#_চন্দ্রবিন্দু_
#_মারিয়া_রশিদ_
#_পর্ব_৫_
সকাল আটটা পেরিয়ে গেছে।
রাহুলের আজ অদ্ভুত লাগছে নিজেরই আচরণ। রাত জেগে ঘুমাতে গিয়েও কেন জানি সকাল সকাল চোখ খুলে গেছে। সে জানে না কেন এত অস্থির লাগছে, কেন বারবার দরজার দিকে তাকাচ্ছে। একবার নয়, দুই বার নয়, বহুবার। শেষে বিরক্ত হয়ে সে নিজেই দরজা খুলে সোফায় বসে থাকে। চোখ স্থির দরজার দিকে।
সময় কেটে যায় ধীরে ধীরে। ঘড়িতে এখন সকাল দশটা। এই সময়ের মধ্যে তৃধা স্কুলে চলে গেছে।
রাহুল কোনো কথা বলেনি। অথচ তার ভেতরটা কেমন অস্থির হয়ে উঠেছিলো তখনও। নিজের এই অবস্থায় অবাক হয় সে। কেন এমোন হচ্ছে? একটা মেয়েকে একবার দেখেছে মাত্র, সকালের আলোয়, ভুলবশত দরজার সামনে দাঁড়ানো এক অচেনা মুখ।
তবুও যেন সেই মুখটাই বারবার ফিরে আসে। সেই চোখ, সেই বিভ্রান্তি, সেই হালকা ভ’য়, আর এক অচেনা মাধুর্য, সবকিছু মিশে তাকে তাড়া করছে অদৃশ্যভাবে। রাহুল বিরক্ত হয়ে উঠে দাঁড়ায়। মনে মনে বলে সে,
–” আমি কি পাগল হয়ে যাচ্ছি নাকি?”
তারপর ঘরে ফিরে গিয়ে বিছানায় লুটিয়ে পড়ে। ঘুমের ঘোরে শরীর ভারী হয়ে আসে। চোখ ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে যায়।
দুপুর গড়িয়ে বিকেল।
রাহুল ঘুম থেকে উঠে ঘড়ির দিকে তাকায়, দুপুর দুইটা। অজান্তেই লম্বা ঘুম হয়ে গেছে। জানালা দিয়ে হালকা সোনালি আলো ঢুকছে। বাতাসে একটা নির্লিপ্ত গন্ধ, বিকেলের নিস্তব্ধতা। ঘরটা নীরব। রাহুল ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ায়। মাথা ভার লাগছে। কিছুটা সময় পর কাপড় পাল্টে নেয়, মুখে জল ছিটিয়ে নেয় আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে। নিজের মুখে আজ এক অদ্ভুত ক্লান্তি। বাইরে যাওয়া দরকার একটু।
চুল আঁচড়িয়ে, শার্ট পরে বের হতে গিয়ে হঠাৎ থেমে যায় দরজার কাছে রাহুল। ঠিক সেই মুহূর্তে পাশের ফ্ল্যাটের দরজা খুলে গেল। আর সেই দরজার ভেতর থেকে বেরিয়ে এলো স্নেহা। রাহুলের চোখ হঠাৎ স্থির হয়ে যায়। আজ বিকেলের আলোয় মেয়েটিকে আরও শান্ত, আরও আলাদা লাগছে। চুল খোলা, চোখে হালকা কাজল, মুখে অদ্ভুত এক স্থিরতা। রাহুল আনমনেই তাকিয়ে থাকে। স্নেহা এক মুহূর্তে বুঝে ফেলে সেই দৃষ্টি। মুখে হালকা হাসি টেনে বলে,
–” ভালো আছেন?”
রাহুল একটু থমকে গিয়ে বলে,
–” জি, ভালো। কিন্তু আপনি তো সকালে আসেন, তাই না?”
স্নেহা নরম গলায় উত্তর দেয়,
–” না, আমি বিকেলে পড়াবো রোজ। গতকাল প্রথম দিন ছিলো, তাই সকালে এসেছিলাম।”
রাহুল মাথা নাড়ে।
–” ও, আচ্ছা।”
এক মুহূর্তের নীরবতা। তারপর দুই জন একসাথে লিফটে ওঠে। লিফটের ভেতর শুধু যন্ত্রের হালকা শব্দ। কেউ কিছু বলে না। স্নেহা ফোনে তাকিয়ে থাকে, আর রাহুলের চোখ পড়ে তার আঙুলে, পাতলা, সাদা, একটু কাঁপা কাঁপা। লিফট নিচে পৌঁছায়। দুই জন একসাথে বেরিয়ে আসে অ্যাপার্টমেন্টের ফটকে। চারপাশে তখন বিকেলের শেষ আলো, রোদ আর ছায়া মিলেমিশে একরকম মায়াবী আবহ তৈরি করেছে। স্নেহা হালকা হাসি দিয়ে বলে,
–” আচ্ছা, আসছি।”
রাহুলের গলা নরম হয়ে আসে,
–” সাবধানে যাবেন।”
স্নেহা রিকশায় উঠে বসে। রাহুল তাকিয়ে থাকে তার দিকে। রিকশাটা ধীরে ধীরে দূরে মিলিয়ে যায়।
রাহুল এখনও দাঁড়িয়ে, চুপচাপ, যেন চোখে কিছু হারিয়ে যাচ্ছে। যখন রিকশা বাঁক নিয়ে অদৃশ্য হয়, তখনই রাহুল গভীর নিশ্বাস ফেলে নিজের গাড়ির দিকে এগোয়। মাথার ভেতর এখনো বাজছে সেই হাসিটা, সেই নরম গলার সুর। তার অজান্তেই ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি ফুটে ওঠে।
…
সময় গড়িয়ে যাচ্ছে। কারণ, সময় কখনও থেমে থাকে না। সে নিজের মতো করে বয়ে যায়, কারও জন্য অপেক্ষা করে না। আজ বিকেলেই বাসায় ফিরেছে আরাফ। অফিসে তেমন কাজ ছিল না, একঘেয়ে সময় কাটানোর চেয়ে মেয়েটার সঙ্গে কিছুটা সময় কাটানোই ভালো মনে হলো তার। তাই হঠাৎ করেই ফেরা। বাসার দরজায় কলিং বেল বাজাতেই সায়েরা খাতুন দরজা খুলে দিলেন। ছেলেকে দেখে মুখে একরাশ বিস্ময়।
–” এই সময়, বাবা? শরীর খারাপ নাকি?”
আরাফ হালকা হাসে।
–” না, আম্মা! অফিসে কাজ ছিল না, তাই আগেই চলে এলাম।”
মায়ের মুখে তখন খুশির ছায়া।
–” আয় তাহলে, রুমে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে নে। আমি খাবার দিই? না কি খেয়ে এসেছিস?”
–” না! ভাবছিলাম বাসায় এসে খাবো। তাই খাইনি।”
–” ভালো করেছিস, আয়।”
আরাফ জুতো খুলে ভেতরে ঢোকে।
–” তুমি এখন বাসায়? আমি তো ভেবেছিলাম দরজায় তালা দেখতে পাবো। বিকেলে তো তোমরা পার্কের মাঠে যাও। আরোহি আজ যায়নি? নাকি ঘুমাচ্ছে এখনো?”
সায়েরা খাতুন হেসে উত্তর দেন,
–” গিয়েছে, জারিফার সাথে।”
আরাফ একটু থমকে যায়।
–” জারিফা?”
–” হ্যাঁ, কেন? তোকে দাদুমনি বলেনি জারিফার কথা? রহিম ভাইদের বাসায় ভাড়া থাকে ওরা।”
আরাফের মুখের অভিব্যক্তি পাল্টে যায়। চোখে রাগের ঝিলিক।
–” বলেছে। কিন্তু তুমি না গিয়ে আমার মেয়েকে ঐ মেয়েটার সাথে একা একা পাঠিয়ে দিলে?”
সায়েরা খাতুনের মুখের হাসি মিলিয়ে যায়। ছেলের কণ্ঠের রুক্ষতা তাকে হতচকিত করে তোলে।
–” কয়েকদিন হলো ওরা একসাথে যায়, বাবা। আরোহি ওকে খুব পছন্দ করে। মেয়েটা ভদ্র, খুব কেয়ারিংও বটে।”
আরাফ এবার একেবারে রেগে উঠে বলে,
–” কয়েকদিন ধরে যাচ্ছে মানে? তুমি কি বলছো এসব, আম্মা? আমার মেয়েকে তুমি এমন একজনের সঙ্গে পাঠাও, যাকে আমি ঠিকমতো চিনিও না? দুইদিনের পরিচয়, আর তুমি নিশ্চিন্তে ওকে দিয়ে দাও? একটু সময়ই তো দেখতে বলি তোমাকে, তাও এতো বিরক্তি তোমার? যে আমার মেয়েকে দুইদিন পাড়ায় আসা মেয়ের সাথে পাঠিয়ে দাও একা একা। যদি এইটাই হয় আমাকে বলতে আমি কিছু একটা ব্যবস্থা করতাম।”
সায়েরা খাতুনের চোখে কষ্ট জমে ওঠে।
–” তুই এইসব কি বলছিস, বাবা?”
–” এটা তোমার ঠিক হয়নি, একদমই ঠিক হয়নি।”
আরাফ তীক্ষ্ণ, রাগভরা নিঃশ্বাস ফেলে আবার জুতো পরে। দরজার দিকে এগিয়ে যায় দ্রুতপায়ে। সায়েরা খাতুন পেছন থেকে কয়েকবার ডাকে,
–” আরাফ! বাবা, শোন তো।”
কিন্তু কোনো সাড়া মেলে না। বাউন্ডারি গেট পেরিয়ে রাস্তার দিকে চলে যায় আরাফ। বিকেলের আলো ততক্ষণে ম্লান হয়ে আসছে, বাতাসে হালকা ধুলো, আর সায়েরা খাতুনের নিঃশব্দ দীর্ঘশ্বাস ঘরের ভেতর ঝুলে থাকে দীর্ঘক্ষণ।
…
পার্কের বিকেলের আলোটা আজ যেন অন্যরকম উজ্জ্বল। দূর থেকে শিশুদের হাসির শব্দ ভেসে আসছে, হালকা বাতাসে গাছের ডাল দুলছে মৃদু ছন্দে। সেই পার্কের এক কোণে জারিফা আর আরোহি একটি বল ছোড়া ধরার খেলায় দুই জনেই মগ্ন। কয়েক দিনের মধ্যেই যেন অবিচ্ছেদ্য বন্ধুত্ব গড়ে উঠেছে তাদের মধ্যে। জারিফা প্রায়ই আসে আরোহির বাসায়, কখনো গল্প করে, কখনো চুপচাপ বসে থাকে। পার্কে এলে দুই জন মিলে ফুচকা, চটপটি খায়, হাসতে হাসতে সময় কেটে যায় অনায়াসে।
কিন্তু জারিফার মনে এক অজানা টান, আরোহির প্রতি এক অদ্ভুত মায়া, যা সে নিজেও ব্যাখ্যা করতে পারে না। শিশুটির হাসি যেন তার মনের ভেতর কোথাও অজান্তেই এক তৃপ্তির পরত তৈরি করে।
বলটা হঠাৎ গড়িয়ে দূরে চলে গেল। আরোহি দৌড়ে তা তুলতে গিয়ে হঠাৎ চিৎকার করে উঠে,
–” পাপা!”
কথাটা শুনেই জারিফার শরীর হালকা কেঁপে উঠে। চোখের পাতা স্থির হয়ে গেল মুহূর্তে। আরোহি দৌড়ে চলে গেছে পার্কের গেটের দিকে। জারিফা কিছু সময় স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো। তার বুকের ভেতর যেন হঠাৎ জমে উঠল অজানা স্পন্দন। সে জানে, আরোহির পাপা মানে আরাফ। সেই মানুষটি, যাকে এখনো দেখেনি কখনও, তবু যার নাম শুনলেই তার মন কেমন অদ্ভুতভাবে আলোড়িত হয়ে ওঠে। ধীরে ধীরে ঘুরে তাকায় জারিফা।
একজন সুদর্শন মানুষ দাঁড়িয়ে আছেন গেটের পাশে। বাহুতে আরোহিকে তুলে নিয়েছেন। শিশুটিকে কোলে নিয়ে কপালে চুমু দিচ্ছেন। দৃশ্যটা এতটাই নিখুঁত, এতটাই কোমল যে জারিফার চোখের দৃষ্টি অজান্তেই স্থির হয়ে যায়। আরোহির মুখে এখনো হাসি, হয়তো বাবার বুকে আশ্রয়ে সে পৃথিবীর সবচেয়ে নিরাপদ জায়গাটা খুঁজে পেয়েছে। আরাফকে দেখে জারিফার মনে হয়, এই মানুষটিকে দেখে বোঝার কোনো উপায় নেই যে তিনি একজন সন্তানের পিতা। চোখে স্থিরতা, মুখে একরকম কঠিন দৃঢ়তা, তবু তার চারপাশে ছড়িয়ে আছে এক অব্যক্ত দূরত্ব। জারিফা কিছুটা দ্বিধা নিয়েই কয়েক পা এগিয়ে আসে। আরাফ কঠিন সুরে বলে,
–” তুমি কখনো দিদা বা পিউমনি ছাড়া একা একা এখানে আসবে না, ঠিক আছে?”
আরোহি ঠোঁট বাঁকায়। একটু অভিমান মেশানো স্বরে বলে,
–” আমি একা আসিনি তো, পাপা! আমি জালিফা আন্টিল সঙ্গে এসেছি।”
আরাফের গলায় ঠাণ্ডা দৃঢ়তা,
–” না, তাও না। তুমি শুধু দিদা, দাদান আর পিউমনির সঙ্গে আসবে। অন্য কারও সঙ্গে নয়।”
আরোহির মুখে বিস্ময়।
–” কিন্তু জালিফা আন্টিও তো বলো পাপা।”
–” তুমি কি পাপার কথা শুনবে না?”
–” হ্যা!”
–” তাহলে পাপা বলছে, তুমি পরিবারের বাইরে কারও সঙ্গে আসবে না। বুঝলে?”
আরোহি চুপ করে গেল। বাবার চোখে রাগের ঝিলিক টের পেল সে। নরম ভাবে বাবার গলা জড়িয়ে ধরে।
জারিফা নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে রইল। চোখের কোণে জমে উঠেছে অনুচ্চারিত কষ্ট। বুঝতে পারছে, এই মানুষটি তার উপস্থিতি মেনে নিতে পারছে না। আরাফ হঠাৎ একবার তাকায় তার দিকে, তারপর ঘুরে যেতে উদ্যত হলো। জারিফা দ্বিধা ভেঙে এগিয়ে এলো এক পা। নরম গলায় বললো,
–” আপনি বোধহয় ওর আমার সঙ্গে আসাটা পছন্দ করেননি। আমি তার জন্য দুঃখিত।”
আরাফ থেমে গেলেও, ঘুরে তাকায় না। স্বরটি এবার নিস্তরঙ্গ, তবু তীক্ষ্ণ।
–” আমার মেয়ে আমার জীবনের সবকিছু। তার ক্ষেত্রে বিন্দুমাত্র ঝুঁকি আমি নিতে পারবো না। তাই পরিবারের বাইরে কাউকে আমি ভরসা করতে পারি না। আশা করি, আপনি বিষয়টা বুঝবেন।”
কোনো উত্তর দিলো না জারিফা। শুধু স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল আরাফের পেছনের দিকে, যতক্ষণ না তিনি আরোহিকে কোলে নিয়ে ধীরে ধীরে পার্কের গেট পেরিয়ে অদৃশ্য হয়ে গেলেন। বাতাসে তখন নিস্তব্ধতা।
শুধু জারিফার চোখে এক অচেনা জলের ঝিলিক, আর দূরে আরোহির কাঁধ ঘুরে ফিরে তাকানো একটুখানি মায়া।
…
সন্ধ্যা নেমে এসেছে। চারপাশে আলো আর অন্ধকারের মিশেলে এক অদ্ভুত নরম ছায়া ছড়িয়ে আছে। তৃধার পড়া শেষ করে স্নেহা ধীরে ধীরে অ্যাপার্টমেন্টের সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামছে। দিনের শেষে তার মুখে ক্লান্তির ছাপ, তবু চোখে একরকম শান্তি, যেন কিছুই তাকে তেমন ছুঁতে পারছে না। ঠিক সেই সময় পেছন থেকে কেউ ডাকে,
–” স্নেহা!”
শব্দটা শুনে সে থেমে যায়। পেছন ফিরে তাকাতেই দেখে রাহুল দাঁড়িয়ে আছে। পরনে সাদা শার্ট, হাত গুঁজে রেখেছে পকেটে, মুখে হালকা হাসি। বিকেলের আলো এখন নিভে এসেছে প্রায়, আলো-আঁধারি মুখে রাহুলকে একরকম রহস্যময় দেখাচ্ছে। স্নেহা মৃদু কণ্ঠে বলে,
–” কিছু বলবে?”
রাহুল একটু এগিয়ে আসে, চোখে স্থির দৃষ্টি।
–” তোমার সঙ্গে আমার কিছু গুরুত্বপূর্ণ কথা আছে।”
গত কয়েক সপ্তাহে রাহুলের সঙ্গে তার সম্পর্কটা এক অদ্ভুত বন্ধুত্বে পরিণত হয়েছে। আপনি থেকে অনেক আগেই তুমি তে নেমে এসেছে। এই সময়ের মধ্যে দুই জনই অনেকটা জেনে নিয়েছে একে অন্যকে। স্নেহা হালকা হেসে বলে,
–” বলো, কী কথা?”
রাহুল এক মুহূর্ত চুপ করে থেকে বলে ওঠে,
–” আগামীকাল তৃধাকে পড়াতে হবে না।”
স্নেহা একটু অবাক হয়।
–” কেন?”
–” একটা জায়গায় যাবো।”
রাহুলের কণ্ঠে এক অচেনা উত্তেজনা।
–” কোথায়?”
রাহুল একটু থেমে তাকায় তার দিকে।
–” এখন বলা যাবে না। আগামীকাল গিয়ে দেখবে। খুব গুরুত্বপূর্ণ জায়গা।”
স্নেহার কপাল কুঁচকে যায়।
–” কিন্তু রাহুল…”
রাহুল বাধা দেয়।
–” কোনো কিন্তু না। আমি তো তোমাকে কখনো কোথাও যেতে বলিনি, তাই না? এই প্রথম বলছি। প্লিজ, রিফিউজ করো না।”
স্নেহা কিছুক্ষণ চুপ থাকে। মুখে অল্প অনিশ্চয়তা, চোখে দ্বিধা। কিন্তু রাহুলের কণ্ঠে এমন আন্তরিকতা যে না বলা যায় না। অবশেষে মৃদু স্বরে বলে,
–” ঠিক আছে।”
রাহুলের চোখে তখন ছোট্ট এক ঝলক আনন্দ।
–” চলো, তোমাকে ড্রপ করে দিই।”
স্নেহা মাথা নাড়ে,
–” না, কোনো দরকার নেই। আমি চলে যেতে পারবো।”
রাহুল হালকা বিরক্তি মেশানো হাসি দিয়ে বলে,
–” উফ! সব সময় এমন বলায় লাগে তোমার? চলো তো।”
রাহুলের কথা উপেক্ষা করা যায় না। স্নেহা চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে, আর রাহুল গাড়ি নিয়ে আসে সামনে। সে দরজা খুলে দাঁড়িয়ে থাকে, যেন স্বাভাবিক এক অভ্যাস। গাড়িতে বসে স্নেহা জানালার বাইরে তাকায়। শহরের আলো একে একে জ্বলছে, রাস্তার ধারে ছায়া গাঢ় হয়ে উঠছে। প্রথম প্রথম এমন সময়গুলো স্নেহার কাছে অস্বস্তিকর লাগত। অচেনা এক মানুষ, যে কেবল দরজার ওপাশ থেকে এসেছিল তার জীবনে। কিন্তু এখন আর তেমন লাগে না। রাহুলের সঙ্গে এই নিঃশব্দ মুহূর্তগুলোয় একরকম স্বস্তি আছে, যেন এই নীরবতারও এক নিজস্ব ভাষা আছে, যা কথায় বলা যায় না। গাড়ি ধীরে ধীরে স্নেহার বাড়ির গলির সামনে এসে থামে। রাহুল মুখ ফেরায় না, শুধু বলে,
–” আগামীকাল বিকেলে প্রস্তুত থেকো।”
স্নেহা দরজার হ্যান্ডেল ধরে, একবার তার দিকে তাকায়।
–” ঠিক আছে!”
বলে নামতে যায় সে।
রাহুল তখন শুধু একটা কথাই বলে, নরম স্বরে,
–” থ্যাংকিউ।”
স্নেহা কিছু না বলে এগিয়ে যায় অন্ধকার গলিটা পেরিয়ে। রাহুল স্নেহাকে গলি পর্যন্ত এগিয়ে দেয়। কারন, এর বেশি গেলে স্নেহার সমস্যা হয়। পাড়ার মানুষ বাজে কথা বলতে পারে। তাই রাহুল গলির মুখে ছেড়ে দেয়। স্নেহা চলে গেলে রাহুল গাড়ি ঘুরিয়ে নেয়।
…
রাত নেমে এসেছে শহরের ওপর। জানালার ওপারে রাস্তার ধারে একমাত্র ল্যাম্পপোস্টটা জ্বলছে, নিঃশব্দে, নির্লিপ্ত আলো ছড়িয়ে। সেই আলোর দিকে তাকিয়ে, মুখভরা বিষণ্নতা নিয়ে চুপচাপ বসে আছে জারিফা। জানালার পাশে বিছানায় হেলান দিয়ে, যেন নিজের ভেতরের কোনো উত্তর খুঁজছে সে। হঠাৎ দরজাটা আস্তে খুলে যায়। ভেতরে এল আনিকা রহমান, জারিফার মা। মেয়ের এমন অন্যমনস্ক চেহারা দেখে তিনি ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে পাশে বসে পড়লেন। কিছুক্ষণ মেয়েকে নীরবে দেখলেন। জারিফা খেয়ালই করছিল না মায়ের উপস্থিতি।
আনিকা রহমান হাত বাড়িয়ে মেয়ের মাথায় হাত রাখতেই যেন ধ্যান ভাঙে তার। জারিফা ধীরে চোখ তুলে তাকায়। আনিকা রহমান মৃদু স্বরে বললেন,
–” কি হয়েছে মা তোর?”
জারিফা ঠোঁট নড়াল হালকা হাসির মতো করে,
–” কিছু না, আম্মু!”
আনিকা রহমান শান্ত কণ্ঠে বললেন,
–” আম্মুকে বলবি না?”
জারিফা কিছুক্ষণ চুপ করে রইলো। তারপর হঠাৎ খুব ধীর গলায় প্রশ্ন করলো,
–” আচ্ছা, আম্মু! জন্ম না দিলে কি মা হওয়া যায় না?”
অপ্রত্যাশিত প্রশ্নে এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেলেন আনিকা রহমান। তারপর নিজেকে সামলে নিয়ে মৃদু হাসলেন।
–” মা হওয়া মানে শুধু সন্তান জন্ম দেওয়া না, মা। মা একটা অনুভূতি। যে নারী সেই অনুভূতি ধারণ করতে পারে, সেই মা হতে পারে। জন্মদানের দরকার হয় না সবসময়।”
জারিফা তাকিয়ে রইলো মায়ের দিকে। চোখে বিস্ময় আর অদ্ভুত এক প্রশ্নের ছায়া। আনিকা রহমান আবার বললেন,
–” আচ্ছা! আমি তোকে যদি জিজ্ঞেস করি, জন্ম দিলেই কি মা হওয়া যায়?”
জারিফা বললো,
–” হয় না?”
আনিকা রহমানের মুখে নিঃশব্দ দীর্ঘশ্বাস।
–” তাহলে আজকাল খবরের কাগজে যা দেখি, শুনি, নবজাতককে ডাস্টবিনে ফেলা, ড্রেনে পাওয়া, কেউ আবার নিজের সন্তানকে মে’রে ফেলছে, এইসব কেন হয় বলতো? মা কি পারে এমনটা করতে?”
জারিফা ধীরে মাথা নাড়ে।
–” না।”
আনিকা রহমান মৃদু হাসলেন।
–” আবার দেখ না, সেই ড্রেনে ফেলা শিশুদের কেউ কেউ তুলে নেয়। নিজের সন্তান মতো করে বড় করে। বুকের দুধ না থাকলেও বুকের ভালোবাসা দিয়ে মানুষ করে। সন্তান হ’ত্যার মতো খবর শুনলে, চোখে পানি আসে, বুক কেঁপে ওঠে। এরা কারা? এরা ও তো জন্ম দেয়নি। তাহলে এরা কি মা না?”
জারিফার চোখের কোণে অজান্তেই জল জমে উঠে।
আনিকা রহমান আবার বললেন,
–” মা সেই, যে নিজের ভিতরে এই অনুভূতিটা ধারণ করতে পারে। যে পারে না, সে শত সন্তান জন্ম দিলেও মা হতে পারে না। আবার যে পারে, তার মা হতে কোনো সন্তান জন্মদানেরই দরকার হয় না। বুঝলি?”
জারিফা চুপ করে যায়। কিন্তু মনে মনে যেন একটা জানালা খুলে গেলো তার সামনে। হঠাৎ চোখের সামনে ভেসে উঠল ছোট্ট আরোহির মুখটা। যখন সে ফুচকার প্লেট সামলাতে পারছিলো না, তখন নিজের হাতে খাইয়ে দিচ্ছিলো জারিফা। যখন আরোহি হেসে কোলে উঠে গলা জড়িয়ে ধরে, জারিফার বুকের ভেতর কেমন অদ্ভুত উষ্ণতা ছড়িয়ে যায়। তার ছোট্ট হাতগুলো যখন জারিফার গাল ছুঁয়ে দেয়, তখন মনে হয় পৃথিবীর সব ভালোবাসা যেন ওই স্পর্শেই মিশে আছে। চোখের কোণে একফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ে।
নরম কণ্ঠে সে বললো,
–” বুঝেছি, আম্মু।”
তারপর ধীরে ধীরে মায়ের কোলে মাথা রেখে শুয়ে পড়ে। আনিকা রহমান মেয়ের চুলে হাত বুলিয়ে দেন স্নেহভরা আদরে। জারিফা চোখ বন্ধ করল, মুখে শান্তির ছায়া। বুকের ভেতর জমে থাকা এক অজানা ব্যথা প্রশমিত হলো নিঃশব্দে।
#_চলবে_ইনশাআল্লাহ_🌹
