#_চন্দ্রবিন্দু_
#_মারিয়া_রশিদ_
#_পর্ব_৬_
বিকেলের রোদটা শহরের গায়ে নরম সোনালি আলো মেখে দিয়েছে। বাতাসে অদ্ভুত একটা শান্তি। সেই শান্তির মাঝেই ধীরে এগিয়ে চলেছে রাহুলের গাড়ি। রাহুল স্টিয়ারিংয়ে হাত রেখে মনোযোগ দিয়ে রাস্তা দেখছে, আর পাশের সিটে বসে আছে স্নেহা। মুখে অল্প উৎকণ্ঠা, চোখে কৌতূহল। গাড়ির জানালা দিয়ে তীব্র ঠান্ডা হাওয়া ঢুকছে, আর তাতে স্নেহার খোলা চুলের কিছু গোছা এলোমেলো হতে হতে তার গাল ছুঁয়ে যাচ্ছে। স্নেহা জানালা বন্ধ করে দেয়। তারপর সে আর চুপ থাকতে পারলো না। একটু সামনে ঝুঁকে বললো,
–” আচ্ছা! কোথায় নিয়ে যাচ্ছো? এইটা তো বলবে?”
রাহুলের ঠোঁটে দুষ্টু হাসি ফুটে ওঠে। চোখ সরু করে বলে,
–” সারপ্রাইজ বললাম তো। ধৈর্য্য রাখো একটু।”
স্নেহা দীর্ঘশ্বাস ফেলে। কিছুক্ষণ পর গাড়ি এসে থামে এক বিশাল লোহার গেটের সামনে। রাহুল হর্ন বাজাতেই যেন মুহূর্তেই প্রাণ ফিরে পায় পুরো দরজা। দারোয়ান দৌড়ে এসে সেই বিশাল গেট খুলে দেয়।
গাড়ি ধীরে ভেতরে ঢুকে যায়। আর গেটের ওপাশে পা ফেলতেই স্নেহার চোখ বিস্তৃত হয়ে যায়। চারদিকে সবুজের সমারোহ। দুই পাশে যতো দূর চোখ যায় ফুলের সারি। গাঁদা, রজনীগন্ধা, গোলাপ, লিলি, যেন প্রকৃতি নিজেই সাজিয়ে রেখেছে কোনো রাজকীয় আগমনের পথ। স্নেহা অন্যমনেই গাড়ির জানালা দিয়ে তাকিয়ে থাকে।
গাড়ি থামতেই রাহুল নেমে এসে তার পাশে দরজা খুলে দেয়। কথা না বলে শুধু তাকিয়ে থাকে তার দিকে, সেই স্থির, নরম দৃষ্টিতে। স্নেহা নামতেই তার সামনে উদ্ভাসিত হয় এক সুন্দর দৃশ্য। বড়সড় ডুপ্লেক্স, তবে সাধারণ নয়। পুরো বাড়িটার গঠন যেন ছোটখাটো কোনো রাজপ্রাসাদ। সাদা-সোনালি রঙের স্থাপত্যে সন্ধ্যার আলো পড়ে নরম একটা আভা তৈরি করেছে। বাড়ির প্রতিটা ইট থেকে বেরিয়ে আসে এক অদ্ভুত আভিজাত্যের গন্ধ। স্নেহা স্তব্ধ হয়ে বলে,
–” এইটা কার বাড়ি?”
রাহুল এক ঝলক তাকিয়ে শুধু বলে ওঠে,
–” এসো। গেলেই জানতে পারবে।”
দুই জন হাঁটতে হাঁটতে বিশাল কাঠের দরজার সামনে পৌঁছায়। রাহুল টোকা দিতেই একজন সার্ভেন্ট দরজা খুলে দাঁড়ায়।
–” দাদী কোথায়?”
রাহুল জিজ্ঞেস করে।
–” ভেতরেই ড্রইংয়েই আছেন।”
স্নেহার ভ্রু কুঁচকে ওঠে। দাদী? এই বাড়ি যদি রাহুলের দাদীর হয়, তাহলে। তার বুকের ভেতর আচমকা কিছু একটার ধাক্কা লাগে। রাহুল ধীরে ধীরে তাকে নিয়ে প্রবেশ করে। ড্রয়িং রুমে ঢুকতেই স্নেহা থমকে যায়।
সামনে নরম আলোয় ভাসছে বিশাল ঘর। অন্তরঙ্গ সাজসজ্জা, পিতলের শো-পিস, ভারী পর্দা, একেকটা জিনিস যেন ঘরের সৌন্দর্য বয়ে বেড়াচ্ছে।
সেসবের মাঝখানে বড় একটা সোফায় বসে আছেন এক বৃদ্ধা। পরণে গাঢ় ঘিয়ে রঙের শাড়ি। চোখে অপার গভীরতা। মুখে বয়সের রেখা থাকলেও আভিজাত্য চাপা পড়ে নেই কোথাও। তিনি তাকিয়ে মুচকি হাসেন। একটা এমন হাসি, যেন কারও জন্য বহুদিন অপেক্ষা করে ছিলেন। রাহুল এগিয়ে গিয়ে দুই বাহু দিয়ে তাকে জড়িয়ে ধরে। স্বরটা হালকা ভাঙা, কিন্তু ভীষণ উষ্ণ,
–” দাদী!”
বৃদ্ধা রেখা চৌধুরী তার মাথায় হাত বুলিয়ে বলেন,
–” শ’য়’তা’ন ছেলে! এতোদিন পর আমার কথা মনে পড়লো?”
রাহুল হাসে।
–” রাগ করো না, দাদী! আজ তোমার জন্য আমি বেস্ট গিফট এনেছি।”
রেখা চৌধুরীর ভ্রু সোজা হয়ে যায়।
–” কি গিফট?”
রাহুল স্নেহার দিকে তাকায়। তারপর নিজের হাত দিয়ে দাদীর মুখ ঘুরিয়ে দেয়। রেখা চৌধুরী সেই মুহূর্তে প্রথমবার দেখেন স্নেহাকে। স্নেহার উড়নার আঁচলটা হাত থেকে প্রায় পড়ে যাচ্ছিল, সে তাড়াতাড়ি সামলায়। চোখে বিস্ময়, অস্বস্তি, অবাক হওয়া সবই একসঙ্গে। রাহুল বলে,
–” এইটাই তোমার গিফট!”
রেখা চৌধুরী ধীর পায়ে এগিয়ে আসেন। তার চোখের দৃষ্টিতে অপার মমতা এবং অদ্ভুত এক কঠিন স্থিরতা।
তিনি স্নেহার ঠিক সামনে এসে দাঁড়ান। এক থমথমে নীরবতা ঘরজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। তারপর খুব আস্তে স্নেহার গালে হাত রেখে বলেন,
–” তুমি স্নেহা?”
স্নেহা কেঁপে ওঠে। রাহুলের দাদী তার নাম জানে কিভাবে? স্নেহা মাথা নিচু করে বলে,
–” আসসালামু আলাইকুম, দাদী!”
উত্তরে রেখা চৌধুরী স্নেহার মুখ তুলে নেন। তার কপালে আলতো চুমু দিয়ে বলেন,
–” ওয়ালাইকুম আসসালাম! নাতবউ আমার খুব পছন্দ হয়েছে, রাহুল।”
বাক্যটা স্নেহার বুকের ভেতরে বাজের মতো আঘাত করে। নাতবউ? দাদী কি বললেন? নাতবউ? স্নেহা স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। রাহুল কোনো কথা বলছে না। স্নেহা কেঁপে উঠে। নাতবউ মানে? ঘরটা নিস্তব্ধ।
রাহুলের দাদী মুচকি হাসছেন। আর স্নেহার পৃথিবী ধীরে ধীরে বদলে যাচ্ছে।
…
দিনের আলো ধীরে ধীরে হালকা হয়ে আসছিল। দুপুরে আরোহিকে বুকে নিয়ে ঘুমিয়েছিলো আরাফ। এতোদিন পর এমন শান্ত দুপুর যেন তাকে একটু নিশ্বাস নেওয়ার অবসর দিয়েছিলো। তবে বিকেল নামতেই আরোহির ঘুম ভেঙে গেলেও আরাফ তখনো গভীর ঘুমে ডুবে। ছোট্ট মেয়েটা বাবাকে না জাগিয়ে নরম পায়ের শব্দে বিছানা থেকে নেমে যায়।
আরাফের ঘুম ভাঙে আরও বেশ কিছুক্ষণ পর। চোখ খুলতেই প্রথমেই তার দৃষ্টি ঘরের কোণে ঘুরে বেড়ায়, আরোহি নেই। অনুমান করে, বোধহয় তার দিদার কাছে গেছে। ফ্রেশ হয়ে মাঝের রুমে যেতেই দেখে সায়েরা খাতুন টিভির সামনে একা বসে আছেন। পাশের রুম থেকে সবে বের হচ্ছে স্নেহা, চোখ মুখ দেখে বোঝা যায় সেও সদ্য ঘুম থেকে উঠেছে।
আরাফ সামনে গিয়ে বলে,
–” আম্মা! আরোহি কোথায়?”
সায়েরা খাতুন চোখ না সরিয়ে স্বাভাবিক স্বরে বলেন,
–” ছাদে আছে, বাবা!”
আরাফের কপাল ভাঁজ পড়ে।
–” একা একা?”
সায়েরা হালকা হেসে বলেন,
–” না! জারিফা এসেছে।”
সে মুহূর্তেই আরাফের মুখ শক্ত হয়ে যায়। অজানা বিরক্তি তার ভিতর থেকে দপ করে জ্বলে ওঠে। কয়েক মাস ধরেই সে মেয়েটিকে সহ্য করতে পারছে না। কারণটা হয়তো খুব স্পষ্ট নয়, কিন্তু আরোহির প্রতি জারিফার অতিরিক্ত আগ্রহ আরোহির মনটাকে অন্যদিকে টেনে নিচ্ছে। এটা সে কিছুতেই পছন্দ করতে পারছে না। দ্রুত ছাদের সিঁড়ির দিকে এগিয়ে গেল আরাফ।
ছাদে উঠে আরাফ যে দৃশ্য দেখে, তাতে তার বুকের ভেতরে অস্বস্তি আরও বাড়ল। জারিফা আর আরোহি হাসতে হাসতে বল নিয়ে ছোড়াছুড়ি করছে। বাতাসে উড়ছে দুই জনের হাসির শব্দ। আরোহির চুল সুন্দর করে বাধা, যেন অনেক যত্নে সাজিয়ে দিয়েছে কেউ। আরোহি বাবাকে দেখে উচ্ছ্বসিত হয়ে দৌড়ে এগিয়ে আসে।
–” পাপা! আসো আসো, আমলা খেলি।”
চোখে তার সেই চিরচেনা ঝিলিক। কিন্তু আরাফ কোনো উত্তর দিল না। নিঃশব্দে মেয়েকে কোলে তুলে নেয়। আরোহি অবাক হয়ে বাবার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলো। জারিফা দাঁড়িয়ে আছে স্থিরভাবে, চোখে এক অস্বস্তির ছাপ। আরাফ ধীরে ধীরে মাথা তুলে তাকায় তার দিকে। চোখে তীক্ষ্ণ এক দৃষ্টি। আরাফের কণ্ঠ ঠান্ডা, ধারালো,
–” দেখুন! আমি আপনাকে এই কথা সরাসরি বলতে চাইনি। কিন্তু, এখন আর চুপ করে থাকতে পারছি না। দয়া করে আমার মেয়ের থেকে দুরে থাকুন। আমি চাই না, আমার মেয়ে বাইরের কারও উপর অতিরিক্ত ইন্টারেস্ট ফিল করুক।”
কথাগুলো যেন ছু’রি হয়ে বিঁধে গেল জারিফার ভেতরে। সে মুহূর্তেই তার মুখের রঙ বদলে যায়।
চুপচাপ কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে সে নিচু গলায় বললো,
–” আমি তো শুধু ওর সাথে একটু সময় কাটাই। আরোহিও আমাকে খুব পছন্দ করে। আমি তো ওকে কোথাও নিয়ে যাচ্ছি না। আপনি ওর আমার সাথে বাইরে যাওয়াটা পছন্দ করেন না। তাই আমি নিজে এখানে আসি, শুধু ওর সাথে একটু সময় কাটাতে।”
আরাফ ঠান্ডা চোখে তাকালয়। কণ্ঠে কোনো কম্পন নেই,
–” আমার মা বা বোনের সাথে আপনার যদি প্রয়োজন থাকে, তাহলে প্রয়োজন মিটিয়ে চলে যাবেন। কিন্তু, আমার মেয়ের সাথে কোনো বন্ধুত্বপূর্ন আচরণ করবেন না। একদমই না।”
জারিফার চোখ ভিজে উঠে। সে তাকায় আরোহির দিকে, মেয়েটার মুখে একরাশ দুঃখ। ছোট্ট চোখ দুটো বিস্ময়ে বড় হয়ে আছে। যেন কিছুই বুঝে উঠতে পারছে না। জারিফা ঠোঁট কামড়ে চোখ নামিয়ে নেয়।
হঠাৎ সে দৌড়ে বের হতে যায়, কিন্তু সিঁড়ির মুখে এসে থমকে দাঁড়ায়। সায়েরা খাতুন আর স্নেহা সেখানে দাঁড়িয়ে সব দেখছিল। দুই জনের চোখেই বেদনার ছাপ।
জারিফা তাদের পাশ কাটিয়ে সিঁড়ি বেয়ে নেমে যায়। মুখের উপর দিয়ে গড়িয়ে পড়ে এক ফোঁটা অশ্রু,
নিঃশব্দ, তিক্ত, অপমানের ভারে ভারী।
…
ছাদের নীরবতা ভেঙে গেল জারিফার দৌড়ে চলে যাওয়ার শব্দে। বাতাসে যেন হঠাৎই একটা অস্বস্তির গুমোট জমে উঠলো। সিঁড়ির মাথায় দাঁড়িয়ে থাকা সায়েরা খাতুন ও স্নেহা স্তব্ধ চোখে সবকিছু দেখছিলো। জারিফার চোখের কোণে ঝরে পড়া সেই নিঃশব্দ অশ্রু দুই জনের বুকেই ভার হয়ে নামলো।
জারিফার চলে যাওয়া মাত্রই আরাফ শক্ত মুখে আরোহিকে কোলে করে রাখে। ছোট্ট মেয়েটা বাবার বুকে লুকালো। কিন্তু, তার চোখে ভ’য়, বাবার কণ্ঠের রাগী ঝাঁজ তাকে কুঁকড়ে থাকতে বাধ্য করেছে।
সায়েরা খাতুন কাঁপা গলায় বললেন,
–” কি করলি তুই এইটা? এইভাবে মেয়েটাকে অপমান করলি?”
তার কণ্ঠে তীক্ষ্ণ তিরস্কার নয় বরং গভীর হতাশা। আরাফ সিঁড়ির মাঝেই থেমে ফিরে তাকালো না। শুধু নিচু, কিন্তু দৃঢ় কণ্ঠে বললো,
–” যা করেছি, ঠিক করেছি। আমি তো তোমাকে সেইদিনও বলেছি, এইসব আমার পছন্দ না।”
সায়েরা খাতুন হতবাক হয়ে তাকিয়ে রইলেন। কিছু বলার আগেই স্নেহা এক পা এগিয়ে এলো। চোখ-মুখে অসন্তোষ।
–” ভাইয়া! জারিফা আপু তো আরোহিকে অনেক ভালোবাসে। কতো আদর করে। এইটা করা তোমার একদম উচিত হয়নি।”
আরাফ এবার থামলো। ধীরে ধীরে মাথা ঘুরিয়ে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে বললো,
–” আমার মেয়েকে ভালোবাসার জন্য তার পরিবারের মানুষই যথেষ্ট। কোনো বাইরের মানুষের প্রয়োজন নেই। এরপর যদি এমন কিছু দেখি, আমি কিন্তু আমার মেয়েকে নিয়ে এই বাসা থেকে বের হয়ে যাবো।”
কথাগুলো বাতাসে ঝুলে থাকে কিছুক্ষণ। কারও পক্ষেই আর কিছু বলা সম্ভব হল না। আরাফ এক নিশ্বাসে বাকিটা বলে সিড়ি বেয়ে নেমে সোজা রুমের দিকে চলে গেল। আরোহি বাবার রাগের কম্পন অনুভব করে আরও জড়িয়ে ধরলো তাকে। ছোট্ট নরম শরীরটা যেন আরও ছোট হয়ে আছে। সিঁড়ির শেষ ধাপে দাঁড়িয়ে স্নেহা গভীর শ্বাস ফেলল।
–” কাজটা একদম ঠিক হলো না, আম্মা!”
সায়েরা খাতুনের চোখ যেন দূরে কোথাও চেয়ে আছে।
–” সেইটা আমিও বুঝতে পারছি। কিন্তু, এই জেদি ছেলে সেইটা কখনোই বুঝবে না।”
স্নেহার কণ্ঠে ক্লান্তি, চিন্তা,
–” আরোহির উপর না চাপ পড়ে এই নিয়ে। ভাইয়াটা মাঝে মাঝে এতো অবুঝ হয়ে যায়, যে কি বলবো।”
সায়েরা খাতুন মাথা নেড়ে আস্তে বললেন,
–” বাদ দে। চল ঘরে চল। আরোহিকে একটু নুডুলস রান্না করে দে। ও কিছু খেলে হয়তো শান্ত হবে।”
দুই জন ধীরে ধীরে সিঁড়ি বেয়ে নেমে আসে। স্নেহা সোজা রান্নাঘরের দিকে যায়। আলো জ্বালিয়ে চুলা জ্বালাতে জ্বালাতে তার মন খারাপ। অন্যদিকে সায়েরা খাতুন চুপচাপ নিজের রুমে ঢুকে দরজা টানলেন।
মাথার ওপরে যেন ভারী একটা অস্বস্তি।
#_চলবে_ইনশাআল্লাহ_🌹
