#আত্মার_আত্মীয়া
#পর্ব_১০
#জান্নাত_সুলতানা
-“কোনো ছেলের সাথে যদি কথা বলতে দেখেছি না তাহলে খুবই খারাপ হবে মাহদি।”
আভিরাজের ফিসফিস স্বর দিয়ার শরীরে ঝাঁকুনি দিয়ে ওঠে। আলভি ততক্ষণে নিজের ফ্রেন্ডের কাছে চলে গিয়েছে। দিয়া এতোক্ষণে এসে জেনেছে আলভির ফ্রেন্ডের ভাইয়ের ফ্রেন্ড আভিরাজ ভাই। তাই তো তিনিও এসছে। আভিরাজ আলভি দু’জনেই বার্থডে গার্লের সাথে ওদের পরিচয় করিয়ে দিয়ে নিজেদের মতো আড্ডায় ডুবে গেলো। দিয়া নাফিজাও নিজেদের মতো কথাবার্তা বলছে। তখন দুটো ছেলে এলো। দিয়ার সাথে কথা বলতে চাইলে দিয়া ভদ্রতার খাতিরে পরিচয় দিলো। তবে পরিচয় নিয়ে ওরা সন্তুষ্ট নয়। একটা ছেলে বেশ ভদ্র-নম্র দেখতে। সে দিয়ার সাথে পড়াশোনা নিয়ে কথা বলতে লাগলো। ছেলে টা অনার্স সেকেন্ড ইয়ারের। মানে আলভির থেকে ছোট। ওর এক যায়গা দাঁড়িয়ে তিনজন। হঠাৎ করে একটা বাচ্চা এসে ওই ছেলে টার সাথে পেছন থেকে খুব জোরে ধাক্কা খায়। যার ফলে ছেলে টা দিয়ার দিকে প্রায় ঝুঁকে যায়। পেছন থেকে সেটার সাক্ষী হয় স্বয়ং আভিরাজ চৌধুরী। দিয়া পিছিয়ে যায় হকচকিয়ে তাকায় সামনে। তৎক্ষনাৎ নজরে আসে আভিরাজ ভাই হাত মুঠোবন্দী করে লম্বা লম্বা কদম ফেলে এদিকেই আসে। দিয়া ভয় পেয়ে যায়৷ আভিরাজ ভাই তাকে থাপ্পড় দিবে? সে যে কথা বললো ছেলেদের সাথে! তিনি তো না করেছিলো। নিশ্চয়ই মারবে। দিয়া চোখ বন্ধ করে দাঁত চেপে নিলো৷ থাপ্পড় খাওয়ার জন্য সে সম্পূর্ণ প্রস্তুতি। কিন্তু কোনো ঝামেলা যেনো না করে এই পুরুষ। অথচ দিয়া কয়েক সেকেন্ড অতিবাহিত হওয়ার পরে-ও যখন কোনো আঘাত পেলো না তখনই চোখ মেলে আচমকা। সাথে সাথে সে চমকে ওঠে। আভিরাজ ভাই ছেলে টার কলার টেনে নিজের সাথে নিয়ে যায়। দিয়া পেছন থেকে নাফিজার হাত ধরে শক্ত করে। প্রায় কমবেশি সবাই ওদের দিকে তাকিয়ে। আলভি আসে দৌড়ে। দিয়া ভাই কে দেখে অস্থির হয়ে ওঠে। বললো,
-“ভাইয়া, আভিরাজ ভাই!”
-“আমি দেখছি। তোরা গিয়ে গাড়িতে বোস।”
আলভি আশ্বস্ত করে। দিয়ার মন সায় দেয় না। মন চায় দৌড়ে গিয়ে দেখে আসতে আভিরাজ ভাই কী করছে ছেলে টার সাথে। তবুও ওর মনের বিরুদ্ধে যেতে হলো। আলভির কথামতো নাফিজা কে নিয়ে গাড়ির দিকে গেলো।
আলভি দৌড়ে আভিরাজ যেদিকে গিয়েছে সেদিকে যায়। বাড়ির পেছনের দিকে একটা কাঠ গাছের বাগান। সেখানে বড়ো বড়ো গাছ আর চাঁদের আলোয়ে চারপাশ আবছা দেখা যাচ্ছে। আভিরাজ ছেলেটার সাথে কী করছে কে জানে। আলভি দৌড়ে গিয়ে আভিরাজ কে ছাড়ানোর চেষ্টা করে। আভিরাজ রাগে হিসহিস করেছে। ভারি নিঃশ্বাস আলভির মনে ভয় ধরে। মেরে টেরে ফেললে কেলেঙ্কারির শেষ থাকবে না। আলভি আভিরাজ কে টেনে সেখান থেকে নিয়ে আসতে চায়। কিন্তু কোনো লাভ হয় না। ছেলে টাও যে এতো সময় নিজে মুখোশ পরে ছিলো তা-ও পরিষ্কার। কেননা এই ছেলে ভালো নয়। আলভির ও রাগ বেড়ে যায়। আভিরাজ হিসহিসিয়ে বলে উঠলো,
-“কু*ত্তার বা*চ্চা। জানো*য়ার। তোর চোখ উপড়ে ফেলবো আমি। ওর সাথে কথা বলার সাহস কোথায় পেয়েছি তুই?”
আভিরাজ ঘুষি মারে। আলভি অবস্থা বেগতিক দেখে আভিরাজ কে পেছনে থেকে জড়িয়ে ধরে। সে-ও লম্বা আভিরাজের চেয়ে কম নয়। শরীর ও বেশ ভালোই আছে। আর সরিয়ে আনতে সক্ষম হলো। আভিরাজ দাও ছেলেটার শরীরে লাত্থি মারে। আলভি বলতে থাকে,
-“আভিরাজ ভাই আমার কথা শোনো। ছাড়ো এদের। আমরা এখান থেকে বেরিয়ে যাবো এখন। বোনু ভয় পাবে এসব শুনলে।”
আভিরাজ হঠাৎ করে নীরব হয়ে গেলো। আর আলভির হাত নিজের পেট থেকে ছাড়িয়ে নিজের শার্ট ঠিক করে নেয়। চুল টা কোনোরকম গুছিয়ে নিঃশ্বাস ফেলতে ফেলতে হনহনিয়ে হাঁটতে থাকে সামনের দিকে। আলভি দৌড়ে আসে পেছনে।
আভিরাজ ভাই যখন ফিরে এলো তখন ঘেমে-নেয়ে একাকার। সুন্দর গোছানো পরিপাটি চুল এলোমেলো। সাদা শার্টে। ধুলো। কেমন ইন অর্ধেক ছুটে গিয়েছে। শার্ট কুঁচকে গিয়েছে। দিয়া কিছু জিজ্ঞেস করার সাহস পায় না। আভিরাজ গাড়ি স্টার্ট করে। আর এক হাত স্টিয়ারিং শক্ত করে চেপে ধরে অন্য আরেক টা হাত দিয়ার উরুর ওপর রাখলো। দিয়ে চমকে উঠলো। আভিরাজ তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে ওর দিকে তাকালো। তবে পরক্ষণেই নিজের মন কে বোঝাল কুল আভিরাজ কুল। রাগ নয়। এই ছোট্ট বিড়াল টাকে তাকে ভালোবেসে জয় করতে হবে। রাগ করলে সে আরও ভেঙে পরবে।
-“তুই ঠিক আছিস?”
আভিরাজ হঠাৎ করে নিজের গম্ভীর স্বভাব ছেড়ে কিছু টা চিন্তিত স্বরে জিজ্ঞেস করলো। পেছনে আলভি নাফিজা দু’জনেই অবাক। দিয়া আভিরাজের হাত সরাতে চায়৷ আভিরাজ হাত টা শিথিল করে। তবে সরায় না। দিয়া বুঝে আভিরাজ ভাই হাত সরাবে না। তাই ছোট্ট করে জবাব দিলো,
-“হ-হাুঁ।”
আশ্চর্য! তার এই একটি মাত্র শব্দ গলা দিয়ে ভাঙা বের হলো। তার ভয়, উদ্বিগ্ন সে। দিয়া তপ্ত শ্বাস ফেললো। নিজে কে শান্ত স্বাভাবিক করতে চাইলো। আভিরাজ নিজের ঠোঁট দাঁত দ্বারা কামড়ে ধরে। মেয়ে টা ভয়ে আছে। আর ভয় দেওয়া যাবে না তাকে। যতোটা সম্ভব যত্ন আর আদর দিতে হবে। আদুরে স্পর্শে বিড়াল পোষ মানে। আর তার এই বিড়াল তো ভালোবাসায় পাগল।
—–
সকালে দিয়ার ঘুম ভাঙে নীলয়ের ডাকে। তাকে ইচ্ছে মতো ডাকছে সে। দিয়া বিরক্ত। তিক্ততা নিয়ে ওঠে বসলো। সারারাত তার ঘুম হয় নি। শুধু সন্ধ্যা রাত থেকে রাতের বারোটা পর্যন্ত সকল ঘটনা তার বারবার মনে পরছিলো। সে বিরক্ত ঠেলে চোখ-মুখ মুছে ওঠে বসে। আর বিরক্তিকর মুখ করে উচ্চস্বরে বলে উঠলো,
-“তোর হাঁসের গলা টা সকাল সকাল আমার কানের সামনেই বাজাতে হলো?”
-“তোমার কপাল ভালো বিয়ের সানাই বাজাই নি।”
দিয়া হতভম্ব হয়ে যায়। কী বলে এই বাঁদর ছেলে? তার বিস্মিত মুখের দিকে তাকিয়ে নীলয় মুখ বিকৃত করে নিলো। যেনো সে আজ হোমওয়ার্ক করতে খুব বিরক্ত বোধ করছে যা বলতে না পারলেও দৃষ্টিতে ঠিকই ফুটে উঠেছে। নীলয় গম্ভীর স্বরে বললো,
-“এভাবে তাকিয়ে থেকো না। পেত্নী লাগে। তোমার বিয়ে হবে, আর মুখ এমন করে রাখলে বিয়ের আগেই আমির ভাইয়া পালিয়ে যাবে।”
নীলয়ের রসাত্মক স্বর দিয়া স্তম্ভিত হয়ে গেলো। বুকের ভেতর ঝড় উঠলো। সে বিরক্ত থেকে ব্যথিত হলো। বিয়ে? এসব কী বলে? নিশ্চয়ই নীলয় কোনো কিছু না জেনে কিছু বলবে না। দিয়া হতবিহ্বল। দুর্বল দৃষ্টি। তার বিয়ে? সত্যি? তা-ও আবার বিয়ে আমির ভাইয়ের সাথে? এটা কী আভিরাজ ভাই আশা করে ছিলো দিয়ার মন? তার কাছে বিয়ে এবং আমির ভাই দুইটাই অপ্রত্যাশিত ছিলো। তবুও এরচেয়ে চমকপ্রদ হচ্ছে সে এখানে সর্বপ্রথম আভিরাজ ভাই কে তার মন মনে করেছে।
——-
তার মামা মামি আর আমির ভাই। তাদের বাড়িতে। তবে সবাই খুব স্বাভাবিক। বেড়াতে এলে যেমন। তবে দিয়া আতংকিত। লিভিং রুমে বসে তখন সময় টা বিকেল। আজ সপ্তাহিক ছুটি বিধায় সবাই বাড়িতে। আভিরাজ আলভি বাদে সবাই আছে। তারা খাওয়া শেষ নিজেদের রুম গিয়েছে এরপর আর আসে নি। দিয়ার মামি এক সময় কথার ফাঁকে বললেন,
-“আমরা চাই ছিলাম আমির কে বিয়ে করিয়ে নেই।”
-“ভালো হবে তো। এখন তো মেয়ের ও বিয়ে হয়েছে। তাহলে আমিরের জন্য মেয়ে দেখেন ভাইজান।”
আভিরাজের বাবা সহমত পোষণ করে এবং নিজের মতামত জানান। দিয়ার মামি আবারও বলেন,
-“দিয়া তো আমাদের খুব পরিচিত।”
-“দিয়ার কথা বলছিলাম আমরা।”
দিয়ার মামা ওনার স্ত্রীর অসম্পূর্ণ কথা সম্পূর্ণ করেন। মূহুর্তেই সবার মুখ অন্ধকার হয়ে আসে। তারা কেউই হয়তো কল্পনা করে নি এমন কিছু হবে। আমির নিজেও হতভম্ব। দিয়ার বাবা মৃদু হাসলেন এবং আস্তে আস্তে করে বললে,
-“অসম্ভব একটা প্রস্তাব ভাবি সাহেবা। আমার আপনাদের এটা বলতে দুঃখ লাগছে তবুও এটা সত্যি।দিয়ার বিয়ে নিয়ে আমাদের আরও চার বছর আগেই কথা দেওয়া।”
দিয়া পেছন থেকে হতভম্ব হয়ে গেলো বাবার কথা শুনে। আশ্চর্য? জীবনের সবচেয়ে বড়ো ধাক্কা টা সে আজ খেয়েছে। বাবা এসব কী বলছে সে কিছুই বুঝে উঠতে পারে না। তার বিয়ে ঠিক? কার সাথে? কবে হলো? সে তো কখনোই এ-সব কিছু জানতো না। তার মাথা ভনভন করতে লাগলো। যেনো এক ঝাঁক মৌমাছির দল তার মাথার ভেতর বাসা বেঁধেছে।
#চলবে……
[ভুল ত্রুটি ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন।]
