#অধিকার (২)
#নুসরাত_জাহান_মিষ্টি
বাবার পরে মাকেও হারিয়ে ফেললাম। সেই সময়ে যে বয়সটা পার করছিলাম তখন জীবনের এত বড় হিসাব মেলানো সম্ভব ছিলো না। তবুও কিছুটা মিলিয়ে ফেলেছিলাম। বাবার মৃ ত্যুর পর সবাই বলতো, তোর বাবা ম রে গেছে। মায়ের কাছে যখন জানতে চাইতাম ম রে যাওয়া কি? তখন মা বলতো,“তোর বাবা আল্লাহর কাছে গিয়েছে।”
তাই এবার মায়ের ম রে যাওয়ার কথাটা জেনে আমার বুঝতে বাকি হলো না যে আমার মায়ও আমার বাবার কাছে চলে গিয়েছে। আল্লাহর কাছে গিয়েছে। যেখানে গেলে আর ফিরে আসা যায় না। আগে মা ছিলো তাই সে বলতো বাবার সঙ্গে সঠিক সময়ে সাক্ষাৎ হবে। মায়ের কথার গভীর ভাবার্থ তো বুঝতাম না। তবে আমার ছোট মস্তিষ্ক মনে করতো, বাবা বেড়াতে গিয়েছে আল্লাহর কাছে। খুব শীঘ্রই ফিরে আসবে। তবে মায়ের মৃ ত্যুর পর এই আশ্বাস দেওয়ার মতো কেউ ছিলো না। তাই তো সবার কথায় বুঝে গেলাম, বাবা-মা ফিরবে না আর। আল্লাহর কাছে গেলে আর ফেরা যায় না। এসব বুঝে ওঠার পর আমি মা বলে চিৎকার দিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়ি। এতটাই কান্নায় ভেঙে পড়ি যে একটা সময় জ্ঞান হারিয়ে পড়ে যাই।
ইতিমধ্যে মায়ের মৃ ত্যুর খবর শুনে মামা, মামী আর নানী এসেছে। তারা আসলে সবাই মিলে মায়ের চরিত্রের বর্ননা করলো। অবশ্যই সেটা খারাপ। লোকের হাতে ধরা খাওয়ার পর সম্মানের ভয়ে মা আত্ম হত্যা করেছে। মামা এসব নিয়ে আর ঘাটলো না। এই মৃ ত্যুর কথা পুলিশ অব্দি গেলে মায়ের মৃ তদেহ নিয়ে কাটাছেঁড়া হবে। এগুলো পাপ। তাই সবার সঙ্গে মিলে মৃ তদেহ দাফন করাই সঠিক বলে মনে করলেন মামা। সেটাই হলো। মাকে বাবার পাশেই মাটি দেওয়া হলো।
মায়ের মৃ ত্যুর তিনদিন হলো। আমি কান্নাকাটি করে জ্বর বাঁধিয়ে ফেললাম। এই তিনদিনে আমার যতটা সময় হুঁশ ছিলো ততবারই আমি চিৎকার দিয়ে মাকে ডেকেছি। বারবার বলেছি,“আমাকে মায়ের কাছে নিয়ে যাও। আমি মায়ের কাছে যাবো। আমাকে মায়ের কাছে নিয়ে যাও।”
তখন মামী এবং নানী আমাকে সামলানোর চেষ্টা করেছে। তিনদিন তারা দু’জন আমার পাশেই ছিলো। এবার মায়ের মৃ ত্যুর রেশটা কাটতে আমার মেঝ চাচা মামাকে ডেকে বলে,“সুজনকে দেখার তো এখন কেউ রইলো না। আপনারা তাকে নিবেন? নয়তো আমরা ভাবছিলাম তাকে এতিমখানায় দিয়ে দিবো।”
“মানে?”
মামা অবাক হয়ে যায়। বাবা, মা হারানোর শোক না কাটতে কাটতে তারা আমার ব্যবস্থা ভেবে ফেলেছে। চাচারা এখানে স্পষ্ট মামাকে জানিয়ে দেয়,“দেখেন আমরা বাড়তি ঝামেলা নিতে পারবো না। তাই আপনারা যা করার করেন। না পারলে আমরা এতিমখানায় দিবো।”
“আপনাদের বাড়তি ঝামেলা নিতে হবে না। ও আমার বোনের সন্তান। দুলাভাই মা রা যাবার পর বোনকে নিতে চাচ্ছিলাম। কিন্তু সে যায়নি স্বামীর ঘরের মায়া ছেড়ে। তখন আমার বোনটা আমার কাছে গেলে আজকের এই পরিনতি হতো না। যাই হোক যা ঘটে গেছে তা নিয়ে নাই বা বলি। আমার ভাগ্নেকে খাওয়ানোর মতো সার্মথ্য আমার আছে। তাই আমি তাকে আমার সঙ্গেই নিবো।”
একটু থেমে মামা আবারও বলে,“আমার বোন চরিত্রহীন নয়। তাই আপনারা যে মিথ্যা বদনাম রটাচ্ছেন তা আমি ভালোই বুঝেছি। সময় আসলে হিসাব বুঝে পাবেন। আফসোস একটাই আমার বোনটা আপনাদের কলঙ্কের দ্বায় নিতে না পেরে চলে গেল। ছেলেটাকে অনাথ করে চলে গেল।”
এটা বলে মামা চলে আসে। চাচারা কিছু বলার সুযোগ পায় না। অতঃপর আমার জায়গা হয় মামার ঘরে। এখানে আমি ভালোই ছিলাম। মামী একটু বাঁকা চোখে দেখলেও নানী এবং মামার আহ্লাদে দেখে কিছু বলতে পারেনি। তাদের ভালোবাসায় আমিও ধীরে ধীরে স্বাভাবিকভাবে বড় হতে থাকি। যদিও মায়ের কথা খুব মনে পড়তো। মাকে নিয়ে প্রায় রাতেই স্বপ্ন দেখতাম। ঘুমের মধ্যেই ‘মা’ বলে চিৎকার দিয়ে উঠতাম। তখন নানী আমাকে বুকের মধ্যে নিয়ে নানা গল্প বলে শান্ত করতেন। এভাবেই আমার বড় হওয়া।
বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বুঝ ব্যবস্থা তৈরি হয়। বুঝতে পারি আমার চাচারা আমার মাকে কতবড় অপবাদ দিয়েছে। অনুভব করতে পারি মায়ের রাতের পর রাত আমাকে বুকে নিয়ে চোখের পানি ফেলার সেই যন্ত্রণার মূহুর্তগুলো। আজ আমি পড়ালেখা শেষ করে খুব ভালো একটি অবস্থানে আছি। বুঝ হওয়ার পর থেকেই আমার মনে হতো আমার মা আত্ম হত্যা করতে পারে না। অন্তত আমার মুখের দিকে তাকিয়ে আমার মা টিকে থাকার লড়াই করতো। সেদিন তো করেছিলো লড়াই। যখন সবাই তাকে এলাকা ছাড়া করতে চাইছিলো তখন সে তেজ নিয়ে বলেছিলো,“কোথাও যাবো না। এটা আমার স্বামীর ভিটে।”
আমার মায়ের সেই কন্ঠস্বর আজও আমাকে ভাবায়, আমার মা সত্যি আত্ম হত্যা করেছিলো তো। এর উত্তর আমার জানা নেই। তবে হ্যাঁ যে সম্পদের জন্য আমার চাচা, চাচী মিলে আমার মাকে গোটা সমাজের কাছে কলঙ্কিনী বানিয়েছিলো সেই সম্পদ আমি তাদের আর ভোগ করতে দিবো না। আর ঠিক এই উদ্দেশ্যই আমি আঠারো বছর পর আবার আমার বাবার বাড়িতে পা রাখলাম। আমি বাড়ির মধ্যে প্রবেশ করতে মেঝ চাচার সামনে পড়ে গেলাম। সে আমাকে অবাক চোখে দেখছিলো। নতুন একজন মানুষকে দেখলে যেমন প্রতিক্রিয়া হওয়া উচিত তার তেমনই হয়েছে। তবে আমার ভাবভঙ্গি ছিলো ভিন্ন। আমি তার দিকে ঘৃণার নজরে তাকাই। এই মানুষটি সেদিন আমাকে মাকে নিজের সঙ্গে জড়িয়ে খুব বাজে কথা বলছিলো। সেটা মনে পড়তেই আমার রাগ হয়। আমি নিজেকে সামলে তাকে বলি,“আমি সুজন।”
“হ্যাঁ?”
মেঝ চাচা বিশ্বাস করতো পারলো না। তারা বোধহয় আশা করেনি কোন একদিন আমি ফিরে আসবো। তাই অবাক হলো। পরক্ষণে নিজেকে সামলে আমাকে ঘরে নিয়ে গেল। চাচীর সঙ্গে তার ছেলে এবং বৌমার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিলো। আমার কথা শুনে ছোট চাচীও আসে। তারও দুটো ছেলে মেয়ে, তারাও আসে। কুশল বিনিময় ছেড়ে আমি বলি,“আমি একটি গুরুত্বপূর্ণ কথা বলতে এসেছি ছোট চাচী। আপনি, ছোট চাচা, মেঝ চাচা এবং মেঝ চাচী একত্র হলে ভালো হয়।”
ছোট চাচী জানালো চাচা সন্ধ্যা আসবে। তখন নাহয় কথা বলবো। আমিও সম্মতি জানালাম। চাচীরা আমাকে দেখে অবাক হলেও নিজেদের সামলে আমাকে আপ্যয়ন করলো। আমিও দুপুরের খাওয়া দাওয়া করে একটু বের হই। আমাদের ঘরটা যেই জায়গায় ছিলো সেখানে এসে দাঁড়াই। সেখানে এখন পাকা ঘর। যেটায় মেঝ চাচার বড় ছেলে থাকে। ছোট ছেলে বউ তাদের সঙ্গে থাকে। আমি ঘরটা ভালোভাবে লক্ষ্য করে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললাম। অতঃপর রাতে সবাই একত্র হলে আমি বললাম,“আমি আমার বাবার সম্পত্তি বুঝে নিতে এসেছি। সেটা বিক্রি করে এখান থেকে একেবারে নিজের সমস্ত চিহ্ন বিলীন করে চলে যাবো সেটা ভেবে আসলাম।”
“সম্পত্তি?”
সবাই হতচকিয়ে গেল। আমার কাছে এটা আশা করেনি। তারা বোধহয় স্বপ্নেও ভাবেনি কোন একদিন আমি সম্পদের আশায় ফিরে আসতে পারি। মেঝ চাচা আমতা আমতা করে বলে,“বাবা সুজন তোমার বাবার হক তুমি নিতে আসছো তাতে আমাদের আপত্তি নাই। কিন্তু আমার বাবার তো তেমন সম্পদ ছিলো না। তাই আমাদের ভাইদের ভাগেও তেমন সম্পদ নাই। হয়তো দুই তিন শতাংশ পেতে পারো। এটা নিতে তুমি আসবে আমরা ভাবিনি। সেখানে তো ভাগ করে আমরা নিয়ে নিয়েছি। তবে সমস্যা নাই। তুমি যখন বিক্রি করতে চাচ্ছো তখন আমরা নাহয় তোমাকে কিছু টাকা দিলাম।”
”স্যরি চাচা।
কিছু টাকা নিতে আমি আসিনি। আমি আমার জমির নায্য মূল্য নিতে আসছি। আমি যতদূর জানি আমার দাদার সম্পত্তি কম ছিলো না। তার উপর আমার বাবা নিজের টাকায় অনেক ফরাজি জমি কিনেছে। তাই আশা করি আজকের বাজার মূল্যে বেশ দামেই আমি সবটা বিক্রি করতে পারবো।”
আমার মুখে জমির এমন হিসাব শুনে তারা অবাক হন। সেই সঙ্গে রাগও হয়। পরক্ষণে ছোট চাচা ভীষণ একটা সন্ধি এঁটে বলে,“জমির কাগজ তো আছেই। সেটা দেখেই বুঝে নিও।”
“হ্যাঁ। তবে চাচা আপনি নিশ্চয় এটা জানেন না আজকাল নকল কাগজ আর আসল কাগজের পার্থক্য করা যায়। চাইলেই আসল কাগজ নতুন করে ওঠানো যায়।”
আমার কথার ভাবার্থ বোধহয় তারা বুঝতে পারেনি। আমি কিছুটা সহজ করে বললাম,“আমি যতদূর আপনাদের চিনি হয়তো আমি চলে যাবার পর আমার বাবার সম্পত্তি কিছু টাকা পয়সা ব্যয় করে নিজেদের নামে মিথ্যা কাগজ তৈরি করে ভাগ করে নিয়েছেন। তো সেটাই। যেহেতু আমি আমার বাবার উত্তরাধিকার আছি সেহেতু এমনটা আপনারা করতে পারেন না। আমাকে ঠকানোর যে ফন্দি আপনারা আটছেন সেটা হবে না। আমি আমার অধিকার যথাযথভাবে বুঝে নিতেই এসেছি। আর সেটা আমি করবোই।”
মেঝ চাচার বড় ছেলেটা বোধহয় একটু রাগী। তাই সে রাগ নিয়েই বলে,“কী বলতে চাও তুমি?”
“এটাই আমার চাচারা আমার বাবার জমির হিসাব দিয়ে নায্য দাম আপোষে দিবে নাকি আমি কিছু অর্থ ব্যয় করে আমার জমির কাগজপত্র তুলে সেগুলো অন্যত্র বিক্রি করবো। এখন সিদ্ধান্ত আপনাদের হাতে। আপনারা সিদ্ধান্ত নেন। যা ভালো মনে করেন।”
আমার মুখ দিয়ে এই কথাগুলো বের হলো না যেন ছোটখাটো একটা বোমা হামলা হলো। সবার মুখ মলিন হয়ে গেল। তাদের মলিন, চুপসে যাওয়া মুখ দেখে আমার ভালোই লাগলো। আমি মনেমনে খুব হাসলাম।
’
’
চলবে,
(ভুলক্রটি ক্ষমা করবেন। লেখা অগোছালো হয়েছে জানি। স্যরি।)
