#অধিকার (১)
#নুসরাত_জাহান_মিষ্টি
বাবার মৃ ত্যুর পর মাকে আর আমাকে চাচারা বাড়ি ছাড়া করতে চাইছিলেন। তবে পারেননি। আমার মায়ের আত্মবিশ্বাসী কন্ঠস্বর, স্বামীর ঘরের উপর অধিকারবোধের কারণে তাকে দূর করতে পারেননি। চাচারা এবং চাচীরা মিলে যখনই মাকে তার বাবার বাড়ি যাওয়ার কথা বলতেন। তখনই মা কঠিন গলায় বলতো,“ওটা আমার বাবার বাড়ি। আমার না। বিয়ের পর স্বামীর ভিটেই আমার ভিটে। আমি এই ভিটে ছেড়ে কখনো যাবো না।”
মায়ের এমন কঠিন কন্ঠের কাছে তারা সবাই থতমত খেয়ে যায়। মায়ও তাদের নিজের ভাষা দ্বারা বুঝিয়ে দেয়, তারা যে সম্পদের জন্য তাকে বাড়ি ছাড়া করতে চাচ্ছে সেটা মা বুঝে। তবে মাকে তাড়ানো এত সহজ নয়। মা আমাকে বুকে জড়িয়ে সবার উদ্দেশ্য বলে,“আমার সুজন থাকতে তার বাবার ভিটে ছাড়া পড়বে, না এটা হতে পারে না। তিনি(স্বামী) বেঁচে থাকলে এটা শুনলে খুবই কষ্ট পেতেন।”
এসব কথা শুনে আমার দুই চাচা এবং তার বউরা যার যার ঘরে চলে যেতো। তবে তারা মায়ের এসব কথায় থেমে যান না। তারা মাকে এবং আমাকে যেকোন মূল্যে তাড়ানোর পরিকল্পনা করছিলো। একটি সুযোগের অপেক্ষায় চাতক পাখির মতো বসেছিলো।
তখন আমি খুবই ছোট ছিলাম। জীবনের এই জটিল হিসাব বুঝতাম না। কতই বা বয়স ছিলো। মাত্র সাত বছর। আমার বাবা যে মা রা গেছে সেটাই আমি বুঝতাম না। মায়ের কাছে বাবার কথা জানতে চাইলে সে বলতো,“তোমার বাবা আল্লাহর কাছে চলে গেছে।”
অবুঝ আমি ভাবতাম আমার বাবা বেড়াতে গিয়েছে। খুব শীঘ্রই চলে আসবো। এই অবুঝ আমিটা আমার চাচাদের ষড়যন্ত্র না বুঝলেও মা বুঝতো। মা সবসময় তাদের নিয়ে ভয় পেতো। তারা কখন না আমাদের ক্ষতি করে বসে। একা একটি বাড়িতে মহিলা মানুষ ছোট এক ছেলেকে নিয়ে থাকাটা সেই সময় অনুযায়ী ভয়েরই ছিলো। মাও ভীষণ ভয় পেতেন। তবে সে সেটা অন্যদের বুঝতে দিতেন না। কারণ মা বিশ্বাস করতো,“নিজের দূর্বলতা অন্যদের দেখালে অন্যরা আস্কারা পেয়ে যায়। তাই কোনভাবেই দূর্বলতা দেখানো যাবে না।”
মা এই কথাটি যেমন বিশ্বাস করতেন তেমন মানতেনও। তাই তো বাবার মৃ ত্যুর পর এক বছর আমাকে নিয়ে বেশ ভালোভাবে কাটিয়ে দিলেন। হাঁস-মুরগি পালন করা থেকে শুরু করে শাক সবজি চাষ করেই মা আমাদের দু’জনার সংসার চালাতে শুরু করেন। শুধু এটা দিয়ে যে আমাদের সংসার চলতো তেমন নয়। বাবার কিছু জমানো টাকাও ছিলো। তবে মা সেটা অতি প্রয়োজন নাহলে খরচ করতেন না। তো এই এক বছর ভালোই কাটে। চাচারাও এতদিন শান্ত মাথায় মাকে বুঝিয়ে শুনিয়ে বের করতে চাচ্ছিলো। কিন্তু পারেনি। তাই তো এবার ষড়যন্ত্রের বীজ রোপন করা শুরু করে। অবশেষে তারা সফলও হয়।
সেদিন রাত দশটার সময় কেউ একজন আমাদের ঘরের দরজায় কড়া নাড়লো। মা শব্দ পেয়ে ভীষণ ভয় পেয়ে যায়। গ্রামে শীতের দিনে রাত দশটা মানে মধ্যরাত। অন্তত আমাদের এখানে তাই। সবাই ইতিমধ্যে খেয়েধেয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে। আমরাও ঘুমিয়ে ছিলাম। দরজার কড়া নাড়ার শব্দ পেয়ে মা জেগে উঠে। এতরাতে দরজার বাহিরে কে থাকতে পারে সেটা ভেবে কিছুটা ভয় নিয়েই বলে,“কে?”
“কে বাহিরে?”
মা পরপর কয়েকবার বললে বাহির থেকে আমার ছোট চাচী জবাব দেয়,“আমি ভাবী। একটা প্রয়োজন ছিলো, দরজাটা একটু খুলেন।”
চাচীর কন্ঠ শুনে মায়ের ভয়টা কেটে যায়। সরল মনেই মা ভেবে নিয়েছে তার বিশেষ কোন প্রয়োজনে সে এসেছে। আর এটাই তার কাল হলো। মা দরজা খুলতে মেঝ চাচা ঘরের মধ্যে প্রবেশ করে। মা কিছু বুঝে ওঠার আগেই সে মাকে মৃদু ধাক্কা দিয়ে ঘরে ঢুকে যায়। মা হতভম্ব হয়ে গিয়ে বলে,“ভাইজান আপনি? আপনি এতরাতে? বাহিরে তো ছোট ভাবী ছিলো? সে কোথায়?”
মা কিছু বুঝে ওঠার আগেই মেঝ চাচা তার নোংরা চাল দিয়ে ফেলে। সে মাকে জড়িয়ে ধরে বলে,“ভাবী ছাড়ুন। ভাবী আপনি এমন আমি কল্পনা করিনি। আপনি আমাকে এজন্য ডেকেছেন?”
চাচার এই কথার মাঝে মেঝ চাচী, ছোট চাচা এবং ছোট চাচী অন্ধকারে আড়াল থেকে বেরিয়ে আসে। তারা এসেই চিৎকার চেঁচামেচি শুরু করে দেয়। মেঝ চাচী রাগী ভাব নিয়ে মাকে একটা থাপ্পড় বসিয়ে দিয়ে বলে,“ছি। তোর এতবড় সাহস তুই আমার স্বামীকে খারাপ বানানোর চেষ্টা করছিস? আমার থেকে কেড়ে নেওয়ার ধান্দা করেছিস?”
তারা মাকে গালি দেওয়া শুরু করে। তাদের চিৎকার চেঁচামেচিতে আমারও ঘুম ভেঙে যায়। সেই সঙ্গে পাশের ঘরে ঘুমিয়ে থাকা আমাদের চাচাতো চাচারাও উঠে যায়। মেঝ চাচা তো মায়ের দিকে লজ্জায় তাকাতে না পারার ভান ধরে বলে,“ভাবী আপনি এমনটা করবেন আমি স্বপ্নেও ভাবিনি।”
তাদের কথার মাঝে মা কিছু বলার সুযোগই পাচ্ছে না। তবে ইতিমধ্যে ঘটনা সে বুঝে ফেলেছে। সে বারবার বলার চেষ্টা করছে তারা ভুল করছে। কিন্তু কেউ শোনার নামই নেয় না। তাকে বকাবকি করে তারা সবাই ঘর থেকে বের হয়। মা হতভম্ব হয়ে আমাকে জড়িয়ে ধরে বসে রইলেন। বাহিরে মেঝ চাচী সবাইকে খুব খারাপভাবে মায়ের চরিত্র বর্ননা করছে। মেঝ চাচা বলে,“ভাবী আমাকে বললো সে আমাকে সুজনকে নিয়ে কিছু কথা বলতে চায়। কথাটা বলা জরুরি। এটা বলে যখন সে আমাকে রাতে আসতে বলে আমি তখনও কল্পনা করিনি তার পেটে পেটে এত। আমি সরল মনেই জানতে চাই রাতে কেন? সে জানায় দরকার আছে? সেই দরকারটা নিয়ে আমার বউ একটু সন্দেহ করে। তাই আমি তাকে নিয়েই যাই। তাকে বলেছি তুমি নাহয় বাহিরে থাকবা। ভাগ্যিস বউ নিয়ে গেছিলাম নয়তো যে কি হতো আজ আমার।”
মেঝ চাচীও তার কথায় তাল মিলিয়ে খুব সুন্দরভাবে মায়ের চরিত্র, খারাপ চরিত্র বর্ননা করছে। মেঝ চাচা ঘরে আসার পর মা তাকে বাজে ইঙ্গিত ইশারা দেয়। মেঝ চাচা বারণ করা সত্ত্বেও।মা তাকে তার জীবনে বাবার শূন্যতার কথা বলে তার কাছে নোংরা আবদার করে। এটা শুনে মেঝ চাচী সহ্য করতে না পেরে ছোট চাচা এবং চাচীকে ডেকে নিয়ে আসে। তারাও একই কথা বলে। মা এসব শুনে পুরো ভেঙে যায়। সকাল হতেই বাড়িতে আশেপাশের অনেক মানুষ এসে উপস্থিত হয়। ঘটনা জানার জন্য। এত সুন্দর একটা ঘটনা, তার বর্ননা না জানলে হয়। তার উপর চাচারা মেম্বার চেয়ারম্যান ডেকে নিয়ে এসেছে। তাদের কথা,“এরকম এক মহিলা এলাকায় থাকলে এলাকার পুরুষদের নষ্ট হওয়া কেউ আটকাতে পারবে না।”
চাচীদের কথা একই বাড়িতে তারা এমন মহিলার সঙ্গে থাকতে পারবে না। তাদের স্বামীরা এখন নাহয় ভালো, কিন্তু কোন এক মহিলা যদি বারবার তাদের স্বামীদের কাছে টানার চেষ্টা করে তখন তারা খারাপ হতে কতক্ষণ। এসবের মাঝে মাকে মেম্বার চেয়ারম্যান ডাকলে মা প্রথমে ভেঙে গিয়ে বারবার তাদের সত্যিটা বোঝানোর চেষ্টা করলেও, একটা সময় পর যখন সবাই মিলে তাকে তাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেয়। সবাই যখন একই কথা বলে তখন মা কঠিন গলায় আমাকে বুকে আকড়ে বলে,“বাজে কথা বলবেন না। আমি কোন অন্যায় করিনি। আর না করবো। বিনা অপরাধে আমি আমার স্বামীর ভিটে ছেড়ে কোথাও যাবো না। এটা আমার স্বামীর ঘর। আমার এবং আমার সন্তানের অধিকার। আমরা এখানেই থাকবো। দেখি কে সরাতে পারে আমাদের?”
মা এসব বলে আমাকে নিয়ে ঘরে এসে ঘরের দরজা বন্ধ করে দেয়।মাকে শত ডেকেও সে বাহিরে বের করতে না পারায় একটা সময় সবাই চলে যায়। চাচা এবং চাচীরাও হতাশ হয়। তারা ভেবেছিলো এতবড় অসম্মানজনক ঘটনা ঘটার পর মা মুখ দেখানোর সাহস পাবে না। তাই নিজ ইচ্ছায় চলে যায়। সেখানে মেম্বার চেয়ারম্যান ডেকেও তাকে তাড়ানো গেল না। অতঃপর সবার মাধ্যমে মানসিক কষ্ট দেওয়া শুরু হয়। সেদিনের পর আমি বা মা কেউ বাহিরে বের হতে পারি না। লোকের মুখোমুখি হলেই বাজে কথা শুনতে হয়।
সেদিন ছিলো শনিবার। আমি বাড়িতেই ছিলাম। মা বাড়ি থেকে কিছুটা দূরে এক বাগানে যায়। যেটা আমাদেরই। সেখানে মা কিছু শাক সবজি লাগিয়েছে, সেখান থেকেই শাক সবজি নিয়ে আসতে যায়। রান্নার জন্য শাক পাতা নিয়ে আসতে গিয়ে আমার মা আর ফেরে না। বেলা গড়িয়ে যায়। তাও আসে না। মায়ের অপেক্ষায় কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছি জানি না। যখন চোখ মেলে তখন দেখলাম বাড়ির সামনে মানুষের ভিড়। আর সেই ভিড়ের মাঝে আমার মায়ের নিথর দেহটা পড়ে রয়েছে। চারদিকে মানুষের নানা গুঞ্জন।সেসব আমার কানে যায় না। আমার চোখ শুধু আমার মাকে দেখছিলো। তার ঘুমন্ত মুখটা দেখে আমার বুকের ভেতর কেমন ব্যথা অনুভব হয়। তখনই পাশ থেকে কেউ একজন বলে,“লোকের কথা না নিতে পেরে জীবনটাই দিয়ে দিলো।”
’
’
চলবে,
