#আত্মার_আত্মীয়া
#পর্ব_৫
#জান্নাত_সুলতানা
-“আভিরাজ ভাই আমার ভয় করছে।”
দিয়া ভয়ার্ত স্বরে বললো। আভিরাজ উচ্চস্বরে বলে উঠলো,
-“শক্ত করে ধরে বোস।”
-“আপনি বাইক সাইডে রাখেন। আমার ভয় করছে।”
পরপরই দিয়া আবারও বললো। আভিরাজ এবার স্পিড আরও বাড়ালো। দিয়া শেষমেশ আভিরাজের পেট জড়িয়ে ধরলো। আলভির বাইক অনেক পেছনে ওদের থেকে। প্রায় আধঘন্টার ও বেশি সময় পর ওরা প্রায় শহর ছেড়ে অনেক টা নির্জন পরিবেশে চলে এলো। বড়ো ট্রাক আর বাস ব্যাতিত তেমন কোনো গাড়ি নজরে আসে না। সময় টা তখন প্রায় সন্ধ্যা। গোধূলিতে আকাশ সেজেছে যেনো। এখন এসে ধীরে ধীরে বাইক টা চলছে। দিয়া তাই পেছনের দিকে তাকালো। আলভির বাইক দেখার জন্য। অথচ আশ্চর্যের ঘটনা হচ্ছে আলভির বাইক দেখা যাচ্ছে না আর। দূরদূর পর্যন্ত কোনো বাইক নেই। দিয়া আভিরাজের উদ্দেশ্যে বললো,
-“ভাইয়ার বাইক টা দেখা যাচ্ছে না আভিরাজ ভাই। প্লিজ আপনি বাইক সাইডে রাখুন না”
দিয়ার কথার অর্থ এমন যে সে আলভির জন্য অপেক্ষা করতে বলছে এখানে। কিন্তু আভিরাজ বাইক রাখলো না আর না-ই কিছু জবাব দিলো। আরও অনেক টা পথ যাওয়ার পর আভিরাজ একটা ছোটখাটো ক্যাফের সামনে বাইক রাখলো৷ ক্যাফের সামনে এক কোণে ছোট একটা ফুলের দোকান। বাইক রেখে আভিরাজ ফুলের দোকানের লোকটার সঙ্গে কথা বলতে গেলো। দিয়া পেছনে এলো। দোকানী বৃদ্ধা একটা পুরুষ। দাড়ি এবং চুল যা আছে সব কালো রঙ পরিবর্তন করিয়া সাদা হয়েছে। বয়স নিশ্চয়ই অনেক। তবে দেখতে সহজসরল মনে হচ্ছে। দিয়ার মন উনার দিক থেকে বালতি রাখা এবং দোকানের দেয়ালের গায়ে বাঁশের ঠেসে সাজানো নানা রঙের ফুলে। কাঠের তৈরি টেবিলের ওপর সারি সারি করে রাখা গোলাপ, রজনীগন্ধা, গাঁদা, গুলদাউদা, জারবেরা, গ্ল্যাডিওলাস, সূর্যমুখী, টিউলিপের মতো বিদেশি কিছু ফুলও। পাশে ঝোলানো ঝুড়িতে রাজহাঁসের মতো সাদা কচি বেলি আর চামেলির মালা। দোকানীর ঠোঁট জুড়ে মৃদু হাসি। তিনি দিয়ার দিকে তাকিয়ে মুচকি হেঁসে জিজ্ঞেস করলো,
-“ফুল লাগবে না ছোট আপা? রজনীগন্ধা, গোলাপ আর জারবেরা মিশায়ে দিলেই একেবারে জমবে!”
সময় টা গোধূলি হলেও কিন্তু দোকানটা যেনো এক টুকরো বসন্ত। ফুলের গন্ধে, মানুষের হাসিতে, আর ছোট ছোট কথায় ভরে আছে ফুলের এই দোকান। বাইরের কোলাহল থেমে গিয়ে শুধু টের পাওয়া যায়। জীবনের মধ্যে ঠিক এমন কিছু মুহূর্ত থাকে। যেগুলো কখনো মুছে যায় না।
আভিরাজ দিয়ার দিকে আঁড়চোখে চাইলো। দিয়া আভিরাজের পেছনের দিকে চলে গেলো। আভিরাজের শার্টের কোণা টা টেনে বললো,
-“একটা নেই? আমার কাছে টাকা নেই। আপনি এখন দিয়ে দেন। ভাইয়া এলে আমি ভাইয়ার থেকে নিয়ে আপনাকে দিয়ে দেবো।”
আভিরাজ ওর কথা কানে তুলেছে কি-না কে জানে। সে দোকানী কে উদ্দেশ্য করে ততক্ষণে বলে উঠলো,
-“ওটা দিয়েন দাদু। হাঁ ওটাই।”
আভিরাজের দেখানো ফুলগুলো লোক টা হাতে তুলে নিলো। একটা জারবেরা, রজনীগন্ধা আর একটা গোলাপ। দিয়া নেওয়ার আগেই আভিরাজ নিয়ে নিলো। একটা ফুলের মালা নিলো। ফুল গুলো দিয়ার হাতে দিয়ে ফুলের মালা টা হাতে বেঁধে দিলো। দিয়া খুব খুশি। মুখ দেখেই বোঝা যাচ্ছে। আভিরাজ যে হাতে ফুলের মালা পড়িয়ে দিলো মেয়ে টার সেদিকে ও খেয়াল নেই। ফুল উলটে-পালটে দেখছে সে৷ উপচে পড়া খুশি তার মুখ জুড়ে। আভিরাজ হাজার টাকার একটা নোট দোকানী কে দিলো। বললো,
-“বাইক রেখে গেলাম দাদু। আধঘন্টার মধ্যে ফিরে আসবো।”
বৃদ্ধা লোক ইতস্তত করলেন। আভিরাজের হাতের থেকে টাকা টা নিতে সময় নিচ্ছেন। আভিরাজ বুঝতে পারলো ফুলের দামের চেয়ে বেশি টাকা দেওয়াতে সে টাকা টা ধরছে না। আভিরাজ ওয়ালেট টা পকেটে রেখে সামন্য একটু এগিয়ে এলো। উনার হাত ধরে টাকা দিয়ে মৃদু স্বরে বললেন,
-“আমার জন্য দোয়া করবেন। পরেরবার নিয়ে এলে যেনো আপা নয় নাতবউ ডাকতে পারেন। আর বিশেষ ধন্যবাদ।”
দিয়া শুনতে পায় না সেকথা। আভিরাজ ওর দিকে তাকিয়ে বললো,
-“চল।”
-“কোথায় যাবো?”
-“আলভির সাথে কথা হয়েছে। ওরা আধঘন্টার মধ্যে চলে আসবে। আমাদের এখানে অপেক্ষা করতে বলেছে।”
-“কখন বললো?”
দিয়া ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করলো। আভিরাজ গম্ভীর স্বরে জানালো,
-“আসার আগে।”
-“তাহলে আমাকে আগে বলেন নি কেনো?”
-“এতো কৈফিয়ত দিতে পারবো না। গেলে আয় না গেলে থাক তুই এখানে। আমি মশার কামর খেতে পারবো না এখানে দাঁড়িয়ে থেকে।”
আভিরাজ সামনের দিকে পা বাড়ালো। দিয়ার অভিমানী মন আরও অভিমান হলো। সে জেদ ধরে দাঁড়িয়ে রইলো সেখানে। আভিরাজ একটু সামনে এগিয়ে পেছন ফিরে দিয়া কে না দেখে রাগ তরতর করে বাড়লো। থাপ্পড় দিয়ে সব ক’টা দাঁত ফেলে দেওয়ার মতো রাগ যুবক টা দাঁতে দাঁত চেপে নিজে কে শান্ত রাখলো। চোয়াল চেপে ফিরে এসে দিয়ার হাত টেনে ধরলো। আচমকাই টানতে দিয়ার পায়ে কাটা স্থানে চিনচিন ব্যাথা শুরু হলো। অস্ফুটে ওর মুখ দিয়ে বেরিয়ে এলো,
-“আহ্।”
-“এই কী হয়েছে? কথা বল। মাহদি?”
আভিরাজের অস্থির কণ্ঠ সঙ্গে সঙ্গে শোনা গেলো। দিয়ার চোখ টলমল করছে। আভিরাজ ওর পায়ের দিকে তাকিয়ে হঠাৎই কোলে তুলে নিলো। দিয়া যেমন চমকেছে তেমনই ওর শরীর কেঁপে উঠলো। ছটফট করতেই আভিরাজ ভাই বলে উঠলো,
-“নড়বি না মাহদি।”
দিয়া সাথে সাথে চুপ করে শান্ত হয়ে গেলো। ফুল গুলো শক্ত করে চেপে ধরে হাত গুলো বুকের ওপর তুলে রাখলো। লম্বা বলিষ্ঠ দেহের আভিরাজ ভাই সাতচল্লিশ কেজি ওজনের দিয়া কে কোলে তুলে একটু ও কুঁজো হয়ে যায় নি। সটান হয়ে যুবক ক্যাফের ভেতর প্রবেশ করলো। রাস্তার পাশে ধানক্ষেত। পরিবেশ বেশ মনোমুগ্ধকর। ভেতর থেকে বাইরের সবকিছু স্পষ্ট। সুন্দর করে টেবিল গুলো পর্দা দিয়ে ঘিরে রাখা। প্রাইভেসির কমতি নেই। তবে আভিরাজের এগুলো দেখে বিরক্তই লাগলো বেশি। সব ঠিকঠাক ছিলো। পর্দা দেওয়া টা কেমন একটু লাগলো। এখনকার উঠতি বয়সীর অনেক ছেলেমেয়ের জন্য এটা বেশ ভালো হলে-ও আসলেই এটা ভালো নয়। ক্যাফের ভেতরের একদম লাস্টের দিকে গিয়ে আভিরাজ একটা টেবিল খালি দেখলো। একজন ওয়াটার এসে চেয়ার টেনে দিলো। আভিরাজ দিয়ে কে বসিয়ে নিজে অন্য টায় বসলো। ওয়েটার পাশে দাঁড়িয়ে বললো,
-“স্যার অর্ডার কী নেবো?”
-“হ্যাঁ। কফি দিবেন। একটা হট একটা কুল।”
ওয়েটার লিখে নিয়ে চলে গেলো। দিয়ার সে-সব খেয়াল নেই। ওর দুনিয়া তখন উলোটপালোট হয়ে আছে। একটু আগের ঘটনা মনে পড়তেই বারবার মাথা নুইয়ে আসে ওর। চোখ তুলে সামনে বসা সুদর্শন যুবক আভিরাজ কে দেখার মতো সাহস ও করতে পারছে না। কালো রঙের শার্ট গায়ে জিন্সের প্যান্ট মাথায় ঘনকালো চুল। গাল ভরতি ট্রিম করা খোঁচা খোঁচা দাড়ি। একটু চোখ তুলে গলা পর্যন্ত গেলো। শার্টের দুই টা বাটন খোলা আছে বুকের দিকে। সেখান থেকেই উঁকিঝুঁকি দিচ্ছে কিছু পশম। দিয়া আস্তে করে ঢোক গিলে মাথা টা আবারও নুইয়ে নিলো। আভিরাজ তখন নিজের ফোন বের করে ক্যামেরা অন করলো। দামী ফোনে মাথা নুইয়ে রাখা দিয়ার ছবি স্পষ্ট। আভিরাজ ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে বললো,
-“এদিকে তাকা।”
দিয়া চাইলো। সঙ্গে সঙ্গে আভিরাজ ছবি ক্লিক করলো। সেলফিতে বেশ সুন্দর দেখাচ্ছে আভিরাজ ভাই কে। দিয়া নিজের দিকে তাকালো। নরমাল সুতির একটা থ্রি-পিস পরনে। এলোমেলো চুল আর তৈলাক্ত ত্বক। মুখের অবস্থা ও বিশেষ ভালো নয়। কিছুদিন আগেই পরীক্ষার গিয়েছে। রাত জেগে পড়ার ফলে কপাল ছোট ছোট কিছু হয়েছে। আভিরাজ ভাই সত্যি সিনেমার হিরোদের মতো সুদর্শন। মানুষ টা দীর্ঘ দিন বিদেশি লেখাপড়া করেছে নিশ্চয়ই সেখানকার সুন্দরী মেয়েদের থেকে প্রপোজাল পেতো। দিয়ার মন টা বড্ড খারাপ হলো। কফি আসতেই আভিরাজ ওকে ঠান্ডা দুধ ও বরফ সহ এসপ্রেসো আইস লাতে এগিয়ে দিলো। দিয়ার পছন্দের কফি। কিন্তু দিয়ার এখন এটাকেও বিরক্ত লাগলো। আভিরাজ ওর মুখের এক্সপ্রেশন দেখে ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করলো,
-“কী হয়েছে তোর? মুখ এমন করে রেখেছিস কেনো?”
-“কিছু না।”
-“তাহলে খাচ্ছিস না কেনো? এটা তো তোর পছন্দের।”
আভিরাজ গম্ভীর স্বরে বললো। দিয়া কফি টার দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো কিছু সময়। এরপর বললো,
-“মানুষ পরিবর্তনশীল। সেখানে তাদের পছন্দ চিরকাল এক থাকবে, এমন ভাবা নিছকই বোকামি।”
#চলবে….
[ভুল ত্রুটি ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন।]
