Friday, June 5, 2026







বাড়ি"ধারাবাহিক গল্প"নিভৃতে তেজস্বিনীনিভৃতে তেজস্বিনী পর্ব-২৩+২৪

নিভৃতে তেজস্বিনী পর্ব-২৩+২৪

#নিভৃতে_তেজস্বিনী
#পর্ব_২৩
#লেখায়_নামিরা_নূর_নিদ্রা

“ইভান সিরাতকে কোথাও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।”

চোখের ঘুম নিমিষেই হারিয়ে যায় ইভানের চোখ থেকে। ভোর ছয়টা বেজে সাইত্রিশ মিনিটে এমন কোনো খবর শোনার জন্য সে একদমই তৈরি ছিল না। কণ্ঠে উত্তেজনা রেখে ইভান প্রশ্ন করে,

“কী বলছিস এসব তুই? সিরাতকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না মানে কী? আমাকে সবকিছু বিস্তারিত বল তামান্না।”

“গতকাল সন্ধ্যায় সিরাত একটা কাজে বাইরে যায়। ওর রাত নয়টার মধ্যেই ফিরে আসার কথা ছিল। কিন্তু এখনো বাড়ি ফেরেনি সিরাত। সিরাতের আম্মু কাঁদতে কাঁদতে অস্থির হয়ে যাচ্ছে। এদিকে নাবিহাকে রাত থেকে হাজার রকমের চেষ্টা করেও কেউ কিচ্ছু খাওয়াতে পারেনি। আমি এই খবর পেয়েই তারিনকে নিয়ে সিরাতদের বাড়িতে এসেছি। ভাই, তুই তো এখানকার থানার এসআই। তুই কিছু একটা কর। যেভাবেই হোক সিরাতকে খুঁজে বের কর।”

“আচ্ছা তুই শান্ত হ। আমি আধ ঘন্টার মধ্যে আসছি।”

ফোন রেখে কোনোরকমে ফ্রেশ হয়ে হন্তদন্ত হয়ে বেরিয়ে পড়ে ইভান। তার মা*থা কাজ করছে না। রাস্তায় বের হয়ে একটা গাড়িও খুঁজে পায় না সে। দিশা না পেয়ে ইভান দ্রুত পা চালিয়, এক প্রকার দৌড়ে মিনিট কুড়ির মাঝেই সিরাতদের বাড়িতে চলে আসে। সদর দরজা দিয়ে ভেতরে ঢোকার সময় ছোট্ট নাবিহার কান্নার আওয়াজ শুনে থেমে যায় ইভান। কিছু একটা ভেবে দ্রুত কল করে অভিকে। দুইবার কল দেওয়ার পরেও অভিকে না পেয়ে নাবিলকে কল দেয়। কল রিসিভ করে ঘুম জড়ানোর কণ্ঠে নাবিল বলে,

“কি ভাই এত সকালে কেউ কল দেয়? কী হয়েছে বল?”

“রাখ তোর ঘুম। এদিকে সিরাতকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। আর তুই এখনো ঘুমাচ্ছিস? তাড়াতাড়ি ওদের বাড়িতে আয় তুই।”

“সিরাতকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না মানে? এই সকাল বেলা তুই আমার সাথে ফাজলামি করছিস ভাই?”

“দিব এক থা*প্পড়। তোর মনে হয় আমি এত গুরুত্বপূর্ণ একটা বিষয় নিয়ে মজা করছি? এত কথা বলার সময় নাই। তুই তাড়াতাড়ি এখানে আয়। রাখছি আমি।”

“আরে শোন তো আমার কথা!”

নাবিলের আর কোনো কথা না শুনেই কল কেটে দেয় ইভান। ভেতরে গিয়ে তারিনের কাছ থেকে নাবিহাকে কোলে নিয়ে বলে,

“কী হয়েছে আম্মু? তুমি কাঁদছ কেন?”

নাবিহা কাঁদতে কাঁদতে উত্তর দেয়,

“আমি মাম্মার কাছে যাব।”

“হ্যা যাবে তো সোনা। মাম্মা খুব তাড়াতাড়ি ফিরে আসবে। এখন তুমি কিছু খেয়ে নাও। নয়তো মাম্মা বাড়ি ফিরে এসব শুনলে কিন্তু খুব কষ্ট পাবে।”

“না, আমি খাব না। আমাকে মাম্মার কাছে নিয়ে চলো।”

“আচ্ছা আমি তোমাকে প্রমিস করছি, আমি খুব দ্রুত তোমার মাম্মাকে তোমার কাছে নিয়ে আসব।”

“সত্যি?”

“তিন সত্যি। কিন্তু তার আগে তোমাকে খেতে হবে। তুমি আমার কথা না শুনলে কিন্তু আমি তোমার মাম্মাকে এনে দিব না।”

ইভানের কথায় নাবিহা অল্প পরিমাণে খাবার খেয়ে নেয়। খুব বেশি খায় না। তবে যেটুকু খেয়েছে এই মুহূর্তে এটাই যথেষ্ট ভেবে আর কেউ বাচ্চাকে জোর করে না খাওয়ার জন্য।

ইতি ইসলাম ইভানের কাছে এসে ভেজা গলায় বলে,

“বাবা আমার মেয়েকে আমার কাছে এনে দাও তুমি। মেয়েটা আমার সারারাত বাড়ি ফেরেনি। কে জানে কি বিপদ হলো মেয়েটার। ওর বাবা সকাল থেকে খোঁজ নিচ্ছে। চেনাজানা সবাইকে কল দেওয়া শেষ। কেউ জানে না ওর খবর। শাহেদ চিন্তায় চিন্তায় অসুস্থ হয়ে পড়েছে। আমি একা হাতে কত দিক সামলাব বলো?”

“আন্টি আন্টি আপনি একটু শান্ত হন। আমার উপর বিশ্বাস রাখুন। আমি আপনাকে কথা দিচ্ছি, যেভাবেই হোক সিরাতকে সুস্থ অবস্থায় বাড়ি ফিরিয়ে আনব আমি।”

“শুধু তুই কেন? আমরা সবাই মিলে আমাদের বন্ধুকে খুঁজে বের করব। আমরা কিচ্ছু হতে দিব না ওর।”

নাবিলকে হাঁপাতে হাঁপাতে বাড়ির ভেতর ঢুকতে দেখে ইভান সেদিকে এগিয়ে যায়। পেছন পেছন নকশি আর উর্মিও চলে আসে। ইভান বাকিদের দিকে তাকিয়ে বলে,

“তোরা এত সকালে আসতে গেলি কেন?”

“এটা কোনো প্রশ্ন হলো ভাই? আমাদের বন্ধু নিখোঁজ। আর আমরা বাড়িতে লেপ মুড়ি দিয়ে ঘুমাব হ্যা?”

উর্মির কথায় ইভান বলে,

“আচ্ছা এসে ভালো করেছিস। এখন ভেতরে আয়। তোদের সাথে আলোচনা করব আমি কিছু বিষয় নিয়ে।”

“একটু অপেক্ষা কর। অথৈ রাস্তায় আছে। ওও আসুক।”

নাবিলের কথায় ইভান সরু চোখে তাকিয়ে প্রশ্ন করে,

“সবাইকে খবর দিয়েছিস তুই? তা অভি আর মাওয়াকে জানাসনি?”

“অভিকে কলে পাওয়া যাচ্ছে না। আর মাওয়ার ফোন বন্ধ।”

“এই দুইটার আবার কী হলো!”

“ওদের সাথে পরে যোগাযোগ করে নিচ্ছি। আগে সিরাতের খোঁজ নিতে হবে।”

এর মাঝেই অথৈ চলে আসে। ইভান সবাইকে নিয়ে বসে বলে,

“আন্টি সিরাত সন্ধ্যায় কী কাজে বেরিয়েছিল?”

“আমাকে বিশেষ কিছু বলেনি৷ একটা ফোন কল এলো। দুই মিনিটের মতো কথা বলে আমাকে বলল, আম্মু তুমি নাবিহার খেয়াল রেখো। আমি একটু বের হচ্ছি। ঘন্টা দুয়েকের মাঝে ফিরে আসব।”

“আপনি কোনো প্রশ্ন করেননি যে সিরাত কোথায় যাচ্ছে?”

“জিজ্ঞেস করেছিলাম। শুধু বলল, খুব জরুরি একটা কাজে বের হচ্ছি। তোমাকে ফিরে এসে সব বলব।”

“তারপর কী হলো?”

“ওর তো নয়টার মধ্যে ফিরে আসার কথা ছিল। কিন্তু এগারোটা বাজার পরেও যখন ফিরল না তখন আমার চিন্তা হচ্ছিল। আমি একের পর এক কল দিয়েই যাচ্ছিলাম। কল যাচ্ছিল ঠিকই, কিন্তু কেউ রিসিভ করেনি। অস্থিরতা নিয়েই বারোটা পর্যন্ত অপেক্ষা করলাম। কিন্তু এতক্ষণ পরেও যখন ফিরল না তখন ওর বাবা আশেপাশে গিয়ে খোঁজ নিল। কিন্তু সেখানেও আশানুরূপ কোনো ফল আমরা পাইনি।”

তারিন নাবিহাকে ফিডার খাওয়াতে খাওয়াতে বলে,

“ওকে কল কে দিয়েছিল? আমাদের আগে এটা জানতে হবে।”

“কোনোভাবে কলটা ওকে মাহতাব দেয়নি তো?”

তামান্নার কথায় সবার মনে অজানা এক ভয় বাসা বাঁধে। নকশি আতঙ্কিত হয়ে বলে,

“মাহতাবের সাথে সিরাতের এভাবে দেখা করতে যাওয়ার কারণ কী হতে পারে? তাছাড়া যদি মাহতাবের সাথেই দেখা করতে গিয়ে সিরাত নিখোঁজ হয় তাহলে তোরা ভাবতে পারছিস এরপর কী হবে?”

“শুধু ভাবতে পারছি না, বুঝতেও পারছি। মাহতাব সিরাতের উপর অনেক ক্ষেপে আছে। সিরাত ওর সাথে যা যা করেছে তারপর তো রেগে যাওয়া স্বাভাবিক। আর রেগে গিয়ে যদি ওই ছেলে সিরাতের কোনো ক্ষতি করতে চায় তাহলেও আমি খুব একটা অবাক হব না। কারণ এদের মতো ছেলেদের পক্ষে সবকিছুই সম্ভব।”

ইভানের কথায় সবার গলা শুকিয়ে আসে ভয়ে। তাদের প্রাণের চেয়েও প্রিয় বন্ধুটার বড়ো কোনো ক্ষতি হয়ে যায়নি তো? এসব ভেবেই সবার শ্বাস নেওয়ার গতি ভারি হয়ে আসে।

অন্ধকার এক ঘরের মধ্যে চেয়ারের সাথে খুব শক্ত করে হাত, পা বেঁধে রেখেছে সিরাতের। ধীরে ধীরে চোখ মেলে তাকিয়ে হাতে ভীষণ ব্যথা অনুভব করে মৃদু আওয়াজ করে ওঠে সিরাত। মা*থাটা ভীষণ ব্যথা করছে তার। গলা শুকিয়ে এসেছে। ধীর কণ্ঠে সে বলে,

“কেউ আছেন এখানে? আমাকে একটু পানি দিন। গলা শুকিয়ে এসেছে আমার।”

প্রথমে কয়েক বার ধীরে বললেও কেউ আসে না। তাই বাধ্য হয়ে যথাসম্ভব চিৎকার করে সিরাত বলে,

“আমাকে এভাবে বেঁধে রাখার মানে কী? কেউ আছেন এখানে? সামনে আসুন আমার।”

কথাটা শোনার সাথে সাথে দরজা খুলে ভেতরে প্রবেশ করে একজন ব্যক্তি। অন্ধকারের মাঝে তার চেহারা ঠিক স্পষ্ট দেখতে পায় না সিরাত। খানিক্ষণ পর ব্যক্তিটি ঘরের আলো জ্বালালে সিরাত চমকে ওঠে। তার কণ্ঠস্বরে আপনাআপনি ভেসে আসে একজনের নাম।

“তুরাগ!”

সিরাতের মুখে নিজের নাম শুনে মুচকি হেসে তুরাগ বলে,

“বাহ্! এতদিনেও আমাকে ভুলতে পারোনি তাহলে। মাওয়ার সাথে সাথে তুমিও আবার আমার প্রেমে পড়ে যাওনি তো?”

“মুখ সামলে কথা বলো। তোমার মতো অত্যন্ত নিকৃষ্ট একজনের প্রেমে পড়ার মতো নোংরা মানসিকতা আমার নয়। কেন আটকে রেখেছ আমাকে? এতদিন পর ফিরে এসে আমার কাছে কী চাও তুমি?”

“আরে কুল কুল। সব সময় এত রেগে গেলে চলে নাকি হ্যা?”

সিরাতের গলা একেবারে শুকিয়ে যাওয়ায় সিরাত ঠিকমতো কথা বলতে পারছে না। তুরাগের দিকে তাকিয়ে বলে,

“আমাকে একটু পানি দাও।”

“পানি খাবে তুমি? দাঁড়াও, আনছি।”

ঘরের এক কোণ থেকে এক বোতল পানি এনে সিরাতের সামনে ধরে তুরাগ।

“তোমার হাত তো বাঁধা। কীভাবে পানি খাবে তুমি? আমিই খাইয়ে দেই কেমন?”

কথাটা বলে বোতলের মুখ খুলে সিরাতের মুখের সামনে বোতল নিয়ে যায় তুরাগ। সিরাত পানি খাওয়ার জন্য মুখ খুললে তুরাগ ওর চোখের সামনে বোতলের সবটুকু পানি মেঝের উপর ফেলে দেয়। সিরাত হতভম্ব চোখে তুরাগের দিকে তাকালে সে ভ্রূ নাচিয়ে বলে,

“এত কষ্ট করে তোমাকে এখানে ধরে এনেছি কি আদর, আপ্যায়ন করার জন্য? আমি তো তোমার কষ্ট দেখতে চাই সিরাত। তুমি তিলে তিলে নিঃশেষ হয়ে যাবে। আর সেটা দেখে আমি মানসিক শান্তি পাব। হাহাহাহাহ!”

তুরাগের এই হাসি সিরাতের কাছে অসহনীয় লাগে। একরাশ বিরক্তি আর রাগ নিয়ে চোখ বন্ধ করে ফেলে সে।

চলবে??

#নিভৃতে_তেজস্বিনী
#পর্ব_২৪
#লেখায়_নামিরা_নূর_নিদ্রা

টানা ছত্রিশ ঘন্টা একটা অন্ধকারাচ্ছন্ন ঘরে বন্দী থেকে সিরাত নিস্তেজ হয়ে পড়েছে। তার দেহে আর এক ফোঁটা শক্তি নেই নিজ পায়ে উঠে দাঁড়ানোর মতো। এতগুলো ঘন্টায় এক ফোঁটা পানি সে পায়নি পান করার জন্য। তার তৃষ্ণার্ত চোখগুলো এক ফোঁটা পানির আশায় এখনো বন্ধ হয়নি। বুকের ভেতর হাহাকার শুরু হয়েছে কেবল একটুখানি পানি পান করার জন্য। চক্ষুদ্বয় যেন এবার তাকিয়ে থাকার ক্ষমতাও হারিয়ে ফেলছে। ধীরে ধীরে সিরাতের নিস্তেজ শরীরটা নুইয়ে পড়ে। যেন এক লজ্জাবতী গাছ লজ্জায় নুইয়ে পড়েছে। এতটা সাহসী এবং বুদ্ধিমতী হওয়ার পরেও যখন কারোর কাছে বন্দী হয়ে থাকতে হয় তখন তা নিজের কাছে লজ্জারই বটে!

ঘরের দরজা ঠেলে এক বলিষ্ঠ যুবক প্রবেশ করে ঘরে। সে সাথে করে একরাশ আলো নিয়ে এসেছে। কিন্তু এই আলো যে ক্ষণস্থায়ী। যে নিজেই আঁধার, তার দ্বারা কি কারো জীবন আলোকিত হতে পারে? এ যে অসম্ভব!

হাতে একটা পানির বোতল নিয়ে এক পা, দুই পা করে আগন্তুক এগিয়ে যায় সিরাতের দিকে। এক বোতল পানির সম্পূর্ণটা সিরাতের চোখেমুখে ছুড়ে দেয় সে। আচমকা পানির ঝাপটায় চমকে ওঠে সিরাত। তার নিস্তেজ শরীরটা যেন আরো বেশি করে নিস্তেজ হয়ে পড়ছে। নিভু নিভু চোখে সামনে তাকিয়ে সিরাত অবাক হয় না। অথচ এখন তার ভীষণভাবে চমকানোর কথা!

কণ্ঠস্বর থেকে আওয়াজ বের হতে না চাইলেও সিরাত নিজের উপর জোর দিয়ে হেসে বলে,

“আর কত নিচে নামবে তুমি? যাকে ভালোবেসে একদিন বাহুডোরে আগলে নিয়েছিলে আজ তাকেই নিজ হাতে মা*রতে চাইছ? কী আমার অপরাধ বলতে পারো তুমি? অন্যায় করলে তুমি। অথচ শাস্তি পেতে হচ্ছে আমাকে!”

সিরাতের কথায় কর্ণপাত না করে মাহতাব পাশ থেকে একটা চেয়ার নিয়ে তার মুখোমুখি বসে পুরো মুখে হাত বুলিয়ে বলে,

“আমার সুন্দরী বউটার চেহারার এ কি বেহাল দশা! চোখের নিচে কালচে দাগ, ঠোঁট জোড়া শুকিয়ে র*ক্ত জমেছে। চেহারার উজ্জ্বলতা হারিয়ে এখন কেবলই মলিনতার ছাপ স্পষ্ট। কোথায় গেল তোমার সৌন্দর্য? কোথায় গেল তোমার তেজস্বী রূপ? নিভৃতে তেজস্বিনী আজ হেরে গেল তবে?”

সিরাত তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে বলে,

“নিভৃতে তেজস্বিনী আজ হেরে গিয়েছে কঠিন বাস্তবতার মঞ্চে!”

“হাহ্! তেজস্বিনী রূপ সবখানে মানায় না সিরাত। নিজের স্বামীর সাথে তুমি যে অন্যায় করেছ তার শাস্তি তো তোমাকে পেতেই হবে জান। মনে আছে? বিয়ের পর প্রথম ছ’মাস আমরা চুটিয়ে প্রেম করেছি। কত-শত বার আমি তোমাকে জান বলে ডেকেছি। আমার স্পর্শে তুমি লজ্জাবতী লতার মতো নুইয়ে পড়েছ আমার বুকে। আমি তো সেই লাজুকলতার প্রেমে পড়েছিলাম। তোমার এই তেজস্বী রূপ আমার মোটেই পছন্দ হয়নি সিরাত। নারীদের হতে হয় তুলার মতো কোমল। কিন্তু তুমি হতে চেয়েছ সূর্যের মতো প্রখর। কী দরকার ছিল এসবের? এত বেশি সাহসী না হলে আজ তুমি বেঁচে যেতে। আর পাঁচটা মেয়ের মতো সংসারী হয়ে স্বামীর সাথে সুখে সংসার করতে পারতে।”

মাহতাবের কথাগুলো যেন সিরাতের নিস্তেজ শরীরে আ*গুন ধরিয়ে দেয়। দাঁতে দাঁত চেপে হাতের মুঠ শক্ত করে সিরাত জবাব দেয়,

“মেয়েরা তুলার মতো কোমল হলে তোমাদের মতো ছেলেরা সহজেই তাদের ছিঁড়ে ছিঁড়ে খে*তে পারবে বলে এমন মেয়ে ভালো তাই না? নিজেদের রক্ষা করার জন্য হলেও প্রত্যেকটা মেয়ের তেজস্বিনী হওয়া উচিত। নয়তো তোমাদের মতো কাপুরুষদের শাস্তি দেবে কীভাবে?”

“কী লাভ হলো এত তেজস্বিনী হয়ে? সেই তো আজ তুমি আমার হাতের মুঠোয় বন্দী।”

“সেদিন যদি তুমি কলে আমার মেয়েকে নিয়ে বাজে কথাগুলো না বলতে তাহলে আমি কখনোই তোমার মুখ দেখতাম না। আমি তো মা৷ আমার মেয়েকে কেউ তুলে নিয়ে গিয়ে পাচার করে দিতে চাইবে, আর সেটা জেনেও আমি চুপ করে থাকব? তুমি খুব ভালো করেই জানতে যে এমন কথা শুনলে আমি হিতাহিতজ্ঞানশূন্য হয়ে তোমার সাথে দেখা করতে যাব। আর তাই এই নোং*রা চাল চাললে তুমি। তুমি কেমন বাবা বলো তো? নিজের স্বার্থসিদ্ধি করার জন্য নিজের আপন মেয়েকেও ব্যবহার করলে তুমি। ছিঃ!”

“আরে তোমার ছিঃ তোমার কাছেই রাখো। তুমি তোমার মেয়ের কথা ভেবেছ? ভাবলে তার বাবার সাথে এতটা অন্যায় করতে পারতে না। আজ তোমার জন্য আমি পথের ভিখারি হয়ে গিয়েছি। এরপরেও তোমাকে ছেড়ে দেওয়া যায়?”

“তো কী করতে চাও আমার সাথে?”

“তোমাকে তিলে তিলে কষ্ট দিয়ে মা*রতে চাই। আমার সুখের জীবন তো শেষ। সুতরাং তোমার সুখের জীবনও শেষ! একটা কথা জানো তো? টিট ফর ট্যাট।”

হাত, পা, ঘাড়, মা*থা, সর্বোপরি পুরো শরীরের ব্যথায় কাবু হয়ে আসে সিরাত। তার চোখ থেকে নিরবে অশ্রু ঝরে। বহুকষ্টে সিরাত মাহতাবকে বলে,

“আমাকে একটু পানি দেবে প্লিজ?”

“মৃ*ত্যুর আগে তুমি এক ফোঁটা পানিও পাবে না। কেন জানো? কারণ তোমার জন্য আমাকে তিনটা রাত না খেয়ে থাকতে হয়েছে। পেটের ক্ষুধার জ্বালায় আমি ছটফট করেছি প্রতিনিয়ত। কিন্তু পকেটে একটা টাকা ছিল না আমার। রাজপ্রাসাদে বড়ো হওয়া ছেলেটার যখন এমন অবস্থা হয় তখন তার অন্যায়কারীকে তো কঠিন শাস্তি দিতেই হবে।”

সিরাত বুঝে যায় এদের কাছে এক ফোঁটা পানি চেয়েও কোনো লাভ নেই। সে ভেবে পায় না এই বন্দী জীবন থেকে কীভাবে ছাড়া পাবে। কে বাঁচাবে তাকে? আচ্ছা, তার ছোট্ট মেয়েটা মা’কে ছাড়া কেমন আছে? ভালো আছে তো? তার বয়স্ক মা-বাবা তার চিন্তায় অসুস্থ হয়ে যায়নি তো? এমন হাজারো কথা ভেবে ঠোঁট ভেঙে কান্নায় ভেঙে পড়ে সিরাত।

সম্পূর্ণ একটা দিন বন্ধুরা সবাই মিলে শত চেষ্টা করেও সিরাতের কোনো খোঁজ পায়নি৷ হতাশ হয়ে প্রত্যেকে মা*থা চেপে ধরে বসে রয় এক স্থানে।

কোথা থেকে যেন অভি আর মাওয়া একসাথে এসে হাজির হয় বাকিদের সামনে। তাদের এমন হন্তদন্ত হয়ে আসতে দেখে উর্মি জিজ্ঞেস করে,

“কোথায় ছিলি তোরা? আর এখন আমাদের খোঁজই বা পেলি কোথায়?”

মাওয়া অস্থির চিত্তে প্রশ্ন করে,

“আমাদের কথা বাদ দে। তোদের খবর আমাদের তারিন দিয়েছে। তারিন তো নাবিহার সাথে আছে এখন। আমাদের আগে বল, সিরাতের কী হয়েছে? ছত্রিশ ঘন্টা পেরিয়ে গেল। এখনো মেয়েটা নিখোঁজ!”

“আমরা তো আমাদের দিক থেকে সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি। ইভান সিরাতের ফোন ট্র্যাক করারও চেষ্টা করেছে। কিন্তু ফোন বন্ধ। আশেপাশের সবগুলো সিসিটিভি ফুটেজ চেক করা শেষ। কোথাও কোনো ক্লু পাইনি আমরা। মাহতাবের খোঁজও করেছি। কিন্তু ওই ছেলের কোনো খবর এখনো পাইনি আমরা।”

তামান্নার কথায় ধপ করে মাটিতে বসে পড়ে মাওয়া। দীর্ঘক্ষণ নিরব থাকার পর অভি বলে ওঠে,

“আচ্ছা সিরাতের ফোনের লাস্ট লোকেশন কোথায়?”

ইভান চটজলদি উত্তর দেয়,

“নিউ ফরেস্ট স্টেশন নামের একটা একুরিয়ামের দোকানের সামনে ওর লাস্ট লোকেশন দেখাচ্ছে।”

“ওখানকার সিসিটিভি ফুটেজ দেখেছিস তোরা?”

“হ্যা, দেখেছি। ওই জায়গা অবধি সিরাত পৌঁছাতেই পারেনি। ওই দোকানের পাশে একটা ডাস্টবিন আছে। সেখানেই ওর ফোন পাওয়া গিয়েছে।”

নকশির কথায় অভি কিছু একটা ভেবে বলে,

“ওই জায়গা থেকে কিছুটা পেছন দিকে গেলেই একটা বুকশপ আছে। আর সিরাত কিন্তু বই পড়তে অনেক ভালোবাসে৷ এমনও তো হতে পারে যে ওখানেই সিরাত মাহতাবের সাথে দেখা করেছে। যেহেতু বুকশপটা মেইন রোড থেকে কিছুটা ভেতরে তাই ওখানকার সিসিটিভি ফুটেজ হয়তো তোরা দেখিসনি।”

“আরেহ্ তাই তো! আমরা তো ওই বুকশপের কথা বেমালুম ভুলে গিয়েছিলাম।”

নাবিলের কথায় অথৈ ইভানকে উদ্দেশ্য করে বলে,

“ভাই যত দ্রুত সম্ভব তুই ওখানকার সিসিটিভি ফুটেজ দেখার ব্যবস্থা কর। এত বড়ো একটা ক্লু আমাদের সামনে ছিল৷ আর আমরা সেটা দেখিইনি!”

“তোরা আমার সাথে ওখানে চল। আমি সিসিটিভি ফুটেজ দেখার ব্যবস্থা করছি।”

বন্ধুরা সবাই মিলে দ্রুত ‘কবিতার শহর’ নামক সেই বুকশপে চলে যায়। ইভান নিজের পরিচয় দেওয়ার সাথে সাথেই দোকানের মালিক সিসিটিভি ফুটেজ দেখার অনুমতি দিয়ে দেয়। এই দোকানে মোট দুইটা সিসিটিভি লাগানো আছে। একটা ভেতরে, আরেকটা বাইরে। সবাই প্রথমে ভেতরের ফুটেজ দেখে। কিন্তু সিরাত এই দোকানের ভেতর অবধি আসেইনি। এরপর ইভান বাইরের সিসিটিভি ফুটেজ বের করে। দোকান থেকে খানিকটা দূরে দাঁড়িয়ে সিরাত বারবার ফোনের দিকে তাকাচ্ছে। এখানে সিরাতকে দেখে সকলের মুখে কিঞ্চিৎ হাসি ফুটে ওঠে। অবশেষে মেয়েটার দেখা তো পাওয়া গেল।

প্রায় পাঁচ মিনিট একই জায়গায় দাঁড়িয়ে সিরাত কারোর জন্য অপেক্ষা করছিল। এরইমাঝে একটা হুডি পরিহিত ছেলে এসে দাঁড়ায় তার সামনে। তাদের মধ্যে কী কথা হয় তা বুঝতে পারে না কেউ। ছেলেটা সিরাতের মুখে কিছু একটা স্প্রে করার সাথে সাথে মুহূর্তের মধ্যে সিরাত লুটিয়ে পড়ে ছেলেটার বুকে। হুডির আড়ালে মুখ ঢাকা থাকায় কেউ তার মুখ দেখতে পায় না।

“এতদূর অবধি এসেও কি আমরা কিচ্ছু করতে পারব না?”

মাওয়ার কান্না জড়িত কণ্ঠে পুনরায় সবাই আশাহত হয়। ছেলেটা সিরাতকে কোলে নিয়ে মিনিটের মধ্যেই আড়াল হয়ে যায়। মাওয়া কিছু একটা দেখে চিৎকার করে বলে,

“ইভান একটু পোজ কর ছেলেটার ডান হাতে।”

ছেলেটার ডান হাতে আঁকা একটা তীরের ছবি দেখে উত্তেজিত হয়ে মাওয়া বলে ওঠে,

“আমি এই চিহ্নটা চিনি।”

অভি অবাক হয়ে বলে,

“চিনিস মানে?”

“আরে এটা তুরাগের হাত। ওর হাতে এই একইরকম চিহ্ন আঁকা ছিল।”

“কী বলছিস তুই? তুরাগ এখানে আসবে কীভাবে?”

উর্মির প্রশ্নের উত্তরে মাওয়া বলে,

“আরে ভাই আমি এতকিছু জানি না। কিন্তু এটা যে তুরাগের হাত তাতে কোনো সন্দেহ নেই। আমি ওর হাতে আঁকা এই চিহ্ন খুব ভালো করে চিনি। সুতরাং এটা যে তুরাগ সে বিষয়ে আমি শতভাব নিশ্চিত। তার মানে সিরাতের নিখোঁজ হওয়ার পেছনে তুরাগের হাত আছে।”

কথাটা বলেই মাওয়া আতঙ্কিত হয়ে পড়ে। বাকি সবাই স্তব্ধ চোখে অপলক তাকিয়ে থাকে মাওয়ার দিকে।

চলবে??

পূর্ববর্তী নিবন্ধ
পরবর্তী নিবন্ধ
গল্প পোকা
গল্প পোকাhttps://golpopoka.com
গল্পপোকা ডট কম -এ আপনাকে স্বাগতম......
RELATED ARTICLES

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে

- Advertisment -

Most Popular

Recent Comments

Md masrur Hasan mahi على অবুঝ_বউ পার্ট: ৫
আমিনুল ইসলাম على প্রয়োজন পর্ব: ৩০ ( অন্তিম)
সাজিবুল ইসলাম على ধর্ষিতাবউ২ ৯ তথা শেষ পর্ব
শাহিদুল ইসলাম على জীবন সঙ্গী ১ম পার্ট
শাহিদুল ইসলাম على জীবন সঙ্গী ১ম পার্ট
Nita Sarkar على স্বপ্নীল ৬৮
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على রহস্য শেষ_পর্ব
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على অলক্ষ্যে তুমি পর্ব-০৬ এবং শেষ পর্ব
Nazmun Nahar Akhi على Psycho_is_back? part_7
Nazmun Nahar Akhi على Dangerous_Villian_Lover part 2
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على জানালার ওপারে পর্ব-১৭ এবং শেষ পর্ব
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على লীলা বোর্ডিং ১২১৫ পর্ব-১১ এবং শেষ পর্ব
মিজানুর রহমান রাহুল على সেই তুমি পর্ব-০১
@feelings على প্রহেলিকা
Anamika Basu على সে পর্ব-১২
Anamika Basu على সে পর্ব-১২
Nusrat jahan على coffee & vanilla Part-10
Pallabi Roy على স্বপ্নীল ৬৮
M.D Mahabub على The_Villain_Lover Part_2
Labani sarkar على Dangerous_Villain_Lover part 23
MD Akas Apc على বিবেক
Tanisha Ahmed على Devil love part-18 
Aius Barmon shorob على নারীর দেহকে নয়
Chandan roy على স্বপ্নীল ৬৮
Chandan roy على স্বপ্নীল ৬৮
Riya Biswas على তুমি রবে ৬০
Priya Banerjee على devil love married life last part
Riya Biswas على তুমি রবে ৬০
Riya Biswas على তুমি রবে ৫২
Mohammad Adib على তুমি রবে ৬০
Avni Ayesha على তুমি রবে ২৮
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
সুমিত على তুমি রবে ২৮
TANJIBA ZENIFAR على তুমি রবে ৫০
TANJIBA ZENIFAR على তুমি রবে ৫০
Samiah Begum على তুমি রবে ৫১
biddut das rocky على নর নারী
গল্প পোকা على নষ্ট গলি শেষ পর্ব
Md Jobayer Hossain Shohag على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
গল্প পোকা على দুই অলসের সংসার
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤৪২.
A.J.S Rakib على মন ফড়িং ❤৪২.
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
Samiya noor على গল্পঃ ভয়
Sadikul على গল্পঃ ভয়
Samia Islam على গল্পঃ ভয়
শূন্য মায়া على মন ফড়িং ❤ ৪০.
Sutapa biswas على মন ফড়িং ❤৩৯.
Foysal Mahmud على My_Mafia_Boss_Husband Part: 16
sutapa biswas على মন ফড়িং ❤ ৩৮.
sutapa biswas على মন ফড়িং ❤ ৩৭
Foysal Mahmud على My_Mafia_Boss_Husband Part: 16
Siyam على বিবেক
Sudipto Guchhait على My_Mafia_Boss পর্ব-৯
saptami karmakar على devil love married life last part
saptami karmakar على devil love married life last part
মায়া على মন ফড়িং ৩০.
মায়া على মন ফড়িং ৩০.
মায়া على মন ফড়িং ২৬.
Shreyashi Dutta على  বিয়ে part 1
Sandipan Biswas على  বিয়ে part 1
Paramita Bhattacharyya على অনুরাগ শেষ পর্ব
জামিয়া পারভীন তানি على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
মায়া على মন ফড়িং  ২২
সুরিয়া মিম على খেলাঘর /পর্ব-৪২
গল্প পোকা على মন ফড়িং ২১
গল্প পোকা على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
Sahin ssb على মন ফড়িং ২১
মায়া على মন ফড়িং ২১
মায়া على মন ফড়িং ❤ ২০.
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤ ২০.
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৮. 
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৭.
Jannatul Ferdous على খেলাঘর পর্ব-৩৫
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤ ১৬. 
গল্প পোকা على ফাল্গুনের_ফুল last_part_8
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৬. 
গল্প পোকা على ছাত্রী যখন বউ পাঠঃ ১
গল্প পোকা على বাজির প্রেম পাঠঃ ১
Foujia Khanom Parsha على মা… ?
HM Ashraful Islam على অবুঝ_বউ পার্ট: ৮
HM Ashraful Islam على অবুঝ_বউ পার্ট: ৫
Ibna Al Wadud Shovon على স্বার্থ