Friday, June 5, 2026







বাড়ি"ধারাবাহিক গল্প"মেমসাহেবমেমসাহেব পর্ব-১৪+১৫+১৬

মেমসাহেব পর্ব-১৪+১৫+১৬

🔴মেমসাহেব (পর্ব :১৪, ১৫, ১৬)🔴
– নিমাই ভট্টাচার্য

মেমসাহেবের দিল্লীবাসের প্রতিটি মুহুর্তের কাহিনী জানিবার জন্য তুমি নিশ্চয়ই পাগল হয়ে উঠেছ। মেমসাহেব কি বলল, কি করল, কেমন করে আদর করল, কোথায় কোথায় ঘুরল ইত্যাদি ইত্যাদি হাজার রকমের প্রশ্ন তোমার মনে উদয় হচ্ছে। তাই না? হবেই তো। শুধু তুমি নও, সবারই হবে।

আমি সবকিছুই তোমাকে জানাব। তবে প্রতিটি মুহুর্তের কাহিনী লেখা নিশ্চয়ই সম্ভব নয়। তাছাড়া আমাদের সম্পর্ক এমন একটা স্তরে পৌঁছেছিল যে, ইচ্ছা থাকলেও সবকিছু লেখা যায় না। তোমাকে কিছুটা অনুমান করে নিতে হবে। তাছাড়া মানুষের জীবনের ঐ বিচিত্ৰ অধ্যায়ের সবকিছু কি ভাষা দিয়ে লেখা যায়?

বেলা এগারটার সময় ব্রেকফাস্ট খেয়ে দুঘণ্টা ধরে বিছানায় গড়াগড়ি করতে করতে দুজনে কত কি করেছিলাম। কখনও ও আমাকে কাছে টেনেছে, কখনও বা আমি ওকে টেনে নিয়েছি আমার বুকের মধ্যে। কখনও আমি ওর ওষ্ঠে বিষ ঢেলেছি, কখনও বা আমার ওষ্ঠে ও ভালবাসা ঢেলেছে। কখনও আবার দু’জনে দুজনকে দেখেছি প্রাণভরে। সে-দেখা যেন শুভদৃষ্টির চাইতেও অনেক মিষ্টি, অনেক স্মরণীয় হয়েছিল।আপনার প্রিয়জনের জন্য সেরা উপহার

আমি বললাম, কতদিন বাদে তোমাকে দেখলাম। সারাজীবন ধরে দেখলেও আমার সে-লোকসান পূরণ হবে না।

আমার বুকের ’পর মাথা রেখে শুয়ে শুয়েই ও একটু হেসে শুধু বললে, তাই বুঝি?

তবে কি?

বন-হরিণীর মত মুহুর্তের মধ্যে মেমসাহেবের চোখের দৃষ্টিটা একটা ঘুরপাক দিয়ে আকাশের কোলে ভেসে বেড়াল কিছুক্ষণ। একটু পরে আমার দিকে তাকিয়ে বললো, আমি কিন্তু তোমাকে রোজ দেখতে পেতাম।

আমি চমকে উঠলাম, তার মানে? ও একটু হাসল। দু’হাত দিয়ে আমার গলাটা জড়িয়ে ধরে প্ৰায় মুখের পর মুখ দিয়ে বললো, সত্যি তোমাকে রোজ দেখেছি।

এবার আর চমকে উঠিনি। হাসলাম। বললাম, কেন আজে বাজে বকছ?

অ্যাজে-বাজে নয় গো আজে-বাজে নয়। রোজ সকালে কলেজে বেরুবার পথে রাসবিহারীর মোড়ে এলেই মনে হতো তুমি দাঁড়িয়ে আছ, ইশারায় ডাকছি। তারপর আমরা চলেছি। এসপ্ল্যানেড, ডালহৌসী, হাওড়া।

এবার মেমসাহেব উবুড় হয়ে শুয়ে হুমড়ি খেয়ে পড়ল আমার মুখের পর। বিকেলবেলায় ফেরার পথে তোমাকে যেন আরো বেশী স্পষ্ট করে দেখতে পেতাম। মনে হতো তুমি রাইটার্স বিল্ডিংএর ডিউটি শেষ করে কোনদিন ডালহৌসী স্কোয়ারের ঐ কোণায়, কোনদিন লাটসাহেবের বাড়ির ওপাশে দাঁড়িয়ে আর।

এবার যেন হঠাৎ মেমসাহেব কেঁদে ফেলল। ওগো, বিশ্বাস কর, কলেজ থেকে ফেরবার পর বিকেল-সন্ধ্যা যেন আর কাটতে চাইত না?–

আমি চট করে মন্তব্য করলাম, রাত্রিটা বুঝি মহাশান্তিতে কাটাতে?

হঠাৎ যেন লজ্জায় ওকে ভাসিয়ে নিয়ে গেল। আমার মুখের পাশে মুখটা লুকাল। আমি জানতে চাইলাম, কি হলো?

মুখ তুলল না। মুখ গুঁজে রেখেই ফিসফিস করে বললো, কিছু বলব না।

কেন।

তোমার ডাঁট বেড়ে যাবে।

ঠিক আছে। আমার কাছ থেকেও তুমি কিছু জানতে পারে না। তাছাড়া তোমার প্রাণের বন্ধু জয়া কি করেছিল, কি বলেছিল, সেসব কিছু তোমাকে বলব না।

মেমসাহেব। আর স্থির থাকতে পারে না। উঠে বসল। আমার হাতদু’টো ধরে বললো, ওগো, বল না, কি হয়েছিল।

আমি মাথা নেড়ে গাইলাম, কিছু বলব বলে এসেছিলেম, রইনু চেয়ে না বলে।

প্ৰথমে খুব বীরত্ব দেখিয়ে মেমসাহেব গাইল, আমি তোমার সঙ্গে বেঁধেছি আমার প্রাণ সুরের বাঁধনে—তুমি জান না, আমি তোমারে পেয়েছি অজানা সাধনে।

আমি হাসতে হাসতে বললাম, খুব ভাল কথা। অত যখন বীরত্ব, তখন জয়ার কথা শুনে কি হবে?

আমার সোল প্রোপাইটার-কাম-ম্যানেজিং ডাইরেকটির ঘাবড়ে গেল। বোধহয় ভাবল, জয়া এই উঠতি বাজারে শেয়ার কিনে ভবিষ্যতে বেশ কিছু মুনাফা লুঠতে চায়। হয়ত আরো শেয়ার কিনে শেষপর্যন্ত অংশীদার থেকে–

ও প্ৰায় আমার বুকের পর লুটিয়ে পড়ল। বল না গো, জয়া কি করেছে? এক সেকেণ্ড চুপ করে থেকে আবার বললো, জয়া আমার বন্ধু হলে কি হয়! আমি জানি ও সুবিধের মেয়ে নয়, ও সবকিছু করতে পারে।

জান দোলাবৌদি, জয়া আমাকে কিছুই করে নি। তবে ও একটু বেশী স্মার্ট, বেশী মডার্ন। তাছাড়া বড়লোকের আদুরে মেয়ে বলে বেশ ঢলঢল ভাব আছে। আমার মত ছোকরাদের সঙ্গে আড্ডা দিতে বসলে জয়ার কোন কাণ্ডজ্ঞান থাকে না। হাসতে হাসতে হয়ত দু’হাত দিয়ে জড়িয়ে ধরল, হয়ত কাঁধে মাথা রেখেই হিঃ হিঃ করতে লাগল। মেমসাহেব এসব জানে।

একবার আমি, মেমসাহেব। আর জয়া ব্যারাকপুর গান্ধীঘাট বেড়াতে গিয়ে কি কাণ্ডটাই না হলো! হি-হি হা-হা করে হাসতে হাসতে জয়ার বুকের কাপড়টা পাশে পড়ে গিয়েছিল। মেমসাহেব হু একবার ওকে ইশারা করলেও ও কিছু গ্ৰাহ্য করল না। রাগে গজগজ করছিল মেমসাহেব কিন্তু কিছু বলতে পারল না। আমি অবস্থা বুঝে চট করে উঠে একটু পায়চারি করতে করতে জয়ার পিছন দিকে চলে গেলাম। তারপর দেখি মেমসাহেব জয়ার আঁচল ঠিক করে দিল।

কলকাতা ফিরে মেমসাহেব আমাকে বলেছিল, এমন অসভ্য মেয়ে আর দেখিনি।

দিল্লীতে জয়ার ছোটকাকা হোম মিনিস্ট্রিতে ডেপুটি সেক্রেটারী ছিলেন। তাইতো মাঝে মাঝেই দিল্লী বেড়াতে আসত। মেমসাহেব হয়ত ভাবল না জানি ওর অনুপস্থিতিতে জয়া আরো কি করছে।

জয়ারা এর মধ্যে দুবার দিল্লী এলেও আমার সঙ্গে একবারই দেখা হয়েছিল। তাও বেশীক্ষণের জন্য নয়। আর সেই স্বল্প সময়ের মধ্যে জয়া আমার পবিত্ৰতা নষ্ট করবার কোন চেষ্টাও করে নি।

শুধু শুধু মেমসাহেবকে ঘাবড়ে দেবার জন্য জয়ার কথা বললাম। রিপোর্টার হলেও হঠাৎ পলিটিসিয়ান হয়ে মেমসাহেবের সঙ্গে একটু পলিটিকস করলাম। কাজ হলো।

শর্ত হলো মেমসাহেব আগে সবকিছু বলবে, পরে আমি জয়ার কথা বলব।

বেল বাজিয়ে গজাননকে তলব করে হুকুম দিলাম, হাফ-সেট চায় লেআও।

গজানন মেমসাহেবের কাছে আৰ্জি জানাল, বিবিজি, ছোটসাবক চায় পিনা থোড়ি কমতি হোন চাইয়ে।

মেমসাহেব একবার আমাকে দেখে নিয়ে গজাননকে বললে, তোমার ছোটসাব আমার কিছু কথা শোনে না।

ওর কথা শুনে স্নেহাতুর বৃদ্ধ গজাননও হেসে ফেলল। এ-কথা ঠিক না বিবিজি ছোটসাব চব্বিশ ঘণ্টা শুধু তোমার কথাই বলে।

গজানন, তুমিও তোমার ছোটোসাব-এর পাল্লায় পড়ে মিথ্যা कथां दळ।

গজানন জিভ কেটে বললো, ভগবান কা কসম বিবিজি, বুট আমি কক্ষনো বলব না।

মেমসাহেব হাসল, আমি হাসলাম। গজানন বললো, যদি তোমার গুসসা না হয়, তাহলে তোমাকে একটা কথা বলতাম।

মেমসাহেব বললো, তোমার কথায় আমি কেন রাগ করব? ছোটোসাব তোমাকে ভীষণ প্যার করে। কি করে বুঝলে? মেমসাহেব জেরা করে। গজানন হাসল। বললো, বিবিজি, আমি তোমাদের আংরেজি পড়িনি। তোমাদের মত আমার দিমাগি নেই। এই দিল্লীতে প্ৰায় পয়ত্ৰিশ বছর হয়ে গেল। অনেক বড় বড় লোক দেখলাম কিন্তু হামারা ছোটাসাব-এর মত লোক খুব বেশী হয় না।

আমি গজাননকে একটা দাবিড় দিয়ে বলি, যা, ভাগ। চা নিয়ে আয়।

গজানন চা আনল। চলে যাবার সময় আমি বললাম, গজানন, কিছু টাকা রেখে যেও।

গজানন চোখ দিয়ে মেমসাহেবকে ইশারা করে বললো, হাগো বিবিজি, টাকা দেব নাকি?

আমি উঠে গজাননকে একটা থাপ্পড় মারতে গেলেই ও দৌড় দিল।

চা খেতে খেতে মেমসাহেব কি বলল জান? বলল অনেক কিছু।

একদিন সকালে উঠে মেজদি ওকে বলল, আমি আর পারছি না।

মেমসাহেব জানতে চাইল, কি পারছিস না রে? প্রকসি দিতে। কিসের প্রকসি? কার প্রকৃসি? কার আবার? রিপোর্টারের। মেমসাহেব বলল, অসভ্যতা করবি না মেজদি। মনে মনে কিন্তু সত্যি একটু চিন্তিত হলো।

একটু পরে একটু ফাঁকা পেয়ে মেমসাহেব মেজদিকে ধরল। হ্যারে কি হয়েছে রে?

মেজদি দর কষাকষি করে, যা চাইব তাই দিবি বল।

জিভ দিয়ে ঠোঁটটা একটু ভিজিয়ে নিল মেমসাহেব। দাঁত দিয়ে ঠোঁটটা একটু কামড়ে ভ্রূ কুঁচকে এক মুহুর্তের জন্য ভেবে নিল। ঠিক আছে যা চাইবি তাই দেবে।

মেজদি ওস্তাদ মেয়ে। কাঁচা কাজ করবার পাত্রী সে নয়। তাই গ্যারান্টি চাইল। মা কালীর ফটো ছুঁয়ে প্ৰতিজ্ঞা কর, আমি যা চাইব তাই দিবি।

ও ঘাবড়ে যায়। একবার ভাবে মেজদি ঠকিয়ে কিছু আদায় করবে। আবার ভাবে, না, না, কিছু দিয়েও খবরটা জানা দরকার। মেমসাহেবের দোটানা মন শেষপৰ্যন্ত মেজদির ফাঁদে আটকে যায়। মা কালীর ফটো ছুয়েই প্ৰতিজ্ঞা করল, আমাকে সবকিছু খুলে বললে তুই যা চাইবি, তাই দেব।

মেজদি ওকে টানতে টানতে ঐ কোণার ছোট্ট বসবার ঘরে নিয়ে দরজা আটকে দেয়। মেমসাহেবের বুকটা চিপটিপ করে। গোল টেবিলের পাশ থেকে দু’টো চেয়ার টেনে দুজনে পাশাপাশি বসল।

মেজদি শুরু করল, রাত্তিরে তুই কি করিস, কি বকবক কারিস, তা জানিস?

কি করি রে মেজদি?

কি আর করবি? আমাকে রিপোর্টার ভেবে কত আদর করিস, তা জানিস?

লজ্জায় আমার কালে মেমসাহেবের মুখও লাল হয়েছিল। বলেছিল, যা যা, বাজে বকিস না।

মেজদি সঙ্গে সঙ্গে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে বলে, ঠিক আছে। না শুনতে চাস, ভাল কথা।

ও তাড়াতাড়ি মেজদির হাত ধরে বসিয়ে দেয়, আচ্ছ যা বলবি বল।

তোর আদরের চোটে তো আমার প্রাণ বেরুবার দায় হয়।…

কেন মিথ্যে কথা বলছিস?

মেজদি মুচকি হাসতে হাসতে বললো, মা কালীর ফটো ছুঁয়ে বলব?

না, না, আর মা কালীর ফটো ছুঁয়ে বলতে হবে না।

শুধু কি আদর? কত কথা বলিস!

ঘুমিয়ে? ঘুমিয়ে?

মেজদি মুচকি হেসে বলল, আজ্ঞে হ্যাঁ। বিশ্বাস না হয় মাকে জিজ্ঞাসা কর।

মা শুনেছে? মেমসাহেব চমকে ওঠে।

একদিন তো ডেফিনিট শুনেছে, হয়ত রোজই শোনে।

ও তাড়াতাড়ি মেজদির হাতটা চেপে ধরে জিজ্ঞাসা করল, কি কথা বলেছি রে?

নির্লিপ্তভাবে মেজদি উত্তর দিল তুই ওকে যা যা বলে আদর করিস, তাই বলেছিস। আবার কি বলবি?

সোফায় বসে সেন্টার টেবিলের ওপর পা তুলে দিয়ে আমরা গল্প করছিলাম। মেমসাহেব ডান হাত দিয়ে আমার মাথাটা কাছে টেনে নিয়ে কানে কানে বলল, দেখেছ, ঘুমিয়েও তোমাকে ভুলতে পারি না।

একটু চুপ করে এবার ফিসফিস করে বলল, দেখেছ, তোমাকে কত ভালবাসি।

আমি একটা সিগারেট ধরিয়ে এক গাল ধুয়া ছেড়ে বললাম, ঘোড়ার ডিম তালবাস। যদি সত্যি সত্যিই ভালবাসতে, তাহলে আজও মেজদি তোমার পাশে শোবার সাহস পায়?

মেমসাহেব আমাকে ভেংচি কেটে বলল, শুতে দিচ্ছি। আর कि!

এবার আমি ওর কানে কানে বললাম, আজ তো আমার হাতে লাটাই। আজ কোথায় উড়ে যাবে? তাছাড়া আজ তো তুমি আমাকে পুরস্কার দেবে।

পুরস্কার?

সেই যে-যা চাইবে, তাই পাবে-পুরস্কার।

মেমসাহেব আমার পাশ থেকে প্ৰায় দৌড়ে পালিয়ে যেতে যেতে বলল, আমি আজই কলকাতা পালাচ্ছি।

নাটকের এই এক চরম গুরুত্বপূর্ণ মুহুর্তে আবার গজাননের আবির্ভাব হলো। বেশ মেজাজের সঙ্গে বলল, দু’টো বেজে গেছে। তোমরা কি সারাদিনই গল্প-গুজব করবে? খাওয়া-দাওয়া করবে না?

দু’টো বেজে গেছে? দুজনেই এক সঙ্গে ঘড়ি দেখে ভীষণ লজ্জিত বোধ করলাম। গজাননকে বললাম, লাঞ্চ নিয়ে এস। দশ মিনিটে আমরা স্নান করে নিচ্ছি।

দিল্লীতে আমাদের দ্বৈত জীবনের উদ্বোধন সঙ্গীত কেমন লাগল? মনে হয় খারাপ লাগে নি। আমারও বেশ লেগেছিল। অনেক দুঃখ কষ্ট, সংগ্রামের পর এই আনন্দের অধিকার অর্জন করেছিলাম। তাইতো বড় মিষ্টি লেগেছিল। এই আনন্দের আত্মতৃপ্তির আস্বাদন।

মেজদিকে ম্যানেজ করে কলেজ থেকে সাতদিনের ছুটি নিয়ে ও আমার কাছে এসেছিল। এসেছিল অনেক কারণে, অনেক প্ৰয়োজনে। সমাজ-সংস্কারের অকটোপাশ থেকে মুক্ত করে একটু মিশতে চেয়েছিলাম। আমরা দুজনেই। মেমসাহেবের দিল্লী আসার কারণ ছিল সেই মুক্তির স্বাদ, আনন্দ উপভোগ করা।

আরো অনেক কারণ ছিল। শূন্যতার মধ্যে দুজনেই অনেক দিন ভেসে বেড়িয়েছিলাম। দুজনেরই মন চাইছিল একটু নিরাপদ আশ্রয়। সেই আশ্রয়, সেই সংসার বাঁধার জন্য অনেক কথা বলবার ছিল। দুজনেরই মনে মনে অনেক কল্পনা আর পরিকল্পনা ছিল। সেসব সম্পর্কেও কথাবার্তা বলে একটা পাকা সিদ্ধান্ত নেবার সময় হয়েছিল।

যাই হোক এক সপ্তাহ কোন কাজকর্ম করব না বলে আমিও ছুটি নিয়েছিলাম। প্ৰতিজ্ঞা করেছিলাম মেমসাহেবকে ট্রেনে চড়িয়ে না দেওয়া পৰ্যন্ত টাইপরাইটার আর পার্লামেণ্ট হাউস স্পৰ্শ করব না। চেয়েছিলাম প্রতিটি মুহুর্ত মেমসাহেবের সান্নিধ্য উপভোগ করব।

সত্যি বলছি দোলাবৌদি, একটি মুহুৰ্তও নষ্ট করিনি। ভগবান আমাদের বিধি-নির্দিষ্ট ভবিষ্যৎ জানতেন বলে একটি মুহুৰ্তও অপব্যয় করতে দেননি। কথায়, গল্পে, গানে, হাসিতে ভরিয়ে তুলেছিলাম ঐ ক’টি দিন।

লাঞ্চ খেতে খেতে অনেক বেলা হয়েছিল। চব্বিশ ঘণ্টা ট্রেন জানি করে নামবার পর থেকে মেমসাহেব একটুও বিশ্রাম করতে পারে নি। আমি বললাম, মেমসাহেব, তুমি একটু বিশ্রাম কর, একটু ঘুমিয়ে নাও।

এই ক’মাসে কলকাতায় অনেক ঘুমিয়েছি, অনেক বিশ্রাম করেছি। তুমি আর আমাকে ঘুমুতে বল না।

এক মিনিট পরেই বলল, তার চাইতে তুমি বরং একটু খোও। আমি তোমার গায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছি।

আমি কেন শোব?

শোও না। আমি তোমার পাশে বসে বসে গল্প করব।

শোবার ইচ্ছা ছিল না কিন্তু লোভ সামলাতে পারলাম না। দিল্লীর কাব্যহীন জীবনে অনেকদিন এমনি একটি পরম দিনের স্বপ্ন দেখেছি।

মেমসাহেব বিশ্রাম করল না। কিন্তু আমি সত্যি সত্যিই শুয়ে পড়লাম। ও আমার পাশে বসে মাথায় মুখে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে গুনগুন করে গান গাইছিল। কখনও কখনও আবার একটু আদর করছিল। কি আশ্চৰ্য আনন্দে যে আমার সারা মন ভরে গিয়েছিল, তা তোমাকে বোঝাতে পারব না। স্বপ্ন যে এমন করে বাস্তবে দেখা দিতে পারে, তা ভেবে আমি অদ্ভুত সাফল্য, সার্থকতার স্বাদ উপভোগ করলাম।

বালিশ দু’টোকে ডিভোর্স করে মেমসাহেবের কোলে মাথা রেখে দু’হাত দিয়ে ওর কোমরটা জড়িয়ে ধরে চোখ বুজলাম।

ও জিজ্ঞাসা করল, ঘুম পাচ্ছে?

কথা বললাম না, শুধু মাথা নেড়ে জানালাম, না।

ক্লান্ত লাগছে?

তবে?

স্বপ্ন দেখছি।

স্বপ্ন?

মাথা নেড়ে বললাম, হ্যাঁ, স্বপ্ন দেখছি।

মুখটা আমার মুখের কাছে এনে ও জানতে চাইল, কি স্বপ্ন দেখছি?

তোমাকে স্বপ্ন দেখছি।

আমাকে?

হ্যাঁ, তোমাকে।

আমি তো তোমার পাশেই রয়েছি। আমাকে আবার কি স্বপ্ন দেখছি?

ওর কোলের পর মাথা রেখেই চিৎ হয়ে শুলাম। দু’হাত দিয়ে ওর গলাটা জড়িয়ে ধরে বললাম, হ্যাঁ, তোমাকেই স্বপ্ন দেখছি। স্বপ্ন দেখছি, জন্ম-জন্মান্তর ধরে আমি এমনি করে তোমার কোলে নিশ্চিন্ত আশ্রয় পাচ্ছি, ভালবাসা পাচ্ছি, ভরসা পাচ্ছি।আপনার প্রিয়জনের জন্য সেরা উপহার

মুহুর্তের জন্য গর্বের বিদ্যুৎ চমকে উঠে মেমসাহেবের সারা মুখটা উজ্জল করে তুললে। পরের মুহুর্তেই ওর ঘন কালো গভীর উজ্জল দু’টো চোখ কোথায় যেন তলিয়ে গেল। আমাকে বলল, ওগো, তুমি আমাকে অমন করে চাইবে না, তুমি আমাকে এত ভালবাসবে না।

কোন বল তো?

যদি কোনদিন কোন কিছু দুর্ঘটনা ঘটে, যদি কোনদিন আমি তোমার আশা-আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে ছন্দ মিলিয়ে চলতে না পারি, সেদিন তুমি সে দুঃখ, সে আঘাত সহ্য করতে পারবে না।

আমি মাথা নাড়তে নাড়তে বললাম, তা হতে পারে না মেমসাহেব। আমার স্বপ্ন ভেঙে দেবার সাহস তোমারও নেই, ভগবানেরও নেই।

আমার কথা শুনে বোধহয় ওর একটু গৰ্ব হলো। বলল, আমি জানি তুমি আমাকে ছাড়া তোমার জীবন কল্পনা করতে পার না। কিন্তু তাই বলে অমন করে বলে না।

কেন বলব না। মেমসাহেব? তোমার মনে কি আজো কোন সন্দেহ আছে?

সন্দেহ থাকলে কেউ এমন করে ছুটে আসে!

মেমসাহেব। আবার থামে। আবার বলল, তোমার দিক থেকে যে আমি কোন আঘাত পাব না, তা আমি জানি। ভয় হয় নিজেকে নিয়েই। আমি কি পারব তোমার আশা পূর্ণ করতে? পারব কি সুখী করতে?

তুমি না পারলে আর কেউ তো পারবে না। মেমসাহেব। তুমি না পারলে স্বয়ং ভগবানও আমাকে সুখী কয়তে পারবেন না।

আরো কত কথা হলো। কথায় কথায় বেলা গড়িয়ে যায়, বিকেল ঘুরে সন্ধ্যা হলো। ঘর-বাড়ি রাস্তাঘাটে আলো জ্বলে উঠল।

মেমসাহেব বলল, ছাড়। আলোটা জেলে দিই। না, না, আলো জেলে না। এই অন্ধকারেই তোমাকে বেশ স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি। আলো জ্বালালেই আরো অনেক কিছু দেখতে হবে।

পাগল কোথাকার।

এমন পাগল আর পাবে না।

ও আমাকে চেপে জড়িয়ে ধরে বলল, এমন পাগলীও আর পাবে না।

ভগবান অনেক হিসাব করেই পাগলার কপালে পাগলী জুটিয়েছেন। তা না হলে, কি এত মিল, এত ভালবাসা হয়? ঐ অন্ধকারের মধ্যেই আরো কিছু সময় কেটে গেল। মেমসাহেব বলল, চলো, একটু ঘুরে আসি। তোমার কি বেড়াতে ইচ্ছা করছে? কলকাতায় তো কোনদিন শান্তিতে বেড়াতে পারিনি। এখানে অন্ততঃ কোন দুশ্চিন্তা নিয়ে ঘুরতে হবে না।আপনার প্রিয়জনের জন্য সেরা উপহার

মেমসাহেব আলো জ্বালল। বেল টিপে বেয়ারা ডাকল। চা আনাল। চা তৈরী করল। আমি শুয়ে শুয়েই এক কাপ চা খেলাম।

এবার মেমসাহেব তাড়া দেয়, নাও, চটপট তৈরী হয়ে নাও। আমি শুয়ে শুয়েই বললাম, ওয়াড্রবটা খোল। আমাকে একটা প্যাণ্ট আর বুশশার্ট দাও।

মেমসাহেব লম্বা বেণী দুলিয়ে বেশ হেলেন্দুলে এগিয়ে গিয়ে ওয়াড়ব খুলেই প্ৰায় চীৎকার করে উঠল, একি তোমার ওয়াড্রবে শাড়ি।

একবার শাড়িগুলো নেড়ে বলল, এ যে অনেক রকমের শাড়ি। ঘুরে ঘুরে কালেকশন করেছ বুঝি?

ও আমার প্যাণ্ট-বুশ-শার্ট না দিয়ে হাঙ্গার থেকে একটা কটুকি শাড়ি এনে আমার কাছে আব্দার করল, আমি এই শাড়িটা পরব?

তবে কি আমি পরব?

শাড়িটার দু-একটা ভাজ খুলে একটু জড়িয়ে নিয়ে ড্রেসিং টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে বলল, লাভলি!

কি লাভলি? শাড়ি না আমি?

শাড়িটা গায়ে জড়িয়েই আয়নার সামনে একটু ঘুরে গোল মেমসাহেব। বলল, ইউ আর নটেরিয়াস বাট শাড়ি ইজ লাভলি। আমি বিছানা ছেড়ে উঠে গিয়ে মেমসাহেবকে জড়িয়ে ধরতেই ও বকে উঠল, সব সময় জড়াবে না। শাড়িটার ভাঁজ নষ্ট করো না।

চট করে ও এবার আমার দিকে ঘুরে আমার মুখের দিকে ব্যাকুল হয়ে চেয়ে বলল, ওগো ব্লাউজের কি হবে? তুমি নিশ্চয়ই ব্লাউজ পিস কেননি?

আমি ওর কানটা ধরে হিড়হিড় করে টানতে টানতে ঘরের কোণায় নিয়ে গিয়ে একটা ছোট সুটকেস খুলে দিলাম। নটি গার্ল! হ্যাভ এ লুক।

হাসতে হাসতে বলল, ব্লাউজ তৈরী করিয়েছ?

আজ্ঞে হ্যাঁ।

মাপ পেলে কোথায়?

তোমার ব্লাউজের মাপ আমি জানি না?

আমার মাথায় দুষ্টুমি বুদ্ধি আসে। কানে কানে বলি, সুড আই টল ইউ ইউর ভাইট্যাল স্ট্যাটিকটিস?

মেমসাহেব আমার পাশ থেকে পালিয়ে যেতে যেতে বলল, কেবল অসত্যতা। জার্নালিস্টগুলো বড় অসভ্য হয়, তাই না?

তোমাদের মত ইয়ং আনম্যারেড প্রফেসারগুলো বড় ধার্মিক হয়, তাই না?

কি করব? তোমাদের মত এক-একটা দস্যু-ডাকাতের হাতে পড়লে আমাদের কি নিস্তার আছে?

আমি যেন আরো কি বলতে গিয়েছিলাম, ও বাধা দিয়ে বলল, এবার তর্ক বন্ধ করে বেরুবে কি?

মেমসাহেব শাড়িটা সোফার পর রেখে নিজের সুটকেস থেকে ধুতি-পাঞ্জাবি বের করে বলল, এই নাও পর।

এবারও জড়িপাড় ধুতি দিলে না? জড়িপাড় ধুতি না পাবার জন্য তোমার কি কিছু অসুবিধা বা ক্ষতি হচ্ছে?

দোলাবৌদি, আমার জীবনের সেসব স্মরণীয় দিনের কথা স্মৃতিতে অমর অক্ষয় হয়ে আছে। আজ আমি রিক্ত, নিঃস্ব। ভিখারী। আজ আমার বুকের ভিতরটা জ্বলে-পুড়ে ছারখার হয়ে যাচ্ছে। মনের মধ্যে অহরহ রাবণের চিতা জ্বলিছে। গঙ্গা-যমুনা নর্মদা-গোদাবরীর সমস্ত জল দিয়েও এ আগুন নিভবে না, নেভাতে পারে না।

বাইরে থেকে আমার চাকচিক্য দেখে, আমার পার্থিব সাফল্য দেখে, আমার মুখের হাসি দেখে সবাই আমাকে কত সুখী ভাবে। কত মানুষ আরো কত কি ভাবে। আমার ব্যক্তিগত জীবন সম্পর্কে কতজনের কত বিচিত্র ধারণা! মনে মনে আমার হাসি পায়। একবার যদি চিৎকার করে কাঁদতে পারতাম, যদি তারস্বরে চিৎকার করে সব কিছু বলতে পারতাম, যদি হনুমানের মত বুক চিরে আমার অন্তরটা সবাইকে দেখাতে পারতাম। তবে হয়ত–

দেখেছ, আবার কি আজে-বাজে বকতে শুরু করেছি? তোমাকে তো আগেই লিখেছি ঐ পোড়া কপালীর কথা লিখতে গেলে, ভাবতে গেলে, মাঝে মাঝেই আমার মাথাটা কেমন করে। উঠে। আরো একটু ধৈৰ্য ধরা। তুমি হয়ত বুঝবে আমার মনের অবস্থা।

দোলাবৌদি আমাদের দুজনের কাহিনী নিয়ে ভলিউম ভলিউম বই লেখা যায়। সেই সাত দিনের দিল্লী বাসের কাহিনী নিয়েই হয়ত একটা চমৎকার উপন্যাস লেখা হতে পারে। তাছাড়া তিন দিনের জন্য জয়পুর আর সিলিসের ঘোরা? আহাহা! সেই তিনটি দিন যদি তিনটি বছর হতো। যদি সেই তিনটি দিন কোন দিনই ফুরাত না।

দিল্লীতে সেই প্ৰথম রাত্ৰিতে আমরা এক মিনিটের জন্যও ঘুমুলাম না। সারা রাত্ৰি কথা বলেও ভোরবেলায় মনে হয়েছিল যেন কিছুই বলা হলো না? মনে হয়েছিল যেন বিধাতাপুরুষের রসিকতায় রাত্রিটা হঠাৎ ছোট হয়েছিল। সকালবেলায় সূৰ্যকে অসহ্য মনে হয়েছিল।

মোটা পর্দার ফাঁক দিয়ে সূর্যরশ্মি চুরি করে আমাদের ঘরে ঢুকে বেশ উৎপাত শুরু করেছিল। কিন্তু তবুও ও আমার গলা জড়িয়ে শুয়ে ছিল আর গুনগুন করে গাইছিল, আমার পরাণ যাহা চায় তুমি তাই, তুমি তাই গো…

আমি প্রশ্ন করলাম, সত্যি? ও বলল, তোমা ছাড়া আর এ জগতে মোর কেহ নাই, কিছু নাই গো। তুমি সুখ যদি নাহি পাও, যাও সুখের সন্ধানে যাও–

আমি আবার কোথায় যাব?

মেমসাহেব মাথা নেড়ে আমাকে ধন্যবাদ জানিয়ে আবার গাইতে থাকে, আমি তোমারে পেয়েছি হৃদয় মাঝে, আর কিছু নাহি চাই গো।

সিওর?

সিওর।

ও এবার কনুই-এর ভর দিয়ে ডান হাতে মাথাটা রেখে বাঁ হাত দিয়ে আমার মুখে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে গাইল–

আমি তোমারি বিরহে রহিব বিলীন,
তোমাতে করিব বাস–
দীর্ঘ দিসব, দীর্ঘ রজনী,
দীর্ঘ বরষ-মাস।
যদি আর-কারে ভালবাস…

আমি বললাম, তুমি পারমিশন দেবে?

মেমসাহেব হেসে ফেলল। হাসতে হাসতেই আবার গাইল–

আর যদি ফিরে নাহি আস,।
তবে তুমি যাহা চাও তাই যেন পাও,।
আমি যত দুঃখ পাই গো।

আমি বললাম, আমি আর কিছু চাইছি না, তুমিও দুঃখ পাবে না।

ও আমাকে দু হাত দিয়ে জড়িয়ে চেপে ধরে ঠোঁটে একটু ভালবাসা দিয়ে বলল, আমি তা জানি গো, জানি।

সকালবেলায় চা খেতে খেতে মেমসাহেব বলল, ওগো, চলে না। দুদিনের জন্য জয়পুর ঘুরে আসি।

আইডিয়াটা মন্দ লাগল না। ঐ চা খেতে খেতেই প্ল্যান হয়ে গেল। একদিন জয়পুর, একদিন সিলিসের ফরেস্ট বাংলোয় থাকব। তারপর দিল্লী ফিরে এসে কিছু ঘোরাঘুরি, দেখাশুনা আর সংসার পাতার বিধিব্যবস্থা করা হবে বলেও ঠিক করলাম।

পর্ব ১৪ শেষ 📌

🔴পর্ব :১৫🔴

আমাকে কিছু করতে হলো না, মেমসাহেব আমার একটা অ্যাটাচির মধ্যে দুদিনের প্রয়োজনীয় সব কিছু ভরে নিয়েছিল। আমি দু’একবার এটা ওটা নেবার কথা বলেছিলাম। ও বলেছিল, তুমি চুপ করে তো।

আমি চুপ করেছিলাম। রাত্রে আমেদাবাদ মেল ধরে পরদিন ভােরবেলায় জয়পুর পৌঁছলাম।

ট্ৰেনে?

ট্রেনের কথা কি লিখব? সেকেণ্ড ক্লাসে গিয়েছিলাম। কম্পার্টমেন্টে আরো প্যাসেঞ্জার ছিলেন। অনেক কিছুই তো ইচ্ছা করেছিল। কিন্তু…। তবে দুজনে এক কোণায় বসে অনেক রাত পৰ্যন্ত গল্প করেছিলাম। মেমসাহেবকে শুতে বলেছিলাম। কিন্তু রাজী হয় নি। ও বলেছিল, তুমি শোও। আমি তোমাকে ঘুম পাড়িয়ে দিচ্ছি।

না, না, তা হয় না।

কেন হবে না?

তুমি জেগে থাকবে। আর আমি ঘুমাব?

আগে তুমি একটু ঘুমিয়ে নাও। পরে আমি ঘুমাব।

আমার ঘুমুতে ইচ্ছা করছিল না। তাই বললাম, তাছাড়া এইটুকু জায়গায় কি ঘুমান যায়?

এইত আমি সরে বসছি। তুমি আমার কোলে মাথা দিয়ে শুয়ে পড়া।

আমার হাসি পেল।

হাসছ কেন?

হাসতে হাসতেই আমি জবাব দিলাম, রেলের এই কম্পার্টমেন্টেও কি তুমি আমাকে আদর করবে?

ও রেগে গেল। বেশ করব। একশবার করব। আমি কি পরপুরুষকে আদর করছি?

মেমসাহেব একটু সরে বসল। আমি ওর কোলে মাথা রেখে শুয়ে পড়লাম।

ও আমার মাথায় মুখে হাত দিয়ে আদর করে ঘুম পাড়াবার চেষ্টা শুরু করল। কয়েক মিনিট বাদে মুখটা আমার মুখের পর এনে জিজ্ঞাসা করল, কি ঘুমুচ্ছ?

ঘুমুবে না?

কেন?

এত সুখে, এত আনন্দে ঘুম আসে না।

এবার মেমসাহেব হাসল। জিজ্ঞাসা করল, সত্যি ভাল লাগছে?

খুব ভাল লাগছে।

ও চুপ করে যায়। কিছু পরে ও আবার হুমঢ়ি খেয়ে আমার মুখের পর পড়ল। বললে, একটা কথা বলব?

বল।

তুমি রোজ এমনি করে আমার কোলের পর মাথা রেখে শোবে, আর আমি তোমাকে ঘুম পাড়িয়ে দেব।

কেন?

কেন আবার? আমার ইচ্ছা করে, ভাল লাগে।।

আমি কোন উত্তর দিলাম না। ওর কোলের মধ্যে মুখ গুঁজে দিয়ে হাসছিলাম।

মেমসাহেব দু’হাত দিয়ে আমার মুখটা নিজের দিকে ঘুরিয়ে নিয়ে বললো, হাসছ কেন?

এমনি।

না, তুমি অমন করে হাসবে না!

বেশ।

মেমসাহেব। আবার আমার মাথায় মুখে হাত বুলিয়ে দিতে লাগল। আমার ভীষণ ভাল লাগছিল যে সত্যি সত্যিই আমি ঘুমিয়ে পড়েছিলাম।

ঘুম ভেঙেছিল একেবারে তোরবেলায়। ঘড়িতে দেখলাম সাড়ে চারটে। মেমসাহেবও ঘুমুচ্ছিল। দুহাতে আমার মুখটা জড়িয়ে ধরে মাথাটা হেলান দিয়ে বসে বসেই ঘুমুচ্ছিল। ভীষণ লজ্জা, ভীষণ কষ্ট লাগল। আমি উঠে বসতেই ওর ঘুম ভেঙে গেল। আমি কিছু বলবার আগেই ও জিজ্ঞাসা করল, উঠলে যে?

আমি ওর প্রশ্নের জবাব না দিয়ে জিজ্ঞাসা করলাম, কটা বাজে জান?

কটা?

সাড়ে চারটে।

তাই বুঝি।

তুমি সারা রাত্রি এইভাবে বসে বসেই কাটালে?

ঐ আবছা আলোতেই আমি দেখতে পেলাম একটু হাসিতে মেমসাহেবের মুখটা উজ্জল হয়েছিল। বললে, তাতে কি হলো।

আমি রেগে বললাম, তাতে কি হলো? সারা রাত্রি আমি মজা করে শুয়ে রইলাম আর তুমি বসে বসে কাটিয়ে দিলে?

শান্ত স্নিগ্ধ মেমসাহেব আমার মুখে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বললে, রাগ করছ, কেন? বিশ্বাস কর, আমার একটুও কষ্ট হয় নি।

আমি উপহাস করে বললাম, না, না, কষ্ট হবে কেন? বড্ড আরামে ঘুমিয়েছি।

আবার সেই মিষ্টি হাসি, স্নিগ্ধ শান্ত কণ্ঠ। আরাম না হলেও আনন্দ তো পেয়েছি।

জান দোলাবৌদি, পোড়াকপালী এমনি করে ভালবেসে আমার সর্বনাশ করেছে।

জয়পুরে গিয়ে কি করেছিল জান? হোটেলে গিয়ে স্নান করে ব্রেকফাস্ট খাবার পর আমি বললাম, কাপড়-চোপড় পালটে নাও।

কেন?

কেন আবার? ঘুরতে বেরুবা।

কোথায় আবার ঘুরবে?

জয়পুর এসে সবাই যেখানে ঘুরতে যায়।

ও বললে, আমি তো অম্বর প্যালেস বা হাওয়া মহল দেখতে আসিনি।

তবে জয়পুর এলে কেন?

কেন আবার? তোমাকে নিয়ে বেড়াতে এলাম। এতদিন ধরে পরিশ্রম করছি। তাই একটু বিশ্রাম পাবে বলে জয়পুর এলাম।

আমি বললাম, দিল্লীতেই তো বিশ্রাম করতে পারতাম।

ভাবলাম আমার সঙ্গে একটু বাইরে গেলে আরো ভাল লাগবে, তাই এলাম।

লনের এক কোণায় একটা গাছের ছায়ায় বসে বসে। সারা সকাল কাটিয়ে দিলাম। আমরা।

ওগো তুমি যখন গাড়ি কিনবে তখন প্ৰত্যেক উইক-এণ্ডে আমরা বাইরে বেরুব। কেমন?

আঙুল দিয়ে নিজের দিকে দেখিয়ে বললাম, আমি গাড়ি কিনব?

তবে কি আমি কিনব?

তুমি কি পাগল হয়েছ?

কেন তুমি বুঝি গাড়ি কিনবে না?

দূর পাগল। আমি গাড়ি কেনার টাকা পাব কোথায়?

ও যেন সত্যি একটু রেগে গেল। তুমি কথায় কথায়, আমায় পাগল পাগল বলবে না তো।

পাগলের মত কথা বললেও পাগল বলব না?

ভ্রূ কুঁচকে ও প্ৰায় চীৎকার করে বললে, না।

একটু পরে আবার বললে, গাড়ি কেনবার কথা বলায় পাগলামি কি হলো?

আমি একটা সিগারেট ধরিয়ে ওর মুখে ধুঁয়া ছেড়ে বললাম, কিচ্ছু না।

আশ্চৰ্য আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে ও বললে, দেখ না এক বছরের মধ্যে তোমার গাড়ি হবে।

তুমি জান?

একশ বার জানি।

একটু পরে আবার কি বললো জান? মেমসাহেব আমার গা ঘোষে বসে আমার কাঁধের ’পর মাথা রেখে আধো-আধো স্বরে বললে, ওগো, তুমি আমাকে ড্রাইভিং শিখিয়ে দেবে?

ও তখন বোয়িং সেভেন-জিরো-সেভেনের চাইতেও অনেক বেশী গতিতে উপরে উঠছিল। সুতরাং আমি অযথা বাধা দেবার ব্যর্থ চেষ্টা না করে বললাম, নিশ্চয়ই।

মনে মনে আমার হাসি পাচ্ছিল। কিন্তু অনেক চেষ্টায় সে হাসি চেপে রেখে বেশ স্বাভাবিক হয়ে জানতে চাইলাম, কি গাড়ি কিনতে চাও?

আমার প্রশ্নে ও খুব খুশি হলো। হাসিতে মুখটা ভরে গেল। টান টানা চোখ দু’টো যেন আরো বড় হলো। বললে, তোমার কোন গাড়ি পছন্দ?

ওকে সন্তুষ্ট করবার জন্য বললাম, গাড়ি কিনলে তো তোমার পছন্দ মতই কিনব।

ও মনে মনে আগে থেকেই সিদ্ধান্ত করে রেখেছিল। তাইতো মুহুর্তের মধ্যে উত্তর দিল, স্ট্যাণ্ডার্ড হেরল্ড।

তোমার বুঝি স্ট্যাণ্ডার্ড হেরল্ড খুব পছন্দ, আমি জানতে চাইলাম।

গাড়িটা দেখতেও ভাল, তাছাড়া…

।মেমসাহেব এগুতে গিয়ে একটু থামল। তাই আমি জিজ্ঞাসা করলাম, তাছাড়া কি?

হাসি হাসি মুখে ও উত্তর দিল, ঐ গাড়িটা যে টু-ডোর। তাতে কি হলো? যেন মহা বোকামি করেই ঐ প্রশ্নটা করেছিলাম, ও বললো, বাঃ, তাতে কি হলো?

খুব সিরিয়াস হয়ে বললে, বাচ্চাদের নিয়ে ঐ গাড়িতে যাওয়ায় কত সুবিধা জান? হঠাৎ দরজা খুলে পড়ে যাবার কোন ভয় নেই, তা জান?

মেমসাহেবের কল্পনার বোয়িং সেভেন-জিরো-সেভেন তখন চল্লিশ হাজার ফুট উপরে উড়ছে। তাছাড়া প্ৰায় সাড়ে পাঁচশ-ছাঁ শো মাইল স্পীডে ছুটে চলেছিল। আমি সেই উড়ো জাহাজের কো-পাইলট হয়েও ওকে পালামের মাটিতে নামাতে পারলাম না। মনে মনে কষ্ট হলো। তাছাড়া আগামী দিনের ওর স্বপ্ন হয়ত আমারও ভাল লেগেছিল। মুখে শুধু বললাম, হ্যাঁ, হ্যাঁ, ঠিক বলেছ।

দুপুর বেলা লাঞ্চের পর দুজনে শুয়ে শুয়ে আরো কত গল্প শুনলাম।…

ওগো, খোকনের খুব ইচ্ছা একবার তোমার কাছে আসে।

আমি বললাম, পাঠিয়ে দিও না।।

না, না, এখন না। আগে আমাদের সংসার হোক, তারপর আসবে।

আমি জানতে চাইলাম, আচ্ছা মেমসাহেব, তুমি খোকনকে খুব ভালবাস, তাই না?

মেমসাহেব বললে, কি করব বল? কাকাবাবুকে তো আমরা কোনদিনই ভাড়াটে ভাবি না। কাকিমা বেঁচে থাকলে হয়ত অতি–মেলামেশা ভাব হতো না। তাছাড়া কাকাবাবু অফিস আর টিউশনি নিয়ে প্রায় সারাদিনই বাড়ির বাইরে। তাই আমরা ছাড়া খোকনকে কে দেখবে বলো?

আমি বললাম, তাতো বুঝলাম। কিন্তু তুমি খোকনকে একটু বেশী ভালবাস।

পাশ ফিরে শুয়ে আমাকে আর একটু কাছে টেনে নিয়ে ও বললে, কেন তোমার হিংসা হয়?

আমি উত্তর দিলাম, আমার হিংসা হবে কেন?

আমিও একটু পাশ ফিরে শুলাম। বললাম, গতবার খোকন যখন ম্যাট্রিক পরীক্ষা দিল, তখন তুমি কি কাণ্ডটাই না করলে?

করব না? আমরা ছাড়া ওর কে আছে বল?

আমরা, আমরা বলছি কেন? বল আমি ছাড়া কে করবে?

ও কোন উত্তর দিল না। শুধু হাসল। একটু পরে আমার মুখে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বললে, আমি বাড়ির মধ্যে সব চাইতে ছোট। কেউ আমাকে দিদি বলে ডাকে না। ছোটবেলা–থেকেই আমার একটা ভাই এর শখ।….

তাই বুঝি?

কি যেন ভেবে ও হাসল। জিজ্ঞাসা করলাম, হাসছ কেন? ছোটবেলার একটা কথা মনে হলো। কি কথা?

মেমসাহেব। আবার হাসল। বললে, ছোটবেলায় একটা ভাই দেবার জন্য আমি মাকে খুব বিরক্ত করতাম।

আমি হাসলাম।

হাসতে হাসতেই ও বললে, সত্যি বলছি, অনেকদিন পৰ্যন্ত একটা ভাই দেবার জন্য মাকে বিরক্ত করেছি। আর আমি যেই ভাই এর কথা বলতাম সঙ্গে সঙ্গে দিদিরা চলে যেত। আর মা আমাকে বকুনি দিয়ে ভাগিয়ে দিতেন।

তাই বুঝি তুমি খোকনকে এত তালবাস?

অনেকটা তাই। তাছাড়া খোকন ছেলেটাও ভাল আর আমাকেও ভীষণ ভালবাসে।

সেকথা সত্যি।

ও চট করে আমার ঠোঁটে একটু ভালবাসার স্পর্শ দিয়ে বললো, থ্যাঙ্ক ইউ।আপনার প্রিয়জনের জন্য সেরা উপহার

পরে আবার মেমসাহেব বলেছিল, সকাল বেলায় ধুতি পাঞ্জাবি পরে খোকন যখন কলেজে যায়, তখন আমার ভীষণ ভাল লাগে।

লাগবেই তো। নিজে হাতে নিজের স্নেহ দিয়ে যাকে এত বড় করেছ, সেই ছেলে বড় হলে, তাল হলে, নিশ্চয়ই ভাল লাগবে।

একটু থামি, একটু হাসি। ও জিজ্ঞাসা করল, আবার হাসছ কেন?

এমনি।

এমনি কেন?

আবার হাসলাম, আবার বললাম, এমনি।

মেমসাহেব পীড়াপীড়ি শুরু করে দিল। এমনি কেন হাসছ বল না।

হাসতে হাসতেই আমি বললাম, বলব?

বলো।

আবার হাসলাম। বললাম, সত্যি বলব?

মেমসাহেব কনুই এর ভর দিয়ে আমার মুখের ওপর হুমডি খেয়ে বললে, বলছি তো বল না।

দু’হাত দিয়ে ওর মুখটা টেনে নিয়ে কানে কানে জিজ্ঞাসা করলাম, আমাদের খোকন কবে হবে?

মেমসাহেবও আমার কানে কানে বললে, তুমি যেদিন চাইবে?

সিওর?

সিওর।

ওকে জড়িয়ে ধরে আদর করে বললাম, থ্যাঙ্ক ইউ ভেরী মাছ।

ও হাসতে হাসতে উত্তর দিল, নট অ্যাট অল! ইট ইউল বী মাই প্লেজার।

আর ইউ সিওর ম্যাডাম?

ইয়েস স্যার, আই এ্যাম সিওর।

এই কথার পর দুজনেরই যেন কি হলো। কি যেন সব দুষ্টুমি বুদ্ধির ঝড় উঠল। দুজনেরই মাথায়। সেদিন দুপুরে ঐ শান্ত স্নিগ্ধ মেমসাহেব যে কি কাণ্ডটাই করল। পরে আমি বলেছিলাম, জান মেমসাহেব, তোমাকে দেখে বুঝা যায় না তোমার মধ্যে এত দুষ্টুমি বুদ্ধি লুকিয়ে আছে।

ও পাশ ফিরে মুখ ঘুরিয়ে শুয়ে বললে, বাজে বকো না।

পরের দিন ভোরবেলায় এলাম সিলিসের। লেকের ধারে পাহাড়ের পর এককালের রাজপ্ৰাসাদ এখন সরকারী পান্থশালা। দোতলার ম্যানেজারের খাতায় নাম ধাম লিখে ঘরের চাবি নিয়ে তিন-তলার ছাদে এসে দাঁড়াতেই মেমসাহেব লেক আর পাহাড় দেখে মুগ্ধ হলো। বললো, চমৎকার।

মাথায় ঘোমটা, কপালে বিরাট সিদুরের টিপ, চোখে সানগ্লাস দিয়ে মেমসাহেবকে এই পরিবেশে আমার যেন আরো হাজার হাজার গুণ ভাল লাগল। আমি বললাম, সত্যি চমৎকার।

তা আমার দিকে তাকিয়ে বলছি কেন?

এই লেক, পাহাড় আর এই রাজপ্রাসাদের চাইতেও তোমাকে বেশী ভাল লাগছে।

আমার প্রশংসা গ্ৰাহ না করে ও ছাদের চারপাশ ঘুরে ঘুরে লোক আর পাহাড় দেখছিল। ইতিমধ্যে ছাদের ওপাশ থেকে অকস্মাৎ এক সদ্য বিবাহিতা মহিলা মেমসাহেবের কাছে এসে জিজ্ঞাসা করলেন, আপনারা বাঙালী?

ও একবার ঘাড় বেঁকিয়ে সানগ্রাসের মধ্য দিয়ে আমাকে দেখে নিয়ে বললো, হ্যাঁ। একটু থেমে জানতে চাইল, আপনি?

ভদ্রমহিলা বত্ৰিশ পাটি দাঁত বার করে বললেন, আমরাও বাঙালী।

আমি মনে মনে বললাম, এখানেও কি একটু নিশ্চিন্তে থাকতে পারব না?

ভদ্রমহিলা থামলেন না। আবার প্রশ্ন করলেন, কোথায় থাকেন আপনারা?

মেমসাহেব অস্বস্তিবোধ করলেও ভদ্রমহিলার আগ্রহের তৃষ্ণা না মিটিয়ে আসতে পারছিল না। বল্লো, দিল্লী।

দিল্লীতে? কোথায়? লোদী কলোনী?

না, ওয়েস্টার্ন কোটে।

আপনার স্বামী কি গভর্ণমেণ্টে আছেন?

না, উনি জার্নালিস্ট।

বেয়ারা ঘরের দরজা খুলে অ্যাটাচিটা রেখে দিল। আমি এবার ডাক দিলাম, শোন।

মেমসাহেব মাথার ঘোমটাটা একটু টেনে বললে, এখন আসি। পরে দেখা হবে।

আমরা আজ বিকেলেই আজমীঢ় চলে যাব।

আজই? মেমসাহেব মনে মনে দুঃখ পাবার ভান করল।

ও ঘরের দরজায় আসতেই আমি বললাম, তুমি ওকে বলো এক্ষুনি বিদায় নিতে।

সানগ্লাসটা খুলতে খুলতে ও বললে, আঃ, শুনতে পাবেন। মেমসাহেব চুল খুলতে বসল। আমি বাথরুমে ঢুকলাম। স্নান সেরে বেরিয়ে আসতেই ও আমাকে বললে, তুমি সাবান, তোয়ালে নিয়ে যাওনি?

বাথরুমেই তো ছিল। ওতো হোটেলের তাতে কি হলো? কাচান তোয়ালে নতুন সাবান ব্যবহার করলে কি হয়েছে?

কিছু হোক। আর নাই হোক, আমার তোয়ালে-সাবান থাকতে তুমি কেন হোটেলের জিনিস ব্যবহার করবে?

মেমসাহেবও স্নান সেরে নিল। বেয়ারাকে ডেকে বললাম,

নাস্তা লে অ্যাও।

ব্রেকফাস্ট খেয়ে সোফায় এসে বসলাম দুজনে। মেমসাহেবকে বললাম, একটা গান শোনাও।

চারিদিকে লোক’জন ঘোরাঘুরি করছে। এখন নয়, সন্ধ্যাবেলায় পাহাড়ের পাশ দিয়ে লেকের ধারে বেড়াতে বেড়াতে তোমাকে অনেক গান শোনাব।

সেদিন সারাদিন মেমসাহেবের গলার রবীন্দ্ৰসঙ্গীত শোনা হয় নি। সত্য। কিন্তু ভবিষ্যৎ জীবনের সঙ্গীত রচনা করেছিলাম দুজনে।… ওগো, এর পর তোমার আর কিছু আয় বাড়লেই তুমি একটা থ্রি-রুম ফ্ল্যাট নেবে।

এখনই ফ্ল্যাট নিয়ে কি হবে?

দুজনেই আস্তে আস্তে সংসারের সবকিছু সাজিয়ে গুছিয়ে নেব।

তাছাড়া থ্রি-রুম ফ্লাট নিয়ে কি হবে? একটা ঘরের একটা ছোট্ট ইউনিট হলেই তো যথেষ্ট।

‘না, না, তা হয় না। একটা ঘরের ফ্ল্যাটে আমাদের দুজনেরই তো হাত-পা ছড়িয়ে থাকা অসম্ভব।

দুজন ছাড়া তিনজন পাচ্ছি কোথায়?

এবার মেমসাহেবের সব গাম্ভীৰ্য উধাও হয়ে গেল। হাসতে হাসতে বললে, তোমার মত ডাকাতের সঙ্গে সংসার করতে শুরু করলে দুজন থেকে তিনজন, তিনজন থেকে চারজন পাঁচজন হতেও সময় লাগবে না।

ওর কথা শুনে আমি স্তম্ভিত না হয়ে পারলাম না। অবাক বিস্ময়ে আমি ওর দিকে চেয়ে রইলাম।

আমন হাঁ করে কি দেখছ?

তোমাকে।

আমাকে?

মাথা নেড়ে বললাম, হুঁ, তোমাকে।

আমাকে কোনদিন দেখনি?

ওর দিকে চেয়ে চেয়েই বললাম, দেখেছি।

এবার মেমসাহেবও একটু অবাক হয়ে আমার দিকে চাইল। তবে অমন করে আমার দিকে চেয়ে চেয়ে কি দেখছি?

আমি দু’হাত দিয়ে ওর মুখখান তুলে ধরে বললাম, জান মেমসাহেব, তুমি নিশ্চয়ই সুখী সার্থক স্ত্রী হবে। কিন্তু সন্তানের জননী হিসাবে বোধহয় তোমার তুলনা হবে না।

মেমসাহেব প্ৰথমে ধীরে ধীরে দৃষ্টিটিা নামিয়ে নিল। তারপর আলতো করে মাথাটা আমার বুকের পর রাখল। দু’টো আঙুল দিয়ে পাঞ্জাবির বোতামটা ঘুরাতে ঘুরাতে বললে, আমার যে ছেলেমেয়ের ভীষণ শখ। রাস্তা-ঘাটে ফুটফুটে সুন্দর বাচ্চা দেখলেই মনে হয়…

যদি তোমার হতো, তাই না?

মেমসাহেব আমার কথায় সম্মতি জানিয়ে মাথা নেড়ে হাসিল।

তারপর আস্তে আস্তে ওর মুখটা আমার কোলের মধ্যে লুকিয়ে ফেলল। আমার মনে হলো কি যেন লজ্জায় বলতে পারছে না। জিজ্ঞাসা করলাম, কিছু বলবো?

মুখটা লুকিয়ে রেখেই আস্তে আস্তে বললে, তোমার ইচ্ছা! করে না?

আমি হোসে ফেললাম। জান মেমসাহেব, স্বপ্ন দেখতে বড় ভয় হয়।

আমার কোলের মধ্যে লুকিয়ে রাখা মুখটা ঘুরিয়ে আমার দিকে চাইল। বললে, কোন ভয় হয়?

জীবনে চলতে গিয়ে বারবার পিছনে পড়ে গেছি। তাইতো ভবিষ্যতের কথা ভাবতে, ভবিষ্যৎ জীবনের স্বপ্ন দেখতে ভয় হয়।

ও হাত দিয়ে আমার মুখটা চেপে ধরে বললে, না, না, ভয়ের কথা বলে না। ভয় কি? একটু আতঙ্কে, একটু দ্বিধাগ্ৰস্ত হয়ে জানতে চাইল, আমি কি তোমার হবে না?

এবার আমি ওর মুখটা চেপে ধরে বললাম, ছি, ছি, ওসব আজেবাজে কথা ভাবছ কেন? তুমি তো আমারই।

ওর মুখে তখনও বেশ চিন্তার ছাপ। বললো, সে তো জানি কিন্তু তবুও তুমি ভয় পাচ্ছি কেন?

আমি দু’হাত দিয়ে ওকে বুকের মধ্যে তুলে নিলাম। সাস্তুনা জানালাম, কিছু ভয় করো না। তোমার স্বপ্ন, তোমার ভালবাসা কোনদিন ব্যর্থ হতে পারে না।আপনার প্রিয়জনের জন্য সেরা উপহার

একটু ব্যাকুলতা মেশানো স্বরে বললে, সত্যি বলছ?

একশ’বার বলছি। যদি বিধাতার ইচ্ছা না হতো তাহলে কি ঐ আশ্চৰ্য ভাবে আমাদের দেখা হতো? নাকি এমনি করে আজ আমরা সিলিসের লেকের পাড়ে মিলতে পারতাম?

আমারও তো তাই মনে হয়। যদি ভগবানের কোন নির্দেশ, কোন ইঙ্গিত না থাকত। তাহলে সত্যি আমরা কোনদিন মিলতে পারতাম।

তবে এত ঘাবড়ে যাচ্ছে কেন?

অনুযোগের সুরে মেমসাহেব বললে, তুমিই তো ঘাবড়ে দিচ্ছ।

ঘাবড়ে দিচ্ছি না, সতর্ক করে দিচ্ছি।

দু’ আঙুল দিয়ে আমার গালটা চেপে ধরে বললে, কি আমার সতর্ক করার ছিরি!

দোলাবৌদি, সেই অরণ্য আর পর্বতের কোলে যে দুটি দিন কাটিয়েছিলাম, তা আমার জীবনের মহা স্মরণীয় দিন। এত আপনার করে, এত নিবিড় করে মেমসাহেবের এত ভালবাসা আমি এর আগে কোনদিন পাইনি। ঐ দুটি দিন প্রতিটি মুহূর্ত মেমসাহেবের ভালবাসা আর উষ্ণ সান্নিধ্য উপভোগ করেছিলাম। আমি। তাইতো তৃতীয় কোন ব্যক্তির সাহচর্যে আসতে মন চায় নি।আপনার প্রিয়জনের জন্য সেরা উপহার

মেমসাহেব বলেছিল, অনেক বেলা হলো। চলো লাঞ্চ খেয়ে আসি।

আমি সোজা জানিয়ে দিয়েছিলাম, আমি ঘর ছেড়ে বেরুচ্ছি না।

তবে?

তবে আবার কি? বেয়ারাকে ডেকে বলা ঘরে খাবার দিয়ে যেতে।

আমি অতীত দিনের রাজপ্রাসাদের রাজকুমারের শয়নকক্ষে মহারাজার মত শুয়ে রইলাম। ও বেল বাজিয়ে বেয়ারাকে ডেকে বললে, সাহাবকা তবিয়ত আচ্ছা নেই হ্যায়। মেহেরবানি কারকে খানা ইধারই লে-আনা।

জো হুকুম মেমসাব।

ঘরে খাবার এসেছিল। সেন্টার টেবিলে খাবার-দাবার সাজিয়ে ও ডাক দিয়েছিল, এসে খেতে এসে।

বড় সোফায় দুজনে পাশাপাশি বসে খেয়েছিলাম। খেতে। খেতে এক টুকরো নরম মাংস আমার মুখে তুলে দিয়ে বলেছিল, এই নাও খেয়ে নাও।

তুমি খাও না।

আমি দিচ্ছি, তুমি খাও না।

মাংসের টুকরোটা খাবার সময় ওরা দু’টো আঙুলে কামড় দিয়ে বললাম, তোমাকেও খেয়ে ফেলি।

হাসতে হাসতে বললে, আমাকে কি খেতে বাকি রেখেছ?

খেয়ে-দোয়ে ও একটা চাদর গায় দিয়ে পাশ ফিরে শুয়ে পড়ল। সতর্ক করে দিল, এখন চুপটি করে ঘুমোও, একটুও বিরক্ত করবে না।

সত্যি?

সত্যি নয়ত কি মিথ্যে?

আমি একটু ওর কাছে এগিয়ে গিয়ে বললাম, বিরক্ত না করে। যদি তোমাকে সুখী করি?

আমাকে হাত দিয়ে একটা ধাক্কা দিয়ে হেসে বললে, দূর থেকে সুখী করে।

অনেক দূরে সরে যাব?

হ্যাঁ, যাও।

তই কি হয়? তোমার কষ্ট হবে।

বুড়ো আঙুলটা দেখিয়ে বললে, কলা হবে। দেখি কেমন যেতে পার!

মেমসাহেব জানত ও পাশ ফিরে শুয়ে থাকতে পারবে না, আমিও দূরে সরে থাকব না। ওর মনের কথা আমি জানতাম, আমার মনের কথাও ও জানত। তবুও হয়ত একটু বেশি আদর, একটু বেশি ভালবাসা পাবার জন্য ও এমনি দুষ্টুমি করতে ভালবাসত। আমারও মন্দ লগত না।

পরের দিন সারা গেস্টহাউস ফাঁকা হয়েছিল। শুধু আমরা দুজন্ম আর দোতলায় এক বৃদ্ধ দম্পতি ছাড়া আর কোন গেস্ট ছিল না।

সন্ধ্যাবেলায় আমরা দুজনে লেকের ধার দিয়ে পাহাড় আর অরণ্যের মধ্যে কত ঘুরে বেড়িয়েছিলাম। মেমসাহেব কত গান শুনিয়েছিল। রাত্রে ফিরে এসে ছাতের কোণে লেকের মিষ্টি হাওয়ায় বসে বসে দুজনে ডিনার খেলাম। তারপর লাইটগুলো অফ করে দিয়ে বিরাট মুক্ত আকাশের তলায় বসে রইলাম। আমরা দুজনে। আকাশের তারাগুলো মিট-মিট করে জ্বললেও সেদিন ঐ আবছা অন্ধকারে আমাদের দুজনের মনের আকাশ পূর্ণিমার আলোয় ভরে গিয়েছিল।

আশপাশে দুনিয়ার আর কোন জনপ্ৰাণী ছিল না। মনে হয়েছিল। শুধু আমরা দুজনেই যেন এই বিশ্বব্ৰহ্মাণ্ডের মালিক। ভগবান যেন আমাদের মুখ চেয়ে, আমাদের শান্তির জন্য আর সবাইকে ছুটি দিয়েছিলেন এই পৃথিবী থেকে অন্য কোথাও একটু ঘুরে আসতে।

জনারণ্যের বাইরেও এর আগে কয়েকবার মেমসাহেবকে কাছে পেয়েছি কিন্তু এমন করে কাছে পাইনি। এত পূর্ণ, পরিপূর্ণ সম্পূর্ণভাবে আগে পাইনি।

মেমসাহেব, ভুলে যাবে নাতো এই রাত্রির কথা?

বোতল বোতল ভালবাসার হুইস্কি খেয়ে মেমসাহেবের এমন নেশা হয়েছিল যে কথা বলার ক্ষমতাও ছিল না। তাইতো শুধু মাথা নেড়ে বললে, না।

কোনওদিন না?

না।

যদি কোনদিন তুমি আমার থেকে অনেক দূরে চলে যাও—

তোমার এই ভালবাসা আর এই স্মৃতি বুকে নিয়ে কোথায় যাব বলে?

তবুও মানুষের অদৃষ্টের কথা তো বলা যায় না।

জিভ দিয়ে ঠোঁটটা একটু ভিজিয়ে নিল, দু’টো দাঁত দিয়ে এ ঠোঁটের কোনাটা একটু কামড়ে নিল মেমসাহেব। তারপর বললো, তোমার এই ভালবাসা পাবার পর আর একজনের সঙ্গে সারাজীবন ধরে ভালবাসার অভিনয় করতে আমি পারব না।

একটু থামল। আমাকে আর একটু কাছে টেনে নিল। একটু বেশি শক্ত কয়ে জড়িয়ে ধরে বললে, তাছাড়া তোমার জীবনটা সর্বনাশ করে আর এক’জনকে আবার ঠকাব কেন? একটু জোর গলায় বলে উঠল, না, না, আমি তা কোনদিন পারব না।।

আমিও যেন কেমন হয়ে গিয়েছিলাম। আমিও বেশ জোর করে ওকে জড়িয়ে ধরলাম। একটু যেন ভেজা গলায় বলেছিলাম, সত্যি বলছি মেমসাহেব, ভগবানের কাছে কায়মনোবাক্যে প্রার্থনা করি সে দুর্দিন যেন কোনদিন না আসে। কিন্তু যদি কোনদিনূ, আসে, সেদিন আমি আর বাঁচিব না। হয় উন্মাদ হবো নয়ত তোমার স্মৃতি বুকে নিয়েই এই লেকের জলে চিরকালের জন্য ডুব দেব।

ও তাড়াতাড়ি আমার মুখটা চেপে ধরল। বললে, ছি, ছি, ওকথা মুখে আনে না। এই তোমার বুকে হাত দিয়ে বলছি আমি তোমাকে ছেড়ে কোথাও যাব না।

একটু থেমে, আমাকে একটু আদর করে মেমসাহেব। আবার বলেছিল, আমি যেতে চাইলেই তুমি আমাকে যেতে দেবে কেন? আমি না তোমার স্ত্রী? তোমার মনে কোন দ্বিধা, কোন চিন্তা থাকলে আজ এই রাত্তিরেই তুমি আমার সিঁথিতে সিঁদুর পরিয়ে দাও, হাতে শাঁখা পরিয়ে দাও। আমি সেই শাঁখা-সিঁদুর পরেই কলকাতা ফিরে যাব।

মেমসাহেবের কথায় আমার মন থেকে অবিশ্বাসের ছোট্ট ছোট্ট টুকরো টুকরো মেঘগুলো পর্যন্ত কোথায় যেন মিলিয়ে গেল। আমার মুখটা হাসিতে ঝলমল করে উঠল। বললাম, না, না, আমার মনে কোন দ্বিধা নেই। তুমি যদি আমার না হতে তাহলে কি আমন। হাসিমুখে তোমার সমস্ত সম্পদ, সব ঐশ্বৰ্য আর ভালবাসা এমন। করে দিতে?

কথায় কথায় অনেক রাত হয়ে গিয়েছিল। হাতে ঘড়ি ছিল কিন্তু দেখার মনোবৃত্তি কারুরই ছিল না। ঘরে এসে আর মেমসাহেব পােশ ফিরে শুয়ে দূরে থাকেনি। এত আপন, এত নিবিড়, এত ঘনিষ্ঠ হয়েছিল সে রাত্রে যে সে কাহিনী লেখা সম্ভব নয়। শুধু জেনে রাখা আমাদের দুটি মন, দুটি প্ৰাণ, দুটি আত্মা আর আশাআকাঙ্ক্ষার, স্বপ্ন-সাধনা সব একাকার হয়ে মিশে গিয়েছিল। সে চিরস্মরণীয় রাত্রে।

পর্ব ১৫ শেষ 📌

🔴পর্ব :১৬🔴

পরের দিন ঘুম ভাঙতে অনেক বেলা হয়েছিল। হয়ত আরো অনেক বেলা হতো। কিন্তু সূর্ষের আলো চোখে পড়ায় আমার ঘুম ভেঙে গেল। পাশের খাটে মেমসাহেব আমার দিকে ফিরে–শুয়েছিল। সূর্যের আলো ওর চোখে পড়ছিল না। মনে হলো মহানন্দে স্বপ্নে বিভোর হয়ে আছে।

ওর ঘুম ভাঙাতে আমার মন চাইল না। ও এত নিশ্চিন্তে, শান্তিতে ঘুমুচ্চিল যে দেখতে বেশ লাগছিল। বহুক্ষণ ধরে শুধু চেয়ে চেয়ে দেখলাম। তারপর উঠে বসে আরো ভাল করে দেখলাম। ওর সর্বাঙ্গের পর দিয়ে বার বার চোখ বুলিয়ে নিলাম। একটু হয়ত হাত বুলিয়ে দিয়েছিলাম ওর গায়।

মনে মনে কত কি ভাবলাম। ভাবলাম, এই মেমসাহেব। এই আমার জীবন-নাট্যের নায়িকা। এই সেই চপলা, চঞ্চল বালা যে আমার জীবন ইতিহাসের মোড় ঘুরিয়েছে? এই সেই শিল্পী যে আমার জীবনে সুর দিয়েছে, চোখে স্বপ্ন দিয়েছে। ভাবলাম, এই সেই, মেয়ে যে আমার জীবনে না এলে আমি কোথায় সবার অলক্ষ্যে হারিয়ে যেতাম, শুকনো পাতার মত কালবৈশাখীর মাতাল হাওয়ায় অজানা ভবিষ্যতের কোলে চিরকালের জন্য লুকিয়ে পড়তাম?

ভাবতে ভাবতে ভারী ভাল লাগল। ওর কপালের পর থেকে চুলগুলো সরিয়ে দিয়ে একটু আদর করলাম।

মেমসাহেব কান্ত হয়ে শুয়েছিল। ওর দীর্ঘ মোটা বিনুনিট কঁধের পাশ, বুকের পর দিয়ে এসে বিছানায় লুটিয়ে পড়েছিল। আমি মুগ্ধ হয়ে আরো অনেকক্ষণ চেয়ে রইলাম। ওর ছন্দোবন্ধ দেহের চড়াই-উতরাই দেখে যেন মনে হলো প্ৰাক্সিটলীসএর ভেনাস বা সাঁচীর যক্ষী টর্সো! নাকি খাজুরাহো’র নায়িকা, অজন্তায় মারকন্যা!

মনে পড়ল ঈতার প্রতি মিলটনের কথা-O fairest of creation last and best, of all God’s works’

ঈভার মত মেমসাহেব নিশ্চয়ই অত সুন্দরী ছিল না কিন্তু আমার চোখে আমার মনে সে তো অনন্যা। আমার শ্যামা মেমসাহেবকে মুগ্ধ হয়ে দেখলাম অনেকক্ষণ। ভাবলাম বাইবেলের মতে তো নারীই ভগবানের শেষ কীর্তি, শ্ৰেষ্ঠ কীর্তি। কিন্তু সবাই কি মেমসাহেব হয়? দেহের এই মাধুৰ্য, চোখে এমনি স্বপ্ন, চরিত্রে এই দৃঢ়তা, মনের এই প্ৰসারতা তো আর কোথাও পেলাম না।

ঘুমিয়ে ঘুমিয়েও যেন ও আমাকে ইশারা করল। মনে হলো যেন ডাক দিল ওগো, কাছে এসো না, দূরে কেন? তুমি কি আমাকে তোমার বুকের মধ্যে তুলে নেবে না?

আমি হাসলাম। মনে মনে বললাম, পোড়ামুখী তুই তো জানিস না, তোকে বেশী আদর করতেও আমার ভয় হয়। তোকে বেশীক্ষণ বুকের মধ্যে ধরে রাখলে জ্বালা করে, ভয় ধরে।

ভয়?

হ্যাঁ, হ্যাঁ, ভয়। ভয় হবে না? যদি কোনদিন কোন কারণে কোন দৈবদুর্বিপাকে আমার বুকটা খালি হয়ে যায়? তখন?

ঘুমিয়ে ঘুমিয়েই মেমসাহেব ওর ডান হাতটা আমার কোলের ’পর ফেলে একটু জড়িয়ে ধরবার চেষ্টা করল। যেন বলল, না গো, না, আমি তোমাকে ছেড়ে কোত্থাও যাব না।

আমি মেমসাহেবকে একটু কাছে টেনে নিলাম, একটু আদর করলাম।

ঐ সকালবেলার মিষ্টি সূর্যের আলোয় মেমসাহেবকে আদর করে বড় ভাল লাগল। কিন্তু আনন্দেয় ঐ পরম মুহুর্তেও একবার মনে হলো, সন্ধ্যায় তো সূৰ্য অস্ত যায়, পৃথিবীতে তো অন্ধকার নেমে আসে।

জান দোলাবৌদি, ঐ হতচ্ছাড়ী মেয়েটাকে যখনই বেশী করে কাছে পেয়েছি তখনই আমার মনের মধ্যে ভয় করত। কেন করত তা জানি না কিন্তু আজ মনে হয়–

থাকগে। ওসব কথা বলতে শুরু করলে আবার সব কিছু গুলিয়ে যাবে। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব তোমাকে আমার মেমসাহেবের কাহিনী শোনাতে হবে। সময় ঝড়ের বেগে এগিয়ে চলেছে। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব একটা শুভলগ্নে আমাকে তো তোমার পাত্রীস্থ করতে হবে। তাই না? তাছাড়া আমারও তো বয়স বাড়ছে। বয়স বেশী হয়ে গেলে কি আমার কপালে কিছু জুটবে?

ঐ অরণ্য-পৰ্বত-লেকের ধারের রাজপ্রাসাদে দুটি দিন, দুটি রাত্রি স্বপ্ন দেখে আমরা আবার দিল্লী ফিরে এলাম। ফিরে এলাম ঠিকই কিন্তু যে মেমসাহেব। আর আমি গিয়েছিলাম। সেই আমরা ফিরে এলাম না। ফিরে এলাম সম্পূর্ণ নতুন হয়ে।

দিল্লীতে ফিরে এসে মেমসাহেব একটি মুহুৰ্তও নষ্ট করে নি। সংসার পাতার কাজে মেতেছিল। একটা স্কুটার রিক্সা নিয়ে দুজনে মিলে দিল্লীর পাড়ায় পাড়ায় ঘুরেছিলাম ভবিষ্যতের আস্তান পছন্দ করবার আশায়। ৰুরোলবাগ, ওয়েস্টার্ন এক্সটেনশন, নিউ রাজেন্দ্রনগর, ইস্ট প্যাটেল নগর থেকে দক্ষিণে নিজামুদ্দীন, জংপুর, ডিফেন্স, সাউথ একসটেনশন, কৈলাস, হাউসখাস, গ্ৰীনপার্ক পর্যন্ত ঘুরেছিলাম। সব দেখেশুনে ও বলেছিল, গ্ৰীনাপার্কেই একটা ছোট্ট কটেজ নেব। আমরা।

এত জায়গা থাকতে গ্রানিপার্ক?

শহর থেকে বেশ একটু দূরে আর বেশ ফাঁকা ফাঁকা আছে।

বড্ড দুর।

তা, হোক। তবুও থেকে শান্তি পাওয়া যাবে।

তা ঠিক।

পরে আবার বলেছিল, দুতিন মাসের মধ্যেই বাড়ি ঠিক করবে। তারপর একটু গোছগাছ করে নিয়েই আমরা সংসার পাতব।

হাত দিয়ে আমার মুখটা নিজের দিকে ঘুরিয়ে নিয়ে মেমসাহেব জিজ্ঞাসা করল, কেমন? তোমার আপত্তি নেই তো?

আমি মাথা নেড়ে বলেছিলাম, না।

আরো দু’চারটি কি যেন কথাবার্তা বলার পর ও আমার গলাটা জড়িয়ে ধরে বলল, দেখ না, বিয়ের পর তোমাকে কেমন জব্দ করি।

কি জব্দ করবে? আজেবাজে খাওয়া-দাওয়া ফালতু আডা দেওয়া সব বন্ধ করে দেব।

তাই বুঝি?

তবে কি?

এবার আমিও একটা হাত দিয়ে ওর গলাটা জড়িয়ে ধরে বললাম, আর কি করবে মেমসাহেব?

আধো আধো গলায় উত্তর দিল, সব কথা বলব কেন?

তাই বুঝি?

তবে কি? বাট ইউ উইল সী আই উইল মেক ইউ হ্যাপি।

তা আমি জানি। তবে মাঝে মাঝে আমার ভয় হয়।

কি ভয় হয়?

আমি ওর কানে কানে ফিসফিস করে বললাম, আমি বোধহয় স্ত্রৈণ হবো!

মেমসাহেব আমাকে একটা ধাক্কা দিয়ে বললে, বাজে বকো না।

একটু মুচকি হাসলেও বেশ সিরিয়াসলি বললাম, বাজে না মেমসাহেব। বিয়ের পর বোধহয় তোমাকে ছেড়ে আমি পার্লামেন্ট বা অফিসেও যেতে পারব না।

এবার মেমসাহেব একটু মুচকি হাসে। বললে, চব্বিশ ঘণ্টা বাড়ি বসে কি করবে?

আবার কানে কানে ফিসফিস করে বললাম, তোমাকে নিয়ে শুয়ে থাকব।

ও হেসে বললে, অসভ্য কোথাকার! একটু থেমে আবার বললে, শুতে দিলে তো?

আমি বললাম, শুতে না দিলে আমি চীৎকার করে, কান্নাকাটি করে। সারা পাড়ায় জানিয়ে দেব।

মেমসাহেব এবার আমার পাশ থেকে উঠে পড়ে। মুখ টিপে হাসতে হাসতে বললে, বাপরে বাপ! কি অসভ্য।

আমি দৌড়ে গিয়ে ওকে ধরতে গেলাম। ও ছুটে বারান্দায় বেরিয়ে যাবার চেষ্টা করল, পারল না। আঁচল ধরে টানতে টানতে নিয়ে এলাম সোফার ওপর। যদি বলি এখনই……

হাতে ঘুষি পাকিয়ে বললে, নাক ফাটিয়ে দেব।

সত্যি?

এমনি করে মেমসাহেবের দিল্লীবাসের মেয়াদ ধীরে ধীরে শেষ হয়ে গেল। রবিবার বিকেলে ডিলুক্স এয়ার কণ্ডিসনড এক্সপ্রেসে কলকাতা চলে গেল। ওয়েস্টার্ন কোর্ট থেকে স্টেশন রওনা হবার আগে মেমসাহেব আমাকে প্ৰণাম করল, আমার বুকে মাথা রেখে জড়িয়ে ধরে একটু কাঁদল।

আমি ওকে আশীৰ্বাদ করলাম, আদর করলাম, চোখের জল মুছিয়ে দিলাম।

এক সপ্তাহ ধরে দুজনে কত কথা বলেছি কিন্তু সেদিন ওর বিদায় মুহুর্তে দুজনের কেউই বিশেষ কথা বলতে পারিনি। আমি শুধু বলেছিলাম, সাবধানে থেকে। ঠিকমত চিঠিপত্র দিও।

ও বলেছিল, ঠিকমত খাওয়া-দাওয়া করে। তোমার শরীর কিন্তু ভাল না।

শেষে নিউ দিল্লী স্টেশনে ট্রেন ছাড়ার ঠিক আগে বলেছিল, তুমি কিন্তু আমাকে বেশীদিন একলা রেখো না। কলকাতায় আমি একলা থাকতে পারি না।

মেমসাহেব চলে গেল। আমি আবার ওয়েস্টার্ন কোটের শূন্যঘরে ফিরে এলাম। মনটা ভীষণ খারাপ লাগল। খেতে গেলাম না। ডাইনিং হলে আমাকে দেখতে না পেয়ে গজানন এলো আমার ঘরে খবর নিতে। আমাকে অনেক অনুরোধ করল কিন্তু তবুও আমি খেতে গেলাম না। বললাম, শরীর খারাপ। গজানন আমার মনের অবস্থা নিশ্চয়ই উপলব্ধি করেছিল। সেজন্য সেও আর দ্বিতীয়বার অনুরোধ না করে বিদায় নিল।

কলকাতা থেকে মেমসাহেবের পৌঁছনো সংবাদ আসতে না আসতেই আমি আবার কাজকর্ম শুরু করেছিলাম। পুরো একটা সপ্তাহ পার্লামেণ্ট যাইনি, সাউথ ব্লক-নর্থ ব্লক যাইনি, মন্ত্রী-এম-পি-অফিসার-ডিপ্লোম্যাট দর্শন করিনি। এমন কি টাইপ রাইটার পৰ্যন্ত সম্পর্শ করিনি।

দু’একদিন এদিক ওদিক ঘোরাঘুরি করলাম। কিন্তু বিশেষ উল্লেখযোগ্য কোন খবর-টাবর পেলাম না। পার্লামেণ্টে তখন আকশাই চীন সড়ক নিয়ে ঝড় বইছিল প্ৰায়ই। প্ৰাইম মিনিস্টারও বেশ গরম গরম কথা বলছিলেন মাঝে মাঝেই। দু’চারজন পলিটাসিয়ান যুদ্ধ করবার পরামর্শ দিলেও প্রাইম মিনিস্টার তা মানতে রাজী হলেন না। অথচ এইভাবে বক্তৃতার লড়াই কতদিন চলতে পারে? অল ইণ্ডিয়া রেডিও আর পিকিঙ বেতারের রাজনৈতিক মল্লযুদ্ধ তেতো হয়ে উঠেছিল। লড়াই করার কোন উদ্যোগ, আয়োজন বা মনোবৃত্তি সরকারী মহলে না দেখায় আমার মনে স্থির বিশ্বাস হলো আলোচনা হতে বাধ্য।

দু’চারজন সিনিয়র ক্যাবিনেট মিনিস্টারের বাড়িতে আর অফিসে কয়েকদিন ঘোরাঘুরি করে কোন কিছুর হদিশ পেলাম না। শেষে সাউথ ব্লকে ঘোরাঘুরি শুরু করলাম। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সেক্রেটারী ও স্পেশ্যাল সেক্রেটারীকেও তেল দিয়ে কিছু ফল হলো না।

শেষে আশা প্ৰায় ছেড়ে দিয়েছি। এমন সময়—

আফ্রিকা ডেক্সের মিঃ চোপরার সঙ্গে আড্ডা দিয়ে বেরুতে বেরুতে প্ৰায় সাড়ে ছাঁটা হয়ে গেল। বেরুবার সময় প্ৰাইম মিনিস্টারের ঘরের সামনে উঁকি দিতে গিয়ে দেখলাম, প্ৰাইম মিনিস্টার লিফট’এ ঢুকেছেন। আমি তাড়াতাড়ি হুড়মুড় করে লাফাতে লাফাতে সিঁড়ি দিয়ে নেমে এলাম।

প্ৰাইম মিনিস্টার গাড়ির দরজার সামনে এসে গিয়েছেন, পাইলট তার মোটর সাইকেলে স্টার্ট দিয়েছে, আয়ারলেস আর সিকিউরিটি কারও স্টার্ট দিয়েছে কিন্তু চলতে শুরু করে নি, এমন সময় ফরেন সেক্রেটারী প্ৰায় দৌড়তে দৌড়তে এসে হাজির হলেন। কানে কানে প্ৰাইম মিনিস্টারের সঙ্গে কি যেন কথা বললেন। প্ৰাইম মিনিস্টার আর ফরেন সেক্রেটারী আবার লিফটএ চড়ে উপরে চলে গেলেন।

আমি একটু পাশে দাঁড়িয়ে সব কিছু দেখলাম। বুঝলাম, সামথিং ভেরী সিরিয়াস অথবা সামথিং ভেরী আর্জেণ্ট। তা নয়ত ঐভাবে ফরেন সেক্রেটারী প্ৰাইম মিনিস্টারকে অফিসে ফেরত নিয়ে যেতেন না।

আমি প্ৰাইম মিনিস্টারের অফিসের পাশে ভিজিটার্স রুমে বসে রইলাম। দেখলাম, বিশ-পাঁচিশ মিনিট পরে প্রাইম মিনিস্টার আবার বেরিয়ে গেলেন। প্ৰাইম মিনিস্টারকে এবার দেখে মনে হলো, একটু যেন স্বস্তি পেয়েছেন মনে মনে।

আমি আরো কয়েক মিনিট অপেক্ষা করলাম। দেখলাম প্রাইম মিনিস্টার চলে যাবার পর পরই চায়না ডিভিশনের জয়েণ্ট সেক্রেটারী মিঃ মালিক ফরেন সেক্রেটারীর ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন।

আমার আর বুঝতে বাকি রইল না চীন সম্পর্কেই কিছু জরুরী খবর এসেছে।

সেদিনকার মত আমি বিদায় নিলাম। পরের দিন থেকে মিঃ মালিকের বাড়ি আর অফিস ঘুরঘুর করা শুরু করলাম। তবুও কিছু সুবিধা হলো না।

শেষে ইউনাইটেড নেশনস ডিভিশনের এক’জন সিনিয়র অফিসারের কাছে খবর পেলাম সীমান্ত বিরোধ আলোচনার জন্য চীনা প্ৰধানমন্ত্রী চৌ এন-লাইকে দিল্লী আসার আমন্ত্রণ জানান হয়েছে এবং তিনি তা গ্ৰহণ করেছেন।

খবরটি সে বাজারে প্রায় অবিশ্বাস্য হলেও যাচাই করে দেখলাম, ঠিকই। দিল্লীর বাজার তখন অত্যন্ত গরম কিন্তু তবুও আমি খবরটা পাঠিয়ে দিলাম। ট্রাঙ্ককাল করে নিউজ এডিটরকে ব্রিফ করে। দিলাম। পরের দিন ডবল কলম হেডিং দিয়ে সেকেণ্ড লীড হয়ে ছাপা হলো, চৌ এন-লাই দিল্লী আসছেন।

এই খবরটা দেবার জন্য প্ৰায় সবাই আমাকে পাগল ভাবল। আমার এডিটরের কাছেও অনেকে অনেক বিরূপ মন্তব্য করলেন। এডিটর চিন্তিত হয়ে আমাকে ট্রাঙ্ককাল করলেন। আমি বললাম, একটু ধৈৰ্য ধরুন।

এক সপ্তাহ ঘুরতে না ঘুরতেই লোকসভায় কোশ্চেন-আওয়ারের পর স্বয়ং প্রাইম মিনিস্টার ঘোষণা করলেন, প্রিমিয়ার চৌ এন-লাই তাঁর আমন্ত্রণ গ্ৰহণ করে সীমান্ত বিরোধ আলোচনার জন্য দিল্লী আসছেন।

বিনা মেঘে বজ্ৰাঘাত হলো অনেকের মাথায়। আমি কিন্তু আনন্দে ধেই ধেই করে নাচতে শুরু করলাম। রাত্রে এডিটরের টেলিগ্ৰাম পেলাম, কনগ্রাফুলেশনস স্পেশ্যাল ইনক্রিমেন্ট টু-ফিফটি উইথ ইমিডিয়েট এফেকটু। দু’হাত তুলে ভগবানকে প্ৰণাম করলাম।

সেই রাত্ৰেই মেমসাহেবকে একটা টেলিগ্ৰাম করে সুখবরটা জানিয়ে দিলাম।

পরের দিন মেমসাহেবেরও একটা টেলিগ্ৰাম পেলাম, এ্যাকসেপ্টট কনগ্ৰাচুলেশনস অ্যাণ্ড প্ৰণাম স্টপ লেটার ফলোজ।

মেমসাহেবের চিঠি পাবার পরও ভাবতে পারিনি। ভবিষ্যতে আরো কোন অপ্রত্যাশিত ঘটনা ঘটবে আমার জীবনে। কিন্তু সত্যি সত্যিই ঘটল। প্ৰাইম মিনিস্টারের সঙ্গে ইউরোপ যাবার দুর্লভ সুযোগ এলে আমার জীবনে কয়েক মাসের মধ্যেই।

বিদায় জানাবার জন্য মেমসাহেব দিল্লী ছুটে এসেছিল। আমি আশ্চর্য হয়েছিলাম। বলেছিলাম, আমাকে সী-অফ করার জন্য। তুমি কলকাতা থেকে দিল্লী এলে?

দুটি হাত দিয়ে আমার দুটি হাত দোলাতে দোলাতে বলেছিল, তুমি প্ৰথমবারের জন্য ইউরোপ যাচ্ছি। আর আমি চুপ করে বসে থাকব কলকাতায়?

ঐ কালো হরিণ চোখ ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে বললো, তাও আবার প্ৰাইম মিনিস্টারের সঙ্গে চলেছি। আমি না এসে থাকতে পারি?

পাগলীর কথাবার্তা শুনে আমার হাসি পেতো। কত হাজার হাজার লোক বিদেশ যাচ্ছে। তার জন্য এক হাজার মাইল দূর থেকে ছুটে এসে বিদায় জানাতে হবে?

দু’হাত দিয়ে আমার মুখখানা তুলে ধরে মেমসাহেব বললো, এসেছি, বেশ করেছি! তোমাকে কৈফিয়ত দিয়ে আসব?

বল দোলাবৌদি, অমন পাগলীর সঙ্গে কি তর্ক করা যায়? যায় না। তাই আমিও আর তর্ক করিনি।

পাশপোর্ট-ভিসা-ফারেন এক্সচেঞ্জ আগেই ঠিক ছিল। এয়ারপ্যাসেজ আগের থেকেই বুক করা ছিল। দুজনে মিলে এয়ার ইণ্ডিয়ার অফিসে গিয়ে টিকিটটা নেবার পর কিটনপ্লেসে। কয়েকটা ছোটখাট জিনিসপত্র কিনলাম। তারপর কফি হাউসে গিয়ে কফি খেয়ে ফিরে এলাম ওয়েস্টার্ন কোটে।

কেরার পথে মেমসাহেব বললো, দেখ তোমার কাজকর্ম আজই শেষ করবে। কালকে কোন কাজ করতে পারবে না।

কেন? কাল কি হবে? আমি জানতে চাইলাম। ঘাড় বেঁকিয়ে চোখ ঘুরিয়ে ও বললো, বা: পরশু ভোরেই তো চলে যাবে। কালকের দিনটাও আমি পেতে পারি না?

লাঞ্চের পর একটু বিশ্রাম করে বেরিয়েছিলাম বাকি কাজগুলো শেষ করার জন্য। তারপর এক্সটারনাল অ্যাফেয়ার্স মিনিস্ট্রিতে গিয়ে দেখাশুনা করে ফিরে এলাম সন্ধ্যার পরই।

এসে দেখি মেমসাহেব একটা চমৎকার বালুচরী শাড়ি পরেছে, বেশ চেপে কান ঢেকে চুল বেঁধেছে, বিরাট খোপায় রূপার কাঁটা গুজেছে। রূপার চেন’এ টিবেটয়ান লকেট লাগানো একটা হার ছাড়া আরো কয়েকটা রূপার গহনা পরেছে। কপালে টকটকে লাল একটা বিরাট টিপ ছাড়াও চোখে বোধ হয় একটু সুরমার টান লাগিয়েছিল।

আমি ঘরে ঢুকে মেমসাহেবকে দেখেই থমকে। দাঁড়ালাম। ও মুখটা একটু নীচু করে চোখটা একটু ঘুরিয়ে আমার দিকে তাকাল। একটু হাসল।

আমি হাসলাম না, হাসতে পারলাম না। আগের মতই স্থির দৃষ্টিতে ওর দিকে চেয়ে রইলাম।

ও আবার আমার দিকে তাকিয়ে একটু মুচকি হাসল। জিজ্ঞাসা করল, অমন স্থির হয়ে কি দেখছ?

তোমাকে।

ন্যাকামি করে ও আবার বললো, আমাকে?

বুঝতে পারছি না?

একটু হাসল। বললো, তা তো বুঝতে পেরেছি। কিন্তু অমন করে দেখবার কি আছে?

কেন দেখছি তা বুঝতে পারছি না? দেখবার কি কোন কারণ নেই?

মেমসাহেব। এবার আর তর্ক না করে ধীর পদক্ষেপে দেহটাকে একটু দুলিয়ে দুলিয়ে আমার সামনে এসে দাঁড়াল। আমার হাত দু’টো ধরে মুখটা একটু বেঁকিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে বললো, খুব খারাপ লাগছে?

আমি প্ৰায় চীৎকার করে উঠলাম, অসহ্য, অসহ্য!

সত্যি খারাপ লাগছে? অত খারাপ কি না তা জানি না, তবে তোমাকে আমি সহ্য করতে পারছি না।

ও এবার সত্যি একটু চিন্তিত হয়ে প্রশ্ন করল, এসব খুলে ফেলব?

এতক্ষণ ও আমার সামনে দাঁড়িয়ে কথা বলছিল। এবার ওকে পাশে টেনে নিয়ে বললাম, হে নিরুপমা, চপলতা আজি যদি ঘটে তবে করিয়ো ক্ষমা… আর হে নিরুপমা, আঁখি যদি আজ করে অপরাধ, করিয়ো ক্ষমা।

দোলাবৌদি, মেমসাহেবও কোন কথা বলল না। দুটি হাত দিয়ে আমার হাতটা জড়িয়ে ধরে মাথাটা হেলান দিয়ে খুব মিহিমুরে গাইল, আমি রূপে তোমায় তোলাব না ভালবাসায় ভোলাব।

আমি প্রশ্ন করলাম, আর কি করবে? মেমসাহেব গাইতে গাইতে বললো, ভরাব না। ভূষণভারে, সাজাব না। ফুলের হারে-সোহাগ আমার মালা করে গলায় তোমার দোলাব।

আমি বললাম, সত্যি?

হাজারবার লক্ষবার সত্যি।

মেমসাহেব গজাননকে ডেকে চায়ের অর্ডায় দিল। চা এলো। চা খেতে খেতে জিজ্ঞাসা করলাম, তুমি কি এয়ার ইণ্ডিয়া বা টুরিস্টবুরোর চাকরির ইন্টারভিউ দিতে যাচ্ছ?

কেন বলতো?

তা নয়ত এত রূপোর গহনা চাপিয়েছ কেন?

আমার খুব ভাল লাগে। কেন তোমার খারাপ লাগছে?

পাগল হয়েছ? খারাপ লাগবে কেন? খুব ভাল লাগছে।

সত্যি?

সত্যি ছাড়া কি মিথ্যা বলছি?

যাই হোক এত সাজলে কেন?

তোমার ভাল লাগবে বলে।

একটু থেমে আবার বললো, তাছাড়া…

তাছাড়া কি?

মুখটা একটু লুকিয়ে, বললো, ইউরোপ যাচ্ছ। না জানি কত মেয়ের সঙ্গে আলাপ হবে। তাই যাতে চট করে ভুলে না যাও…

আমাকে নিয়ে আজো তোমার এত ভয়?

আমাকে একটু আদর করে মেমসাহেব বললো, না গো না। এমনি সেজেছি।

সেদিন সন্ধ্যা-রাত্রি আর পরের দিনটা পুরোপুরি মেমসাহেবকে দিয়েছিলাম।

তারপর বিদায়ের দিন এয়ারপোর্ট রওনা হবার আগে মেমসাহেব আমাকে প্ৰণাম করেছিল, আমি ওকে আশীৰ্বাদ করেছিলাম। কিন্তু তবুও ও চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল। মনে হলো যেন কিছু বলবে। জানতে চাইলাম, কিছু বলবে?

কিছু কথা না বলে মাথা নীচু করে ঠোঁট কামড়াতে কামড়াতে মুচকি মুচকি হাসছিল।

আমি ওর মুখটা আলতো করে তুলে ধরে আবার জানতে চাইলাম, কি, কিছু বলবে?

অনেকক্ষণ ধরে অনেকবার জিজ্ঞাসা করার পর হতচ্ছাড়ী আমার কানে কানে কি বলেছিল জান দোলাবৌদি? বলেছিল, আমাকে আর একটু ভাল করে আদর কর।

কি করব? বিদায়বেলায় এই অনুরোধ না রেখে আমি পারিনি। সত্যি একটু ভাল করেই আদর করলাম। আর ওর দেহে একটা চিহ্ন রেখে গেলাম, যে চিহ্ন শুধু মেমসাহেবই দেখেছিল। কিন্তু দুনিয়ার আর কেউ দেখতে পারে নি।

পালামের মাটি ছেড়ে আমি চলে গেলাম।

ঘুরতে ঘুরতে শেষে লণ্ডন পৌঁছে মেমসাহেবের চার-পাঁচটা চিঠি একসঙ্গে পেলাম। বার বার করে লিখেছিল, ফেরার সময় তুমি দিল্লীতে না গিয়ে যদি সোজা কলকাতা আস, তবে খুব ভাল হয়। কলেজে টেস্ট শুরু হয়েছে; সুতরাং এখন ছুটি নেওয়া যাবে না। অথচ তুমি ফিরবে। আর আমি তোমাকে এয়ারপোর্টে রিসিভ করব না, তা হতে পারে না।

শেষে লিখেছিল,তুমি কবে, কোন ফ্লাইটে, কখন দমদমে পৌঁছাবে, সে খবর আর কাউকে জানাবে না। দমদমে যেন ভিড় না হয়। শুধু আমিই তোমাকে রিসিত করব, আর কোন তৃতীয় ব্যক্তি যেন এয়ারপোর্টে না থাকে।

মেমসাহেব আমাকে বিদায় জানাবার জন্য কলকাতা থেকে দিল্লী ছুটে এসেছিল। সুতরাং আমি ওর এই অনুরোধ উপেক্ষা করতে পারলাম না। বণ্ড স্ট্রীটে এয়ার ইণ্ডিয়া অফিসে গিয়ে আরো কিছু পেমেণ্ট করে টিকিটটা চেঞ্জ করে আনলাম। তারপর রওনা হবার আগে মেমসাহেবকে একটা কেবল করলাম, রিচিং ডামডাম এয়ার ইণ্ডিয়া স্যাটারডে মৰ্ণিং।। মজা করবার জন্য শেষে উপদেশ দিলাম, ডোন্ট ইনফর্ম এনিবডি।

সেদিন দমদমে অরেঞ্জ পাড়ের একটা তাঁতের শাড়ি আর অরেঞ্জ রং-এর একটা ব্লাউজ পরে, রোদপুরের মধ্যে মাথায় ঘোমটা দিয়ে ‘মেমসাহেব রেলিং এর ধারে দাঁড়িয়েছিল আমার আগমন প্ৰত্যাশায়। . আমার দুহাতে ব্রিফকেশ, টাইপরাইটার, কেবিনব্যাগ আর ওভারকোট থাকায় হাত নাড়তে পারলাম না। শুধু একটু মুখের হাসি দিয়ে ওকে জানিয়ে দিলাম, ফিরে এসেছি।

চলবে।

পূর্ববর্তী নিবন্ধ
পরবর্তী নিবন্ধ
গল্প পোকা
গল্প পোকাhttps://golpopoka.com
গল্পপোকা ডট কম -এ আপনাকে স্বাগতম......
RELATED ARTICLES

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে

- Advertisment -

Most Popular

Recent Comments

Md masrur Hasan mahi على অবুঝ_বউ পার্ট: ৫
আমিনুল ইসলাম على প্রয়োজন পর্ব: ৩০ ( অন্তিম)
সাজিবুল ইসলাম على ধর্ষিতাবউ২ ৯ তথা শেষ পর্ব
শাহিদুল ইসলাম على জীবন সঙ্গী ১ম পার্ট
শাহিদুল ইসলাম على জীবন সঙ্গী ১ম পার্ট
Nita Sarkar على স্বপ্নীল ৬৮
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على রহস্য শেষ_পর্ব
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على অলক্ষ্যে তুমি পর্ব-০৬ এবং শেষ পর্ব
Nazmun Nahar Akhi على Psycho_is_back? part_7
Nazmun Nahar Akhi على Dangerous_Villian_Lover part 2
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على জানালার ওপারে পর্ব-১৭ এবং শেষ পর্ব
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على লীলা বোর্ডিং ১২১৫ পর্ব-১১ এবং শেষ পর্ব
মিজানুর রহমান রাহুল على সেই তুমি পর্ব-০১
@feelings على প্রহেলিকা
Anamika Basu على সে পর্ব-১২
Anamika Basu على সে পর্ব-১২
Nusrat jahan على coffee & vanilla Part-10
Pallabi Roy على স্বপ্নীল ৬৮
M.D Mahabub على The_Villain_Lover Part_2
Labani sarkar على Dangerous_Villain_Lover part 23
MD Akas Apc على বিবেক
Tanisha Ahmed على Devil love part-18 
Aius Barmon shorob على নারীর দেহকে নয়
Chandan roy على স্বপ্নীল ৬৮
Chandan roy على স্বপ্নীল ৬৮
Riya Biswas على তুমি রবে ৬০
Priya Banerjee على devil love married life last part
Riya Biswas على তুমি রবে ৬০
Riya Biswas على তুমি রবে ৫২
Mohammad Adib على তুমি রবে ৬০
Avni Ayesha على তুমি রবে ২৮
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
সুমিত على তুমি রবে ২৮
TANJIBA ZENIFAR على তুমি রবে ৫০
TANJIBA ZENIFAR على তুমি রবে ৫০
Samiah Begum على তুমি রবে ৫১
biddut das rocky على নর নারী
গল্প পোকা على নষ্ট গলি শেষ পর্ব
Md Jobayer Hossain Shohag على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
গল্প পোকা على দুই অলসের সংসার
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤৪২.
A.J.S Rakib على মন ফড়িং ❤৪২.
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
Samiya noor على গল্পঃ ভয়
Sadikul على গল্পঃ ভয়
Samia Islam على গল্পঃ ভয়
শূন্য মায়া على মন ফড়িং ❤ ৪০.
Sutapa biswas على মন ফড়িং ❤৩৯.
Foysal Mahmud على My_Mafia_Boss_Husband Part: 16
sutapa biswas على মন ফড়িং ❤ ৩৮.
sutapa biswas على মন ফড়িং ❤ ৩৭
Foysal Mahmud على My_Mafia_Boss_Husband Part: 16
Siyam على বিবেক
Sudipto Guchhait على My_Mafia_Boss পর্ব-৯
saptami karmakar على devil love married life last part
saptami karmakar على devil love married life last part
মায়া على মন ফড়িং ৩০.
মায়া على মন ফড়িং ৩০.
মায়া على মন ফড়িং ২৬.
Shreyashi Dutta على  বিয়ে part 1
Sandipan Biswas على  বিয়ে part 1
Paramita Bhattacharyya على অনুরাগ শেষ পর্ব
জামিয়া পারভীন তানি على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
মায়া على মন ফড়িং  ২২
সুরিয়া মিম على খেলাঘর /পর্ব-৪২
গল্প পোকা على মন ফড়িং ২১
গল্প পোকা على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
Sahin ssb على মন ফড়িং ২১
মায়া على মন ফড়িং ২১
মায়া على মন ফড়িং ❤ ২০.
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤ ২০.
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৮. 
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৭.
Jannatul Ferdous على খেলাঘর পর্ব-৩৫
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤ ১৬. 
গল্প পোকা على ফাল্গুনের_ফুল last_part_8
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৬. 
গল্প পোকা على ছাত্রী যখন বউ পাঠঃ ১
গল্প পোকা على বাজির প্রেম পাঠঃ ১
Foujia Khanom Parsha على মা… ?
HM Ashraful Islam على অবুঝ_বউ পার্ট: ৮
HM Ashraful Islam على অবুঝ_বউ পার্ট: ৫
Ibna Al Wadud Shovon على স্বার্থ