#আত্মার_আত্মীয়া
#পর্ব_১৩
#জান্নাত_সুলতানা
-“আপনি খুব বাজে আভিরাজ ভাই।”
দিয়া টলমল চোখে রাগী স্বরে উপরোক্ত অপবাদ দিলো আভিরাজ ভাই কে। আভিরাজ ওর মুখের দিকে তাকলো। টেবিলের ওপর ধীরে নাশতার প্লেট রাখলো। আর দিয়ার ক্রন্দনরত মুখের দিকে শান্ত চোখে তাকিয়ে গম্ভীর স্বরে বলে উঠলো,
-“চুপচাপ খেয়ে রেডি হ। নয়তো আমি একা চলে যাচ্ছি।”
-“যাবো না। এখন আর গিয়ে কী হবে?”
দিয়া রাগ দেখালো। আভিরাজ চেয়ার টেনে ওর পাশে বসলো। আর নাশতা তুলে ওর মুখে জোর করে তুলে দিয়ে চোয়ালে চেপে রেখে শান্ত আর স্বাভাবিক ভাবে বলে উঠলো,
-“বিয়ে খাবি।”
দিয়ার কাছে এটা অস্বাভাবিক। বাবা, ভাই মা তাকে মাঝেমধ্যে খাইয়ে দেয়। কিন্তু অন্য একটা পুরুষ? সে সব ভুলে স্তব্ধ হয়ে গেলো। আভিরাজ নিজের মতো আবারও ওর মুখে খাবার তুলে দিলো। সে খুব স্বাভাবিক। দিয়া তাই আরও অস্বস্তি বোধ করলো। মাথা নিচু করে খাবার চিবাতে চিবাতে বলে উঠলো,
-“শুধু খাওয়ার জন্য আমি এতো পথ যাবো? আপনার তাই মনে হয়?”
-“তো?”
আভিরাজ ঠোঁট গোল করে এক ভ্রু কপালে তুলে জিজ্ঞেস করলো। দিয়া হকচকিয়ে গেলো আভিরাজ ভাইয়ের দৃষ্টি দেখে। সে কী বোঝাতে চাচ্ছে এটা কী তিনি বুঝতে পারছে না? না-কি উলটো পালটা কিছু ভাবছে? ভাবুক গিয়ে। একটা বিয়েতে কতরকম আনন্দ হয়। কতরকম প্রোগ্রাম। সে তো হলুদের, মেহেন্দির প্রোগ্রাম গুলোর জন্য মন খারাপ করছে। সেগুলো মিস করে গেলো সে। দিয়া মাথা নিচু করে ঘাড় অন্য দিকে ঘুরিয়ে নিলো। আর অনেক্ক্ষণ নীরবতা পালন করে, অভিমানী মিশ্রিত রাগ নিয়ে বললো,
-“আপনার সাথে কথা বলতে চাই না আমি।”
-“আমি একটা কথা দ্বিতীয় বার রিপিট করতে একদম পছন্দ করি না, মাহদি।”
দিয়া টলমল চোখে আবারও পুরুষ টার দিকে তাকাতেই আভিরাজ প্লেটে পড়ে থাকা শেষ খাবার টুকু শেষবারের মতো দিয়ার মুখে তুলে দিয়ে বলে উঠলো,
-“এখন যাবে। আর রেডি হয়ে থার্টি মিনিট টাইম। এই টাইমের মধ্যে তুই নিচে আসবি।”
-“আভিরাজ ভাই!
-“সমস্যা কী?”
আভিরাজ রান্না ঘরে যাওয়ার জন্য উদ্যত হতেই দিয়া পেছন থেকে ডাকলো। আভিরাজ ঘাড় বাঁকিয়ে চাইলো ওর দিকে। দিয়া অসহায় কণ্ঠে বলে উঠলো,
-“এতোটুকু সময়ের মধ্যে কিভাবে রেডি হবো আমি?”
-“শোন ওটা তোর বিয়ে নয়। তাই এতো সাজুগুজুর দরকার নেই।”
গম্ভীর স্বরে কথাগুলো বলেই আভিরাজ রান্না ঘরে চলে গেলো। দিয়া আনমনে শুধালো,
-“আচ্ছা।”
-“আই অ্যাম ওয়েটিং ফর ইউ।”
দিয়া পেছনে তাকালো। এরপর দ্রুত ওপরে চলে গেলো। রুমে যেতেই দেখলো ফোনে অনেকগুলো কল। বাবা, ভাইয়া আর ছোট আব্বুর। দিয়া আগে শপিং ব্যাগ থেকে গাউন নিলো। এরপর ড্রেস পরে নিজের বাবা কে কল দিয়ে আয়নার সামনে বসলো। চুল আঁচড়াতে আঁচড়াতে কথা বলে। ভালোমন্দ কথা শেষ হতেই ওর বাবা জিজ্ঞেস করলো,
-“আভিরাজ কোথায়? কখন থেকে কল দিচ্ছি ওঠাচ্ছে না।”
-“জানি না তো। হয়তো নিজের রুমে।”
-“আচ্ছা। সাবধানে এসো। আমি আবার কল দিচ্ছি তাকে।”
দিয়া কল কেটে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললো। আর আয়নায় তাকিয়ে চমকে উঠলো। থতমত খেয়ে তাকিয়ে রইলো। আভিরাজ ভাই দাঁড়িয়ে। গায়ে একটা সফেদা পাঞ্জাবি। পেশিবহুল হাতের বাহু গুলো স্পষ্ট পোষাকের ভেতর ও নিজেদের ফুলেফেঁপে ওঠে সৌন্দর্যের জানান দিচ্ছে। হাতে চেইন ফিতার টাইম ওয়াচ। জিন্সের প্যান্ট, পায়ে কালো রঙের লোফার। লম্বা চুলটা পরিপাটি করে রাখা। দিয়া থম মেরে গেলো। আভিরাজ পাঞ্জাবির হাত ফোল্ড করতে করতে ওর দিকে না তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলো,
-“হয়েছে?”
-“হু, হুঁ, হ্যাঁ।”
দিয়া হকচকিয়ে জবাব দিলো। আভিরাজ তাকালো ওর দিকে। এরপর কণ্ঠ খাদে নামিয়ে ডাকলো,
-“আয়।”
নিজের জুতো হাতে নিলো দিয়া। আভিরাজ ওর দিকে তাকলো। লং গাউন। হিজাব। অল্প সাজ তবুও গর্জিয়াস। আভিরাজ যেনো ঘোরে চলে গেলো। আভিরাজের সামনে এসে যে যুবতী দাঁড়িয়ে আছে সেদিকে ও খেয়াল নেই। দিয়া ব্যাস্ততা দেখিয়ে হাতের জুতো টা চেক করতে করতে বললো,
-“চলুন।”
এরপর নিজেই রুম থেকে আগে বেরিয়ে এলো। সে আর কিছু সময় সেখানে দাঁড়িয়ে থাকলো হয়তো নিজের ওপর ভরসা হারাবে৷ তাই তো ব্যাস্ততা দেখাচ্ছে খুব। কয়েক পা সামনে এগিয়ে যাওয়ার পরই আভিরাজ ভাই পেছন থেকে গমগমে গম্ভীর স্বরে বলে উঠলো,
-“এতো উঁচু হিল?”
-“এটার সাথে এটা না পরলে মানাবে না।”
দিয়া ওনার দিকে তাকিয়ে শান্ত স্বরে জানালো। আভিরাজ কয়েক পা এগিয়ে এলো। গতকাল ঘুরতে গিয়ে শপিং করা হলে-ও জুতো টা নেওয়া হয় নি। কেননা দিয়া চাইছে না আভিরাজ ভাইয়ের টাকা খরচ হয়। সে তো ভেবেছিলো বিয়ে বাড়িতে গিয়ে সবার সাথে শপিং করবে। কিন্তু বিয়ের আগের দিন যাবে তাই সে এখানে বিয়ের শপিং টা করেছে। আর এখন যেহেতু আলভি বা তার বাবা কেউ নেই তাই তাকে আভিরাজ ভাইয়ের টাকায় সব কেনাকাটা করতে হয়েছে। সেইজন্য খুব প্রয়োজন ছাড়া কিছু নেয়নি। যদিও সে ভেবেছিলো আলমারিতে থাকা নতুন থ্রি-পিস টা পরে চলে যাবে। কিন্তু আভিরাজ ভাই জোর করে গাউন নিয়েছে দামী দেখে।
ওর ভাবনার মাঝেই আভিরাজ ওর হাত থেকে জুতো জোড়া ছিনিয়ে নিলো। তারপর ওকে টেনে নিয়ে সিঁড়িতে বসালো। নিজেও নিচে একটা সিঁড়িতে বসালো। আর জুতো টা পড়িয়ে দিলো। দিয়া ঠকঠক করে কাঁপতে লাগলো। এই কাঁপুনি বাড়িয়ে দিয়ে আভিরাজ ওকে কোলে তুলে নিলো। দিয়া চমকে ওঠে গলা জড়িয়ে ধরে। আতংকিত স্বরে অভিযোগ করে,
-“আল্লাহ কী করেন?”
-“এতো সিঁড়ি এগুলো পরে নামতে পারবি না।”
আভিরাজ ভাই সাবধানে পা ফেলে সিঁড়ি বেয়ে নামতে নামতে জবাব দিলো। বাড়ি থেকে বেরিয়ে সোজা গিয়ে ওকে গাড়িতে রেখে দিলো। দিয়া কে বসিয়ে তিনি আবারও ফিরে গেলো। দরজায় লক করতে। কেননা তাদের বাড়িতে যে কাজের মহিলা আছে তিনিও বাড়ির সবার সাথে চলে গিয়েছে। আর এখন তো বাড়ি একদম ফাঁকা।
দিয়া গাড়িতে বসে গরমে হাসফাস করতে লাগলো। আভিরাজ ফিরে এলো। ড্রাইভিং সিটে বসে নিঃশব্দে কোনো বাক্য ছাড়াই এসির পাওয়ার বাড়িয়ে দিলো।
দিয়ার মন পুলকিত হলো। তার ভালো লাগলো আভিরাজ ভাই এতোকিছু খেয়াল করছে। আর আজ দুইদিনে সে এটা খুব ভালো করে বুঝতে পেরেছে আভিরাজ ভাই ভীষণ কেয়ারিং। আর এরজন্য ওনার বউ নিশ্চয়ই ভাগ্যবতী। কিন্তু ওনার বউ? বিয়ে তো ওর সাথেই ফিক্সড। এমন নয়তো তাকে দেখানোর জন্য অভিনয় করে তিনি এমন করছে! হুঁ, হতেও পারে। কিন্তু সে এতো তাড়াতাড়ি এই পুরুষ কে বিয়ে করছে না।
——
গাড়ি থেকে নামার পরপরই দিয়া পড়ে যেতে নিচ্ছিলো। আভিরাজ এসে ওকে পেছন থেকে ধরে নিলো। ওরা এসে পৌঁছাল প্রায় দেড় ঘন্টা পর। মানে তখনও বর আসে নি। সময় টা তখন সাড়ে বারোটা। আভিরাজ উদ্বিগ্ন হয়ে জিজ্ঞেস করলো,
-“আর ইউ ওকে?”
-“হুম। ঠিক আছি।”
দিয়া মাথা নেড়ে নিশ্চিত করলো। এরপর আশেপাশে তাকিয়ে দেখলো ওদের দিকে অনেকেই তাকিয়ে আছে। তাই সে নিজে কে ছাড়িয়ে নেওয়ার চেষ্টা করতে করতে বললো,
-“ছাড়ুন সবাই দেখছে।”
আভিরাজ হয়তো এটার জবাব অন্য অনেক কিছু দিতে পারতো। কিন্তু সে কিছু না বলেই ওর হাত টা ছেড়ে দিলো আর ওর পাশে পাশে হেঁটে বাড়ির ভেতরে ঢুকে গেলো। পথিমধ্যে যতো মানুষ ছিলো ওদের ঘুরেঘুরে দেখলো। যেহেতু এটা গ্রাম আর আভিরাজের তুলনায় দিয়া হাইটে এবং বয়সে ও ছোট তাই সবার কৌতূহল টা বেশি হয়তো।
বিয়ে বাড়িতে মানুষের সমাগম হবে স্বাভাবিক। চেনা পরিচিত মুখ খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। তবুও তাদের দু’জন খুব আদরের সহিত আপ্যায়ন করা হলো। দিয়া উঠোনে যাওয়ার পরপরই আগে বায়না করলো মায়েদের সাথে দেখা করতে চায়। আলভি কে ফোন দিতেই সে এসে উপস্থিত হলো। কালো পাঞ্জাবি দারুণ হ্যান্ডসাম লাগছে তাকে-ও।
-“বি কেয়ার ফুল। চোখের আড়াল একদম করবি না।”
আলভি কে হুশিয়ারী দিলো আভিরাজ। আলভি তপ্ত শ্বাস ফেললো।
-“ও আমার বোন।”
সে-ও আভিরাজের মতো ফিসফিস করে বললো। আর দিয়া কে নিয়ে একটা ঘরের ভেতর চলে গেলো।
——-
দিয়া সবার সাথে দেখা করে আভিরাজের এক মামাতো বোন কে নিয়ে কনের কাছে এলো। আভিরাজ পথিমধ্যে আঁটকে ওর হাতে একটা মিনি চার্জার ফ্যান দিয়ে দিলো। দিয়া এটা পেয়ে খুশিই হলো। কেননা অতিরিক্ত গরম যে। তবে লজ্জা অস্বস্তিতে মন খারাপ ও হয়ে গেলো। পাশে কিছু মহিলাদের কথা শুনে। আভিরাজ ভাই ততক্ষণে চলে গিয়েছে।
-“শহরের মাইয়া মানুষ এমনই হয়। বেডা মাইনষের লগে ঢলাঢলি করে।”
-“আমার মাইয়া তো জীবনে ও চাচাতো ভাইয়েরার সামনেও যায় না। কথা ও কয় না।”
পাশ থেকে একজন মহিলা বললো। দিয়া ওনাদের মোটামুটি চিনে। আগে যখন আসা হতো তখন তাদের পরিচয় জেনেছে।
-“কান দিয়ো না আপু। এরা এমনই।”
আভিরাজের মামাতো বোন বললো। আভিরাজ তখন হঠাৎ করে কোত্থেকে এসে দিয়ার পাশে দাঁড়াল। আর ওনাদের দিকে তাকিয়ে রসাত্মক স্বর বলে উঠলো,
-“তবুও ভালো বাড়ি থেকে পালিয়ে যায় না।”
আভিরাজের মামাতো বোন হেঁসে ফেললো। কেননা এই মহিলার মেয়ে কিছুদিন আগে পালিয়ে গিয়েছে। দিয়া চমকে উঠলো। আভিরাজের বাহুর পাঞ্জাবি ধরে টানলো। চুপ করতে অনুরোধ করলো ইশারায়। ঝামেলা চায় না সে। এসব ভালো লাগে না। আর বিয়ে বাড়িতে তো মোটেও সে অশান্তি চায় না।
#চলবে….
