#_চন্দ্রবিন্দু_
#_মারিয়া_রশিদ_
#_পর্ব_৯_
রাত অনেকটা গাঢ় হয়ে এসেছে। শহরের কোলাহল থেমে গিয়ে চারদিকে নেমে এসেছে এক অদ্ভুত নীরবতা। সেই নীরবতার মাঝেই স্নেহা নিজের রুমে বসে আছে। টেবিল ল্যাম্পের ক্ষীণ আলোয় তার মুখটা আরও ক্লান্ত, আরও বিষণ্ন দেখাচ্ছে। ঘুম যেন চোখের পাতায় এসে দাঁড়িয়ে থেকেও ফিরে যাচ্ছে, হয়তো রাহুলের স্মৃতির ভিড়ে জায়গা পাচ্ছে না।
সেইদিনের পর থেকে রাহুল আর একবারও তাকে ফোন করেনি, কোনো যোগাযোগ করেনি। এই নীরবতা কি বিদায়ের ইঙ্গিত? রাহুল কি সত্যিই চলে গেছে? তাকে ফেলে রেখে? ঠোঁটের কোণে এক ঝলক তাচ্ছিল্য হাসি ফুটে ওঠে স্নেহার, নিজেরই প্রতি যেন এক তীব্র বিদ্রূপ। নেহাল চলে যাওয়ার পর তার জীবনটা যে কতটা ফাঁকা হয়ে গিয়েছিলো, তা সে কারও কাছে বলার মতো কথাও খুঁজে পেতো না। ঠিক সেই সময়েই রাহুল এসেছিল তার জীবনে। চুপচাপ, ধীরে ধীরে, কোনো শব্দ না করেই সে স্নেহার একাকিত্বে আলো ফেলেছিল। স্নেহা বুঝতে পারছিলো, রাহুল তার প্রতি দুর্বল হয়ে পড়ছে। কিন্তু সে কি কখনো ভাবতে পেরেছিলো, রাহুল তাকে তার দাদীর কাছে নিয়ে যাবে, তাকে নিজের জীবনে জায়গা দেওয়ার চেষ্টা করবে? না, সেটা সে কোনোদিন কল্পনাও করেনি।
চাইলেই স্নেহা রাহুলকে গ্রহণ করতে পারতো, হাজার বার পারতো। কিন্তু কেন পারলো না? প্রশ্নটা যেন বুকে এক অদৃশ্য ভার হয়ে চেপে আছে। উত্তরটা সে খুব ভালোভাবেই জানে ভ’য়। যদি রাহুলও নেহালের মতো তাকে ভে’ঙে দেয়? যদি আবার প্র’তা’র’ণা, বে’ইমা’নি তার জীবনের দুয়ারে দাঁড়ায়? তাহলে স্নেহা ভে’ঙে পড়বে, পুরোপুরি। নিজের হৃদয়কে আরেকবার চূর্ণ হতে দেখার সাহস তার নেই। মানুষের মন বারবার ভাঙার জন্য তৈরি হয়নি, স্নেহার মন তো নয়ই। চোখের কোণে জল এসে ভিজিয়ে দিলো তার গাল।
কেন? কেন রাহুল আর যোগাযোগ করলো না? মুখে কোনো শব্দ নেই, কিন্তু মনের ভেতর প্রশ্নেরা তীব্র ঝড় তোলে।
নেহালের কথা শুনে কি পিছিয়ে গেলো রাহুল? স্নেহার অতীত কি রাহুল মেনে নিতে পারেনি? স্নেহা হাতের পিঠ দিয়ে চোখের কোণ মুছে নেয়, কিন্তু বুকের ভেতরের ব্যথা যেন আরও তীক্ষ্ণ হয়ে ওঠে। সারাদিন নিজেকে কাজের ভিড়ে ব্যস্ত করে রাখে সে, হেসে কথা বলে, মানুষের সামনে শক্ত থাকে। কিন্তু রাত, রাতের নীরবতা কখনোই তাকে রক্ষা করে না। অন্ধকারের ভেতর নিজের হৃদয়ের সামনে দাঁড়াতে হয় তাকে, সেখানে কোনো অভিনয় চলে না। হঠাৎই সে বালিশ টেনে নিয়ে মুখ গুঁজে দেয়। কান্না হু হু করে বেরিয়ে আসে, চাপা কান্না, তবু ভেতরে য’ন্ত্র’ণার ঢেউ ওঠে থেমে থেমে। মানুষ সব কিছুর সামনে শক্ত থাকতে পারে, কিন্তু নিজের সামনে? আঁধারের আড়ালে নিজের সত্যিকারের ভাঙা অংশগুলো লুকানো যায় না।
…
রাত গভীর।
ঘুম যে আজ তার চোখের পাতা ছুঁয়েও দেখেনি, সেটা আরাফ অনেক আগেই বুঝেছে। অদৃশ্য এক অস্থিরতা বুকের ভেতর ছটফট করছে। রুমের ভেতরের শান্ত আলো, আরোহির নিয়মিত নিশ্বাসের শব্দ কিছুতেই তার মনটা স্থির হচ্ছে না। অবশেষে ক্লান্ত হয়ে সে উঠে দাঁড়ায়, আস্তে করে দরজা খুলে বারান্দায় এসে দাঁড়ায়। শহরের রাত্রিকালীন আলো ফিকে। বাতাস থমথমে। কেমন যেন ভারী।
আরাফ গিরিল এর ওপর দুই হাত রেখে দাঁড়ায়। হঠাৎ পিছন থেকে একটা পরিচিত, খুব পরিচিত কণ্ঠ ভেসে আসে,
–” এইভাবে বসে আছো কেন?”
আরাফ চমকে উঠে। হৃদপিণ্ডের স্পন্দন আচমকা বেড়ে যায়। ধীরে ধীরে সে মাথা ঘুরিয়ে তাকায়। দেখে,
সাদা শাড়ি পরা এক নারী নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে আছে ঠিক তার পাশে। খোলা চুল হাওয়ায় দুলছে। মোলায়েম আলোয় তার মুখটা আস্তে আস্তে স্পষ্ট হয়।
মিরা। তার সন্তানের মা। তার প্রথম প্রেম। যে নারী সন্তান জন্মের সময়, পৃথিবী থেকে কেড়ে নিয়েছিলো।
আরাফের নিঃশ্বাস আটকে যায়।
–” মিরা! তুমি?”
কণ্ঠটা যেন নিজের মতো করে বেরিয়ে আসে, কাঁপা, ভাঙা। মিরা নিঃশব্দে হাসে। চোখে অদ্ভুত শান্তি।
–” আজ না এসে পারলাম না, আরাফ! কারন, তোমার জন্য আমার মেয়ে কষ্ট পাবে, এইটা আমি মেনে নিতে পারবো না।”
আরাফের মুখ শক্ত হয়ে যায়।
–” আমি? আমি আমার মেয়েকে কষ্ট দিচ্ছি? তুমি এই কথা বলছো, মিরা?”
আরাফের কণ্ঠ ভেঙে আসে, তীব্র, ব্যথায় মোড়া।
–” তুমি যখন আমাদের ছেড়ে ওপারে চলে গেলে, তখন থেকে এই দুই হাতেই আমি মেয়েকে আগলে রেখেছি। দিন রাত আগলে রেখেছি। ঘুম খাওয়া ভুলে আগলে রেখেছি। আর তুমি বলছো আমি ওকে কষ্ট দিচ্ছি?”
মিরা তাকিয়ে থাকে গভীর চোখে।
–” হ্যা, আরাফ! তুমি অজান্তেই ওকে দিচ্ছো।”
চুপ করে যায় আরাফ।
–” কিভাবে?”
মিরা এগিয়ে এসে রেলিং আঁকড়ে ধরে। হাওয়ায় তার সাদা শাড়ি উড়তে থাকে।
–” আমার মেয়ের একজন মায়ের প্রয়োজন আছে। আর তুমিও জানো, জারিফা ওকে কতোটা ভালোবাসে। কীভাবে আগলে রাখে। কিন্তু তুমি সব জেনেও না জানার ভান করছো, আমার মেয়েটাও চাচ্ছে জারিফাকে মা বানাতে কিন্তু তুমি তাকে সেইটা দিতে চাচ্ছো না।”
আরাফ গলা শক্ত করে।
–” কারন, আমি তোমার জায়গায় কাউকে বসাতে চাই না।”
একটা লম্বা নিঃশ্বাস ফেলে মিরা।
–” আর, আমিও চাই না তুমি আমার জায়গায় কাউকে বসাও। কিন্তু, আরাফ কারোর জন্য নতুন একটা জায়গা সৃষ্টি করা অন্যায় নয়।”
আরাফ চোখ সরিয়ে নেয়।
–” জারিফা? সে শিক্ষিত, সম্মানিত পরিবার থেকে এসেছে। এমন একজন কেন আমার মতো এক সন্তানের বাবাকে বিয়ে করবে?”
মিরা ধীরে বলে ওঠে,
–” তুমি কি জানার সুযোগ দিয়েছো তাকে?”
আরাফ চুপ। মিরার কণ্ঠ এবার কঠিন হয়ে ওঠে,
–” তোমার এই অবুঝপানার জন্য যদি আমার মেয়ে বিন্দুমাত্র কষ্ট পায়। তবে আমি তোমাকে কখনো ক্ষমা করবো না, আরাফ!”
হঠাৎ ঠিক সেই মুহূর্তে, আকাশ কাঁপিয়ে তীব্র শব্দে মেঘ ডাকতে শুরু করলো। আরাফ চমকে উঠে আকাশের দিকে তাকায়। আকাশকালো, শিকড়ের মতো বিদ্যুতের রেখা ছুটে যাচ্ছে। দমকা হাওয়া হঠাৎই খুব তীব্র হয়ে ওঠে। সে তাড়াতাড়ি পাশে তাকায়, কেউ নেই। কোথাও নেই। এক নিমিষে যেন পুরো পৃথিবী থেকে উধাও হয়ে গেছে মিরা। আতঙ্কে কাঁপা গলায় আরাফ ডাকে,
–” মিরা! মিরা! কোথায় তুমি?”
শুধু ঝড়ের শব্দ। হাওয়া আরও জোরে বয়ে চলে।
আরাফের কপালে ঘাম জমে যায়। এক ঝলক বিদ্যুৎ চমকাতেই সে বুঝে, এটা স্বপ্ন না। দর্শনও না। হয়তো, তার নিজের জমে থাকা ভ’য়, অপরাধবোধ আর ভালোবাসার সংঘর্ষই এই রূপে ধরা দিয়েছে। আতঙ্কে বারান্দা থেকে সরে আসে আরাফ। দ্রুত দরজা বন্ধ করে দেয়। ভেতরে রাজকন্যার ঘুমন্ত মুখ ড্রিম লাইটে স্পষ্ট। আরাফ থেমে দেখে, কতোটা শান্ত, কতোটা নির্ভরশীল মুখ সে মেয়েটার।
ধীরে ধীরে এগিয়ে যায় আরাফ। আরোহির পাশে শুয়ে পড়ে। কপালে চুমু খায়। সারা শরীরটা জড়িয়ে ধরে,
যেন ঝড়কে আড়াল করতে চায় নিজের বুকে। বারান্দার বাইরে তখনও ঝড় বয়ে যাচ্ছে। কিন্তু ভেতরে, এক বাবা তার মেয়েকে বুকে চেপে ধরে আছেন, যেন পৃথিবীটা একমাত্র এইটুকুই।
…
সকালবেলার আলো ঘরজুড়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। আরাফ আরোহিকে নিয়ে রুম থেকে বের হলো। ছোট্ট মেয়েটির চুল দুই ঝুটি করে বেঁধে দিয়েছে সে। টেবিলের পাশে দুই জন পাশাপাশি বসে পড়লো। সায়েরা খাতুন আরাফ আরোহির খাবার এনে দেয়। স্নেহা আরোহির টিফিন রেডি করছে। আরোহিকে খাবার খাইয়ে নিজেও খেতে শুরু করে আরাফ। সায়েরা খাতুন নিঃশব্দে তাকালেন তার দিকে।
–” আরাফ! এখনো রেগে আছিস আমার উপর?”
আরাফ মাথা নাড়লো ধীরে।
–” না, আম্মা!”
সায়েরা খাতুন আবার বললেন,
–” আমি আর আরোহিকে এইসব বলবো নানে। তুই রাগ করে থাকিস না।”
আরাফ একটু থেমে বললো,
–” না! রেগে থাকবো কেন, আম্মা? তুমি যেইটা ভালো বুঝছো, সেইটাই করেছো।”
আরাফ খাওয়া শেষ করে রুমে চলে গেলো রেডি হতে। রুমে ঢুকতেই অদ্ভুত এক নিস্তব্ধতা তাকে গ্রাস করলো। আলমারির দরজা খুলতেই হাত গিয়ে থামলো পুরোনো এক ছোট্ট কাঠের বাক্সে। সেটা খুলে বের করলো মিরার ছবি। শাড়ির কোঁচ টেনে হাসতে থাকা মুখটা, আজও কতটা জীবন্ত! ছবিটার দিকে তাকিয়ে আরাফের মুখে এক হালকা হাসি ফুটে উঠলো। স্মৃতিরা বুকের ভেতর গুমগুম করে উঠলো।
ঠিক তখনই পেছন থেকে আরোহির টুকটুকে কণ্ঠ,
–” স্কুলে যাবো না পাপা?”
আরাফ চমকে উঠে তাড়াতাড়ি ছবিটা আলমারির ভেতর রেখে দিলো। শার্ট বের করতে করতে বললো,
–” যাবো তো মা, অবশ্যই যাবো।”
আরোহি আবার দৌড়ে বাইরে চলে গেলো। আরাফ আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে শার্টের বোতাম দিতে দিতে নিজেকে দেখলো। হঠাৎই মনে হলো, আয়নার পেছন থেকে কেউ যেন তাকিয়ে আছে। কেউ খুব পরিচিত, কেউ খুব প্রিয়। পর মুহূর্তেই মিরার রূপ যেন প্রতিবিম্বের ভেতর ভেসে উঠলো। মিরার ঠাণ্ডা, তবু সতর্ক কণ্ঠ,
–” আমার মেয়ে যদি একটুও কষ্ট পায়, আরাফ! আমি কিন্তু তোমাকে কখনো ক্ষমা করবো না।”
আরাফ খুব ধীরে, প্রায় ফিসফিস করে উত্তর দিলো,
–” তোমার মেয়ে একটুও কষ্ট পাবে না, একটুও না। তার জন্য আমি সবটুকু করবো।”
প্রতিবিম্ব মিলিয়ে গেলো বাতাসে। রুম আবার নিস্তব্ধ হয়ে গেলো। আরাফ এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে বাইরে বেরিয়ে এলো। দরজা পেরিয়ে দেখে, আরোহি স্নেহার পাশে দাঁড়িয়ে উচ্ছ্বাসভরা ভঙ্গিতে কিছু বলছে। স্নেহা মনোযোগ দিয়ে শুনছে আর হেসে উঠছে। সেই দৃশ্য দেখে আরাফের বুকের কোথাও যেন অচেনা এক হালকা টান লাগে, অস্বীকার করা যায় না এমন কিছু।
আরোহি আরাফকে দেখেই দৌড়ে এল, তার হাতটা শক্ত করে ধরে।
–” চলো পাপা!”
স্নেহার দিকে একবার তাকালো আরাফ, নীরব, তবু অনুভব পূর্ণ। তারপর ছোট্ট মেয়েটির হাত ধরে বাইরে বেরিয়ে গেলো দুই জন।
#_চলবে_ইনশাআল্লাহ_🌹
