#আত্মার_আত্মীয়া
#পর্ব_১১
#জান্নাত_সুলতানা
-“আব্বু?”
-“পরে কথা হবে বাবা। তুমি এখন নিজের রুমে যাও।”
দিয়া আর কিছু বলে না। মাথা ঘুরতে থাকে তার। কার সাথে বিয়ে, কে সেই মানুষ শুধু এ-সব চিন্তা নিয়ে সে সিঁড়ি বেয়ে উঠতে লাগলো। হঠাৎ করে পাশ দিয়ে কারোর নেমে যাওয়ার হালকা সংস্পর্শে সে বাস্তবে ফিরে এলো।
চোখ তুলে পাশে দেখলো। না ততক্ষণে ব্যাক্তি তার অনেক টা পেছনে নেমে গিয়েছে। দিয়া ঘাড় বাঁকিয়ে চাইলো এবার। আভিরাজ ভাই। সাদা টি-শার্ট গায়ে প্যান্টের পকেটে হাত দু’টো গুঁজে রাখা। দিয়া লক্ষ্য করলো আভিরাজ ভাই গিয়ে লিভিং রুমে একটা সোফায় বসলো৷ আর তখনই আলভি ও ওর পাশ দিয়ে খুব দ্রুত নেমে গিয়ে আভিরাজ ভাইয়ের পেছনে দাঁড়াল। যেনো রাজের পাশে মন্ত্রী। উফ, দিয়ার বিরক্তি লাগলো। তার ভাই ও হয়েছে একটা আভিরাজ ভাইয়ের নেওটা। অসহ্য।
সে আর কিছু দেখার জন্য আগ্রহী হলে-ও এটা সম্ভব ছিলো না। তাই নাফিজা কে সাথে নিয়ে ছাঁদে চলে গেলো।
——
আমিরের পরিবার সবাই চলে গিয়েছে। আভিরাজ আসার পর-ই চোখাচোখি হয়ে ছিলো তাদের। এরপর আর কিছু নয়। আভিরাজ তখন বসে ছিলো একই ভঙ্গিতে। আর একটু পর একজন বুয়া এসে একটা কফি দিয়ে গেলো। আভিরাজ সেটাতে আয়েশ করে চুমুক দেয়। আর ঠোঁট মুখের ভেতর নিয়ে হঠাৎ করে বলে উঠলো,
-“আজ শুক্রবার আব্বু।”
-“তো?”
-“কাজী ডাকবে না-কি আমি ডাকবো?”
আভিরাজ গম্ভীর স্বরে জিজ্ঞেস করলো। কেমন লজ্জাহীন একটা প্রস্তাব। একঘর মানুষের মাঝে বড্ড বেমানান এই প্রস্তাব। ছেলে নিজের বিয়ের জন্য কাজী ডাকবে তা-ও সেটা নিজের বাবামায়ের চাচা চাচির সামনে বসে বড়ো গলায় বলছে। আভিরাজের বাবা কিছু টা নাক কুঁচকালেন। এবং বলে উঠলেন,
-“এটা হতে পারে না আভিরাজ।”
-“কী হতে পারে না? চাইলে সব সম্ভব।”
-“দিয়ার বয়স এখনো আঠারো হয় নি।”
তিনি তর্ক করেন ছেলের সাথে। আভিরাজ এবার বসা ছেড়ে ওঠে দাঁড়ালো। আর গুরুগম্ভীর স্বরে বললো,
-“আঠারো না হলে-ও বিয়ে হয়। বিয়ের উপযোগী মেয়ে বাড়িতে থাকলে বিয়ে রোজ আসবে। আর এটার রিস্ক আমি নিতে পারবো না মেঝো আব্বু।”
আভিরাজ দিয়ার বাবার উদ্দেশ্য কথা গুলো বলেই হনহনিয়ে সিঁড়ি বেয়ে ওপরে চলে গেলো। আলভি ফাহাদ সাথে গেলো।
——
আভিরাজ নিজের রুমে থাকা ডিভানে জোরে লাত্থি মারে। একটা রাগে তার শরীর কাঁপছে। আলভি সুড়সুড় করে বেরি যায় নীলয়, ফাহাদ কে নিয়ে। আভিরাজ দরজা বন্ধ করতে গেলেই একটা ছোট হাত দরজায় পরলো। আভিরাজের কুঁচকানো ভ্রু জোড়া শিথিল হলো। সে দরজার হ্যান্ডেল ছেড়ে রুমে ফিরে এলো। দিয়া রুমে প্রবেশ করে আলগোছে। আর দরজা সামন্য চাপিয়ে মিনমিন করে ডাকলো,
-“আভিরাজ ভাই!”
নীরবতা এরপর। আভিরাজ ঘাড় বাঁকিয়ে ওর দিকে তাকালো। আর ওকে ভয়ে কাচুমাচু করতে দেখে শান্ত স্বরে আদেশ করলো,
-“কথা বল।”
-“বলছি তো।”
-“বল।”
-“আপনি রেগে আছেন কেনো?”
দিয়া আমতা আমতা করে জিজ্ঞেস করলো। রাত হয়েছে সবাই খাবার খেয়েছে। কিন্তু আভিরাজ ভাই খায় নি। দিয়া এটা জানতেই এসছে আভিরাজ ভাইয়ের হয়েছে টা কী? আভিরাজ এবারও মুখ গম্ভীর রেখে ত্যাড়া উত্তর দিলো,
-“সেটা জেনে তোর কী কাজ?”
-“আপনি খাবার খেয়ে নিন। তাহলে আর জানতে চাইবো না।”
দিয়া ঠোঁট এলিয়ে মিষ্টি হাসে। আভিরাজ ওর মুখের দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে। এমন ভয়ংকর চাহনি দিয়ার বুকের ভেতর ধুকধুক করতে লাগলো। সে মাথা নিচু করে আবারও কিছু বলার জন্য উদ্যত হতেই আভিরাজ হঠাৎ করে ফিসফিসিয়ে ওঠে,
-“তুই ভালোবাসা কী জানিস? বুঝিস কিছু?”
দিয়া অবাক। চমকে যায় সে। হতভম্ব হয়ে আভিরাজের দিকে তাকিয়ে ভাবে কী বলছে এসব আভিরাজ ভাই? হঠাৎ করে এ-সব? তা-ও আবার ভালোবাসার কথা? সে যে গেইমের জন্য একবার বিয়ের কথা বলেছিল এটা নিয়ে তো সে এখনো আভিরাজ ভাইয়ের সামনে এসে লজ্জায় মুষড়ে যায়। আর আভিরাজ ভাই হঠাৎ করে তাকে এইরকম কথা বলছে? দিয়া নিজে কে সামলে নিলো। আঙুলে ওড়নার কোণ পেঁচাতে পেঁচাতে অবুঝ চোখে তাকিয়ে বলে উঠলো,
-“আমি কী করে জানবো? আগে আপনি তো কোনো ছেলের সাথে কথা বলতে দেন নি৷ আর এখন ভাইয়া দেয় না।”
ওর এমন অবুঝ কথা আভিরাজের যেমন হাসি পায় তেমন ভ্রু কুঁচকে আসে এটা ভেবে এই মেয়ে কী তবে সেই স্বাধীনতা পেলে কিছু করে ফেলতো? আভিরাজ ওর দিকে এগিয়ে আসে। আর গম্ভীর স্বরে জিজ্ঞেস করলো,
-“তোর ইচ্ছে করে?”
-“ন-না তো। একদম না। আমি তো কখনো বাইরের কোনো ছেলের সাথে বিয়ের আগে কথাই বলবো না।”
আভিরাজের মুখের দিকে তাকিয়ে দিয়ার গলা শুঁকিয়ে আসে। এতো মারাত্মকভাবে তাকায় কেনো যুবক? হায়! দিয়া আস্তে করে ঢোক গিলে। আর এক পা আরও পেছনে রাখে।
-“সেটার প্রয়োজন পরবে না।”
আভিরাজ শক্ত কণ্ঠে জবাব দিলো। আভিরাজ ওর চোয়াল আলতো করে চেপে ধরে। দিয়া না বুঝে মাথা নাড়ে। আভিরাজ কয়েক সেকেন্ড পর ওকে ছেড়ে দিলো। দিয়া এতো সময় শ্বাস বন্ধ করে দাঁড়িয়ে ছিলো যেনো ছাড়া পেতেই সে নিজে কে কোনো রকম সামলে নিয়ে রুম থেকে বেরিয়ে যায়। দিয়া যেতেই আভিরাজ দরজা বন্ধ করে আর গায়ে থাকা টি-শার্ট খুলে ফেলে এক টানে। আর বিছানায় পেটের ওপর শুয়ে বিড়বিড় করতে থাকে কিছু।
——
দিয়া সকাল সকাল বেরিয়েছে আজ। নিজের দুই বান্ধবীর সাথে আজ সারাদিন ঘুরবে বলে। আভিরাজ ভাই সে কথা জানে না। দিয়ার সাথে অবশ্যই আলভি যেতে চাই ছিলো কিন্তু তিনটি মেয়ের মধ্যে সে একা অকোয়ার্ড ফিল করে অর্ধেক রাস্তা থেকে ফিরে এসছে বেচারা। আর যেহেতু যায়গা টা কাছেই ছিলো আলভি ও আর বেশি ভাবছে না। আভিরাজ ওয়াকআউট করছিলো ব্যালকনিতে আলভি বাইক নিয়ে গেইট দিয়ে প্রবেশ করতেই আভিরাজ গলা উঁচিয়ে জিজ্ঞেস করলো,
-“কোত্থেকে আসা হচ্ছে?”
-“দিয়া ওর ফ্রেন্ড’দের সাথে ঘুরতে গিয়েছে। ওকে নামিয়ে দিয়ে এসছি।”
-“কোথায় গিয়েছে?”
-“তুমি তো জানো না। পাশের গ্রামের একটা বিল আছে। এখন তো বর্ষা মৌসুমে পানি আছে। সুন্দর পরিবেশ। সকালে সূর্য খুব সুন্দর দেখায় সেখান থেকে।”
আলভির কথা শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আভিরাজ হাতের ডাম্বেল ফেলে রুমের ভেতর চলে গেলো। আলভি বুঝতে পারে না হঠাৎ করে আবার কী হলো।
-“যা শ্লা হঠাৎ করে আবার কী হলো? কিছু না বলে চলে গেলো!”
সে বিড়বিড় করতে করতে বাইক থেকে নেমে চাবি খুলে আর বাড়ির ভেতর যাওয়ার জন্য উদ্যত হতেই দেখলো আভিরাজ সদর দরজা দিয়ে বেরিয়ে আসছে। হাতে চাবি। গায়ে একটা কালো রঙের টি-শার্ট। এলোমেলো চুল। আর ওয়াকআউট এর ঘাম তখনও শরীরে। আলভি ভ্রু কুঁচকে নিলো। আর জিজ্ঞেস করলো,
-“তুমি এভাবে কোথাও যাচ্ছো?”
-“তোর বোনের কাছে।”
-“কিন্তু ও তো,,,
-“তুই নিজের মুখ বন্ধ রাখ।”
-“কেনো?”
-“কজ আমি তোর মতো ষ্টুপিড না।”
আলভির মুখ হা হয়ে যায়। সে হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো। কিসের জন্য তাকে এসব বলছে সে কিছুই বুঝে উঠতে পারে না। এরমধ্যে আভিরাজ তার সামনে দিয়ে বাইক নিয়ে চলে গেলো। আলভি ও একটু সময় যেতেই আভিরাজের পেছনে বাইক নিয়ে যেতে লাগলো।
—–
রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে পূর্বে দিকে তাকিয়ে সবাই। সূর্য আস্তে আস্তে রক্তিমা ভাব নিয়ে উঠছে। পানির মধ্যে আরও ঝলমল করছে। সবাই সেটাই দেখছে। ঠান্ডা বাতাস আর একটি স্নিগ্ধ সকাল। বিলের গায়ে থাকা পানি ছুঁয়ে ওঠা আসা ঠান্ডা। যায়গা টা আসলেই সুন্দর। মানুষ আছে অনেক। মেয়ে আবার অনেক কাপল আবার কিছু ছেলেপেলে ও আছে। চারপাশে একদম খোলা। দুইটা বাইক শাঁই শাঁই করে এসে বিলের দাঁড়ে রাস্তায় থামতেই সেদিকে অনেকের দৃষ্টি পরলো। দিয়া ও তার বান্ধবীরা ও চাইলো। আর দিয়ার মুখ অটোমেটিক হা হয়ে গেলো। দিয়া নিজে কে সামলে নিয়ে আলভি আর আভিরাজের দিকে এগিয়ে এলো। সে হয়তো কল্পনা ও করে নি আভিরাজ ভাই এখানে আসতে পারে। তাই অনেক বেশি অবাক। আর মুখে হাত দিয়ে আভিরাজ কে উদ্দেশ্য করে বলে উঠলো,
-“আল্লাহ! আপনি?”
-“তোর প্রবলেম?”
-“না তো।”
-“ভাইয়া তুমি তো চলে গিয়েছিল!”
-“হাঁ। পরে ভাবলাম দেখে যাই।”
আলভি হকচকিয়ে গিয়ে বললো। দিয়া আভিরাজের দিকে তাকায়। আর আবারও গিয়ে নিজের যায়গায় দাঁড়িয়ে পরে। ওদের থেকে একটু দূরে আলভি আর আভিরাজ দাঁড়িয়ে আছে। দিয়ার বান্ধবী দুজনেই আভিরাজের দিকে তাকিয়ে ফিসফাস করছে। দিয়া কিছু না শুনে বুঝে ওরা আভিরাজ ভাইয়ের সৌন্দর্য নিয়ে কথা বলছে। দিয়ার কেনো জানি রাগ শরীর কাঁপছে। আভিরাজ এক পাশে দাঁড়িয়ে ছিলো দিয়া এসে আভিরাজের পেছনে দাঁড়াল। সবার দৃষ্টি সূর্যের দিকে থাকলেও তার দুই অসভ্য বান্ধবী আভিরাজ ভাই এর দিকে তাকিয়ে আছে। এদের দিয়া মনে মনে ইচ্ছে মতো ঝেড়ে নিলো।
-“আপনি সুদর্শন না হলে আমি এক্ষুণি এক ঘুষি মারতাম আপনাকে।”
-“কী?”
আভিরাজ আচমকাই না বুঝে শুধালো। দিয়া কোমরে হাত রেখে দাঁত বের করে বলে,
-“জি।”
-“আর তোকে থাপ্পড় দিয়ে এক্ষুণি এই পানিতে ফেলে চুবাইতে পারলে আমার সেই ভাল্লাগত।”
আভিরাজ দাঁতে দাঁত চেপে মেকি হেঁসে জানায়। দিয়া অবাক হয়ে বলে উঠলো,
-“আমি কী করলাম?”
-“তোর সাহস বেশি বেড়েছে।”
-“হুঁ, ভালো।”
আভিরাজের গম্ভীর স্বরে বললো। আর আভিরাজের গম্ভীর স্বর কে তোয়াক্কা না করে দিয়া মুখ ভেংচি কেটে আবারও চলে গেলো। আর আভিরাজ এই চঞ্চল চড়ুইটার দিকে নিষ্পলক চোখে তাকিয়ে রইলো।
#চলবে…..
[ভুল ত্রুটি ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন।]
