#লাভ_আফটার_ম্যারেজ
#আনাহিতা_তুলি
#পর্ব_১১
গল্প গাড়িতে বসে আছে ঠিক শুভ্রর পাশটায়। আজ শুভ্র ড্রাইভ করছে না তাই তারা ব্যাক সিটে বসেছে। কিন্তু গল্প বুঝতে পারছে না শুভ্রর হয়েছে টা কি? ও তো কখনো তার সামনে এমন গম্ভীর রাগী রাগী মুখ ভার করে থাকে না! তবে আজ এমন কি হলো? যে কারনে শুভ্র এমন করছে! গল্প দু-একবার জিজ্ঞেসও করলো কিন্তু প্রতিত্তোরে শুভ্র তার দিকে গম্ভীর চোখে চেয়ে চুপ থেকেছে। শুভ্রর ওমন চাহনি দেখে সে আর কিছু বলেনি। নিজেও চুপচাপ ভূমিকা পালন করছে।
তাদের গাড়িটা এসে থামলো একটা সুনসান এলাকায়। এদিকটায় মানুষ আর যানবাহন হাতে গুনা কিছু। গাড়ি থামতেই শুভ্র ড্রাইভারের উদ্দেশ্য গম্ভীর গলায় বললো,
‘চাচা আপনি একটু বাহিরে যান। সামনেই চায়ের দোকান আছে, কিছু খেয়ে আসুন। আমি ডেকে নিব আপনাকে।’
ড্রাইভার সাহেব বিনয়ের সঙ্গে বলল,
‘আইচ্ছা বাবা। তোমরা থাক তাইলে, আমারে ডাক দিলেই হইবো।’
কথাটা বলেই উনি গাড়ি থেকে নামতে গেলে শুভ্র ওয়ালেট থেকে কিছু টাকা বের করে ড্রাইভার চাচার হাতে ধরিয়ে দেয়। ড্রাইভার সাহেব খুশি মনে গাড়ি থেকে নেমে যায়।
গল্প নড়েচড়ে বসল। গাড়ির ভিতর এখন থমথমে পরিবেশ। শুভ্র এখনো কিছু বলছে না। গল্পই কথা পারলো,
‘শুভ্র আপনি কথা বলছেন না কেনো? এভাবে চুপচাপ থাকলে আমাকে ডেকে আনার মানে কি?
কোনো সমস্যা?’
শুভ্র এবার গল্পর দিকে ফিরে তাকাল। সে একটা মিটিং এ্যাটেন্ড করতে যাচ্ছিল। হুট করেই তার চোখ যায় রেস্টুরেন্টের কাচের দেয়াল বেদ করে গল্পর দিকে। মুহূর্তেই সে গাড়ি থামায় কিন্তু তখনই চোখে পরে এক অপ্রত্যাশিত দৃশ্য। গল্পকে একটা ছেলে হাঁটু মুড়ে বসে গোলাপ এগিয়ে দিচ্ছে; গল্প আবার সেটা হাসতে হাসতে গ্রহণও করলো। ক্ষনিকের মধ্যে বিষয়টা মস্তিষ্কে ক্যাচ করতেই রাগে তার ভ্রম্য থালু জ্বলে উঠে। নিমিষেই দৃষ্টি হয় প্রখর হাত হয় মুষ্টিবদ্ধ। গল্পর হাতে এখনো লাল গোলাপের তোড়া টা; যা দেখে শুভ্রর রাগটা দপদপ করে জ্বলে উঠলো দ্বিগুণ গতিতে। গল্পর হাত থেকে ফুলের তোড়া টা নিয়ে গ্লাস দিয়ে বাহিরে ছুড়ে ফেললো। আকস্মিক ঘটনায় গল্প বিস্মিত হতেও ভুলে গেলো। শুভ্র রাগী গলায় বললো,
‘আপনার হাতের এই… এই ফুল গুলোই আমার প্রবলেম। বুঝেছেন?’
গল্প যেনো বোকা বনে গেলো। বলে কি এই লোক? যে নিজেই তার সাথে দেখা হলে বেশিরভাগ সময় ফুল নিয়ে আসে। আর আজ তিনি কিনা বলছেন তার ফুলে সমস্যা? বিস্ময় নিয়ে বলল,
‘কিহ? আপনার ফুলে সমস্যা?’
কথাটা বলতেই শুভ্র তার দিকে চাইল। শুভ্রর ওই জ্বলন্ত অঙ্গার চোখের দিকে তাকিয়ে গল্প নিবে গেলো। চোখ নামিয়ে ধীমী স্বরে বলল,
‘আপনি এমন উইয়ার্ড রিয়াকশন দিচ্ছেন কেনো? কিছু কি হয়েছে, বলুন? না বললে বুঝব কি করে!’
শুভ্র গল্পকে একহাতে টেনে তার নিজের সাথে আষ্টেপৃষ্ঠে ধরে দাঁতে দাঁত চেপে বললো,
‘আমার বউ অন্য কোনো ছেলে থেকে ফুল নিবে আর আপনি তার থেকে কেমন রিয়াকশন আশা করছেন? খুশিতে ঝুমঝুম করব আমি, হু? ওই ছেলে আপনাকে প্রপোজ করেছে, হুম? আর আপনি তার বাড়িয়ে দেয়া ফুলও নিলেন!’
গল্প এতোক্ষণে আন্দাজ করতে পারলো শুভ্রর হাঠাৎ এতো রাগের কারন। মহাশয় জ্বলছে, বুঝে আসতেই ঠোঁটের কোনে একটু হাসি এলো। তবে তা লুকিয়ে মুহুর্তেই চট করে কিছু একটা ভেবে ইনোসেন্ট ফেস করে বলে,
‘আপনি রেগে যাচ্ছেন কেনো শুভ্র? ফুলই তো ছিলো শুধু!’
শুভ্র হতভম্ব হয়ে গেলো কিছুক্ষণের জন্য। পরপরই রাগে তার গা জ্বলে উঠলো। গল্পকে আরও খানিকটা শক্ত করে চেপে ধরে হিসহিসিয়ে বলল,
‘শুধুই ফুল? মাই ডিয়ার ওয়াইফ, আমি ছাড়া অন্য কোনো ছেলের থেকে ফুল নেওয়া তো দূরের কথা তার বাড়িয়ে দেওয়া ফুলের দিকে আপনার তাকানোও নিষিদ্ধ! গট ইট? তাছাড়া আমি মানুষটা কিন্তু এতোটাও ভালো নই যতটা দেখেন। কে বলতে পারে হুট করেই একদিন দেখলেন আপনার দিকে বাড়িয়ে দেয়া ফুলের হাতটা আর কোনোদিন ফুল ধরার অবস্থাতেই থাকল না!’
এই পর্যায়ে গল্প একটু অবাক হয়ে বলল,
‘কি করবেন?’
শুভ্র একটু হাসলো। হাসিটা কেমন জানি অদ্ভুত টেকল গল্পর কাছে। গল্পকে এভাবে চেয়ে থাকতে দেখে শুভ্র তার কপালে পড়ে থাকা চুলগুলো ফু দিয়ে সরাল। ভীষণ সহজ কিন্তু থমথমে গলায় বলল,
‘ইউ নো হোয়াট; আমি ছোট বেলা থেকেই একটু হিংসুটে টাইপ ছেলে। যেটা আমার সেটা একান্তই আমার। তার এক ইঞ্চি ভাগ তো দূরের কথা ছায়াও আমি শুভ্র কাউকে মারাতে দেই না। আর সেখানে আপনি ভুলেও ভাববেন না আমি আপনার ব্যাপারে আপনার এক ইঞ্চি ছায়ার ভাগও ছাড় দিবো!’
গল্প ফ্যালফ্যাল করে শুভ্রর কথা শুনে গেলো। আজকের এই শুভ্রকে তার বড্ড অচেনা লাগছে; যে তার ব্যাপারে অনেক রক্ষণশীল মনোভাব পোষণ করে। শুভ্র আবারও বলল,
‘ডোন্ট ওয়্যারি, ইফ এ্যানিওয়ান হু টাচ-ইজ ইউুর শ্যাডো; দেন অ্যাই উইল এন্ড দেম। এন্ড অ্যাই মিন ইট।’
শুভ্রর এমন শীতল অথচ তীর্যক অভিব্যক্তিতে গল্প আঁতকে উঠল। স্তব্ধ গলায় বলল,
‘কিহ্? আ…’
গল্পর কথা শেষ হওয়ার আগেই শুভ্র আবারও বলে,
‘তোমাকে এখন থেকে আর আপনি-আজ্ঞে করা হবে না। বেশি লাই দিয়েছি বলে যার তার থেকে ফুল এক্সপেক্ট করছো। ওসব আর হবে না; এখন থেকে স্রেফ তুমি! ’
গল্প বিস্ময়ে ডুক গিলল। পরপরই হাত উঁচিয়ে বলল,
‘রিলাক্স শুভ্র রিলাক্স। আপনার মনে হচ্ছে না আপনি একটু বেশিই হাইপার হয়ে যাচ্ছেন?’
শুভ্র তীক্ষ্ণ চোখে তাকাল গল্পর দিকে। তার হাইপার হওয়াটা কি স্বাভাবিক না? সে কোনো মহান পুরুষ নয়, যে তার বউয়ের দিকে কেউ ভালোবেসে ফুল তুলে দিবে আর সে সেটা চেয়ে চেয়ে দেখবে। শুভ্র কিছু বলতে যাবে তার আগেই গল্প তাকে থামিয়ে দিয়ে বললো,
‘আপনি কি আমাকে কিছু বলতে দিবেন?’
বউয়ের গলার ভারী আওয়াজ টের পেয়ে শুভ্র এই পর্যায়ে কিছুটা নিভল। গল্প আবারও বলে,
‘আপনি যা ভাবছেন তেমন কিছুই না। ওটা আমার ফ্রেন্ড ছিল তাছাড়া ও মুসলিমও নয়। সে একটি মেয়েকে পছন্দ করে তাকে প্রপোজ করার জন্যই এই ফুলগুলো নিয়ে আসে। মাঝখান থেকে তুশি ওকে ফোর্স করে তার প্রপোজ করার আগে একটু প্রেকটিস করতে যাতে নার্ভাস না হয়। তুশি মূলত মজাই করছিল ওর সাথে। আর সূর্যও ওর কথায় রাজি হয়। এই যাহ্!’
একদমে কথাগুলো বলে গল্প শ্বাস ফেললো। শুভ্রর হাতের বাঁধন তখন অনেকটা ঢিলে হয়েছে। সরু চোখে চেয়ে বললো,
‘তাহলে ও তোমাকে ফুল গুলো কেনো দিলো? এটা তো…’
শুভ্রকে কথা শেষ করতে না দিয়েই গল্প বলে,
‘ওহো! সূর্য ফুলগুলো আমাকে দেয় নি। আমি নিজেই ওর থেকে নিয়েছি– ইনফেক্ট জোর করেই এনেছি। ও বেচারা তো মুখ বেজার করে পিছন থেকে কতবার ডাকল ফুল রেখে আসতে!’
শুভ্রর দৃষ্টি এবার স্থির হলো। সে কি একটু বেশিই করে ফেললো আজ? কথাগুলো ভাবতেই ওর চোখের ভেসে উঠে– গল্পর সামনে সূর্যর হাঁটু মুড়ে বসে ফুল বাড়িয়ে দেওয়ার দৃশ্য টা। পরপরই মনে হলো না সে যা দেখেছে তাতে এমন রিয়েক্ট করা খুব একটা অপ্রত্যাশিত না। তবে ভুল তো সে করেইছে এবার সরি টাও তো তাকেই বলতে হবে। তবে তার কিছু বলার আগেই গল্প বলে উঠে,
‘শুভ্র আশা করি আপনি আপনার প্রশ্নের উত্তর পেয়েছেন। এবার আমাকে হোস্টেল পর্যন্ত ছেড়ে আসতে পারবেন নাকি আমি অন্য গাড়ি করে চলে যাবো? আমার বিকেলে একটা টিউশন আছে।’
শুভ্র তখনও তার দিকে শীতল দৃষ্টিতে থাকিয়ে আছে। গল্প কিছু না বলে গাড়ির দরজা খুলতে উদ্ধত হলে শুভ্র তার হাত নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে নিলো। বলল,
‘এতো মাতব্বরি করতে হবে না। বসুন চুপচাপ।’
শুভ্র ড্রাইভার চাচাকে একটা কল দিতেই উনি দু’মিনিটের ভিতর চলে আসে। পুরোটা সময় কেউই আর কোনো কথা বলেনি। শুভ্র কি বলবে তা গুছিয়ে উঠার আগেই দেখা গেলো; তাদের গাড়িটা গল্পর হোস্টেলের সামনে ব্রেক কষলো। গল্প কিছু না বলেই বেরিয়ে গেলো। আজকের এই কান্ডে শুভ্রর উপর তার অল্প বিস্তর অভিমানও হলো বৈকি। তবে একটা বিষয় বুঝতে পারলো– শুভ্রর হয়ত তাকে অন্য কারও সঙ্গে খুব একটা সহ্য হয় না। যার একটা ছোট্ট নমুনা আজ সে দেখলো।
গল্প নেমে যেতেই শুভ্রর ফোন টা বেজে উঠলো। শুভ্র তা রিসিভ করে কানে ধরলো,
‘শুভ্র তুই কই ব্যাটা? আমরা একঘন্টা ধরে ওয়েট করছি তবু তর আসার নাম গন্ধ নেই! মিটিং টা কি ক্যানসেল করে দিব!’
আরাফের রাগ জায়েজ আছে। সে আজ অনেকটা কেয়ারলেসের মতো কাজ করেছে। এতোটা কেয়ারলেস সে কবে হলো; ভাবার সময়টুকুও পেলো না। শুভ্র হাতের ঘড়িতে সময় দেখল। পরপরই বলল,
‘আসছি আমি। আর বিশ মিনিট ওয়েট কর। ক্লাইন্ডদের একটু বুঝিয়ে রাখ ভাই। আমি একটু ঝামেলায় ছিলাম।’
আরাফ ভ্রু কুচকে বলল,
‘ঝামেলা? কি হয়েছে? অল ওকে?’
‘নাউ অল ওকে। আসছি আমি।’
বলেই কল ডিসকানেক্ট করলো। গাড়ি থেকে বের হয়ে ড্রাইভারের উদ্দেশ্য বলল,
‘চাচা আপনি পাশের সিটে বসুন। আমাকে ড্রাইভ করতে দিন অনেক দ্রুত পৌঁছাতে হবে।’
ড্রাইভার একটু ইতস্তত করল। মালকিন বলেছে শুভ্রকে যেনো ফাস্ট ড্রাইভিং করতে না দেয় কেননা; একবার শুভ্র ফুল স্পিডে গাড়ি চালিয়ে এক ভয়াবহ এক্সিডেন্ট এর সম্মুখীন হয়েছিল। যদিও সেবার আল্লাহর অশেষ রহমতে শুভ্রর খুব একটা ক্ষতি হয়নি। সেই থেকেই উনার ভয় শুভ্রর ড্রাইভিং নিয়ে। তার ধারনা শুভ্র অনেক ফাস্ট বেখায়লি গাড়ি চালায়। ড্রাইভার চাচাকে এমন আমসি মুখ করে থাকতে দেখে শুভ্র ফোঁস করে শ্বাস ফেললো। বলল,
‘চিন্তা নেই আমার ড্রাইভিং যথেষ্ট ভালো। আম্মুর কথা ভাবতে হবে না। আপনি ওদিকে বসুন; আমাকে দ্রুত একটা মিটিং এ্যাটেন্ড করতে হবে।’
ড্রাইভার সরে বসলো। শুভ্র গাড়ি স্টার্ট দিল তাকে দ্রুতই যেতে হবে।
_____________________________
তখন রাত এগারোটা বাজে। গল্প বইয়ে মুখ গুঁজে পড়ছে। তার মনোযোগের বিগ্ন ঘটে ফোনের কর্কশ আওয়াজে। অসময়ে এমন কল আসায় গল্প বড্ড বিরক্ত হলো। আজ শুভ্রর সাথে ওমন টুকটাক কথাকথির পর থেকেই তার মেজাজ চুড়ান্ত হয়ে আছে। তখন তো সরি বললোই না এমনকি তারপরেও কল করে মহাশয়ের সরি বলার টাইম হয় নি। গল্প ঠিক করেছে শুভ্র কল না দিলে সেও কল দিবে না। শুভ্র আজ নিজে থেকে ভুল বুঝে তার উপর গরম হয়েছিল; এখন তাকে নিজ থেকেই সেটা সল্ভ করতে হবে, হু!
গল্প ভেবেছিল হয়ত শুভ্র ফোন দিয়েছে তাই অতি আগ্রহী হয়ে ফোনটা নিলো। কিন্তু যতটা আগ্রহী সে ছিল ততটাই রেগে গেলো ফোন স্কিনে সিম কোম্পানির নাম্বার দেখে। এই রাতের বেলায় ওই বেয়াদব সিম কোম্পানি গুলোকে ফোন কেন করতে হবে? তাদের কি খেয়ে দেয়ে আর কোনো কাজ নেই নাকি? এই রাত-বিরেতে মানুষকে ডিসটার্ব করে! মেজাজ বিগড়ে গিয়ে গল্প তাদের উদ্দেশ্য ভয়াবহ কিছু গালি ছুড়লো।
মিনিট পাঁচেক পর তার ফোন টা আবারও বেজে উঠলো। গল্প এবার অতটা আগ্রহী হয়ে ফোন তুলল না ফলে কলিং হতে হতে ফোন টা কেটে গেলো। পরপর আবারও বেজে উঠলো। গল্প এবার ফোন তুলে সামনে নিতেই ঠোঁটের কোনে হাসি এলো মনটা হুট করেই খুশি হয়ে গেলো। তবে তা প্রকাশ না করে ফোন টা তুলল।
‘গল্প এই মুহূর্তে আমি তোমার হোস্টেলের সামনে আছি। একটু নিচে আসো।’
শুভ্রর এমন কথায় গল্প ভরকাল কিছুটা। এতো রাতে যে হোস্টেল থেকে বের হওয়া যায় না, লোকটা কি সে সম্পর্কে অবগত নয় নাকি!
‘এতো রাতে যে হোস্টেল থেকে বের হওয়া নিষেধ আপনি কি তা জানেন না? না জেনে থাকলে আমি জানিয়ে দিলাম, এখন বের হওয়া পসিবল নয়।’
শুভ্র একটু হাসলো। বলল,
‘সব পসিবল। তুমি শুধু নিচে নামো– দেখবে দারোয়ান নিজ থেকে তোমাকে গেইট খুলে দিবে।’
গল্প কাঠকাঠ গলায় বলল,
‘ আমি রুলস ব্রেক করতে পারব না। আপনি চলে যান; আমি আসছি না।’
‘তাহলে আমিও ওয়েট করছি। দেখি অপেক্ষার অবসান কখন হয়!’
গল্প ফোন রেখে দিল। তবে ঘর জুড়ে পায়চারি করতে থাকল। একবার জানালা দিয়ে উঁকি দিতেই দেখে শুভ্র গাড়িতে হেলান দিয়ে এদিকেই তাকিয়ে আছে। গল্প দ্রুত সরে আসে। ফোন লাগায় শুভ্রকে,
‘আপনি এখনো যাচ্ছেন না কেনো? এই রাত-বিরেতে এসবের মানে কি?’
‘বললাম তো আপনি নিচে না আসলে যাচ্ছি না। আপনি কি আসছেন?’
শুভ্র একবার আপনি তো একবার তুমি সম্বোধনে গল্প নিঃশব্দে হেসে ফেললো। বলল,
‘আপনি অনেক জেদী শুভ্র।’
‘দুঃখিত এই জেদী শুভ্র টা আপনার হাজব্যান্ড।’
গল্প কিছু না বলেই ফোন রাখল। তুশি এতোক্ষণ গল্পর কার্যকলাপ দেখছিল। এবার সে ভ্রু কুচকে বলল,
‘তর মনে কি একটুও দয়া মায়া নেই। তুই এখনই যাবি। বেচারা শুভ্র ভাই টা কখন থেকে ওয়েট করছে!’
শুভ্রকে বেচারা বলায় গল্প মনে মনে বিদ্রুপ হাসল। আজ সে শুভ্রর যে নমুনা দেখেছে– এতে তার বুঝ হয়েছে; শুভ্র বেচারা টাইপ কখনোই না।
তবে এবার সে গায়ে ওড়না টা জড়িয়ে ঘর থেকে বের হলো। এবং আশ্চর্য জনক ভাবে দারোয়ান নিজ থেকে হেসে হেসে তার জন্য গেইট খুলে দিলো। বুঝল সব শুভ্রর কারসাজি।
বাহিরে আসতেই দেখা গেলো শুভ্র তার দিকে হেসে এগিয়ে আসছে। গল্প শুভ্রর ওই হাসি দেখেই থমকে গেলো– উফফ….লোকটার হাসিটা এতো মারাত্মক কেনো! সে তো ওই হাসিতেই ঘায়েল।
শুভ্র কিছু না বলে গল্পর একটা হাত নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে বলল,
‘চলুন হাঁটি। ’
‘এতো রাতে?’
‘ইয়েস, নাইট ওয়াক।’
গল্প মাথা দুলিয়ে শুভ্রর সাথে হাঁটছে। দুজনেই চুপচাপ। একটু সামনেই একটা চায়ের টঙ। শুভ্র বলল,
‘চা খাবেন?’
গল্প আবার চা প্রেমি তাই চায়ের প্রস্তাব কখনো ফেরায় না। সাথে সাথেই বলে উঠলো,
‘অবশ্যই।’
বলেই একটু বিব্রত হলো। শুভ্র হেসে বলল,
‘চলুন খাই।’
দুজনে দু কাপ চা খেলো ওই রাতের নিস্তব্ধতায়। গল্প বিষয়টা দারুণ উপভোগ করছে। হুট করেই তার মনে হচ্ছে শুভ্রর সঙ্গ তার ভীষণ পছন্দ। চা খাওয়ার পর আরও মিনিট পাঁচেক হাঁটা হাঁটি করে তারা হোস্টেলের সামনে আসল। এই এতোটা সময়ে কেউই কোনো কথা বলেনি। শুভ্র গল্পকে দাঁড়াতে বলে গাড়ি থেকে কিছু একটা বের করল। পরপরই গল্প দেখে শুভ্রর হাতে একটা লাল গোলাপের তোড়া। গল্পর দিকে তা বাড়িয়ে দিয়ে নরম স্বরে বললো,
‘সরি। আজ দুপুরে তোমার উপর মেবি একটু বেশিই রুড বিহেভ করে ফেলেছি।’
গল্প অবাক হলো ভীষণ। তবে ফুল গুলো নিয়ে একটু খুঁচিয়ে বললো,
‘তো গাড়িতে যে বললেন আপনার নাকি এই ফুলে সমস্যা! ’
গল্পর কথার ধরন শুভ্র বুঝে গেলো নিমিষেই। নিরেট গলার বলল,
‘উহুম… ফুলে সমস্যা না। তুমি অন্য কারও থেকে ফুল নিলে সেই ফুলে সমস্যা।’
গল্পর ঠোঁটের কোনে অস্পষ্ট একটা হাসি দেখা গেলো। বলল,
‘এখন আসি। অনেক রাত হয়েছে।’
গল্প এক পা বাড়াতেই শুভ্র হুট করে বলল,
‘গল্প তোমার গালে মেবি কিছু একটা লেগে আছে।’
গল্প গালে হাত বুলিয়ে বলল,
‘কোথায়?’
‘আমাকে দেখতে দাও।’
কথাটা বলেই শুভ্র গল্পর গালে চট করে একটা চুমু খেলো।
আকস্মিক এই ঘটনায় গল্প স্তব্ধ হয়ে গেলো। শুভ্র ঠোঁট কামড়ে হেসে বলল,
‘সরিয়ে দিয়েছি। এবার ভিতরে যান। বাই দ্যা ওয়ে কাল কিন্তু আপনার জন্য একটা সারপ্রাইজ আছে।’
শুভ্র গাড়ির দিকে এগিয়ে যায়। গল্প তখনও দুম মেরে দাঁড়িয়ে রইলো। আকস্মিক এই ঘটনাটা তার হজম করতে সময় লাগলো। পরপরই অস্পষ্ট আওড়ালো– লোকটা তো ভারী ধুরন্ধর!!
#চলবে
#লাভ_আফটার_ম্যারেজ
#আনাহিতা_তুলি
#পর্ব_১২
জাহানারা ব্রেকফাস্ট সাজাচ্ছিল তখন। শুভ্র আর শাহিনুজ্জামান একসঙ্গেই ডাইনিং এ এলেন। শাহিনুজ্জামান ব্রেডে মাখন লাগাতে লাগাতে শুভ্রকে জিজ্ঞেস করলো,
‘তোমার গুনধর ছোট ভাইয়ের এক্সাম কবে শেষ? বলেছে কিছু? তাকে তো আজকাল ফোনে পাওয়াই দুষ্কর!’
শুভ্র মুখের জুস টুকু গিলে বলল,
‘এই মাসেই শেষ। নেক্সট মান্থে দেশে আসবে বলেছে।’
শাহিনুজ্জামান এবার কিছু টা ভারী গলায় বলল,
‘আমার কাছে দু-একটা লিংক আসছে সে নাকি আজকাল নাইটক্লাবের আড্ডায় খুব শামিল হয়েছে? শুনো, তাকে বলে দিও –নাইটক্লাবে যাওয়া অব্ধি কোনোমতে মেনে নিলেও যদি আর পাঁচটা বিদেশি বন্ধুদের সঙ্গে তালে তাল মিলিয়ে লাল পানীয় পান করে; তবে তার জন্য আমি তাকে মোটেই স্পেয়ার করব না।’
শুভ্র কপাল কুঁচকে ফেলল। মানতেই হবে তার বাবার হাত বহুত লম্বা। নাহলে এখানে বসেই সূদুর লন্ডনে ছেলে কি করছে না করছে তার হদিশ রাখা চারটি খানি কথা না। ফোঁস করে শ্বাস ফেলে বলল,
‘ডোন্ট ওয়্যারি। শাওন ড্রিংক করবে না। ও দেশের বাহিরে থাকলেও আমাদের পারিবারিক শিক্ষা ভুলেনি। এমনটা হবে চিন্তা করো না। আর ক্লাবে গিয়েছিল তো তার ফ্রেন্ডদের বার্থডে পার্টিতে।’
শাহিনুজ্জামান টেবিল ছেড়ে উঠতে উঠতে বলল,
‘না হলেই ভালো। জাহান আমি আসছি, আজকে ফিরতে লেইট হবে।’
কথাটা বলেই গটগট করে বেরিয়ে গেলো। জাহানারা চেয়ে রইলেন স্বামীর প্রস্থানের দিকে। তারপর শুভ্রকে বলল,
‘হ্যাঁরে শুভ্র, শাওনকে বলবি ওসব ক্লাব টাবে আর না যেতে। হঠাৎ করে বন্ধুদের পাল্লায় পড়ে যদি ভুলে ওসব খেয়ে ফেলে। তবে তর বাবাকে তো চিনিসই বাড়িতে একেবারে তুলকালাম কান্ড বাঁধিয়ে ছাড়বে।’
শুভ্র তার বাবা-মার এতো চিন্তা দেখে যারপরনাই অবাক। শাওন তো ছোট না। হ্যাঁ ওই একটু উড়নচণ্ডী স্বভাবের কিন্তু বেয়ারা না।
‘ওকে আমি বলে দিব আম্মু। এবার অযথা চিন্তা থামাও।’
জাহানারা আর কিছু বলার আগেই তার সেলফোন টা বেজে উঠলো। হাতে নিয়ে দেখে আরাফের ফোন। তিনি ভ্রু কুচকে ফেলেন আরাফ কেন তাকে এই সময় ফোন দিতে যাবে! ফোন রিসিভ না করেই শুভ্রকে তাড়া দিয়ে বলল,
‘এ্যাই শুভ্র আরাফ ফোন দিচ্ছে। তর ফোন কি বন্ধ নাকি?’
‘না তো আমার ফোন তো অন। তুমি রিসিভ করে জেনে নাও কেনো ফোন দিলো!’
জাহানারা তাই করলেন। ফোন রিসিভ করতেই আরাফ উচ্ছ্বসিত হয়ে সালাম দিলো তাকে। ছটফটে গলায় বললো,
‘আমার সুইট আন্টি টা কেমন আছে? ভালো তো?’
জাহানারা হেসে বলল,
‘ আলহামদুলিল্লাহ ভালো, বাবা। তুমি কেমন আছো? কেয়া মামনি কেমন আছে?’
‘আমরাও ভালো আছি আন্টি। আপনাকে একটা দারুন নিউজ দিতে ফোন দিলাম আন্টি।’
জাহানারার সরল মন অন্য কিছু ভেবে নিলো,
‘খুশির সংবাদ বুঝি বাবা!’
‘জ্বি আন্টি অবশ্যই খুশির সংবাদ।’
‘তাহলে তো মিষ্টি নিয়ে এসে বলা উচিত ছিল। আচ্ছা বাদ দাও, কেয়া মামনি কোথায় আছে? ওর কিন্তু এই সময় বেশি বেশি যত্ন নিবে আর রেগুলার চেকাপ করাবে।’
আরাফ ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেলো। কথা গুলোর মানে বুঝতেই জ্বিব কাটলো। তাড়াহুড়ো করে বলল,
‘না না আন্টি আপনি যা ভাবছেন তা না।’
জাহানারা বিব্রত হেসে বলল,
‘তা না? তাহলে তুমি যে বললে খুশির সংবাদ?’
‘খুশির সংবাদ-ই তবে সেটা অন্য কিছু।’
জাহানারা হেসে বলল,
‘আচ্ছা তবে, বল শুনি।’
আরাফ ঝরঝরে গলায় বললো,
‘আন্টি শুভ্রর আগে আমিই আপনাকে বলে দেই– আমাদের কোম্পানি বড় একটা প্রজেক্ট লঞ্চ করতে যাচ্ছে আন্টি।’
জাহানারা খুশি হয়ে বলল,
‘ আলহামদুলিল্লাহ আলহামদুলিল্লাহ। এটা তো খুবই ভালো খবর বাবা।’
আরাফ আরও বলে,
‘আমরা ফরেইনার একটা ক্লাইন্ডের সাথে মিটিং ঢিল করতে শ্রীমঙ্গল যাবো আন্টি। আর আমরা ঠিক করেছি দু -তিন’দিন সেখানে ঘুরাঘুরিও করব একটু। আমার সাথে কেয়াও যাবে।’
জাহানারা খুশি মনে সব শুনছে। ছেলেমেয়েদের সাফল্যে তিনি নিজেও দারুণ খুশি। ওপাশ থেকে আরাফের গলা ভেসে আসে,
‘আন্টি যেহেতু আমরা কাজের পরে একটু ঘুরাঘুরি করব আর তাছাড়া আমার সাথে কেয়াও যাচ্ছে। তাই আমি শুভ্রকে বলেছিলাম ও যেনো গল্পকে আমাদের সাথে নিয়ে চলে। মেয়েটার ভালোই লাগবে কেয়াও তো আছে। কিন্তু শুভ্র কে বলাতে ও হ্যাঁ না কিছুই বলল না। ’
জাহানারা চট করেই খুশি হয়ে গেলেন কিছু একটা ভেবে। তার ছেলেটা এতো বোরিং কেনো? ভেবেই তিনি বিরক্ত হলেন।তবে আরাফকে আশ্বাস দিয়ে বললো,
‘তুমি একদম ভেবো না আরাফ। শুভ্রকে হ্যাঁ বলানোর দায়িত্ব আমার। যাবে না মানে! অবশ্যই যাবে।’
আরাফ খুশি হয়ে ফোন রাখল। জাহানারা ছেলের দিকে চাইলেন। শুভ্র এই মুহূর্তে ফোন ঘাটাঘাটি করছে। ধ্যান ভাঙলো মায়ের গলার আওয়াজে,
‘তরা নাকি শ্রীমঙ্গল যাচ্ছিস? আমাকে তো বললি না?’
শুভ্র ফোন থেকে চোখ তুলে বলল,
‘আজই বলতাম। কিন্তু তার আগেই আরাফ বলে দিল।’
জাহানারা এবার আসল কথায় আসলেন,
‘আরাফের সাথে নাকি কেয়াও যাচ্ছে! তাহলে তুইও গল্পকে সঙ্গে নিয়ে যা। মেয়েটাকে নিয়ে তো এমনেতে কোথাও ঘুরতে যাস না; এখন একটা সুযোগ এসেছে নিয়ে যা বাবা।’
‘কিন্তু আম্মু তাহিয়াতের তো ক্লাস মিস হবে এতে।’
জাহানারা চট করেই বলল,
‘কিন্তু তরা তো শুনলাম বৃহস্পতিবারে যাচ্ছিস। আর শুক্রবার তো এমনেতেই বন্ধ। তাছাড়া দু-একদিন ক্লাস মিস দিলে কিছু হবেও না।’
শুভ্র নিরেট গলার বলল,
‘কিন্ত গল্পর বাবা-মা আই মিন আঙ্কেল আন্টি উনারা কি পারমিশন দিবেন এখন?’
জাহানারা ফুল কনফিডেন্সের সঙ্গে বলল,
‘তুই ওসব নিয়ে চিন্তা করিস না। ভাইসাব আর আপা দুজনেই খুব অমায়িক আমি বললে তারা কিছুতেই না করবে না।’
শুভ্র ঠোঁটের কোনে হাসিটা লুকিয়ে স্বাভাবিক গলায় বলল,
‘দেন ওকে। তুমি কথা বলো, আমার কোনো প্রবলেম নেই।’
কথাটা বলেই শুভ্র উঠে গেলো। জাহানারা খুশি খুশি মন নিয়ে হাতের কাজটা দ্রুতই সারছেন। তাকে তো আবার গল্প আর তার বাড়িতে ফোন দিয়ে খবরটা জানাতে হবে।
_____________________________
গল্প সারা রুম জুড়ে পায়চারি করছে। একটু আগেই জাহানারা ফোন দিয়েছিল বলল– শুভ্র নাকি একটা কাজে শ্রীমঙ্গল যাচ্ছে। কাজ শেষে আবার দু-তিন দিন ঘুরাঘুরিও করবে, তাই সেই ভ্রমণের সঙ্গী যেনো গল্পও হয়। ঘুরতে যাওয়ার কথাতে গল্পর মন বাক-বাকুম করে উঠলেও– মুখের উপর কিছু বলতে পারেনি। তবে শুধু এটুকু ইনিয়েবিনিয়ে বলেছিল বাবার পারমিশন টা প্রয়োজন এতে। জাহানারা আমোদিত গলায় বলল– ওসব নিয়ে তুমি চিন্তা করো না মা। ভাইসাব পারমিশন দিবেন দেখে নিও। জাহানারার সাথে কথা শেষ করে ফোন রাখতেই নিলুফারের কল আসে। এবং অতি আশ্চর্য জনক ভাবে জানায় –সে যেনো শুভ্রর সাথে অবশ্যই শ্রীমঙ্গল এ-র উদ্দেশ্য রওনা দেয়। তার বাবা ইমতিয়াজ রহমানের ও নাকি এতে কোনো আপত্তি নেই।
বিষয়টাতে গল্প যারপরনাই অবাক হয়েছিল। সে লাস্ট কিছু মাস আগেও তার পুরো ফ্যামিলির কাছে নেচে-কুঁদে ট্যুরে যাওয়ার পারমিশন চেয়েছিল। কিন্তু তাদের উত্তর ছিলো একেবারে অনড় –না। কিন্তু এখন কি নিশ্চিন্তেই না এক কথাতে শুভ্রর সাথে ঘুরতে যাওয়ার পারমিশন দিয়ে দিল!
কিন্তু কথা হলো শুভ্র তো তাকে এই ব্যাপারে কিছুই বলেনি। আচ্ছা গতকাল রাতে যে বলছিল তার জন্য একটা সারপ্রাইজ আছে, তবে কি এটাই সেই সারপ্রাইজ!
কথাগুলো ভাবতে ভাবতেই দোনোমোনো করে ফোন লাগাল শুভ্রর ফোনে। রিসিভ হলো কয়েক সেকেন্ডই। গল্প সালাম দিয়ে কিছুক্ষন চুপচাপ থেকে বলল,
‘আপনি শ্রীমঙ্গল যাচ্ছেন?’
শুভ্র চেয়ারে হেলান দিলো আরাম করে। মৃদু হেসে বললো,
‘আমি না আমরা। দ্যাট মিন’স আমি এবং তুমি। সাথে অবশ্য আরাফ, কেয়া আর ফাহিমও যাচ্ছে।’
‘আমাকে তো আগে বলেননি? এটাই আপনার সারপ্রাইজ ছিলো বুঝি?’
শুভ্র হেসে বললো,
‘ইয়েস। তুমি বুঝতে পেরেছো! গ্রেট।’
শুভ্রর কথার মধ্যেই আরাফ আর ফাহিম ওর কেবিনে ডুকল। শুভ্র গল্পকে পরে ফোন দিবে বলে কল ডিসকানেক্ট করল। আরাফ অবাক হওয়ার ভান করে বলল,
‘এটা আমি কি দেখছিরে ফাহিম; আমাদের মোস্ট ডিসিপ্লিন বয় শেহজাদ আহমেদ শুভ্র কিনা অফিস আওয়ারে ফোনে তার বউয়ের সাথে প্রেমালাপ করছে! এটাও দেখতে হলো!’
ফাহিম হেসে ফেললো। শুভ্র তার দিকে তীক্ষ্ণ চোখে তাকাল বলল,
‘বাজে না বকে যা বলতে এসেছিস বল।’
আরাফ এবার রয়েসয়ে বলল,
‘আরে ভাই, কেয়া জেদ ধরেছে আমাদের নাকি ট্রেনে করে শ্রীমঙ্গল যেতে হবে। ট্রেনে গেলে নাকি জার্নি টা বেশি এনজয় করতে পারবে। এখন কি করি বল তো?’
শুভ্র সহজ গলায় বললো,
‘গ্রেট। আমিও ট্রেনের কথাই ভাবছিলাম। এক কাজ কর পরশু ট্রেনের টিকিট বুক করে ফেল। গল্পও ট্রেন জার্নিটা বেশি প্রেপার করে, ওটাই ভালো হবে।’
আরাফ হ্যাঁ বোধক মাথা ঝাঁকাল। ওপাশ থেকে ফাহিম দুঃখী দুঃখী মুখ করে বলল,
‘ভাই তরা এই ট্যুর থেকে বরং আমাকে বাদ দে। তরা সবাই জোড়ায় জোড়ায় ঘুরবি; আমি কি করব? আমাকে তো একটাও পাত্তা দিবি না।’
আরাফ হেসে বললো,
‘মামু…তুমি বরং আমাদের জোড়ায় জোড়ায় কাপল পিক তুলে দিবে। ওকে? তার জন্য অবশ্য তোকে ট্রিট ও দিব।’
বলেই চোখ টিপ দিয়ে হু হা করে হেসে ফেললো। শুভ্রও হেসে ফেলে। ফাহিম রাগে গজগজ করতে করতে বেরিয়ে যেতেই আরাফ হাসিতে আরও ফেটে পড়ল।
______________________
গল্প এই মুহূর্তে একটা শপিংমলে কেয়ার সাথে ঘুরঘুর করছে। কেয়া মূলত ওকে হোস্টেল থেকে পিক করে নিয়েছে একসঙ্গে কিছু কেনাকাটা করবে বলে। ঘুরতে যাবে কিনা তাই। এই কয়দিনে গল্পর সাথে কেয়ার বেশ ভালোই ভাব জমেছে। কেয়া এতো মিশুকে একটা মেয়ে যে গল্পর তাকে দারুণ পছন্দ। আর তাই তো একবার তার সাথে বেরুতে বলাতেই সে আপনমনে রাজি হয়ে যায়।
কেয়া বেশ কয়েকটা শাড়ি কিনেছে আরও টুকিটাকি অনেক কিছু প্রয়োজনীয় কিনেছে। এখন সে আরাফের জন্য কেনাকাটা করছে। গল্পর হুট করেই শুভ্রকে কিছু দিতে বড্ড ইচ্ছে হলো। শুভ্র তাকে বেশ শপিং করে দিলেও; এযাবৎ সে শুভ্রকে কিছুই গিফট করেনি। তাই আজ যখন সুযোগ হয়েছে তখন শুভ্রকে কিছু একটা দিতে মন চাইছে খুব। সে কেয়াকে বলে ওপাশে শার্টের কালেকশন দেখছে। শুভ্রকে সব ধরনের কালারেই চমৎকার মানায়। কিন্তু সাদাতে যেনো একটু বেশিই মানায়। তাই সুন্দর দেখতে সাদা শার্ট টা নিয়ে নিলো। কেয়া হেসে বলল,
‘বরের জন্য গিফট বুঝি?’
গল্প প্রতিত্তোরে লাজুক হেসে মাথা দুলাল। আরও ঘন্টা খানেক ঘুরাঘুরির পর তারা মল থেকে বের হলো। কেয়া বাহিরে এসেই গল্পর হাতে একটা শপিং ব্যাগ ধরিয়ে দিয়ে বলল,
‘এটা তোমার জন্য। একদম মানা করবে না কিন্তু। এই শাড়িটাতে তোমায় খুব মানাবে।’
গল্প বিব্রত হেসে বলল,
‘কিন্তু আমি তো তোমাকে কিছুই দেইনি আপু! এটা কিন্তু ঠিক হলো না।’
কেয়া হেসে বলল,
‘আরে আমি কি পালিয়ে যাচ্ছি নাকি? অন্য এক সময় দিবে, আমার আবার গিফট পেতে দারুণ লাগে।’
বলেই হেসে ফেললো। গল্পও হাসলো ইশ… কেয়া আপুটা কি মিষ্টি! কেয়া গল্পকে তাড়া দিয়ে গাড়িতে উঠতে বলল। গল্প গাড়িতে বসে ভাবতে লাগলো
–আচ্ছা শার্ট টা শুভ্রর পছন্দ হবে তো? খুশি হবে পেলে? কি জানি! সে ঠিক করেছে এই শার্ট টা শ্রীমঙ্গলে যাওয়ার পর সে শুভ্রকে দিবে। এই মুহূর্তে সে ট্যুরটা নিয়ে দারুণ এক্সাইটেড। লাইফের প্রথম ট্যুর পারমিশন পেয়েছে কিনা! তাই।
#চলবে
