#অনাকাঙ্ক্ষিত_অসুখ
#লিমা_ইমরাত
#দ্বিতীয়াংশ
মাঝরাতে চাঁদের আলোয় ঝলমল করছে চারিপাশ। ব্যালকনিতে রাখা দোলনায় আমার স্বামীর কোলে বসে সেই সৌন্দর্য উপভোগ করতে ব্যাস্ত আমি। রিহানকে বার বার নামিয়ে দিতে বললেও সে একই ভাবে আমাকে কোলে নিয়ে ঘাড়ে মুখ গুঁজে রয়েছ। থেকে থেকে চুমু দিচ্ছে আর দুই একটা কথার হ্যাঁ হুম উত্তর দিয়ে যাচ্ছে। ব্যাপারটা নিয়ে আমি বেজায় বিরক্ত। প্রেগন্যান্সির এই লম্বা জার্নিতে মুড সুইংস টা ভীষণ ভাবে চেপে ধরেছিলো আমায়। হুট করেই রেগে যাওয়া চিৎকার করা গাল ফুলিয়ে বসে থাকা। এরপর কোনো কারণ ছাড়াই কেঁদে কেটে রিহানের বুক ভাসানো।
ইদানিং মাকে মিস করি ভীষণ।রিহানের ভালোবাসা এবং যত্নে কোনো কমতি নেই।তবুও মায়ের অভাব বোধ করি। মনের মাঝে অজানা ভয় বাসা বেঁধে থাকে। যদি কিছু হয়ে যায়? যদি কিছু হয় আমার বেবি দের? তাহলে কি হবে? কিভাবে থাকবে আমার রিহান। প্রায় এক বছর তো হতে চললো নিজেদের পরিবার ছেড়ে দূরে আছি।আমার বাচ্চারা কি দুনিয়াতে এসে তার দাদা দাদির আদর মাখা ভালোবাসা পাবে না?
এসব ভাবতে ভাবতে চোখ বেয়ে জল গড়িয়ে পরলো। রিহান এর হাতের শক্ত বাঁধন আমার পেটে। হাতে পানির ফোঁটা হাতে পড়তেই ঘাড় থেকে মুখ তুললো রিহান। অস্থির হয়ে উঠলো ক্রমশ। আমাকে ঘুরিয়ে নিজের দিকে করে দুই হাতে গাল ছুঁয়ে বললো –
” কি হয়েছে জান? কাদঁছো কেনো ব্যথা হচ্ছে পেটে? কোথায় কষ্ট হচ্ছে তোমার? আমাকে দেখাও জান?
ছলছল চোখে কথা গুলো বললো রিহান। আমি ঠোঁট চেপে কান্না আটকাতে না পেরে ওকে জড়িয়ে ধরে শব্দ করেই কেঁদে ফেললাম। এতে করে আরো বেশি অস্থির উম্মাদ হয়ে উঠলো ছেলেটা। আমাকে কোলে নিয়ে উঠে রুমে নিয়ে শুইয়ে দিলো বেডে। কান্না ভেজা গলায় বললো –
” সরি জান ,আম সরি! খুব করে সরি। আমার জন্য তোমাকে এত কষ্ট পেতে হচ্ছে। আমি বুঝতে পারিনি জান আমার খুশির জন্য আমার বাবা ডাক শোনার জন্য তোমার এত টা কষ্ট সহ্য করতে হবে। আমি বুঝতে পারলে কখনোই বাবা হতে চাইতাম না।
আমি তোমাকে ভীষণ ভালোবাসি জান। কোনো কিছুর বিনিময়ে তোমাকে হারানো সম্ভব না। তুমি …..
আর বলতে পারলো না ছেলেটা। আমাকে জড়িয়ে কান্নায় ভেংগে পড়লো। কান্নার তোপে শরীর কেঁপে কেঁপে উঠছে। ওকে দুই হাতে জড়িয়ে নিলাম নিজের সাথে। বুকে মুখ গুঁজে শুয়ে থাকা অবস্থায় মাথায় হাত বুলিয়ে দিলাম। আমার ভেতরে থাকা ভয়টা আরো বেশি জোড়ালো হলো এবার। ছেলেটা আমায় অসম্ভব ভালোবাসে তাতে সন্দেহ নেই। আমর শরীরের অবস্থা যে ভালো নয় সেটা আমি জানতাম কিন্তু এবার নিশ্চিত হলাম কোনো ছোট খাটো সমস্যা না। জীবনের ঝুঁকি আছে আমার।
থমধরে শুয়ে রইলাম ওকে বুকে নিয়েই। ঘুমিয়ে গেছে রিহান। মাথায় এখন আমার একটাই চিন্তা। রিহানের মা বাবার সাথে যোগাযোগ করা। আমার কিছু হলে একে কে সামলাবে? যেখানে আমার নিশ্চয়তা নেই সেখানে কার ভরসায় রেখে যাবো আমি ওকে।
~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~
আমাদের বাসার ডাইনিং রুমে বসে আছে রিহানের পরিবারে সবাই। রিহানের মা বাবা সহ আরো কিছু আত্মীয়।খালি বাসা আজ মানুষে ভরপুর। রিহান কে বলার পর সে নিজ থেকেই তার বাবা মায়ের সাথে কথা বলেছে। আমাদের সন্তান আসার কথা শুনে তারা আর রাগ করে থাকতে পারেনি। রিহান তাদের একমাত্র ছেলে। অনেক আদরের সন্তান। সেই রিহানের অংশ তাদের নাতি নাতনী আসতে চলেছে।এরপর আর কিভাবে রাগ করে থাকবেন তারা? আজ সকাল হতেই চলে এসেছেন তারা। রিহানকে জড়িয়ে সে কি কান্না আমার শাশুরির। বুকে এক সূক্ষ্ম পীরা অনুভব করলাম আমি। নিজের সন্তানের থেকে দূরে থেকে এক মায়ের মনে কি চলে সেটা বুজতে পারলাম। নিজের পেটে হাত রেখে এসব ভাবছিলাম আমি।
আমার শশুর শাশুড়ি আমাকে নিয়ে তবেই ফিরবেন বাড়িতে। কিন্তু রিহান কোথাও যেতে দিবে না আর না সে যাবে। এই সময় আমার জার্নি করা নিষেধ আর নিয়মিত চেকআপ করাতে হয়। রিহানের মা রেগে গেলেন।তার একমাত্র ছেলের বউ কেনো ভাড়া বাসায় থাকবে? এতদিন যোগাযোগ ছিল ন কিন্তু এখন তো সব ঠিক হয়ে গেছে। এখন সে কিছুতেই রাখবে এখানে
।রিহানকে রেখে বউ নিয়ে চলে যাবেন।
এক কথায় কাজ হলো বোধহয়। রিহান গম্ভীর মুখে বসে।তার কথা একটাই বউ ছাড়া সে থাকতে পারবে না। কারো কাছে রেখে সে শান্তি পাবে নাহ। তার বউয়ের তাকে প্রয়োজন। এসব শুনে মিটিমিটি হাসছে সকলেই। শেষে সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো আমরা রিহানের বাসায় থাকবো।রিহানের প্রথম সন্তান রিহানের নিজের বাড়ি থেকেই হবে।কোনো ভাড়া বাসায় থাকা চলবে না । আমিও দ্বিমত করিনি। আমার বাচ্চারা তার অধিকার থেকে বঞ্চিত কেনো হবে।
~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~
আমার স্বামীর বাসায় এসেছি আজ দুই মাস। এখন আমার নয় মাসের ভরা পেট। গত দুই মাস ধরে হাটা চলা সম্পূর্ণ বন্ধ আমার। না বসে থাকা যায় আর না শুয়ে থাকা। অতিরিক্ত ব্যথায় যখন শব্দ করে কান্না করি তখন আমাকে নিজের বুকে জড়িয়ে ধরে রিহান নিজেও কাঁদে । অনুশোচনায় গুমরে মরছে ছেলেটা। ঘুম নেই খাওয়া নেই সারা ক্ষণ আমার কাছে থাকে। শাশুড়ি মা ও আমায় ভীষণ ভালো বাসে। যত্ন করে খাইয়ে দেয় চুল বেঁধে দেয় আমার সবকিছু করে দেয়। হাতে পায়ে পানি এসে ফুলে যায়। নিজ হাতে মালিশ করে দেয় সে। বাবা অফিস থেকে আসার সময় আমার পছন্দের খাবার নিয়ে আসে। মাথায় হাত বুলিয়ে সাহস দেয়।তাদের ভালোবাসায় সিক্ত আমি। এমন একটা স্বামী এমন পরিবার প্রতিটা মেয়ের স্বপ্ন। আমার কপালে বুঝি এত সুখ সয়?
রাত ২ টা বাজে হয়তো। পেটের তীব্র ব্যথায় ঘুম ভেংগে গেল।শরীর ঘেমে ভিজে উঠছে আমার। গলা শুকিয়ে কাঠ কাঠ। রিহান গভীর ঘুমে মগ্ন। নয়তো আমার নড়াচড়ায় ঘুম থেকে উঠে যেত ছেলেটা। হঠাৎ করেই পেটের জোড়ালো ব্যথায় গুঙিয়ে উঠতেই ঘুম ভাঙ্গলো তার। আমাকে ধরে উঠে বসে পাশে ফিরে লাইট জ্বালিয়ে দিয়েছে।
“কি হয়েছে জান? ব্যথা করছে খুব? আমি আম্মুকে ডাকছি । এখুনি হাসপাতালে নিয়ে যাবো তোমায়।
আমাকে কোলে তুলে নেওয়ার কিছু ক্ষণ পরেই জ্ঞান হারালাম আমি। চোখ বন্ধ হওয়ার আগে শুধু রিহানের মুখটা অস্পষ্ট দেখতে পেয়েছিলাম।জানিনা আর কখনও দেখা হবে কিনা এই মায়ারাজের মুখ খানা। তার বাচ্চাদের কি হবে? আমি কি আমার বাচ্চাদের সুস্থ ভাবে দুনিয়া দেখাতে পারবো? রিহানের কোলে তুলে দিতে পারবো তার অস্তিত্ব দের? যদি আমার কিছু হয়েও যায় তাহলে বাচ্চাদের দিকে তাকিয়ে অন্তত বাঁচতে পারবে ছেলেটা!
#চলবে……
