#আত্মার_আত্মীয়া
#পর্ব_৪
#জান্নাত_সুলতানা
-“তুই ফেলে এসছি কাল আমার ঘরে এ-সব?”
দিয়ার প্রশ্নে নাফিজা অবাক হয় না করতেই যাচ্ছিলো। তবে সিঁড়ি বেয়ে আভিরাজ ভাই কে নিচে নামতে দেখে ও বলে উঠলো,
-“হাঁ হাঁ তোমার জন্য। আমার মনে নেই তোমাকে বলতে।”
দিয়া ভ্রু কুঁচকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে নাফিজার দিকে তাকিয়ে আছে। এমন অপ্রস্তুত হওয়ার মতো সে কিছু জিজ্ঞেস করে নি। তাহলে ও এমন তোলাচ্ছে কেনো? তবে এটার চেয়ে বেশি ওর অভিমান হলো। আভিরাজ ভাই সবাই কে কতকিছু দিলো আর ওকে কিচ্ছু না! অন্যের দেওয়া চকলেট ও খাবে না। দিয়া চকলেটের বক্স নাফিজার হাতে দিলো। বললো,
-“আমার চকলেট লাগবে না।”
নাফিজা হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো। আভিরাজ এসে খাবার টেবিলে বসলো। সকালে নাশতা হবে একটু পর। এখনো কেউ আসে নি। নাফিজা কে চকলেট দিয়ে দিয়া রান্না ঘরে চলে গেলো। আভিরাজের মা ওকে দেখেই বলে উঠলো,
-“কিছু লাগবে তোর?”
-“না বড়ো মা। তোমাদের সাহায্য করতে এসছি। বলো কী করবো?”
-“ওরে বাবা। প্রসাদের রাজকন্যা রন্ধনশালায়! মহারাজ দেখলে কেলেঙ্কারির শেষ থাকবে না। সকলের গর্দান যাবে।”
মাইমুনার কথায় সব জা ঠোঁট টিপে হাসলো। দিয়া ছোট ছোট চোখে তাকিয়ে বলে উঠলো,
-“মেঝো মা?”
-“হ্যাঁ মা বল।”
-“তুমি আামকে নিয়ে মজা করতে পারো না।”
দিয়া আহ্লাদী স্বরে বললো। মাইমুনা চুলায় তরকারি নাড়তে নাড়তে জবাব বললো,
-“আচ্ছা।”
আমেনা বেগম দিয়ার হাতে একটা জুসের জার দিয়ে বললেন,
-“যা এটা রেখে আয়।”
দিয়া জার হাতে মৃদু হেসে রান্না ঘর থেকে বেরিয়ে এলো। নাফিজা আভিরাজ নাফিজা কে কিছু বলছিলো। তবে দিয়া কে দেখে ভাব এমন করলো যেনো নাফিজা কে পড়াশোনার জন্য উপদেশ দিচ্ছেন। দিয়া জার টা রেখে চলেই যাচ্ছিলো। তখনই আভিরাজ রাশভারী কণ্ঠে পেছনে আদেশ করলো,
-“এক গ্লাস জুস দে তো আমাকে।”
দিয়ার একবার ইচ্ছে হলো জুস আভিরাজ ভাইয়ের মাথায় ঢালতে। কিন্তু কেনো? কে জানে। দিয়ার কাছে উত্তর নেই। তবে আভিরাজ ভাইয়ের ওপর কোনো অজানা কারণেই দিয়ার রাগ হচ্ছে।
ও গ্লাস হাতে জার থেকে জুস নিয়ে আভিরাজের কাছে এলো। একটু দূরত্ব রেখে দাঁড়িয়ে হাত বাড়ি গ্লাস টা সাধলো আভিরাজ ভাই কে। আভিরাজ চোখ পাকিয়ে তাকাতেই দিয়ার হাত থেকে গ্লাস নিচে পরে গেলো। ভয়ে শরীর তো কেঁপে উঠলো সাথে পায়ে ও আঘাত লেগেছে। নাফিজা চমকে ওঠে এগিয়ে আসতে নিয়ে ও আসে না। মা আর বড়ো মাকে ডাকতে লাগলো। সবাই শব্দ পেয়ে ছুটে এলো। দিয়া একটু পিছিয়ে গিয়ে নিচে বসে পড়লো। কাচের আঁচড় লেগে রক্ত কয়েক যায়গা থেকে চুইয়ে পড়ে। মাইমুনা ফাস্টএইড বক্স আনতে যায়। নওরিন জাহান বরফ নিয়ে আসে। আভিরাজের মা এসে ওর পাশে বসে গেলো। দিয়ার মা মরিয়ম নওয়াজ মুখ শক্ত করে দাড়িয়ে আছেন। এই মেয়ে অতি আহ্লাদী হয়েছে। সামন্য একটা কাজ। এটাও ঠিক মতো করতে পারলো না। আলভি মাত্রই এসছিলো লিভিং রুম। বোন কে এভাবে বসে থাকতে দেখেই আলভি দ্রুত পায়ে এগিয়ে এলো। জিজ্ঞেস করলো,
-“কিভাবে হলো এটা?”
-“এতো বড়ো মেয়ে হয়েছে কাজ এখনো ঠিকঠাক একটা করতে পারে না। গ্লাস ফেলে দিয়েছে হাত থেকে।”
এমনভাবে বললেন কথা মরিয়ম নওয়াজ মনে হলো দিয়া ইচ্ছে করে গ্লাস ফেলে দিয়েছে। দিয়া মায়ের কথা শুনেও শুনলো না। মা এমনই একটু রাগী। নওরিন জাহান দিয়ার পায়ে বরফ দিচ্ছিলো। অল্পই কেটেছে। তবুও জ্বলছে বরফ দেওয়াতে দিয়া চোখ খিঁচে বন্ধ করে নিতেই আলভি মায়ের কথা পাত্তা না দিয়ে বোন কে কোলে তুলে নিলো। লিভিং রুমে নিয়ে সোফায় বসালো। বোনের পায়ে নিজেই ঔষধ লাগিয়ে দিলো। নাশতা এনে খাইয়ে দিয়ে একটা ব্যাথার ঔষধ খাইয়ে দিলো। ততক্ষণে সবাই উপস্থিত হয়েছে লিভিং রুমে। শুধু আভিরাজ ভাই নেই। দিয়া এটাও লক্ষ্য করলো। উনার জন্যই তো এমন হলো। আর একবার ও তাকিয়ে দেখলো না তিনি। দিয়ার আরও একটু রাগ, একটু অভিমান হলো। সে সেই অভিমান থেকেই রেগে গিয়ে সবাই কে যেতে বললো। আচমকাই রেগে কেনো গেলো কেউই বুঝতে পারে না। সবাই কে বিদায় করে দিয়ে, ইশতিয়াক চৌধুরী মেয়ের কাছে এসে বসলেন। জিজ্ঞেস করলেন,
-“কী হয়েছে আম্মা?”
-“আব্বু আমি নানু বাড়ি যেতে চাই।”
-“আগে সুস্থ হয়ে যাও।”
-“আমি সুস্থ আছি আব্বু।”
-“হাঁটতে পারবে না তো। ক্ষতস্থানে থেকে রক্ত আসবে যে।”
-“আসবে না। তুমি প্লিজ আমাকে দিয়ে এসো।”
মেয়ের জেদের কাছে হার মানলেন ইশতিয়াক চৌধুরী। মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে মৃদু হাসলেন তিনি। যদিও তাদের সবাই কে যেতে হবে সামনে সপ্তাহে। মরিয়ম নওয়াজ এর ভাইয়ের মেয়ের বিয়ে ঠিক হয়েছে। তিনি তাই সম্মতি দিলেন। দিয়া যেনো স্বস্তি পেলো। তার কেনো জানি অশান্তি লাগছে এখানে। কারণ কী? সে কী নিয়ে এতো বেশি ভাবছে যে তার এতো অস্বস্তি লাগছে? কারণ খুঁজে পাচ্ছে না।
——–
-“তোর হাত টা ভেঙে ফেলতে ইচ্ছে করছে আমার।”
আভিরাজ রাগে হিসহিসিয়ে বলে উঠলো। আলভি অবাক হলো। সে নিজের হাত উলটে পালটে দেখতে দেখতে অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলো,
-“কিন্তু কেনো? আমার হাত তোমার কী ক্ষতি করলো?”
-“চুপ শ্লা।”
আভিরাজ দাঁতে দাঁত চেপে আবারও ধমক দিয়ে উঠলো। আলভি মুখ ভেংচি কাটলো। এরপর বাইকের চাবি একটা আভিরাজ কে দিয়ে বললো,
-“ফাহাদ কে আমার সাথে নিচ্ছি। তুমি একা যাও। কতদিন প্র্যাকটিস নেই তোমার। আমাদের কারোর হাত পা ভাঙার শখ নাই।”
আভিরাজ চাবি নিয়ে শার্টের হাতা ফোল্ড করে কনুইয়ের ওপর ভাজ করে রাখতে রাখতে বললো,
-“তোকে আগেও বলেছি। এখনো বলছি। আমার সামনে একদম মেয়েদের মতো ঢং করবি না।”
আলভি ততক্ষণে বাইকে বসে গিয়েছে। আভিরাজ ও ওঠে বসলো। ফাহাদ দুই ভাই কেই চিয়ারআপ করছে। দিয়া নিজের ব্যালকনিতে বসে আছে নাফিজার সাথে। নাফিজা আচমকাই সেখান থেকে হাত নাড়িয়ে আভিরাজ কে বললো,
-“আভিরাজ ভাইয়া অল দ্য বেস্ট।”
আভিরাজ ঘাড় বাঁকিয়ে তাকালো সেদিকে। সঙ্গে সঙ্গে এক জোড়া শীতল দৃষ্টি নজরে এলো। তবে কুঁচকানো ভ্রু জোড়া যেনো কিছু নিয়ে বিদ্রূপ করছে। আভিরাজ গলা উঁচিয়ে ডাকলো,
-“মাহদি কাম হেয়ার।”
দিয়া অবাক হয়। নাফিজা ততক্ষণে দিয়ার হাত ধরে টানছে। দিয়া নড়ছে না। আলভি ও ডাকলো,
-“বোনু আয় তো। আমার দাঁড়িয়ে থেকে কোমর ব্যাথা হয়ে যাচ্ছে।”
-“এই ঢঙ্গি তুই বসে আছি। দাঁড়িয়ে নয়।”
আভিরাজের কথা শুনে আলভি নিজের বাইকের দিকে একবার তাকালো। সত্যি ই তো সে বসে আছে। বললো,
-“ওহ সরি। আমার মনে ছিলো না। আচ্ছা সেই যা-ই হোক তুমি বোনু কেনো ডাকলে?”
-“তোর বোন কে নিয়ে রাইড হবে।”
-“এই আভিরাজ ভাই না। তুমি ভুলে যাচ্ছো তুমি অনেকদিন পর বাইক চালাবে। অঘটন কিছু হয়ে গেলে,,,”
-“এই চুপ শ্লা। সারাক্ষণ প্যানপ্যান। নিজের ভালো চাইলে মুখ বন্ধ করে বসে থাকবি। নয়তো ওই যে ডাস্টবিন, সেখানে দশ মিনিট তোর মাথা গুঁজে রাখবো।”
গেইটের সামনেই একটা ডাস্টবিন রাখা। সেটা ইশারা করে বলো আভিরাজ। আলভি চোখ বড়ো বড়ো করে তো তাকালো। তবে আভিরাজ সে-সব পাত্তা দিলো না। নাফিজা ধরে ধরে নিয়ে এসছে দিয়া কে। দিয়া আসতেই আভিরাজ ওর দিকে একবার তাকিয়ে আবার পায়ের দিকে তাকালো। পরক্ষণেই দিয়ার দিকে একটা হেলমেট এগিয়ে দিয়ে বললো,
-“পড়ে নে।”
দিয়া এদিক-ওদিক তাকালো। অবাক হয়েছে। মাথা টা নুইয়ে নিয়ে বললো,
-“আমি যাবো না।”
-“আর একবার বল।”
-“আমি,,,”
আভিরাজের রাগান্বিত চোখের দিকে তাকিয়ে বাকি কথা আর বলতে পারলো না মেয়ে টা। হাত টা সামন্য বাড়িয়ে হেলমেট টা হাতে নিলো। পড়তে গিয়ে পারলো না। আভিরাজ ফোঁস করে নিঃশ্বাস ফেললো। একটা হেলমেট পড়তে পারে না মেয়ে তার বাইক চালানো নিয়ে উপহাস্যের দৃষ্টিতে তাকায়! হেলমেট পরিয়ে দিয়ে আভিরাজ নিজের হেলমেট পড়ে নিলো। ফাহাদ, নাফিজা, আলভি ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে দেখলো শুধু।
#চলবে…….
[ভুল ত্রুটি ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন।]
