Friday, June 5, 2026







বাঁধনহারা পর্ব-০১

ছোটগল্প
বাঁধনহারা (পর্ব ০১)
~আরিফুর রহমান মিনহাজ
১.
মেয়েটির সঙ্গে প্রথম দেখা হওয়ার দিনটি আমার স্পষ্ট মনে পড়ে। ভরদুপুরে সস্তায় পেটের খিদে নিবৃত্ত করবার জন্য ইতিউতি ঘুরে বেড়াচ্ছিলাম। আশেপাশে অগুনতি ভাতের হোটেল থাকা সত্বেও তাতে ঢুকার সাহস হচ্ছিল না সঙ্গত কারণেই। স্বল্প বেতনের একজন সাইট ইঞ্জিনিয়ারের পক্ষে রোজ-রোজ রেঁস্তোরায় খাওয়ার চিন্তা বিলাসিতা বই আর কিছু নয়। কাজেই মধ্য-এপ্রিলের চাঁদিফাটা তুমুল দাবদাহ উপেক্ষা করে সস্তা খাবারের সন্ধানে বের হওয়া। হাঁটতে হাঁটতে প্রায় অনেকদূর এসে পড়েছিলাম। ফ্লাইওভারের কাছাকাছি। ফ্লাইওভারের নিচে অনেকগুলো ভ্রাম্যমাণ খাবারের দোকান চোখে পড়তেই সেদিকে এগিয়ে গেলাম। অবস্থাদৃষ্টে বুঝলাম, এদের খরিদ্দারের বড় অংশই কলেজপড়ুয়া আর চাকরিজীবী। বসার বেঞ্চগুলো দখল হয়ে যাবার পরেও বেশিরভাগ মানুষ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে মচমচিয়ে ভাজাপোড়া খাচ্ছে,ভাবলেশহীনভাবে। দোকানগুলোতে হরেকরকম আইটেম দেখা গেল। বিরিয়ানি,সিঙারা সমুচা, বেগুনি আলুর চপ, ছোলাবুুট,নুডলস ইত্যাদি। আমি বসার জায়গা হয় এমন একটি দোকানের খোঁজে ইতস্তত দৃষ্টিপাত করে ব্যর্থ হয়ে তুলনামূলক কম ক্রেতা আছে এমন একটি দোকানের সামনে গিয়ে হাজির হলাম। অন্যান্য দোকানের মতো এই দোকানেও একই আইটেম উপস্থিত। রসালো ছোলাবুট,বেগুনি,আলুর চপ,জিলাপি এগুলোই।
– কী খাবেন?
আমার চোখ ছিল থরে-থরে সাজিয়ে রাখা খাবারগুলো দিকে।একটি তীক্ষ্ণ মেয়েলি কণ্ঠে আমি চমকে উঠলাম। সামনে তাকিয়ে দেখি একটি ঘর্মাপ্লুত শ্যামল নারীমুখ কিছুটা নিরুৎসাহিতভাবে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। চোখজোড়া জ্বলজ্বলে, নাকটা ঈষৎ বোঁচা, ঠোঁটজোড়া পাতলা এবং তীক্ষ্ণ। চুল চুড়োখোঁপা করা। ছিপছিপে গড়ন। শ্যামল গাত্রবর্ণ। বয়স আঠারো-উনিশের বেশি হবে না। কৈশোরের মৃদু ছাপ যেন এখনো লেপ্টে আছে চোখে-মুখে। পরনে পেঁয়াজ রঙা মলিন সেলোয়ার-কামিজ। বুকের ওপর সুবিন্যস্তভাবে দোপাট্টা টানা। শহরের এমন একটা জনাকীর্ণ জায়গায় একটি উঠতি মেয়ে ভ্রাম্যমাণ খাবারের দোকান চালাচ্ছে এই বিস্ময়টি আমি চাপা দিয়ে বললাম,
– ছোলাবুট দেন। সাথে বেগুনি দিয়েন না,শুধু চপ দিয়েন।
আমার মুখে আপনি সম্মোধন শুনেই বোধহয় মেয়েটি একটু অবাক হলো। সেটা গোপন করার চেষ্টা করে সে দ্রুতই ছোলাবুট প্রস্তুত করে আমার দিকে বাড়িয়ে দিল। আমি বেশ তৃপ্তি নিয়েই খাওয়া শেষ করলাম। বিল মিটিয়ে বাকি টাকাগুলো ফেরত নিতে নিতে ছোট করে বললাম,
– ছোলাটা ভালো ছিল।
মেয়েটি হা-না কিছু না বলে দ্ব্যর্থকভাবে মাথা ঝাঁকাল শুধু। এরপর অন্য ক্রেতার দিকে ঝুঁকে গেল।
এভাবেই মেয়েটির সঙ্গে আমার দেখা। এরপর থেকে সাইটের কাছাকাছি হওয়ায় কীভাবে যেন আমি সেই ভ্রাম্যমাণ দোকানের নিয়মিত কাস্টমার হয়ে উঠলাম। রোজ একই ধাঁচের খাবারে মন সায় দিত না বটে,কিন্তু সাইটের আশেপাশে এরচেয়ে সুলভ-মূল্যে এমন উপাদেয় খাবার জুটবে কোথা থেকে? উপরন্তু মেয়েটির রন্ধনপ্রণালী যে-কারোরই ভালো লাগতে বাধ্য। প্রথম একমাস তার সঙ্গে আমার কোনো বাড়তি আলাপচারিতার সুযোগ হয়ে উঠেনি,অথবা প্রয়োজনও হয়নি। মেয়েটির নীরবতা আর অম্লান রহস্যের খোলসে নিজেকে এমনভাবে ঘিরে রেখেছিল যে আমি সেই চিরশান্ত মূর্তিটাকে শ্রদ্ধার চোখেই দেখতে শুরু করেছিলাম। যাইহোক, আমাদের আলাপের সুত্রপাত হয় এক কালবৈশাখী-ক্লান্ত অপরাহ্নে। ঝড়ের তাণ্ডবে পুরো শহর যখন পর্যুদস্ত সেই থমথমে পরিবেশে আমি সাইটের কাজ কিছুটা গুছিয়ে খিদের তাড়নায় হাজির হলাম ফ্লাইওভারের নিচে। তখন দুপুর গড়িয়ে প্রায় বিকেল। আকশটা কালো মেঘে ছেয়ে আছে। গুড়ি-গুড়ি বৃষ্টি পড়ছে। ভ্রাম্যমাণ দোকানগুলোতে মানুষের ভিড় নেই খুব একটা। আমি গিয়ে সরাসরি বেঞ্চে বসেছি। মেয়েটির দিকে তাকিয়ে দেখি তার চোখে একধরণের জিজ্ঞাসা ঝুলে আছে যার মানে’আজ এতক্ষণে যে’। আমি যেন অনেকটা কৈফিয়তের সুরে বলে উঠলাম,
– যা ঝড় হলো!… বেচাকেনা তো তেমন হয়নি মনে হচ্ছে।
মেয়েটি ভ্যানের পাশে বড় কড়াইয়ে কিছু একটা ভাজছিল। আমার কথায় সায় দিয়ে বলল,
– হু, ঝড়-বাতাসের মইদ্দে কি আর কাস্টমার হয়! আপনেরে কী দিব?
আমি বললাম,সব তো ঠান্ডা হয়ে গেছে। কী খাই?
– কাজ না থাকলে একটু বসেন। নুডুলস পাকাচ্ছি।
বলে পাশেই তাকে সাহায্য করতে থাকা বছর দশেকের ছোকরাটিকে বলল, মাজেদ, যা পানি নিয়ে আয়। তাড়াতাড়ি আসিস।
ছেলেটি দুটি বড় পাঁচ লিটারি বোতল নিয়ে তৎক্ষনাৎ চলে গেল। এই ছেলেটিকে কদাচিত দেখা যায় এখানে। কাস্টমারদের খাবার পরিবেশন করে, মেয়েটির ফুট-ফরমায়েশ খাটে। মেয়েটির চেহারার সঙ্গে আংশিক মিল থাকায় বুঝতে কষ্ট হয় না যে ওরা ভাই-বোন। আমি জিজ্ঞেস করলাম,
– ও স্কুলে পড়ে না?
– পড়ে। কেলাস থিরিতে। স্কুল থেকে আইসা আমার লগে থাকে আরকি।
এমনসময় একটা ষোল সতের বছরের একটা ছেলে এসে ভ্যানের সামনে দাঁড়ায়। তার চোখ-মুখ উদ্ভ্রান্ত। চুল উশকোখুশকো। রুক্ষ মলিন গায়ের ত্বক। ভাবভঙ্গিতে বেপরোয়া ভাব স্পষ্ট। কোনো ভূমিকা ছাড়াই সে মেয়েটির উদ্দেশ্যে বলল,
– আপা, কিছু টেকা দে।
মেয়েটি সেদিকে তেমন ভ্রুক্ষেপ না করে আপনমনে কাজ করতে করতে বলল,
– টেকা নাই,কী করবি টেকা দিয়া?
– লাগবে আমার। তুই দে।
মেয়েটি চোখ পাকিয়ে ক্ষেপে উঠল,
– আমি জানি না তুই টেকা দিয়ে কী করবি? ডেন্ডিখোর কোনাইকার। যা ভাগ এহান থিকা।
– তরে টেকা দিতে কইছি আপা। একজনে টেকা পায়। না দিতে পারলে খবর কইরা ফেলবে।
– করুক। ধার কি আমি করছি? ধার কইরা জুয়া খেলার সময় মনে থাকে না কোত্থিকা দিবি? কাজ নাই কাম নাই সারাদিন খালি ঢ্যাংঢ্যাং। দূর হ এখান থিকা।
ছেলেটি নিস্ফল আক্রোশে দাঁত খিঁচিয়ে গালিগালাজ করতে করতে রাস্তা থেকে একটা পাথর কুড়িয়ে ত্বরিত-বেগে ছুঁড়ে মারল মেয়েটির দিকে। পাথর এসে লাগল হাতের কব্জিতে। বেদনার্ত স্বর ছিটকে এলো তার গলা থেকে। ততক্ষণে ছেলেটি উর্ধ্বশ্বাসে পালিয়ে গেছে।উপস্থিত কয়েকজন লোক ছেলেটিকে হইহই করে ধাওয়া করতে গেলে মেয়েটি আঘাতপ্রাপ্ত হাত চেপে ধরে কাতরাতে কাতরাতে বলল,
– বাদ দেন,ও আমার ভাই হয়।
ঘটনার আকস্মিকতায় আমি বিমূঢ় হয়ে গেলেও দ্রুত তা কাটিয়ে মেয়েটির নিকটে এসে দাঁড়িয়েছি। দেখলাম, চেপে-রাখা হাত থেকে ক্ষীণ ধারায় রক্ত ঝরছে। হাড় ফেটে যাওয়াও বিচিত্র নয়। আমি বললাম,
– রক্ত পড়ছে। চলুন, একটা ফার্মেসীতে গিয়ে ওয়াশ করে নেওয়া যাক।
মেয়েটি চেপে রাখা হাতটা একবার তুলে দেখে বলল,
– লাগবে না। নুডলস পুড়ে যাইবো আবার।
বলেই একটি ন্যাকড়া বের করল। একটানে ছিঁড়ে হাতে পেঁচিয়ে নিতে নিতে ভাইকে শাপশাপান্ত করতে লাগল বিড়বিড় করে। চোখে টলটল করতে থাকা পানি মুছে নিল একফাঁকে। আমার ভীষণ মায়া লাগল। আশেপাশের লোকগুলো তখন নিষ্ক্রান্ত হয়েছে দেখে আমি অযাচিতভাবে বললাম,,
– ছেলেটা তো বেশ বখে গেছে। শাসন করেন না?
মেয়েটি কড়াইয়ে নুডলস উলটপালট করতে করতে ক্ষীণ কণ্ঠে বলল,
– শাসন! আমি দুইটা দিলে আমারে চারটা দিয়ে হাওয়া হয় যায়। কোথায় কোথায় থাকে আল্লায় যানে। বাড়িঘরেও থাকে না। টেকার দরকার পড়লে এমনে আয়া হাঙ্গামা করে। আস্তা হারামযাদা। নইলে এতোবড় ভাই থাকতে আমার দোকানদারি করন লাগে?
আমি বুঝলাম,মাত্র ঘটে যাওয়া ঘটনার ক্ষোভে মেয়েটির ভেতরে থাকা কথাগুলো অনবরত অগ্নুৎপাতের মতো উৎক্ষিপ্ত হয়ে চলেছে। আমার কী যেন হলো আমি বোকার মতো জিজ্ঞেস করে বসলাম,
– আপনার বাবা-মা কিছু বলে না?
মেয়েটি একটু বিরক্ত হলো যেন। কড়াই থেকে নুডলসগুলো একটা বড় থালায় উপুড় করে ঢেলে চামচ দিয়ে তা সুবিন্যস্ত করল। তার ওপর নিপুণহস্তে ধনিয়াপাতা ছিটিয়ে দিল। এরপর একটা পলিথিন দিয়ে থালাটা ঢেকে সামনে সাজিয়ে রেখে শ্লেষের সুরে বলল,
– বাপ-মা নাই।
আমি স্তিমিত হাসলাম। এবার বুঝতে পারলাম ঘটনাটা। অনেকটা আমার মতো অবস্থা। পিতা-মাতা নেই। আত্মীয়স্বজন পরিত্যাগ করেছে। চাচারা জোতজমি দখল করেছে। এখন আমি উদ্বাস্তু হয়ে আছি এই শহরে। নিজের প্রচেষ্টায় কোনোমতে ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করে এখন নামেমাত্র চাকরি করছি। অবশ্য এতেই আমার হয়ে যায়। কোনো পিছুটান নেই বলে বাড়তি আয় নিয়ে আমার বিশেষ মাথাব্যথা নেই। কিন্তু আমাকে যারা উপেক্ষা করেছে তাদের শোধ তোলার জন্য হলেও জীবনে কিছু একটা করে দেখানোর তাড়নায় এখনো পড়াশোনা চালিয়ে যাচ্ছি। মেয়েটির জীবন বৃত্তান্ত আরো সবিস্তারে জানার জন্য কৌতুহল বোধ করলেও আজকের মতো ক্ষান্ত দিলাম৷ প্রথমদিন জানার জন্য এটুকুই যথেষ্ট। এমনিতেই মেয়েটি স্বল্পভাষী। আমার কৌতুহল যাতে উলঙ্গ হয়ে না পড়ে তা সম্পর্কে আমি সচেতন।
২.
পরবর্তী কয়েকটি মাস নিয়মিত না হলেও প্রায়শই যাওয়া হতো সেই জায়গায়। কখনো দুপুরে আর কখনো-বা বিকেলে। এরমধ্যে বেশিরভাগ দিন মরিয়মের সঙ্গে আমার বাক্যবিনিময়ও হয়নি। আমি কেবল দূর থেকে একজন সাধারণ মানুষের দৃষ্টিকোণ থেকে ওর সংগ্রামী জীবনটাকে দেখে অভিভূত হতাম। আমার নিজের পরিবারের জন্য কিছু করার সৌভাগ্য হয়ে উঠেনি বলেই বোধহয় ওকে দেখে তৃপ্তি পেতাম। বাবা-মায়ের একমাত্র সন্তান ছিলাম। আকস্মিক সড়ক দুর্ঘটনায় বাবা-মায়ের যুগপৎ মৃত্যুর পর সম্পত্তির লোভ আমার স্বজনদের কাছে আমাকে ব্রাত্য করে তোলে। সে এক দীর্ঘ ইতিহাস। আমি কেবল সেই ইতিহাসের আঁচটুকু ভবিষ্যতের পাথেয় হিসেবে নিজের মধ্যে পুষে রেখেছি সযত্নে। এর বেশি কিছু নয়।
মেয়েটির নাম মরিয়ম। ধীরে ধীরে মরিয়ম সম্পর্কে অনেককিছু জানতে পারলাম।আমার মতো তার জীবনেও রয়েছে বিয়োগান্তক যাতনা আর ;উপেক্ষা! এই শহরের কোনো এক নিম্নবর্গীয় উদ্বাস্তু সমাজে তার জন্ম এবং বেড়ে ওঠা। ফ্লাইওভারের ঠিক এই জায়গাটাতেই তার বাবা মতিউরের পান-সিগারেটের দোকান ছিল। ফ্লাস্কে ভরে রং চাও বিক্রি করতেন। দারিদ্র্যের সঙ্গে অহর্নিশ লড়াই করলেও আধুনিক দুনিয়ায় পড়াশোনার মর্মটা তিনি বুঝতেন। বুঝতেন বলেই কষ্টেসৃষ্টে পড়াতেন তিন ছেলেমেয়েকে। মরিয়ম যখন ক্লাস টেনে সে-বছরই আচমকা এক দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে তিনি মারা যান। অন্নসংস্থান বন্ধ হয়ে যায় পরিবারের৷ মরিয়ম মা’কে নিয়ে খোলাখুলি কিছু না বললেও তার চোখের ভাষা পড়ে বুঝা গেল মরিয়মের মায়ের চরিত্র বিশেষ সুবিধার ছিল না। আগে থেকেই তাঁর পরকীয়ার সম্পর্ক ছিল৷ স্বামী মারা যেতেই তিনি তিন ছেলেমেয়েকে ত্যাগ করে প্রেমিককে বিয়ে করেন। মরিয়মের বাবা মতিউরও বোধকরি স্ত্রীর এই অন্ধকার দিকটি সম্পর্কে ওয়াকিবহাল ছিলেন। মৃত্যুর আগে অত্যন্ত সংগোপনে তিনি অল্পকিছু জমানো অর্থ মরিয়মের হাতে তুলে দেন। সেই থেকেই শুরু। শুরুর পথটা অবশ্যই তার জন্য কুসুমাস্তীর্ণ ছিল না। কিন্তু শত প্রতিকূলতার মধ্যেও মরিয়ম আজ অর্থনৈতিকভাবে মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে। দাঁড়িয়েছে বটে,কিন্তু সে জানে, এখানে স্থিতিশীলতা নেই। মরিয়মের স্বপ্ন, এই ভ্রাম্যমাণত্বের একদিন অবসান ঘটবে আর কোথাও তার একটা স্থায়ী রেস্তোরাঁ হবে। উপরন্তু, তার মা খুব একটা ভালো নেই নতুন স্বামীর কাছে। ভালো থাকার কথাও নয়। মরিয়ম বিলক্ষণ জানতো,প্রতারণার পরিণতি কখনো সুখকর হয় না। তিনিও প্রায়শই মরিয়মের কাছে এসে নিজের অসহায়ত্ব তুলে ধরেন। নতুন স্বামী তাঁর খোঁজখবর নেয় না,মাতাল হলে মারধর করে প্রভৃতি অভিযোগ। মরিয়ম জন্মদাত্রীকে দুরদুর করে তাড়িয়ে দিতে পারে না ঠিক, কিন্তু কোমলতাও দেখায় না৷ পাহাড়ের মতো নিশ্চল-নিস্পন্দ থেকে নীরবে জানান দেয়,তার রাজ্যে প্রতারকের স্থান নেই।
মরিয়মের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো তার মেঝো ভাইটির অবাধ দৌরাত্ম্য। বাবার মৃত্যু, মায়ের অন্তর্ধান এবং সঙ্গদোষ তাকে বিপথগামী করে তুলেছে। শহরের কিশোরগ্যাংয়ের সঙ্গে জড়িয়ে নানাবিধ অপরাধ সংঘটিত হয় তার দ্বারা। এছাড়া, নেশার টাকার জন্য বোনের সঙ্গে দিনরাত হাঁকপাঁক তো আছেই। মরিয়ম কষ্টার্জিত টাকা না দিলেও ঘরের রন্ধ্রে রন্ধ্রে তল্লাশি চালিয়ে সে টাকা চুরি করে নিয়ে যায়,ঘরের জিনিসপত্র বিক্রি করে দেয়। এ নিয়ে দুই ভাইবোনেতে ব্যাপক হুজ্জত চলে। কদাচিত মরিয়ম শরীরের বিভিন্ন আঘাত নিয়ে ফিরে আসে। খুবই স্বাভাবিক; নিজ চোখে ছেলেটির যে রুদ্রমূর্তি আমি দেখেছি, কীভাবে যে মরিয়ম একে নিয়ে একছাদের নিচে বাস করে বুঝে আসে না। আমি দেখেই বুঝতে পারি, বিগত রাতে আরো একদফা সংঘর্ষ হয়ে গেছে। নিয়মিত সাক্ষাতের কারণে ততদিনে মরিয়ম আর আমাতে নিজেদের অগোচরেই অলিখিত একটা বোঝাপড়া হয়েছে। ও আমাকে ইসহাক ভাই বলে ডাকে। দেখলেই কুশল বিনিময় করে। আমি নাম ধরেই ডাকি। আমার উদ্বাস্তু হওয়ার ইতিহাসও সে মোটামুটি জানে,অন্তত যতটুকু আমি জানিয়েছি। একদিন আমি ইঞ্জিনিয়ার শুনে সে হাঁ হয়ে গিয়ে বলল, আপনে মজা লইতেছেন? এন্জিনিয়াররা কি এরকম বাইরের খাবার খায়? তারা তো বড় লোক।
আমি হেসে বলি, আমার মতো ছোট ইঞ্জিনিয়াররা খায়। যখন বড় ইঞ্জিনিয়ার হবো তখন নাহয় তোমার বড় রেস্তোরাঁয় খাব!
ওর চোখেমুখে স্বপ্নিল হাসি ফুটে ওঠে। আমি এই সুযোগে বলি,
– কিন্তু মরিয়ম। তোমার ভাইটার তো একটা গতি করতে হয়। নয়তো দেখবে ও তোমার স্বপ্নের পথে বাঁধা হয়ে দাঁড়াবে।
– কী করমু, ভাই তো! ফালায় তো দিতে পারি না।
– ফেলে দিতে তো বলছি না। রিহ্যাবে দিয়ে দাও। কত ছেলেমেয়ে ভালো হয়ে আসতেছে না রিহ্যাব থেকে?
মরিময় কপাল কুঁচকে চুপ করে থাকে৷ কী ভাবে কে বলবে!
মাসকয়েক পরের কথা। মেসের একচিলতে ব্যালকনিতে উদোম গায়ে বসে একের পর এক সিগ্রেট ছাই করছি। বিদ্যুৎ নেই, ভ্যাপসা গরম পড়েছে। একটু আগের বাইরের আলো ঝলমলে শহরটা হঠাৎ করে নিঝুম অন্ধকারের নিপতিত হয়েছে। পাশের ঘরে রুমমেইটরা মিলে হৈহল্লা করে তাস খেলছে। সাউন্ডবক্সে পুরনো দিনের হিন্দি গান বাজছে। ওদের সঙ্গে কখনোই আমার বনিবনা হয়নি। একেকটা শিক্ষিত হলেও তাদের চিন্তাচেতনার মধ্যে যে প্রচ্ছন্ন বন্যতা আমি দেখি তার সঙ্গে আমি ঠিক নিজেকে খাপ খাওয়াতে পারি না। এরজন্য ওরা আমাকে অহংকারী ভাবলেও করার কিছু নেই। রাত্রির নির্জনতাকে দীর্ণ কর তাদের হৈহল্লাকে ছাপিয়ে আমার মস্তিষ্কের জালজুড়ে ভাসছিল সম্প্রতি ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো। প্রথমটি ঘটে অফিসে। আমাদের কনসাল্টেন্ট অফিসে আমাকে কদাচিত যেতে হয় সাইটের কাজ সম্পর্কে সিনিয়র ইঞ্জিনিয়ারের সঙ্গে আলাপ করতে। অফিসটা ছিমছাম। কর্মচারীর সংখ্যা অল্প। কাজের খাতিরে অফিসের একজন নারী অপারেটরের সঙ্গে আমার প্রায়শই আলাপ হতো। নাম মাইশা। একই কলেজের জুনিয়র হওয়াতে আমাদের আলাপের পথটা আরো মসৃণ হয়েছিল। যাইহোক,সম্প্রতি হুয়াটঅ্যাপের একটি দীর্ঘ বার্তায় আমাকে সরাসরি বিবাহের প্রস্তাব দিয়ে বসে। সেই প্রস্তাবের বিপরীতে আমি বিভ্রান্ত এবং বিব্রত হয়ে চোরের মতো ঘাপটি মেরে বসে আছি। মেয়েটি সুন্দরী,নমনীয় এবং বোধকরি কিছুটা রক্ষণশীল। নিঃসন্দেহে, বর্তমান পাত্রীর বাজারে তাঁর দাম বেশ চড়া হবে। কিন্তু আমার মতো চালচুলোহীন একজন পুরুষ যে কি-না উদ্‌বর্তনের জন্য দিবানিশি ঘাঁড় গুঁজে কাজ করে চলেছে তার জন্য মাইশার মতো পাত্রী ফাঁ-সির কাষ্ঠের মতোই বিপজ্জনক। কিন্তু মাইশার প্রস্তাব যে আমার মতো জিরজিরে প্রাণীর জন্য লোভনীয় তা বলার অপেক্ষা রাখে না। কিন্তু! মনের গহীনে কোথাও যেন একটা অমীমাংসিত রহস্য রয়ে গেছে যার কারণে আমার বিলোল মন মাইশার প্রস্তাবে একবাক্যে রাজি হবার দুঃসাহস দেখাচ্ছে না।
দ্বিতীয় যে ব্যাপারটি হলো,মরিয়ম। অবশ্যসম্ভাবী একটি বিপদ অবশেষে মরিয়মের ঘাড়ে চেপেছে। একদিন মাঝরাতে একটি অপরিচিত নাম্বার থেকে ফোন পেয়ে রিসিভ করলাম। ওপাশ থেকে ভেসে এলো নারীকণ্ঠ। চিনতে পেরে আমি বললাম,
– মরিয়ম তুমি এতো রাতে? আমার নাম্বার কোথায় পেলে?
মরিয়ম সে জবাব না দিয়ে হড়বড়িয়ে যা বলল তার সারাংশ হলো, তার ভাই মাজেদ মাদক চোরাকারবারি কাণ্ডে ধরা পড়েছে, একটু আগে পুলিশ তাকে ধরে বাসা থেকে উঠিয়ে নিয়ে গেছে। আমার সঙ্গে তার দেখা করা দরকার। সভ্য সমাজে তাকে সাহায্য করার মতো কেউ নেই।
আমি মহাফাঁপড়ে পড়ে তার সঙ্গে থানায় গেলাম। মরিয়ম ইতোমধ্যেই থানার দারোগার বিরক্তির কারণ হয়েছে বোধহয়। আমি গিয়ে কথা বলার আগ্রহ প্রকাশ করতেই দারোগা আপত্তিকর ইঙ্গিতে মরিয়মকে বলল,
– এতক্ষণ জ্বালায়া খায়েশ মিটেনাই,এখন আবার নাগর নিয়া আসছস!
এতক্ষণ মরিয়মের শরীরী ও মুখের ভাষায় ঋজুতা এবং আনুগত্য বিদ্যমান থাকলেও এইকথায় সে ভয়ংকরভাবে রেগে গিয়ে চোটপাট শুরু করল।
আমি কোনোমতে তার মুখ চেপে ধরে দারোগা সাহেবকে স্যরি বলে সেখান থেকে প্রস্থান করলাম।
থানার বাইরের টং দোকানে বসে ধোঁয়া-ওঠা চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে বললাম,
– এমন চিল্লাফাল্লা করে ফায়দা হবে না মরিয়ম। তোমার ভাই জটিল মামলায় ফেঁসেছে মনে হচ্ছে। ও এখনো কিশোর, ওকে বিশেষ কষ্ট দিবে না যতটুকু জানি। তবে ভালোই হলো, বছর কয়েক ভেতরে থাকলে ওর রিহ্যাবটা হয়ে যাবে।
আমার থেকে দুইহাত দুরত্বে বসে ছিল মরিয়ম। ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল সে,
– আপনে পাষাণের মতোন কথা কইতেছেন।
– আমি পাষাণই।
– আপনি কিছু একটা করেন।
আমি একটা নিঃশাস ফেলে বললাম,
– আচ্ছা দেখি কী করতে পারি। আমার একটা ক্লাসমেট আছে। ওর চাচা শহরের নামকরা নেতা। চিন্তা করিও না।
মরিয়ম তবুও কাঁদছে। রাস্তার ধারের ফ্লুরোসেন্ট বাতির মায়াবি আলো ওর কপোল-প্লাবিত অশ্রু কালো মুখাবয়বের ওপর পড়ে চিকচিক করছে। আমি নিমেষহারা দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলাম ওর দিকে। ভালোবাসার মানুষের জন্য কান্নাও বুঝি এমন অলৌকিক সুন্দর হয়! আমি শেষ কবে কারো জন্য কেঁদেছি এমন আকুল হয়ে? আমার অপলক দৃষ্টির সামনে মরিয়ম বিব্রত হয়ে পড়ল। বুক চিরে বেরিয়ে এলো দীর্ঘশ্বাস। বললাম,
– ভাবছি মরিয়ম, কারো জন্য কাঁদতে পারাও সৌভাগ্যের।
মরিয়ম আমার কথার গভীরতা হয়তো ধরতে পারল না কিন্তু কণ্ঠের আদ্রতা ঠিকই তাকে স্পর্শ করল। নরম স্বরে সে বলল,
– রাতে খাইছিলেন ইসহাক ভাই?
আমার মনে পড়ল, আমি না খেয়েই শুয়ে পড়েছিলাম। বুয়া আসেনি। বললাম সেটা। শুনে বলল,
– চলেন আমার ঘরে খাবেন। এইতো রাস্তার মোড় পার হইলেই আমার বাসা।
এরপর আমার কোনো আপত্তিই ধোপে টিকল না। এমন সপ্রতিভ মরিয়মকে আগে কখনো দেখা যায়নি। আমার প্রতিশ্রুতির জন্যই বোধহয়! বড় রাস্তা থেকে ছোট ছোট গলিঘুঁজি পেরিয়ে পৌঁছালাম ওর বাসায়। দুই কক্ষবিশিষ্ট ছিমছাম, গুছানো ঘর মরিয়মের। কেমন আঁশটে একটা গন্ধ আশেপাশে। তবুও মনে হলো,এখানে মায়া আছে,মমতা আছে। ডেস্কির পাতিলে হাত দিয়ে মরিয়ম বলল,
– ভাত বরফ হয়ে গেছে। একটু বসেন। ইশটোভে বসাইলে দেরি লাগবো না।
চলবে…

গল্প পোকা
গল্প পোকাhttps://golpopoka.com
গল্পপোকা ডট কম -এ আপনাকে স্বাগতম......
RELATED ARTICLES

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে

- Advertisment -

Most Popular

Recent Comments

Md masrur Hasan mahi على অবুঝ_বউ পার্ট: ৫
আমিনুল ইসলাম على প্রয়োজন পর্ব: ৩০ ( অন্তিম)
সাজিবুল ইসলাম على ধর্ষিতাবউ২ ৯ তথা শেষ পর্ব
শাহিদুল ইসলাম على জীবন সঙ্গী ১ম পার্ট
শাহিদুল ইসলাম على জীবন সঙ্গী ১ম পার্ট
Nita Sarkar على স্বপ্নীল ৬৮
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على রহস্য শেষ_পর্ব
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على অলক্ষ্যে তুমি পর্ব-০৬ এবং শেষ পর্ব
Nazmun Nahar Akhi على Psycho_is_back? part_7
Nazmun Nahar Akhi على Dangerous_Villian_Lover part 2
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على জানালার ওপারে পর্ব-১৭ এবং শেষ পর্ব
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على লীলা বোর্ডিং ১২১৫ পর্ব-১১ এবং শেষ পর্ব
মিজানুর রহমান রাহুল على সেই তুমি পর্ব-০১
@feelings على প্রহেলিকা
Anamika Basu على সে পর্ব-১২
Anamika Basu على সে পর্ব-১২
Nusrat jahan على coffee & vanilla Part-10
Pallabi Roy على স্বপ্নীল ৬৮
M.D Mahabub على The_Villain_Lover Part_2
Labani sarkar على Dangerous_Villain_Lover part 23
MD Akas Apc على বিবেক
Tanisha Ahmed على Devil love part-18 
Aius Barmon shorob على নারীর দেহকে নয়
Chandan roy على স্বপ্নীল ৬৮
Chandan roy على স্বপ্নীল ৬৮
Riya Biswas على তুমি রবে ৬০
Priya Banerjee على devil love married life last part
Riya Biswas على তুমি রবে ৬০
Riya Biswas على তুমি রবে ৫২
Mohammad Adib على তুমি রবে ৬০
Avni Ayesha على তুমি রবে ২৮
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
সুমিত على তুমি রবে ২৮
TANJIBA ZENIFAR على তুমি রবে ৫০
TANJIBA ZENIFAR على তুমি রবে ৫০
Samiah Begum على তুমি রবে ৫১
biddut das rocky على নর নারী
গল্প পোকা على নষ্ট গলি শেষ পর্ব
Md Jobayer Hossain Shohag على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
গল্প পোকা على দুই অলসের সংসার
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤৪২.
A.J.S Rakib على মন ফড়িং ❤৪২.
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
Samiya noor على গল্পঃ ভয়
Sadikul على গল্পঃ ভয়
Samia Islam على গল্পঃ ভয়
শূন্য মায়া على মন ফড়িং ❤ ৪০.
Sutapa biswas على মন ফড়িং ❤৩৯.
Foysal Mahmud على My_Mafia_Boss_Husband Part: 16
sutapa biswas على মন ফড়িং ❤ ৩৮.
sutapa biswas على মন ফড়িং ❤ ৩৭
Foysal Mahmud على My_Mafia_Boss_Husband Part: 16
Siyam على বিবেক
Sudipto Guchhait على My_Mafia_Boss পর্ব-৯
saptami karmakar على devil love married life last part
saptami karmakar على devil love married life last part
মায়া على মন ফড়িং ৩০.
মায়া على মন ফড়িং ৩০.
মায়া على মন ফড়িং ২৬.
Shreyashi Dutta على  বিয়ে part 1
Sandipan Biswas على  বিয়ে part 1
Paramita Bhattacharyya على অনুরাগ শেষ পর্ব
জামিয়া পারভীন তানি على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
মায়া على মন ফড়িং  ২২
সুরিয়া মিম على খেলাঘর /পর্ব-৪২
গল্প পোকা على মন ফড়িং ২১
গল্প পোকা على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
Sahin ssb على মন ফড়িং ২১
মায়া على মন ফড়িং ২১
মায়া على মন ফড়িং ❤ ২০.
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤ ২০.
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৮. 
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৭.
Jannatul Ferdous على খেলাঘর পর্ব-৩৫
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤ ১৬. 
গল্প পোকা على ফাল্গুনের_ফুল last_part_8
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৬. 
গল্প পোকা على ছাত্রী যখন বউ পাঠঃ ১
গল্প পোকা على বাজির প্রেম পাঠঃ ১
Foujia Khanom Parsha على মা… ?
HM Ashraful Islam على অবুঝ_বউ পার্ট: ৮
HM Ashraful Islam على অবুঝ_বউ পার্ট: ৫
Ibna Al Wadud Shovon على স্বার্থ