#অনাকাঙ্ক্ষিত_অসুখ
#লিমা_ইমরাত
“প্রেগন্যান্সির চার মাস চলাকালীন যখন আমার শরীর ভীষণ রকম খারাপ হতে শুরু করে। তখন থেকে বাড়তে থাকে আমার স্বামীর আমাকে নিয়ে পাগলামি। টুইন বেবী কনসিভ করায় প্রথম থেকেই অনেক কমপ্লিকেশন ছিলো। তবে আমার স্বামী রিহানের ভালোবাসার কোনো কমতি ছিলো না কখনোই।
পরিবারের অমতে সকলের বিরুদ্ধে পালিয়ে গিয়ে বিয়ে করেছিলাম আমরা। মাত্র এক বছরের প্রেমের সম্পর্ক ছিলো আমাদের। তখন আমার স্বামী রিহানের কোনো চাকরি ছিল না । সম্ভ্রান্ত পরিবারের সন্তান হওয়া সত্ত্বেও আমার জন্য নিজের বিলাসবহুল জীবন ছেড়ে এসেছিল সেদিন। আজ প্রায় এক বছর হতে চললো আমরা আমাদের পরিবার ছেড়ে দূরে আছি। অথচ তার ভালোবাসা আমাকে কখনো বুঝতেই দিলো না একাকীত্ব কি।
রিহান একটা প্রাইভেট কোম্পানীতে কাজ করছে এখন । ভালোই সেলারি পায় তাই দিয়ে আমাদের সুন্দর ভাবে চলে যায়। তবে কাজের জন্য তাকে সারা দিন বাহিরে থাকতে হয় । আমাকে বাসায় একা রেখে যেতে হবে বলে একজন হেল্পিং হ্যান্ড রাখা হয়েছে কয়েকমাস আগে।
পাঁচ মাসের ভরা পেটে হাত রেখে বসে বসে আনমনে ভাবছি। আমাদের সুখের সংসার তবুও কেমন যেন অসম্পূর্ণ। আচ্ছা আমাদের পরিবার কি আমাদের মেনে নিবে না? আমাদের বাচ্চা গুলো কি দাদা দাদির আদোর পাবে না ? একটা ভুলের শাস্তি আজীবন বয়ে বেড়াতে হবে আমাদের?
ভাবনার মাঝেই অফিস থেকে ফিরলো রিহান। অফিস ব্যাগ টা রেখেই হাঁটু গেড়ে বসে পড়ে আমার পেটের কাছে। ঢিলেঢালা লেডিস সার্ট পেট থেকে সরিয়ে চুমুতে ভরিয়ে দিলো সেখানটায়। এটা নতুন কিছু নয়।গত পাঁচ মাস ধরেই এমনই করে সে। বাবুদের সাথে একা একা কথা বলবে। পেটে কান পেতে সুয়ে থাকবে। এটা যেন তার নিত্য দিনের অভ্যাস।
এভাবেই যত দিন যেতে লাগলো ততই আমার শরীর খারাপ হতে শুরু করলো।শরীরে ধরা পড়লো নানা ধরনের জটিলতা । নরমাল ডেলিভারি করার মতো অবস্থা ছিলো না আমার।তাই আট মাসের শেষের দিকে সি সেকশন করার কথা বলেন ডাক্তার। এরপর ডাক্তারের সাথে আরো কিছু কথা হয় রিহানের যা আমার অজানা। সেই দিন ডাক্তারের চেম্বার থেকে বেরিয়ে সেদিন রিহান থমকে গিয়েছিল। ঠিক মতো কথা বলতো না। মুখ খানা সবসময় মলিন করে থাকতো।
সাত মাসের পেট নিয়ে নরা চরা করা অসম্ভব হয়ে গেলো আমার। টুইন বেবি হওয়ায় আরো বেশি সমস্যা হচ্ছিল। উঠে দাঁড়ানোর মতো ক্ষমতা হারিয়ে ফেললাম। রিহান অফিস থেকে ওয়ার্ক ফ্রম হোমের জন্য আবেদন করেছিল যাতে করে পুরোটা সময় আমার যত্ন নিতে পারে। এখন হুইল চেয়ারে করেই আমার চলা ফেরা করতে হয়।
আমার খাওয়া থেকে শুরু করে গোসল করানো ওয়াশরুমে নিয়ে যাওয়া ওষুধ দেওয়া সব কেমন একা হাতে করে ফেলতো ছেলেটা। যদি বলতাম তোমার কষ্ট হয় না ? কিভাবে সামলাও তুমি এত কিছু? বিরক্তি আসে না আমার ওপর?
রিহান আমার চোখের দিকে মায়াভরা দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতো। আলতো হাতে গাল ছুঁয়ে ঠোঁটে চুমু খেয়ে বলতো ” তুমি যদি আমার জায়গায় থাকতে তাহলে কি করতে? ভালোবাসার মানুষের কোনো কিছুতেই কষ্ট হয় না । আর না বিরক্তি আসে। বুকে বাসা বেঁধে থাকা ব্যথা আর হারিয়ে ফেলার যে ভয় নিয়ে আমি বেঁচে আছি সেটা যদি একটু বুঝতে তবে এসব বলতে পারতে না।(পরবর্তী অংশ দ্রুত পেতে আমার পেইজে ফলো দিয়ে পাশে থাকুন)
আমি শুধু ছলছল চোখে তাকিয়ে ছিলাম ছেলেটার মুখের দিকে। কি অসম্ভব মায়া। কি দারুন আকুতি তার কন্ঠস্বর। এমন একজন মানুষ ছেড়ে কি থাকা সম্ভব?
একদিন মাঝ রাতে ঘুম ভেংগে গেল কারো কান্নার শব্দে। পাশে ফিরে রিহান কে পেলাম না। কোনো রকম বালিস ধরে উঠে বসলাম আমি । খাটের থেকে কিছুটা দূরে জায়নামাজে বসে কান্নায় ভেঙে পড়েছে রিহান। কান্নার তোপে শরীর কেঁপে উঠছে ছেলেটার। ভিতর টা কেঁপে উঠলো আমার।
খাট থেকে নেমে উঠে দাড়িয়ে আবারো পড়ে যেতে নিলে দুহাতে আগলে নিলো কেউ। আমাকে উঠতে দেখেই নামাজ শেষ করে এগিয়ে এসেছে রিহান। খাটে বসিয়ে বুকে জড়িয়ে নিলো আমায়। বুক টা কাপছে চরম ভাবে। চোখ মুখ গলা ভিজে একাকার। আমাকে জড়িয়ে গলায় মুখ গুজে শুয়ে পড়লো সে। হয়তো আমার থেকে কান্না গুলো আড়াল করতে চাইছে। আমি ওর মাথায় হাত বুলিয়ে সান্ত্বনা দিতে বললাম কি হয়েছে করছো কেনো? ভয় পেয়েছো? আমি আছি দেখো? শান্ত হও দয়া করে!
আমাকে হারানোর ভয়ে কেমন নিস্তব্ধ হয়ে গেলো ছেলেটা। ওর ভয় দুশ্চিন্তা দেখে আমিও কেমন ঘাবড়ে গেলাম। আচ্ছা আমি আমার বাচ্চাদের দুনিয়া দেখাতে পারবো তো? ওদের বাবার কোলে তুলে দিতে পারবো তো? যদি কিছু হয়ে যায় আমার তখন এই পাগল ছেলেটাকে কে সামলাবে?কি হতে চলেছে আমাদের সাথে?
চলবে।
