#লাভ_আফটার_ম্যারেজ
#আনাহিতা_তুলি
#পর্ব_২৭
গল্প সেজেগুজে শুভ্রর সত্যিকারের পুতুল বউ হয়ে বসে আছে। তুশি গল্পর মাথার দোপাট্টায় একটা পিন এঁটে দিচ্ছিল আর একের পর এক বকবক করেই যাচ্ছিল; সাথে অবশ্য গল্পর কাজিন অনুও আছে। তুশি হুট করে গল্পর থুতনি ধরে বলে,
‘বেইব তোকে বউ সাজে পুরাই পুতুল পুতুল লাগছে। শুভ্র ভাই আজ নির্ঘাত একটা লম্বা সেজদা দিয়ে বলবে –আল্লাহ থ্যাঙ্ক ইউ, থ্যাঙ্ক ইউ সো মাচ- এতো সুন্দর একটা মিষ্টি বউ দেওয়ার জন্য।’
তুশির কথায় সবাই হেসে ফেললো। অনু হাসি থামিয়ে শুভ্রর সাইড নিয়ে বললো,
‘কিন্তু তুশি আপু দুলাভাইও কিন্তু কম সুন্দর না! দুজনকে একদম মেইড ফর ইচ আদার লাগে।’
তুশি অনুর গাল টেনে দিয়ে বলল,
‘হ্যাঁ হ্যাঁ পাকা বুড়ি তাদেরকে একদম মেইড ফর ইচ আদার ই লাগে।’
খানিক পরেই নিচে বেশ সোরগোল শুনা গেলো সম্ভবত বর এসে পড়েছে। তুশি আর অনু দৌড়ে বের হয়ে গেলো দেখাদেখি গল্পর রুমে বাকি যারা ছিলো তারাও সবাই হুটোপুটি করে বর দেখতে ছুটলো। গল্প তখন পুরো রুম জুড়ে একা বসে তার বুকের ভিতর অদ্ভুত এক ধুকপুকানি হচ্ছে। একটা সময় সে বসা থেকে উঠে ধীর পায়ে জানালার কাছটায় গেলো –উদ্দেশ্য বর বেশে শুভ্রকে একঝলক দেখা। তবে সেটা বোধহয় আর সম্ভব হলো না কারন ইতিমধ্যে তার করিডোর থেকে কারও চপল পায়ের আওয়াজ ভেসে এলো যে সম্ভবত এদিকেই আসছে। গল্প দ্রুত নিজের জায়গায় গিয়ে বসে পরলো; কারন যেই আসুক না কেনো যদি একবার দেখে নেয় যে –বউ তার বর দেখার জন্য জানালার কাছে লুকিয়ে উঁকিঝুঁকি মারছে তবে সেটা অবশ্যই লজ্জাজনক একটা বিষয় হবে। গল্প আপাতত এই লজ্জার সম্মুখীন হতে ছাচ্ছে না তাই তার অশান্ত মন শান্ত করার প্রয়াস চালিয়ে চুপচাপ বসে রইলো।
গেইটে তখন বর আঁটকে বরন করার পর দেনাপাওনা নিয়ে তুমুল বাকবিতণ্ডা চলছে। কনে পক্ষ থেকে তুশি আর অনু অন্যদিকে বর পক্ষ থেকে শাওন আর আরাফ এই দেনাপাওনার বাকবিতন্ডায় শামিল হয়েছে। শুভ্র অবশ্য এ নিয়ে বেশ বিরক্ত হচ্ছে তার কথা হলো যা চাচ্ছে তা দিয়ে দিলেই তো হয়ে যায়; এতো বিতর্কের কি আছে!! সে আপাতত এখন এই ঝামেলা ছাড়িয়ে ভিতরে যেতে চাচ্ছে –তার মাসুম মনটা আকুপাকু করছে বউটাকে দেখার জন্য।
শুভ্র তাদের এই তর্ক বির্তকে অস্থির হয়ে অবশেষে এক কাজ করে বসলো –গেইটের টাকা নিয়ে যখন তর্ক বির্তক চরম পর্যায়ে ঠিক তখুনি শুভ্র –তুশিরা যা ডিমান্ড করেছিল তার পুরোটাই দিয়ে দিলো। আরাফ, শাওন হতবিহ্বল হয়ে শুভ্রর দিকে চেয়ে রইলো কিছু পল। তুশিরা তো ডিমান্ড অনুযায়ী টাকা পেয়ে তুমুল খুশি যেনো কোনো যুদ্ধ জয় করে ফেলেছে। টাকা পাওয়ার পরপরই শুভ্রকে সমাদরে ভিতরে নিয়ে গেলো সবাই।
শুভ্রকে বরের জন্য করা আলাদা স্ট্রেজে বসাতেই আরাফ আর শাওন তার উপর একপ্রকার হামলে পড়লো।
‘ভাইয়া তুই লাস্ট মোমেন্টে এটা কি করলি? ওরা তো রীতিমতো ডাকাতি করেছে আমাদের থেকে; আর তুইও করতে দিলি! আরেকটু হলেই তো ওরা মেনে যেতো –মাঝখান থেকে সব গুগলেট করে দিলি ধুরর!’
আরাফ তীক্ষ্ণ চোখে চেয়ে বলল,
‘তুই বর মানুষ তুই মুখে রুমাল চেপে চুপচাপ থাকবি। তুই কেনো এতো মাতব্বরি করতে গেলি? তর জন্য এতোক্ষণ ধরে বাকবিতন্ডা চালিয়েও আমরা ওদের কাছে হেরে গেলাম।’
ফাহিম টিপ্পনী কেটে বলে,
‘আরে আরাফ, শাওন তরা এখনো বুঝতে পারলি না আমাদের বর মশাই কেনো এমনটা করলো –যতো তাড়াতাড়ি ভিতরে ডুকতে পারবে বউয়ের দেখাও যে এতো তাড়াতাড়িই হবে! আহ এটাও বুঝলি না তরা ইডিয়ট! দেখ ওকে দেখ কেমন বউ দেখার জন্য চটপট করছে, আহারে।’
আরাফ শুভ্রর মুখের উপর ঝুঁকতেই শুভ্র খানিকটা পিছিয়ে গেলো। বিরক্তি নিয়ে বললো,
‘কি করছিস টা কি -সর সামনে থেকে।’
আরাফ সরলো না বরং ফেসটা ইনোসেন্ট করে বলল,
‘শুভ্র এই ছিলো তর মনে? তুই কি জীবনে আর বউ দেখিস নি যে আমাদের মুখ পুড়িয়ে তোকে এভাবে ভিতরে ডুকতে হলো? তর থেকে এটা একদমই আশা করিনি শুভ্র।’
শুভ্র চাপা স্বরে বললো,
‘সিরিয়াসলি তরা এতো ড্রামাবাজ কীভাবে বলতো? লিসেন, তরা ওদের সাথে কখনোই কথায় পারতি না উল্টো সময় নষ্ট হচ্ছিল। এখন একটু মুখটা বন্ধ কর ভাই।’
কিছুক্ষণ পরই গল্পকে এনে শুভ্রর পাশে বসানো হলো। শুভ্রর চোখ ফেরানো দায় হলো গল্পকে বধুবেসে দেখে মনের অজান্তেই মুখ থেকে বেরিয়ে এলো– মাশাআল্লাহ। উফ তার বউটা এতো মিষ্টি কেনো মনে হচ্ছে একটা আস্ত রসগোল্লা!
_________________________
বেশ কিছু সময়ের পর এলো কনে বিদায়ের পালা। এই মুহূর্তে এসে গল্প একদম বাচ্চাদের মতো কাঁদছে। এই বাড়ি আপনজন ছেড়ে যেতে হবে ভাবতেই তার কান্নার পাল্লা দ্বিগুণ হচ্ছে। নীলুফার কেঁদেকুটে অস্থির কল্পও কাঁদছে তবে সে তার মাকে সামলাচ্ছে। ইমতিয়াজ রহমান স্বভাবত বেশ গম্ভীর প্রকৃতির মানুষ। কিন্তু এই পর্যায়ে এসে গল্প যখন –আব্বু আব্বু বলে উনার বুকে হামলে পড়লো তখন তিনিও নিজেকে আর ধরে রাখতে পারলেন না। চোখের পানি ফেলে মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে বুঝাতে লাগলেন। নিজেই মেয়েকে আগলে নিয়ে গাড়িতে বসিয়ে দিলেন।
শুভ্র অসহায় চোখে বউয়ের কান্না দেখে যাচ্ছে। মেয়েটা এতো কেনো কাঁদছে? মনে হচ্ছে তাকে কেউ জোর করে বিয়ে দিয়ে বরের সাথে পাঠিয়ে দিচ্ছে! গাড়ির স্টার্ট করতেই গল্পর কান্নাও গতি হু হু করে বেড়ে গেলো। তুশি, অনু, নিষাদ সবাই গাড়ির কাছে এসে গল্পকে এটা ওটা বলে কান্না থামানোর প্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছে কিন্তু তার কান্নার বেগ যেনো কিছুতেই কমছে না। একপর্যায়ে নিষাদ বলল,
‘আর কাঁদিস না বোন; জানিস কান্না করলে তোকে একদম পেত্নীর মতো লাগে। শুভ্র ভাই তো তোকে দেখে পরে নির্ঘাত ভয় পেয়ে যাবে!’
কারও কোনো কথাই কাজে দিলো না। অবশেষে গাড়ি এগিয়ে চললো আপন গতিতে কিন্তু গল্প তার কান্না ভুললো না। শুভ্র এবার পকেটে থেকে একটা চকলেট বের করে গল্পর দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল,
‘চকলেট খাবে, চকলেট? এটা খেলে ভালো লাগবে।’
এমন একটা মুহুর্তে শুভ্রর থেকে এমন কথা শুনে গল্প যারপরনাই অবাক হয়ে থাকালো। বলল,
‘আপনি আমার সাথে মজা করছেন শুভ্র? আমি কাঁদছি আর আপনি আমাকে চকলেট সাধছেন! আমি কি বাচ্চা –যে চকলেট পেলে কান্না থেমে যাবে?’
শুভ্র চকলেট রেখে রুমাল দিয়ে গল্পর চোখ মুছে দিয়ে বলল,
‘আচ্ছা ভুল হয়েছে। এখন বলো কি করলে মহারানীর কান্না থামবে?’
গল্প ধরা গলায় বললো,
‘আমাকে বাড়িতে নিয়ে যান আমি বাবার কাছে আরেকটু থাকতে চাই।’
শুভ্র হাসলো একটু; গল্পর মাথাটা তার বুকে চেপে ধরলো খানিক সময়। মাথায় হাত বুলিয়ে তাকে শান্ত করার প্রয়াস চালিয়ে বলল,
‘বিলিভ মি তাহিয়াত –আমার যদি সাধ্য থাকতো তবে তোমাকে এভাবে কাঁদিয়ে কখনোই আমার সঙ্গে নিতাম না। কিন্তু আফসোস বিধাতা আমাকে সেই সাধ্য দেয়নি ওয়াইফি।’
শুভ্র একটু থেমে আবারও বলল,
‘তাছাড়া আমরা আবারও আসবো তো তোমার শহরে। যখনি মন চাইবে আমাকে বলবে; নিয়ে আসবো আমি। আচ্ছা মনে করো তুমি এক রাজ্য থেকে আরেক রাজ্যে যাচ্ছো লাইক বাবার রাজ্য থেকে বরের রাজ্য। ওহ্ তাহিয়াত ভেবে দেখেছ এখন থেকে তো তোমার দুটো রাজ্য –যখন যেখানে মন চাইবে সেখানে যাবে। কিন্তু এবার তো আমার তোমাকে দেখে হিংসে হচ্ছে!’
গল্প এতোক্ষণ ধরে শুভ্রর বুকে মাথা রেখে সবগুলো কথাই মনোযোগ দিয়ে শুনছিলো। কান্না থেমেছে অনেকক্ষণ আগেই ঠোঁটে এসেছে অল্প বিস্তর হাসির রেখাও। শুভ্রর শেষ কথাটায় হালকা একটু মাথাটা উঁচিয়ে জানতে চাইল,
‘কেনো? হিংসে হচ্ছে কেনো?’
শুভ্র ঠোঁট উল্টিয়ে বলল,
‘হবে না? তোমার তো মন খারাপ হলে এক বাড়ি থেকে আরেক বাড়িতে চলে যাবে –কিন্তু আমি তো কোথাও যেতে পারবো না। মন খারাপ হোক বা রাগ হোক ঘুরেফিরে সেই এক বাড়িতেই আসতে হবে।’
গল্প ঠোঁট চেপে হাসলো। শুভ্রর বুকে আরাম করে মাথাটা হেলিয়ে বলল,
‘ইশ আপনার তো দেখি আসলেই কষ্ট! থাক কষ্ট পাবেন না। আপনি বোধ হয় অবগত আজ থেকে আপনার বাড়িতে আমি পার হচ্ছি। তো আপনার এতোসব কষ্টের কথা বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নিলাম যে –আপনার রাগ হোক বা মন খারাপ সেটা ফিক্সড করার গুরু দায়িত্ব টা নাহয় আমিই নিলাম। এ নিয়ে এতো আফসোস করবেন না মশাই আমি আবার খুবই দরদী রমনী।’
গল্পর কান্না থামাতে পেরে শুভ্র যেনো স্বস্তির শ্বাস ফেললো। গল্পর ঘোমটা দেওয়া মাথায় চুমু খেয়ে মুচকি হেসে বলল,
‘বলছ! তাহলে ঠিক আছে।’
__________________________
শুভ্ররা বাড়িতে এসে পৌঁছেছে ঘন্টা খানেক হবে। সারাদিনের এতো দখল তারউপর এতোটা জার্নি করে এসে গল্পর এখন কাহিল অবস্থা। জাহানারা বধূ বরন করে গল্পকে সোজা শুভ্রর ঘরে পাঠিয়ে দিলেন মেয়েটা এতদূর জার্নি করে এসেছে এখন অবশ্যই তার একটু বিশ্রামের প্রয়োজন। শুভ্রকে ডেকে গল্পর জন্য ঘরে খাবার পাঠানোর ব্যবস্থা করলেন। শুভ্র খাবারের প্লেট হাতে নিয়ে ঘরে ডুকে দেখে গল্প বিছানায় চুপচাপ বসে আছে -এখনো চেইঞ্জ করেনি।
‘তাহিয়াত, তুমি এখনো চেইঞ্জ করোনি কেনো? অস্বস্তি লাগছে না তোমার?’
গল্প চোখ তুলে থাকাল শুভ্রর দিকে তার চোখ দুটোতে ক্লান্তির চাপ স্পষ্ট। শুভ্রর ভেজা চুল দেখে গল্প আন্দাজ করে নিলো জনাব গোসল করে একদম ফ্রেশ হয়েই এসেছে। বলল,
‘কিভাবে করবো লাগেজ টা তো এখানে নেই!’
শুভ্র বিরক্তিতে শ্বাস ফেললো। বলল,
‘শাওন টা এত্তো ফাজিল ওকে বললাম লাগেজ টা আমার রুমে রেখে যেতে শুনেই নি! আচ্ছা আমি ওটা আনার ব্যাবস্থা করছি আপাতত তুমি ফ্রেশ হয়ে আসো।’
‘আমাকে এখন গোসল করতে হবে শুভ্র। জার্নি করে এসে গোসল না করলে আমার ভীষণ অকওয়ার্ড ফিল হয়।’
শুভ্র হাতের প্লেট টা টি-টেবিলের ওপর রেখে কাভার্ড খুলে সেখান থেকে একটা শাড়ি বের করে গল্পকে দিলো। বলল,
‘এই শাড়িটা কয়েকদিন আগেই কিনে এনেছিলাম তোমার জন্য। এখন নাহয় এটাই পড়ো।’
গল্প শাড়ি টা নিলো ভীষণ সফট একটা শাড়ি দেখতেও সুন্দর। বলল,
‘থ্যাঙ্কস, শাড়ি টা খুব সুন্দর।’
মিনিট পনেরো পর গল্প ওয়াশরুম থেকে বের হলো এলোমেলো শাড়ি গায়ে জড়িয়ে। একেতে শাড়ি পড়ায় সে খুব একটা পটু নয় তারউপর ওয়াশরুমে শাড়ি পড়া যেনো আরও দুর্লভ একটা বিষয়। গল্পকে এমন এলোমেলো শাড়ি পড়া অবস্থায় দেখে শুভ্র হেসে বললো,
‘কি ব্যাপার তাহিয়াত সদ্য গোসল শেষে এভাবে এলোমেলো শাড়ি পড়া অবস্থায় বরের হার্ট দুর্বল করার পায়তারা হচ্ছে বুঝি!’
গল্প শাড়ির কুঁচি ঠিক করতে করতে বিরক্তিতে বলল,
‘মজা করবেন না শুভ্র, ওয়াশরুমে শাড়ি পরা যে কি ঝামেলা সেটা আপনি কি বুঝবেন!’
শুভ্র এগিয়ে এসে গল্প থেকে শাড়ির কুঁচি টা কেড়ে নিয়ে বলল,
‘এমন আনাড়ি হাতে শাড়ির কুঁচি ঠিক করলে আজ সারা রাত শেষ! চুপচাপ দাঁড়াও আমি ঠিক করে দিচ্ছি।’
‘আপনি বুঝি এক্সপার্ট শাড়ির কুঁচি ঠিক করতে?’
‘হুম এক্সপার্ট তো এইযে দেখো কি সুন্দর বউয়ের শাড়ির কুঁচি ধরতে হেল্প করছি।’
গল্প কিছু বলল না তার মুখে খেলে গেলো চাপা হাসি। শুভ্র হাঁটু মুড়ে খুব মনোযোগ দিয়ে ঠোঁটে ঠোঁট চেপে কুঁচি ঠিক করার ট্রাই করে যাচ্ছে। কুঁচি গুলো ঠিক করে দাঁড়িয়ে বলল,
‘গুঁজে দেই?’
গল্পর তড়াক করে শুভ্রর থেকে শাড়ির কুঁচি গুলো নিয়ে নিজেই গুঁজে ফেললো। লজ্জায় তার গাল গুলো অলরেডি গরম হয়ে গেছে। শুভ্র তার কানের কাছে ফিসফিসিয়ে বলে,
‘আমিও কিন্তু গুঁজে দিতে পারতাম –তবে আরও সুন্দর হতো সেটা।’
গল্প লজ্জায় হাসফাস করে বলে,
‘আপনার এতোটা কষ্ট না করলেও চলবে শুভ্র –এটুকু কাজ আমিই পারি। এতোটাও আনাড়ি নই।’
শুভ্র মাথা নেড়ে হাসলো। কথা বাড়ালো না গল্পর হাত ধরে সোফায় বসিয়ে বলল,
‘ওকে। এখন খেতে হবে; খিদে পায়নি নাকি তোমার? দেখি হা করো আমি খাইয়ে দিচ্ছি।’
গল্প মুখে খাবার নেওয়ার আগে জানতে চাইল,
‘আপনি খেয়েছেন?’
শুভ্র একটা লোকমা গল্পর মুখের সামনে ধরে বলল,
‘না, দুজন একসাথেই খাব।’
শুভ্র তাদের খাবার-দাবারের পাট চুকিয়ে বারান্দায় আসলো। গল্প বারান্দার রেলিঙ ধরে দাঁড়িয়ে আছে বাগানবিলাসের কাছটায়। শুভ্র গল্পর মাথা থেকে টাওয়াল টা খুলে চুল গুলো ভালো করে মুছে দিচ্ছে। জিজ্ঞেস করলো,
‘কফি খাবে? বানাই?’
গল্পর হুট করে সেদিনের কথা মনে পরে গেলো। ঠোঁট চেপে বললো,
‘উইদ ডিটারজেন্ট নাকি আবারও?’
শুভ্র গল্পকে পিছন থেকে জড়িয়ে ধরে তার কাঁধে থুতনি রেখে ফিসফিস করে বলল,
‘নো। উইদ ভালোবাসা।’
গল্প হেসে মাথা নাড়িয়ে বলে,
‘তাহলে খাওয়াই যায়।’
শুভ্রর ঘরেই একটা কফি মেকার ছিলো তাই কিছুক্ষণের মধ্যেই সে দু মগ কফি বানিয়ে বারান্দায় এলো। গল্প এক চুমুক মুখে দিয়েই বলল,
‘ওহ এটা সত্যিই ভালো। আপনি তো মশাই দুর্দান্ত কফি বানান দেখছি। রোজ বানিয়ে খাওয়াতে হবে কিন্তু!’
শুভ্র বুকে হাত দিয়ে বলে,
‘যেসা আপকা মর্জি রানী সাহেবা।’
শুভ্রর কথা বলার ভঙ্গিমায় গল্প খিলখিল করে হেসে উঠলো। শুভ্র গল্পর হাসি দেখে বুকে একহাত চেপে বলে,
‘এভাবে হাসবেন না রানী সাহেবা –আমি খুন হয়ে যাই তো।’
গল্প হাসি থামিয়ে বলল,
‘চলুন ঘুমাতে যাই –আমার ভীষণ ঘুম পেয়েছে।’
শুভ্র অবাক হওয়ার ভান করে বলল,
‘কি বলো আজ ঘুমাবে? আজ না আমাদের ফাস্ট নাইট! আর তুমি ঘুমানোর প্ল্যান করছো?’
গল্প শুভ্রর কথার ইঙ্গিত বুঝতে পারছে। সামান্য একটা ঢোক গিলে নমনীয় গলায় বলে,
‘শুভ্র ইফ ইউ ডোন্ট মাইন্ড –আজ আমি ভীষণ টায়ার্ড। আই নিড এ্যা ডিপ ন্যাপ।’
শুভ্র একটু মন খারাপের ভান করলো। গল্প শুভ্রর ওমন বেজার মুখ দেখে বলে,
‘আপনি কি রাগ করলেন? আচ্ছা তাহলে….’
গল্পকে আর পুরো কথাটা শেষ করতে না দিয়ে শুভ্র তাকে কোলে তুলে নিলো। বেডে বসিয়ে পকেট থেকে একটা চেইন বের করে তা গল্পর গলায় পরিয়ে দিয়ে তার নরম গালে একটা চুমু খেয়ে বলল,
‘এটা তোমার গিফট। পছন্দ হয়েছে?’
গল্প গলার চেইনটার দিকে তাকিয়ে বলল,
‘হুম… খুব।’
শুভ্র লাইট অফ করে বিছানায় শুয়ে পড়লো আর সাথে সাথে গল্পকে এক টানে তার বুকের মধ্যে ফেললো। মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলল,
‘ঘুমাও এবার আমি মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছি।’
গল্প অবাক হয়ে মাথাটা একটু তুলে বলল,
‘আপনি ঘুমাবেন এখন? তখন তো ভাবলাম রাগ করলেন!’
শুভ্র গল্পর মাথাটা তার বুকে চেপে ধরে বলল,
‘মজা করছিলাম তাহিয়াত। তাছাড়া আমি কিন্তু ফ্যাসিস্ট হাজব্যান্ড নই যে –বউয়ের ভালো লাগা খারাপ লাগা দেখেও না দেখার ভান করে শুধু নিজের সুবিধা নিবো…হুম! এখন ঘুমাও তো। তবে ঘুমাতে হবে আমার বুকেই এইক্ষেত্রে আমি আবার একটু- ফ্যাসিস্ট।’
গল্প আরও একবার মুগ্ধ হলো শুভ্রর প্রতি। শুভ্রর বুকে নাক ঘেঁষে আদুরে ভঙ্গিতে নিজেকে গুটিয়ে নিলো। সারা ঘরময় নিশিগন্ধার সুবাস ছড়াচ্ছে। আজ তাদের ঘরটা পুরোপুরি নিশিগন্ধা দিয়ে সজ্জিত আর শুভ্রর ব্যাক্তিগত নিশিগন্ধা টা তার বুকেই আদুরে ভঙ্গিতে কখন যে গভীর ঘুমে তলিয়ে গেল তা বলা গেলো না। নিরব আঁধার ঘরে শুধু শুনা গেলো তার নিশ্চিন্ত মনে ঘুমের ভারি নিশ্বাস।
#চলবে
#লাভ_আফটার_ম্যারেজ
#আনাহিতা_তুলি
#পর্ব_২৮
গল্প একটা শাড়ি পড়ে মনের মাধুরি মিশিয়ে আজ সেজেছে। সাদা আর গোলাপির মিশেলে শিফনের শাড়িটায় তাকে মানিয়েছে চমৎকার –সঙ্গে হাত ভর্তি কাচের চুড়ি আর চোখে গাঢ় কাজলের প্রলেপ সব মিলিয়ে তাকে অপরূপা লাগছে। আজ তার আর শুভ্রর এনিভার্সারি তাই তো এতো আয়োজন করে সাজগোজ। তার ফাইনাল ইয়ারের এক্সাম শেষ হয়েছে তিন-চার দিন হলো আর এই মুহূর্তে নিজেকে সে একদমই খাঁচায় মুক্ত পাখির মতো ফিল করছে।
শুভ্র যখন বাসায় ফিরে রাত তখন বারোটা পেরিয়েছে –একহাতে ঝুলানো কোট আর অন্য হতে আছে একগাদা রজনীগন্ধা ফুল। জাহানারা তখন পানি নিতে ডাইনিং এ এসেছিলেন ছেলেকে এতো রাত করে বাসায় ফিরতে দেখে তিনি বেশ বিরক্ত হলেন। একটু শাসনের মতো করেই বলল,
‘শুভ্র, এই সময় হলো তর বাড়ি ফিরার? কতোদিন বলেছি এতো রত করে বাড়ি ফিরিস না একটা কথাও তো শুনিস না! বাবার মতো হয়েছো একদম শুধু কাজ আর কাজ!’
শুভ্র মায়ের অভিযোগ মাথা পেতে মেনে নিলো। শান্ত গলায় বলল,
‘খেয়েছো তোমরা সবাই?’
শুভ্র জনে সবাই খেয়েছে কিন্তু তার প্রশ্ন করার মূল উদ্দেশ্য হলো গল্প খেয়েছে কিনা তা জানা। মেয়েটা খাবার-দাবার নিয়ে বড্ড অনিয়ম করছে আজকাল। জাহানারা আরেক দফা ছেলের প্রতি অসন্তোষ হয়ে বলল,
‘আমরা তো খেয়েছি কিন্তু গল্প এখনো খায়নি। মেয়েটা রোজ রোজ তোমার জন্য অপেক্ষা করে না খেয়ে বসে থাকে; তার কথা ভেবেও তো অন্তত একটু তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরতে পারো।’
শুভ্র অপরাধী গলায় বললো,
‘কি করবো বলো আম্মু –তুমি তো জানো একটা কোম্পানি দাঁড় করানো কতোটা কষ্টের; বাবাকে তো নিশ্চয়ই দেখেছ কি পরিমান কাটতে হয় তার পিছনে!’
জাহানারা বুঝলেন ছেলের কথা তবু সাবধানী গলায় বলল,
‘বুঝতে পারি বাবা, বুঝতে পারি। কিন্তু সবসময় কাজটাকেই এতো প্রায়োরিটি দিলে হয় না সম্পর্ক ফ্যামিলি এসবও খেয়াল রাখতে হয়।’
শুভ্র মনোযোগ দিয়ে শুনলো সব মায়ের কথায় সায় জানিয়ে মাথা দুলায়। জাহানারা ছেলেকে তাড়া দিয়ে বলে,
‘এখন ঘরে যাও। আর আমার কথাটা মাথায় রেখো।’
___________________________
শুভ্র ঘরে ডুকে দেখে পুরো ঘরটা বেলুন আর ক্যান্ডেল দিয়ে সাজানো। কিন্তু ঘরের মালকিন কে আপাতত কোথাও দেখা যাচ্ছে না। শুভ্র হতের কোটটা আর ফুলগুলো পাশে রেখে বারান্দায় গেলো দেখলো গল্প উদাস হয়ে আকশের দিকে তাকিয়ে আছে। শুভ্র ধীর পায়ে গিয়ে গল্পকে পিছন থেকে আলগোছে জড়িয়ে ধরলো তার থুতনি টেকলো গল্পর উন্মুক্ত কাঁধে। গল্পর কোনো হেলদোল দেখা গেলো না যেমন দাঁড়িয়ে ছিলো ঠিক তেমনই রইলো। শুভ্র গল্পর এমন স্ট্যাচু ভাব দেখে তাকে তার দিকে ফিরালো আর সঙ্গে সঙ্গেই একটা ঝটকা খেলো গল্পর ছলছল চোখ দেখে। শুভ্রর ভীষণ অপরাধবোধ কাজ করলো সে মেয়েটাকে কাঁদাল! যাকে সে তার জীবনের সবটুকু দিয়ে ভালো রাখতে চেয়েছে। গল্প শুভ্রর থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে একটু সরে দাঁড়ালো। অভিমানী গলায় বলল,
‘দূরে থাকুন আমার থেকে। এতো তাড়াতাড়ি আপনার কাজ শেষ হলো কি করে! একদম আমার কাছে আসবেন না, বলে দিলাম।’
একটু শাসন, একটু রাগ আর একটু অভিমান গল্পর গলা থেকে ঝরে পরল। শুভ্র গল্পর কথা পাত্তা না দিয়ে আরেকটু ঘনিষ্ঠ হয়ে দাঁড়াল। বলল,
‘বললেই হলো? যদি আমিই দূরে থাকি তবে যার জন্য এতো আয়োজন নিয়ে সেজেছ সে মন ভরে দেখবে কিকরে! দেখি, একটু এদিকে আসো তো কেমন লাগছে দেখি আমার কুইনকে! অবশ্য তাকে তো অলওয়েজ কুইন লাগে –সে সাজুক বা সাজুক নো ম্যাটার।’
কথাগুলো বলতে বলতে পকেট থেকে একটা বেলী ফুলের গাজরা বের করে সন্তপর্ণে তার খোঁপায় পরিয়ে দিল। এটুকু যত্নে গল্প মনে মনে খুশিতে আটখান হলেও তা শুভ্রকে বুঝতে দিলো না। গম্ভীর হওয়ার ভান করে বলল,
‘আপনি কি ভেবেছেন সবসময় এমন করে আমাকে পটিয়ে নিবেন? কিন্তু আজ তা হবে না; আপনার এসব ধান্দা আজ কাজে লাগবে না।’
অথচ সে অলরেডি পটে গেছে বরের ধান্ধায় কিন্তু সেটা শুভ্রকে বুঝতে দিলো না। শুভ্র কিছু মনে করে চট করে ঘরে ডুকল; সেকেন্ডের মধ্যেই ফিরে এলো হাতে করে একটা রজনীগন্ধার তোড়া আর একটা সাদা দেখতে বড়ো হাওয়াই মিঠাই নিয়ে। গল্প তার দিকে তাকাতেই শুভ্র ওগুলো হাতে নিয়েই কান ধরে ইনোসেন্ট ফেস করে বলে,
‘আমি এত্তো এত্তো সরি মাই ডিয়ার ওয়াইফ। প্লিজ এবার একটু হাসো! এই নাও তোমার প্রিয় ফুল আর পছন্দের খাবার হাওয়াই মিঠাই।’
গল্প মনটা খুশিতে ঝুমঝুম করে উঠলো; কিন্তু তৎক্ষনাৎ শুভ্রর বাড়িয়ে দেওয়া ফুল আর মিঠাই হাতে নিলো না। শুভ্রর হাত ঠেলে ফিরিয়ে দিলো। শুভ্র এবার কিছু একটা ভেবে বলল,
‘ঠিকাছে কেউ যখন কিছুই নিবে না তখন আমার আর কি করার! মিঠাই টা নাহয় আমিই খেয়ে ফেলি তাছাড়া খাবার নষ্ট করা তো আর যায় না।’
শুভ্র প্যাকেট টা খুলে একটা কামড় দিতেই গল্প সেটা ছিনিয়ে নিলো আর নিয়েই খেতে শুরু করলো। শুভ্র ঠোঁট কামড়ে হেসে বললো,
‘আরে আরে কি করছো আমি খাচ্ছিলাম তো! আমাকেও দাও একটু..!’
গল্প ততক্ষণে হাওয়াই মিঠাই সাবার করে পেটে চালান দিয়েছে। শুভ্রর দিকে ফিরে ওর হাত থেকে রজনীগন্ধার তোড়া টা নিয়ে সেটা দিয়ে ওর মুখে হালকা ছুঁইয়ে বলল,
‘ওটা তো আনহেলদি ছিলো শুভ্র। আপনি তো আবার আনহেলদি খাবার খান না!’
শুভ্র গল্পর শাড়ির আঁচল গলিয়ে তার উম্মুক্ত কোমরে শীতল হাত রাখতেই সে সহসা কেঁপে উঠলো। শুভ্র এবার তাকে একদম নিজের সঙ্গে মিশিয়ে নিয়ে ভীষণ আশ্লেষে বলল,
‘তাহলে একটু হেলদি খাবার দিন বেগম সাহেবা ওটাতে আমার পেটও ভরবে আর মনও।’
গল্প শুভ্রর বুকে আঁকিবুঁকি করতে করতে বলল,
‘তাহলে ডাইনিং এ চলুন আমি আজ আপনার ফেবারিট চিকেন ভেজিটেবল স্যুপ রান্না করেছিলাম।’
শুভ্র গল্পর ঠোঁটে বৃদ্ধা আঙুল দিয়ে স্লাইড করতে করতে বলল,
‘যখন সামনেই এতো হেলদি কিছু আছে তখন আর আমার কষ্ট করে ডাইনিং এ কেনো যেতে হবে! লেট মি টেস্ট ইট।’
গল্প কিছু বলার আগেই শুভ্র তার মুখ বন্ধ করে দিলো এক জোড়া দাম্ভিক ঠোঁটের সাহায্য –যা ইতিমধ্যে গল্পর ঠোঁটে স্বাধীন ভাবে বিচরণ করে যাচ্ছে। গল্প শুভ্রর গলার কাছটায় কলার টা হালকা করে চেপে ধরতেই শুভ্র যেনো আরেকটু পেয়ে বসলো –মেয়েটার শ্বাস নেওয়াই যেনো একটু দুষ্কর করে তুললো। শুভ্র যখন বুঝল গল্পর শ্বাস নিতে প্রবলেম হচ্ছে তখন সে সরে এলো কানের কাছে ফিসফিসিয়ে বলল,
‘সরি একটু বেশিই হয়ে গেছে বাট ইটস সো…’
গল্প তাকাতেই শুভ্র থেমে গেলো। শুভ্র আরও কিছু বলবে তার আগেই গল্প এক বিস্ময়কর কান্ড করে বসলো –দু পায়ের গোড়ালি উঁচু করে শুভ্রর কলার ধরে তার গলার অ্যাডমস অ্যাপল এ একটা চুমু খেয়ে দৌড়ে ভিতরে চলে গেলো। শুভ্র কয়েক সেকেন্ড আহাম্মকের মতো দাঁড়িয়ে রইলো; ব্যাপারটা বুঝতে পেরে চুলে হাত বুলিয়ে হেসে উঠলো।
শুভ্র ঘরে ডুকতেই গল্প তার দিকে একটা গিফট বক্স বাড়িয়ে দিয়ে বলল,
‘আজ আমাদের এনিভার্সারি অ্যাই হোপ কাজের চাপে ভুলে যাননি! এটা আমার তরফ থেকে একটা ছোট্ট গিফট –আপাতত টিউশনির টাকায় এটাই কিনতে পেরেছি। জব হলে আরও ভালো কিছু দিবো, ওকে!’
শুভ্র গল্পর বাড়িয়ে দেওয়া গিফট বক্সটা হতে নিয়ে সেটা খুলে দেখে একটা চমৎকার ঘড়ি। শুভ্র সঙ্গে সঙ্গেই তা হাতে পরে নেয় চোখে মুখে উপচে পড়া খুশি নিয়ে বলে,
‘এটা আসলেই চমৎকার তাহিয়াত –আজ থেকে আমি এটাই পড়ব। আর গিফট কখনো ছোট বড়ো হয় না ভালোবাসা টাই মুখ্য।’
গল্প হাসলো তৃপ্তির হাসি। শুভ্র এবার মন খারাপ করে বলল,
‘কিন্তু তাহিয়াত আমি তো তোমার জন্য কিছু আনতে পারিনি; মনেই ছিলো না সো সরি।’
শুভ্রর মনে ছিলো না আজ তাদের এনিভার্সারি! কথাটা ভাবতেই গল্পর মুখে আঁধার নেমে এলো কিন্তু শুভ্রকে তা বুঝতে না দিয়ে জোরপূর্বক মুখে হাসি টেনে বলে,
‘ইটস ওকে। আচ্ছা আমি আপনার খাবারটা গরম করি তাহলে।’
গল্প রুম থেকে চলে যেতে চাচ্ছিল শুভ্র তার হাত ধরে বলল,
‘তুমি কি রাগ করেছো?’
‘না তো!’
‘তাহলে চলো ডান্স করি। আমাকে এতো সুন্দর একটা গিফট দিলে একটু তো সেলিব্রেশন করাই উচিত।’
গল্প অবাক হয়ে বলল,
‘এই মাঝরাতে আপনার নাচতে মন চাইছে?’
শুভ্র অল্প ভলিউমে একটা গান ছেড়ে দিয়ে গল্পকে হেঁচকা টানে কাছে নিয়ে বলল,
‘তাতে কি! তুমি আমার দিকে মন দাও তাহলেই হলো।’
ব্যাকগ্রাউন্ডে “মেরে হাত মে, তেরা হাত হো” মিউজিক টা বাজছে। গল্প হুট করেই জানতে চাইল,
‘আচ্ছা এটা কি আপনার পছন্দের গান নাকি? যখনই আমার সাথে ডান্স করেন মেক্সিমাম টাইমেই এই মিউজিক টাই চালু করেন।’
‘ফেবরিট কিনা জানি না কিন্তু তোমার সঙ্গে ডান্স করার সময় এটাই প্রথম মাথায় আসে; তাই দিয়ে দেই।’
শুভ্র নাচের তালে তালে গল্পকে ভীষণ কাছ থেকে ছুঁয়ে দিচ্ছে। একপর্যায়ে গল্প অনুভব করে শুভ্র তার হাতে কিছু একটা পরিয়ে দিচ্ছে। সেদিকে তাকাতেই দেখে হালকা মোমের আলোয় চোখে পড়লো একটা ব্রেসলেট। গোল্ডের মধ্যে উপরে আবার ছোট ছোট সাদা ডায়মন্ড এর কাজ করা। গল্প বিস্ময় নিয়ে শুভ্রর দিকে তাকাতে শুভ্র তার কানের কাছে ফিসফিসিয়ে বলে,
‘হ্যাপি এনিভার্সারি আমার সত্তর হূরের সরদারনী।’
গল্প বিস্ময় নিয়ে বললো,
‘আপনার মনে ছিলো? একটু আগে যে বললেন আপনার মনে ছিলো না!’
‘যে আমার জীবনে আমার সমস্ত ক্লান্তি- ক্লেশ দূর করার টনিক নিয়ে এসে আমার লাইফটা ফুল ফুল করে তুলেছে –তার আগমনের দিন আমি কি করে ভুলে যাই!’
গল্প আপ্লূত হলো আবারও। শুভ্রকে পরম আবেশে জড়িয়ে ধরলো বুকে আদুরে ভঙ্গিতে নাক ঘেঁষে বলল,
‘ধন্যবাদ সাহেব!’
শুভ্র আলগোছে গল্পর কানের থেকে দুল গুলো খুলতে লাগলো। গল্প অবাক হলো,
‘এটা কি করেছেন?’
‘রুম টা এতো সুন্দর করে সাজালে –একদম ড্রিমি!’
‘তো?’
শুভ্র খুব সহজ ভঙ্গিতে বললো,
‘তো…তো এই ড্রিমি রুমে একটা ড্রিমি মোমেন্ট ক্রিয়েট করি চলো!’
‘আ….
গল্পকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে শুভ্র তাকে পাঁজা কোলে তুলে নিলো। গলায় নাক ঘেঁষতেই গল্প তার শার্ট কামচে ধরলো। শুভ্র ওই অবস্থাতেই গল্পর গলায় ছোট একটা চুমু খেয়ে বলল,
‘অ্যাম অ্যাই ফোর্সিং ইউ?’
গল্প লজ্জা শুভ্রর বুকে মুখ লুকালো। হালকা মাথা নাড়িয়ে না বুঝালো। শুভ্র ঠোঁট কামড়ে হেসে বলল,
‘দেন, লেটস গেট লস্ট ইন এ্যা ড্রিমি মোমেন্ট- জাস্ট ইউ এন্ড মি….’
___________________________
শুভ্রর মন মেজাজ আজ চূড়ান্ত খারাপ। তার মন-মেজাজ তুঙ্গে তুলার হোতা হলো তার একমাত্র বউ। সে আজ পাঁচ দিন হলো বাপের বাড়ি গেছে কিন্তু আসার কোনো নাম গন্ধ নেই। অথচ সেই ধুরন্ধর মহিলা কি ভালা-ভোলা মুখ করেই না বলেছিল– “শুভ্র আমি সত্যি বলছি দুদিন থেকেই এসে পরবো। এবার আর না করবেন না প্লিজ।”
বউয়ের ওমন ইনোসেন্ট মুখ দেখে শুভ্র কীভাবে কীভাবে যেনো গলে গিয়েছিল। আর সেটাই হলো তার কাল! ওই মহিলার ইনোসেন্ট মুখের আড়ালে ধুরন্ধরগিরি লুকিয়ে ছিলো তা তো আর সরল শুভ্র বুঝতে পারেনি! এই যে সে সকাল থেকে কলের উপর কল দিচ্ছে অথচ গল্প সেটা ধরারই নাম নিচ্ছে না –নিবে কিকরে নিশ্চয়ই তুশির সঙ্গে ঢেঙ ঢেঙ করে ঘুরে বেড়াচ্ছে। তার যে একটা বর আছে সেই হদিশ কি মহারানীর আছে!
ফাহিম শুভ্রর মেজাজের এমন অবস্থা দেখে বলল,
‘কিরে ভাই, সকাল থেকে এমন ফায়ার হয়ে আছিস কেনো? বউয়ের সাথে ঝগড়া-টগরা করেছিস নাকি?’
ফাহিমের কথায় শুভ্র কিছু বলবে তার আগেই আরাফ টিপ্পনী কেটে বলল,
‘বউ থাকলে তো ঝগড়া হবে মামা!’
ফাহিম আশ্চর্য হয়ে বলে,
‘বউ থাকলে মানে? ভাবি কই?’
‘কেয়ার সাথে কাল গল্প ভিডিও কলে কথা বলছিল– ময়মনসিংহ গেছে বাপের বাড়ি।’
ফাহিম হেসে বলে,
‘ওহ এটাই তবে কারন! তাই তো আমাদের শুভ্র সাহেবের মন মেজাজ আজকাল তুঙ্গে।’
শুভ্র ওদের হাসি-তামাশায় কোনো কথায় কান দিলো না। হুট করেই চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে বলে,
‘আমি আজকে লিভ নিচ্ছি তরা বাকিটা সামলে নিস।’
কথাটা বলেই শুভ্র গটগট করে বেরিয়ে গেলো। আরাফ আর ফাহিমের চোয়াল ঝুলে পড়লো। আরাফ অত্যন্ত কনফিডেন্সের সঙ্গে বলল,
‘এই ব্যাটা এখন নিশ্চয়ই শ্বশুর বাড়ির রাস্তায় ইউটার্ন নিবে আমি শিওর।’
ফাহিমও সায় দিয়ে বলল,
‘আমিও শিওর।’
আরাফ আর ফাহিম কথাটা বলেই একসঙ্গে হেসে উঠলো। তাদের কনফিডেন্স কে সত্য প্রমাণ করে দিয়ে শুভ্রর গাড়িটা সত্যি সত্যিই ময়মনসিংহের দিকে টার্ন নিলো। যাওয়ার পথে গল্পকে একটা ছোট্ট ম্যাসেজ পাঠালো –“মাই ডিয়ার ওয়াইফ, আজ আমিও দেখতে চাই তোমার ঠিক কয়টা পাখা গজিয়েছে -যে আমার কল পিক করার টাইম অব্ধি পাচ্ছো না!”
#চলবে
