উপরে দোষ চাপিয়ে পালিয়ে গেলো?”
শান্ত প্রতিত্তোরে বলল,
-“কারণ আমি জানি, এসব বুদ্ধি তোরই।”
মিমি আমতা-আমতা করে বলল,
-“কিন্তু আমি তো কাগজে বার্থডে উইশ লিখতে বলেছিলাম। ওরা বিয়ের কথা লিখেছে। এটা আমার দোষ হলো?”
শান্ত মিমির লেখা ছন্দটা সামনে ধরলো। ভ্রু উঁচিয়ে জিজ্ঞেস করলো,
-“তাহলে এই ছন্দটা?”
মিমির সব সাজানো কথা-বার্তা তালগোল পাকিয়ে গেলো। উত্তর না দিয়ে একে একে সবগুলো কাগজ ছুটিয়ে হাতে নিলো। এরপর রুম থেকে বের হতে যাবে, তখন পিছু ডাকলো শান্ত। বলল,
-“আমার হাতেরটা কে নেবে?”
মিমি ঘুরে এগিয়ে এলো শান্তর দিকে। হাত বাড়িয়ে গোমড়ামুখে বলল,
-“দাও।”
শান্ত কথা না বাড়িয়ে দিয়ে দিলো। অতঃপর বলল,
-“তুই চাস আমি বিয়ে করি?”
মিমির শিরদাঁড়া বেয়ে যেন বরফশীতল স্রোত বয়ে গেলো। শিউরে উঠে কাগজটা নিয়ে বলল,
-“আমি জানি না।”
বলেই উত্তরের অপেক্ষা না করে ছুটে রুম থেকে বেরিয়ে গেলো।
*********
শান্তর জন্মদিন উপলক্ষে সব কাজিনরা এসে হাজির হয়েছে ফুপুর বাসায়। শান্তর বড় মামার এক ছেলে সুজন ও এক মেয়ে সাবিনা। আর ছোট মামার তিন মেয়ে। ফিহা, তিশা, মিমি। মিমির সাথে শান্তর লুকোচুরি সম্পর্কটা পরিবারের কারোই অজানা নেই। তলে-তলে বিয়েও ঠিক করে রেখেছে দু’জনের। অপেক্ষা করছেন এখন ছেলে-মেয়ের নিজ থেকে স্বীকার করার। কিন্তু তারা তো নিজেরাই একে-অপরের কাছে মনের কথা প্রকাশ করতে পারছে না।
আজ জন্মদিনের পর মোক্ষম সুযোগ এসে ধরা দিলো। সুজন বুঝালো, জন্মদিনটাকে স্মরনীয় করে রাখতে বিশেষ কিছু করাই যায়। সেটা হতে পারে, মনের কথা ব্যক্ত করা থেকেই। একপাক্ষিক সুজনের বক্তব্য শেষ হওয়ার পর শান্ত বলল,
-“সম্ভব না। তোর বোন বেহুশ হয়ে যাবে। এরপর আমার নামে একটা বদনাম রটে যাবে।”
কপাল চাপড়ালো সুজন,
-“তুই কি বোকা? এমন সুযোগ হাতছাড়া করে কেউ? যেখানে পরিবারের সবাই রাজী আছে।”
-“পরিবারের সবাই রাজী আছে তো বিয়ের কার্ড ছাপাচ্ছে না কেন? জেনে-বুঝে নাটক করছে সবাই। যত্তসব।”
-“তুইও তো একই কাজ করছিস। বোল দে দিল কি বাত! এরপর বিয়ের কার্ড ছাপানোর দায়িত্ব আমার।”
শান্ত তপ্ত শ্বাস ঝেড়ে বলল,
-“পারবো না।”
সুজন বুদ্ধি দিলো,
-“আচ্ছা, এক কাজ করি চল। সবাই মিলে ট্রুথ এন্ড ডেয়ার খেলি। তুই সুযোগমতো মনের কথা বলে দিস।”
শান্ত এই প্রস্তাবও নাকচ করে দিলো। কিন্তু সকলের জোরাজুরিতে বেশিক্ষণ টিকতে পারলো না। যাকে ঘিরে জন্মদিনের আয়োজন, সেই যদি অংশগ্রহণ না করলো, তাহলে কেমন হয় ব্যাপারটা?
অগত্যা বসতে হলো শান্তকে। ড্রইংরুমে গোল হয়ে বসে খেলায় ডুবেছে সবাই। মাঝখানে একটা বোতল রাখা। ঘোরানোর পর বোতলটা যার দিকেই থামছে, তাকেই ট্রুথ অথবা ডেয়ার বেছে নিতে হচ্ছে। অধিকাংশই বেছে নিচ্ছে ট্রুথ।
অবশেষে এলো শান্তর পালা। বোতল তার দিকে মুখ করে থামতেই সবাই একযোগে “ডেয়ার” বলে চেঁচিয়ে উঠলো। সে নিলোও ডেয়ার। অমনিই গলা খ্যাঁকাড়ি দিয়ে সুজন বলে উঠলো,
-“একটা গান প্লিজ, গায়ক সাহেব।”
সবাই হৈচৈ করে উঠলো। অর্থাৎ সবাই এই শর্তে সহমত। শিমা দৌড়ে গিয়ে গিটারও এনে দিলো। শান্ত গিটার হাতে নিলো ঠিকই, তবে বসে রইলো থম মেরে। কিয়ৎক্ষণ বাদে সবার অপেক্ষার সমাপ্তি ঘটিয়ে গেয়ে উঠলো,
-“তোর প্রেমেতে অন্ধ হলাম,
কি দোষ দিবি তাতে?”
কেবল দুটো লাইন। এরপর আর একটা শব্দও উচ্চারণ করতে পারলো না বেচারা। সবাইকে থমকে দিয়ে মিমি ফট করে বলে বসেছে,
-“চরিত্রের দোষ।”
চলবে,,
