#আত্মার_আত্মীয়া
#পর্ব_৭
#জান্নাত_সুলতানা
-“কি হলো এখনো উঠছিস না কেনো? তোকে কোলে করে তুলবো আমি? উঠে বোস।”
আভিরাজের রাগী গম্ভীর স্বরে দিয়ার আরও কান্না পায়। তার পায়ে ব্যাথা। আর এই মানুষ টার একটু দয়া হচ্ছে না তার ওপর। একটু ধরে তুললে কী এমন হয়? ক্যাফেতে তো ঠিকই কোলে তুলেছিল। দিয়া মুখ ভেংচি কাটলো। কিছু টা কষ্ট করে মেঝে থেকে ওঠে চেয়ারে বসলো। আভিরাজ ভাই বেশ কিছু প্রশ্ন দাগিয়ে দিলো। দিয়া কে সে-সব পড়তে দিলো। আর নিজে ফোনের ভেতর মুখ গুঁজে রইলো। কি এতো মনোযোগ দিয়ে ফোনের স্ক্রিনে দেখছে কে জানে। দিয়া আবার মুখ ভেংচায়। সাথে সাথে আভিরাজ ভাই বলে উঠলো,
-“এই বেয়াদব মুখ এমন বাঁদরের মতো করিস কেনো?”
বাঁদর? বাঁদর কাকে বলে এই যুবক? দিয়ার মতো একজন সুন্দরী যুবতী মেয়ে কে তিনি এই উপাধি কী করে দিতে পারে? চোখ কী নেই? দিয়া রাগ যেমন হলো তেমন থতমত খেলো। ফোনের দিকে তাকিয়ে কিভাবে দেখলো দিয়া মুখ ভেংচি কেটেছে! ভারী চিন্তার বিষয়। দিয়া কলম টা কামড়ে ধরে ভাবুক হলো। সেই ভাবুক মুখখানা সামনের পুরুষ গভীর চাহনিতে পর্যবেক্ষণ করলো। যা মেয়ে টা একটু ও টের পেলো না।
——
-“তোর বোন কোথায়?”
আভিরাজ প্রশ্নে আলভি খাবার রেখে আভিরাজের মুখের দিকে চাইলো। বললো,
-“বোনু কে তো আব্বু সকাল সকাল নিয়ে বেরিয়ে গেছে। বললো মামার বাসায় রেখে নিজে অফিস করবে।”
সকাল আটটা এখন। আভিরাজ দাঁতে দাঁত চেপে ধরলো। সে বারণ করা স্বত্বেও মেয়ে টা চলে গেলো? এতো সাহস? না-কি অভিমান? আভিরাজ কিছু না বলে নিজের কফি টা নিয়ে হনহনিয়ে সিঁড়ি বেয়ে ওপরে চলে গেলো। আলভি খাবার টেবিলে বসে গালে হাত রাখলো।
——-
দিয়া মামার বাসায় এসছে পর সারাদিন বেশ ভালো কাটলো। রাতে নিজের জন্য বরাদ্দকৃত রুমে ফিরে এসে হাতে পায়ে ময়েশ্চারাইজার লাগিয়ে নিলো। নিচতলায় এই রুম টা একদম নির্জন। যদিও পাশের রুমেই রয়েছে দিয়ার মামা-মামী। তবুও ভয় একটু হচ্ছে অনেকদিন পর নিজের ঘর ব্যাতিত অন্য কোথাও ঘুমবে। তাই ঘুম আসছে না। বিছানায় শুয়ে এপাশ-ওপাশ করছে আর ভাবছে আভিরাজ ভাই নিশ্চয়ই রেগেমেগে গিয়েছে দিয়া যে ওনার কথা অমান্য করলো। করলে করুক গিয়ে। তাতে দিয়ার কী! সে এসছে এখানে নিশ্চিন্তে কিছু দিন থাকবে।
হঠাৎ জানালায় শব্দ পেয়ে একটু ভয় পেলো। কাঠের ফাঁকফোকড় বেশ রয়েছে। দিয়া গুটিয়ে গেলো। চোর কিংবা ভূতের ভয়ে গায়ে কম্বল মুড়ি দিলো। জানালার ঠকঠক শব্দে ওর আরও ভয় ধরলো। কান টা খাঁড়া করে শুনলো। ফিসফিস করে যেনো কেউ ডাকলো মাহদি বলে। মাহদি তো আভিরাজ ভাই ছাড়া কেউ বলে না। দিয়া এবার চিন্তিত হলো। ওঠে এগিয়ে গেলো জানালার কাছে। সামন্য একটু ফাঁক করে উঁকি দিলো। একটা ছায়ামূর্তি দাঁড়িয়ে। ভয়ে মেয়ে টার আত্মা বেরিয়ে আসার জোগাড়। সত্যি সত্যি আভিরাজ ভাই রেগে মেগে দিয়া কে মারতে চলে এলো না-কি! দিয়া জানালা বন্ধ করতে যাবে তখনই বাঁধা দিলো সেই ছায়ামূর্তি। একটু এগিয়ে আলোর দিকে এলো। দিয়ার তখন সামনের পুরুষ কে চিনতে একটু অসুবিধা হলো না।
-“আমি তোর জীবনে হঠাৎ আসা কেউ না। আমি তোর ছায়া। তুই তোকে না চিনলেও আমি তোকে অনেক আগেই চিনেছি। আমার সাথে অভিমান করে কোনো লাভ নেই। তোর অভিমান স্বার্থকতা, বাকি সব আমার। খুব শীগ্রই সেটা প্রমাণ ও পেয়ে যাবি।”
মানুষ টার গম্ভীর, হিমবাহের ন্যায় শীতল কণ্ঠ। অথচ প্রতি টা শব্দ থেকে যেনো আগুনের গোলা দিয়ার বুকে এসে বিঁধছে। সব টা স্বপ্ন? হোক৷ তবুও এই একরোখা, জেদি পুরুষ টা বাস্তবে এখানে না আসুক। দিয়া মনেপ্রাণে চাইলো সব কিছু ওর কল্পনা। জানালা টা বন্ধ করে দিয়ে এসে বিছানায় শুয়ে পড়লো।
মশার কামড়ে আলভির অবস্থা প্রায় নাস্তানাবুদ। বিরক্তি তার চোখে মুখে ফুটে উঠেছে। সে বিরক্তিকর স্বরে বলে উঠলো,
-“প্রেম তুমি করো, মশার কামড় খাই আমি!
ভালোবাসা তোমাদের, আর ডেঙ্গু আমার।”
সে মশা মারতে মারতে ঘড়িতে টাইম দেখলো। মাত্র পাঁচ মিনিটে খুব খারাপ অবস্থা। মামার এলাকায় বেশ মশা। মামা একজন মেয়র হয়ে ও তার নিজের এলাকার এমন দুর্দশা সত্যি বেদনাদায়ক। আলভি বাইকের চাবি টা পকেটে নিলো। কোথাও যাওয়ার উদ্দেশ্যে পা ফেলে দুই কদম এগিয়ে এলো। তখন সামনে থেকে মচমচ শব্দ আভিরাজ এলো। হুডি গায়ে ঘেমে-নেয়ে একাকার অবস্থা যুবকের। এতো গরমে কেউ হুডি পরে? আলভি বললো,
-“চলো ভেতরে যাই। আমাকে মশা কামড়াচ্ছে ভাই।”
আভিরাজ মুখে কিছু বললো না। চাহনি দেখে আলভি মুখে আঙুল দিলো। আভিরাজ বললো,
-“মামাশ্বশুর বাড়িতে তো বিয়ের পর রাতে যাবো। বিয়ের আগে বউ ছাড়া রাতে গিয়ে লাভ নেই। চল বাড়ি যাই।”
আলভি চোখ বড়ো বড়ো করে নিলো। তার চাহনি যেনল বলছে কী নির্লজ্জ কথাবার্তা তা-ও আবার যার সঙ্গে লাইন মারছে তারই বড়ো ভাইয়ের সামনে!
-“একটু তো নিজের কথাতে লাগাম টানো ভাই। আমি ওর বড়ো ভাই।”
আভিরাজ আলভির গাল টেনে দিলো। মুচকি হেঁসে বললো,
-“ওলেলে আমার সম্মুন্দি সাহেব।”
আলভি মুখের এমন এক্সপ্রেশন দিলো যেনো সে খুব বিরক্ত।
—–
আয়েশা দিয়ার মামাতো বোন। মাস্টার্স কমপ্লিট করেছে প্রায় এক বছর। বয়ফ্রেন্ডের জব হচ্ছিল না বিধায় সে বিয়ে করে নি। সাত বছরের সম্পর্কে অবশেষে ছেলে চাকরি পাওয়ার পর পারিবারিক ভাবে মেনে বিয়ে হচ্ছে তাদের। কোনো রকম ত্রুটি রাখছে না দিয়ার মামা। বাড়িঘর ঝকঝকে তকতকে পরিষ্কার। দিয়ার মামা একজন। পুরনো দিনের জমিদার ছিলো নানা। খুব আয়োজন হচ্ছে বাড়িতে। এক সপ্তাহ আগে থেকে সাজসজ্জা শুরু। দিয়া এ-সব দেখছে আর অবাক হচ্ছে। তারচেয়ে বেশি অবাক হচ্ছে এ-সব ভেবে যে সাত বছর একে-অপরের পাশে থেকেছে। সুখে-দুঃখে দিন পার করেছে। আয়েশা যখন দিয়া কে তাদের প্রেমের কাহিনি শোনাচ্ছে স্ট্রাগল করার গল্প বলছে মেয়ে টার এসব শুনতে এতো ভালো লাগছে। থাকছে খাচ্ছে লাইফ ফরফর করে চলছে। কোনো কিছু তাকে ছুঁতে পারছে না। ঘুরছে বেশ নিজের মামাতো বোনের সঙ্গে। আজ-ও তারা যাচ্ছে একটা রিসোর্টে। সাথে যাচ্ছে দিয়ার মামাতো ভাই আমির। দিয়ার এটাতে একটু মন টা খারাপ হলো। কেননা আমির ভাই খুব গম্ভীর আর চুপচাপ স্বভাবের। সাথে গেলে যদি ধমক টমক দেয়। দিয়া তো কোনো কিছু মন খুলে করতেও পারবে না। দিয়া রেডি হয়ে আয়েশার রুমে এলো। আয়েশা আয়নার সামনে মুখ গোমড়া করে চোখ কাজল লাগাচ্ছে। দিয়া জিজ্ঞেস করলো,
-“কি হয়েছে আপু? তোমায় এমন লাগছে কেনো?”
-“শোন দিয়া তোর ভাইয়া আসবে দেখা করতে। বিয়ের আর একদিন বাকি। আমির ভাইয়া দেখা করত নিষেধ করেছে। এখন ভাইয়া সাথে গেলে দেখা করবো কিভাবে?”
সাত বছর প্রেম করেছে লুকিয়ে। এখন এসে ভয় পাচ্ছে? যদি বিষয় টা ভয়ের নয়। তবুও বড়ো ভাই সাথে থাকলে নিজের হবু স্বামী সঙ্গে দেখা করে টা একটু অস্বস্তিকর। দিয়া বুঝলো আমির ভাই শুধু ওর প্রবলেম নয় আয়েশার ও প্রবলেম। দিয়া মুখে তা প্রকাশ করলো না। ছোট করে জবাব দিলো,
-“ওহ আচ্ছা।”
-“এখন কী করবো?”
দিয়া গম্ভীর মুখে ভাবতে বসলো। আয়েশা ওর পাশে বসে চিন্তিত হয়ে দাঁত দিয়ে নখ খুঁটতে লাগলো। দিয়া কিছু সময় চুপ থেকে হঠাৎ করে বলে উঠলো,
-“আপু তোমার কাছে নতুন কোনো সিম কার্ড আছে? যেটার নাম্বার কেউ জানে না। এমন সিম কার্ড?”
-“না তো। মনে নে,, আরে হ্যাঁ একটা আছে আমার এক ফ্রেন্ডের। ওর বিয়ে হয়ে গিয়েছে তিন বছর আগে। তখন আসলে সিম কার্ড টা নিয়ে পুরনো বয়ফ্রেন্ডদের সাথে কথা বলতো। লাস্ট যখন সিম কার্ড রাখলো এরপর আর নেয় নি। আমার কাছে আছে সেটা এখনো।”
বলতে বলতে গিয়ে আয়েশা সিম কার্ড টা ড্রেসিং টেবিলের ওপর একটা ছোট বক্স থেকে সেটা বের করলো। যা দেখে দিয়ার চোখ চকচক করে উঠলো। সিম হাতে নিয়ে বলে উঠলো,
-“তুমি নিশ্চিন্তে থাকো। বাকিটা আমি দেখছি।”
-“কিন্তু কী করবি তুই?”
দিয়া আয়েশার ফোন টা নিয়ে আগে সেখানে সিম কার্ড লাগালো। কিছু সময় পর আবার ফিরত দিলো। তার ঠিক দুই মিনিট বাদে ওরা নিচে নেমে এলো। দোতলা বাড়িটার লিভিং রুম টা বিশাল। কাজের লোকগুলো রান্না ঘরে কাজে ব্যাস্ত। আর ডেকোরেশন এর লোকেরা তাদের কাজ করছে। আমির সেখানেই ছিলো। দিয়ার মামা লিভিং রুমে সোফায় বসে ল্যাপটপ নিয়ে কিছু করছে। দিয়া উঁকি মারি। সেখানেই ডেকোরেশনের ডিজাইন দেখা যাচ্ছে। এরমধ্যে ওদের সাথে কথা বলেন তিনি। আমির এসে বসে তখন। দিয়া সাইডে দাঁড়িয়ে থাকে। সময় এর অপেক্ষা মাত্র। আমির আয়েশা কে জিজ্ঞেস করলো,
-“কতদূর যাবি তোরা?”
-“বেশি দূরে না ভাইয়া। ওই সামনের রেস্টুরেন্টায়।”
-“ওহ আচ্ছা। সাবধানে যাবি। তাড়াতাড়ি ফিরে আসবি। আমি একটু হসপিটাল যাচ্ছি তাই তোদের সাথে যেতে পারছি না।”
দিয়ার ঠোঁটে বাঁকা হাসি। আয়েশা খুশি তো হয়েছে। তবে বেশ অবাক হয়েছে কী এমন করলো দিয়া যে এতো তাড়াতাড়ি পরিস্থিতি বদলে গেলো!
আয়েশার বয়ফ্রেন্ড এর নাম ইফতি। বেশ অমায়িক মানুষ। দিয়া আগে থেকেই চিনে ইফতি কে। ইফতি আগে থেকে ছিলো রেস্টুরেন্টের ভেতর। ওরা সেখানে গিয়ে একটা টেবিলে বসলো। ওরা খাবার অর্ডার দিয়ে বসে গল্প করছে তখন হঠাৎ করে ইফতি ওঠে বাইরে গেলো। ফিরে এলো একটু পরেই। তবে সাথে করে আরও একজন কে নিয়ে এসছে। দিয়া মানুষ টাকে দেখার আগে কণ্ঠস্বর শুনতেই চমকে উঠলো।
#চলবে…..
[ভুল ত্রুটি ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন।]
