#মাস্টার_মশাই
#শারমিন_আহমেদ_নৈঋতা
#শেষ_পর্ব
______________
৮.
ঘড়ির কাঁটায় ন’টা বাজে। রাতের নিস্তব্ধতা ঘিরে রয়েছে পুরো বাড়িটা। বারান্দার রেলিঙের ওপর বসা মিনি, ওর ছোটো ছোটো চোখজোড়া স্থির হয়ে আছে বাইরে। অন্ধকারে মৃদু জ্বলছে আরও এক জোড়া চোখ। বারান্দা থেকে একটু দূরে দাঁড়িয়ে আছে একটা পুরুষ বিড়াল। মিনিকে ডাকছে সে। মিনির সাথে বন্ধুত্ব করতে এসেছে। মিনি ড্যাবড্যাব করে ওর দিকে তাকিয়ে আছে। নিজের মতো আরেকটা বিড়াল দেখে কিছুটা ভয় পাচ্ছে সে। বিড়ালটা তাকে ডাকলো। মিনির গাঁয়ের পশম দাঁড়িয়ে গেল। ওদের দুজনার মাঝে অল্প একটু দূরত্ব; পুরুষ বিড়ালটি মানুষের ভয়ে এগুচ্ছে না। সে ঠাই দাঁড়িয়ে আছে। মিনি রেলিঙ থেকে লাফিয়ে পড়লেই পুরুষ বিড়ালটির কাছে যেতে পারবে। মিনি একপলক পুরুষ বিড়ালের দিকে তাকিয়ে আবার মাথা ঘুরিয়ে আলোর দিকে তাকায়। আলো ঘরের ভেতর কি যেন করছে। মিনি সন্দিহান হয়ে পড়ে। সে ওই পুরুষ বিড়ালটির কাছে যাবে কী যাবে না? ভাবতে থাকে। সহসা ডাক পড়ল আলোর। সঙ্গে সঙ্গে মিনি লাফিয়ে পড়ে। নাহ! সে বাইরে যায়নি বরং পুরুষ বিড়ালটিকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে ভেতরে চলে গেল। আলো ওকে খেতে দেয়। সে পা গুটিয়ে বসে আরামসে খেতে লাগলো। পাশে সৌরভ ও আলোও খেতে বসেছে। আলো বাঁ হাতে মিনির মাথার হাত বুলিয়ে বলল, ‘তোকে ভাজা মাছ আরেকটা দিই?’
মিনি যেন ওর কথা বুঝতে পারে। সে পরপর দুবার চোখের পলক ফেলল। অমনি তাকে আরেকটা মাছ দেয় আলো। সৌরভ ওদের দিকে তাকায়। ভাতের সাথে তরকারি মাখাতে মাখাতে আলোর দিকে তাকিয়ে, সে বলল, ‘হেরে মা তুই কি এই বছর আর ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হবি না? ভর্তির আর এক মাস আছে। আর কত দিন গেলে এডমিশন নিবি। বল!’ প্রশ্ন করে মেয়ের মুখে দিকে তাকিয়ে রইল সৌরভ। আলোর সেদিকে কোনো আগ্রহ নেই। সে মিনিকে মাছ দিয়ে নিজে খেতে বসল। সৌরভ আবারও বলল, ‘আমার যে স্বপ্ন—তুই পড়াশোনা শেষ করে মস্ত বড়ো এক মানুষ হবি। অনার্স কমপ্লিট করে মাস্টার্স করতে ইতালি যাবি। অথচ তুই কি-না আমার কথার গুরুত্ব ই দিচ্ছিস না। ওই য হোস্টেল ছেড়ে এলি তারপর থেকে থ হয়ে বসে রয়েছিস। কি হয়েছে বলবি তো আমাকে। না বললে বুঝব কী করে?’
আলো মাথা তুললো। একপলক দু’পলক তাকিয়ে রইল। তারপর ভাবলেশহীন গলায় বলল, ‘কি বলব? আমার কিছুই হয়নি। তুমি আমাকে নিয়ে অহেতুক চিন্তা করো। আর চিন্তা করতে হবে না, এই মাসেই এডমিশন নেবো। তোমার ইচ্ছা ই পূরণ করব।’
সৌরভ খুশি হয় খুব। সৌরভ মমতা মাখানো গলায় বলল, ‘আমি তোর জন্য সবসময় দোয়া করি। আল্লাহ তোকে উঁচু মাকাম দান করুক।’
‘আমিন।’ মাথা নিচু করে নরম স্বরে বলল আলো।
৯.
আলো আবারও হোস্টেলে উঠল। সে খুব ভোরে উঠে পড়ার টেবিলে বসে পড়তে শুরু করে। খোলা জানালা দিয়ে হু হু করে ঠান্ডা বাতাস ঢুকছে৷ ঠান্ডায় দাঁতে দাঁত কটমট শব্দ হচ্ছিল। জানালা বন্ধ করে আবারও পড়তে লাগল। যে করে হোক মাস্টার মশাই এর ইচ্ছা তাকে পূরণ করতেই হবে। আলো মরিয়া হয়ে পড়াশোনা করতে লাগে। সে মাঝেমধ্যে ভয়ে কুঁকড়ে যেতো। মনে মনে নিজেই নিজেকে প্রশ্ন করতো, ‘আমি পারব তো?’ মন ক্লান্ত হয়ে বসে পরতো। তারপর আবারও উঠে দাঁড়াতো। তাকে পারতেই হবে। মাস্টার মশাই এর অনুপ্রেরণা তার শক্তি। চার বছর দেখতে দেখতে কেটে গেল। পরীক্ষার রেজাল্ট দেখে কিছুক্ষণ স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল আলো। পরক্ষণেই খুশিতে লাফিয়ে উঠল। দুচোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ে আনন্দে। মাস্টার মশাই কে জড়িয়ে ধরে সে বলল,
‘মাস্টার মশাই আমি পেরেছি। এবার আমাকে আর কেউ আটকাতে পারবে না। আমি স্বাধীন হয়ে উড়ব আকাশে। আরও একটা স্বপ্ন আছে। সেটাও পূরণ করব। আমি তোমার ইচ্ছা পূরণ করব!’
_____________
আলোর জীবনে নতুন আলোর ঝলকানি নেমে এলো। ইতালির একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে সে স্কলারশিপ পেয়েছে। ইমেইল পাওয়া মাত্র কান্না করে বুক ভাসিয়েছে। কান্না করে বুক ভাসিয়েছে সৌরভও। তার যে স্বপ্ন পূরণের পথে।
বিদেশে যাওয়ার দিন। এখন বিকেলবেলা। ৪ টায় আলোর ফ্লাইট! বিশাল শহরের বাসস্ট্যান্ডে এসে নামলো ওরা৷ স্যুটকেসটা হাতে নিয়ে চলছে সৌরভ তার পাশে হাঁটছিল আলো। সৌরভ বারবার আলোর মুখের দিকে তাকাচ্ছিল। সে বলল, ‘মন খারাপ নাকি ভয় করছে?’
আলো এক নিঃশ্বাসে বলল, ‘দুটোই।’
সৌরভ হেসে বলল, ‘মন খারাপ করিস না। কয়েক দিনের ব্যাপার মাস্টার্স করে আবার চলে আসবি। আর আল্লাহর কালাম সাথে থাকলে ভয় পাওয়ার কিছু নেই। মনে মনে দোয়া পড়বি। সব কিছু স্বাভাবিক লাগবে।’
আলোর চোখে জল জমে উঠল। সৌরভ বলল, ‘বিদেশ যাচ্ছিস রে মা৷ ওখানে তুই ই সব। তোর সবকিছু নিজেকেই করতে হবে। যেমনটা হোস্টেলে করতিস। আমি জানি কোনো কিছুই তোর জন্য কঠিন না৷ তুই সব সামলে নিবি। টাকার প্রয়োজন হলে আমাকে কল করবি। আর সাহস হারাবি না। আল্লাহ সবসময় তোর সাথেই আছেন।’
আলো তার মাস্টার মশাই কে জড়িয়ে ধরল। আশেপাশের মানুষ ফ্যালফ্যাল চোখে তাকিয়ে তাদের দেখে, সৌরভ তাদের দিকে তাকিয়ে হালকা হেসে বলল, ‘আমার মেয়ে আজ বিদেশ চলে যাবে। তাই একটু কাঁদছে।’
তারা আবার নিজেদের মতো চলতে শুরু করে। আলো কাঁদতে কাঁদতে বলল, ‘তোমাকে ছেড়ে যেতে আমার খুব কষ্ট হচ্ছে বাবা।’
সৌরভের বুকের ভেতর ধুক করে উঠল। চোখে জল জমলো। এতগুলো বছর সে যে ডাক আলোর মুখে শুনতে চেয়েছিল আজ তা সে শুনলো। আজ যে খুশির সীমা রইল না সৌরভের। সে কাঁদতে লাগল। বাবা-মেয়ে রাস্তায় দাঁড়িয়ে কাঁদছে। কী অদ্ভুত দৃশ্য। সৌরভ মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে বলল, ‘তোর ফ্লাইটের দেরি হয়ে যাবে মা। জলদি চল।’
১০.
ইতালির ছোট্ট একটি শহরে আলোর ডরমেটরি। এক সপ্তাহ হয় সে ইতালিতে এসেছে। এরইমধ্যে রুমমেট দুজনের সাথে ভালো বন্ধুত্ব হয়েছে তার। তারা অন্য দেশের মানুষ। আলো রোজ সকালে এক কাপ কফি নিয়ে বসে জানালার সামনে। তারপর অনেকক্ষণ বাইরে তাকিয়ে থাকে। জানালার বাইরে দূরের পাহাড়গুলোর উপর সূর্যের সোনালি রোদ জ্বলজ্বল করছে। রাস্তায় মানুষ জন সকাল সকাল হাঁটতে বেরিয়েছে। আলো জানালার পাশে বসে তাদেরকে দেখে অদৃশ্য সুখ অনুভব করে। এক চুমুক কফি খেয়ে, গভীর শ্বাস নেয় আলো। তার নতুন জীবন ভালোই কাটছিল হঠাৎ করে আপদ হয়ে এন্ট্রি নিলো সাদ। ওর মুখোমুখি হতে হবে বলে আজও ইউনিতে যেতে মন চাইছে না আলোর। তবু সে গেল। ইউনির সামনেই দাঁড়িয়ে আছে সাদ। সে আলোকে আসতে দেখে মিষ্টি করে হাসলো। তারপর একটা গোলাপ তার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে সাদ মিষ্টি কণ্ঠে বলল, ‘আই লাই ইউ অ্যালো।’
সাদ মুসলিম ঘরের ছেলে। জন্মের পর থেকে ইতালিতে বাস। তাই বাংলা খুব একটা পারে না। ওর আধভাঙা বাংলা শুনে মেজাজ খারাপ হয় আলোর। আলো গভীর শ্বাস নিল। আজ সে কিছু কড়া কথা সাদকে শুনিয়ে দেবে। একটা মানুষের পেছনে এত ঘোরার কী আছে? হেহহ! নির্লজ্জ ছেলে। সে মনে মনে একবার কথাগুলো গুছিয়ে নিল। তারপর বলল, ‘সত্যি ভালোবাসো?’
সাদ দুবার মাথা নাড়ল। আলো পূনরায় জিজ্ঞেস করল, ‘আচ্ছা তাহলে বলো ভালোবাসা কী?’
সাদ দেনা মোনা করতে লাগল। এক কথায় সে বলতে পারলো না। ভালোবাসা আসলে কী? আলো মৃদু হাসল। তারপর শান্ত গলায় বলল, ‘ভালোবাসা এত সহজ জিনিস না। এটা খুব জটিল বস্তু! শুধু মুখে দু চারটে শব্দ উচ্চারণ করলেই ভালোবাসা হয়ে যায় না। ভালোবাসার জন্য মন থেকে ভালোবাসা উপলব্ধি করতে হয়। যতক্ষণ ভালোবাসা উপলব্ধি না করা হয়, ততক্ষণ মনে টান আসে না। আর মনের টান না থাকলে সেখানে ভালোবাসা ও থাকে না।’
সাদ কণ্ঠ স্বর নরম করে বলল, ‘আমি তোমাকে প্রপোজ করলাম আর তুমি তা পরোক্ষভাবে প্রত্যাখান করলে।’
আলো আবারও হাসল। সে অদ্ভুত কণ্ঠে বলল, ‘মানুষ বড়ো স্বার্থপর সাদ! এরা শুধু নিজের স্বার্থ টুকুই বোঝে। মানুষ তার শখের মানুষকে পেয়ে গেলে অবহেলা করে আর না পেলে সারা জীবন আফসোস করে। পেয়ে অবহেলা করার চেয়ে সারাজীবন আফসোস করা ঢের ভালো।’ আলো একটু থামলো। দম নিয়ে সে ফের বলল, ‘আমাকে ভালোবেসো না। কোনো লাভ হবে না। আমি এতদূর দেশে ভালোবাসি করতে আসিনি। আমি এসেছি, আমার মাস্টার মশাই আমার বাবার স্বপ্ন পূরণের জন্য।’
আলো সেদিন সাদের থেকে পিছু ছাড়িয়ে নিল। তারপর মন লাগিয়ে পড়ালেখা করতে লাগল। যে করে হোক বড় মানুষ হতে হবে তাকে। প্রতিদিন চারবার করে মাস্টার মশাই এর সাথে ফোনে আলাপ করে সে। প্রতিটা কথার শেষে বাবা বাবা বলে ডাকে৷ আর বলে, ‘যতোই বাবা ডাকি ততই ডাকতে ইচ্ছা করে, এত ডাকি তবু মন ভরে না।’
সৌরভ মাস্টার হাসেন। তার স্বপ্ন পূরণ হয়েছে। আর কোনো ইচ্ছে অপূর্ণ নেই তার। এবার মেয়েটার একটা বিয়ে দিতে পারলেই তার শান্তি।
(সমাপ্ত)
