#আত্মার_আত্মীয়া
#পর্ব_৮
#জান্নাত_সুলতানা
-“আভিরাজ ভাই!”
আভিরাজ ভাই দিয়ার দিকে আঁড়চোখে চাইলো একবার। এরপর ওর পাশের চেয়ারে বসলো। ইফতি আয়েশা পাশে বসেছে। দিয়ার কোনো অজানা কারণে হাত-পা কাঁপছে। আভিরাজ ভাই এর কথা অমান্য করেছে সেই ভয়ে না-কি মানুষ টা স্বয়ং ওর পাশে বসে আছে সেইজন্য ঠিক অনুভব করতে পারলো না। দিয়া কোলের ওপর হাত রেখে কচলাচ্ছিলো। তখনই হাত দুটোর ওপর একটা দানবীয় হাতের অস্তিত্ব টের পেলো। শক্ত রক্ষ হাতের ছোঁয়ায় চমকে উঠলো দিয়া। শরীর জুড়ে শীতল স্রোত বয়ে গেলো। কথা নয় কোনো বার্তা নয়। তবুও যেনো বলছে “ভয় পাস না” আশ্বস্ত করা এই হাতের স্পর্শের অর্থ দিয়া খুঁজতে যায় না। চুপটি করে বসে থাকে। সেদিনের দেওয়া ফুল আর মালা আজকের এই ভরসার হাত টা পেয়ে দিয়া যতোটা খুশি হয়েছে সেদিন আভিরাজ ভাই এর থেকে কোনো গিফট না পেয়েও ওর এতো খারাপ লাগে নি। একটু অভিমান হয়েছে। যা সুপ্ত। খুব গোপনে গেঁথে আছে মনে। ওরা খাওয়াদাওয়া শেষ করে বেরিয়ে এলো। ইফতি আয়েশা কে নিয়ে একটা রিকশা করে গেলো। আভিরাজ ভাই নিজের বাইকে। দিয়া না চাইতেও আবারও আভিরাজ ভাই এর বাইকের পেছনের সিটে বসতে হলো।
-“ভালো করে ধরো বোস।”
এই একটা সতর্ক বার্তা দিয়ার হাত কাঁধ থেকে পেটে চলে আসে। মানুষ টা এতো গম্ভীর, কণ্ঠ শুনলেও দিয়ার ভয় লাগে। সেখানে যুবকের দেওয়া আদেশ অমান্য করার মতো দুঃসাহস মেয়ে টা দেখাতে পারে না। যদিও মাঝেমধ্যে রেগে অমান্য করে ফেলে তবে তা ওর কাছে ঠিক মনে হয়।
——
বাড়ির রমরমা পরিবেশ বলে দেয় অতিথি দিয়ে বাড়ি টা ভরে গিয়েছে। নীলয় বাড়ির সামনে বড়ো উঠোনে খেলছে কয়েকজন ছেলের সাথে। দিয়া দেখেই বুঝে গেলো চৌধুরী বাড়ির সব সদস্য আসতে কেউই বাকি নেই।
-“ভেতরে যাবি সোজা। কোনো দিকে তাকাবি না। আর যখনতখন বাইরে যেনো না দেখি আমি। যদি দেখেছি। তাহলে ঠ্যাং ভেঙে তোর গলায় ঝুলিয়ে দেবো।”
আভিরাজ বাইকের চাবি খুলে নিয়ে বাড়ির ভেতর চলে গেলো। দিয়া ভ্রু কুঁচকে বিরক্ত প্রকাশ করলো। একটু বেশি তদারকি করছে মানুষ টা।
——–
বাড়ির ভেতর প্রবেশ করে দেখলো লিভিং রুম জমজমাট পরিবেশ। দিয়া গিয়ে দাঁড়াল নিজের মেঝো আম্মুর পাশে। মিসেস মাইমুনার সঙ্গে বেশ ভালো বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক। মরিয়ম নওয়াজ মেয়ের দিকে আঁড়চোখে তাকালো। দিয়া কাচুমাচু করে। দিয়া একটু সময় দাঁড়িয়ে রইলো। ফ্রেশ হওয়া দরকার। তাই ও ধীরে ধীরে সরে এলো সেখান থেকে। নিজের রুমে ফিরে ড্রেস পালটে ফ্রেশ হয়ে বিছানায় শুয়ে পড়লো। দরজা খোলাই আছে। নাফিজা এসে ওর সাথে বসলো। দুই বোনের আড্ডা চলমান। তখন এলো আয়েশা।
-“আপু তোমার একটা দেবর থাকলে আমার সেটিং করে দাও। দুই বোন মিলে এক সঙ্গে সংসার করবো।”
-“এ্যা আসছে সংসার করতে। এই তোর দুধের দাঁত সব-কয়টা পড়ে ছিলো?”
দরজা দিয়ে আলভি যখন প্রবেশ করতে করতে কথা গুলো বলে উঠলো নাফিজার মুখ টা তখন থতমত হয়ে এলো। আলভি ওর দিকে বিরক্তিকর চোখে তাকিয়ে এরপর বোনের দিকে তাকালো। বললো,
-“তোর আবার এই রাবিশ টার মতো কোনো শখ টখ নেই তো বোনু?”
আভিরাজ ভাই দাঁড়িয়ে দরজায়। দিয়া জানে ইফতির কোনো ভাইবোন নেই। তবুও কেনো জানি আচমকাই মাথায় শয়তানি বুদ্ধি খেলে গেলো। জবাবে বললো,
-“হ্যাঁ, আছে তো। আয়েশা আপু তোমার দেবর থাকলে আমার সঙ্গে স,,,”
আভিরাজ ভাই যখন রুমের ভেতর প্রবেশ করলেন বাকিটা আর বলতে পারলো না দিয়া। ভয়ে না-কি অন্য কোনো কারণে কণ্ঠনালিতে চাপ অনুভব করলো। আলভি নিজের বোনের কথায় চোখ বড়ো বড়ো করে বলে উঠলো,
-“ওহ তোর ও বিয়ে করার শখ। দাঁড়া বড়ো আব্বু কে বলে তোর ব্যবস্থা করছি আমি।”
দিয়া আস্তে করে ঢোক গিলে নিলো। সে এতো দ্রুত বিয়ে করতে চায় না। পড়তে চায় ও। তবে এই একটা কথা বলার শক্তি টুকু এখন ওর নেই।
এরমধ্যে আমির এসে উপস্থিত হলো। সবার সাথে কথাবার্তা শেষ ফাহাদ বললো,
-“ভাইয়া কী কাজে খুব ব্যাস্ত? আমরা সেই দুপুরে এসছি।”
-“আর বলিস না। এক জন রক্তের প্রয়োজনে বলে নক দিয়ে উধাও হয়ে গিয়েছে। হসপিটালে এই নামে কোনো রোগী পর্যন্ত নেই। সারা টা বিকেল গচ্ছা গেলো।”
আমিরের বিরক্তিকর স্বর। আয়েশা দিয়ার দিকে চাইলো। এতোক্ষণে বুঝতে পারে দিয়ার চালাকি। দিয়া মিটমিট হাসে। যা আভিরাজ ভাই এর চোখ এড়ায় না।
—–
পরেরদিন বিকেল থেকে মেহেদীর অনুষ্ঠানের আয়োজন শুরু। বাড়িতে পুরুষ সদস্য বাদে মহিলা এমন কোনো সদস্য বাদ নেই মেহেদী লাগাচ্ছে না। দিয়া পড়বে কী মেয়ে টা মেহেদীর জন্য যে পান্নার সবুজ রঙের শাড়ী টা গায়ে জড়িয়েছে সেটা সিল্কির। এখনো শাড়ী টাই গুছিয়ে উঠতে পারছে না। শখ করেই এনে ছিলো সিল্কি শাড়ী। তবে কে জানতো এমন হবে। মেয়ে টা রাগে দুঃখ শাড়ী খুলে রুমে বসে রইলো। নাফিজা এসে জোর করলেও গেলো না। নাফিজা এই খবর পুরো বাড়ি করলো৷ আভিরাজ ভাই ছিলেন বাহিরে। কাজে মানুষ টার নাস্তানাবুদ অবস্থা। সে নিজের মায়ের কাছে গিয়ে শান্ত স্বরে বললো,
-“আম্মু ওকে নিচে আসতে বলো।”
আমেনা বেগম চারপাশ তাকায়। তিনি এবার নিজেই গেলেন ছেলের কথা অনুযায়ী। গিয়ে নিয়ে এলো দিয়া কে। আভিরাজ ভাই ওর হাত ধরে বাড়ি থেকে বেরিয়ে এলো। বাইকে বসে ওকে নিয়ে শাঁই শাঁই করে ছুটলেন। কেউ কেউ চাচাতো ভাই বোনের সম্পর্কে দেখে কেউ প্রসংশা করলো তো কেউ বাঁকা চোখে চাইলো।
——-
কয়েকটি দোকান ঘুরে ঘুরে আভিরাজ একটা সুতির শাড়ী নিলো। দিয়ার বেশ পছন্দ হলো শাড়ী। আভিরাজ ভাই জিজ্ঞেস করলো,
-“হলুদের আর বিয়ের জন্য আগের গুলো হবে?”
দিয়ার মনে পরলো সেগুলো জর্জেট। পড়া যাবে। মাথা নিচু করে বললো,
-“ওটা জর্জেট আছে। পড়তে পারবো।”
আভিরাজ ভাই শুনলেন কিন্তু পাত্তা দিলো না। নিজের মতো করে আবারও দোকান থেকে দামী একটা থ্রি-পিস নিলেন হলুদের জন্য একটা সুতির শাড়ী নিলো। দিয়া বাঁধা দিলে বললো,
-“ওসব কাপড় পড়তে হবে না। এগুলো পড়বি।”
রাতের শহরে বাইকে করে মার্কেট করে দিয়ার মনমেজাজ সব ফুরফুর হয়ে গেলো। অর্ধেক রাস্তা আসার পর আভিরাজ জিজ্ঞেস করলো,
-“গতকাল কী হয়েছিল রে? আমির যে বলছিলো!”
-“কই? কখন? কী হবে? কিছু না তো।”
দিয়ার সাথে সাথে এমন অস্থিরতা আভিরাজ ভ্রু কুঁচকে নিলো। সামন্য প্রশ্নই তো করেছে। এমন অস্থির কেনো হচ্ছে মেয়ে টা? নিশ্চয়ই গন্ডগোল করেছে কিছু।
——–
হলুদ বিয়ে সব হৈ-হুল্লোড়ের মধ্যে দিয়ে শেষ হলো। চৌধুরী বাড়ি সব সদস্য যে যার বাড়ি ফিরে যাবে আজ। চৌধুরী বাড়ির নিজস্ব দু’টো গাড়ি রয়েছে। বাড়ি ফেরার সময় একটা গাড়িতে সব মহিলারা নাফিজা নীলয় অন্য গাড়ি টায় বাড়ির সব পুরুষ। ফাহাদ, আলভি, আভিরাজ ভাই বাইকে করে ফিরবে। বিপত্তি সৃষ্টি হলো দিয়ার বেলায়। আলভি বোন কে নিজের সাথে করে নিবে বলে সবাই কে বিদায় করলো। কিন্তু ফাহাদ আলভির বাইকে যাবে। দিয়া কে আভিরাজ ভাই এর বাইকে যেতে হবে। অথচ দিয়ার মুখ টা আজ সকাল থেকে পাংশুটে হয়ে আছে। মুখ এমন হুতোম প্যাঁচার মতো করে রাখার মানে খুঁজে পাচ্ছে না কেউ। বাইক স্টার্ট দেওয়ার প্রায় অনেক্ক্ষণ পরে-ও দিয়া যখন আভিরাজ ভাই কে ধরলো না তখন আভিরাজ ভাই বলে উঠলো,
-“কী হয়েছে তোর? মুখ এমন কেনো?”
-“আপনাকে কেনো বলবো?”
আভিরাজ আর কিছু বললো না। দিয়ার মন আরও খারাপ হলো। একটু জোর করলে কী এমন হতো? অদ্ভুত মানুষ। উনি কী জানে না ওনার বিয়ের জন্য মেয়ে দেখছে! কিন্তু এতে ওর কেনো খারাপ লাগছে! কোনো প্রশ্নের উত্তর নেই মেয়ে টার কাছে।
#চলবে….
[ভুল ত্রুটি ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন।]
